সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

যার সঙ্গেই দেখা হয়, তাকেই বলতে শুনি ইচ্ছে হয়, এক্ষুণি চলে যাই ওদের পাশে দাঁড়িয়ে লড়াই করি। চেনা-অচেনার কোনও বিভেদ নেই। চায়ের দোকানে, পানের দোকানের সামনে রাস্তার মোড়ে মোড়ে, যুবকদের মুখে মুখে একই কথা, চলো আমরাও যাই। ওইসব যুবক কে কোন পার্টির সমর্থক? জিজ্ঞাসে কোন জন? বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর আজ কান্ডারি।
বাঙালির মধ্যে এমন অকৃত্রিম আকাঙ্ক্ষা ও উত্তেজনা বহুদিন দেখা যায়নি। ইদানীং বাংলাদেশে দেশপ্রেম কিংবা নিজস্ব সংস্কৃতিকে উপেক্ষার চোখে দেখার হুজুগ এসেছিল। কিন্তু আজ প্রমাণিত হল বইপড়া তত্ত্ব কিংবা শুকনো অঙ্কের মতন হৃদয়হীন যুক্তি শুধু নিজেদের মধ্যে হানাহানিই ঘটাতে পারে—কিন্তু দেশ ও ভাষার প্রতি ভালোবাসা একটা দেশের সমস্ত মানুষকে বিনা দ্বিধায় এক সংগ্রামের সঙ্গী করে নিতে পারে।
বাংলাদেশে বহুদিন কোনও যুদ্ধ হয়নি। আজ যে যুদ্ধ বেধেছে, এর চেয়ে সত্যতর কোনও কারণে কোনও যুদ্ধ হতে পারে না। এইরকম যুদ্ধে কোনও গ্লানি নেই, রক্তস্রোতে কোনও পাপ নেই, এই যুদ্ধ যেন একটা উৎসবের মতন এতে প্রাণ দেবার জন্য কাড়াকাড়ি পড়ে যায়।
পাশের বাংলায় যে যুদ্ধ চলেছে, তার আঁচ যে এখানেও লাগবে, তা তো আমাদের বেঁচে থাকার মতনই স্বাভাবিক ঘটনা। তাই এদিকের অসংখ্য মানুষও ওই যুদ্ধে অংশীদার হতে প্রস্তুত, প্রাণ দিতেও প্রস্তুত, তাই পথে-ঘাটে সর্বত্র শোনা যাচ্ছে, চলো, আমরাও যাই।
স্পেনের মুক্তি যুদ্ধে পৃথিবীর নানা দেশের স্বাধীনতাপ্রেমীরা যোগ দিতে গিয়েছিলেন, কিন্তু স্পেনের উদাহরণ দিয়ে লাভ নেই, ওদিকের বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক যে কত নিবিড়—তা আর নতুন করে বলার দরকার নেই এখন। শুধু যে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালরাই ওপারের জন্য ছটফট করছেন তাই নয়, আজ বাঙালি মাত্রই এই মুক্তি যুদ্ধে উন্মাদনা বোধ করছেন। বাংলাদেশই বা কেন, গোটা ভারতবর্ষে—দিল্লি, বোম্বাই, মাদ্রাজ, পাঞ্জাবেও জনসভা হয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সমর্থনে। ভারতের প্রতিটি রাজনৈতিক দল ধিক্কার দিয়েছে পশ্চিম পাকিস্তানের বর্বরতাকে।
চলো, আমরাও যাই! কী করে যাওয়া হবে? একথা ঠিক, ভাবাবেগের বশে অনেকে মিলে সীমান্ত পেরিয়ে ওপারে ছুটে গেলে প্রকৃত-কোনও সাহায্যই হবে না। এটা উৎসব নয়, বাস্তব যুদ্ধ। দয়া-মায়া বিবেক শূন্য, অত্যাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রাণপণ লড়াই। এখন সুশৃঙ্খল প্রতিরোধ বাহিনী দরকার। হাতিয়ার যাদের নেই, হাতিয়ার চালাবার শিক্ষা যাদের নেই—তেমন লোকেরা এলোমেলোভাবে ছুটে গেলে যুদ্ধে অসুবিধেই সৃষ্টি করা হবে! এখনও স্বাধীন বাংলাদেশে যুদ্ধ করার জন্য মানুষের অভাব হয়নি, ওদের দরকার অস্ত্রের।
আমার মনে হয়, আবেগবশত এক্ষুণি ছুটে না গিয়ে, যাবার ইচ্ছেটা মনের মধ্যে টিঁকিয়ে রাখা দরকার। প্রতিজ্ঞার আগুন যেন অনির্বাণভাবে জ্বলতে থাকে। বাঙালির আত্মসম্মান বাঁচানোর জন্য প্রয়োজনে প্রাণ দেবার শপথ যেন অটুট থাকে। ইতিমধ্যে বিভিন্ন দলের উদ্যোগে সম্মিলিতভাবে একটি কমিটি গঠন করে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গড়ে তোলা দরকার। যাতে ওদিক থেকে ডাক পড়লেই ছুটে যেতে পারে এই স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী। বিভিন্ন দলের উদ্যোগে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠিত হলে তারা ওদিকে গিয়েও পরস্পরের সঙ্গে মারামারি করবে না তো? তার থেকে বড় কেলেঙ্কারি আর কী হতে পারে?
এই মুহূর্তে আমাদের প্রধান দায়িত্ব, স্বাধীন বাংলাদেশকে অবিলম্বে স্বীকৃতি দেবার দাবিতে দেশব্যাপী প্রবল ধ্বনি তোলা। পৃথিবীর অন্যান্য দেশ কে কবে স্বীকৃতি দেবে না দেবে জানি না, ভারতই প্রথম স্বীকৃতি জানান। স্বাধীন বাংলাদেশকে সরকারিভাবে মেনে নিলে আমাদের কাজ অনেক সহজ হয়ে যাবে। বাইরের অস্ত্র সাহায্য ছাড়া এই ধরনের লড়াই অনর্থক রক্তক্ষয়ী হয়। জয় হবেই, শুধু আরও রক্তক্ষয়। স্বাধীন বাংলাদেশের সমর্থনে এখানে হরতাল ডাকা হয়েছে সেদিন মিছিলে মিটিং-এ সোচ্চার হয়ে উঠুক এই দাবি, কূটনৈতিক কচকচির বদলে—আমরা স্বাধীন বাংলাদেশ এবং অস্থায়ী সরকারের স্বীকৃতি চাই।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন