সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

প্রথমবার গিয়েছিলাম প্রায় ছাব্বিশ-সাতাশ বছর আগে। কোনও আমন্ত্রণে নয়, সেখানে আমার পরিচিত কেউ নেই, আমার মুখখানাও তখন পাঠকদের কাছে চেনা হয়নি। সে সময় পর্যটন শিল্পকে উৎসাহ দেওয়া হত না, হোটেলের সংখ্যা ছিল নগণ্য আর আমাদের মতন প্রতিবেশী রাজ্যের মানুষকেও আন্দামানে যেতে হলে সেখানকার শাসন-কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আগে অনুমতি নিতে হত। যথাবিহিত সেসব নিষ্পন্ন করে আমি একদিন জাহাজের টিকিট কেটে ভেসে পড়েছিলাম বঙ্গোপসাগরে। আমার বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে কেউই তখনও পর্যন্ত আন্দামান দ্বীপপুঞ্জ দ্যাখেনি, সঠিক ধারণাও নেই, কয়েকজন আমাকে জিগ্যেস করেছিল, হঠাৎ একা একা আন্দামান যাচ্ছ কেন? আমি সঠিক উত্তর এড়িয়ে গেছি, অনায়াসে বলা যেত বিকজ ইট ইজ দেয়ার। আসল কারণ হল, আমাদের স্বাধীনতা-সংগ্রামের সশস্ত্র বিপ্লবীদের মধ্যে যাঁরা আন্দামানে দণ্ডিত হয়েছিলেন এবং তাঁদের মধ্যে যাঁরা তখনও বেঁচে আছেন, তাঁদের নিয়ে একটি উপন্যাস রচনা করার বাসনা আমার মনে ঘুরঘুর করছিল। নিজেই ঠিক করেছিলাম, কুখ্যাত সেলুলার জেলটি স্বচক্ষে না দেখে এরকম রচনায় হাত দেওয়া উচিত নয়।
সেই মুখ্য উদ্দেশ্যটি ছাড়াও ভ্রমণের টান তো ছিলই। সঙ্গীবিহীন অপরিকল্পিত ভ্রমণের স্বাদই আলাদা, আমি উপভোগ করেছিলাম খুবই। ইচ্ছেমতন এক-একটা দ্বীপে গিয়ে থেকেছি। এমন গাঢ় নীল সমুদ্র, এমন বৃষ্টির লুকোচুরি খেলার আকাশ, এমন নিবিড় অরণ্য, যেদিকে তাকালে মনে হয় ব্রহ্ম-স্বাদের মতন অনুচ্ছিষ্ট। শুনেছি জারোয়াদের সম্পর্কে অনেক রোমাঞ্চকর গল্প, দেখেছি পাল পাল হরিণ, নির্জন বেলাভূমিতে কতরকম ঝিনুক ও শঙ্খ।
একটিই মাত্র ভদ্রগোছের সরকারি হোটেল ছিল, সেখানে আমি জায়গা পেয়েছিলাম বটে, তবে বেশ মজার শর্তে। প্রত্যেকদিন দুপুরবেলা বারোটা থেকে চারটে পর্যন্ত ঘর ছেড়ে দিতে হবে। কারণ ওই সময় ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনসের ফ্লাইট আসে, পাইলট ও অন্য কর্মীরা স্নান খাওয়াদাওয়া করে ওই হোটেলে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেন, পুরো হোটেলটা তাঁদেরই দখলে থাকে (ঘর ছিল মাত্র ছ'-সাতখানা)। অর্থাৎ প্রতিদিন চার ঘণ্টা আমি উদ্বাস্তু।
তখন অনেক জায়গাতেই দেখা যেত বাঙালি মুখ, পথেঘাটে শোনা যেত বাংলা কথাবার্তা। অতুল স্মৃতি সমিতি নামে বাঙালিদের একটি পুরোনো প্রতিষ্ঠানে যেতাম খবরের কাগজ পড়তে। অনেকের মুখেই খেদোক্তি শুনেছি, এই আন্দামান দ্বীপপুঞ্জ অনায়াসেই একটি বাঙালিপ্রধান রাজ্য হতে পারত, ত্রিপুরার মতন। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে পূর্ব পাকিস্তান থেকে লক্ষ লক্ষ উদ্বাস্তু আসছিল, পশ্চিমবঙ্গের তখন উপচে ওঠার মতন অবস্থা। তাদের আর স্থান দেওয়া যাচ্ছিল না। বিধানচন্দ্র রায়ের উদ্যোগে, কেন্দ্রীয় সরকারের সম্মতিতে বাঙালি উদ্বাস্তুদের আন্দামানে পাঠাবার পর বিরোধী পক্ষ দারুণ কোলাহল ও প্রতিবাদ শুরু করে দেয়। যেন বেড়াল পার করার মতন বাঙালি উদ্বাস্তুদের কালাপানি পার করে পাঠানো হচ্ছে নির্বাসনে। প্রতিবাদের ফলে আন্দামানে উদ্বাস্তু পাঠানো বন্ধ করে পাঠানো শুরু হয় দণ্ডকারণ্যে।
আন্দামানের মতন দণ্ডকারণ্যের উদ্বাস্তু শিবিরগুলিও ঘুরে ঘুরে দেখার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা আমার আছে। দণ্ডকারণ্যেই আসলে বাঙালি উদ্বাস্তুরা প্রকৃত নির্বাসিত এবং উপেক্ষিত। সেই কঠিন পাথুরে মাটির পরিবেশে বাঙালি উদ্বাস্তুরা ফসল ফলাতে পারেনি, দশকের-পর-দশক তারা সরকারের গলগ্রহ এবং ডোল-নির্ভর থেকেছে, এক সময় বেপরোয়া হয়ে তারা দলে দলে ছুটে এসেছিল সুন্দরবনের মরিচঝাঁপিতে, তাদের ঘাড় ধাক্কার চেয়েও বেশি অপমান করে বিতাড়িত করা হয়েছে। অপরপক্ষে আন্দামানে যে কয়েক ব্যাচ উদ্বাস্তু পাঠানো হয়েছিল, তারা চতুর্দিকে জল ও নরম মাটি পেয়ে মাছ ধরা ও চাষবাসে স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছে অবিলম্বে। অনেকে রীতিমতো স্বচ্ছল। গুজব শুনেছি, কোনও কোনও প্রাক্তন উদ্বাস্তু নাকি প্লেন চার্টার করে পশ্চিমবঙ্গে বিয়ে করতে আসে। সত্যি হতেও পারে।
যদি আরও লাখ দু-এক উদ্বাস্তুকে পাঠানো যেত আন্দামানে, তাদের জন্য অঢেল জায়গা ছিল। এটা আমাদের বিরোধী পক্ষের অদূরদর্শিতা তো বটেই। বিরোধী পক্ষের দু-চারজন প্রতিনিধি যদি আন্দামানে গিয়ে স্বচক্ষে সেখানকার পরিবেশ দেখে আসতেন, তা হলে নিশ্চিত এমন প্রতিবাদ কিংবা কালাপানি সম্পর্কে কুসংস্কারের পরিচয় দিতেন না।
সাতাশ বছর বাদে আমি ফিরে গেলাম আন্দামানে, এবারে এক ত্রিভাষা সাহিত্য সম্মেলনে যোগ দিতে, সস্ত্রীক। প্রথমটায় আমার হতভম্ব হওয়ার মতন অবস্থা, পোর্টব্লেয়ার শহরটি যেন চিনতেই পারছি না। আমার স্ত্রীকে যা গল্প বলেছিলাম, তার কিছুই প্রায় মেলে না। এখন প্রচুর দোকানপাট, প্রচুর বাড়ি, কোনও কোনও এলাকা বেশ ঘিঞ্জি, বেশ কয়েকটি হোটেল ও গেস্টহাউস হয়েছে, তার মধ্যে চার-পাঁচ তারা হোটেলও আছে। এখন পর্যটনকেও উৎসাহিত ও প্রবর্ধিত করা হচ্ছে, ফরসা ফরসা বিদেশি মুখও দেখা যায়।
উন্নতি হয়েছে অবশ্যই, তবে পিছু হটে গেছে বাঙালিরা। আগে শিক্ষক, চিকিৎসক, সরকারি অফিসারদের মধ্যে বাঙালির সংখ্যাই বেশি দেখেছিলাম, এখন তামিল, তেলুগু, মালয়ালি, এমনকী পাঞ্জাবিই অধিকাংশ। যেমন কলকাতা থেকে আন্দামানের জাহাজ ছাড়ে, তেমনই জাহাজ আসে চেন্নাই ও ভাইজাগ থেকে। দক্ষিণ ভারতীয়দের উদ্যম বেশি, অধিকাংশ দোকানের মালিক তাঁরাই। সুদূর পাঞ্জাব থেকে এসে অনেকে এখানে ব্যবসা-বাণিজ্য চালাচ্ছে, রীতিমতো পাঞ্জাবি সেটলমেন্ট। একসময় কলকাতা বন্দরে জাহাজ ধর্মঘটে মাসাধিককাল আন্দামানের জাহাজ বন্ধ ছিল, সেই সুযোগে চেন্নাইয়ের তৎপরতা বেড়ে গেছে। জারোয়ারাও আর তেমন নেই, কেউ কেউ শহরে এসে ভিক্ষা করে।
এক সময়ে এখানকার স্কুল-কলেজগুলি ছিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে। এখন তা চলে গেছে পণ্ডিচেরিতে। বিচারব্যবস্থা শুধু রয়ে গেছে কলকাতার উচ্চ আদালতের আওতায়। প্রথমবার যখন আসি, এখানকার জঙ্গলে হরিণের সংখ্যা খুব বেড়ে গিয়েছিল। মূল ভূখণ্ড থেকে হরিণ এনে ছাড়া হয়েছিল, বাঘ-সিংহ নেই বলে হরিণের বংশবৃদ্ধি হচ্ছিল হুহু করে। ফসলের খেত ধ্বংস করত, তাই হরিণ মারা নিষিদ্ধ ছিল না। যত্রতত্র হরিণের মাংস ও চামড়া বিক্রি হত। মাংস ছিল চার টাকা কিলো। তখন চিংড়িও ছিল চার টাকা। এখনও হরিণের মাংস পাওয়া যায়, পঞ্চাশ থেকে ষাট টাকা কিলো। শুনলাম, চিংড়ি বেশ দুর্লভ আর সবজির খুব দাম। ফুলকপি ষাট টাকা, কাঁচা লঙ্কা কখনও দুশো টাকা কিলোও হয়।
সরকারি ভাষা মূলত ইংরেজি ও হিন্দি। দ্বিতীয়বার পৌঁছবার পরই একটা করুণ কাহিনি শুনেছিলাম। পোর্টব্লেয়ার কলেজের বাংলা অনার্স ক্লাসে দুটি মাত্র ছাত্রী ছিল, তারা হঠাৎ বাংলা ছেড়ে অন্য বিষয়ে চলে গেছে। দুজন অধ্যাপক আছেন, একজনও ছাত্রছাত্রী নেই। আগের বছরও এমন হয়েছিল। এর পরে বাংলা বিভাগটি যদি তুলে দেওয়া হয়, তাতে বিস্ময়ের কিছু থাকবে না। নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা বাংলা পড়তে চায় না। কারণ, প্রয়োজন ছাড়াও বাংলার সাংস্কৃতিক পরিবেশও নেই। একটি ছেলে আমাকে বলল, সে আগে বাংলা কবিতা লিখত, এখন লেখে উর্দুতে। উর্দু ভাষার বিরুদ্ধে আমার বলার কিছুই নেই, শুনতে বেশ ভালোই লাগে। কিন্তু যারা মাতৃভাষা ছাড়ে, তারা সাধারণত ইংরেজি গ্রহণ করে, তার বদলে উর্দু হলে একটু তো খটকা লাগবেই।
ম্রিয়মাণ অবস্থার মধ্যেও কিছু কিছু বাঙালি বাংলার সংস্কৃতি ও ভাষাকে এখনও আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। বাংলা সিনেমা এখানে অতি দুর্লভ, আদিত্য নাট্য আকাদেমি নামে একটি সংস্থা মাঝে মাঝে মঞ্চস্থ করে নাটক। অনিয়মিত হলেও বেরোয় কয়েকটি সাময়িক পত্রিকা, যেমন বাকপ্রতিমা, দ্বীপবাণী, সমুদ্রমেখলা, আহেলী। রয়েছেন রবীন রায়চৌধুরীর মতন গ্রন্থকার। একটি বাংলা গ্রন্থাগার আছে, পৃষ্ঠপোষকের অভাবে বেশ মলিন। এই বাঙালিদের কি আমরা একেবারেই দূরে সরিয়ে রাখব? এরা চিরতরে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে বাংলা সংস্কৃতি থেকে? পশ্চিমবঙ্গ সরকারের উচিত, অবিলম্বে পোর্টব্লেয়ারে একটি সংস্কৃতি কেন্দ্র স্থাপন করা। সেটা তথ্যকেন্দ্র ও বাংলা আকাদেমির মিলিত রূপ হতে পারে। ছোট আকারের হলেও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের উপস্থিতি স্থানীয় বাঙালিদের মনে ভরসা জোগাবে।
'বাকপ্রতিমা'-র সম্পাদক অনাদিরঞ্জন বিশ্বাস আমাকে এমন একটা কথা বলেছিল, যা আমার বুকে গেঁথে আছে। বিবাহিত গৃহস্থ, পরিবার তেমন সচ্ছল নয়। কষ্ট করে, নিছক ভালোবাসার টানে পত্রিকাটি প্রকাশ করে। সে বলেছিল, বাংলাভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য এক সময়ে ঢাকায় প্রাণ দিয়েছে চার জন, শিলচরে প্রায় দিয়েছে এগারো জন। যদি আবার বাংলাভাষার ওপর তেমন আক্রমণ আসে, তীব্র আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে আবার প্রাণ দিতে হয়, তা হলে, সুনীলদা, অনুগ্রহ করে আমাকে একেবারে সামনে দাঁড়াবার সুযোগ দেবেন। প্রথম গুলিটায় আমি প্রাণ দিতে চাই।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন