সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

সাতক্ষীরায় একজন সৌম্য দর্শন বৃদ্ধ হাসতে হাসতে আমাকে জিগ্যেস করেছিলেন, এরপর কী? তখন তাঁর হাসিটাও একটু অস্বাভাবিক লেগেছিল।
ডিসেম্বর মাসের গোড়ার দিকে সাতক্ষীরা শহরের পতনের দু-একদিন পরেই বাংলাদেশ সরকারের প্রশাসন প্রতিনিধি ও মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে কলকাতা থেকে আমরা কয়েকজন গিয়েছিলাম। বসিরহাটের কাছে ইটিন্ডা থেকে ইছামতী নদী পেরিয়ে তিন মাইল গেলেই ভোমরা, তারপর থেকেই বাংলাদেশের মাটি। খুলনা-সাতক্ষীরা যাতায়াতকারী একটি লঝঝরে বাস তখন মুক্তি বাহিনীর দখলে, সেটি চেপে কিছুদূর যাওয়ার পরই বাসটি ছেড়ে দিতে হল, বাসটির অন্য প্রয়োজন ছিল, তখন পায় হাঁটা।
বাংলাদেশের মাটিতে প্রথম পা দিয়েই এক ধরনের রোমাঞ্চ হয়। যদিও তার কোনও যুক্তি নেই। এ মাটি তো আলাদা কিছু নয়। অদূরের বসিরহাট—হাসনাবাদ আর এই ভোমরার ভূপ্রকৃতিতেও তফাত কিছু নেই, একই দেশ, একই মানুষ—মাঝখানে কয়েকবছর একটা অবাস্তব দেয়াল তোলা ছিল। সেই নিষেধের ভ্রুকুটিই মনের মধ্যে এই বাষ্প তৈরি করে দিয়েছে।
রাস্তার দুপাশে যুদ্ধের ক্ষত বিক্ষত চিহ্ন। অজস্র বাঙ্কার আর ফক্স হোল আর আগুনে পোড়া বাড়ি। তখনও খুলনা শহর এলাকায় তুমুল যুদ্ধ চলছে, ঢাকা আত্মসর্ম্পণের সম্ভাবনাও দেখা যায়নি। আমি তো নিজে যুদ্ধ করিনি, তাই সেই যুদ্ধসঙ্কুল আবহাওয়ার মধ্যে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বেশ একটা সুখ মিশ্রিত শিরশিরে অনুভূতি হচ্ছিল।
সাতক্ষীরা শহরের পার্কে মিটিং—সেখানে নবীন বাংলাদেশ সরকার তাঁদের নীতি ঘোষণা করবেন। সাতক্ষীরার যুদ্ধে মুক্তি বাহিনীরই ছিল প্রধান ভূমিকা—ভারতীয় সেনাবাহিনী শুধু শেষ ধাক্কা দিয়ে সাহায্য করে খুলনার দিকে এগিয়ে গেছে। সাতক্ষীরা শহর এলাকায় কিংবা মিটিং-এ একজনও ভারতীয় সৈনিক নেই। ভারতীয় বলতে আমরা কয়েকজন নিছক অসামরিক মানুষই উপস্থিত। কয়েকশো মুক্তিযোদ্ধা অস্ত্র ভূমিতে নামিয়ে রেখে মিটিং-এর মাঝখানে বসেছে। মঞ্চের দুপাশে দুটি তরুণ পাহারা দিচ্ছে স্টেনগান হাতে নিয়ে।
মিটিং-এর প্রথম দিকে খুব বেশি লোক হয়নি। আস্তে আস্তে ভিড় বাড়ে। অধিকাংশ মানুষেরই মুখ ভাবলেশহীন। মঞ্চ থেকে যখন জ-য় বাং-লা ধ্বনি তোলা হচ্ছিল, আমি লক্ষ করেছিলুম, অনেকেই গলা মেলায়নি। অনেকেই মিটিং থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে সতর্কভাবে সব ব্যাপারটা লক্ষ করেছিল। তাতে আমার একটু খটকা লাগে। আমরা ধারণা করেছিলুম, বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষই স্বাধীনতার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছিল। কিন্তু সেটা বাস্তবে সত্যি হতে পারে না। বহু নিরন্ন শিক্ষাহীন মানুষের কাছে স্বাধীনতার মর্মটাই পরিষ্কার নয়। দারিদ্র্য তাদের চিরকাল পরাধীন করে রেখেছে, শুধু শাসক বদলেছে মাত্র। পাকিস্তানি সৈন্যদের নারকীয় অত্যাচারে সকলেই সহ্যের শেষ সীমায় এসেছিল ঠিকই, তারা বিতাড়িত হওয়ায় স্বস্তি পেয়েছে ঠিকই, কিন্তু নতুন শাসন ব্যবস্থার চরিত্র সম্পর্কে সন্দীহান। আবার কি হিন্দু রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হতে চলল নাকি? সাতক্ষীরা শহরে তখন একজনও হিন্দু নেই—আবার কি পাক সেনাবাহিনীর হাতে অত্যাচারিত নিগৃহীত হিন্দুরা প্রতিশোধ নিতে ফিরে আসবে? কিংবা যুদ্ধ তো তখনও শেষ হয়নি—হঠাৎ যদি সীমান্তের একদিক থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে চিনা সৈন্য, ভারতীয় বাহিনী তা হলে সেই সীমান্ত বাঁচাতে বাংলাদেশ ছেড়ে দৌড় দেবে—তাহলে আবার ফিরে আসবে পাকিস্তানিরা—তখন এই জয় বাংলা ধ্বনি দেবার জন্য প্রত্যেকের গলা কাটবে না? কিংবা ভারত মহাসাগর থেকে মার্কিন সপ্তম নৌবাহিনী যদি সত্যিই কামান দেগে বসে, ভারতের সাধ্য আছে যুদ্ধ চালাবার? মুক্তিবাহিনী আর কোনও দিন সীমান্ত পেরুতে পারবে তাহলে?
মুখে অবশ্য এই সংশয়ের কথা কেউ বলেননি। সকলেই আমাদের বলছিলেন, পাকিস্তানিরা গেছে আপদ গেছে। আমরা তো এই স্বাধীনতাই চেয়েছিলাম।
মিটিং-এর বক্তাদের জোরালো বক্তৃতায় ক্রমশ আবহাওয়া বদলায়। অনেকেই আরও কাছাকাছি চলে আসে ও শ্লোগানে গলা মেলায়। উত্তাল জয় বাংলা ধ্বনিতে দিক দিগন্ত ভরে যায়।
মিটিং শেষ হবার পর আমি বাইরে ঘুরছি সেই সময় সেই বৃদ্ধের সঙ্গে দেখা। মাথা ভরতি ধপধপে সাদা চুল, মুখেও সেইরকম সাদা দাড়ি। বার্ধক্যের যে একটা সৌন্দর্য আছে, এইরকম বৃদ্ধকে দেখলে তা বোঝা যায়। সঞ্জীবচন্দ্রের ভাষা ব্যবহার করে বলতে হয়, এমন প্রসন্নতা ব্যঞ্জক ওষ্ঠ খুব কম দেখা যায়।
বৃদ্ধ আপন মনে মিটিমিটি হাসছিলেন। সেই হাসিটিই আমার দৃষ্টি আকৃষ্ট করে। এখানে এসে আর যাই দেখি, হাসি দেখিনি। মুখে মুখে অত্যাচার ও নিপীড়নের কাহিনি। অনেকেরই মনের মধ্যে চাপা শঙ্কা—কাকে কখন কোলাবরেটার বা দালাল বলা হবে ঠিক নেই। নতুন শাসকরা কাকে কীরকম শাস্তি দেবে কে জানে! এই সময় কারুর মুখে হাসি আসতে পারে না।
আমি বৃদ্ধের কাছে এগিয়ে গিয়ে প্রশ্ন করলাম, আপনার কেমন লাগছে?
বৃদ্ধ আমাকে আপাদমস্তক দেখে জিগ্যেস করলেন, তুমি বাবা বুঝি ইন্ডিয়ার লোক?
আমার চেহারায় বা পোশাকে সেরকম কী পরিচয় ছিল জানি না। বছর পঁচিশেক আগে হলে ইনি নিশ্চয়ই জিগ্যেস করতেন, তোমার বাবা কোন জেলায় বাড়ি। এখন জেলার বদলে দেশ।
উত্তর দিলাম, হ্যাঁ।
বৃদ্ধ পূর্ববৎ হাসতে হাসতে বললেন, এরপর কী? এরপর কী? কেন, এ কথা বলছেন কেন?
বৃদ্ধ সেই মিটিং ভাঙা ভিড়ের দিকে হাত দেখিয়ে বললেন, মাত্র সাতদিন আগে ঠিক এই জায়গায়, ঠিক এই সময় আর একটি মিটিং হয়েছিল। এতগুলোন মানুষই এসেছিল। তখন আর্মির লোকেরা আর শহরের মুরুব্বীরা বক্তৃতা দিলে, সবাই বললে, মুক্তিবাহিনী আমাদের দুশমণ, ভারতের দালাল। ওরা আসছে আমাদের ধর্ম, মান-ইজ্জত কেড়ে নিতে। সবাই আল্লার কাছে প্রার্থনা করলে, ওইসব দুশমন নিপাত যাক। আজ যারা জয় বাংলা বলে চেঁচাচ্ছে—তাদের অনেকেই সেদিন একরকম ভাবে আল্লা হো-আকবর বলে চিৎকার করছিল : তা, সেদিন দেখলুম একরকম, আজ আবার অন্য রকম। এখন কথা হচ্ছে, আর সাতদিন পর আবার কী দেখব?
তখনও যুদ্ধ শেষ হয়নি। আমরা ভারতে বসে নিশ্চিত জানতুম—এই যুদ্ধে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় যৌথ সংগ্রাম দু-চারদিনের মধ্যে জয়যুক্ত হবেই। কিন্তু দখলীকৃত এলাকায় বসে অনবরত পাকিস্তানি প্রচার শুনতে শুনতে সেখানকার মানুষের পক্ষে এরকম বিশ্বাস খুব দৃঢ় হওয়া সম্ভব ছিল না। এরকম প্রশ্ন উঠতে পারেই। বৃদ্ধ সেটা প্রকাশ্যে বলে ফেললেন।
কিন্তু চকিতে আমার মনে অন্য একটা কথা এসেছিল। এরপরে কী—এই প্রশ্নের মধ্যে অনেক রকম আশঙ্কা। বিজয়ের পর আবার কত রক্তপাত শুরু হবে? মুক্তিবাহিনীর কোনও কোনও যোদ্ধার মুখে শুনতাম, আমরা যখন ভেতরে ঢুকব, মারতে মারতে ঢুকবে! যারা দালালি করছে, আমাদের বাংলারই মানুষ হয়েও আমাদের বাড়ি-ঘর লুট করছে—মা-বোনের ওপর অত্যাচার করছে, তাদের ছাড়বো? একজন বলেছিল সবুর খানকে খুন না করে আমি আর দেশের ভাত খাবো না! এসব বড় ভয়ংকর কথা। সদ্য স্বাধীনতার পর মারামারি কাটাকুটি শুরু হলে সে দেশ নিজের পায়ে দাঁড়াবে কী করে? বিদেশি শকুনরা তো সেই সুযোগের জন্য ওঁৎ পেতে আছে। এখন প্রতিশোধের চেয়ে ক্ষমাই বেশি শক্তিশালী।
আমি বৃদ্ধকে আবার জিগ্যেস করলাম, সে পরে যা হওয়ার তাই হবে। আজকের দিনটায় আপনার কেমন লাগছে?
বৃদ্ধ বললেন, আমি আর ক'দিনই বা বাঁচব? আমার কথায় কী যায় আসে!—না, তবু বলুন! আপনার মতামত শুনতে চাই।
—শুধু ধম্মো ধম্মো করলে কি আর দেশ চলে? মানুষকে খেতে পরতে না দিলে আল্লাও দয়া করেন না তাদের। মারামারি কাটাকাটি না করে সবাই যদি মিলে মিশে থাকে, তবে তো ভালোই। কিন্তু তা থাকবে কি? দেখলাম তো সারাটা জীবন ধরো—
এরপর ঠিক তিনমাস কেটে গেছে। মিথ্যে প্রমাণিত হয়ে গেছে অনেক আশঙ্কা। এর মধ্যে আমি বাংলাদেশের অনেক জায়গায় আবার ঘুরে এসেছি। মুক্তি বাহিনী যে আশ্চর্য সংযম দেখিয়েছে তার নজীর পৃথিবীর ইতিহাসে নেই। দু-একটা ছোটখাটো ঘটনা যা ঘটেছে, তা এতই নগন্য যে তার উল্লেখ করা উদ্দেশ্যমূলক অভিসন্ধি ছাড়া আর কিছুই নয়। হিন্দু রাজত্বও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ইন্দিরা গান্ধি যে ক'টি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তার প্রত্যেকটি রক্ষা করেছেন। এই যুদ্ধ যে সাম্প্রদায়িকতার ওপর একটা বড় আঘাত, সে বিষয়ে আমার অন্তত কোনও সন্দেহ নেই। হঠাৎ একদিনে সব মুছে যাবে এরকম আশা কেউ করে না। বরং বলা যেতে পারে, বাংলাদেশের এই ঐতিহাসিক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ভারতীয় হিন্দু এবং মুসলমানদের মধ্যে সাম্প্রদায়িকতার চির অবসানের একটা উদ্যোগ নেওয়া দরকার।
ঢাকা শহরে গিয়ে হাজার হাজার সাহসী তরুণ মুগ্ধ দেখে বুকখানা গর্বে ভরে যায়। দুঃসাহস ও বিজয়গর্ব তাদের মুখে অপরূপ সৌন্দর্য দিয়েছে। তারা প্রত্যেকে দেশ গড়ার কাছে অংশীদার।
তবু নিভৃতে কারুর সঙ্গে আলোচনা হলে, সেই প্রশ্নটি আবার শোনা যায়, এরপরে কী?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনের মাঠে বসে এই প্রশ্নটি আমি আবার শুনতে পাই। বৃদ্ধ নয়, অনতিনবীন চিন্তিত মুখ। আমি বললাম, আপনি কী হিসেবে বলছেন? অনেকে এখন থেকেই মাথা ঘামাচ্ছেন, পাঁচ বছর বাদে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক কীরকম হবে। আমি মাথা ঘামাতে চাই না।
তিনি বললেন, না, সেকথা নয়। স্বাধীনতা পাওয়া গেল, জয়ের আনন্দও আস্তে আস্তে স্তিমিত হয়ে আসবে। কিন্তু তারপর? সমস্ত মানুষের সুখ-সমৃদ্ধির কী হবে? যে সমাজতন্ত্রের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হল, সেটা কী করে আসবে?
—কেন আসবে না?
—আপনাদের ইন্ডিয়াতেও তো সমাজতন্ত্রের কথা ঘোষণা করা হয়েছে।
—কিন্তু বাস্তবে কতটা হয়েছে।
—ভারত অনেক বড় দেশ। অনেক অনেক জটিল তার সমস্যা। সেখানে সব কিছুই আস্তে আস্তে বদলায়। আপনাদের নবীন উৎসাহ—আপনারাই অনেক তাড়াতাড়ি সেই প্রতিশ্রুতি সার্থক করে তুলতে পারবেন। ভারত আপনাদের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করবে।
তিনি বললেন, কিন্তু দু-চার বছরের মধ্যে যদি প্রতিক্রিয়াশীলরা আবার মাথা তুলে দাঁড়ায়? যদি চিনি মাখিয়ে আবার ধর্মের বিষ খাওয়াতে চায়?
আমি বললাম, ইতিহাস কি কখনও কিছুটা সামনের দিকে এগিয়ে আবার পেছনে ফেরে? আমি অন্তত সেরকম বিশ্বাস করতে চাই না।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন