প্রবাসী বাঙালি : সার্থকতা ও পরের প্রজন্ম

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

নিউ জার্সিতে আলোলিকা ও ভবানী মুখোপাধ্যায়ের বাড়িতে প্রথম আলাপ হয়েছিল ধ্রুব কুণ্ডুর সঙ্গে। কুড়ি-একুশ বছর আগের কথা, সে তখন সুঠাম, স্বাস্থ্যবান যুবক, অত্যন্ত সুপুরুষ এবং বলশালী, কিছুটা সংগ্রামের পর ওখানকার জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত, ক্যাডিলাক (সম্ভবত, আমি গাড়ির নাম মনে রাখতে পারি না) গাড়ি চালায় এবং জীবনরসে ভরপুর। সেই সময়েই কথা প্রসঙ্গে সে বলেছিল, আমি বুড়ো হয়ে এদেশে মরতে রাজি নই, এখানে আমার সবকিছু আছে, তবু আমি দেশে ফিরে যাব! এরকম কথা অনেকেই বলে, অনেকেই কোনও কোনও আবেগময় রাতে খুব শিগগিরই দেশে ফিরে যাবার সঙ্কল্প নিয়ে ঘুমোতে যায়, পরদিন সকালে উঠে ওই ধরনের চিন্তাই ছেলেমানুষি মনে হয়। যারা ভাগ্যান্বেষণে বিদেশে যায়, সেখানে বিদ্যা ও অর্থ দুটোই ভালোভাবে অর্জন করতে পেরে যায়। ওদেশের সুখ-সম্ভোগে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে, তারাই আবার সমস্যাসঙ্কুল স্বদেশে ফিরে আসার জন্য হঠাৎ হঠাৎ উতলা হয়ে ওঠে কেন? এর কোনও সহজ উত্তর নেই। দেশপ্রেম? মা-বাবা কিংবা বন্ধু-বান্ধবদের টান? কোনওটাই তেমন জোরালো নয়। এর পরেও থাকে বিস্ময়, নিজস্ব, অতি ব্যক্তিগত ভালো-লাগা বা ভালো-না-লাগা। তারও কোনও ব্যাখ্যা নেই।

ধ্রুব কুণ্ডু যৌবন বয়েসেই ফিরে এল। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফার্মেসির ডিগ্রি নিয়ে সে আমেরিকার ওষুধ কোম্পানিতে ভালো কাজ পেয়েছিল, এ দেশেও ওষুধ কোম্পানিতে উচ্চপদ পেতে তার অসুবিধে হল না। কিন্তু বনিবনা হল না সে চাকরিতে, কিছুদিন পরেই সে ফিরে গেল। এটাও একটা পরিচিত ফর্মুলা। আবেগের বশে যারা দেশে ফিরে আসে, তারা গ্রিন কার্ড কিংবা ফেরার পথ খোলা রাখে, এদেশের গরম যেমন তাদের সহ্য হয় না, তেমনই বুরোক্র্যাটদের মেজাজ, সরকারি দফতরগুলিতে গয়ংগচ্ছ ভাব, এমনকী ব্যাঙ্কে হয়রানি, টেন বা প্লেনের টিকিট পেতেও ঝামেলা ইত্যাদি তাদের দুর্বিষহ মনে হয়, বুকের মধ্যে রাগ বা অভিমান নিয়ে তারা ফিরে যায়।

ধ্রুব কুণ্ডু গেল বটে, কিন্তু আর চাকরি নিল না। আসলে চাকরি তার ধাতে নেই, তাদের পরিবারে কেউ কখনও চাকরি করেনি। সে হুগলির ইটাচুনার জমিদার বাড়ির সন্তান, এখন আর জমিদারির ঠাটবাট নেই বটে, কিন্তু ইটাচুনার বিশাল প্রাসাদটি অটুট আছে, কলকাতাতেও তাদের সুরম্য হর্ম্য। পরের অধীনে কাজ করতে পারবে না বলে সে আমেরিকায় শুরু করল ব্যবসা, মূলত চামড়ার ব্যাগের, কলকাতার আর্ট কলেজের ছাত্ররা নতুন নতুন ডিজাইন এঁকে দেয়। কুণ্ডুদেরই কারখানায় তৈরি ব্যাগ বিদেশে বিক্রি হয়। এ ব্যবসায়ে সার্থকতা আসতে দেরি হয়নি, ম্যানহাটনে ও নিউ জার্সিতে তার দুটি আউট-লেট, তবু হঠাৎ আবার তার মন উচাটন হল, সেসব ছেড়েছুড়ে ফিরে এল দেশে। ধ্রুবর স্ত্রী বৃতিও খুব গুণী মেয়ে, সে বেশ ঈর্ষণীয় চাকরি করে, স্বামীর সঙ্গেই না ফিরে সে ঠিক করেছিল, আরও দু-এক বছর চাকরি চালিয়ে ভালো টাকা জমিয়ে নিয়ে আসবে। তা ছাড়া তার বাবা-মায়ের কাছে কিছু কিছু অর্থ পাঠাবার দায়িত্ব নিয়েছিল। মাঝে মাঝেই সে টেলিফোনে দুঃসংবাদ দেয়। কাঁদো কাঁদো গলায় বলে, তার আবার একটা প্রমোশন হয়েছে, এত উপার্জন ছেড়ে কি হুট করে চলে আসা যায়?

ধ্রুব এখন কলকাতায় দিব্যি জমিয়ে বসেছে। গ্রামের বাড়িতে পোলটি আর কলকাতায় ওষুধের দোকান খুললেও কোনও ধরাবাঁধা কাজের সঙ্গে সে আর যুক্ত নয়। তার দিন ও রাত্রিগুলি স্বাধীন, সে যখন-তখন স্বেচ্ছাচারী হতে পারে। বছরে অন্তত দুবার সে আমেরিকায় গিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে কয়েকটি সপ্তাহ কাটিয়ে আসে, বৃতিও বছরে একবার কলকাতা ঘুরে যায়। তাদের দাম্পত্য সম্পর্কে কোনও ফাটল নেই। শুধু টেলিফোনের বিল খুব বেশি দিতে হয়।

আমি প্রথমেই ধ্রুব কুণ্ডুর কথা লিখলাম, তার কারণ, যত প্রবাসী বা অনাবাসী বাঙালি আমি দেখেছি তাদের মধ্যে ওর দৃষ্টান্তটি অনন্য। (কমও তো দেখলাম না, আমি আয়ওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিতে গিয়েছিলাম ১৯৬৩ সালে, এবছর সেই ঘটনার চল্লিশ বর্ষপূর্তি হল। এর মধ্যে ওদেশে গেছি আরও বেশ কয়েকবার, কোনও-না-কোনও বিশ্ববিদ্যালয় বা সংস্থার আমন্ত্রণে, আমেরিকার বঙ্গ সম্মেলনেও যোগ দিয়েছিলাম প্রথম বছরেই। পরিচয় ও সখ্য হয়েছে কত মানুষের সঙ্গে, আতিথ্য পাবার সৌভাগ্য হয়েছে বেশ কিছু পরিবারের) অবশ্য ধ্রুব কুণ্ডু যে এমন ব্যতিক্রম হতে পেরেছে, তার দুটি কারণ, আর্থিক অসচ্ছলতার কোনও আশঙ্কা ছিল না, এবং এই দম্পতি স্বেচ্ছায় নিঃসন্তান।

ছেলেমেয়েদের কথা চিন্তা করেই অনেকে নিজেদের ইচ্ছেটাকে ঘুম পাড়িয়ে আর পাকাপাকি দেশে ফিরতে পারে না। ছেলেমেয়েদের চোখ ফুটলে আর স্কুলে যাওয়া শুরু করলে সে দেশটাকেই তারা আপন জ্ঞান করে, বাবা-মায়ের দেশে এসে তারা স্বস্তি বোধ করে না। একটু বড় বয়েসে এসে এ দেশের স্কুল-কলেজে ভরতি হলে তারা অকূল পাথারে পড়ে, সব কিছুই আলাদা এবং ভাষার ব্যবধানে তারা দিশেহারা হয়ে যায়। সেটা তাদের প্রতি অবিচার হয়।

টরেন্টোর নীলাদ্রি চাকী একটা চমৎকার কথা বলেছিল। পঞ্চাশ বছর বয়েসে নীলাদ্রি সবকিছু গুটিয়ে সপরিবারে ফিরে এসেছিল কলকাতায়। ওই দম্পতির দুটি ছোট মেয়ে এখানকার ইস্কুলে ভরতি হয়ে বাংলা ভাষাতেও বেশ সচ্ছন্দ হয়ে গেল। কলকাতায় ফ্ল্যাট কিনে সাজিয়ে-গুছিয়ে বসেছিল, নীলাদ্রিকে কেউ যদি জিগ্যেস করত, তুমি ফিরে এলে কেন, তার উত্তরে সে সহাস্যে বলত, জীবনের পঁচিশ বছর পড়াশুনো করেছি, তার পরের পঁচিশ বছর জীবিকার জন্য কঠোর পরিশ্রম করেছি (নীলাদ্রি ইঞ্জিনিয়ার), আর যদি পঁচিশ বছরও বাঁচি, তাহলে আর কোনও কাজ করব না, আড্ডা দেব, বই পড়ব, থিয়েটার-ছবির প্রদর্শনী দেখব, গানের জলসায় যাব, বেড়াব। নীলাদ্রি কলকাতার সাংস্কৃতিক জগতের সঙ্গে বেশ যুক্ত হয়ে পড়েছিল, তার নিজস্ব শখ ছিল দুর্লভ কোনও আর্টের উপাদান সংগ্রহ করা। তার মেয়েরা খানিকটা বড় হবার পর কিছু একটা সমস্যা হল, তা আমি ঠিক জানি না। প্রায় সাত-আট বছর পর আবার নীলাদ্রি এদিককার সব পাট চুকিয়ে ফিরে গেল কানাডায়, সেখানে তাকে নতুন করে ঢুকতে হল জীবিকার জগতে।

কবি উৎপলকুমার বসু ঠিক করেছিল তাদের একমাত্র সন্তানকে বিদেশি আবহাওয়ায় মানুষ করবে না, ছেলের তিন-চার বছর বয়েসেই সে ও তার স্ত্রী সান্ত্বনা লন্ডনের সংসার গুটিয়ে ফিরে আসে কলকাতায়। তাদের উদ্দেশ্য সার্থক হয়েছে, ছেলে এখানে মানিয়ে নিতে পেরেছিল, সেই ছেলে এখন রবীন্দ্র ভারতীর অধ্যাপক।

এককালে 'উচ্চ শিক্ষার্থে বিদেশ যাত্রা' এই শিরোনামে সংবাদপত্রে খবর কিংবা বিজ্ঞাপন ছাপা হত, তার সঙ্গে পোস্টেজ স্ট্যাম্পের সাইজের সেই কৃতী ছাত্র বা ছাত্রীর ছবি। এখন আর এসব দেখা যায় না, কারণ প্রতি বছর রাশি রাশি ছেলেমেয়ে উড়ে চলে যাচ্ছে অন্য দেশে। আমরা প্রাচ্যদেশীয় হলেও আমাদের মুখ পশ্চিম দিকে। আমরা চিন বা জাপান সম্পর্কে যতটুকু জানি, সেই তুলনায় ইউরোপ, আমেরিকা সম্পর্কে প্রায় সবজান্তা। চায়ের দোকানে বা রকের আড্ডায় একটা কথা চালু ছিল, বি এন জি এস, অর্থাৎ 'বিলেত-না-গিয়েও-সাহেব'।

সত্যিই কেউ কেউ লন্ডনের রাস্তাঘাটের নামও বলে দিতে পারত কলকাতায় বসে। আর এখন দশবার বিলেত ঘোরা কাউকেও সাহেব বলে পাত্তা দেওয়া হয় না।

বিদেশ যাওয়ার ঝোঁক হঠাৎ খুব বেড়ে যায় ষাটের দশকে। শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা তখন লক্ষ থেকে নিযুতে পৌঁছে যাচ্ছে, এমনকী ডাক্তারি-ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করলেও উপার্জনের নিশ্চয়তা ছিল না, তাই যাদের পক্ষে জাহাজ ভাড়ার টাকা জোগাড় করা সম্ভব হত, তারাই পাড়ি দিতে শুরু করল পশ্চিমের ধনাঢ্য দেশগুলিতে। এখন ভিসায় এত কড়াকড়ি, কিন্তু শুনলে অবিশ্বাস্য মনে হবে, দু'দশক আগেও ইংল্যান্ড, জার্মানি, সুইডেন, কানাডায় ভারতীয়দের কোনও ভিসার প্রয়োজন হত না। আমেরিকার ভিসাও ছিল সহজলভ্য, এই তো সেদিনও আমেরিকার ভিসার জন্য একটা পয়সাও খরচ লাগত না। যুদ্ধোত্তর জার্মানিতে পুরুষের সংখ্যা এত কমে গিয়েছিল যে অন্য দেশ থেকে আগত শিক্ষিত-অশিক্ষিত, দক্ষ-অদক্ষ কর্মী সকলেরই কিছু না কিছু কাজ জুটে যেত সেখানে। জার্মান পুরুষদের তুলনায় নারীর সংখ্যা অনেক গুণ বেশি, সুতরাং বিবাহযোগ্য পাত্রীরা গিসগিস করছে, সেই জন্য সে আমলের বহিরাগতদের প্রায় সকলেরই জার্মান বউ। তবে ভারতের থেকেও আরব দেশগুলি থেকে পুরুষ কর্মী জার্মানিতে গেছে অনেক বেশি, পরে তাদের নিয়ে নানা সমস্যাও হয়েছে, ফাসবিন্ডারের চলচ্চিত্রে তা প্রতিফলিত হয়েছে।

কানাডা বিশাল দেশ। অথচ জনসংখ্যা খুবই কম। সে দেশ গড়ার জন্যও নানাধরনের কর্মী প্রয়োজন। মধ্য ষাটে কানাডা হাট করে তার দরজা খুলে দিয়ে দু-হাত বাড়িয়ে অতিথিদের আহ্বান করেছে। উন্নততর নতুন সুযোগের সন্ধানে জার্মানি থেকে অনেক ভারতীয় তথা বাঙালি পাড়ি দিয়েছে কানাডায়। ইংল্যান্ড থেকেও অনেক গিয়েছে। ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগানের মতন জার্মানি থেকে আসা আর ইংল্যান্ড থেকে আসা বাঙালিদের মধ্যে কিছুটা রেষারেষির ভাব কানাডায় ছিল অনেকদিন।

জাহাজ ভাড়া কিংবা বিমান ভাড়া না দিয়েও দেশ ছেড়ে গেছেন কেউ কেউ। তারা খুব সাহসী, তাদের বুকে ছিল অভিযানস্পৃহা। 'সাইকেলে বিশ্বভ্রমণ' কিংবা 'পদব্রজে ইউরোপ', এরকম সংবাদ প্রায়ই বেরুত। সামান্য টাকা সম্বল করে ও শুভার্থীদের দেওয়া ফুলের মালা গলায় নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন তাঁরা, পথে বিপদের সম্ভাবনা অগ্রাহ্য করে। বিখ্যাত রামনাথ বিশ্বাস কিংবা বিমল মুখোপাধ্যায়ের মতন দু-চারজন ফিরেও এসেছেন, আবার অনেকে ফিরে আসেননি, থেমে গেছেন মাঝপথে।

এরকম দু-একজনকে আমি চিনি। বেলঘরিয়ার ছেলে দীপ্তেন্দু চক্রবর্তী কেরানি হিসেবে জীবিকাজীবন শুরু করেছিল। এ দেশের কেরানিরা শেষজীবনে বড় জোর খুদে অফিসার হয়, কিন্তু দীপ্তেন্দু সেভাবে জীবন কাটাতে রাজি ছিল না। সে অন্য ধাতুতে গড়া। একটা সাইকেল নিয়ে সে বেরিয়ে পড়ল অনিশ্চিত ভবিষ্যতের রাস্তায়। দিল্লিতে পৌঁছবার পর লেখক-সাংবাদিক নিমাই ভট্টাচার্যের সহায়তায় দেখা করতে পারল ইন্দিরা গাঁধীর সঙ্গে, তিনি তাকে উৎসাহ দিয়ে শংসাপত্র দিয়েছিলেন। ওরকম দু-একটা পরিচয়পত্রের দরকার হয়, না হলে কোনও প্রতিকূল দেশে গুপ্তচর সন্দেহে গ্রেফতার হওয়ার বা মারধর খাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। দীপ্তেন্দুর স্বভাবটা ডাকাবুকো ধরনের। তাই অনেক বাধা অনায়াসে পেরিয়ে সে পৌঁছয় লন্ডনে। তাই সাইকেলটি তখন অচল হয়ে গেছে। লন্ডনে নানারকম টুকটাক কাজ করার পর সে আটলান্টিক পেরিয়ে এল কানাডায়। সেখানেও সে প্রথম দিকে জীবিকার জন্য কোনও পেশাই অগ্রাহ্য করেনি, এমনকী পুলিশের কাজও করেছে। তবে এসব ছেলে ধরাবাঁধা চাকরিতে মানানসই হয় না। শুরু করল রিয়েল এস্টেটের ব্যবসা, জমি কেনা-বেচা, বাড়ি বানানো, এক সময় অনেক সম্পদের অধিকারী হল, আবার সে ব্যবসায়ে হঠাৎ খুব নিম্নগতি হলেও হার মানেনি, এখন সে স্বাধীনভাবে চালাচ্ছে ট্যাভেল এজেন্সি! বিবাহিত, সংসারী দীপ্তেন্দুর মন কিন্তু যখন-তখন উড়ে যায় দেশের দিকে, প্রতিদিন ইন্টারনেটে দেশের সমস্ত খবর খুঁটিয়ে পড়ে, নিজে বাংলা-ইংরিজিতে দেশের পত্র-পত্রিকায় লেখে, কী করে পশ্চিম বাংলার উন্নতি হবে সবদিক দিয়ে, এই চিন্তায় সে এক-একদিন বেশি নেশা করে ফেলে।

নকশাল আমলেও অনেক ছেলেমেয়ে বিদেশে পাড়ি দিয়েছিল। তাদের মধ্যে একটি মেয়ের কাহিনি চমকপ্রদ। কৃষ্ণকলি সরকারের (আসল নাম নয়) জন্ম বামপন্থী রাজনৈতিক পরিবারে। নকশাল আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েছিল, পুলিশ তাকে খোঁজাখুঁজি করছে এবং ধরতে পারলে কী অবস্থা হবে তা অনুমেয়, সেই অবস্থায় উনিশ বছরের তরুণীটি দেশ ছেড়ে পালায়। হিচ হাইকিং করে সে আফগানিস্তান পেরিয়ে আরবের মরুভূমির মধ্য দিয়ে গেছে একা একা, কখনও দস্যুদলের সঙ্গেও রাত কাটিয়েছে। সে এক রোমহর্ষক কাহিনি। তা নিয়ে উপন্যাস লিখলে মনে হবে অবাস্তব, অবিশ্বাস্য। অসম্ভব মনের জোর সে যুবতীর, কোনওক্রমে পৌঁছল লন্ডনে, কিছুদিন পর আমেরিকায়। সেখানে হরেকরকম জীবিকার সঙ্গে যুক্ত থেকেছে। আমার সঙ্গে তার যেবার প্রথম দেখা হয়, তখন সে একজন বিখ্যাত আমেরিকান লেখকের গবেষণা-সহায়িকা। ও দেশের জনপ্রিয় ঔপন্যাসিকরা এরকম তিন-চারজন রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট রাখেন।

দেশ ছেড়ে বিদেশে, বিশেষত পশ্চিমি দেশে যাওয়ার মূল কারণ অবশ্যই দুটো। উচ্চতর বিদ্যালাভ এবং অর্থ উপার্জন। তবে বিদ্যালাভ শেষ করার পর বেশি অর্থের লালসায় সবাই ওসব দেশে থেকে যায়, এটা মনে করা ঠিক নয়। অনেকেই স্বদেশে এসে অধীত বিদ্যার প্রয়োগে আগ্রহী, তার জন্য উপার্জন কিছু কম হলেও মেনে নিতে পারে। কিন্তু দেশে ফিরে যদি সুযোগও না পাওয়া যায়, তখন মন ভেঙে যায়, তারা আবার ফিরে যায়, কেউ কেউ দেশের প্রতি বিদ্বেষী হয়ে ওঠে। এরকম অনেককে দেখেছি, কলকাতা বা পশ্চিমবঙ্গে রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে সমস্ত ব্যবস্থা কত খারাপ, সেই নিন্দেতে অক্লান্ত। এই খারাপ ব্যবস্থা বদলাবার কোনও দায়িত্ব অবশ্য তাঁদের নয়, তাঁরা বিদেশের নিশ্চিন্ত জীবন পেয়ে গেছেন।

পরাধীন আমলে বা তারও কয়েক দশক পর পর্যন্ত অনেকেই কিন্তু দেশে ফিরে আসতেন। আমরা এক সময় কত বিলেতফেরত ডাক্তার দেখেছি, কত এম আই টি থেকে পাশ করো ইঞ্জিনিয়ার, কত অক্সফোর্ডের ডিগ্রিধারী অধ্যাপক। তখন এঁদের জন্য জায়গা খালি ছিল, এখন যে-কোনও কাজের জন্য নিদারুণ প্রতিযোগিতা! আমার এক দূর সম্পর্কের বন্ধু ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় প্রায় পনেরো বছর বিজ্ঞানের অধ্যাপনা করার পর ঝোঁকের মাথায় দেশে ফিরে এলেন, দেশের ছেলেমেয়েদের পড়াবেন। সায়েন্স কলেজে পুরোনো মাস্টারমশাইয়ের কাছে গিয়ে জানালেন তাঁর মনোবাসনা। বিভাগীয় প্রধান জানালেন যে তাঁকে একটি জুনিয়ার লেকচারারের পদ দেওয়া যেতে পারে। এ কী অদ্ভুত প্রস্তাব! সাহেবদের দেশে পনেরো বছর পড়াবার অভিজ্ঞতার কোনও মূল্য দেওয়া হবে না। তাঁকে শুরু করতে হবে প্রথম থেকে? বন্ধুটি মনঃক্ষুণ্ণ তো হতেই পারেন। সায়েন্স কলেজের এক অধ্যাপক তাকে বললেন, ভাই, তুমি আশা করছ, আমাদের কয়েকজনকে ডিঙিয়ে তোমাকে রিডার কিংবা প্রফেসার পদ দেওয়া হোক। তোমার আর আমার রেজাল্ট ছিল একইরকম। তুমি বিদেশে চলে গেলে, আর আমার বিধবা মা একা থাকতে পারবেন না বলে ওদেশের দু-একটা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সুযোগ পাওয়া সত্ত্বেও আমি যাইনি। আমার এই বিদেশ না-যাওয়াটা কি অপরাধ? এটাও অকাট্য যুক্তি।

এখন সরকারি নিয়ম হয়েছে যে বিদেশে ডিগ্রিধারী ডাক্তারদের আলাদা কোনও বিশেষ স্বীকৃতি দেওয়া হবে না। ইঞ্জিনিয়ার, অধ্যাপকদের সম্পর্কেও সম্ভবত এ নিয়ম প্রযোজ্য। বিদেশে শিক্ষাপ্রাপ্তদের এখন আর না ফিরে আসার সিদ্ধান্তের এটাই বোধহয় বড় কারণ।

ইংল্যান্ড বা জার্মানির তুলনায় আমেরিকা-কানাডায় যাবার ঝোঁকই এখন খুব বেশি। কারণ, ওই দুই দেশে উপার্জন অনেক বেশি। কাজ পাওয়াও কঠিন নয়। কিন্তু আমেরিকায় যাওয়ার সুযোগ পেয়েও যায়নি এমন একজনকে জানি। তার নাম অসীম রায়। কলকাতায় বিএসসি পাশ করে অসীম চাকরি পেয়েছিল স্টেট ইলেকটিসিটি বোর্ডে, পোস্টিং হয়েছিল বর্ধমানের একটি গ্রামে। সেখানে একটা ছোট ঘর ভাড়া করে থাকত, খেতে হত নিজে রান্না করে, পরে একটা রান্নার লোকও বোধহয় জুটেছিল, ঘুরতে হত গ্রামে গ্রামে। এরকম তো অনেকেই এখানে চাকরি করে, তাদের মধ্যে দু-একজনের মনই হঠাৎ ছটফটিয়ে ওঠে। অসীম হঠাৎ সে চাকরি ছেড়ে কোনওক্রমে গিয়ে পড়ল ইংল্যান্ডে। সেখানে চাকরি করতে করতে পড়াশুনা, ক্রমে ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি লাভ। প্রায় আট বছর সেখানে কাজ করার পর তার ইচ্ছে হল দেশ বদলাবে। আমেরিকা থেকে সে ডাক পেয়েছিল, কিন্তু চলে এল ফ্রান্সে। আমেরিকায় সে গেল না কেন? ওখানে ছুটি কম। ফরাসিদের জীবনযাত্রা অনেকটা ঢিলেঢালা, সেখানকার সাংস্কৃতিক পরিবেশও অসীমের পছন্দ হয়ে গেল। এখন সে ফরাসি নাগরিক। অসীমের এক বন্ধু কোকো মুখার্জি কিন্তু ব্রিটিশ নাগরিক হয়েও ফিরে এসেছেন দেশে। আস্তানা গেড়েছে শান্তিনিকেতনে, এখন আলস্যই তার বিলাস। আড্ডাতেই তার আরাম, বিলেতের কথা উচ্চারণই করে না।

অন্যান্য দেশের তুলনায় ফ্রান্সে পশ্চিমবঙ্গীয় বাঙালিদের সংখ্যা বেশ কম। একটি ছোট গোষ্ঠী, তবু তাদের নিজস্ব পাঠাগার ও ক্লাব আছে। ইংলন্ডে বহুদিন প্রবাসী অথচ ইংরিজি সাহিত্য সম্পর্কে কিছুই জানে না, এমন বাঙালির সংখ্যা যথেষ্ট। কিন্তু ফরাসি দেশে যারা থাকে, তাদের পেশা যাই-ই হোক, সে দেশের শিল্প-সাহিত্য সম্পর্কে তারা সচেতন, এমনই একটা সামাজিক বাতাবরণ। যেমন ডক্টর ভূপেশ দাশ, তিনি বিশিষ্ট বিজ্ঞানী, কিন্তু সংস্কৃতির বিভিন্ন শাখা সম্পর্কে অবহিত। শিল্পী শক্তি বর্মন আন্তর্জাতিক খ্যাতি পেয়েছেন। ওদেশেই থেকে গেছেন চল্লিশ-বেয়াল্লিশ বছর, কিন্তু এখনও বাংলা সাহিত্য, বাংলা গান সম্পর্কে যেমন আগ্রহী, তেমনই ফরাসি শিল্প-সাহিত্যে নিমজ্জিত। বাঘা যতীনের নাতি পৃথ্বীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় বহুবছর ধরে ফরাসি ও বাংলা সংস্কৃতির সেতুবন্ধন করে আসছেন। ব্যবসায়িক সাফল্য পেয়েছেন সম্বিৎ সেনগুপ্ত, তিনিই আবার শিল্পী ও গীতিকার। বহরমপুরের মেয়ে প্রীতি আর ময়মনসিং-এর ছেলে বিকাশ সান্যাল প্যারিসে কাটিয়ে দিলেন তিন দশকের বেশি সময়। বিকাশ এক সময় নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনের অধ্যক্ষ ছিলেন, এখন প্যারিসে ইউ এন-এর শিক্ষা উপদেষ্টা। পৃথিবীর বহু ছোট-বড় দেশে তাঁকে ঘুরে বেড়াতে হয়। সেসব জায়গার শিক্ষা সংস্কারের কাজে, এমনকী যুদ্ধ পরবর্তী আফগানিস্থানেও। ইংরেজিতে বই লিখেছেন অনেকগুলো, ফরাসি ভাষা জানেন জলের মতন, এবং তিনি মনেপ্রাণে এখনও খাঁটি বাঙালি ও বাঙাল। ময়মনসিং-এর নাম শুনলেই তাঁর মনটা হু-হু করে। প্রীতি একজন গদ্য লেখিকা এবং কবি। 'দেশ' পত্রিকায় বহুদিন 'প্যারিসের চিঠি' লিখেছেন। নিজের উংসাহে ফরাসি সাহিত্য ও শিল্পের খুঁটিনাটি তথ্য সংগ্রহ করেন, এখন মেতেছেন অকালমৃত পর্তুগিজ কবি ফের্নান্দো পেসোয়াকে নিয়ে। বিকাশ মেইজোঁ দ্য ল্যাঁদ, অর্থাৎ ইন্ডিয়া হাউজেরও পরিচালক। এই দম্পতির আন্তরিক আতিথ্যের কথা সুবিদিত।

প্যারিসের আর একজন শিল্পী সাহাবুদ্দিনও যেমন খ্যাতিমান তেমনই আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব। তবে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কথা আমাদের আলাদা করে অন্য সময় লিখতে হবে। পশ্চিম বাংলার বাঙালিদের চেয়ে বাংলাদেশের জনসংখ্যা দ্বিগুণ। কিন্তু বিদেশে, অনেকগুলি দেশে, পশ্চিমবঙ্গীয় বাঙালিদের তুলনায় বাংলাদেশিদের সংখ্যা অনেক গুণ বেশি। একটা হিসেব পেয়েছিলাম জাপানে। টোকিও শহরে বাংলাদেশিদের দশ হাজার! তার কারণ কি, আমাদের এদিককার বাঙালিরা ঘরকুনো, ঝুঁকি নিতে ভয় পায়? কত বেকার ছেলে নিষ্কর্মা হয়ে থেকে থেকে বুড়ো হয়ে যাচ্ছে, তবু দেশের বাইরে যেতে চায় না। আমার এক বন্ধু কয়েকটি হাত কচলানো বেকার যুবককে বলেছিল, আমার চাকরি দেবার ক্ষমতা নেই। কিন্তু তোমাদের আন্দামানে যাবার জাহাজ ভাড়া দিচ্ছি। সেখানে গিয়ে দেখো না কিছু চেষ্টা করে। সেখানে কাজ জুটে যেতে পারে। আন্দামান শুনেই চোখ গোল গোল করে তারা পিছিয়ে গেছে।

ইউরোপ-আমেরিকায় যেসব পশ্চিমবঙ্গীয়দের দেখা যায়, তারা অধিকাংশই ভালো ছাত্রছাত্রী, প্রথম দিকে পড়াশুনো ও নতুন চাকরিতে প্রচুর পরিশ্রম করতে হলেও কিছুদিন পরে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। কিন্তু বাংলাদেশের ভালো ছাত্রছাত্রী ও বিদ্বানদের সঙ্গে সঙ্গে তেমন লেখাপড়া না জানা হাজার হাজার মানুষ চরম অনিশ্চয়তা নিয়েও দেশ ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে, দারুণ কষ্ট সহ্য করতে পারে, রেস্তোরাঁয় বাসন মাজার মতন যে-কোনও ছোট চাকরি নিতেও রাজি হয়ে যায়। তাদের মধ্যে কিছু সংখ্যক পরবর্তী জীবনে সাফল্যও অর্জন করে।

বাংলাদেশির মধ্যে অনেক খ্যাতিমান চিকিৎসক, স্থপতি, অধ্যাপক আছেন। পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরা ব্যবসা-বাণিজ্যে উদ্যোগী হয় না। প্রায় সবাই চাকুরিজীবী, বাংলাদেশিরা অনেকরকম ব্যবসা শুরু করে। নিউ ইয়র্কের জ্যাকসন হাইট নামে অঞ্চলটি প্রায় বাংলাদেশিরাই দখল করে নিয়েছে। ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট নামে যেগুলি চলে, তার অনেকগুলিরই মালিক বাংলাদেশি কিংবা পাকিস্তানি। সাহেবরা ইন্ডিয়ান ফুড চেনে, বাংলাদেশি বা পাকিস্তানি ফুড নামে কিছু এখনও জনপ্রিয় হয়নি। কোনও পাকিস্তানি শিল্পী উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত গাইলেও তা ইন্ডিয়ান মিউজিক। আমরা সবাই ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্টের মানুষ, এই ভৌগোলিক পরিচয়টা মেনে নিলেই ঝামেলা চুকে যায়, কিন্তু অনেকের 'ইন্ডিয়ান' শব্দটি উচ্চারণেই আপত্তি।

অন্যান্য দেশের তুলনায় আমেরিকায় ছুটি কম, কাজ বেশি। মাইনে বেশি দেয়, তাই প্রচুর খাটিয়ে নেয়। চাকরির কোনও নিরাপত্তা নেই। যত উঁচু পদের কাজই হোক, যে-কোনওদিন ছাঁটাই হতে পারে যে কেউ। কোম্পানি তিন মাসের মাইনে ধরিয়ে দিয়ে বলবে, কাল থেকে আর আসতে হবে না। সেই জন্য প্রত্যেক দিনই নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিতে হয়। ধ্রুব কুণ্ডু বলেছিল, আমেরিকায় সকাল বলে কিছু নেই, হয়তো সেই কারণেই সে আমেরিকায় থাকতে চায়নি। আমাদের এখানকার সকাল অনেক প্রলম্বিত, বিছানায় শুয়ে চা খাওয়া, অনেকক্ষণ ধরে খবরের কাগজ পড়া, তারপর থলি হাতে বাজার যাওয়া, যাওয়া-আসার পথে এর-তার সঙ্গে কুশল বিনিময়, সংক্ষিপ্ত আড্ডা, তারপর বাড়ি ফিরে অফিস যাওয়ার প্রস্তুতি, অনেকেই বাইরে লাঞ্চের বদলে ভাত-ডাল-মাছের ঝোল খেয়ে যায় বাড়ি থেকে। আর আমেরিকায় ভোরবেলা ঘুম ভাঙার পরই তড়াক করে লাফিয়ে নামতে হয় বিছানা থেকে। নিজেকেই বানাতে হয় চা কিংবা কফি, তাতে চুমুক দিতে দিতেই দাড়ি কামানো, তারপর টয়লেট, তারপর স্নান। চলতি ভাষায় যাকে বলে শেভ, শিট অ্যান্ড শাওয়ার, সবই অতি দ্রুত। তারপর একটা স্যান্ডুইচ কোনওক্রমে নাকেমুখে গুঁজে দৌড়। সে বাইরে ঝড়-বৃষ্টি হোক বা অবিরাম তুষারপাত, যেতেই হবে। বছরে বেশ কয়েক মাস এই সময়টা বাইরে অন্ধকার থাকে। অনেককেই গাড়ি চালিয়ে যেতে হয় এক ঘণ্টা বা তারও বেশি, অর্থাৎ কর্মস্থল পঞ্চাশ-ষাট মাইল দূরে, একটু বেলা করে বেরুলেই প্রবল ট্রাফিক জ্যামের সম্ভাবনা, তা নিয়ে প্রতিদিনের উৎকণ্ঠা। হয়তো এই জন্যই অনাবাসীদের মধ্যে হৃদরোগীদের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি। স্বামী-স্ত্রীর সংসারেরও এই একই রুটিন, শতকরা পঁচানব্বইটি পরিবারে দুজনেই কাজে যায়, দুটি গাড়ি, একইরকম ব্যস্ততা। মেয়েদের অবশ্য দাড়ি কামাতে হয় না, কিন্তু তাদের চুল আঁচড়াতে বেশি সময় লাগে।

ভোরের আলো ফোটার আগেই যারা বেরিয়ে যায়, তারা ফেরে দিনের আলো শেষ করে। আসা-যাওয়াতেই যে সময় লাগে অনেক। তারপর ক্লান্ত শরীরে অন্য কিছু করার আর উদ্যম থাকে না, কিছুটা রান্নাবান্না করতেই হয়। আহারপর্ব শেষ করেই ঘুমের সাধনা, কেননা, পরদিন আবার ভোরে উঠতে হবে। রবিবারেও ছুটি নেই। অন্য কোনও কাজের লোক তো নেই, তাই বাগানের ঘাস ছাঁটা (না ছাঁটলে প্রতিবেশী বাঁকা মন্তব্য করবে কিংবা নিজের লন মোয়ার ধার দিতে চাইবে) থেকে শুরু করে রান্নাঘর পরিষ্কার, কার্পেটের ওপর ভ্যাকুয়াম ক্লিনার চালানো, (ঠান্ডার দেশ বলে মেঝেতে কার্পেট পাততেই হয় এবং নিয়মিত কার্পেটের ধুলি-মুক্তি না ঘটালে হাঁপানি হবার সম্ভাবনা থাকে) জামা-প্যান্ট কাচা, বাথরুমের কল সারানো, এমনকী ছাদের টালি মেরামত, এরকম হাজারটা কাজ থাকে। রবিবারই যেন পরিশ্রম বেশি।

এ তো এক যান্ত্রিক জীবন। অনেকেই এই যান্ত্রিকতা মেনে নেয়। মানুষের সভ্যতার যা শ্রেষ্ঠ ফসল, শিল্প, সাহিত্য, সঙ্গীত, এসব থেকে তারা বঞ্চিত। তুলনামূলকভাবে পশ্চিমবঙ্গীয়দের চেয়ে বাংলাদেশিরা যে জাতীয় সংস্কৃতি ও ভাষাকে ধরে রাখার ব্যাপারে অনেক বেশি নিষ্ঠার পরিচয় দেয়, তা অবশ্য স্বীকার্য। তারা ছেলেমেয়েদের বাংলা শেখায়, বাড়ির মধ্যে ইংরেজি বলে না। পশ্চিমবঙ্গীয়রা ছেলেমেয়েদের বাংলা শেখাবার চেষ্টাই করে না অনেকে, আর অনেকে প্রথম প্রথম একটু চেষ্টা করে হাল ছেড়ে দেয়, ছেলেমেয়েদের সঙ্গে শুধু ইংরিজিতে কথা বলে, স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়াও পুরো ইংরিজিতে। মিয়েলে রাজ্জাক হাওলাদারের কিশোর পুত্র লম্বা একটা বাংলা কবিতা মুখস্থ শুনিয়ে আমাকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। কোনও প্রবাসী পশ্চিমবঙ্গীয়র বাড়িতে এমন অবাক হবার সৌভাগ্য আমার হয়নি।

ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে। আলোলিকা এবং ভবানী মুখোপাধ্যায়ের একমাত্র কন্যার মুখে আমি কখনও কবিতা শুনিনি বটে কিন্তু তার বাংলা একেবারে নির্ভুল, উচ্চারণ নিখুঁত। ইঞ্জিনিয়ার হয়েও ভবানীর ওপর কাজের চাপের কোনও ছাপ পড়েনি। সদা প্রফুল্ল, আপন মনে গুনগুন করে গান গায়, সে তার ব্রাহ্মণত্বও বজায় রেখেছে, অনেক পুজোর পুরোহিত, আবার নাটকদলে বিশিষ্ট অভিনেতা। আলোলিকা বাচ্চাদের নাচ-গান শেখায়, অনেক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত, এবং নিয়মিত লেখিকা, বাংলার পাঠকদের কাছে সে পরিচিত।

ওয়াশিংটন ডিসি-র রমেন পাইন, জুলি তাদের দুই মেয়েকে যত্ন করে বাংলা শিখিয়েছে। ছোট মেয়েটি নৃত্যশিল্পী। রমেন-জুলি এক সময় চলে এসেছিল দেশে, এখানে টেলিভিশনে সংবাদ পাঠক হিসেবে প্রায়ই দেখা যেত রমেনকে। কিন্তু তার এক ছেলে প্রতিবন্ধী, তার চিকিৎসার প্রয়োজনেই ওরা আবার ফিরে গেছে। তার জন্য রমেনের মনোবেদনা রয়ে গেছে এখনও। আমেরিকার তুষারপাত দেখতে দেখতে রমেনের মনে পড়ে কোলাঘাটের কাছে কোথাও রাস্তার ধারে চায়ের দোকানে বসে ভাঁড়ের চা খাওয়ার কথা। প্রতি বছর সে আসে দেশে।

নূপুর লাহিড়ি অত্যন্ত ব্যস্ত ডাক্তার। নিজস্ব চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানও চালাতে হয়, তবু সাহিত্য-সঙ্গীতের সঙ্গে তার সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। সে কবিতা-গল্প লেখে, নিজের গানের ক্যাসেট আছে, বাড়িতে বাংলা বইয়ের লাইব্রেরি করেছে,

বেঙ্গল ফাউন্ডেশন নামে প্রতিষ্ঠান গড়ে সে ওদেশের মানুষদের মধ্যে বাংলা সংস্কৃতি প্রচারের চেষ্টা চালিয়েছে। আবার ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডাও দিতে পারে, চোখের নিমেষে রেঁধে ফেলতে পারে দশ-পনেরো জনের সুখাদ্য, তার এক শরীরে যেন পাঁচ রমণীর জীবনীশক্তি। একবার কলকাতায় এসে এয়ারপোর্ট থেকে সে সোজা চলে এসেছিল বইমেলায়। দীর্ঘ বিমানযাত্রার পর ক্লান্ত শরীরে বাড়ি গিয়ে বিশ্রাম নেবার বদলে বইমেলা দেখতে যাবার মতন ইচ্ছে এবং জীবনীশক্তি সারা পৃথিবীতে বোধহয় একমাত্র নূপুরেরই আছে। সেবার বইমেলায় আগুন লেগেছিল, বহু স্টল পুড়ে যায়। পরে, ক্ষতিগ্রস্ত প্রকাশকদের সাহায্যকল্পে কিছু পোড়া বই নিলাম হয়েছিল, সর্বোচ্চ দাম দিয়ে একটি অর্ধদগ্ধ গ্রন্থ এই নূপুর লাহিড়িই কিনে নিয়ে যায় সুভেনির হিসেবে।

এবং গৌতম দত্ত। পেশায় ইঞ্জিনিয়ার, তবে চাকরির বদলে তার নিজস্ব প্রতিষ্ঠান। খুবই ব্যস্ত থাকার কথা, তবু সে কবিতা লেখে, কবিতার আলোচনায় মশগুল হয়ে যায়। এবং তার প্রবল নেশা নাটকে। শুধু অভিনয় নয়, পরিচালনা এবং প্রযোজনায়। ইংরিজি এবং বাংলা নাটক। গত বছরই সে 'প্রথম আলো' নামে একটি নাটকের প্রযোজনা ও পরিচালনার দায়িত্ব নেয়, বিরাট লম্বা নাটক, অভিনেতা-অভিনেত্রী প্রায় তিরিশজন। কর্মব্যস্ত এতগুলি মানুষকে জড়ো করে মাসের-পর-মাস রিহার্সালের ব্যবস্থা করা কম কথা নয়, তারপর পূর্ব উপকূলের সাতটি শহরে, এর মধ্যে খোদ নিউ নিয়র্কের ম্যানহাটনেও ঘুরে ঘুরে হয়েছে এই নাটকের অভিনয়। পুরো সেট ও লটবহর নিয়ে যেতে হয়েছে টাক ভাড়া করে ও নিজেরা টাক চালিয়ে, প্রত্যেক জায়গায় মঞ্চসজ্জা ও তা গুটোনার ভারও নিতে হয়েছে নিজেদের, এসব নিদারুণ পরিশ্রমসাধ্য কাজ। অবশ্য গৌতমকে সবসময় সাহায্য করেছে তার কয়েকজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু। দেশের ছেলেরা দেশে থাকলে এত পরিশ্রম করতে চায় না, হয়তো আবহাওয়ারই দোষ, বিদেশে গিয়ে তারা কোনও পরিশ্রমের কাজেই পিছু-পা হয় না। গৌতম ও তার বন্ধুরা যে এত খাটাখাটনি করেছে, তাতে তাদের অন্য কোনও লাভের প্রশ্ন নেই, নিছক নাটকের প্রতি ভালোবাসা ও বন্ধুত্বের টান। শুধু অভিনয় নয়, এঁদের অনেকের সঙ্গীতপ্রতিভাও বিস্ময়কর। গৌতমের স্ত্রী মুনিয়া এমনই অসাধারণ অভিনয় করে যে দেশে থাকলে সে অনায়াসে সিনেমার হিরোইন হতে পারত।

অনেক আসরে কারও কারও গান শুনে কিংবা নাচ দেখে মনে হয়েছে, দেশে থাকলে তাদের প্রতিভা আরও বিকশিত হত, বিখ্যাতও হতে পারত। কারও কারও কবিতা বা গল্প দেখেও মনে হয়, আরও একটু চর্চা থাকলে তারা সার্থক লেখক হতে পারত, বিদেশে বসে তার সুযোগ খুব কম।

জ্যোতির্ময় দত্তর কথা মনে পড়লেই আমার এক ধরনের কষ্ট হয়। সাধারণত অধিকাংশ ছেলেমেয়েই দেশ ছেড়ে যায় অল্প বয়েসে, জ্যোতি দত্ত আর মীনাক্ষী গেলেন প্রায় মধ্য বয়েসে। জ্যোতির বিদেশে থিতু হওয়ায় বাংলা সাংবাদিকতায় ও সাহিত্যে এক দারুণ ক্ষতি হয়ে গেল! জ্যোতি ওখানেও ইংরিজি সাংবাদিকতা করছেন, কিন্তু সেরকম তো আরও কতই আছেন, কিন্তু কলকাতায় তিনি ছিলেন এক অনন্য রঙিন ব্যক্তিত্ব। সবসময়ই তিনি কিছু-না-কিছু অভিনব পরিকল্পনায় শহর মাতিয়ে রাখতেন। মীনাক্ষীও কলকাতার একটি বিশেষ আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন। বুদ্ধদেব বসু-প্রতিভা বসুর বাড়ির আড্ডা চালিয়ে যাচ্ছিলেন মীনাক্ষী, চলে গেলেন নিউ ইয়র্ক। অবশ্য মীনাক্ষী ওখানকার টেগোর সোসাইটির সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন।

উজ্জ্বল ব্যতিক্রমী কিছু কিছু মানুষ ছড়িয়ে আছেন এত বড় দেশে, তাঁদের অনেকের কথাই আমি জানি না। যেমন ইংল্যান্ডে আমি অনেকবারই গেছি বটে, কিন্তু সেখানকার বেশি বাঙালিদের সঙ্গে আমার পরিচয়ের সুযোগ ঘটেনি। আমার বাল্যবন্ধু ভাস্কর দত্ত প্রতিবার এয়ারপোর্টে এসে খপ করে আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে যেত তার বাড়িতে। তারপর আর ঘোরাঘুরি করা হত না। ভাস্কর চরম আড্ডাবাজ, সে বলত বোস না, কোথায় যাবি? মলয় ঠাকুর, অমলেন্দু বিশ্বাসের মতন কয়েকজন এসে যোগ দিত সেই আড্ডায়। ১৯৬৫ সালে দেশ ছাড়ার সময় ভাস্কর বলেছিল, বিলেতে আমার নামে একটা রাস্তা করে তারপর দেশে ফিরব। ওর নামে রাস্তা হয়নি বটে, কিন্তু ভাস্কর দুটো কারখানা কিনেছিল, সেখানকার ইংরেজ কর্মচারীরা ভাস্করকে দেখে সসম্ভ্রমে উঠে দাঁড়িয়ে গুড মর্নিং মিস্টার ডাটা বললে ভাস্কর আমার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপত। আমরা পরাধীন আমলে জন্মেছি, তাই বিলেতে গিয়ে সাহেব মুচি দিয়ে জুতো পালিশ করিয়ে পরম শ্লাঘা বোধ করেছি। চাকরিজীবনে ভাস্কর যখন-তখন আমাদের পেয়ে গেলেই বলত, আজ আর অফিস যেতে ভালো লাগছে না। কারখানার মালিক হবার পর আর ওকে পায় কে, আমি নানা কারণে ফ্রান্স, জার্মানি কিংবা বেলজিয়ামে গেলে ভাস্করও সেখানে উপস্থিত। উদ্দেশ্য, স্রেফ আড্ডা।

আর কখনও কখনও গিয়ে থেকেছি রাখী ও নবকুমার বসুর বাড়িতে। সেটা অবশ্য লন্ডন শহর থেকে অনেক দূরে—স্ক্যানথর্প নামে একটি জায়গায়। এই দম্পতি দুজনেই ডাক্তার। নবকুমারের মতো বাংলা সাহিত্য সঙ্গীতকে এমন প্রাণের সঙ্গে আঁকড়ে ধরার মতো উৎসাহ কম লোকেরই দেখা যায়। ব্যস্ত ডাক্তার হয়েও সে প্রতিদিন লিখতে বসে। এ ছাড়া সে চমৎকার গান গায়, তবলা ও হারমোনিয়াম বাজায়। সুতরাং তার বাড়িতে গেলে চমৎকার সময় কাটে। রাখী ডাক্তার হিসেবে ব্যস্ততর। তবু সে ফাঁকে ফাঁকে যেমন রান্না করে, তেমনই বাংলা বই ও বাংলা সাহিত্যের সব খবর রাখে।

তবু এর মধ্যে অক্সফোর্ডে একবার গিয়েছিলাম নীরদচন্দ্র চৌধুরীর বাড়িতে। তখন তাঁর বয়েস চুরানব্বই। তাঁর পাণ্ডিত্য ও স্মৃতিশক্তির চেয়েও তাঁর শারীরিক তৎপরতার অহংকার বেশি বিস্মিত করেছিল। একটা হাতলহীন চেয়ার দেখিয়ে তিনি জিগ্যেস করেছিলেন, কিছু না ধরে এই চেয়ারে উঠে দাঁড়াতে পারবেন? আমরা (সঙ্গে বাদল বসু ও ভাস্কর) চেষ্টা করারই সাহস পাইনি, চুরানব্বই বছর বয়স্ক গ্রন্থকীটটি কিন্তু সেটা অনায়াসে করে দেখালেন।

ওঁরই প্রতিবেশী ছিলেন প্রখ্যাত দার্শনিক বিমলকৃষ্ণ মতিলাল। দুই প্রতিবেশীর মধ্যে তেমন সৌহার্দ্য ছিল না বোধ হয়। নীরদচন্দ্র যেমন প্রতি কথায় টুকটুক করে আদিরসাত্মক ইয়ার্কি ঢুকিয়ে দিতেন, সে তুলনায় বিমলকৃষ্ণ মতিলাল শান্ত, লাজুক ধরনের। কীভাবে মৃত্যুকে জয় করা যায়, এ বিষয়ে খুব সুন্দর আলোচনা করেছিলেন। তিনি জানতেন, তাঁর মৃত্যু আসন্ন।

বৈদগ্ধ্য ও পাণ্ডিত্যের জন্য যিনি আন্তর্জাতিক প্রসিদ্ধি পেয়েছেন, সেই তপন রায়চৌধুরী ঘরোয়া আলাপে তাঁর পরিচিতদের নানান রসিকতায় মুগ্ধ করে রাখেন। তাঁকে বলা যায় সৈয়দ মুজতবা আলীর উত্তরসুরি। এক দিকে যেমন রচনা করেছেন, 'ইউরোপ রিকনসিডারড', তেমনই বাংলায় লিখেছেন চমৎকার উপভোগ্য বই, 'রোমন্থন অথবা ভীমরতিপ্রাপ্তর পরচরিতচর্চা'। তাঁর সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ পরিচয় অবশ্য যৎসামান্য।

অপর এক ইতিহাসবিদ রণজিৎ গুহ সাবলর্টান হিস্ট্রির জন্য প্রসিদ্ধ, থাকেন ভিয়েনায়। আমি কখনও অস্ট্রিয়ায় যাইনি, ওঁর সঙ্গে একবার মাত্র দেখা হয়েছে কলকাতায়। আমাকে অবাক করে উনি আলোচনা করেছিলেন বাংলা কবিতা এবং কৃত্তিবাস পত্রিকা বিষয়ে। ইতিহাস বিষয়ে যে আমি একেবারেই অজ্ঞ, তা উনি কী করে যেন বুঝে গিয়েছিলেন। পাতলা চেহারা, ছোটখাটো মানুষটি, বয়েস হয়েছে, তিনি দুবার বললেন, আমার বোধহয় আর ইহজীবনে কলকাতায় আসা হবে না। সে কথাটা আমার কানে এখনও বাজে।

জার্মানিতেও আমার পরিচয়ের পরিধি খুব কম। গেলে প্রধানত দেখা হয় অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তর সঙ্গে। কিংবা বার্লিনে পঙ্কজ চট্টোপাধ্যায়, মাধুরীর বাড়িতে। এবং ফ্রাঙ্কফুর্টের হাবিবুল্লাহ বাবুল আমি যেখানেই থাকি তার বাড়িতে ধরে নিয়ে যাবেই। তারপর সে আর তার স্ত্রী বকুল কত কী যে রান্না করবে তার ঠিক নেই, দলে দলে এসে পড়বে ওদের বাংলাদেশি বন্ধুরা। তখন আমিও বাংলাদেশি হয়ে যাই। জন্মসূত্রে সে দাবি তো আমার আছেই।

ষাট সত্তরের দশকে যাঁরা বিদেশে পাড়ি দিয়েছিলেন, তাঁরা অনেকেই এখন পরবর্তী প্রজন্ম সম্পর্কে চিন্তিত। ওদেশে জন্ম, ওদেশে স্কুল-কলেজে শিক্ষা, সেইসব ছেলেমেয়েদের গায়ের রং ছাড়া আর কোনও বাঙালি বা ভারতীয় পরিচয় কি অবশিষ্ট থাকবে? মাতৃভাষা কিংবা পিতৃভাষা প্রায় কেউই শেখে না, কেউ কেউ কথা বলতে পারলেও অক্ষর জ্ঞান হয় না, সুকুমার রায় বা রবীন্দ্রনাথের স্থান থাকবে না তাদের জীবনে? অনেক পরিবারেই বাবা-মায়েরা হাল ছেড়ে দিয়েছেন, আবার সুইজারল্যান্ডের পূর্ণেন্দু চৌধুরীর মতনও কেউ কেউ আছেন, যিনি তাঁর ছেলেকে কঠোর নির্দেশ দিয়ে রেখেছিলেন, বাইরে থেকে এসে সদর দরজা পেরিয়ে বাড়িতে ঢুকলেই সমস্ত কথা বাংলায় বলতে হবে। তাঁর স্ত্রী শিখা একদিন হাসতে হাসতে বলেছিলেন, একদিন ছেলেটা দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে, কী একটা বাংলা কথা মনে পড়ছে না, সেজন্য ভেতরে ঢুকতেই পারছে না।

কোথাও কোথাও অভিভাবকরা রবিবার সকালে নিজস্ব একটা স্কুল চালাবার চেষ্টা করেন। কাছাকাছি বাঙালি পরিবারের ছেলেমেয়েদের জড়ো করে শেখানো হয় বাংলা ভাষা, বাংলা গান, তাদের দিয়ে অভিনয় করানো হয় ছোট ছোট নাটক। যদি এর কিছু অন্তত পরবর্তী জীবনে মনে রাখতে পারে। নিউ ইয়র্কের লং আয়ল্যান্ডে ডাক্তার কুমারশঙ্কর মণ্ডলের সমুদ্রের ধার ঘেঁষা বাড়িতে তাঁর বন্ধুবান্ধবদের সহায়তায় এরকম একটি স্কুল চলে, সেখানে ছোট ছেলেমেয়েদের আবৃত্তি, নাচ ও নাটক দেখেছি। ব্যস্ত ডাক্তার, তাঁর বন্ধুরাও ব্যস্ত, তবু ছেলেমেয়েদের মধ্যে কিছুটা অন্তত বাংলা সংস্কৃতির ছোঁয়া রাখতে তাঁদের পরিশ্রমের ক্লান্তি নেই। বিদেশে বসে বাংলা পত্রিকাও প্রকাশ করেছেন কেউ কেউ। লন্ডনের হিরন্ময় ভট্টাচার্য বহুদিন ধরে সম্পাদনা করেছেন 'সাগর পারে'। ওহায়ো'র কলম্বাস থেকে তনুশ্রী ভট্টাচার্য ও প্রভাত দত্ত এক সময় বার করেছেন অতলান্তিক। নিয়মিতভাবে পত্রিকা প্রকাশ করা খুবই শক্ত, অর্থসংকটের চেয়েও ভালো লেখা সংগ্রহ করা বেশ কঠিন। এখন ক্যালিফোর্নিয়া থেকে দেবী ও সুকান্ত ঘোষ প্রকাশ করে চলেছেন উৎসব। বলাই বাহুল্য, এ ব্যাপারে বাংলাদেশিদের উদ্যম অনেক বেশি। শুধু নিউ ইয়র্ক অঞ্চল থেকেই প্রকাশিত হয় ওঁদের ন'টি বাংলা পত্রপত্রিকা, পশ্চিমবঙ্গীয়দের একটাও নয়।

পশ্চিমবাংলার বাঙালিরা ব্যবসা করে না, এ কথাটা লেখা আমার ভুল হয়েছে। অন্তত তিনজন বড় আকারের বাঙালি ব্যবসায়ীর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে কানাডায়, তাঁদের কারখানা কিংবা অফিসও দেখেছি। টরেন্টোর গোরা আদিত্যকে সবাই এক ডাকে চেনে। সুপুরষ গোরা আদিত্য প্রথম জীবন শুরু করেছিলেন সাধারণ কেমিস্ট হিসেবে, এখন এক কোটি ডলারের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক। তাঁর মেড-কেম ল্যাবরেটরিজ-এ কর্মচারীর সংখ্যা পাঁচশোরও বেশি এবং অন্টারিও প্রদেশে এটি দ্বিতীয় বৃহত্তম ক্লিনিক। খুব ফরসা রং, প্রথম দর্শনে তাঁকে দেখে মনে হয় পাক্কা সাহেব, কিন্তু অসম্ভব প্রীতি আছে রবীন্দ্রসঙ্গীত। এবং কলকাতার প্রতি প্রবল টান।

আবার দীপ্তি দত্তর চেহারায় একটুও সাহেবি ছাপ নেই, খাঁটি বাঙালি মুখ, কিন্তু একটাও বাংলা কথা উচ্চারণ করেন না। তাঁর পরিচালনায় এম অ্যান্ড আই পাওয়ার কর্পোরেশন একটি বৃহৎ প্রতিষ্ঠান, বিদ্যুৎ উৎপাদনের বয়লার বিশেষজ্ঞ দীপ্তি দত্ত খুবই সার্থক, সারা পৃথিবীর বড় বড় কোম্পানির কাছ থেকে অর্ডার পাচ্ছেন, খুবই ব্যস্ত, তবু তিনি পশ্চিমবাংলার মান্ধাতার আমলের বয়লারগুলির মেরামতি এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থার উন্নতিতে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে এসেছিলেন স্বতঃপ্রবৃত্তভাবে, লাভের চিন্তা না করে। কারণ, তিনি এক সময় গরিব অবস্থায় ছাত্রজীবন কাটিয়েছেন এই কলকাতায়, সেই ঋণ শোধ করতে চান। কিন্তু সরকারি বিভাগের গড়িমসি ও ফাইল চালাচালিতে তিনি বিরক্ত, ক্রুদ্ধ ও বেদনার্ত। আমাকে তিনি বললেন, কলকাতার রাইটার্স বিল্ডিংসের লোকেরা একের পর এক চিঠি লিখে যাচ্ছে, তারা চিঠি লিখতে ভালোবাসে, আমি বুঝি কাজ। চিঠি লেখা মানে সময় নষ্ট, সময় নষ্ট মানেই আর্থিক ক্ষতি।

দীপ্তি দত্ত একটাও বাংলা বলছিলেন না কেন? এমনকী কথা প্রসঙ্গে হঠাৎ শরৎচন্দ্রের কথা এল, অর্থাৎ তিনি বাংলা বই পড়েছেন, তবু সে কথাও ইংরিজিতে। ইনি নিশ্চয়ই বাংলা ভুলে যাননি, ষোলো বছর বয়েস পর্যন্ত মানুষ যে ভাষায় কথা বলে, তা সারা জীবনে ভোলে না। তাঁর আদি নিবাস ছিল পূর্ববঙ্গে, আমার মনে হল, তাঁর বাংলা উচ্চারণে খুব সম্ভবত বেশিরকমের পূর্ববঙ্গীয় (বাঙাল) অ্যাকসেন্ট রয়ে গেছে, বিশেষত সিলেট ও চিটাগাং-এর মানুষদের থেকে যায়, সেই জন্যই অন্যদের সামনে বাংলায় মুখ খুলতে চান না।

শঙ্কর সরকার আবার খাঁটি বাঙালি। তাঁর জেনারেল ইলেকটিক সুইচ অ্যান্ড গিয়ার বেশ বড় কারখানা, তিনি একার উদ্যমে গড়ে তুলেছেন। কারখানার শেডে বিরাট বিরাট যন্ত্রে উৎপাদন চলছে, তিনি ঘুরে ঘুরে দেখালেন, যেন সেসব তাঁর স্বপ্নের সার্থকতা। অনেক বাঙালিকে সেখানে কাজ দিয়েছেন তিনি। নিজের ছেলেকেও বসিয়েছেন। আমাকে ও দীপ্তেন্দু চক্রবর্তীকে নিয়ে তিনি দুপুরবেলা খেতে গেলেন এক রেস্তোরাঁয়, শোনালেন তাঁর ভবিষ্যতের অনেক পরিকল্পনা, তাঁর কথাবার্তা যেন অনেকটা কোনও ধুতি-পাঞ্জাবি পরা অধ্যাপকের মতন। কয়েকদিন পরেই হঠাৎ শুনলাম, শঙ্কর সরকার পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। এখনও রয়ে গেছে তাঁর স্বপ্ন।

বাঙালিয়ানার প্রশ্নে আমার এমন একজনের কথা মনে পড়ে, যাঁর তুল্য মানুষ আমি পৃথিবীতে আর একজনও দেখিনি। তাঁর নাম কান্তি হোর। ১৯৯২ সালে তিনি ছিলেন টরেন্টোর বঙ্গ সম্মেলনের সভাপতি। এই বঙ্গ সন্মেলনের বিভিন্ন শহরে আমি কয়েকবার গেছি, কিন্তু কান্তি হোরের নেতৃত্বে সেবারের উৎসব ছিল সবচেয়ে সুশৃঙ্খল এবং আকর্ষণীয়। সেই থেকে তাঁর সঙ্গে আমার নিয়মিত যোগাযোগ রয়ে গেছে।

আমার চেনাজানাদের মধ্যে কান্তিবাবুর প্রবাসজীবনই সবচেয়ে দীর্ঘ, পঞ্চাশ বছরেরও বেশি তিনি দেশ ছাড়া। এর মধ্যে বেশ কিছু বছর তিনি কাটিয়েছেন ইকুয়েডরের মতন এমন জায়গায়, যেখানে একজনও বাঙালি নেই। অথচ কান্তিবাবুর বাংলা এখনও নির্ভুল ও সাবলীল, তিনি ইংরিজি ও জার্মান ভাষার মতন স্প্যানিশও জানেন খুব ভালো, অথচ বাংলা বলার সময় অন্য ভাষা মিশিয়ে ফেলেন না। এই টেলিফোন ও ই-মেলের যুগেও কান্তিবাবু চিঠি লিখতে ভালোবাসেন, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে তাঁর চিঠি পাই বাংলায়, নির্ভুল বাংলায় এবং তাঁর হস্তাক্ষর সত্যিই মুক্তোর মতন। অর্ধেক শতাব্দীরও বেশি সময় দেশের বাইরে থেকে তিনি বাংলা ভাষাকে এরকমভাবে ধরে রাখতে পেরেছেন, আশ্চর্য, আশ্চর্য! মানুষটি দারুণ আড্ডাপ্রিয়, বয়েস সত্তর ছাড়িয়ে গেছে, তবু যুবকের মতন রাত্রি জাগরণ, আড্ডা, বিয়ার পান ও ধূম্র পানে তাঁর জুড়ি নেই। কলকাতায় বেশি আসতে পারেন না। তবু তিনি এখানকার সাহিত্য, থিয়েটার, সিনেমার সব খবর রাখেন এবং ভদ্রতার প্রতিযোগিতায় তাঁর সঙ্গে খুব কম মানুষই এঁটে উঠতে পারবেন।

স্বভাবে মিল নেই, তবু কান্তিবাবুর সঙ্গে এখন বিশেষ বন্ধুত্ব হয়েছে মিয়েল ছেড়ে টরেন্টোতে আসা অশোক চক্রবর্তীর। ইনি কবিতা লেখেন, তবে মানুষটি ছটফটে ধরনের, ধূমপান বিরোধী এবং অ্যালকোহলেও বিশেষ আসক্তি নেই। বিপরীত স্বভাবের হলেই বোধ হয় বন্ধুত্ব বেশি হয়। মিলও আছে এক জায়গায়। অশোক চক্রবর্তী বাংলা ভাষার প্রসার ও মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য বিশেষ উৎসাহী, ওঁর স্ত্রী ভারতীয় শিল্প-সাহিত্যের গুণগ্রাহী এবং অতিথিবৎসল। কান্তি হোড় অবশ্য চিরকুমার।

ক্যালিফোর্নিয়ার ডাক্তার মদনগোপাল মুখোপাধ্যায়ও জাগতিক বিষয়ে অত্যন্ত সার্থক হয়েও কায়-মন-বাক্যে খাঁটি বাঙালি রয়ে গেছেন। ওঁর স্ত্রী ডলিও সুযোগ্যা সহধর্মিণী, ছেলে মেয়ে দুটিও স্বাভাবিকভাবে বাংলা বলে, ওঁদের প্রাসাদোপম বাড়িতে বেশ বাংলা বাংলা পরিবেশ। মদন খুবই ব্যস্ত ডাক্তার। তবু তিনি বাংলা সাহিত্যে নিমগ্ন, সুদীর্ঘকাল 'দেশ' পত্রিকায় আমেরিকা চিঠি লিখেছেন, তাঁর নাটকের বইও আছে।

আমেরিকা যৌবনের দেশ। বুড়ো-বুড়িদের অবস্থা অনেক ক্ষেত্রেই করুণ, কেউ খোঁজখবর নেয় না। আমাদের অনাবাসীরা অনেকেই মধ্যজীবনে ভেবেছেন যে রিটায়ার করার পর লক স্টক অ্যান্ড ব্যারেল ফিরে যাবেন দেশে। কেউ কেউ সল্ট লেকে ফ্ল্যাট বা শান্তিনিকেতনে বাড়ি করে রেখেছেন। কিন্তু সেরকমভাবে অনেকেরই ফেরা হয় না। ছেলেমেয়েরা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলে, তাদের জন্য বা নাতি-নাতনিদের জন্য মায়া থেকে যায়। বৃদ্ধ বয়েসে অনেকের আরও মনে হয়, অসুখবিসুখ হলে দেশের চিকিৎসা খুবই খারাপ, হাসপাতালগুলোর যা বীভৎস অবস্থা, তার থেকে ওইসব দেশে চিকিৎসার জন্যই থেকে যাওয়া ভালো। অবশ্য আমেরিকায় চিকিৎসা যেমন ব্যয়সাধ্য, সেরকম টাকা খরচ করলে এদেশে রাজার হালে থাকা যায়, ডাক্তার আসবে বাড়িতে, চব্বিশ ঘণ্টার নার্স রাখা যাবে।

অনেকে পাকাপাকি না ফিরে শীত-গ্রীষ্মের অবস্থান দুরকম করে নিয়েছেন। ওদেশে শীতের সময় বেশ কষ্ট হয়। এদেশে শীত বেশ উপভোগ্য। এদেশের গরম অসহ্য, তখন ওদেশ বেশ মনোরম। প্রতিবছর তিন মাস দেশে কাটিয়ে গেলে দেশের স্বাদ-গন্ধ, টাটকা সবজি ও মাছের স্বাদ পাওয়া যায়, এখানকার শীতকালেই তো নানারকম সাংস্কৃতিক উৎসব হয়।

সেরকমই প্রতি বছর আসেন করবী নাগ ও মণি নাগ। মাস কয়েকের জন্য তাঁরা কলকাতা বা শান্তিনিকেতনের নানান অনুষ্ঠানে হাজিরা দেন। মণিদা কিছু কিছু সামাজিক কাজের সঙ্গেও যুক্ত এখানে। শান্তিনিকেতনের রাস্তায় বাচ্চু রায়কে (হিতব্রত রায়, রজনীকান্ত সেনের নাতি, নিজেও চমৎকার গান করেন) হাঁটতে দেখলেই বোঝা যায় ভার্জিনিয়ার দিকটায় শীত পড়ে গেছে, তিনি সেখান থেকে উড়ে এসেছেন। বাচ্চু রায়কে মনে হয় চিরতরুণ, তিনি গানে-গল্পে মাতিয়ে রাখেন সবাইকে। দেখতে পাওয়া যায় লন্ডনের নিমাই ভট্টাচার্যকে। তিনিও খুব আড্ডাবাজ। অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত তাঁর স্ত্রী টুডবার্টাকে নিয়ে শীতকাল ছাড়াও কোনও কোনও গ্রীষ্মকালেও এসে পড়েন। যেমন ব্রুকলিনের যামিনী মুখোপাধ্যায়। সাহিত্য ও শিল্প দুটোতেই সমান আকর্ষণ। কলকাতার শিল্পীমহলে তিনি বিশেষ পরিচিত। তাঁর স্ত্রী সুমিত্রা চলে গেলেন পৃথিবী ছেড়ে সম্প্রতি, অনেকেরই তিনি খুব প্রিয় ছিলেন। আরও আসেন অনেকেই। এঁদের বলা হয় শীতের পাখি। এঁদের আগমনে কলকাতা শহরটা বর্ণময় হয়ে ওঠে।

বাঙালিদের মধ্যে ঐশ্বর্য ও খ্যাতিতে অনেকেই খুব উচ্চস্থানে উঠেছেন। তাঁদের সঙ্গে আমার পরিচয়ের সুযোগ হয় না। দু-হাজার সালে কলকাতায় বিশ্ব বঙ্গ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তাতে সারা বিশ্বের সব দেশ থেকে কৃতি বাঙালিদের এখানে আহ্বান করে আনার কথা ছিল। সে উৎসব অবশ্য শেষ পর্যন্ত তেমন জমেনি। সেই উপলক্ষে একটি বৃহদাকার স্মারকগ্রন্থ সম্পাদনার ভার পড়েছিল আমার ওপর। কবি সুবোধ সরকারের সহায়তায় উৎসবের শুরুতেই সেটি প্রকাশ করতে পেরেছিলাম, সেটাই এক মাত্র। আরও অনেক পরিকল্পনা বাতিল হয়ে গিয়েছিল। সেই স্মারকগ্রন্থটিতে বহু কৃতি বাঙালির পরিচিতি ও ছবি আছে। তাঁরা প্রায় সকলেই ডাক্তার কিংবা বিজ্ঞানী কিংবা ব্যবসায়ী বা ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের উচ্চ পদাধিকারী। সেই সময় রটে গিয়েছিল যে আমেরিকার বাঙালিদের মধ্যে সবচেয়ে ধনাঢ্য ব্যক্তি ড. মণিলাল ভৌমিক। বাংলায় তাঁর একটি জীবনীগ্রন্থও বেরিয়ে গেল। তাঁর উত্থানকাহিনি রূপকথার মতন। তমলুকের কাছে একটি অকিঞ্চিৎকর গ্রামে তাঁর জন্ম, স্কুলে যেতেন খালি পায়ে। মেধা ও পরিশ্রমের সহযোগে আজ তিনি বিশিষ্ট এক বিজ্ঞানী। পঞ্চাশের ওপর গবেষণাপত্র এবং এক ডজন মার্কিন পেটেন্ট। বহু সম্মানে যেমন তিনি ভূষিত, তেমনই এসেছে প্রচুর অর্থ।

আমাদের স্মারকগ্রন্থটির জন্য খরচ হয়েছিল প্রচুর। তার কমিটি মেম্বাররা ঠিক করেছিলেন অনাবাসী সম্পন্ন বাঙালিদের কাছ থেকে ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপনের বিনিময়ে ভালোরকম অর্থ আদায় করা হবে। যে-কোনও প্রকাশনার চতুর্থ মলাটটিই বিজ্ঞাপনের জন্য সবচেয়ে দামি, আমরা সেই মলাটটি ড. মণিলাল ভৌমিকের জন্য ধার্য করে রেখেছিলাম, একেবারে শেষ মুহূর্তে ফ্যাক্স বার্তা এল, ওই জায়গায় নাম যাবে ডাঃ কালীপ্রদীপ ও সুনন্দা চৌধুরীর। ইনিই নাকি ধনসম্পদ অধিকারী হিসেবে এক নম্বর। ডঃ মণিলাল ভৌমিক ফিজিক্স-এর বিজ্ঞানী, আর ডাঃ কালীপ্রদীপ চৌধুরী আগে ছিলেন চিকিৎসক, পরে বেশ কয়েকটি হাসপাতাল ও চিকিংসা প্রতিষ্ঠানের মালিক, রিয়েল এস্টেট এবং বিনোদন শিল্পেও তাঁর বাণিজ্য বিস্তৃত। ক্যালিফোর্নিয়ার হ্যামেট ভ্যালিতে তাঁর নামে একটি রাস্তা হয়ে গেছে, চৌধুরী সার্কল।

হলদিয়া পেটোকেমিক্যালস এবং অন্যান্য কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের জন্য পূর্ণেন্দু চট্টোপাধ্যায়ের নাম এখানে যথেষ্ট পরিচিত। আমাদের এখানকার আই আই টি-র ছাত্র এবং বার্কলে বিশ্ববিদ্যালয়ের পি এইচ ডি পূর্ণেন্দু চট্টোপাধ্যায় তুলনামূলকভাবে অল্প বয়েসেই শিল্প-বাণিজ্যের জগতে তাঁর মেধার জোরে খুব বড় ভূমিকা নিতে পেরেছেন। আবার এ দেশে অনেকেই যাঁর নাম জানেন না, কিন্তু হলিউডের তারকারা যাঁর কাছে ছুটে যান, সেই বাঙালিটির নাম বিক্রম চৌধুরী। যোগাসনের শিক্ষার জন্য তিনি প্রসিদ্ধ। এলিজাবেথ টেলর, মাইকেল জ্যাকসন, ব্রুক শিল্ড প্রমুখ তাঁর রুগি। বেভারলি হিলস-এ তাঁর যোগাসন কলেজ।

সার্থক বাঙালি হিসেবে পরিতোষ চক্রবর্তী, ডাঃ ব্রজদুলাল মুখার্জি, ডঃ কানু চ্যাটার্জি, ডঃ শান্তনু দাশ, দিলীপ মল্লিক, ডঃ কিরণময় দাশ, স্বাতী এল মৈত্র, রণজিৎকুমার দত্ত, কৃষ্ণা লাহিড়ী, অজিতকুমার রক্ষিত প্রমুখদের নাম দেখেছি, কিন্তু এঁদের ব্যক্তিজীবন সম্পর্কে বিশেষ কিছুই জানি না।

আর অমর্ত্য সেন? তাঁর কথা এর কোনও তালিকাতেই আঁটানো যায় না। তিনি অনন্য। এবং এখনও তিনি ভারতের নাগরিক। কিংবা বলা যায়, বাঙালি হয়েও বিশ্ব নাগরিক।

এই পর্যন্ত লেখার পর মনে পড়ল, অস্ট্রেলিয়া সম্পর্কে তো কিছু লেখা হল না। এখন সে-মহাদেশেও বহু সংখ্যক বাঙালি ও বাংলাদেশির বসতি। তাঁদের অনেকের মতে ইউরোপ-আমেরিকার চেয়েও অস্ট্রেলিয়ার জীবনযাত্রা অনেক বেশি আরামের এবং টেনশন কম। বর্ণবিভেদ এবং জাতিগত বিভেদ অনুভবই করা যাবে না। কেউ কেউ এখন আমেরিকা ছেড়ে চলে আসছেন অস্ট্রেলিয়ায়। যেমন শ্রীমন্ত মুখোপাধ্যায়, এক সময় থাকতেন বস্টনে, এখন সিডনিতে। শ্রীমন্ত মুখোপাধ্যায়ের আমন্ত্রণে আমি সস্ত্রীক সিডনিতে গেছি, তার স্ত্রীর নাম মিষ্টি (ভালো নাম নিশ্চয়ই একটা আছে, কিন্তু এই নামটাই তাকে ঠিক ঠিক মানায়) আমাদের কত যত্নই না করেছে। ওদের ব্যবস্থাপনায় আমরা অস্ট্রেলিয়ায় বেশ কয়েকটি জায়গায় ঘুরেছি, বহু বাঙালির সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। অনেকের আন্তরিকতায় মুগ্ধ হয়েছি। অনেকেই সেখানে কৃতি হয়েছেন। তাঁদের কথা লিখতে হলে আর একটি স্বতন্ত্র অধ্যায় দরকার। কিন্তু আর সময় নেই যে! বারান্তরে দেখা যাবে।

দেশ

সকল অধ্যায়
১.
বাংলা ভাষার আত্ম-পরিচয়
২.
আ মরি বাংলা ভাষা
৩.
এ বার সমস্ত বিদ্যালয়ে বাংলা আবশ্যিক
৪.
বাংলা আছে, থাকবে
৫.
বাঙালি ও বাংলা ভাষা
৬.
বাঙালি কে? আমি কি বাঙালি?
৭.
আর কতদিন সহ্য করব?
৮.
বাঙালি, বাঙালিত্ব—জাতি ও সংস্কৃতি
৯.
দুই বাংলার বাঙালি
১০.
ইতিহাসের পরিহাস
১১.
ভাষার সূক্ষ্মতা ও সংস্কার
১২.
আমাদের হ্রস্সি দীর্ঘি জ্ঞান
১৩.
প্রবাসে বাংলা ভাষা
১৪.
প্রবাসী বাঙালি : সার্থকতা ও পরের প্রজন্ম
১৫.
কিন্তু মাতৃভাষা ছাড়া কি সাহিত্যসৃষ্টি সম্ভব?
১৬.
বাঙালি সংস্কৃতির উত্তরাধিকার
১৭.
আগামী প্রজন্মের বাঙালি
১৮.
বাঙালি অনেক, মুছে যাচ্ছে বাংলা
১৯.
হিস্ট্রি চ্যানেল হিন্দিতে কেন, বাঙালি আজও সর্বংসহা
২০.
বিশ্ব বইমেলা এবং প্রবাসে বাংলা
২১.
স্বাধীন বাংলাদেশ
২২.
সীমান্তে দুবার
২৩.
চলো, আমরাও যাই
২৪.
ওদের সংগ্রামের দিকে তাকিয়ে আমরা
২৫.
বাংলাদেশ কিছুটা অজানা, অচেনা
২৬.
সেদিনের স্মৃতি
২৭.
একুশে ফেব্রুয়ারির গভীর রাত্রে
২৮.
কয়েকটি ছোটখাটো জরুরি বিষয়
২৯.
পাশাপাশি এসে দাঁড়ানোই বড় কথা
৩০.
বাংলাদেশের সঙ্গে আমার নাড়ির টান
৩১.
ধনসম্পদ গেছে, মানসম্মানও যেতে বসেছে
৩২.
পশ্চিমবঙ্গে বাংলা চাইছি, আনন্দবাজারের আপত্তি কেন?
৩৩.
নাম বদলের সৎ প্রস্তাব তাতেই এত বিরুদ্ধ হইহল্লা?
৩৪.
রাকা রায় ওদিকে একলা লড়াই চালাবেন?
৩৫.
যত দূরেই যাই
৩৬.
দৃশ্যপটে বাংলা : প্রয়োজনে চাই ভাষা-পুলিশ
৩৭.
সামনে তাকালে বাংলা অক্ষর চোখেই পড়ে না!
৩৮.
প্রতিবাদের ভাষা কেন কলুষিত হবে?
৩৯.
নিজস্ব ভাষা
৪০.
আগে বাংলা অনুষ্ঠানের জন্য একটা আলাদা চ্যানেল চাই
৪১.
যে প্রশ্নের উত্তর এখনও জানি না
৪২.
বাঙালি কোথায় নেই? বাঙালি এখন কোথায়?
৪৩.
আগামী বছরে দুর্গোৎসব হবে ডিসেম্বর মাসে
৪৪.
মঞ্চে আবার যেন সোনালি যুগ

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%