সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

সংবাদপত্রের পাতায় নন্দীগ্রাম নিয়ে কোনও না কোনও খবর প্রায় প্রতিদিনই উঠে আসছে। গত ১৪ মার্চ থেকে আজ পর্যন্ত নন্দীগ্রামকে ঘিরে এক ধারাবাহিক ঘটনাপ্রবাহ চলছেই। সেদিন পুলিশের গুলিতে নন্দীগ্রামে চোদ্দো জন নারী-পুরুষের মৃত্যু, অথচ পুলিশের প্রতি প্রত্যাঘাতের তেমন কোনও নিদর্শন নেই, এ খবর শুনে প্রথমে হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। এ তো আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার নিমিত্ত ও নয়, সেসব ক্ষেত্রে ধেয়ে আসা জনতার দিকে বন্দুকের নল নীচু করে পায়ে আঘাত করাই নীতি, নানা ছবিতে তেমন কোনও বিশাল উন্মত্ত জনতাও দেখা যায়নি। এ যে অকারণ নিষ্ঠুরতা, ঠান্ডা মাথায় হত্যা! পুলিশের এই আচরণের জন্য যে বা যারাই হোক, শেষ পর্যন্ত অভিযুক্ত পশ্চিমবঙ্গ সরকার এবং তার প্রধান হিসেবে মুখ্যমন্ত্রী। প্রাথমিক বিস্ময়ের পর নানা দিকে জেগে ওঠে ক্ষোভ, হতাশা, বেদনা ও ক্রোধ। নানা রঙের বিরোধী দলগুলি তো শুধু কথায় নয়, ভাঙচুরের পথেও প্রতিবাদ করবেনই (কংগ্রেসি আমলে যদি এরকম নৃশংস ব্যাপার ঘটত, এরকম ঘটেছেও কয়েকবার, তখন কি বামপন্থীরাও প্রতিবাদে লণ্ডভণ্ড করতেন না?)। কিন্তু এবারে সমাজের সর্বস্তর থেকে, লেখক-শিল্পী-বুদ্ধিজীবী-অভিনেতা-নাট্যকর্মী, চিকিৎসক প্রমুখের যে প্রতিবাদ, তাকে বলা চলে অভূতপূর্ব। বিবৃতি, ইস্তাহার, জনসভা ও মিছিলে অংশগ্রহণ করেছেন এঁরা। মনোবেদনা নিয়ে নিভৃতচারী হয়ে থাকা, কিংবা যাঁর যাঁর নিজ সৃষ্টি ও কর্মের মধ্য দিয়ে প্রতিবাদের দিন আর নেই, এঁদেরও এখন প্রকাশ্যে সরব হতে হয়।
বিভিন্ন জনের প্রতিবাদের ভাষা ও ধরন বিভিন্নরকম হতেই পারে। কিন্তু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও শিল্পী-সাহিত্যিকদের ভাষা কি একরকম হওয়া সম্ভব? এবারে অনেক ক্ষেত্রে সেরকম মিল দেখে আতঙ্কিত হয়েছি। রাজনীতির মানুষেরা অনেক সময়ই ভাষা ব্যবহারের সুরুচির সীমা ছাড়িয়ে অশালীন শব্দ ব্যবহার করেন। মানুষের যখন যুক্তির অভাব হয়, তখনই সে গালাগালির আশ্রয় নেয়। রাস্তা-ঘাটে, টামে-বাসে, বিধানসভা-লোকসভায় এরকম অজস্র উদাহরণ আমরা দেখেছি। শুধু বিরোধীরাই নন, সরকারপক্ষও এই দুরাচার থেকে বাদ যান না। কিন্তু লেখক-শিল্পীরা ভাষায় দুর্গন্ধ ছড়াবেন কেন, ভাষার শুদ্ধতা রক্ষার দায়িত্ব তো তাঁদেরই। মুখ্যমন্ত্রীর ওপর যতই রাগ হোক, তাঁর পোশাক কিংবা খাদ্যরুচি নিয়ে মন্তব্য করা কি শিষ্টাচার সম্মত? ক্রোধের বশে তুলনা কিংবা উপমা ব্যবহারে দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হলে অনেক সময় সাম্প্রদায়িক শক্তি এবং অতি দক্ষিণপন্থীদেরই যে প্রশ্রয় দেওয়া হয়, তা কি তাঁরা খেয়াল করেন না? হঠাৎ হঠাৎ হিটলারের প্রসঙ্গ এসেছে, তবে কি হিটলারের প্রকৃত নারকীয় কীর্তির কথা তাঁরা জানেন না? লেখক-শিল্পীদের উপমাই তো অব্যর্থ হওয়ার কথা। কোনও গায়ক যদি অস্ত্র হাতে নিয়ে কোনও রাজনৈতিক দলের কর্মীদের খুন করার হুমকি দেন, তাঁর সঙ্গে এক মঞ্চে বসা কি অন্য লেখক-শিল্পীদের মানায়?
এই সরকারের প্রতি বিরাগে অনেকেই নানারকম সরকারি প্রতিষ্ঠান কিংবা অবৈতনিক কমিটি থেকে সদস্যপদ ত্যাগ করেছেন। তা তো করতেই পারেন, সেটা তাঁদের গণতান্ত্রিক অধিকার। তবে কেমন যেন হুড়োহুড়ির ভাব আছে। অনেকে যেন নন্দীগ্রামের ঘটনার সঙ্গে অপ্রাসঙ্গিকভাবে অকস্মাৎ উপলব্ধি করলেন, এইসব প্রতিষ্ঠান বা কমিটিগুলিই অপ্রয়োজনীয় বা ক্ষতিকর। আগে বোঝেননি? বেশ কয়েকজন বিভিন্ন সময়ে প্রাপ্ত (পাঁচ-দশ বছর আগেরও) সরকারি পুরস্কার ফিরিয়ে দিলেন। সেইসব অর্থ নন্দীগ্রামের আর্তদের সাহায্যকল্পে দানের কথাও ঘোষণা করেছেন। এটাকেও একটা মহৎ প্রস্তাব বলা যেতে পারত, শুধু একটি ছোট্ট কাঁটা খচখচ করে। দানের কথাটা কি প্রচারমাধ্যমে জানানো খুব দরকার ছিল? ঢাক-ঢোল পিটিয়ে দান করলে দানের মর্যাদা কি কিছুটা ক্ষুণ্ণ হয় না? শঙ্খ ঘোষ সরকারি-বেসরকারি যত পুরস্কার পেয়েছেন, তার অধিকাংশ অর্থই তিনি দিয়ে দিয়েছেন বিভিন্ন সেবা প্রতিষ্ঠানকে। কোনওরকম প্রচারের মধ্যে না গিয়ে, নিঃশব্দে। আমরা এই তথ্য জেনেছি, কারণ আমরা এরকম দু-একটি গ্রহিতা-প্রতিষ্ঠানের কাজকর্মের সঙ্গে কিছুটা যুক্ত।
কৃষি ও শিল্পায়নের মধ্যে যে প্রকৃত কোনও সংঘর্ষ নেই, তা নিয়ে ভুল বোঝাবুঝিতে দেশে হঠাৎ যেন একটা আপৎকাল এসেছে। এরকম সময়ে বুদ্ধি ও যুক্তিবোধ সুস্থির রাখাই তো দরকার।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন