সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

আমি হিন্দি ভাষার মোটেই বিরোধী নই। কোনও ভাষারই বিরোধী নই। কিন্তু কিছু কিছু ঔচিত্যবোধের কথা তো বলতেই হবে! কলকাতা তথা পশ্চিমবাংলায় বাংলায় ফিল্মের তুলনায় হিন্দি ফিল্ম অনেক বেশি সংখ্যায় দেখানো হয়, কিন্তু তা জোর করে বন্ধ করার কোনও প্রশ্নই তোলা উচিত নয়। সরকার কিংবা শাসকদল সে বিষয়ে নীতি নির্ধারণ করবেন অথবা করবেন না। বাংলা ফিল্মের কলাকুশলীরা সে ব্যাপারে আন্দোলন করবেন অথবা করবেন না। ফিল্মের ব্যবসা সম্বন্ধে আমি মতামত দেবার অনধিকারী।
টিভি চ্যানেলগুলিতে হিন্দি অনুষ্ঠানেরই আধিক্য। সে বিষয়েও বলার কিছু নেই, দর্শকদের চাহিদা মেটাতেই বোধহয় ব্যবসায়ীরা সে উদ্যোগ নেয়। বাংলা, এমনকী ইংরেজি পত্রিকাগুলিতেও ইদানীং হিন্দি অনুষ্ঠানের আলোচনা এবং ছবি ফলাও করে ছাপা হয়, সেটাও নিশ্চয়ই জনরুচির ব্যাপার। হিন্দি ভাষাতে বেশ কিছু উৎকৃষ্ট ফিল্মও তৈরি হয়, কিন্তু নিকৃষ্ট ফিল্মের সংখ্যাই বেশি। নিকৃষ্টগুলিই প্রাধান্য পায়। সমাজের গতিই তো সেই দিকে। আমার মতন চুটোপুঁটি তা রোধ করতে পারবে না। তবে একটা মজার কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। টিভির চ্যানেল ঘোরাতে ঘোরাতে দেখা যায়, দশটার মধ্যে ছ'-সাতটাতেই একদল ছেলেমেয়ে অবিকল একই ভঙ্গিতে নাচছে, যদি তাকে নাচ বলা যায়। ভারতীয় জনগণের মধ্যে নাচ যে এত জনপ্রিয় তা তো বাস্তব চক্ষু মেলে দেখতে পাইনি কখনও।
টিভি-তে অন্যান্য ভাষার অনুষ্ঠানও থাকে। সেটাই সঙ্গত। বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষ নিজেদের পছন্দ মতন অনুষ্ঠান বেছে নিতে পারবে। সেটাই স্বাভাবিক। হিন্দি যদি বেশি জনপ্রিয় হয়, তা হলে হিন্দি অনুষ্ঠান বেশি থাকবে।
ইংরেজি ইংরেজিই থাকুক
আমার আপত্তি, সম্প্রতি ইংরেজি অনুষ্ঠানগুলিও যে হিন্দিতে পরিবেশন করার ঝোঁক দেখা যাচ্ছে, সে বিষয়ে। বিষয়টি গুরুতর। ডাবিং সম্পর্কে কিছু নির্দিষ্ট বিধি আছে। বাংলা অনুষ্ঠান হিন্দিতে কিংবা হিন্দি অনুষ্ঠান বাংলায় ডাব করা চলে না। ইংরেজি অনুষ্ঠান বিষয়ে বুঝি কোনও নীতি নেই? ইতিহাস ও বিজ্ঞান বিষয়ক অনেক অনুষ্ঠান আসে বিদেশ থেকে। সেগুলির হিন্দিকরণ রীতিমতন অন্যায়। বাংলায় ডাব করলেও অন্যায় হত। কলকাতা শহরে বাঙালি, হিন্দিভাষী ছাড়াও বহু বহু অন্য ভাষাভাষী মানুষ তাকে, ইংরেজি অনুষ্ঠানগুলি তাঁদের সকলের জন্য। পটনা কিংবা ইলাহাবাদের মতন শহরে ইংরেজির বদলে হিন্দি চালাবার চেষ্টা করা হলে তবু মানে বোঝা যায়, কিন্তু কলকাতা একটি কসমোপলিটান শহর। এখানে সব ভাষার মানুষেরই অনুষ্ঠান নির্বাচনের স্বাধীনতা থাকা উচিত।
ডাবিং ব্যাপারটাই আমার হাস্যকর লাগে। পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও এর চল কমে যাচ্ছে। কল্পনা করুন তো, গ্রেগরি পেক কথা বলছেন চিনে ভাষায় আর মেরিলিন মনরো প্রেম করছেন তামিলে। মনে আছে, একবার ব্যাঙ্কক শহরের হোটেলে শুয়ে টিভি-তে স্যার লরেন্স অলিভিয়েরের মুখে তাই ভাষা শুনে হাসতে হাসতে আমার চোখে জল এসে গিয়েছিল। কোনও হিন্দিভাষীরও নিশ্চয়ই একই অবস্থা হত। ছবিটি ছিল খুবই সিরিয়াস। এখানেও ইতিহাস-বিজ্ঞানের অনুষ্ঠানগুলিতে সাহেব-মেমদের মুখে হিন্দি শুনলে শুধুমাত্র ওই ভাষার মানুষরা পুলকিত হতে পারেন, কিন্তু অন্যদের হাস্যকর মনে হবেই।
বরং সাবটাইটল চলতে পারে
ডাবিং-এর বদলে তবু সাব টাইটল বসানো যেতে পারে। সেটাই সর্বস্বীকৃত রীতি। এখানকার কেবল-অপারেটররা যদি হিন্দি ভাষায় অত্যুৎসাহী হন, তা হলে হিন্দি সাবটাইটেল ব্যবহার করুন। কেউ আপত্তি করবে না। যদি কেউ কেউ বলেন যে, টিভির অনুষ্ঠান চোখে দেখার ও কানে শোনার জন্য, সেই জন্যই যাঁরা লেখাপড়া তেমন জানেন না, তাঁদের জন্যই ডাবিং করা হচ্ছে, তা হলে এই যুক্তি মূর্খতার ধার ঘেঁষে যাবে। অল্পশিক্ষিত কিংবা অশিক্ষিতদের জন্য অনুষ্ঠানের ধরনটাই অন্যরকম হওয়া দরকার। ইতিহাস-বিজ্ঞানের অনুষ্ঠানগুলি অ-আ-ক-খ থেকে শুরু হয় না। যাঁরা হাবল টেলিস্কোপ বা ব্ল্যাক হোলের কথা কিছুই জানেন না, কিংবা মেসোপটেমিয়ার নাম শোনেননি, তাঁরা মহাকাশ বিজ্ঞান কিংবা ইতিহাসের অনুষ্ঠান শুধু হিন্দি ভাষায় দেখে কী বুঝবেন? তাঁরা ওই সব অনুষ্ঠান দেখবেনই না, তাঁরা নাচ-গান দেখবেন।
আমি হিন্দি ভাষা অনেকটা বুঝি, উত্তর ভারতে গেলে হিন্দিতেই কথা বলি। কিন্তু বিজ্ঞান ও ইতিহাসের সূক্ষ্ম বিষয় ইংরেজিতেই পড়তে শুনতে অভ্যস্ত। তা ছাড়া, চোখের সামনে যখন দেখি সাহেব-মেমরা ঠোঁট নাড়ছে আর কথা ভেসে আসছে হিন্দিতে (অযথা নাটকীয় ভাবে), তখন ক্রমশই বিরক্তি জমতে থাকে। তার পর বন্ধ করে দিই। আমার ধারণা, হিন্দি ভাষার বিদগ্ধ ব্যক্তিরাও অন্য কোনও ভাষাকে দমন করে তার ওপর হিন্দি ভাষাকে চাপিয়ে দেওয়া পছন্দ করেন না। দক্ষিণ ভারতে কী হয়? তারা জোর করে হিন্দি অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেয় বলে এই অত্যুৎসাহীরা তাদের ভয় পায়। বাংলা কত দিন সর্বংসহা হয়ে থাকবে? আমার মতন নিরীহ মানুষেরও এক এক সময় ইচ্ছে হয়, দলবল জুটিয়ে নিয়ে এই সব প্রচার দফতরে ভয় দেখাতে!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন