পশ্চিমবঙ্গে বাংলা চাইছি, আনন্দবাজারের আপত্তি কেন?

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

ভাষা-শহিদ-স্মারক সমিতির পক্ষ থেকে লেখক-বুদ্ধিজীবীদের একটি প্রতিনিধি দল সম্প্রতি বাংলা ভাষা প্রসারের জন্য রাজ্য সরকারের সাময়িকভারপ্রাপ্ত মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের কাছে অনেকগুলি দাবি জানাতে গিয়েছিলেন। বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশতি হয়েছে তার পরস্পরবিরোধী ও ভ্রান্ত প্রতিবেদন। আনন্দবাজার পত্রিকাতেও ১৪ জ্যৈষ্ঠ দ্বিতীয় সম্পাদকীয়তে প্রচুর বিদ্রূপ বর্ষিত হয়েছে সেই প্রতিনিধি দলের প্রতি। অবশ্য রচনাটির শিরোনাম 'আ মরি বাংলা ভাষা' দেখে ঠিক বোঝা যায় না, বিদ্রূপ ওই প্রতিনিধিদলের প্রতি, না বাংলা ভাষার উদ্দেশে। এবং 'মড়াকান্না', 'পাগলের প্রলাপ' এই ধরনের ভাষা ব্যবহার দেখলে মনে হয়, যুক্তি যখন দুর্বল তখনই মানুষ গালিগালাজ অবলম্বন করে; আমি অবশ্য তার প্রত্যুত্তর দেব না, প্রতিনিধিদলের অন্যতম সদস্য হিসেবে ভ্রান্তিগুলি সংশোধনের চেষ্টা করব।

আনন্দবাজারের পক্ষ থেকে মূল দাবিগুলি অনুধাবন করা হয়নি, জানতেও চাওয়া হয়নি। মূল দাবি শুধু কলকাতার নাম পরিবর্তন বা মোটর গাড়ির নাম্বার প্লেট বদল ইত্যাদি নয়, মূল দাবি এই রাজ্যের সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার। তা নিয়ে বাংলা ভাষার সবচেয়ে জনপ্রিয় দৈনিকের কী আপত্তি থাকতে পারে! সংবিধান অনুযায়ী ইংরেজি ও হিন্দি ভারত সরকারের যোগাযোগের ভাষা, রাজ্যগুলির প্রধান ভাষা জাতীয় ভাষা বা ন্যাশলান ল্যাঙ্গুয়েজ হিসেবে স্বীকৃত, কিন্তু কার্যত হিন্দিকে রাজভাষা হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে, সেজন্য কেন্দ্রীয় সরকার ব্যয় করছেন বহু কোটি টাকা। বাংলা ভাষা ভারতের দ্বিতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ ভাষা, তার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের কোনও মাথা ব্যথা নেই, অন্যান্য জাতীয় ভাষাগুলিই বা বঞ্চিত হবে কেন? এই ব্যাপারে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করাই আমাদের প্রধান দাবি।

এই রাজ্যে সরকারি কাজকর্মে বাংলাভাষা ব্যবহারের সিদ্ধান্ত আগেই নেওয়া হয়ে গেছে, আমরা চেয়েছি তার প্রয়োগ ত্বরান্বিত করতে। পশ্চিমবঙ্গ ও নাগাল্যান্ড ব্যতীত, ভারতের সবক'টি রাজ্যে বিদ্যালয় স্তরে রাজ্যের ভাষা পঠন পাঠন আবশ্যিক। অর্থাৎ তামিলনাড়ু বা মহারাষ্ট্রে যদি বাঙালি ছেলেমেয়েরা পড়াশুনো করে, তাদের তামিল বা মরাঠি ভাষা পড়তেই হবে। সেই জন্যই আমরা চেয়েছি, পশ্চিম বাংলাতেও অন্তত অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত বাংলা শিক্ষা অবিলম্বে বাধ্যতামূলক করা হোক। শুধু সরকারি নয়, বে-সরকারি, ইংলিশ মিডিয়াম, হিন্দি মিডিয়াম, সব স্কুলে। এত কাল এই ব্যাপারে আমরা অবহেলা করেছি বলে অনেক বাঙালির সন্তানও ইংলিশ বা হিন্দি মিডিয়াম নেয়, বাংলা পড়ে না। দিল্লি-মুম্বই-চেন্নাইয়ের দ্বিতীয় প্রজন্মের বাঙালি ছেলেমেয়েরা বাংলা লিখতে পড়তে শেখে না। আমরা কি ক্রমাগত বাঙালির সংখ্যা হারাতেই থাকব? অন্য রাজ্য থেকে জীবিকা বা অন্যান্য প্রয়োজনে যাঁরা পশ্চিম বাংলায় বসবাস করবেন, তাঁদের ছেলেমেয়েরা বাংলা শিখবে, বাংলা সংস্কৃতির সঙ্গে কিছুটা পরিচিত হবে, এ দাবি কি অস্বাভাবিক? অনেকে স্বেচ্ছায়ও বাংলা শেখেন। যাঁরা বাংলা জানেন, তাঁরাই বাঙালি, ঘোষ-বোস-চট্টোপাধ্যায়-মুখোপাধ্যায় হওয়ার দরকার নেই। পাণ্ডে-দুবে-বাজপেয়ী-নায়ারও বাঙালি হতে পারেন।

সম্পাদকীয়তে লেখা হয়েছে, আমরা দূরদর্শনে হিন্দি অনুষ্ঠান বাতিল করতে চেয়েছি। এটাকে মিথ্যে বললে কম বলা হয়, এমন কথা আমরা উচ্চারণই করিনি, আমরা অন্য কোনও ভাষার বিরোধী নই, আমরা চেয়েছি, একটি পূর্ণাঙ্গ রুচিসম্মত, বাংলা অনুষ্ঠানের চ্যানেল চালু করতে। যেমন ইন্টারনেটে ইংরেজিতে বাঙালিদের যে কুৎসা রটনা চলছে অশ্লীল ভাষায়, তার জবাব আমরা দিতে চাই না, কেন না মনোরোগীরাই ওরকম ভাষা ব্যবহার করে, কিন্তু ইন্টারনেটে বাংলার সুস্থ সংস্কৃতির পরিচয়মূলক একটি নতুন জানলা খোলার উদ্যোগ নেব না কেন? কলকাতার রাস্তায় অধিকাংশ হোর্ডিং সাইনবোর্ড ইংরেজি বা হিন্দি ভাষায়, তা থাক না, আমাদের দাবি শুধু বাংলা অক্ষরও তাতে জুড়ে দিতে হবে। কলকাতা কসমোপলিটন শহরই থাকুক, কিন্তু এ শহর যে পশ্চিম বাংলার রাজধানী, এ পরিচয় একেবারে মুছে যেতে দেব না কিছুতেই!

ক্যালকাটার বদলে কলকাতা, আর ওয়েস্ট বেঙ্গলের বদলে পশ্চিমবঙ্গ, এই পরিবর্তনের দাবিতে যাঁরা শিবসেনার গন্ধ পান, তাঁরা হীনম্মন্যতায় ভুগছেন। চেন্নাই, তিরুবন্তিপুরম, ভাদোদারা, এমনকী ঘরের কাছে গৌহাটির বদলে গুয়াহাটি, এইসব পরিবর্তনের পেছনেও বুঝি শিবসেনা রয়েছে? কলকাতা নামের ইতিহাস নিয়ে অনেক বিতর্ক ও কচকচি আছে, সে ব্যাপারে আমিও নেহাত কম জানি না, কিন্তু সে সবের মধ্যে যেতে চাই না। ইংরেজরা নাম দিয়েছে ক্যালকাটা, গত আড়াইশো বছর ধরে বাঙালিরা বলে কলকাতা, এখন সর্বত্র বাংলায় কলকাতাই লেখা হয়, অবাঙালিরাও বলে কলকাত্তা, একমাত্র দিশি সাহেবরাই বলে 'খ্যালখাটা'! যে নামে আমরা এই শহরটাকে ডাকি, ইংরেজিতেও সেই নামটা লিখতে পারব না কেন? একই শহরের দুরকম নাম বজায় রাখার কী যুক্তি থাকতে পারে? আর কোথাও আছে নাকি? পশ্চিমবঙ্গের নাম পরিবর্তনের প্রসঙ্গ উঠলেই অনেকে মাথা ঝাড়া দেন।

বঙ্গ, বঙ্গদেশ, বঙ্গভূমি, গৌড় ইত্যাদি নিয়ে নানা মুনির নানা মত, তাই আমরা নাম পরিবর্তনের ঝামেলায় যেতে চাই না, শুধু দাবি করেছি, পশ্চিমবঙ্গ নামটির ইংরেজি অনুবাদ অপ্রয়োজনীয়। মধ্যপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থান, হিমাচল প্রদেশ যদি ইংরেজি হরফে লেখা যেতে পারে তা হলে পশ্চিমবঙ্গই বা যাবে না কেন? এর পরেও যাঁরা 'ওয়েস্ট বেঙ্গল' বজায় রাখার পক্ষপাতী, আমি তাঁদের দাস মনোভাবসম্পন্ন বলতে বাধ্য। আর যাঁরা বলেন, যেমন আছে তেমনই থাক না, বদলাবার দরকার কী, তাঁদের জানাতে চাই যে, যা বদলায় না তা ক্রমশই ক্ষয় পায়, সেই ক্ষয় রোগই আমাদের পেয়ে বসেছে। কেউ কেউ বলেন, এ-রাজ্যে এত বেকার, শিল্প-বাণিজ্যের এত দুর্দশা, সেই সব সমস্যা দূর না করে বাংলা ভাষা নিয়ে মাতামাতি করার কী আছে? যাঁরা এই কথা বলেন, তাঁরা ওই সব বড় বড় সমস্যা দূর করার জন্য নিজেরা কিছু করছেন কি! যদি করতে চান, করুন না। দেশে বেকার সমস্যা আছে বলে ভাষার অবমাননা সহ্য করে যেতে হবে? আমরা যদি বলি, বাংলা না জানলে এ-রাজ্যে কারুকে চাকরি দেওয়া চলবে না, সেটা কি মূল মূল সমস্যাকেও খানিকটা ছুঁয়ে যায় না?

এই দাবিগুলি মুষ্টিমেয় কিছু লোকের হঠাৎ খেয়ালপ্রসূতও নয়। একটি সংস্থা গঠন করে এক বছর আগে, বাংলা ভাষার জন্য যাঁরা প্রাণ দিয়েছেন ঢাকা ও শিলচরে, তাঁদের স্মরণে সুরেন্দ্রনাথ পার্কে একটি শ্বেত পাথরের শহিদ বেদি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অদূরে স্থাপিত হয়েছে খোলা মঞ্চ, লালন মঞ্চ নামে, যেখানে প্রতি শনিবার বাংলার কিছু কিছু লুপ্তপ্রায় সংস্কৃতি, যেমন জারি গান, সারি গান, কবির লড়াই, জেলেপাড়ার সং, রায় বেঁশে ইত্যাদি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চলছে। তারই পরবর্তী কার্যক্রম বাংলা ভাষার প্রসার ও সমৃদ্ধির জন্য সর্বাত্মক আন্দোলন। মিউজিয়ামের আশুতোষ শতবার্ষিকী হলে বহু বিশিষ্ট ও বিদ্বজ্জনের সমাবেশে এই দাবিগুলি আলোচিত ও গৃহীত হয়েছে। পশ্চিম বাংলার অনেক সংস্থা এই দাবিগুলির সঙ্গে একমত। এর মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলিরও কোনও ভেদাভেদ নেই।

না, শুধু আবেদন নিবেদনের পর্যায়েই এই দাবি থেমে থাকবে না। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত বাংলা শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার জন্য প্রয়োজন হলে আমরা পথে নামব। ইংরেজি পত্রিকাগুলোতে যারা বাঙালিদের বং বলে সম্বোধন করে, সেইসব পত্রকারদের ঝুঁটি নেড়ে দিতে হবে। বাঙালি ছেলে-মেয়েরা যদি নিজেদের মধ্যে ইংরেজিতে কথা বলে তবে তারা হবে প্রকাশ্যে উপহাসের পাত্র। যেসব বাবা-মা সন্তানদের বাংলা শেখাতে অবহেলা করে, তাদের সামাজিকভাবে বয়কট করা দরকার। যে-কোনও দোকানে, অফিসে, ব্যাঙ্কে, হোটেলে বাংলায় প্রশ্ন করলে যদি উত্তর না পাওয়া যায়, তবে তাদের বোঝাতে হবে চোখরাঙানির ভাষা। অন্যান্য ক্ষেত্রে আরও কঠিন ব্যবস্থা।

ময়দানে প্রতিষ্ঠিত শহিদবেদি আমাদের এই কথাই স্মরণ করিয়ে দেয় যে বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য হয়তো এই পশ্চিম বাংলাতেও রক্ত দিতে হতে পারে। দল নির্বিশেষে বহু তরুণ-তরুণী যে তার জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।

সকল অধ্যায়
১.
বাংলা ভাষার আত্ম-পরিচয়
২.
আ মরি বাংলা ভাষা
৩.
এ বার সমস্ত বিদ্যালয়ে বাংলা আবশ্যিক
৪.
বাংলা আছে, থাকবে
৫.
বাঙালি ও বাংলা ভাষা
৬.
বাঙালি কে? আমি কি বাঙালি?
৭.
আর কতদিন সহ্য করব?
৮.
বাঙালি, বাঙালিত্ব—জাতি ও সংস্কৃতি
৯.
দুই বাংলার বাঙালি
১০.
ইতিহাসের পরিহাস
১১.
ভাষার সূক্ষ্মতা ও সংস্কার
১২.
আমাদের হ্রস্সি দীর্ঘি জ্ঞান
১৩.
প্রবাসে বাংলা ভাষা
১৪.
প্রবাসী বাঙালি : সার্থকতা ও পরের প্রজন্ম
১৫.
কিন্তু মাতৃভাষা ছাড়া কি সাহিত্যসৃষ্টি সম্ভব?
১৬.
বাঙালি সংস্কৃতির উত্তরাধিকার
১৭.
আগামী প্রজন্মের বাঙালি
১৮.
বাঙালি অনেক, মুছে যাচ্ছে বাংলা
১৯.
হিস্ট্রি চ্যানেল হিন্দিতে কেন, বাঙালি আজও সর্বংসহা
২০.
বিশ্ব বইমেলা এবং প্রবাসে বাংলা
২১.
স্বাধীন বাংলাদেশ
২২.
সীমান্তে দুবার
২৩.
চলো, আমরাও যাই
২৪.
ওদের সংগ্রামের দিকে তাকিয়ে আমরা
২৫.
বাংলাদেশ কিছুটা অজানা, অচেনা
২৬.
সেদিনের স্মৃতি
২৭.
একুশে ফেব্রুয়ারির গভীর রাত্রে
২৮.
কয়েকটি ছোটখাটো জরুরি বিষয়
২৯.
পাশাপাশি এসে দাঁড়ানোই বড় কথা
৩০.
বাংলাদেশের সঙ্গে আমার নাড়ির টান
৩১.
ধনসম্পদ গেছে, মানসম্মানও যেতে বসেছে
৩২.
পশ্চিমবঙ্গে বাংলা চাইছি, আনন্দবাজারের আপত্তি কেন?
৩৩.
নাম বদলের সৎ প্রস্তাব তাতেই এত বিরুদ্ধ হইহল্লা?
৩৪.
রাকা রায় ওদিকে একলা লড়াই চালাবেন?
৩৫.
যত দূরেই যাই
৩৬.
দৃশ্যপটে বাংলা : প্রয়োজনে চাই ভাষা-পুলিশ
৩৭.
সামনে তাকালে বাংলা অক্ষর চোখেই পড়ে না!
৩৮.
প্রতিবাদের ভাষা কেন কলুষিত হবে?
৩৯.
নিজস্ব ভাষা
৪০.
আগে বাংলা অনুষ্ঠানের জন্য একটা আলাদা চ্যানেল চাই
৪১.
যে প্রশ্নের উত্তর এখনও জানি না
৪২.
বাঙালি কোথায় নেই? বাঙালি এখন কোথায়?
৪৩.
আগামী বছরে দুর্গোৎসব হবে ডিসেম্বর মাসে
৪৪.
মঞ্চে আবার যেন সোনালি যুগ

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%