সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশে বন্ধু-বান্ধবের মুখে প্রায়ই একটা আলোচনা শুনি।
এখন সেই স্বাধীন দেশের মানুষরা বাঙালি না বাংলাদেশি? বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতির উত্তরাধিকারের দাবিতেই পূর্ব পাকিস্তানে আন্দোলন শুরু হয়েছিল। স্বাধীনতার দাবি উঠেছে অনেক পরে, তখনও আলাদা রাষ্ট্রটির নাম ঠিক ছিল না। একাত্তরের মার্চ মাসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তাঁর শেষ বক্তৃতায় বলেছিলেন, জয় বাংলা!
রাষ্ট্রের নামেই দেশের নাগরিকদের নাম হয়। বাংলাদেশ নামই প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবার পর সে দেশের নাগরিকরা দেশ-বিদেশে বাংলাদেশি নামেই পরিচিত হয়ে উঠছে। তবে কি তারা আর বাঙালি থাকছে না? কিংবা বাঙালি আর বাংলাদেশি কি সমার্থক নয়? এ বিতর্কের এখনও মীমাংসা হয়নি।
স্বাধীনতার আগেই অখণ্ড বাংলার একটি অংশের চলতি নাম ছিল পূর্ব বাংলা, যা পরবর্তীকালে হয় পূর্ব পাকিস্তান। পূর্ব থাকলেই পশ্চিম-এর বাস্তব অস্তিত্ব থাকে। পূর্ব অদৃশ্য হয়ে গেলে পশ্চিমবঙ্গ নামটা কৃত্রিম হয়ে পড়ে। এতদিন সেই কৃত্রিম নামটাই চলে আসছিল। কেউ কেউ বলছেন, ইতিহাস রক্ষার প্রয়োজনেই পশ্চিমবঙ্গ নামটা টিকিয়ে রাখা দরকার, তাতে বঙ্গ ব্যবচ্ছেদের ইতিহাস বিধৃত থাকবে! এ কেমন ধরনের ছেঁদো ইতিহাস? ইতিহাসের কারণে প্রতিবেশী রাষ্ট্রটির নাম তো 'পূর্ব বাংলাদেশ' নয়! দু-টুকরো হয়ে যাওয়া ভারতের নামও তো নয় 'খণ্ড ভারত'! দুই রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত পাঞ্জাবও শুধুই পাঞ্জাব। ইতিহাস রক্ষার দায় শুধু পশ্চিমবঙ্গের?
এতদিন পশ্চিমবঙ্গ নাম বজায় থাকলেও এ-রাজ্যের মানুষ কিন্তু পশ্চিমবঙ্গী হয়নি। বাইরেও সবাই বাঙালি বলে। ইংরেজিতেও শুধুই বেঙ্গলি। তার ফলে আমাদের জাতি-পরিচয় বদলাবার প্রশ্ন নেই। বাঙালিদের এই রাজ্যটির নাম বাংলা হওয়াই স্বাভাবিক।
স্বাধীনতার পরই, কংগ্রেসি আমল থেকেই এ-রাজ্যের প্রতি কেন্দ্রের 'বিমাতৃসুলভ ব্যবহার,' এই শব্দবন্ধে আমরা অভ্যস্ত। খণ্ডিত পাঞ্জাব কেন্দ্রের কাছ থেকে যতটা সাহায্য পেয়েছে, খণ্ডিত বাংলা পেয়েছে তেমনই বঞ্চনা। বাঙালি উদ্বাস্তুদের প্রতি ব্যবহারে মানবতার কোনও চিহ্ন ছিল না। শরণার্থী সমস্যা আমাদের আজও ঘোচেনি। সেরকম কোনও তেজ-সম্পন্ন বাঙালি নেতা কেন্দ্রীয় সরকারে স্থান পাননি, যাঁরা গিয়েছেন, তাঁরা বাংলা তথা পশ্চিম বাংলার উন্নতি সম্পর্কে বিশেষ উচ্চবাচ্য করেননি, পাছে তাঁদের গায়ে প্রাদেশিকতার ছাপ পড়ে। বিরোধী পক্ষ গলা ফাটিয়েছেন, কেন্দ্রে এবং রাজ্যে। তারপর কয়েকবার সরকার বদল হয়েছে, অবস্থা বিশেষ বদলায়নি। আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলিতে বড় বেশি রাজনীতি, শুধুই রাজনীতি, ভাষা-সংস্কৃতি-সামাজিক ব্যবহার সম্পর্কে স্পষ্ট কোনও নীতি নেই! আধখানা শতাব্দী পার হয়ে গেল, তবু নামমাত্র শিক্ষিতের হারও পঞ্চাশ শতাংশ পেরুল না, এর থেকে লজ্জার আর কী হতে পারে? অর্থনৈতিক দারিদ্র্যের চেয়ে শিক্ষার দারিদ্র্য কম মারাত্মক নয়। কিংবা এরা যে পরস্পরের পরিপূরক, তা আমরা আজও বুঝলাম না।
বাংলাদেশ বাংলা ভাষার স্থান করে দিয়েছে সারা বিশ্বে, সেখানে আমাদের স্থান কোথায়? আমরা যে বাংলা ভাষাকে ক্রমশ হারাতে বসেছি, সে বোধটাও কি আমরা হারিয়ে ফেলেছি? ভাষা-ভিত্তিক রাজ্য পুনর্গঠনের পর সব রাজ্যগুলিতেই সে রাজ্যের ভাষা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে, শুধু পশ্চিম বাংলায় পায়নি। সব স্কুলে বাংলা পড়ানো বাধ্যতামূলক নয়, সে জন্য অনেক বাঙালি ছেলেমেয়েও আর বাংলা শেখে না। সরকারের সর্বস্তরে বাংলা ব্যবহার সম্পর্কে সরকারের পক্ষ থেকে অনেকবার স্তোকবাক্য দেওয়া হয়েছে, কাজের কাজ কিছুই হয়নি। বাংলা টাইপ রাইটার, বাংলা টাইপিস্ট-এর অভাব, এসব হাস্যকর অজুহাত। আসল কারণ, উদ্যোগের অভাব। আমাদের বিধানসভাতেও নাকি অনেক বাঙালি সদস্য ইংরেজিতে বাগাড়ম্বর করেন। ইংরেজি জানে না, কিংবা ইংরেজি কম জানে, এ বলে অনেককে আড়ালে হেয় করার চেষ্টা এখনও চলে। ইংরেজিতে দিগগজ হলেও কি বাংলা জানতে নেই? ইংরেজি তো শিখতেই হবে, তা বলে বাংলা ভুলব কেন? কিংবা মাতৃভাষার মর্যাদা সম্পর্কে সচেতন থাকব না কেন? খুবই দুঃখের বিষয়, আমাদের পশ্চিম বাংলার তিনজন দীর্ঘকালীন মুখ্যমন্ত্রী, বিধানচন্দ্র রায়, সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় এবং জ্যোতিবসু এঁদের মধ্যে বহুরকম বৈপরীত্য এবং অমিল থাকলেও একটি বিষয়ে মিল আছে, এঁরা কেউ কখনও বাংলায় এক কলমও লেখেননি। ব্যক্তিগত চিঠিও বাংলায় লিখেছেন কি না সন্দেহ!
বিপ্লবের মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তন না হলে লোকের রাস্তায় দাঁড়িয়ে যেখানে সেখানে পেচ্ছাপ করাও বন্ধ করা যাবে না, এক সময় এই ছিল মূল উপপাদ্য। বিপ্লবও হল না, রাস্তায় যত্রতত্র পেচ্ছাপও চলতে লাগল, এই হয়েছে এখনকার অবস্থা। বিপ্লবের বরাদ্দ দিয়ে অনেকে নাকে তেল দিয়ে ঘুমিয়েছে, অনেকে বহুরকম দায়িত্ব এড়িয়ে গেছে। কোন ধরনের সমাজ পরিবর্তনের জন্য বিপ্লব, এখন এই প্রশ্নটাই একটা সাংঘাতিক ধাঁধা। তাই চট করে এখন আর কেউ বিপ্লবের কথা মুখে আনে না। তার ফলে চলছে চরম অরাজকতা। আন্তর্জাতিকতাবাদের বন্দনা করতে করতে আমরা নিজেদের জাতিসত্তা হারাতে বসেছি।
বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি যে এখন সবদিক থেকে সঙ্কুচিত হয়ে আসছে, তা অনেক বাঙালিও দিব্যি মেনে নিয়েছে। যেন এটাই ভবিতব্য। কেউ কিছু প্রতিবাদ বা দাবি তুললে এরাই 'শিবসেনা', 'আমরা বাঙালি', 'ফ্যাসিস্ত' এইসব গালাগালি ছুঁড়ে দেয়, এর কারণ কী? কোনও কিছুই বদলাবার দরকার নেই, যেমন চলছে তেমনই চলুক, এরকম কথাও তারা বলে, অনেক কলকারখানা বন্ধ, অর্থনৈতিক অবস্থা অবনতির দিকে, সুতরাং বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিও ডুবে যাক, শেষ হয়ে যাক, এরকম স্থূল কথা বলতেও তাদের মুখে আটকায় না। আবার প্রশ্ন করছি, এর কারণ কী? ইংরেজদের কাছে মীরজাফর, জগৎশেঠ, রায়দুর্লভরা যেমনভাবে বাংলার স্বাধীনতা বিক্রি করে দিয়েছিল, এ-যুগের এরাও কী সেরকম কোনও শক্তির স্বার্থে বাংলাকে বিকৃত করতে চাইছে। তা হলে যে ধরে নিতে হয়, সেরকম কোনও শক্তি আবার বাংলা সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা হরণ করতে চাইছে। তামিলনাড়ুতে রাজনৈতিক দলগুলি অন্য সব বিষয়ে নিজেদের মধ্যে খেয়োখেয়ি করে, কিন্তু তামিল ভাষা মর্যাদার প্রশ্নে সকলেই সমস্বরে একই দাবি জানায়। কোনও বিরুদ্ধে কণ্ঠস্বর ধ্বনিত হয় না। এবং তামিল ভাষা-সংস্কৃতির স্বাধীনতা হরণ করার মতো সাহসও কোনও বহিঃশক্তির নেই!
একটা কিছু করতে হবে। তার প্রথম প্রয়াস, মাথা ঝাঁকানি দিয়ে উঠে দাঁড়ানো। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র বাঙালিকে ব্যবসায়ে নামতে প্রবৃত্ত করেছিলেন। উৎসাহের সঙ্গে নেমেও পড়েছিলেন অনেকে। তাঁদের বংশধররা সেসব রক্ষা করতে পারেনি। এখন যদি আবার সেরকম একজন আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র নাও পাওয়া যায়, সমবেতভাবে কিছু বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদ বাংলার শিল্প-বাণিজ্যকে উজ্জীবিত করতে পারেন। সেই জন্যই তো তৈরি হয়েছে নগজাগরণ মঞ্চ। অনেক বাধা তো আসবেই, ভেতর ও বাইরে থেকে। বাঙালির একটা অস্ত্র আছে, নিষ্কর্মাদের বিদ্রূপ, তাও বর্ষিত হবে যথেষ্ট, রাঘববোয়ালদের স্বার্থে ঘা পড়লে তারা ধারালো দাঁত দেখাবে, সে সবের বিরুদ্ধে যদি আমরা শক্ত হয়ে দাঁড়াতে না পারি, তা হলে বেঁচে থাকার মানে কী?
আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের চিঠিপত্রের বিনিময় হয়েছিল রাজশেখর বসুকে কেন্দ্র করে। রাজশেখর বসু বিজ্ঞানী হয়েও চলে এসেছিলেন সাহিত্যের অঙ্গনে। ব্যবসা-বাণিজ্য, বিজ্ঞানচর্চার অবশ্যই প্রয়োজন আছে, তা বলে সাহিত্য অবহেলিত হবে কেন? নিজের বিশাল কাঁধে বাংলা সাহিত্য-সঙ্গীত-শিল্পকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিলেন রবীন্দ্রনাথ, কিন্তু তারও তো সঙ্গীসাথীর প্রয়োজন ছিল। অসাধারণ কৌতুকরসের গল্পগুলি ছাড়াও রামায়ণ-মহাভারতের সারানুবাদ ও গীতার প্রাঞ্জল অনুবাদ করে রাজশেখর বসু বাংলার কী উপকারই না করে গেছেন! এখন আর রবীন্দ্রনাথকে পাওয়া যাবে না, সব যুগে ওরকম মানুষ আসে না। কিন্তু ছোট ছোট মাটির প্রদীপ তো আছে অনেক। পাশাপাশি অনেক প্রদীপ জ্বললেও কম আলো হয় না।
পাশাপাশি এসে দাঁড়ানোটাই বড় কথা!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন