সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

পাথুরিয়াঘাটার প্রখ্যাত প্রয়াত প্রসন্নকুমার ঠাকুরের দৌহিত্র নগেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের শখ হয়েছিল, তিনি একটা নতুন মঞ্চ নির্মাণ করে থিয়েটার চালাবেন। নিতান্ত ব্যবসার কারণে নয়, উচ্চাঙ্গের নাটকের অভিনয়, যা ইংরেজদের থিয়েটারের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারবে। এ জন্য তিনি প্রায় নির্বাসন থেকে ফিরিয়ে আনলেন গিরিশচন্দ্রকে।
স্টার থিয়েটার গড়ে তোলার জন্য অভিনেত্রী বিনোদিনীকে শরীর বিক্রয় করতে হয়েছিল। সেই বিনোদিনীকেও এক সময় স্টারের সঙ্গে সংস্রব ত্যাগ করতে হয়। আর গিরিশচন্দ্রও এক সময় তাঁর অতিপ্রিয় স্টারের জন্য মস্তক বিক্রয় পর্যন্ত করেছিলেন। তাঁকেও বিতাড়িত হতে হয় সেই মঞ্চ থেকে। সে সব কাহিনি এখানে অপ্রাসঙ্গিক। অপমানিত গিরিশচন্দ্র থিয়েটারের জগৎ থেকেই দূরে সরে গিয়েছিলেন। কিন্তু মঞ্চ-মায়ায় যিনি একবার আবদ্ধ হয়েছেন, তাঁর পক্ষে কি বেশিদিন এই অভিমান টিকিয়ে রাখা সম্ভব? নগেন্দ্রবাবুর প্রস্তাবে তিনি আবার পাদপ্রদীপের সামনে ফিরে আসতে রাজি হলেন। শুধু নাট্যকার হিসেবেই নয়, অনেক কাল পর তিনি আবার ধরাচুড়ো পরে অভিনয়ও করবেন।
ইংরেজদের সঙ্গে টক্কর দেওয়ার জন্য উপযুক্ত নাটক চাই। তাই অনেক পরিশ্রমে গিরিশচন্দ্র অনুবাদ করলেন শেক্সপিয়রের ম্যাকবেথ-এর মতো শক্ত নাটক। ভাবানুবাদ নয়, একেবারে সাহেব-মেমদের মতো পোশাক পরে, উপযুক্ত সেটে অনুষ্ঠান। গিরিশচন্দ্র স্বয়ং সাজলেন ম্যাকবেথ। নতুন মঞ্চটির নাম মিনার্ভা। সেখানে ম্যাকবেথের প্রথম অভিনয় হয়েছিল ২৮ জানুয়ারি, ১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দ।
তার পর তো এতগুলি বছরে মিনার্ভা থিয়েটার অনেক বিপর্যয়ের মধ্যে দিয়ে গেছে। একবার আগুনে ভস্মীভূত হয়েছিল। তার পরেও জোড়াতালি দিয়ে মাঝে মাঝে চালাবার চেষ্টা হয়েছিল। ইদানীং একেবারেই পোড়োবাড়ির হাল হয়েছিল। সরকারি উদ্যোগে আবার আমূল সংস্কার করে, পুরোনো রূপটি অনেকটা ফিরিয়ে এখন চালু করা হয়েছে। এবং মঞ্চস্থ হচ্ছে শেক্সপিয়রেরই অন্য একটি নাটক, 'কিং লিয়ার'। প্রধান ভূমিকায় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। একশো সতেরো বছর পর পুনর্নির্মিত মিনার্ভাকে জীবন্ত করে তোলার জন্য আবার শেক্সপিয়রেরই নাটক মঞ্চস্থ করা উদ্যোক্তাদের পরিকল্পিত কি না তা জানি না। তবে শুনেছি, রাজা লিয়ারের ভূমিকায় অভিনয় করার শখ সৌমিত্রর অনেক দিনের। অনেক কাল আগে অধ্যাপক সুনীল চট্টোপাধ্যায়ের অনূদিত রূপটিই খানিকটা মাজা-ঘষা করে নেওয়া হয়েছে।
কেমন হয়েছিল গিরিশচন্দ্রের সেই প্রোডাকশন? সেই সময় তিনি হাঁপানিতে ভুগছিলেন। তবু নাকি তিনি সিংহবিক্রমে দাপাদাপি করেছেন মঞ্চে। দেশীয় অনেক জ্ঞানী-গুণী ম্যাকবেথের প্রভূত প্রশংসা করেছিলেন তো বটেই, এমনকী সাহেবদের পত্রিকা 'দি ইংলিশম্যান' পর্যন্ত স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিল যে, বাঙালির এই প্রশংসনীয় উদ্যম ইংরেজদের মঞ্চের সঙ্গে তুলনীয়।
কিং লিয়ারের এই প্রোডাকশন সম্পর্কে এ কালের ইংলিশম্যানরা কী বলছেন জানি না, তবে আমি বা আমার মতো অনেকেই এমনই অভিভূত যে মনে হয়েছে, দেশ-বিদেশের অন্য অনেক শেক্সপিয়র নাট্য প্রযোজনার সঙ্গে মিনার্ভার এই অনুষ্ঠানের তুলনা তো অনায়াসেই করা যায়, এমনকী এটি হয়তো উৎকৃষ্টতর। কী অসাধারণ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয়, কোনও প্রশংসাই যেন যথেষ্ট নয়। এক কালের বাংলা সিনেমার সেই রোমান্টিক প্রেমিক, সত্যজিৎ রায় যাঁকে বহু ভাবে ব্যবহার করেছেন, উত্তমকুমারের পাশাপাশি যাঁর নাম উচ্চারিত হয়েছে, অনেক পথ পেরিয়ে এসে সেই সৌমিত্র এখন বাংলা মঞ্চের রাজা। একের পর এক নাটক মঞ্চস্থ করে যাচ্ছেন, বিভিন্ন আঙ্গিকে। 'হোমাপাখি' কিংবা 'তৃতীয় অঙ্ক, 'অতএব'-এর তুলনায় কিং লিয়ারের ভূমিকায় তাঁর সম্পূর্ণ অন্য রূপ। দার্ঢ্য ও করুণ রস সমানভাবে পাশাপাশি। গিরিশচন্দ্র যখন 'ম্যাকবেথ' করেন তখন তাঁর বয়স ঊনপঞ্চাশ। এরপর তিনি আর বিশেষ কোনও নতুন নাটকে মঞ্চাবতরণ করেননি। আর সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের বয়স এখন ছিয়াত্তর। তবু তাঁর পরিশ্রম করার কী অসীম ক্ষমতা, কত দিকে ছড়িয়ে রেখেছেন নিজেকে।
কিং লিয়ার নাটকে অনেক চরিত্র। শুধুমাত্র নায়কের অভিনয় নৈপুণ্যে এমন নাটক সার্থক হতে পারে না। সে কৃতিত্ব পরিচালক সুমন মুখোপাধ্যায়ের। আমরা আগেই লক্ষ করেছি, (যেমন 'তিস্তাপারের বৃত্তান্ত') মঞ্চে বহু চরিত্রের উপস্থিতি নিখুঁতভাবে চালনা করায় সুমন বিশেষ দক্ষ। এই নাটকেও এত চরিত্র, ইংরেজ ও ফরাসি সৈন্য সমেত। কোথাও তাদের পোশাক ও পদক্ষেপের ভ্রান্তি চোখে পড়ে না। অন্যান্য অভিনেতাও যথেষ্ট পারঙ্গমতা দেখিয়েছেন। সেটটিও চমৎকার।
এই নাটক দেখার পর এ কথাও অবশ্যই মনে আসে, সম্প্রতি যেন বাংলার নাট্যজগতে আবার একটা সোনালি যুগ এসেছে। বছরে একটা দুটোও বাংলা সিনেমা দেখার যোগ্য হয় কি না সন্দেহ। কিন্তু মঞ্চ-নাটকগুলির প্রয়োগ, অভিনয়, শিল্পগুণ অনেক উন্নতমানের। মফসসলের দলগুলিরও অনেক প্রয়াস অভিনব।
এক সময় বাংলার তুলনায় মহারাষ্ট্রের থিয়েটার আন্দোলন অনেকটা এগিয়ে ছিল। এখন যেন সেখানে খানিকটা ঝিমোনো ভাব এসেছে। বাংলার নাট্যজগৎ এখন বেশ চাঙ্গা। প্রবীণদের মধ্যে নান্দীকারের রুদ্রপ্রসাদ ও স্বাতীলেখা এখনও সমান সক্রিয়। সদ্য-প্রয়াত কুমার রায়ের বহুরূপী দলও নতুন নাটক মঞ্চস্থ করে চলেছে। মারীচ সংবাদ-এর অরুণ মুখোপাধ্যায়কেও দেখা যায়, কখনও সখনও। আর বিভাস চক্রবর্তী নিজের দল ছাড়াও অন্য অনেক দলের সার্থক পরিচালক। মেঘনাদ ভট্টাচার্য পরিচালক ও অভিনেতা হিসাবে সার্থক। উষা গঙ্গোপাধ্যায়ের রঙ্গকর্মী-র নতুন নতুন প্রোডাকশন বাংলা বা হিন্দিতে খুবই উল্লেখযোগ্য। ব্রাত্য বসু একই সঙ্গে নাট্যকার, পরিচালক ও অভিনেতা—এই তিন দিকেই প্রতিভার পরিচয় দিয়ে চলেছেন। কৌশিক সেনের প্রযোজনার আঙ্গিক ও তাঁর নিজস্ব অভিনয় আমার খুব প্রিয়। রমাপ্রসাদ একজন পাকা অভিনেতা ও সার্থক নাট্য রূপকার। স্কুলের বাচ্চাদের দিয়ে তাঁর একটি নাটকের অভিনয় দেখতে দেখতে আমি চোখের জল সামলাতে পারিনি। (এই লেখার পর হঠাৎ শুনলাম রমাপ্রসাদ বণিক আর নেই, শুনে আবার আমার চোখের জল আসার উপক্রম হল) 'পূর্ব পশ্চিম' নামের নতুন দলটির পরপর প্রকল্পগুলির একটা দেখলে অন্যগুলিও দেখার অদম্য ইচ্ছে হয়। আরও কত দলের ভালো নাটকের নাম শুনি। সময় করে দেখা হয় না বলে আফশোশ থেকে যায়। অনেকের কথা উল্লেখ করা হল না, বাদ রয়ে গেল। মোট কথা, এ কথা বেশ জোর দিয়ে বলা যায়। এই মুহূর্তে বাংলায় যে বাংলার দু-একটি ব্যাপার নিয়ে গর্ব করতে পারি, তার মধ্যে নাট্য আন্দোলনের স্থান অবশ্যই প্রথমে।
এলেবেলে খেলুড়ে
কৌশিক বসু একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অর্থনীতিবিদ। কিছু দিন আগে তিনি আমেরিকার কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করতেন। এখন ভারত সরকারের অর্থ মন্ত্রকের প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা। তাঁর একটি গ্রন্থের নাম ‘The Retreat of Democracy’-এর প্রথম অধ্যায়টির নাম ‘Ele Bele, The Subversion of Democracy’ এই ‘Ele Bele, কিন্তু কোনও ল্যাটিন শব্দ নয়, কথ্য বাংলায় এলেবেলে। প্রসঙ্গটি বেশ মজার। ছেলেবেলায় যখন আমরা কয়েকজন মিলে কোনও খেলা করতাম, তখন অন্তরঙ্গ কয়েকজন খেলার সঙ্গী ছাড়া অন্য কেউ এসে যোগ দিলে কিংবা অন্য কাউকে চাপিয়ে দেওয়া হলে তা আমাদের মোটেও পছন্দ হত না। ধরা যাক, আমাদের কোনও মাসি বেড়াতে এসেছেন তাঁর ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে। গুরুজনেরা বলতেন, সেই ছেলেকেও আমাদের খেলার মধ্যে নিতে হবে। আমরা নিতে বাধ্য হতাম। কিন্তু বন্ধুদের মধ্যে চোখে চোখে কথা হয়ে যেত—ও আছে বটে, কিন্তু ধতর্ব্যের মধ্যে নয়, ও এলেবেলে। তেমনই অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থা, বিশ্বের অনেক দেশের মতামত নিয়ে যেখানে নীতি নির্ধারণ করার কথা, সেখানে আসল কলকাঠি নাড়ে কয়েকটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের একটা ছোট গোষ্ঠী। বাকিরা সবাই এলেবেলে। আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও বাণিজ্য নীতির ক্ষেত্রে আসল খেলুড়ে মাত্র কয়েকটি, এলেবেলের সংখ্যাই অনেক বেশি।
অরণ্যের রাজবাড়ি
''আমাকে যেমন বলা হল, তেমনই স্নানের সময় কোমরে গামছা জড়িয়ে খালি পায়ে লাফাতে লাফাতে বাথরুমে ঢুকলাম। এখন হয়েছে কি, বাথরুম থেকে বেরিয়ে কুয়োতলা যাবার পথে একটা তারে ধোওয়া-জামাকাপড় মেলা ছিল। আমাকে আসতে দেখেই পিসিমা কোনও কথা না বলে একটি লাঠির ডগা দিয়ে ধোওয়া জামাকাপড়গুলি উঁচু করে, আমার মাথায় যাতে না লাগে সেইরকম করে তুলে ধরলেন।
'' 'ও হো, স্নান না করে ধোওয়া জামাকাপড় তো ছোঁওয়া চলবে না'—তাই না? আমি হাসতে হাসতে পিসিমাকে এই কথা বলতে পিসিমাও হাসতে হাসতে জবাব দিলেন...''
এই উদ্ধৃতি পাঠ করলে কি একটু বোঝার উপায় আছে যে, এর লেখক বাংলাভাষী নন, দূর বিদেশি? আসলে 'অরণ্যের রাজবাড়ি' নামের গ্রন্থটি রচনা করেছেন জাপানের অধিবাসী শ্রীনাওকি নিশিওকা। তিনি জাপানি ভাষারও একজন সুখ্যাত লেখক ও গবেষক। শান্তিনিকেতনে যাওয়া আসার সূত্রে বাংলা শেখা। এমন স্বচ্ছ, সাবলীল গদ্যে তাঁর রচনা অত্যন্ত উপভোগ্য।
ইদানীং কালে বেলজিয়ান পাদ্রি ফাদার দ্যতিয়েনের 'ডায়েরির ছেঁড়া পাতা'য় অত্যন্ত রসমাধুর্য পূর্ণ বাংলা গদ্য লিখে আমাদের মুগ্ধ করেছেন। ফাদার দ্যতিয়েনকে তাঁর শেষ বয়সে, এ বছরই রবীন্দ্র পুরস্কার দেওয়াটা একটা পুণ্য-কাজ হয়েছে। নাওকি নিশিওকা-র মতো বাংলা গদ্য অনেক বাঙালি লেখকের কাছেই ঈর্ষণীয় মনে হবে। এই বইয়ের পাঁচটি রচনা অনেকটা ছোট গল্প আর ভ্রমণ অভিজ্ঞতার সংমিশ্রণ। অতি সাধারণ মানুষজনকেও তিনি বড় মায়াময় দৃষ্টিতে ফুটিয়ে তুলেছেন। সত্যি, এটি বাংলা ভাষার একটি 'অতি' উল্লেখযোগ্য বই।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন