সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

দিল্লি থেকে ঢাকার দূরত্ব অনেক, কিন্তু কলকাতা থেকে খুব কাছে।
আন্তর্জাতিক, রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ইত্যাদি যাবতীয় সম্পর্ক ঢাকার সঙ্গে দিল্লির, কলকাতার সঙ্গে কিছুই না। দিল্লির সরকারের চোখে বাংলাদেশ দ্বিখণ্ডিত পাকিস্তানের একটি নতুন দেশমাত্র কিন্তু কলকাতা বা পশ্চিম বাংলার পক্ষে সে ভাবে বাংলাদেশকে দেখা কোনওক্রমেই সম্ভব নয়। পশ্চিম বাংলার অসংখ্য অধিবাসীর চোখে বাংলাদেশ এখনও প্রাক্তন জন্মভূমি কিংবা পিতৃ-পিতামহের স্মৃতি বিজড়িত স্থান। বাংলাদেশের কিছু লোক যদি সীমান্ত পার হয়ে এদিকে আসতে চায়, তাহলে দিল্লির সরকারের চোখে সে ঘটনা হবে বিদেশি নাগরিকদের বে-আইনি অনুপ্রবেশ, আর এখানকার অনেকের কাছে তা বিপন্ন আত্মীয়স্বজনদের আশ্রয়লাভের চেষ্টা। বিলেতে ভারতীয়দের অবাধ গমন বন্ধ হলে আমরা বিরক্ত হই, আবার বাংলাদেশের নাগরিকরা ভারতে বসবাস করতে চাইলেও অনেক বিরক্ত হন।
বাংলাদেশ আমাদের এত কাছে, কিন্তু সেখানকার খবর আমরা সবচেয়ে কম জানি। আমাদের সংবাদপত্রগুলিতে আমেরিকা, ব্রিটেন, রাশিয়া, চিন সম্পর্কে যত খবর ছাপা হয়, তার চেয়ে অনেক কম ছাপা হয় বাংলাদেশ সম্পর্কে। খবরের অভাব অনেক সময় ভুল ধারণার সৃষ্টি করে। বাংলাদেশের যে খবর এখানে ছাপা হয়, তা শুধুই নৌকাডুবি, দুর্ভিক্ষ, খুন, রাজনৈতিক পালাবদল এবং সীমান্তে গুলি। অর্থাৎ মনে হতে পারে যেন এই গুলি বাদ দিয়ে বাংলাদেশে কোনও স্বাভাবিক জীবন নেই, কিংবা সেখানে কোনও সুস্থ, সাংস্কৃতিক ঘটনা ঘটে না। ঘটে, আমরা জানতে পারি না। এরই পরিপূরকভাবে বাংলাদেশের সংবাদপত্রগুলিতে ছাপা হয় শুধু ভারতের দাঙ্গার খবর, খেলা, বন্যা বা রাজনৈতিক কেলেঙ্কারির সংবাদ। বাংলাদেশের টেলিভিশন রাত্রের সংবাদের শেষে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের রাজধানীর উল্লেখযোগ্য ক্রিয়াকলাপের কথা বলা হয়, লন্ডন, রোম, টোকিও-র খবর নিয়মিত থাকে, দিল্লির উল্লেখ হয় অতি কদাচিৎ। কলকাতার তো প্রশ্নই ওঠে না।
বাংলাদেশের সংবাদপত্রগুলিতে ভারতের দাঙ্গার উল্লেখ ফলাও করে থাকে। একথা ঠিক সম্প্রতি গত এক বছর ধরে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার মতন কুৎসিত ব্যাপার আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। আলিগড়, জামসেদপুরের ঘটনা শুধু লজ্জার নয়, গভীর শোকের। বাংলাদেশের পত্র-পত্রিকায় এই সংবাদ ছাপার মধ্যে এরকম মনোভাব ফুটে ওঠে যে বাংলাদেশে তো ইদানীং আর দাঙ্গা হয় না। ভারতে হয় কেন? বাংলাদেশে যে এখন আর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয় না, সেটা অত্যন্ত প্রশংসার বিষয়। পাকিস্তানেও দাঙ্গা হয় না এমনকী লন্ডনেও হিন্দু মুসলমান দাঙ্গা হতে পারে কখনও, কিন্তু পাকিস্তানে আর কোনওদিন হবে না। দাঙ্গা সেখানেই হয়, যেখানে দুটি পক্ষ থাকে। ভারতের মতন বিশাল দেশে, আদিবাসী বনাম উচ্চবর্ণ, পার্বতী-সমতলবাসী, এক প্রদেশি—অন্য প্রদেশি, হিন্দু-মুসলমান, এমনকী শিয়া-সুন্নির মধ্যেও হানাহানি হয়। ভারতের বর্তমান সরকার দুর্বল বলেই এরকম কু-ঘটনা ঘটতে পারছে। বাংলাদেশে সংখ্যালঘুরা এখন অতি সংখ্যালঘু এবং নির্জীব। বাংলাদেশের সরকার সবল, তবু এক শ্রেণির লোক সে দেশ ছেড়ে অনবরত চলে আসতে বাধ্য হচ্ছে। বাংলাদেশের হিন্দুরা ভারতের দিকে এক পা উঁচিয়ে আছে, এরকমই ওখানে গ্রামের দিকের অনেক লোকের ধারণা, এবং অনেকটা সত্যও বটে। অধিকাংশ পরিবারেরই ছেলেমেয়েদের পাঠিয়ে দেওয়া হয় ভারতে, বুড়োবুড়িরা জায়গা আঁকড়ে পড়ে আছে। সেই বুড়োবুড়িদের প্রস্থান ত্বরান্বিত করার জন্য যে সুযোগ সন্ধানীদের চেষ্টার কোনও ত্রুটি নেই, এটা একটা বাস্তব ঘটনা। কিংবা এর নাম ইতিহাসের নিয়তি। এ ব্যাপার রোধ করার ক্ষমতা ভারত বা বাংলাদেশ সরকারের আছে কি না কে জানে, অথবা সেই জন্যই দু-সরকার এই ব্যাপারে কিছু না জানার ভান করে থাকাই শ্রেয় মনে করেন। এর ফলে সবচেয়ে ভারগ্রস্ত হচ্ছে অবশ্য পশ্চিম বাংলা।
বাংলাদেশের একজন প্রবীণ সংবাদ ভাষ্যকার বলেছেন যে ইতিহাসে দেখা যায়, ইসলাম হয় কোনও রাজ্যে পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে অথবা সেখান থেকে হটে এসেছে। যেমন হটে এসেছিল স্পেন থেকে। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর মুসলমান সংখ্যাধিক্য নিয়েও ধর্মসহিষ্ণু রাষ্ট্র পরিচালনার পরীক্ষা হয়েছিল তা ব্যর্থ হয়েছে অনেকখানি। ভারতে ধর্মনিরপেক্ষ শাসন প্রবর্তিত হওয়ার পর তাতে কখনও একটু আধটু চিড় ধরলেও কখনও ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়নি। তা হলে, ভারত ইতিহাসে ব্যতিক্রম। মধ্যপ্রাচ্যের প্রবল ধর্মীয় জিগির সম্পন্ন রাষ্ট্র চালনার যে জোয়ার এসেছে, পাকিস্তানও যা গ্রহণ করল, বাংলাদেশেও তার ছোঁয়াও লেগেছে কিছুটা। বাংলাদেশের পত্র-পত্রিকা পড়লে বোঝা যায় যে, বাংলাদেশের মুক্তি যুদ্ধের যারা বিরোধিতা করেছিল, যারা পাকিস্তানের সমর্থক ছিল, তারা অনেকে এখন ফিরে এসেছে শাসন ক্ষমতায়। রাষ্ট্রপতি জিয়া নিজে অবশ্য একজন বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক নির্বাচনের পর কিছুটা গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে শাসন ব্যবস্থা চালু হয়েছে। ভারতে আমরা যেরকম গণতান্ত্রিক নির্বাচনের কথা জানি, বাংলাদেশে সেরকম হয়নি, সেখানে নির্বাচন হয় সামরিক শাসনের আওতায়। তবু, নতুন শাসন ব্যবস্থায় অনেক সুফল দেখা যাচ্ছে। সরকার বিরোধীপক্ষ পাচ্ছেন, মতামত প্রকাশের সুযোগ, আইন শৃঙ্খলার উন্নতি হয়েছে। ঢাকা শহরের চেহারা আগের চেয়ে অনেক পরিচ্ছন্ন ও শোভন। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে, যদিও নিয়ন্ত্রণের আইনগুলি রদ করা হয়নি এখনও। ভারতীয় মুদ্রার তুলনায় বাংলাদেশের টাকার মূল্য কম কেন, এই নিয়ে প্রশ্ন আছে ওখানকার অনেকের মনে। তবে ভারতের তুলনায় বাংলাদেশে সোনার দামও প্রায় দ্বিগুণ।
বাংলাদেশের একটি চিত্র এদিকে অনেকের কাছেই অজানা। বাংলাদেশের যুব সম্প্রদায়ের মধ্যে শিল্প, সাহিত্য, মুক্ত বুদ্ধি ও চিন্তায় যেন একটি নব জাগরণ এসেছে। ভারতীয় দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েই পুরোপুরি না দেখে যদি বাঙালি দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দেখা যায়, তাহলে মনে হবে, বাংলাদেশ ও পশ্চিম বাংলার যুব সমাজের মধ্যে যথেষ্ট মানসিক মিল আছে। সেখানে ধর্মের চেয়েও ভাষা ও সংস্কৃতির যোগসূত্র অনেক বড় কথা। পশ্চিম বাংলার বইপত্র চোরাচালান হয়ে বাংলাদেশে কিছু যায়, সেই তুলনায় বাংলাদেশের বই পশ্চিম বাংলায় খুব কম আসে। আমার মনে হয়, একতরফাভাবেই বাংলাদেশের বইপত্র পশ্চিম বাংলায় অবাধে আসার ব্যবস্থা করা উচিত। এ ব্যাপারে ভারত সরকারের কোনওরকম মাথাব্যথা না থাকতে পারে, কিন্তু পশ্চিম বাংলার সরকার ভেবে দেখতে পারেন।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন