সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

আমরা আর পিছোতে পিছোতে কতটা পিছোব? বাংলা ভাষার অবমাননা দেখতে দেখতে আমরা আর কতখানি কাপুরুষের মতন অসহিষ্ণু হব?
কলকাতা শহরে এমন অনেক দোকান আছে, এমন অনেক হোটেল আছে, যেখানে বাংলায় কথা বলা যায় না, বাংলায় কিছু জিগ্যেস করলেও উত্তর পাওয়া যায় না। এমন বহু-অফিস আছে, যেখানে বাংলায় চিঠি কিংবা দরখাস্ত লেখার প্রশ্নই ওঠে না। আমরা সারা বিশ্বে বাংলা ভাষার কেমন সমাদর তা নিয়ে মাথা ঘামাই, অথচ খোদ কলকাতা শহরেই বাংলা ভাষার এই দুর্দশা। চিন-রাশিয়ার কথা তো বলাই বাহুল্য, বুলগেরিয়া কিংবা রোমানিয়ার মতন ছোট্ট দেশেও সেখানকার স্থানীয় ভাষায় সর্বোচ্চ স্তরে মত বিনিময় করা যাবে না, এমন ভাবাই যায় না। এবং আমাদের পাশের দেশ বাংলাদেশেও।
বিশ্বের প্রধান ভাষাগুলির মধ্যে বাংলার স্থান ষষ্ঠ, জনসংখ্যার হিসেবে ফরাসি স্প্যানিশেরও ঊর্ধ্বে, সেই বাংলা আজ যতখানি বরণীয় বাংলাদেশে, ততখানিই অবহেলিত ভারতে।
দিল্লি-বোম্বাই-এলাহাবাদ-কাশী-পাটনার বাঙালি ছেলেময়েরা এখন আর কেউ বাংলা পড়ে না। কারণ বাংলা শেখার সঙ্গে জীবিকার যোগ নেই। ওইসব জায়গায় প্রচুর ছেলেমেয়েকে দেখেছি, যারা কোনওক্রমে বাংলায় কথা বলতে পারে বটে, কিন্তু বাংলা অক্ষরজ্ঞান নেই। বাংলা বই পড়ে না, বাংলা গান শোনে না। বিলেত-আমেরিকায় যেসব বাঙালি পরিবার এক যুগের বেশি
স্থায়ী হয়ে গেছে, তাদের ছেলেমেয়েরা আর বাঙালি রইল না বলে আমরা হা-হুতাশ কিংবা হাসিহাসি করি, কিন্তু আমাদের নিজের দেশেও তো প্রায় সেই অবস্থা। এমনকী কলকাতা শহরেও। এই শহরে যেসব লম্বা লম্বা আট-দশতলা বাড়ি উঠেছে, তার যে-কোনও বাড়ির লিফট দিয়ে উঠতে উঠতে বাঙালি ছেলেমেয়েদের মুখে বাংলা শোনা যাবে না। হয় ট্যাঁশ ইংরেজি অথবা একটা জগাখিচুড়ি ভাষা। মাতৃভাষা না জানাটা যে একটা লজ্জার ব্যাপার, সেটা বোধটাই চলে যাচ্ছে একটা প্রজন্ম থেকে। দোষ এইসব ছেলেমেয়েদের নয়, তাদের মা-বাবাদের। শিক্ষানীতির। আমাদের শাসকদের সম্মানজ্ঞানের অভাবও এর একটি কারণ। বাংলা মাধ্যম স্কুলগুলির এখন দুয়োরানির ছেলেমেয়েদের মতন অবস্থা। নেহাত বাধ্য না হলে নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের বাচ্চাদেরও এখন পাড়ার বাংলা স্কুলে পাঠানো হয় না। যেসব বাবা-মায়েরা নিজেরা বাংলা স্কুলে পড়েছে এবং জীবনে খুব একটা খারাপ কিছু করেনি, তারাও ছেলেমেয়েদের এখন কিছুতেই বাংলা স্কুলে পাঠাবে না। একটু ভালো চাকরির ক্ষেত্রে ফুরফুর করে ইংরেজি বলতে পারাটাই প্রাথমিক যোগ্যতা। নিয়োগকারীরা প্রথমেই দেখে নেয় প্রার্থী কোন স্কুলে পড়াশুনো করেছে। সেন্ট জেভিয়ার্স? ঠিক আছে। তীর্থপতি? মাস্টারির চেষ্টা করুন! আমাদের রাজ্য সরকার, কংগ্রেস বা বামপন্থী, মাঝে-মাঝেই হুঙ্কার ছাড়ে, এবার থেকে সব সরকারি কাজ বাংলায় হবে! আসলে কিচ্ছু হয় না! বিধানচন্দ্র রায় পরপর তিনটি বাক্য শুদ্ধ বাংলায় বলতে পারতেন না। সিদ্ধার্থ রায়ের মুখে বাংলা সাহিত্য সম্পর্কে কয়েকটি উক্তি শুনে আমার পক্ষে হাসি চাপা শক্ত হয়েছিল। জ্যোতি বসু অসমাপ্ত বাক্যে বাংলা বক্তৃতা বেশ ভালোই চালিয়ে যান, তিনি বাংলা লিখতে পারেন কি না তা বলতে পারবেন তাঁর ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা। আমাদের নকশাল বন্ধুদেরও ধন্যবাদ। সত্তরের দশককে মুক্তির দশক করার উন্মাদনায় তাঁরা কিছু কিছু বাংলা স্কুল পুড়িয়ে দিলেন, মফস্সলের বহু স্কুলের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে গেল, ইংরেজি-মাধ্যম স্কুলগুলিকে নকশালরা স্পর্শও করলেন না। সেই থেকে অভিভাবকরা ছেলেমেয়েদের হাত ধরে পাগলের মতো ছুটতে লাগলেন ইংরেজি স্কুলগুলির দিকে। ব্যাঙের ছাতার মতন সেইরকম স্কুল গজাতেও লাগল। যাওয়া-আসার পথে দেখতে পাই কোনও বিখ্যাত স্কুলের আশপাশের রাস্তার ফুটপাথে-রকে-গ্যারেজে দুপুর রোদে বসে থাকেন মহিলারা, বহুদূর থেকে ছেলেমেয়েকে সেই স্কুলে পৌঁছে দিয়ে ফিরে না-গিয়ে, আবার বিকেল বেলা সন্তানদের সঙ্গে নেবার জন্য অপেক্ষা করেন। এইরকম হাজার হাজার মাকে পথে বসিয়েছে আমাদের শিক্ষানীতি। রাষ্ট্রভাষা প্রসারের ছুতোয় হিন্দি ভাষাকে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে জোর করে। হিন্দি শিখলে ক্ষতি নেই, যে-কোনও ভাষা শিক্ষাই সুফল দেয়, কিন্তু জোর করে চাপানো ভাষা কেউ গ্রহণ করে না। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙার অন্যতম কারণ যে অঙ্গ রাজ্যগুলির ওপর রুশ ভাষার জবরদস্তি, তা আমাদের কত্তারা খেয়াল করেন না।
হিন্দি ভাষা ও সংস্কৃতি ও বোম্বাই মার্কা হিন্দি সিনেমা এক নয়। হিন্দি ভাষার ভালো দিকগুলি জানবার আগেই হিন্দি সিনেমার বিকট সংস্কৃতি চেপে বসল আমাদের ওপর। খারাপ টাকা যেমন ভালো টাকাকে বাজার থেকে তাড়িয়ে দেয়, তেমনই বিকৃত রুচির হিন্দি সিনেমা ভালো বাংলা সিনেমাকে একেবারে নির্মূল করছে। সত্যজিৎ-মৃণাল-গৌতম-বুদ্ধদেবের নাম টানার দরকার নেই, পঞ্চাশটা বাংলা ফিল্মের মধ্যে একটি-দুটির বেশি দেখার যোগ্য নয়। ষাটের দশক পর্যন্ত বেশ কিছু পরিচ্ছন্ন বাংলা ছবি তৈরি হত, মহৎ কিছু না হলেও বেশ উপভোগ্য। সেসব বাংলা ছবি গেল কোথায়? গত তিরিশ বছর ধরে কুৎসিত হিন্দি ফিল্মগুলো প্রবল দাপটে এমনকী গ্রামের দর্শকেরও রুচি নষ্ট করে দিয়েছে। এখন আত্মসম্মান জ্ঞানহীন একদল লোক হিন্দির অনুকরণে আরও খারাপ ফিল্ম তৈরি করে। চোখের সামনে আমরা বাংলা ফিল্মের সুস্থ ঐতিহ্য নষ্ট হতে দিয়েছি। মৃণাল-গৌতম-বুদ্ধদেবকেও এখন বাধ্য হয়ে হিন্দি ভাষায় ছবি বানাতে হয়।
বাংলা-ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর নবতম আক্রমণ চলেছে টিভি-তে। দূরদর্শন নামটা আক্ষরিক অর্থে সত্যি নয়, রুপালি পরদার ছায়াছবি এখন এসে পড়েছে ঘরের মধ্যে, নিজের বিছানায় বসে অপরের বেডরুম সিন দেখা যায়। ইচ্ছে থাক বা না থাক, টিভি দেখতেই হয়। অল্পবয়সি ছেলেমেয়ে ও বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের তো অবশ্য দ্রষ্টব্য। বাড়িতে একটা টিভি সেট রাখা সামাজিক সম্মানের ব্যাপার হয়ে গেছে। নিম্ন মধ্যবিত্ত বাড়ি, এমনকি বস্তিতেও দেখা যায় টিভি অ্যান্টেনা। এখন ছেলেমেয়েরা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়তে যায়, বাড়িতে হিন্দি অনুষ্ঠান দ্যাখে। বাংলার স্থান কোথায়?
দূরদর্শনে প্রথম থেকে আঞ্চলিক কার্যক্রম ও রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম নামে দুটি ব্যাপার ছিল। রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম মানেই হিন্দি বা ইংরেজি। তারপর এল দ্বিতীয় চ্যানেল, যার পুরোপুরি সময়টাই আঞ্চলিক ভাষার প্রাপ্য। কিন্তু তার মধ্যে হিন্দি খবর শোনা ছিল বাধ্যতামূলক! বাংলা-ইংরেজি-হিন্দি খবরের মধ্যে বিশেষ হেরফের নেই। যার যেটা খুশি শুনবে। কিন্তু বাংলা খবর শুনে যে সবকিছু জেনে নিয়েছে, সে হিন্দি বা ইংরেজি সংবাদও শুনতে কেন বাধ্য হবে? এখন কী একটা উদার নীতি না খোলা নীতির ব্যাপার চলছে, যার ফলে দ্বিতীয় চ্যানেল থেকেও বাংলা প্রায় উধাও! টিভি খোলা থাকলেই দেখা যায় হিন্দি ফিল্মে গানের দৃশ্য, একইরকমের হুটোপুটি নাচ, যৌন আবেদন জাগাবার চেষ্টায় নিকৃষ্টতম অঙ্গভঙ্গি। শিল্পরুচির কোনও চিহ্ন নেই। বাংলার সংগীত শিল্পী, বাংলার নাট্যদল, বাংলার ধারাবাহিক নির্মাতারা রক্তাল্পতায় ভুগছে, ক্রমশ পিছিয়ে যাচ্ছে।
এই অবস্থা আমরা কতদিন সহ্য করব? নাঃ, আবেদন-নিবেদনে আর আমার কোনও বিশ্বাস নেই। পশ্চিম বাংলার দলমত নির্বিশেষে এখনই যদি আমরা সবাই এক সঙ্গে প্রতিরোধে না নামি, তাহলে এই অধোগতির আর কোনও সীমা থাকবে না। আমাদের প্রতিবেশী বাংলাদেশই বাংলা ভাষা-সংস্কৃতির পূর্ণ উত্তরাধিকার নিয়ে নেবে, পশ্চিমবঙ্গ থেকে তা মুছে যাবে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন