সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

পাঞ্জাবের অমৃতসর শহরে, শিখদের অতি পবিত্র স্বর্ণমন্দিরের কাছেই জালিয়ানওয়ালাবাগ উদ্যান। সব শহরেই এরকম দু-চারটে পার্ক থাকে। জালিয়ানওয়ালাবাগের দৃশ্যত আলাদা কোনও বৈশিষ্ট্য নেই, তবু সারা ভারতের মানুষ এই বাগানটির নাম জানে (না, সব মানুষ নয়, শিক্ষিত শ্রেণির কিছু, এবং স্থানীয় লোকজন।) তার কারণ, ব্রিটিশ রাজত্বে নানান কুকীর্তির মধ্যে এই উদ্যানে এক দিনের ঘটনা অতি কলঙ্কের ইতিহাস হয়ে আছে আজও দগদগ করে।
সে ইতিহাস বিস্তৃত ভাবে বলার দরকার নেই, বর্তমানের প্রসঙ্গ রবীন্দ্রনাথ। সংক্ষেপে এইটুকু বলা যায়, প্রথম মহাযুদ্ধ শেষ হয়েছে। বহু পাঞ্জাবি সৈনিক ইংরেজদের পক্ষ নিয়ে প্রাণ দিয়েছে সেই যুদ্ধে। যুদ্ধ চলার সময় ভারতে স্বায়ত্তশাসনের টোপ দেওয়া হয়েছিল। যুদ্ধ শেষে সেসব আর উচ্চারণও করে না শাসকরা। বিক্ষুব্ধ, অশান্ত পাঞ্জাবে চলছে ধরপাকড়, গ্রেফতার হয়েছেন গান্ধিজি, অমৃতসরে সবরকম জনসমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এরই মধ্যে, এপ্রিলের ১৩ তারিখ (১৯১৯ সাল) বৈশাখী পূর্ণিমা, গ্রাম থেকে দলে দলে মানুষ আসে শহরে, তারা ওই সব ১৪৪ ধারা-টারার কথা জানে না। তারা অনেকেই এসে জড়ো হয়েছে ওই পার্কে, একটা মঞ্চও বাঁধা হয়েছে। পার্কটা এমনই যে বাইরে থেকে দেখা যায় না, দুপাশের বাড়ির মধ্য দিয়ে একটা সরু প্রবেশ পথ, চার দিকে বড় বড় বাড়ি ও দেওয়াল, বেরোবার রাস্তাও ওই একটাই। হঠাৎ এক সময় জেনারেল ডায়ার নামে এক বীরপুঙ্গব তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে এসে ওই পথটা আটকাল। জনতাকে ছত্রভঙ্গ হওয়ার জন্য কোনও সাবধানবাণীও উচ্চারিত হল না, হুকুম দিল গুলি চালাবার। সেই বীভৎস দৃশ্য কল্পনা করাও শক্ত, প্রতিবাদহীন, নিরস্ত্র, নিরিহ মানুষ, নারী, শিশু, বৃদ্ধ তাদের খুন করতে পারে মানুষই? কান্না, আর্ত চিৎকার, হুড়োহুড়ির মধ্যে সরকারি হিসেবেই মৃত্যু হয় ৩৭৯ জনের। আহত কয়েক হাজার। বেসরকারি মতে, মৃত্যুর সংখ্যা অনেক বেশি। সৈন্যদের বন্দুকের গুলি ফুরিয়ে গিয়েছিল বলেই তারা সবাইকে হত্যা করতে পারেনি।
ব্রিটিশ সরকারের এমন বর্বরতার কাহিনি সারা দেশ জানতে পারেনি, কারণ তখন সমস্ত সংবাদপত্রে কঠোর ভাবে সেন্সরশিপ জারি ছিল। ক্রমশ প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণে কিছু কিছু তথ্য নেতাদের কানে আসে। কিন্তু তাঁরা তখনই কোনও প্রতিবাদ-আন্দোলন করতে দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন, কারণ তখন ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে কিছু কিছু ক্ষমতার দরাদরির সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল।
রাজনৈতিক নেতারা আবেগে চালিত হন না। কিন্তু এক কবিকে এই ঘটনা দারুণ ভাবে বিচলিত করেছিল। রবীন্দ্রনাথ তখন গান্ধিজি ও চিত্তরঞ্জন দাশকে এর প্রতিবাদের প্রস্তাব দিয়েছিলেন, ওঁরা এড়িয়ে যান। এক নিদ্রাহীন রাত্রির পর রবীন্দ্রনাথ নিজেই এককভাবে জ্বলন্ত ভাষায় প্রতিবাদ জানিয়ে জরুরি চিঠি পাঠান ভারতের বড়লাটকে, তাঁর নাইটহুডও ফিরিয়ে দেন।
হঠাৎ এত দিন পর এই প্রসঙ্গ কেন? এখন রবীন্দ্রনাথের জন্মের দেড়শো বছর উপলক্ষে নানান অনুষ্ঠান হচ্ছে সারা দেশ জুড়ে। তারই অঙ্গ হিসেবে একটি কবি-সম্মেলনের আয়োজন করা হয় ওই জালিয়ানওয়ালাবাগ উদ্যানের মধ্যেই ম্যারাপ বেধেঁ। সারা দেশ থেকে নানান ভাষার কবিদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল, কলকাতা থেকে গিয়েছিলেন অমিতাভ চৌধুরী। প্রতিবাদ নয়, রবীন্দ্রনাথের প্রতি কবিদের শ্রদ্ধাঞ্জলি। সাহিত্য অকাদেমির এই পরিকল্পনা খানিকটা অভিনব তো বটেই।
প্রথম দিনের অনুষ্ঠান শেষে ফেরার সময় একটা তথ্য দেখে আমি চমকে উঠলাম। সেই বৈশাখী পূর্ণিমার দিনে, নারকীয় তাণ্ডবের মধ্যে একজন বাঙালিও ছিলেন! তাঁর নাম ডাক্তার ষষ্ঠীচরণ মুখোপাধ্যায়, গুলি চালনার সময় তিনি কোনওক্রমে মঞ্চটার তলায় ঢুকে পড়ে প্রাণে বেঁচে যান। পরে তিনি ওই উদ্যানটিতে নিহতদের স্মৃতিরক্ষা ব্যবস্থায় অগ্রণী হয়েছিলেন। ওঁরই বংশধর সুকুমার মুখোপাধ্যায় এখনও সপরিবারে ওই পার্কের প্রবেশ পথের ধারেই এক বাড়িতে থাকেন, একতলার একটি ঘরে একটা সংগ্রহশালাও চালাচ্ছেন।
এইসব দেখতে দেখতে আমার এক সঙ্গী সবিস্ময়ে বলে উঠল, বাঙালি কোথায় নেই?
ঠিক। তবে, এই কথাটা শুনলেই আমার মনে হয়, বাঙালি এখন কোথায়?
কবিতা লেখার জন্য কারাগারে
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর কেটে গেল তেষট্টি বছর। এই স্বাধীনতা অর্জনের জন্য কত মানুষ আত্মত্যাগ করেছে, সেসব এখন ইতিহাস। অনেকে ইতিহাসেও স্থান পাননি। আন্দামানের জেলে ১৬০০ রাজবন্দির নাম দেখেছি, তাঁদের ক'জনের কথা লোকে মনে রেখেছে? মনে রাখা স্বাভাবিকও নয়।
কিন্তু কবিতা লেখার জন্য যাঁদের কারাবরণ করতে হয়েছিল, তাঁদের কথা একেবারে ভুলে যাওয়া অন্তত সাহিত্যজগতের পক্ষে অনুচিত। বাঙালিদের মধ্যে সেরকম ক'জন ছিলেন তার একটি তালিকা প্রস্তুত করার ভার কি কেউ নেবে?
সেরকমই এক জনের নাম দয়াল কুমার, এ বছর তাঁর জন্মশতবর্ষ। তাঁর কাব্যগ্রন্থ 'বিংশ শতাব্দী' বাজেয়াপ্ত হয়েছিল এবং '১৯০৮ আর ১৯৩১' শীর্ষক একটি কবিতার জন্য তিনি কারারুদ্ধ হয়েছিলেন তিরিশের দশকে। তার পরেও তিনি কয়েক বার জেল খেটেছেন, এমনকী দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও।
দয়াল কুমার প্রায় সারা জীবনই ছিলেন রাজনীতির সঙ্গে বিশেষ ভাবে জড়িত। দেশ সেবার আদর্শে তিনি প্রথম দিকে ছিলেন গান্ধিজির প্রতি আকৃষ্ট, তারপর সাম্যবাদী আর কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য। চুঁচড়োয় বাড়ি, তিনি ছিলেন সেই অঞ্চলের সকলের পরিচিত দয়ালদা। তাঁর পরিবারটি ছিল সেকালের কমিউনিস্টদের একটি আর্দশ প্রতিচ্ছবি। তাঁর স্ত্রী মুক্তাও ছিলেন সমাজকর্মী, ছেলেমেয়েদেরও রাজনীতির সংস্পর্শ থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়নি। দারিদ্র ছিল নিত্যসঙ্গী। বিষয় ভোগ কিংবা ক্ষমতার লোভ এইসব মানুষের মধ্যে সামান্যতম স্থানও পেত না, বরং দারিদ্র্য নিয়ে অহংকার ছিল। নজরুল ইসলামের লেখা—'হে দারিদ্র তুমি মোরে করেছো মহান'—অনেকে জীবন দিয়ে বিশ্বাস করতেন। অভাবে সংসার, অনেকগুলি ছেলেমেয়ে, তবু স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসেবে যখন ভারত সরকার তাঁকে পেনশন ও তাম্রপত্র দিতে চায়, তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।
দয়াল কুমার ছিলেন নজরুল ইসলামের খুব ভক্ত, সেই ধারারই কবি। এ কালের দৃষ্টিভঙ্গিতে তাঁর রচনাগুলি কতটা স্লোগানধর্মী আর কতটা কাব্যরসসম্পৃক্ত, তা নিয়ে মতভেদ হতেই পারে। কিন্তু এমন মানুষের জীবন অবশ্যই এখনও স্মরণীয়।
এবং অধৃষ্য কুমার
দয়াল কুমারের এক সন্তান তাঁর বাবার আদর্শকেও ছাড়িয়ে নকশালপন্থী নেতা হয়ে ওঠেন সেই ষাট-সত্তরের দশকে। ধরা পড়ে জেলও খেটেছেন। পরিচিতরা অনেকেই তাঁর নাম বলতেন, এখনও বলেন, অদৃশ্য কুমার। শুনলেই মনে হয় ছদ্মনাম। কিংবা কোনও রোমহর্ষক ডিটেকটিভ গল্পের প্রতিনায়ক। তা কিন্তু নয়, কুমার এঁদের পারিবারিক পদবি, প্রথম নামটি অদৃশ্য নয়, অধৃষ্য। সংস্কৃতগন্ধী হলেও এটা একটা বাংলা শব্দ, কেন না বাংলা অভিধানে স্থান পেয়েছে। এর অর্থ, যাকে দমন করা যায় না।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন