বাংলা ভাষার আত্ম-পরিচয়

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

পৃথিবীর জনসংখ্যা এখন ছ'শো কোটি ছাড়িয়ে গেছে, তার এক তৃতীয়াংশ, অর্থাৎ দুশো কোটিরও কিছু বেশি মানুষের বাসস্থান দুটি মাত্র দেশে। চিন এবং ভারত। খণ্ডিত ভারতের তুলনায় চিন আয়তনে এবং জনসংখ্যায় ভারতের চেয়েও বড়, এবং চিনের আরও একটি বিশেষ সুবিধে এই যে, এই বিশাল জনসংখ্যার শতকরা পঁচানব্বই অংশেরই ভাষা এক, ভাষার সূত্রে চিন সমগ্র দেশে ঐক্যবন্ধন বজায় রাখতে পেরেছে। চিনের এই ভাষানীতি এমনই কঠোর যে সেখানে মুসলমানদেরও আরবি নাম গ্রহণ করতে দেওয়া হয় না। পৃথিবীর সমস্ত দেশেই যেসব মানুষ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন, তাঁদের সকলকেই আরবি নাম গ্রহণ করতে হয় (যেমন, আমেরিকার প্রখ্যাত মুষ্টিযোদ্ধা ক্যাসিয়াস ক্লে হয়েছে মহম্মদ আলি) এবং আজান ও কোরান পাঠ করতে হয় আরবি ভাষায়। একমাত্র চিনে সে অধিকার নেই। সে দেশের মসজিদেও কোরান পাঠ হয় চিনা ভাষায়।

ভারতীয় জনগণ বহু ভাষা, বহু ধর্ম ও বহু জাতিতে বিভক্ত। ভাষা অনেক সময়ই জাতীয়তার ভিত্তি। এই জন্যই ভারতীয় জাতীয়তার সঠিক সংজ্ঞা নির্ধারণ করা শক্ত। ভারত গণতান্ত্রিক ও ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র। এই দুটি নীতির মধ্যেই যে উদারতা রয়েছে, তাতে বিচ্ছিন্নতার প্রচেষ্টাও প্রশ্রয় পায়। এই সমস্যায় ভুগতে হয়েছে স্বাধীন ভারত রাষ্ট্রের জন্মকাল থেকেই। এবং অনেক বাধা বিঘ্ন সত্ত্বেও নানান স্থানীয় বিভাজনের মধ্যেও ঐক্য স্থাপনের চেষ্টাও চলেছে। বিদেশে ভারতীয় সাহিত্য বলতে অনেকে বেদ-উপনিষদ, রামায়ণ-মহাভারতের সময়কালীন সাহিত্য মনে করেন। কিন্তু আধুনিক ভারতীয় সাহিত্যের কোনও নির্দিষ্ট রূপ নেই। বিভিন্ন ভাষার সাহিত্যের ঐতিহ্য এবং আঙ্গিকে অনেক তফাত। জওহরলাল নেহেরু বলেছিলেন, Indian literature is one, but written in many languages, কথাটা শুনতে ভালো। কিন্তু বাস্তবের সঙ্গে কোনো মিল নেই। একজন শিক্ষিত ভারতীয় ইওরোপ-আমেরিকার সাহিত্য সম্পর্কে যত খবর রাখেন, সেই তুলনায় অন্য ভারতীয় ভাষাগুলির সাহিত্য সম্পর্কে তাঁকে অজ্ঞই বলা যায়। তবু, ভারতের এমন কয়েকটি ভাষা আছে, যেগুলি সারা বিশ্বের প্রধান ভাষাগুলির সমপর্যায়ের। চিনে-ভাষা অবশ্যই এক নম্বর ভাষা। ইওরোপের দেশগুলি ছোট ছোট, সেখানকার কয়েকটি ভাষা খুবই সমৃদ্ধ, কিন্তু এক-একটি দেশের জনসাধারণের মাতৃভাষা শুধু সংখ্যার বিচারে এশিয়ার ভাষাগুলির সমকক্ষ হতে পারে না। এর মধ্যে ইংরেজ ও স্প্যানিশরা বিভিন্ন মহাদেশে কলোনি স্থাপন করে নিজেদের ভাষা ছড়িয়ে দিয়েছে। যেমন আমেরিকা এবং ক্যানাডা এবং অস্ট্রেলিয়ায় ইংরিজি ভাষার প্রাধান্যের জোরেই এখন ইংরিজি পৃথিবীর দ্বিতীয় প্রধান ভাষা। স্প্যানিশ ভাষাও প্রাধান্য পেয়েছে দক্ষিণ আমেরিকার অনেকখানি রাজ্যে, তার স্থান তৃতীয়। কিন্তু ভারতীয়রা কলোনি বিস্তার করতে পারেনি বা চায়নি, তা সত্ত্বেও তাদের দুটি ভাষা, হিন্দি ও বাংলা জনসংখ্যার ভিত্তিতে পৃথিবীতে চতুর্থ ও পঞ্চম স্থান অধিকার করেছে। (একেবারে সাম্প্রতিকতম পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে যে স্প্যানিশ ভাষাকে পেছনে সরিয়ে দিয়ে হিন্দি ও বাংলা চলে এসেছে তৃতীয় ও চতুর্থ স্থানে।)

বাংলা ভাষার ইতিহাস বেশ বিচিত্র। হিন্দি পুরোপুরি ভারতীয় ভাষা। কিন্তু বাংলা ভাষা তা নয়। পূর্বতন বঙ্গদেশ রাজনৈতিক কারণে বিভক্ত হয়ে, তার দুই তৃতীয়াংশ নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল পূর্ব পাকিস্তান। বর্তমানে তা বাংলাদেশ নামে স্বাধীন রাষ্ট্র। সেখানকার রাষ্ট্রভাষা বাংলা। ভারতেও বাংলা ভাষা অন্যতম জাতীয় ভাষা হিসেবে স্বীকৃত, পশ্চিমবঙ্গ এবং ত্রিপুরা এই দুটি রাজ্যের ভাষা বাংলা। আসামের একটি জেলাও বাংলাভাষী। পূর্ব পাকিস্তানে বাংলা ভাষার অধিকার আদায়ের দাবিতে যেমন চারজন শহিদ হয়েছিলেন, সেরকম আমাদের কাছাড় জেলাতেও বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার দাবিতে প্রাণ দিয়েছেন এগারোজন। বাংলাদেশ ও ভারতের বাইরেও বাংলাভাষী বহু মানুষ ছড়িয়ে আছে সারা পৃথিবীতে। সব মিলিয়ে মোট বাঙালির সংখ্যা পঁচিশ কোটির বেশি। অর্থাৎ বাঙালির সংখ্যা আমেরিকানদের সংখ্যার প্রায় সমান সমান।

সাধারণভাবে একটা ধারণা প্রচলিত আছে যে বাংলাভাষা প্রাচীন সংস্কৃত ভাষারই একটি কন্যা। এটা ঠিক নয়। বাংলার সঙ্গে সংস্কৃতের সম্পর্ক অতি সুদূর। ইতিহাসপূর্বকালে এশিয়া-ইওরোপে যে ভাষার প্রচলন ছিল, তার নাম দেওয়া হয়েছে Indo-European Language, তার নিদর্শন এখন খুঁজে পাওয়া খুবই শক্ত। তবে Germanic, Italic, Hellenic Slavic এবং Indo-Iranian ভাষাগুলির উৎস হিসেবে সেই ভাষাকেই ধরা হয়। ইওরোপের ল্যাটিন এবং ভারতের সংস্কৃত ভাষার সৃষ্টি ওই একই উৎস থেকে। ইংরিজি ভাষা যেমন ল্যাটিন থেকে সরাসরি আসেনি, এসেছে Low German থেকে, সেইরকম সংস্কৃত ভেঙে পালি এবং অনেকগুলি প্রাকৃত ভাষার উদ্ভব হয়, তারই একটি, মাগধী প্রাকৃতের সঙ্গে বাংলা ভাষার কিছুটা সম্পর্ক আছে। সংস্কৃত ক্রিয়াপদ এবং বাক্যের Syntax থেকে বাংলা ভাষা অনেকখানি সরে এসেছে, যদিও সংস্কৃত শব্দভাণ্ডার থেকে অনেক শব্দ এখানে অবিকৃতভাবে সরাসরি চলে এসেছে বাংলায়, সেইসব শব্দকে বলা হয় তৎসম, আর যেসব শব্দ কিছুটা পরিবর্তিত হয়েছে, সেগুলি তদভব। এর সঙ্গে সহজভাবে মিশে আছে আরও বহু দেশি ও বিদেশি শব্দ। অন্য ভাষা থেকে প্রচুর শব্দ আহরণ করতে পেরেছে বলেই বাংলা ভাষা দ্রুত এত উন্নত ভাষা হতে পেরেছে।

বাংলা ভাষার আর একটি বৈশিষ্ট্যও বিশেষ উল্লেখযোগ্য। হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলমান ও খ্রিস্টান, এই চার ধর্মেরই মানুষ রয়েছে বাঙালিদের মধ্যে এবং এই প্রত্যেক ধর্মেরই কিছু কিছু প্রভাব পড়েছে বাংলা ভাষায়। প্রায় এক হাজার বছর আগেকার বাংলা ভাষার যে আদিরূপের নিদর্শন হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপাল থেকে সংগ্রহ করে এনেছিলেন, চর্যাপদ নামে সেই ছোট ছোট কবিতাগুলি বৌদ্ধদের রচনা। একসময় সারা ভারতেই হিন্দু ব্রাহ্মণ্যবাদকে হটিয়ে দিয়ে বৌদ্ধরা প্রধান হয়ে উঠেছিল। কয়েক শতাব্দী পরে ব্রাহ্মণ্যবাদ আবার মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে, হিন্দু সমাজের শিরোমণিরা চতুর কৌশলে বুদ্ধকে হিন্দু অবতার হিসেবে ঘোষণা করে, অর্থাৎ বৌদ্ধধর্ম হিন্দুত্বের চেয়ে আলাদা কিছু নয়। এবং তখনও যারা বৌদ্ধ জীবনচর্যা পালন করছিল, মারতে শুরু করা হয় তাদের। অনেক বৌদ্ধ তখন লুকিয়ে সমাজের নীচু তলায় আশ্রয় নেয়, তারাই রচনা করে এই চর্যাপদগুলি। বৌদ্ধরা সবসময়েই সাধারণ মানুষের সুবোধ্য ভাষায় এবং মুখের ভাষায় ধর্মপ্রচার করেছে, সেই জন্যই বৌদ্ধ শাস্ত্র ও সাহিত্য সরে গেছে সংস্কৃত থেকে। চর্যাপদগুলির ভাষাও একেবারে নীচু তলার মানুষের মুখের ভাষায় রচিত। সুতরাং অভিজাত ও উচ্চশিক্ষিতদের ভাষার বদলে সেই আদি বাংলা ভাষার ভিত্তি হয় জনগণের ভাষা।

ভারতে ইসলাম ধর্মের আগমনের পরেই তা অতি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। মোগল-পাঠানরা সাতশো বছর ধরে ভারতে রাজত্ব করেছে বটে, কিন্তু শুধু রাজশক্তির পৃষ্ঠপোষকতাতেই ইসলামের এতখানি জনপ্রিয়তা সম্ভব ছিল না। এ জনপ্রিয়তার কারণ হিন্দুদের নিজস্ব দুর্বলতা। হিন্দু সমাজ তখন নানান শ্রেণি ও বর্ণে বিভক্ত। উঁচুতলার লোকেরা নীচুতলার মানুষদের সমস্ত মানবিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে। যুক্তিহীন অন্ধ কুসংস্কারে আচ্ছন্ন হয়েছিল এমনকী শিক্ষিত সম্প্রদায়ও। বৈশ্য ও শূদ্ররা ছিল অস্পৃশ্য, এক কুয়ো বা পুকুর থেকে উচ্চবর্ণের সঙ্গে তাদের জল পানেরও অধিকার ছিল না। হিন্দু মন্দিরে বিড়াল বা ছাগলও ঢুকে পড়তে পারত, কিন্তু কোনও তথাকথিত অন্ত্যজ শ্রেণির শিশু মন্দির এলাকায় ভুল করে ঢুকলেও মার খেত। (ভারতের অনেক অঞ্চলে এইসব কুৎসিত প্রথা এখনও রয়ে গেছে।) ইসলাম এসে শ্রেণিহীন সমাজ ও সমভ্রাতৃত্বের ডাক দেয়, তাতেই আকৃষ্ট হয় হিন্দু সমাজের নির্যাতিত, অপমানিত মানুষের দল। এদেরই সংখ্যা ছিল বেশি। (মুসলমানদের মধ্যে সমভ্রাতৃত্বের আদর্শ যদিও বাস্তবে পুরোপুরি সত্য নয়, সেখানেও শ্রেণিভেদ আছে। তবু তা হিন্দু সমাজের তুলনায় অনেক বেশি সংযত।) ক্রমে বাঙালিদের মধ্যে মুসলমান জনসংখ্যা হিন্দুদেরও ছাড়িয়ে যায়।

মুসলমান শাসকদের সঙ্গে আসে আরবি ও ফার্সি ভাষা। সাধারণ মুসলমানদের ধর্ম চর্যার জন্যও আরবি ভাষা অত্যাবশ্যক। তার ফলে অনেক আরবি শব্দ ও কিছু কিছু ফার্সি শব্দ ঢুকে পড়ে বাংলা ভাষায়। হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সেইসব শব্দ গ্রহণ করে এবং সাহিত্যেও স্থান পায়। (যেমন পরবর্তীকালে ইংরেজদের আগমনের পর আমরা গ্রহণ করেছি প্রচুর ইংরেজি শব্দ, ফরাসি সংস্পর্শে তাদেরও কিছু শব্দ ঢুকেছে বাংলায়, এমনকী পর্তুগিজ জলদস্যুরাও কয়েকটি শব্দে তাদের চিহ্ন রেখে গেছে।) গত চার-পাঁচশো বছরের মধ্যে বাংলা হয়ে ওঠে পুরোপুরি একটি মিশ্রভাষা। সংস্কৃত থেকে বাংলা কত দূরে সরে এসেছে, তার প্রমাণ এখন অসংস্কৃত শব্দ বাদ দিয়ে পরপর তিনটি বাক্য লেখাও শক্ত।

আমি একসময় কাশ্মীরের রাজা জয়াপীড়-কে নিয়ে একটি উপন্যাস লিখেছিলাম। রাজ্যচ্যুত হয়ে জয়াপীড় সুদূর কাশ্মীর থেকে ঘুরতে ঘুরতে বাংলায় এসে উপস্থিত হন এবং পরে এখানেই একটি রাজ্য স্থাপন করেন। এটা সপ্তম শতাব্দীর ঘটনা, যখন ভারতে ইসলামের নাম-গন্ধ কিছুই ছিল না। সুতরাং এই উপন্যাস লিখতে গিয়ে আমার মনে হয়েছিল, এর ভাষায় আরবি-ফার্সি শব্দ থাকা উচিত নয়। কিন্তু কয়েকলাইন লিখেই আমি থমকে গিয়ে বুঝেছি, এই শুদ্ধতা রক্ষা করা অসম্ভব। জোর করে লিখতে গেলেও তা হবে কৃত্রিম। অনেক আরবি-ফারসি শব্দ, যেগুলিকে এক সময় বলা হত মুসলমানি শব্দ, তা আমাদের অস্থি-মজ্জায় এমনভাবে গেঁথে গেছে যে তার কোনও প্রতিশব্দই এখন আর খুঁজে পাওয়া যায় না। উদাহরণ হিসেবে পছন্দ শব্দটি উল্লেখ করা যায়, যা এসেছে পসন্দ থেকে। বাংলায় পছন্দ শব্দটির কোনও বিকল্প আছে কি? ইসলাম-পূর্ব অতীতে নিশ্চয়ই কোনও শব্দ ছিল, কিন্তু তা হারিয়ে গেছে। এখন আবার তা খুঁজে আনাও অর্থহীন। ঊনবিংশ শতাব্দীতে কিছু কিছু পণ্ডিত নির্বোধের মতন আরবি-ফারসি শব্দগুলির বদলে নতুনভাবে সংস্কৃত শব্দ প্রয়োগের চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তাতে শুধু বিভ্রান্তিই ঘটেছে। যেমন আমরা সবাই কলম দিয়ে লিখি। কোনও কোনও পণ্ডিত কলমের বদলে লেখনী ব্যবহার করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু কলম আর লেখনী এক নয়। ওড়িশার তালপাতার ওপর আঁচড় কাটবার জন্য এক ধরনের লোহার শলাকা ব্যবহার করা হত, তার নাম লেখনী, তাতে কালির দরকার হয় না। সেইরকমই দোয়াত-এর বদলে মস্যাধার বললে তা হাস্যকর শোনাবে। বাংলায় লেখা হয় অন্যরা কিংবা অন্যদের, এই বহুবচনের রা ও দের সরাসরি মুসলমানদের কাছ থেকে পাওয়া। এসব এখন বদলাবার কোনও প্রশ্নই নেই।

এক সময় কিছু কিছু মুসলমান লেখকও সংস্কৃত শব্দে হিন্দুয়ানির গন্ধ পেয়ে যতদূর সম্ভব অপ্রচলিত আরবি-ফারসি শব্দ চালাবার চেষ্টা করেছিলেন। তাকেই বলা হত মুসলমানি বাংলা। সেসব লেখায় গ্রন্থের বদলে কিতাব, সুন্দর-এর বদলে খুবসুরৎ ইত্যাদি ব্যবহার করা হতে লাগল জোর করে। মীর মোশারফ হোসেন, এস ওয়াজেদ আলি প্রমুখ লেখকেরা এধরনের মৌলবী বাংলা থেকে বাংলা ভাষাকে উদ্ধার করেন। পূর্ব পাকিস্তানেও এক সময় সামরিক শাসকরা বাংলা ভাষা থেকে হিন্দুয়ানির গন্ধ তাড়াবার জন্য জোর করে বেশি বেশি উর্দু ও আরবি শব্দ মেশাবার জন্য ফতোয়া জারি করেছিল। কিন্তু ভাষা প্রবাহিত হয় স্বাভাবিক নিয়মে, জোর জবরদস্তি করে তা বদলানো যায় না। তখনকার পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান লেখকরা এই ফতোয়া একেবারে মানেননি, বরং উলটোটাই হয়েছে বেশি, আমি লক্ষ করেছি, পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে পূর্ব পাকিস্তানের লেখকদের ভাষায় বেশি বেশি সংস্কৃতঘেঁষা শব্দ স্থান পেত, সেই তুলনায় পশ্চিম-বাংলায় লেখকদের রচনায় অবাধ ছিল উর্দু ও আরবি শব্দ।

বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিতে মুসলমানদের অবদান অনেকখানি। মধ্যযুগে বঙ্গভূমি বা বাংলা নামে কোনও বড় রাজ্য ছিল না। ভৌগোলিকভাবে এই অঞ্চল ছিল অনেকগুলি ছোট ছোট রাজত্বে বিভক্ত। সুলতান শামসউদ্দিন ইলিয়াস শাহ এই ছোট ছোট রাজ্যগুলিকে জয় করে এক সীমানার মধ্যে নিয়ে আসেন। তখন পর্যন্ত বাংলা ভাষার নিজস্ব কোনও রূপরেখা গড়ে ওঠেনি। যুক্ত হবার পর বিভিন্ন অংশের সঙ্গে যোগাযোগের ভাষা অর্থাৎ Lingua franca হিসেবে বাংলা ভাষা গড়ে ওঠে। কিন্তু তখন এই ভাষার নাম কী ছিল? বাঙালিরা তাদের মাতৃভাষার নাম যে বাংলা, তা জেনেছে অনেক পরে। তখন সাধারণ মানুষ দুটি ভাষার কথা জানত, শাস্ত্রের ভাষা বা পণ্ডিতদের ভাষার নাম সংস্কৃত আর জনসাধারণের ভাষার নাম দেশি ভাষা, অথবা শুধু ভাষা। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে ফারসি ভাষা-ভাষী মুসলমানরাই প্রথমে এই দেশীয় ভাষার নাম দেয় বাঙ্গলহ বা Bangalla। মা হুয়ান নামে এক চিন দেশীয় মুসলমান পঞ্চাদশ শতাব্দীর প্রথমভাগে সমুদ্র অভিযানে বেরিয়ে বাংলা অঞ্চলেও এসেছিলেন, তিনি লিখেছিলেন যে এই দেশের লোক প্রধান যে ভাষাটি ব্যবহার করে তার নাম বঙ্গ-কো-লি। অর্থাৎ বঙ্গালি বা বাঙ্গালি। অর্থাৎ মা হুয়ানের রচনাতেই প্রথম বাংলা ভাষার নামটি পাওয়া যায়। সুলতানি আমলে হিন্দুদের সঙ্গে সঙ্গে মুসলমানরাও এই বাংলা ভাষাতে সাহিত্য রচনা শুরু করেন।

সৌভাগ্যবশত সংখ্যা গরিষ্ঠতার সুযোগে কিংবা রাজনৈতিক কারণে মুসলমানদের জন্য আলাদা ধরনের কোনও বাংলা ভাষা গড়ে উঠতে পারেনি। বঙ্কিম-মীর মুশারফ-রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের সৃষ্টিতে যে অত্যন্ত শক্তিশালী ও আধুনিক বাংলা ভাষা বর্তমানে রূপ পেয়েছে, তাতে কিন্তু মুসলমানের সমান উত্তরাধিকার। স্বাধীনতার পর দেশভাগ হবার সময় বাংলা ভাষাও ভাগ হবার একটা সম্ভাবনা ছিল। সেই সময় প্রখ্যাত পণ্ডিত ও ভাষাবিদ ড. শহিদুল্লা একটি বলিষ্ঠ ভূমিকা গ্রহণ করেন। পূর্ব পাকিস্তানের বাংলা ভাষার রূপ কী হবে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। পূর্ব পাকিস্তান তথা পূর্ব বাংলায় বিভিন্ন জেলার কথ্য ভাষা ভিন্ন ভিন্ন। যশোর জেলার সঙ্গে চট্টগ্রামের ভাষার এতই তফাত যে প্রায় এক ভাষা বলে বোঝাই যায় না। শুধু উচ্চারণ নয়, শব্দ ব্যবহার এবং ক্রিয়া পদেও অনেক অমিল। কোনও কোনও জেলায় অতীত ক্রিয়াপদ দিয়ে ভবিষ্যৎ বোঝানো হয়। সুতরাং কোনও বিশেষ একটি জেলার ভাষাকে স্ট্যান্ডার্ড বাংলা হিসেবে ধরে নিলে প্রচুর গোলমালের সম্ভাবনা ছিল। সেই সময় ড. শহিদ্দুলা বলেছিলেন, পশ্চিমবাংলার কৃষ্ণনগর অঞ্চলের ভাষার সমগ্র বাঙালির ও বাংলা সাহিত্যের স্ট্যান্ডার্ড ভাষা হিসেবে আগেই গৃহীত হয়ে আছে, সুতরাং তার থেকে সরে গেলে পূর্ব বাংলার ভাষা বাংলা ভাষার মূল স্রোত থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। এই সাহসী সিদ্ধান্তের ফলে পূর্ব পাকিস্তানের এবং পরবর্তীকালে বাংলাদেশের সংবাদপত্রে, রেডিয়োতে এবং টিভিতে যে বাংলা ভাষা ব্যবহৃত হয় তা মূল স্রোতের বাংলা। বাংলাদেশ ও ভারতের এবং পৃথিবীর বহু দেশে ছড়িয়ে থাকা বাঙালিদের ভাষা একই রয়ে গেছে। ভাষাই যেহেতু সংস্কৃতির প্রধান বাহন, তাই রাজনৈতিক বা ধর্মীয় বিভেদ যতই মাথা চাড়া দিয়ে উঠুক মাঝে মাঝে, ভাষার সূত্রে সমস্ত বাঙালিদের আত্মীয়তা কখনও বিচ্ছিন্ন হয়নি। ভাষার শক্তিতে বিশ্বের পঁচিশ কোটি বাঙালি যতদিন ঐক্যবদ্ধ হয়ে থাকতে পারবে, ততদিনই বাংলা ভাষা বিশ্বের অন্যতম প্রধান ভাষা হিসেবে গণ্য হবে।

টরেন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের সাউথ এশিয়ান স্টাডিজের অন্তর্গত

বাংলা বিভাগে প্রদত্ত ভাষণ। ২২ নভেম্বর ২০০২।

অধ্যায় ১ / ৪৪
সকল অধ্যায়
১.
বাংলা ভাষার আত্ম-পরিচয়
২.
আ মরি বাংলা ভাষা
৩.
এ বার সমস্ত বিদ্যালয়ে বাংলা আবশ্যিক
৪.
বাংলা আছে, থাকবে
৫.
বাঙালি ও বাংলা ভাষা
৬.
বাঙালি কে? আমি কি বাঙালি?
৭.
আর কতদিন সহ্য করব?
৮.
বাঙালি, বাঙালিত্ব—জাতি ও সংস্কৃতি
৯.
দুই বাংলার বাঙালি
১০.
ইতিহাসের পরিহাস
১১.
ভাষার সূক্ষ্মতা ও সংস্কার
১২.
আমাদের হ্রস্সি দীর্ঘি জ্ঞান
১৩.
প্রবাসে বাংলা ভাষা
১৪.
প্রবাসী বাঙালি : সার্থকতা ও পরের প্রজন্ম
১৫.
কিন্তু মাতৃভাষা ছাড়া কি সাহিত্যসৃষ্টি সম্ভব?
১৬.
বাঙালি সংস্কৃতির উত্তরাধিকার
১৭.
আগামী প্রজন্মের বাঙালি
১৮.
বাঙালি অনেক, মুছে যাচ্ছে বাংলা
১৯.
হিস্ট্রি চ্যানেল হিন্দিতে কেন, বাঙালি আজও সর্বংসহা
২০.
বিশ্ব বইমেলা এবং প্রবাসে বাংলা
২১.
স্বাধীন বাংলাদেশ
২২.
সীমান্তে দুবার
২৩.
চলো, আমরাও যাই
২৪.
ওদের সংগ্রামের দিকে তাকিয়ে আমরা
২৫.
বাংলাদেশ কিছুটা অজানা, অচেনা
২৬.
সেদিনের স্মৃতি
২৭.
একুশে ফেব্রুয়ারির গভীর রাত্রে
২৮.
কয়েকটি ছোটখাটো জরুরি বিষয়
২৯.
পাশাপাশি এসে দাঁড়ানোই বড় কথা
৩০.
বাংলাদেশের সঙ্গে আমার নাড়ির টান
৩১.
ধনসম্পদ গেছে, মানসম্মানও যেতে বসেছে
৩২.
পশ্চিমবঙ্গে বাংলা চাইছি, আনন্দবাজারের আপত্তি কেন?
৩৩.
নাম বদলের সৎ প্রস্তাব তাতেই এত বিরুদ্ধ হইহল্লা?
৩৪.
রাকা রায় ওদিকে একলা লড়াই চালাবেন?
৩৫.
যত দূরেই যাই
৩৬.
দৃশ্যপটে বাংলা : প্রয়োজনে চাই ভাষা-পুলিশ
৩৭.
সামনে তাকালে বাংলা অক্ষর চোখেই পড়ে না!
৩৮.
প্রতিবাদের ভাষা কেন কলুষিত হবে?
৩৯.
নিজস্ব ভাষা
৪০.
আগে বাংলা অনুষ্ঠানের জন্য একটা আলাদা চ্যানেল চাই
৪১.
যে প্রশ্নের উত্তর এখনও জানি না
৪২.
বাঙালি কোথায় নেই? বাঙালি এখন কোথায়?
৪৩.
আগামী বছরে দুর্গোৎসব হবে ডিসেম্বর মাসে
৪৪.
মঞ্চে আবার যেন সোনালি যুগ

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%