সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

কলকাতা শহর কোনও দিনই শুধু বাঙালিদের শহর ছিল না। এখনও তা নেই। এবং ভবিষ্যতেও হবে না। নানান জাতির, নানান ভাষার, নানান ধর্ম ও সংস্কৃতির বেশভূষা ও খাদ্য অভ্যাসের মানুষের সমাবেশে এই শহরটি বর্ণময় হয়ে উঠেছে এবং এ শহরের এই কসমোপলিটান চরিত্রটাই আমরা বজায় রাখতে চাই। ভবিষ্যতের জন্য সেটা আরও বেশি দরকার। কিন্তু কলকাতা যে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিরও প্রধান কেন্দ্র, তা-ও কি অস্বীকার করা যায়? এবং অন্যান্য ভাষাভাষীদের অধিকার রক্ষা কিংবা কসমোপলিটান চরিত্র বজায় রাখার দায়ে বাংলা ভাষাকে পিছু হঠিয়ে দেওয়া কিংবা বিলুপ্ত করে দেবার চেষ্টাও কি সমর্থনযোগ্য? আমরা উদার হতে গিয়ে নিজেদের অধিকার বোধও ভুলে যাব? সেই রকমই ঘটেছে ধীরে ধীরে প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে। ইংরিজির ব্যবহার সর্বত্র, হিন্দিও ইচ্ছে মতন ব্যবহার করা যায়, কিন্তু বাংলা ভাষায় কোনও কাজই হয় না। বেসরকারি সংস্থাগুলিতে তো বটেই, সরকারি কাজে বাংলা ভাষা অচল হয়ে গিয়েছিল—ব্যাঙ্কে, পোস্ট অফিসে, আদালতে বাংলা বর্জিত। থানায় বাংলায় অভিযোগ দায়ের করা যাবে না। কোনও নির্যাতিতা মহিলা রাজ্য সরকারের কাছে বাংলায় প্রতিকার প্রার্থনা করে চিঠি লিখলে উত্তর পাবেন না, এ কোন ধরনের গণতন্ত্র? বাংলার এই অবমাননার ফলে কলকাতা শহরের দৃশ্যপট থেকেও মুছে যেতে লাগল বাংলা। স্বাধীনতার পরেও বেশ কয়েক বছর কলকাতার বহু সাইনবোর্ড লেখা থাকত বাংলায়, সাহেব-কোম্পানিগুলি অবশ্যই ইংরিজির পাশাপাশি ব্যবহার করতেন বাংলা। এমনকী হিন্দি সিনেমায়ও কিছু কিছু পোস্টার লেখা হত বাংলা অক্ষরে।
বছরছয়েক আগে আমরা কয়েকজন এসপ্লানেডে দাঁড়িয়ে আবিষ্কার করলাম, চতুর্দিকে মুণ্ডু ঘুরিয়েও একটাও বাংলা অক্ষর চোখে পড়ে না। শুধু এসপ্লানেডে কেন প্রধানত বাঙালি পাড়াগুলিতেও নাম ফলকে বাংলা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। আমরা ছেলেবেলায় গলির মোড়ে মিষ্টির দোকানে বড় বড় অক্ষরে লেখা নাম দেখতাম 'অন্নপূর্ণা মিষ্টান্ন ভাণ্ডার'। চোখের সামনে প্রতিদিন ওই বাংলা অক্ষর দেখে দেখে অন্নপূর্ণা বানানটা মনে গেঁথে গেছে। এখন সেই অন্নপূর্ণা মিষ্টান্ন ভাণ্ডারও ইংরিজিতে লেখা হয়। এর নাম সংস্কৃতির সমন্বয়? জুতোর দোকানের নাম শ্রীচরণে-শু দেখে মজা পেতাম। এখন আর সেই সব মজাটজা পাবার প্রশ্ন নেই। বাংলা ভাষার অ-ব্যবহারে এখনকার বাঙালি শিশুরাও অভিভাবকদের অনিচ্ছায় বাংলা পাঠে অমনোযোগী, রাস্তায় বেরিয়ে তারা চোখের সামনেও বাংলা অক্ষর দেখতে পায় না। বাঙ্গালোরও তো আন্তর্জাতিক মানের কসমোপলিটান শহর, সেখানে তো স্থানীয় কন্নড় ভাষার যথেষ্ট স্থান আছে!
ভাষার এই অবনয়ন কোনও এক সময় তো রুখতেই হয়। তাই শুরু হয়েছিল আন্দোলন। কয়েক বছরের চেষ্টায় তাতে কিছু কাজও হয়েছে। বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী বাংলা ভাষাপ্রেমী, তিনি বুদ্ধিজীবীদের দাবির যৌক্তিকতা মেনে নিয়েছেন। সরকারি কাজে কিছু কিছু বাংলা ভাষার ব্যবহার শুরু হয়েছে (সর্বত্র নয় এখনও), আদালতে বাংলা একেবারে অচ্ছুৎ নয়, এমনকী থানাতেও ভুলভাল ইংরিজির বদলে বাংলাতেও অভিযোগপত্র দায়ের করা যায়। সেই আন্দোলনেরই অন্যতম পরিণতি, সম্প্রতি কলকাতার মেয়রের ঘোষণা সমস্ত বাণিজ্যিক প্রতিষ্টানেই টেড লাইসেন্স নিতে গেলে বাংলা ভাষার ব্যবহার আবশ্যিক করতে হবে। আনন্দবাজার পত্রিকার সম্পাদকীয় স্তম্ভে (৩/৬/০৬) সেই ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়ে অভিনন্দন জানানো হয়েছে। এ জন্য মেয়র বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যকে ধন্যবাদ। আনন্দবাজার পত্রিকাকেও ধন্যবাদ। তার পরেও আমার সামান্য কিছু নিবেদন আছে।
কলকাতার মেয়র স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এই ঘোষণা করেননি হঠাৎ। এর পেছনে আছে সরকারি সমর্থন এবং একটি আন্দোলনের ছোট্ট ইতিহাস। কিন্তু কোথাও কোথাও বিকৃত করা হচ্ছে সেই ইতিহাসকে, তথ্যভ্রান্তি ঘটিয়ে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে তির্যক মন্তব্য। তির্যক মন্তব্য অনেক সময় উপভোগ্য হয়। কিন্তু গুরুতর তথ্যভ্রান্তি থাকলে তা উপহাস্যযোগ্য হবার সম্ভাবনা থাকে। সুতরাং আমি বিনীতভাবে সেই ছোট্ট ইতিহাসেরও অতি সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিতে চাই। ইতিহাসে ভুল থাকবে কেন?
আন্দোলনের প্রথম পর্বে থাকে আবেদন নিবেদন। সেই সময় কলকাতার নাম পরিবর্তনেরও দাবি তুলেছিলাম আমরা। লেখক-শিল্পী-বুদ্ধিজীবীদের প্রতিনিধি দল নিয়ে একাধিকবার মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের কাছে দাবিপত্র পেশ করা হয়েছে। বহু জন স্বাক্ষরিত সেই দাবিপত্র আমি রচনা করেছি, অতএব কোনওরকম স্মৃতিভ্রান্তির সুযোগ নেই। স্পষ্টভাবে তাতে বলা হয়েছিল যে, সাইনবোর্ড বা নামফলকে বাংলা ভাষার জন্য এক-তৃতীয়াংশ স্থান রাখতে হবে। মনে রাখা দরকার, এক-তৃতীয়াংশ, অর্ধেকও নয়, অর্থাৎ বেশিরভাগ জায়গাই ছেড়ে দিয়েছি অন্য ভাষার জন্য। পরবর্তীকালেও আমাদের সমস্ত ঘোষণাপত্রেও ওই এক-তৃতীয়াংশের কথাই বলা আছে। তবু আমরা ইংরেজি হঠিয়ে দিতে চেয়েছি কিংবা অন্য ভাষার ওপর জোরজুলুম করেছি, এই অভিযোগ তোলা হয়েছে কেন? এটা ইতিহাসের বিকৃতি।
আবেদন-নিবেদনের পর প্রত্যক্ষ অভিযান। রাস্তায় নেমে আমরা বিভিন্ন বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান এবং দোকানপাটে গেছি বাংলা ভাষার দাবি নিয়ে। ভাষা শহিদ স্মারক সমিতি, নবজাগরণ মঞ্চ এবং ভাষা-চেতনা সমিতি নামে তিনটি সংস্থা বাংলা ভাষা-সংস্কৃতির উন্নয়নের জন্য কিছু না কিছু কাজ করে চলেছে। এই তিনটি সংস্থাই নিজেদের মধ্যে বিভেদ ভুলে, একযোগে স্পষ্ট নীতি নির্ধারণ করে অভিযানে শামিল হয়েছে। সেই নীতিটি হল, কোনওরকম ভয় প্রদর্শন কিংবা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটাবে না কেউ। এটা এক দিকে যেমন রাজনৈতিক আন্দোলন নয়, তেমনি সমাজবিরোধীরা যাতে কোনওক্রমে ঢুকে না পড়ে, সে দিকে প্রখর নজর রাখতে হবে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার এই, আমার মতন শান্ত প্রকৃতির মানুষ অধৈর্য হয়ে কিছুটা চোখরাঙানির পক্ষে ছিলাম। আমার চেয়ে প্রাজ্ঞ ও বিবেচকরা আমাকে নিরস্ত করেছেন। রোদ্দুর, বৃষ্টি উপেক্ষা করে বহু বিশিষ্ট নাগরিক, শিল্পী, বুদ্ধিজীবী, লেখক, খেলোয়াড়, সংগীতজ্ঞ, অভিনেতা এবং নাম না-জানা বহু বাংলা ভাষাপ্রেমী যোগ দিয়েছেন সেই অভিযানে। চৌরঙ্গিতে, শ্যামবাজারে, গড়িয়াহাটে, পার্ক সার্কাসে, আরও কয়েক জায়গায়, অনেক বার। কোনও প্রতিষ্ঠানেই খারাপ ব্যবহার পাইনি। অনেক অবাঙালি দোকানদার বিস্মিতভাবে বলেছেন, তাই নাকি, বাংলাতেও নাম লিখতে হবে? ঠিক আছে, লিখব। কেউ কেউ লিখেছেনও!
দুর্ঘটনা ঘটতেই পারে, সেরকম ঘটেছেও একটি মাত্র জায়গায় এবং তা দুর্ঘটনাই, ইচ্ছাকৃত নয়। চৌরঙ্গির একটি দোকানে ভিড়ের মধ্যে ঠেলাঠেলিতে কাচের শো-কেস ভেঙে যায়। সে জন্য ক্ষমা চাওয়া হয়েছে এবং কাচ মেরামতির খরচও আমরা দিতে চেয়েছিলাম, অথচ সেই তুচ্ছ ঘটনা উপলক্ষ করেই বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে অভিযোগ করা হয়েছে, আমরা অনেক জায়গায় জোর-জবরদস্তি করেছি, হিংসার আশ্রয় নিয়েছি। যদি তেমনই হবে, তবে পুলিশ সেইসব দুষ্কৃতীদের গ্রেফতার করল না কেন? কোনও থানাতেই একটাও অভিযোগ জমা পড়েনি ভাঙচুরের। তবু আমাদের বলা হয়েছে ভাষা-মৌলবাদী। আমরা সবরকম মৌলবাদের বিরুদ্ধে, সামান্য এক-তৃতীয়াংশের দাবিদার, এই অভিযোগ তো আমাদের গায়ে লাগবেই। বরং আমরা বেশি উদার হতে হতে উদাসীন হয়ে পড়েছিলাম।
আমরা এখনও অনেক ব্যাপারেই রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টান্ত টেনে আনি। রবীন্দ্রনাথ বহু ব্যাপারে আমাদের পথ নির্দেশক। কিন্তু অনেকে ভুলে যান, রবীন্দ্রনাথ বাংলা ভাষার প্রয়োগের প্রশ্নে আমাদের চেয়েও উগ্র ছিলেন। বাঙালিকে বাঙালির ইংরেজিতে চিঠি লেখা, দুই বাঙালির কথোপকথনে ইংরেজির ব্যবহার তিনি ঘোর অপছন্দ করতেন। সেই ১৯০৫-এর বঙ্গভঙ্গের প্রস্তাবে তাঁর প্রতিক্রিয়া হয়েছিল সবচেয়ে বেশি। যে ঠাকুরবাড়ির ছেলেরা কখনও মোজা ছাড়া জুতো পরত না, সেই ঠাকুরবাড়ির ছেলে হয়ে সব আভিজাত্য বিসর্জন দিয়ে রবীন্দ্রনাথ খালি পায়ে রাস্তায় বেরিয়ে বিরোধী মিছিলে অংশ নিয়েছিলেন, নাখোদা মসজিদের অভ্যন্তরে ঢুকে রাখি পরাতে গিয়েছিলেন মৌলবাদীদের। ১৯৪৭-এর সত্যিকারের বঙ্গভঙ্গের সময় রবীন্দ্রনাথ বেঁচে থাকলে তাঁর মনের অবস্থা কীরকম হত, ভাবলেও বুক কাঁপে। আর এই একবিংশ শতাব্দীর গোড়ায় যদি পাওয়া যেত যুবক রবীন্দ্রনাথকে, তা হলে তিনি নিশ্চয়ই যোগ দিতেন সাইনবোর্ডে বাংলা ভাষার দাবির অভিযানে। শঙ্খ ঘোষের পাশে পাশে হাঁটতেন। আর বাংলার সীমানার বাইরে বাংলা ভাষার প্রসার সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের যা অভিমত ছিল, এখন তা আমরা ভুলেও উচ্চারণ করব না। রবীন্দ্রনাথ এখন উপস্থিত থাকলে তাঁকে বলতাম চুপ, চুপ, গুরুদেব, (না, আমি গুরুদেব সম্বোধন করতাম না। আমি ডাকতাম রবিদাদা) ও-রকম কথা আর এক বারও বলবেন না। পাশের রাজ্যে দাঙ্গা বেঁধে যাবে।
বছর দু-এক আগে এক সাংস্কৃতিক সম্মেলনে মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য এবং প্রাক্তন মেয়র সুব্রত মুখোপাধ্যায়। ওঁদের সামনেই সমস্ত নামফলকে বাংলা ব্যবহার আবশ্যিক করার জন্য সোজাসুজি আবেদন জানানো হয়। মুখ্যমন্ত্রী নীতিগতভাবে সমর্থন জানান। সুব্রতবাবুও তাঁর ভাষণে আন্তরিকভাবে বলেন, হ্যাঁ, এটা অবশ্যই হওয়া উচিত, আমি দেখছি। কিন্তু তিনি দেখার সময় পাননি।
গত বছরেও ওই একই সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য এবং নবীন মেয়র। এ বারেও ওই দাবি উত্থাপিত হয় আরও জোরালো ভাষায়। মুখ্যমন্ত্রী সম্মতি জানিয়েছেন, মেয়রও বাংলা ভাষাপ্রেমী। তিনি একমত হয়েছেন তো বটেই, কার্যকর করার জন্য উদ্যোগ নিতে দেরি করেননি। তাঁকে আবার ধন্যবাদ।
এখনও অনেক কাজ বাকি আছে। তার অন্যতম, পশ্চিমবাংলার সমস্ত বিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা শিক্ষা আবশিক করা। না, এটাও জোর-জবরদস্তি কিংবা অন্যের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ কিংবা ভাষা-মৌলবাদ নয়। সুপ্রিম কোর্টের সুস্পষ্ট নির্দেশ। ভারতে অনেক রাজ্যেই স্ব-রাজ্যের ভাষা আবশ্যিক হয়ে গেছে। অতি সম্প্রতি তামিলনাড়ুতে হল সব বিদ্যালয়ে তামিল ভাষা দশম শ্রেণি পর্যন্ত।
পশ্চিম বাংলায় সুপ্রিম কোর্টের এই নির্দেশ পালনে এখনও দ্বিধা কেন?
(আনন্দবাজার পত্রিকা—২৪ জৈষ্ঠ ১৪১৩)
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন