সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

ভারতবর্ষের মধ্যে যখন আমি ঘুরে বেড়াই, তখন কিন্তু আমি ভারতীয় না, বাঙালি। ক্রিকেট টেস্ট কিংবা পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধের সময়টুকু বাদ দিলে, দেশের সমস্ত মানুষকে আমরা দু-ভাগে ভাগ করে রাখি, বাঙালি ও অবাঙালি। আমরা সবাই ভারতীয় হই বিদেশে গিয়ে, যখন পাসপোর্ট দেখাতে হয়।
তাও পুরো ভারতীয় নয়, আধা। অর্থাৎ বিদেশিদের কাছে ভারতীয় বলে নিজেদের পরিচয় দিই, কিন্তু অন্য কোনও ভারতীয়ের সঙ্গে দেখা হলে প্রথমেই মনে মনে অনুধাবন করি, লোকটি কি গুজরাতি, না পাঞ্জাবি, না মহারাষ্ট্রীয়? ভারত-মানচিত্রের তলার অংশের মানুষদের কখনও পূর্ণ ভারতীয় হতে দেওয়া হয় না, তারা সাউথ ইন্ডিয়ান! বিদেশের বড় বড় শহরে, যেখানে প্রচুর ভারতীয়ের বসতি, সেখানেও পঞ্জাবি, গুজরাতি, মালয়ালি, বাঙালিরা আলাদা আলাদা গোষ্ঠীতে বিভক্ত, সামাজিক মেলামেশা ওই গোষ্ঠীর মধ্যেই প্রধানত আবদ্ধ। সবাইকে মেলাবার কিছু কিছু চেষ্টা হয়েছে, তেমন সার্থক হয়নি।
এই দেশটাই এরকম। এতগুলি জোরালো ভাষা, তাই ভাষাভিত্তিক জন-গোষ্ঠী স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখবেই। আবার সবাই আলগা ভাবে ভারতীয়। এই বিচিত্র অবস্থাটি অন্য অনেক দেশেরই নেই। যেমন চিনের সঙ্গে এ দেশের ঠিক তুলনা চলে না। সে দেশে নব্বই শতাংশ মানুষ এক ভাষাতে কথা বলে, সেখানেও কিছু কিছু গোষ্ঠী আছে বটে, কিন্তু ভাষা-বিভেদ নেই, খাদ্য-অভ্যাসও প্রায় একইরকম।
আমরা বাঙালি সংস্কৃতির কথা বলি, আবার আমরা ভারতীয় সংস্কৃতিও উত্তরাধিকারী। চণ্ডীদাস-ভারতচন্দ্র আমাদের কবি, কালিদাস-জয়দেবও কি নন? রামায়ণ-মহাভারতে বাংলার উল্লেখ প্রায় নেই-ই বলতে গেলে, তবু ওই দুটি মহাগ্রন্থ আমাদের জীবনের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে আছে। আবার বাংলা ভাষার তীব্র টানে, আমরা অন্য কোনও ভারতীয় ভাষাকে গ্রহণ করতে পারিনি। শুধু হিন্দু বাঙালি নয়, বাঙালি মুসলমানদেরও জোর করে ধরানো যায়নি উর্দু জবান। দেশ ভাগের অনেক আগে, বাংলার অ্যাসেমব্লিতে মুসলমান সদস্যরাই প্রথম বাংলায় বক্তব্য প্রকাশের দাবি তোলেন।
বাঙালি কে? বাংলা ভাষায় যে কথা বলে, সে-ই বাঙালি। যেমন অ্যান্টনি কবিয়াল, যেমন সখারাম গণেশ দেউস্কর, যেমন আবু সয়ীদ আইয়ুব। বাঙালি পরিবারে জন্মেও যারা বাংলা ভাষা শেখে না, তাদের আর বাঙালি বলে গণ্য করা ঠিক নয়। ইদানীং দেখা যাচ্ছে, কলকাতাতেও কিছু নারী-পুরুষ ইংরেজির মোহে আকৃষ্ট হয়ে বাংলা ভাষা একেবারেই ব্যবহার করে না, তাদের বাঙালি সমাজ থেকে নাম কেটে দেওয়া উচিত। তারা মধ্যবর্তী কোথাও ঝুলে থাকুক। কিংবা ট্যাঁস ফিরিঙ্গি হতে চায় হোক।
আগেকার বঙ্গদেশ দু-খণ্ড হয়ে এক অংশ স্বাধীন রাষ্ট্র হয়েছে বটে, কিন্তু ভারতস্থিত পশ্চিম বাংলার মানুষদের বাংলা ভাষার সূত্রেই বাঙালি হিসাবে পরিচিতি।
নানান ঐতিহাসিক কারণে দেড় শতাব্দী ধরে এই বাঙালিদের মধ্যে একটা উচ্চম্মন্যতা এসে গিয়েছিল। সে কারণগুলি আর বিশদ করে বলার দরকার নেই। রাজনীতি আর সাহিত্যে বাঙালিরা অন্য ভারতীয় জনগোষ্ঠী থেকে অনেকখানি এগিয়ে ছিল। ১৯০৫-এর বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনেই এ-দেশে প্রকাশ্য গণ-আন্দোলনের শুরু। সর্বভারতীয় কংগ্রেস পার্টিতে অনেকদিন পর্যন্ত ছিল বাঙালিদেরই আধিপত্য। পরে বোমা-বন্দুকের বিপ্লবের মহড়াতেও বাঙালিরা অগ্রণী। শিক্ষক-চিকিৎসক-উকিল-কেরানি উৎপাদনেও বঙ্গভূমি ছিল খুবই উর্বর। এইসব কারণে বাঙালিরা অন্য প্রদেশে বা অন্য রাজ্যে গিয়ে সেখানকার মানুষদের দিকে নীচু চোখে তাকাত। অন্য প্রদেশের মানুষদের ডাকা হত অবজ্ঞাসূচক নামে। খোট্টা, মেড়ো, উড়ে, আসামী, পাঁইয়া, বাঁধাকপি ইত্যাদি শব্দগুলি শুধু মুখে মুখে নয়, ছাপার অক্ষরেও দেখা গেছে।
এই উচ্চম্মন্যতা থেকে আসে এক ধরনের ফাঁকা আত্মম্ভরিতা। অন্য প্রদেশের মানুষদের ভাষা, সংস্কৃতি সম্বন্ধে কিছু জানার চেষ্টা না করে অবহেলা ভরে উড়িয়ে দেওয়া হত। তৎকালীন বাঙালিরা চিন্তাও করেনি যে অবজ্ঞার প্রত্যুত্তরে অবজ্ঞাই ফিরে আসে, তারপর ক্রোধ ও ঘৃণা। হয়েছিলও তাই। এক সময় শিক্ষিত বুদ্ধিজীবী বাঙালির সংখ্যাধিক্যের জন্য অন্য প্রদেশের মানুষরা তাদের দিকে প্রথমে শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে তাকাত। কিছুটা হীনম্মন্যতাও ছিল। তারপর তা রূপান্তরিত হয় ক্রমান্বয়ে অবজ্ঞা, ক্রোধ ও ঘৃণায়।
বাঙালি ও মহারাষ্ট্রীয়রা উচ্চশিক্ষা ও আধুনিক শিক্ষার সুযোগ পেয়েছিল আগে, কিন্তু কিছু পরে পরে অন্য জনগোষ্ঠীও যে সেই সুযোগ পাবে, এটাই তো স্বাভাবিক। তারাও জেগে উঠবে। কোথাও কোথাও তারা বাঙালি ও মহারাষ্ট্রীয়দের থেকেও এগিয়ে যাবে, বাঙালিরা তা বোঝেনি বা বুঝতে চায়নি। স্বাধীনতার পরে চিত্রটি সম্পূর্ণ বদলে যায়। দেশ বিভাগের চরম আঘাতে পশ্চিম বাংলা এমনই বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে যে মেরুদাঁড়া ভাঙা প্রাণীর মতন অগ্রগতি রুদ্ধ হয়ে যায়। স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরের মধ্যে আর একটি বাঙালিও সর্বভারতীয় কংগ্রেস দলের সভাপতি হতে পারেনি। এমনকী সে দাবি পর্যন্ত তোলা যায়নি। বস্তুত সুভাষচন্দ্রের পর ওই পদের দাবিদার হওয়ার যোগ্যও কেউ নেই। বিধানচন্দ্র রায়ের পর বাংলার কংগ্রেসি নেতাদের ভূমিকা শুধু দিল্লির নেতাদের পদলেহী ও চাটুকারের। সর্বভারতীয় রাজনীতিতে বাঙালিদের স্থান হয়ে গেল নগণ্য, অর্থনীতিতেও অত্যন্ত হীনবল। প্রতিবাদী শক্তি হিসাবে বামপন্থীরা সংগঠিত হয়ে শক্তি বৃদ্ধি করায় তবু খানিকটা সমীহ আদায় করে নিয়েছে।
এখন বাঙালির ধনসম্পদ তো গেছেই, মানসম্মানও যেতে বসেছে। সর্বত্র শোনা যায়, বাঙালির আর কিছু নেই, যে সাহিত্য-সংস্কৃতি নিয়ে বাঙালির এত গর্ব ছিল, তাও নেমে গেছে অনেক নীচে। এর কিছুটা চেষ্টাকৃত প্রচার। এই চেষ্টার মূলে আছে কিছুটা প্রতিশোধ স্পৃহা। তবু এই অবনমন কতখানি সত্য, তাও তো বিচার করে দেখতে হবে। সব দিকগুলি নিয়ে বলার অধিকার আমার নেই, সাহিত্য সম্পর্কে কিছুটা জানি, অন্য প্রধান ভাষাগুলির সাম্প্রতিক সাহিত্যের গতি-প্রকৃতি বিষয়ে কিছুটা খোঁজ খবর রাখি।
এক সময়ে, ধরা যাক স্বাধীনতার আগেকার মোটামুটি আশি বছরে, অন্যান্য ভারতীয় ভাষার তুলনায় বাংলা সাহিত্য যে অতি দ্রুত অনেক উন্নত হয়েছিল, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। সবক'টি ভাষাতেই প্রথম দিকের ঔপন্যাসিকরা বঙ্কিমচন্দ্রের কাছে ঋণী। আমাদের সৌভাগ্য এই যে গদ্য সাহিত্য শুরুর সময়েই বঙ্কিমচন্দ্রের মতন একজন বড় মাপের প্রতিভাবান লেখক কলম ধরেছিলেন। প্রথম থেকেই তিনি উঁচু তারে বেঁধে দিয়েছিলেন কথাসাহিত্য। তা অন্যান্য আঞ্চলিক লেখকদের প্রভাবিত করেছে। নোবেল প্রাইজ পাওয়ার আগে রবীন্দ্রনাথের সর্বভারতীয় পরিচিতি ছিল খুবই সীমিত। স্বামী বিবেকানন্দের শিকাগো জয়ের মতনই, সাহেবদের দেশ থেকে রবীন্দ্রনাথের এত বড় পুরস্কার প্রাপ্তিতে সারা ভারতের দৃষ্টি তাঁর দিকে আকৃষ্ট হয়। তারপর থেকে তিনি বিশ্বকবি, সুতরাং সারা ভারতের শ্রেষ্ঠ কবি হিসাবে তো স্বীকৃতি পাবেনই। কিন্তু গান বাদ দিলে রবীন্দ্রনাথের মহিমা অনেকখানি কমে যায়, অন্য ভাষায় রবীন্দ্রসঙ্গীতের রস ঠিক মতন পাওয়া যায় না, রবীন্দ্রনাথের গল্প-উপন্যাস-কবিতা অন্য সব ভাষায় অনুদিত হলেও শুধু উচ্চশিক্ষিতদের কাছেই আদৃত হয়েছে, জনসাধারণের কাছে পৌঁছোয় না। রবীন্দ্রনাথের নাম যতখানি শ্রদ্ধেয়, তাঁর রচনা ততখানি পঠিত নয়।
সেই কৃতিত্বের অধিকারী শরৎচন্দ্র। কোনও বড় পুরস্কারই পাননি তিনি, শুধু গল্প নির্মাণের কুশলতায় এবং সাধারণ মানুষের জীবনের প্রতিচ্ছবি ফুটিয়ে তোলায় তিনি সর্বশ্রেণির মানুষের মন জয় করে নিয়েছেন। ভারতের এমন কোনও ভাষা নেই, যেখানে শরৎচন্দ্রের রচনা এখনও আগ্রহের সঙ্গে পঠিত হয় না। অনেক ভাষার সাধারণ পাঠকরা জানেই না যে শরৎচন্দ্র একজন বাঙালি, মনে করে তাদেরই ভাষার লেখক। অনুবাদে চট্টোপাধ্যায় পদবিটা বাদ দেওয়া হয়। আমি কিছু কিছু গুজরাতি পাঠকের মুখে শুনেছি যে, তাদের ধারণা শরৎচন্দর একজন গুজরাতি লেখক।
কিন্তু তারপর? অন্য ভাষার তুলনায় বাংলা সাহিত্য অধঃপাতে গেছে? কিছু কিছু বাঙালি এখনও আত্মম্ভরি, অর্ধশিক্ষিত এবং ফাঁকা দাম্ভিকতায় পূর্ণ। তারা গায়ের জোরে বলতে চায় বাংলা সাহিত্য এখনও শ্রেষ্ঠ! কিন্তু গায়ের জোরে বললেই বা তা মানছে কে? বঙ্কিম-রবীন্দ্রনাথ-শরৎচন্দ্র-নজরুলের গৌরব নিয়ে আর কতদিন ধুয়ে খাওয়া হবে, পরবর্তী বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে সমসাময়িক অন্য ভাষার সাহিত্যের তুলনা তো করতেই হবে। কুরুতুলুন হায়দার, নির্মল ভার্মা, কৃষ্ণা সোপতি, এম টি বাসুদেবন নায়ার, ইউ আর অনন্তমূর্তির মতন শক্তিশালী লেখকদের সঙ্গে বাঙালি পাঠকদের পরিচিতি নেই। গোপালকৃষ্ণ আডিগার মতন কবির রচনা কজন পড়েছে? মলয়ালম সাহিত্য, হিন্দি সাহিত্য বহু অনুবাদে সমৃদ্ধ। সেই তুলনায় বাংলায় প্রায় কিছুই অনুবাদ হয় না অন্য ভারতীয় সাহিত্যের। অন্যান্য ভাষার উন্নতি সম্পর্কে অজ্ঞ বাঙালি এখনও বাস করছে মূর্খের স্বর্গে।
এহ বাহ্য। এর পরেও বলা যায় যে জীবনানন্দ দাশের মতন সম্পূর্ণ মৌলিক স্টাইলের স্রষ্টা কোনও কবি এখনও কোনও ভারতীয় ভাষায় নেই। জীবনানন্দ দাশ একাই যেভাবে বাংলা কবিতার রূপান্তর ঘটিয়ে দিয়েছেন, তেমন প্রতিভা অন্য ভাষায় আসেনি। তারাশঙ্কর, বিভূতিভূষণ ও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমকক্ষ ঔপন্যাসিক এখনও অন্য ভাষায় খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। এঁদের মধ্যে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ই বাংলার বাইরে সবচেয়ে কম পরিচিত, কিন্তু যাঁরা পড়েছেন, তাঁদের মুগ্ধ বিস্ময়ের খবর জানি। সতীনাথ ভাদুড়ির 'ঢোঁড়াই চরিত মানস'-এর তুল্য উপন্যাস অন্য ভাষায় লেখা হয়নি আজও। ফণীশ্বরনাথ রেণু-র প্রসিদ্ধ উপন্যাস 'ময়লা আঁচল'-এ সতীনাথের প্রভাব আছে। রেণুজি তা স্বীকার করেও গেছেন। কমলকুমার মজুমদারের ভাষারীতি এমনই যা অনুবাদ করা প্রায় অসাধ্য ব্যাপার। যেমন জেমস জয়েসের 'ফিনেগানস ওয়েক' অনুবাদ করা যায় না। কিন্তু অন্য ভারতীয় ভাষায় আমি এমন কোনও উপন্যাসের কথা শুনিনি, যা অনুবাদ করা দুঃসাধ্য।
আমার সমসাময়িক বাঙালি লেখকদের সঙ্গে অন্যান্য ভারতীয় ভাষায় সাম্প্রতিক সাহিত্যের প্রতিতুলনা থেকে আমি বিরত হলাম। কেন না, তাতে হয়তো আমারও আত্মম্ভরিতা প্রকাশ পেয়ে যেতে পারে!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন