বাংলাদেশের সঙ্গে আমার নাড়ির টান

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

বাংলাদেশের সঙ্গে আমার নাড়ির টান আছে। আমি সেখানেই জন্মেছি।

অফিসে আমার টেবিলের বাঁ-পাশে লেখা আছে 'আই লাভ বাংলাদেশ'। দেশভাগ হওয়ার পর আমি ৪৮ সালে একবার মাত্র আমার জন্মস্থানে গিয়েছিলাম। ওদেশে অনেকবার গিয়েছি, যেখানে জন্মেছি তার পাশ দিয়েও গিয়েছি। কিন্তু ঠিক জন্মস্থানের জায়গায় যাবার আমার কোনও ইচ্ছে নেই। জানি সেই জায়গাটার অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে। আমাদের বাড়িঘর কিছু নেই। সব ভেঙে গেছে অথবা ভেঙে ফেলা হয়েছে। পুরোনো যেসব স্মৃতি আছে, যে চিত্রটা আমার মনে আছে, সেগুলো এখন আর কিছুই দেখতে পাব না। আমি চাই আমার পুরোনো স্মৃতির চিত্রটাই মনের মধ্যে থাকুক।

বাংলাদেশের মানুষের অতিথি বাৎসল্য একটু বাড়াবাড়ি রকমের বেশি। ওখানে গেলে আমার খেয়ে খেয়ে প্রায় মরে যাবার উপক্রম হয়। কাজেই একটু আতিথ্যটা কম করলেই ভালো হয়, অন্তত খাওয়ানোটা একটু কম করলে ভালো হয়। তবে ওখানে গেলে সবসময়ই মনে হয় নিজের লোকের মধ্যে এসেছি। কারুর কারুর কাছ থেকে এমন ব্যবহার পাই—এমন বন্ধুর মতো আত্মীয়র মতো যে মনে হয় পৃথিবীতে অন্য কোনও জায়গার বদলে বাংলাদেশটাই আমার সবচেয়ে আপন জায়গা।

বাল্যকালে কাটানো বাংলাদেশের কিছু কিছু স্মৃতি এখনও আমার মধ্যে রয়ে গেছে। 'অর্জুন' উপন্যাসে কিংবা 'পূর্ব-পশ্চিম' উপন্যাসে বাংলাদেশের প্রকৃতি অনেকখানি এসেছে। বিশেষ করে নদীগুলোর কথা আছে। বাংলাদেশের এইসব বর্ণনা আমার সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতার বদলে কৈশোর স্মৃতি বা বাল্যস্মৃতি থেকে উঠে আসে। 'একা এবং কয়েকজন' উপন্যাসেও বাংলাদেশের প্রসঙ্গ অনেকখানি আছে।

বাংলাদেশ নামে যে রাষ্ট্রটির ২৫ বছর পূর্ণ হল, সেই রাষ্ট্রটি সম্পর্কে আমি ভীষণ ভাবে আগ্রহী। ওখানকার ঘটনাপ্রবাহ আমি সবসময় লক্ষ রাখি, নিজে যাই, নিজের চোখে দেখি। আমি মনে করি বাংলাদেশের ভবিষ্যতের দিকেই তাকানো উচিত, অতীতের দিকে তাকানোর কোনও যুক্তি নেই।

এটা নিশ্চয়ই আমাদের কাছে গর্বের বিষয় যে এখন বাংলাদেশ রাষ্ট্রপুঞ্জের বাংলা ভাষায় বক্তৃতা দিতে পারে এবং বাংলা বিশ্বে একটা স্বীকৃত ভাষা হয়েছে। এটা বাংলাদেশের জন্যই সম্ভব হয়েছে। তবে বাংলাদেশে এখনও অনেক লোকে অকারণে ইংরিজিতে কথা বলে। যে সময় উৎসব হয় তখন অনেকেই পাজামা পাঞ্জাবি পরে বাঙালি সাজে কিন্তু অন্যসময় স্যুট-বুট পড়ে, জিনস পড়ে। তখন আর অতটা বাঙালি থাকে না। পশ্চিমী আকর্ষণের প্রভাব বাংলাদেশেও আছে তবে সব মিলিয়ে বাংলাদেশে বাংলা ভাষার ব্যবহার অনেক বেশি, এটাই খুব আনন্দের কথা।

বাংলাদেশের মানুষের একটা অভিযোগ আছে যে এখানকার লেখকদের লেখা ওঁরা বেশি পড়ে কিন্তু সে তুলনায় এখানকার পাঠক ওদের লেখা পড়েন কম। কথাটা অনেকটাই সত্যি। তবে এর পেছনে অনেকগুলো কারণও আছে। বাংলাদেশে এখনও কিন্তু লেখকের সংখ্যা বেশি নয়। বাংলাদেশের জনসংখ্যা বেশি, পাঠক বেশি সেই তুলনায় গল্প-উপন্যাস লেখকের সংখ্যা এখনও কম। দু-একজন সেখানে খুবই জনপ্রিয় হয়েছে কিন্তু হিসেব করলে দেখা যাবে যে তাদের সংখ্যা তুলনায় কম। পশ্চিম বাংলার যেহেতু একটা অনেকদিনের ঐতিহ্য রয়েছে, এখানে গল্প-উপন্যাসের চর্চা খুব বেশি হয়। ওখানকার পাঠকদের যে একটা ক্ষুধা আছে সেটা ওখানকার সাহিত্য দিয়ে মেটানো যায় না বলে এখানকার লেখা ওরা পড়ে। কবিতার দিক থেকে অবশ্য বাংলাদেশ বেশ উন্নত। বাংলাদেশে বহু কবিতা লেখা হয়, কবির সংখ্যাও অনেক। অনেকেই পশ্চিম বাংলায় ওদের কবিতা পাঠ করেন। বাংলাদেশের অনেক কবিই পশ্চিম বাংলায় বেশ জনপ্রিয়। এখন দু-দেশের আদানপ্রদান অনেকটা সহজ হয়ে এসেছ বলে যাওয়া আসা হয়। বাংলাদেশের কবিদের কবিতার বইও এখানে ছাপা হচ্ছে। বাংলাদেশের কিছু কিছু উপন্যাস লেখকের বইও এখানে ছাপা হতে শুরু হয়েছে। তাঁরা ইদানীং বেশ জনপ্রিয়ও হচ্ছেন।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক উত্থান-পতন আমাদের তুলনায় অনেক বেশি হয়েছে। প্রথম কথা একটা অত্যন্ত রক্তাক্ত এবং ভয়ঙ্কর যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে ওই দেশের জন্ম, তার পরেও বিভিন্ন সময় ওখানে রাষ্ট্রনায়করা খুন হয়েছেন, সামরিক অভ্যুত্থান হয়েছে। গণতন্ত্র বিপন্ন হয়েছে। সেই সবসময় ওখানে অন্যান্য মানুষদের মতন শিল্পীরাও এগিয়ে এসেছেন তাঁদের কণ্ঠস্বর দিয়ে প্রতিবাদ করতে। সুতরাং বাংলাদেশের কবিতার মধ্যে এই প্রতিবাদী সুরটা বেশি করে ফুটে উঠেছে। প্রতিবাদ করতে গেলে গলাটা একটু উচ্চকণ্ঠ হয়ে যায়। সে জন্যই বাংলাদেশের কবিতার মধ্যে একটু উচ্চকণ্ঠ টের পাওয়া যায়। একটু বেশি মাত্রায় আবেগও রয়েছে। সে তুলনায় পশ্চিমবঙ্গে এত বেশি উত্থান পতন ঘটেনি। পশ্চিম বাংলায় একদিকে যেমন ভাষা শিল্পের চর্চাটা বেশি হয়েছে আবার তেমনি হয়তো অনেকে যাঁরা মার্কসবাদে বিশ্বাসী তাঁরা তা নিয়েও কিছু কবিতা লিখেছেন তাঁদের কবিতার মধ্যেও উচ্চকণ্ঠ এসেছে। তবে পশ্চিম বাংলার কবিতার মূল সুরটা কিন্তু শিল্পের সূক্ষতার সাধনার দিকেই বেশি।

বাংলাদেশ সম্পর্কে বলতে গেলে তসলিমা প্রসঙ্গ এসেই যায়। তসলিমা একটি সাহসী মেয়ে। তাঁর ঝকঝকে গদ্য ভাষা দিয়ে সে নারী নির্যাতন বা ধর্মের নামে মানবিকতা কোথায় কোথায় বিচ্যুত হয়, তা নিয়ে খুব তীক্ষ্ন ভাষায় লিখেছিলেন। সে কারণে একটা আলোড়নের সৃষ্টি হয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় তসলিমা শিল্প সাহিত্য চর্চা করবার খুব একটা সময় পাননি। মাত্র কয়েক বছরেই তাঁর সাহিত্য জীবনে বিরাট পরিবর্তন ঘটে যায়।

অনেক বাধার সম্মুখীন হতে হয় এবং শেষ পর্যন্ত দেশত্যাগ করতে হয়। দুর্ভাগ্যের বিষয়, বাড়িতে বসে নিবিড়ভাবে সাহিত্যচর্চা করার সুযোগ থেকে তসলিমা বঞ্চিত হয়েছে। আপাতত আমি বাংলাদেশে দেখি তসলিমা সম্পর্কে সকলেই নিরুত্তাপ, কেউ কোনও কথাই বলতে চায় না। যেন অনেকেই তাঁকে ভুলে গেছে।

বাংলাদেশের সঙ্গে যেহেতু আমার নাড়ির টান আছে তাই তুচ্ছ তুচ্ছ কারণে যখন আমাদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয় তখন তা আমার খুবই খারাপ লাগে। গঙ্গার জলের ওপর সকলেরই অধিকার আছে। বাংলাদেশের মধ্যে দিয়ে যখন পদ্মা প্রবাহিত হচ্ছে তখন যদি সেখানে জল কম পড়ে তবে আমাদের তো জল দিতেই হবে। আবার কলকাতা বন্দরকেও বাঁচাতে হবে। এবারে যে চুক্তি হয়েছে তা অনেকটা যেন দু-দেশের পক্ষেই সুবিধাজনক শর্ত। সুতরাং আমার মনে হয় ভুল বোঝাবুঝির অবসান হবে। গঙ্গা দিয়ে অনেক জল বইবে। ওঁরা পানি নেবে আমরা জল নেব এবং আদান-প্রদানটা আরও বেশি বাড়বে।

সকল অধ্যায়
১.
বাংলা ভাষার আত্ম-পরিচয়
২.
আ মরি বাংলা ভাষা
৩.
এ বার সমস্ত বিদ্যালয়ে বাংলা আবশ্যিক
৪.
বাংলা আছে, থাকবে
৫.
বাঙালি ও বাংলা ভাষা
৬.
বাঙালি কে? আমি কি বাঙালি?
৭.
আর কতদিন সহ্য করব?
৮.
বাঙালি, বাঙালিত্ব—জাতি ও সংস্কৃতি
৯.
দুই বাংলার বাঙালি
১০.
ইতিহাসের পরিহাস
১১.
ভাষার সূক্ষ্মতা ও সংস্কার
১২.
আমাদের হ্রস্সি দীর্ঘি জ্ঞান
১৩.
প্রবাসে বাংলা ভাষা
১৪.
প্রবাসী বাঙালি : সার্থকতা ও পরের প্রজন্ম
১৫.
কিন্তু মাতৃভাষা ছাড়া কি সাহিত্যসৃষ্টি সম্ভব?
১৬.
বাঙালি সংস্কৃতির উত্তরাধিকার
১৭.
আগামী প্রজন্মের বাঙালি
১৮.
বাঙালি অনেক, মুছে যাচ্ছে বাংলা
১৯.
হিস্ট্রি চ্যানেল হিন্দিতে কেন, বাঙালি আজও সর্বংসহা
২০.
বিশ্ব বইমেলা এবং প্রবাসে বাংলা
২১.
স্বাধীন বাংলাদেশ
২২.
সীমান্তে দুবার
২৩.
চলো, আমরাও যাই
২৪.
ওদের সংগ্রামের দিকে তাকিয়ে আমরা
২৫.
বাংলাদেশ কিছুটা অজানা, অচেনা
২৬.
সেদিনের স্মৃতি
২৭.
একুশে ফেব্রুয়ারির গভীর রাত্রে
২৮.
কয়েকটি ছোটখাটো জরুরি বিষয়
২৯.
পাশাপাশি এসে দাঁড়ানোই বড় কথা
৩০.
বাংলাদেশের সঙ্গে আমার নাড়ির টান
৩১.
ধনসম্পদ গেছে, মানসম্মানও যেতে বসেছে
৩২.
পশ্চিমবঙ্গে বাংলা চাইছি, আনন্দবাজারের আপত্তি কেন?
৩৩.
নাম বদলের সৎ প্রস্তাব তাতেই এত বিরুদ্ধ হইহল্লা?
৩৪.
রাকা রায় ওদিকে একলা লড়াই চালাবেন?
৩৫.
যত দূরেই যাই
৩৬.
দৃশ্যপটে বাংলা : প্রয়োজনে চাই ভাষা-পুলিশ
৩৭.
সামনে তাকালে বাংলা অক্ষর চোখেই পড়ে না!
৩৮.
প্রতিবাদের ভাষা কেন কলুষিত হবে?
৩৯.
নিজস্ব ভাষা
৪০.
আগে বাংলা অনুষ্ঠানের জন্য একটা আলাদা চ্যানেল চাই
৪১.
যে প্রশ্নের উত্তর এখনও জানি না
৪২.
বাঙালি কোথায় নেই? বাঙালি এখন কোথায়?
৪৩.
আগামী বছরে দুর্গোৎসব হবে ডিসেম্বর মাসে
৪৪.
মঞ্চে আবার যেন সোনালি যুগ

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%