সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

ঢাকার এক বন্ধু একদিন জিগ্যেস করলেন, পশ্চিম বাংলায় সবচেয়ে বড় উৎসব নিশ্চয়ই দুর্গাপুজো, আমাদের বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় উৎসব কী বলুন তো? এর উত্তরে ঈদ বলেই আমি বোকা বনে যেতাম, তাই ধাঁধার উত্তর জানার ভঙ্গিতে তাকিয়েছিলাম বন্ধুরই দিকে। বন্ধুটি সহাস্যে বললেন—নববর্ষ।
বাংলাদেশের নাগরিকদের মধ্যে শতকরা নব্বইজন মুসলমান, তারা ঈদের উৎসব করেন অবশ্যই, অনেকে রোজা রাখেন, মসজিদে কিংবা মাঠের জমায়েতে নামাজ পড়েন, কিন্তু দুর্গাপুজোর মতন পাড়ায় পাড়ায় ম্যারাপ বেঁধে, ঢাক-ঢোল-সানাই বাজিয়ে উৎসব হয় না। অথচ প্রায় সেইরকমই বাংলাদেশে, নববর্ষের সময় অনেক ছোটখাটো শহরেও সেই উৎসবে কোনও ধর্মীয় ব্যাপার থাকে না, হয় গান বাজনা, কবিতা পাঠ, নৃত্যনাট্য ইত্যাদি। পশ্চিম বাংলায় আবার নববর্ষে কোনও মাতামাতি নেই, ওই দিনটিতে ছুটি থাকে বটে কিন্তু উদযাপন করার ব্যাপারে কারও বিশেষ ছাড় নেই। সবদিক দিয়ে পয়লা জানুয়ারিই তো এখন প্রকৃত নববর্ষের দিন। পরাধীন ভারতে এইসব ছিল জাতীয়তাবাদের প্রকাশ। স্বাধীনতার পরেও কিছু বছর তার রেশ থেকে গিয়েছিল, এখন পশ্চিম বাংলায় জাতীয়তাবাদ শব্দটাই কেমন যেন অদ্ভুত শোনায়।
পাকিস্তানি আমলে পূর্বপাকিস্তানের মানুষ নিজেদের বাঙালিত্বের ওপর জোর দেবার জন্যই বাংলা নববর্ষের উৎসব পালনের প্রতি জোর দিয়েছিলেন। আজ সেখানকার বাঙালিদের নিজস্ব রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা হয়েছে, তবু এইসব উৎসব ম্লান হয়ে যায়নি।
বাংলাদেশের আর একটি অসাম্প্রদায়িক উৎসব হল একুশে ফেব্রুয়ারি, শহিদ দিবস। মূলত ছাত্রছাত্রীরাই এই দিনটিকে মেতে ওঠে বটে, কিন্তু এই উৎসবের ছোঁয়া লাগে সারা দেশে। দলমত নির্বিশেষে পশ্চিম বাংলার সব ছাত্ররা কোনও একটা বিশেষ উপলক্ষে উৎসবে মাতবে, পশ্চিম বাংলায় এটা এখন প্রায় অকল্পনীয়। আমাদের এদিককার ছাত্ররা এখন বড় আকারে কোনওরকম সাংস্কৃতিক উৎসবের আয়োজন করে কি? রাজনীতিই এখন একমাত্র সংস্কৃতি।
বাংলাদেশে একুশে ফেব্রুয়ারি উৎসবে আমি দেখেছি ব্যাংক কর্মচারী সমিতি কিংবা কৃষিজীবী সমবায় ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানের সদস্যরাও মিছিল করে আসে। সে দেশের রাষ্ট্রপতিও যেমন প্রতি বছর এই দিনটিকে স্মরণ করেন, তেমনি অনেক সাধারণ গৃহস্থ বউ-ছেলে-মেয়ের হাত ধরে শহিদ বেদি পর্যন্ত দর্শন করতে আসেন। বাংলা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে বাহান্ন সালের একুশে ফেব্রুয়ারি চারজন তরুণ প্রাণ দিয়েছিল ঢাকায়। সেই অনুসারে এই শহিদ দিবসটি শোক দিবস হিসেবে প্রতি বছর পালিত হবার কথা ছিল। কিন্তু এখন সেটা জয় দিবস কিংবা ভবিষ্যতের জন্য শপথ নেবার দিন। আজকের যারা তরুণ-তরুণী, যাদের বয়স কুড়ি-একুশ, তারা সেই বাহান্ন সাল দেখেনি তো বটেই, বাংলাদেশ স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতিও তাদের নেই, তবু একুশে ফেব্রুয়ারির উৎসব উদযাপনে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির মহিমা বিবর্ধনের জন্য তাদের আবেগ ও উন্মাদনা দেখে অভিভূত না হয়ে পারা যায় না। হিন্দু জনপ্রতিনিধিরা সাহেবদের উচ্চারণ নকল করে জ্বালাময়ী ইংরেজিতে বক্তৃতা দিলেই আত্মশ্লাঘা বোধ করতেন। উচ্চশিক্ষিত মুখ্যমন্ত্রী (তখন প্রধানমন্ত্রী বলা হত) ফজলুল হক সাহেবও মাঝে মাঝে বাংলা বাক্য উচ্চারণ করতেন সাহেবদের নাকের ডগায়। পাকিস্তান সৃষ্টির পর বাহান্ন সালেরও অনেক অনেক আগে কায়েদ-এ-আজম জিন্না এক জনসভায় আব্বাসউদ্দিনের গান সম্পর্কে আপত্তি তুলেছিলেন। তখন সাধারণ মুসলমান শ্রোতারা পাকিস্তানের মহামহিমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের শোরগোল তুলেছিল। শেষ পর্যন্ত আব্বাসউদ্দিনের গান দিয়েই সভা শুরু হয়েছিল।
আজ পশ্চিমবাংলায় বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি সংকুচিত হয়ে আসছে ক্রমশ। গোর্খাল্যান্ডের বদলে গোর্খা হিল কাউন্সিল নামে যা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সেখানে বাংলা সিনেমা দ্যাখার কথা কেউ কল্পনা করতেই পারে না। লাউড স্পিকারে বাজে শুধু হিন্দি গান। এই ঠুঁটো পশ্চিম বাংলাতেও এক শ্রেণির বাঙালি বাংলা সংস্কৃতির সব চিহ্ন গা থেকে মুছে ফেলতে বদ্ধপরিকর। চতুর্দিকে এখন ব্রাউন সাহেবদের আধিপত্য। বাংলা বই সম্পর্কে মন্তব্য—আমারও স্ত্রী পড়েন মাঝে মাঝে, তবু স্ত্রীরা এখনও পড়ছেন, তাদের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে বাংলা বই, বাংলা গানের সব সম্পর্ক ঘুচে গেছে। উচ্চবিত্ত সমাজের বাড়িতে গেলেই শোনা যাবে এখন মাইকেল জ্যাকসনের নাকি সুরের চিৎকার। কোনও কোনও বাড়িতে আমি কাঁটা চামচ দিয়ে ইলিশ মাছ খেতে দেখেছি! ওঃ সে কী পরিশ্রম।
বাংলাদেশেও কি ইঙ্গ-বঙ্গ সমাজ নেই? আছে। জিনস ও গেঞ্জি পরা ছেলে, সবসময় ইংরেজি বলা মেয়েদের দল, বিদেশি ম্যাগাজিন পড়া মা-বাবা, এরকম একটা শ্রেণি আছে সেখানে।
কিন্তু বাংলা শিল্প-সংস্কৃতির সঙ্গে তাদের সম্পর্ক পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়নি। তাদের একজন রসিকতা করে আমাকে বলেছিলেন, পয়লা ফেব্রুয়ারি বাঙালি হয়ে যাই, আবার ২৮শে ফেব্রুয়ারি বাংলা ভুলে যাই। তবু তো একটা মাস তারা বাঙালি সাজতে লজ্জা পান না। আমাদের এখানকার ব্রাউন সাহেবরা অনেকে ২৫শে বৈশাখেরও তোয়াক্কা করেন না। বাংলা নববর্ষ কবে, সে ধাঁধার উত্তর তাদের ছেলেমেয়েরাও দিতে পারবে না।
বাংলাদেশের ইঙ্গ-বঙ্গ সমাজটি বিশেষ বড় নয়। তার বাইরে যে বিশাল জনসংখ্যা তারা বাংলা সংস্কৃতিতে লালিত হচ্ছে। তাদের মুখের ভাষাই হয়ে উঠেছে প্রকৃত বাংলা। অনেক বাঙালি হিন্দুরই একটা নির্বোধ অভিযোগ আছে, মুসলমানেরা জলকে পানি বলে কেন? ওদের কথায় আরবি-ফরাসি শব্দ থাকে কেন? আসলে কিন্তু মুসলমানরা জলকে পানি বলে না, পানিকেই পানি বলে, যেমন সারা ভারতের হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সবাই পানিকে পানিই বলে। বাঙালি হিন্দুই একমাত্র জল শব্দটি আঁকড়ে বসে আছে। আমার মতে, বাঙালি হিন্দুদের লেখায় জল এবং পানি দুটোই ব্যবহার করা উচিত। বাংলাদেশের মুসলমান লেখকরা অনেকেই লেখার মধ্যে জল শব্দটি ব্যবহার করতে দ্বিধা করেন না। অন্যান্য বৈদেশিক শব্দের মতো প্রচুর আরবি-ফারসি শব্দ বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করেছে, আরও নতুন নতুন শব্দ যোগ হলে এই ভাষারই উপকার হবে। আরবি-ফারসি শব্দ বাদ দিয়ে পরপর আট-দশটি বাংলা বাক্যরচনা করা এখন সংস্কৃত পণ্ডিতদের পক্ষেও দুঃসাধ্য। আমি নিজেই একবার সে চেষ্টা করে বিপদে পড়েছি। সপ্তম শতাব্দীর পটভূমিকায় কাশ্মীরের রাজা জয়াপীড়কে নায়ক করে একটি ঐতিহাসিক উপন্যাস লিখতে গিয়ে এই বিপদ ঘটেছিল। বাংলাদেশে মৌলবাদীদের সংখ্যা বাড়ছে, ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল। এখন সেটাকে ইসলামি রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে, অথচ সেখানকার মানুষ নববর্ষ ও একুশে ফেব্রুয়ারির মতন দুটি অসাম্প্রদায়িক উৎসব নিয়ে মাতামাতি করে, এটা খুব আশ্চর্যের নয়?
ইসলামি রাষ্ট্র হিসেবে সরকারিভাবে ঘোষিত হলেও বাংলাদেশের সব মানুষ তা মেনে নেয়নি। আওয়ামি লিগ তো বটেই, অন্যান্য সব বিরোধী দলগুলোই এর বিপক্ষে। ইসলামি রাষ্ট্রের সব রীতিনীতি প্রযুক্ত হলে শুধু যে সংখ্যালঘু হিন্দু-বৌদ্ধদেরই দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হয়ে থাকতে হবে তাই নয়, মুসলমান সমাজেও প্রগতির পথ রুদ্ধ হবে, মেয়েদের শিক্ষা-সংস্কৃতির স্বাধীনতা খর্ব হবে। আরবের টাকার চাপে বাংলাদেশ সরকারকে অনেক কিছু মেনে নিতে হচ্ছে বটে, কিন্তু বাঙালি মুসলমান পুরোপুরি আরবের অনুসরণ করবে না কখনও।
মৌলবাদীরা মাথা চাড়া দিচ্ছে ঠিকই তার পিছনে উস্কানি ও প্ররোচনা আছে। কিন্তু কিছু পত্র-পত্রিকায় মৌলবাদীদের বেশ হুঙ্কার শোনা যায়, কিন্তু সেইসব মৌলবাদীরাও নববর্ষ ও একুশে ফেব্রুয়ারির অনুষ্ঠানে যোগ দেয়। নববর্ষ সম্পর্কে তাদের আপত্তিরও কিছু থাকার কথা নয়, ইচ্ছে করলে তারা এই দিনটিকে উৎসব বলে মানতে পারে, বাংলা নববর্ষের সঙ্গে ইসলামেরও যোগ কম নয়। আর একুশে ফেব্রুয়ারি সম্পর্কে আপত্তি তুলবে এমন বুকের পাটা বাংলাদেশে কারও নেই।
পশ্চিমবাংলায় একমাত্র অসাম্প্রদায়িক উৎসব বলতে পঁচিশ বৈশাখ। হ্যাঁ, এখন জেলায় জেলায় গ্রামে গ্রামেও পঁচিশে বৈশাখের উৎসব হয়। ভাগ্যিস রবীন্দ্রনাথ এত গান, গীতিনাট্য, নৃত্যনাট্য লিখে গিয়েছিলেন। নজরুল এবং সুকান্তরও জন্মদিন পালিত হচ্ছে নানা জায়গায়, সেই তুলনায় বঙ্কিম কিংবা শরৎচন্দ্র তেমন কল্কে পান না। দেখা যাচ্ছে কবিদেরই শেষ পর্যন্ত জয় হয়। বাংলাদেশেও রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে মাতামাতি হয় যথেষ্ট, সেখানকার অনেক শিল্পীর কণ্ঠের রবীন্দ্রসংগীত অতি চমৎকার, রবীন্দ্রনাথের একটি গান ওদেশের জাতীয় সংগীত, নজরুল ওদের জাতীয় কবি এবং সুকান্ত চর্চার একটা কেন্দ্রও আছে ঢাকায়, আমি নিজে দেখেছি। দেশভাগ হলেও বাংলাদেশিরা সমগ্র বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতিরই উত্তরাধিকারী। সেই তুলনায় এদিকে আমরা ওদিকে সাহিত্য-সংস্কৃতির কতটা অগ্রগতি হচ্ছে তার কিছুই প্রায় খবর রাখি না। ইদানিং টিভিতে বাংলাদেশের অনুষ্ঠান দেখে কেউ কেউ অবাক হয়ে বলে আরে ওরা তো বেশ ভালো নাটক করে, ওদের গান এত ভালো?
যুক্ত বাংলায় এতকাল হিন্দু-মুসলমান পাশাপাশি থাকলেও কিছুতেই যেন সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন ঘটেনি। তার জন্য অনেকটাই দায়ী হিন্দু উন্নাসিকতা। বাঙালি হিন্দুরা বহুকাল ধরে বলে এসেছে—আরে ওই লোকটা তো মুসলমান, ও আবার বাঙালি নাকি? যেন মুসলমানরা বাঙালি হতে পারে না। অধিকাংশ হিন্দুই জানে না কিংবা খেয়াল করে না যে বাংলা ভাষার সম্মান রক্ষার যাবতীয় লড়াই বাঙালি মুসলমানরাই করেছে। একটু আগে থেকে শিক্ষা পাবার সুযোগে হিন্দুদের মধ্যে অনেক বড় বড় লেখক জন্মেছেন বটে, কিন্তু সংঘবদ্ধভাবে বাঙালি হিন্দুরা বাংলা ভাষার জন্য কিছুই করেনি। মুসলমানরা সেটা শুরু করেছে পাকিস্তানি আমলেরও অনেক আগে, সেই উনিশশো সাইত্রিশ সাল থেকে। সেবারই প্রথম সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে নির্বাচন হল। যশোর, খুলনা, রাজশাহী থেকে অনেক লুঙ্গি বা ধুতি পরা মুসলমান নির্বাচিত হয়ে এলেন কলকাতার বিধানসভায়। সেই সময়, সেই ব্রিটিশ আমলেই তারা দাবি তুলেছিলেন তাদের বাংলা ভাষায় বক্তৃতা করতে দিতে হবে।
বাংলাদেশে শিক্ষিত মানুষেরা কথ্য ভাষায় পরিচিত আরবি-ফারসি শব্দ কদাচিৎ ব্যবহার করেন, লিখিত ভাষায় তৎসম শব্দই বেশি। সেই তুলনায় আমরা অনেক অপ্রয়োজনীয় ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করি। ইচ্ছে করে কিছু আরবি-ফারসি শব্দ মিলিয়ে চমৎকার এক বাংলা লিখতেন সৈয়দ মুজতবা আলী। তিনি বাংলা গদ্যের এক প্রধান লেখক। গদ্যের স্টাইলে তিনি প্রমথ চৌধুরীর সমতুল্য।
আজ পশ্চিমবাংলায় বাংলা গানের এক অদ্ভুত অবস্থা। বাংলা গান যারা ভালোবাসতেন, তাদের অবলম্বন রবীন্দ্রসংগীত কিংবা নজরুলগীতি, অতুলপ্রসাদ-রজনীকান্ত-দ্বিজেন্দ্রলালের গান ফিরে আসছে। পুরাতনী বাংলা গানও আসর জমাচ্ছে, কিন্তু নতুন গান কোথায়? অন্তত দু-দশকের মধ্যে কোনও নতুন বাংলা গান জনপ্রিয় হয়নি। পল্লিগীতির নামে যেগুলো চলে, সেগুলো শহুরে বাবুদের লেখা। এ যেন একতরফের ভালোবাসা, আমরা বাংলা গান ভালোবাসতে চাই, কিন্তু নতুন গান নেই। বাংলাদেশেও আধুনিক গান তেমন উচ্চাঙ্গের নয়, কিন্তু নানা জেলা থেকে বৈচিত্র্যময় লোকগীতি উঠে আসছে। রচিত হচ্ছে আবেগময় দেশাত্মবোধক গান, (আমাদের এখানে তো দেশাত্মবোধক গান উঠেই গেছে) তারা এক জায়গায় কয়েকজন সমবেত হলে হিন্দি, উর্দু গান না করে বাংলা গানই গায়। যে-কোনও অনুষ্ঠান প্রাঙ্গণে ওদের আলপনা অনেকক্ষণ তাকিয়ে দেখার মতো, আমাদের কলেজের ছেলেমেয়েরা আলপনা দিতে এখনও শেখেনি। বাংলাদেশের জন্যই সারা পৃথিবীতে বাংলা ভাষার স্বীকৃতি। বাঙালি শব্দটির বদলে আস্তে আস্তে বাংলাদেশি নামটি পরিচিত হয়ে উঠেছে। প্রবাসে যেসব বাংলাদেশি থাকে, তারাও সহজে বাঙালিত্ব বিসর্জন দেয় না। বাঙালি বলবে না, পাবর্ত্য চট্টগ্রামে যে চাকমারা সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে, তারাও কিন্তু বাঙালি, তারা বাংলা ভাষার মাধ্যমে লেখাপড়া শেখে। বাংলাদেশের একজন অল্পশিক্ষিত চাষিকে মানি অর্ডার ফর্ম পূরণ করার জন্য অন্যের সাহায্য নিতে হয় না। কলকাতা থেকে ঢাকায় গেলে প্রথমেই সকলের মনে হয় এটাই বাংলার স্বভূমি। দুদিকে বাংলার সাংস্কৃতিক আদানপ্রদান না হলে ক্ষতি হবে পশ্চিমবাংলারই বেশি। বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে আমাদের আগ্রহে দিন দিন না বাড়ালে আমাদের সংস্কৃতিও শুকিয়ে যাবে। নচেৎ আজ থেকে তিরিশ কিংবা পঞ্চাশ বছর পর বাংলাদেশিরা যদি বলে—ভারতে বাঙালি থাকে সে আবার কী—তাতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই।
ঈশ্বর কিংবা আল্লা আমাদের মাথায় থাকুন, ধর্ম থাকুক, ধর্ম থাকুক ঘরে ঘরে, রাজনৈতিক বিভেদ নিয়ে মত্ত থাকুক রাজনীতিবিদরা। ভাষা এবং সংস্কৃতিকে এসব কিছুর ঊর্ধ্বে না রাখতে পারলে কোনও জাতিই জাতি হিসেবে পরিপুষ্ট হতে পারে না। জার্মানিও দু-ভাগ হয়েছিল, সেই দুই অংশের মধ্যে যাতায়াত ভারত-বাংলাদেশের চেয়েও কঠিন ছিল, তবু জার্মান জাতের মধ্যে সমভ্রাতৃত্ববোধ কখনও নষ্ট হয়নি। বার্লিনের যে দেয়াল লিখনটি এ সম্পর্কে প্রাসঙ্গিক, সেটি এখানে উদ্ধৃত করার বাসনা সংবরণ করতে পারছি না : Live alone and free, like a tree, but in the brotherhood of the forest.
(বঙ্গ সংস্কৃতি উৎসব ১৪১২)
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন