সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

জোসেফ কনরাড জাতে পোলিশ, কিন্তু ইংরেজি সাহিত্যের প্রতিষ্ঠিত লেখক। নবোকভ আগে লিখতেন রুশ ভাষায়, কিন্তু দেশত্যাগ করার কিছুদিন পর দিব্যি ইংরেজিতে লিখতে শুরু করলেন। 'লোলিটা উপন্যাসটির বিশেষ আকর্ষণই হল এর ভাষার খেলা। জর্জ বার্নার্ড শ কথ্য ইংরেজি মুখস্ত করতে করতে যুবা বয়সে লন্ডনে এসেছিলেন, তারপর তিনি ইংরেজি ভাষায় দিগবিজয় করেন। বস্তুত বেশ কয়েকজন আইরিশ নিজেদের মাতৃভাষা কেলটিক ছেড়ে ইংরেজি সাহিত্যের মহারথী। ইয়েটস, জেমস জয়েস—এরকম কত নামই তো করা যায়। আর এক আইরিশ, স্যামুয়েল বেকেট আবার তাঁর বিশ্ববিখ্যাত বইগুলি লেখেন ফরাসি ভাষায়। তবু এগুলোকেও ব্যতিক্রম বলেই গণ্য করতে হয়। মাতৃভাষা ছাড়া সাহিত্য সৃষ্টি হয় না। এরকমই তো আমাদের বিশ্বাস। অন্য ভাষা শিখে প্রবন্ধ কিংবা দুর্বোদ্য, নীরস গবেষণাপত্র রচনা করা যায়। কিন্তু রসসাহিত্য সৃষ্টি করতে পারে ক'জন? আমাদের চোখের সামনেই তো বহুকাল ধরে জাজ্জ্বল্যমান উদাহরণ মাইকেল মধুসূদন।
টি এস এলিয়টের নির্বাচিত কবিতার শেষ দিকে তাঁর লেখা কয়েকটি ফরাসি কবিতা আছে। আমার ফরাসি জ্ঞান নেই, তবে আমার এক ফরাসি বান্ধবী বলেছিল এ কবিতাগুলোতে ঘামের গন্ধ কবিত্বকে ছাপিয়ে গেছে। রবীন্দ্রনাথ নিজের কিছু কবিতা ইংরেজিতে অনুবাদ করেছিলেন, সেগুলো বিষয়গুণে তখন বিদেশের বহু মানুষকে আকৃষ্ট করেছিল কিন্তু মৌলিক ইংরেজি কবিতা হিসেবে গ্রাহ্য হয়নি। সারা জীবনে একটা ভাষাই শিখে শেষ করা যায় না, দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ ভাষা কাজ চালাবার জন্য শেখা যেতে পারে, কিন্তু সেই সব ভাষায় কলম চালানো অনেক সময় ছেলেখেলার পর্যায়ে পড়ে। কিন্তু ইংরেজ, ফরাসি, স্প্যানিশ কলোনিগুলিতে ওই সব ভাষার উচ্ছিষ্ট টুকরো পড়ে থাকবেই। আমরা সেই টুকরোগুলো পরিবর্ধন করেছি। পরাধীন আমলে আমাদের যে দেশাত্মবোধ ছিল, আমরা যে 'এক জাতি, এক প্রাণ, একতা' বলে গান গেয়েছি, ইংরেজ চলে যাবার পর আমরা হঠাৎ আবিষ্কার করলুম যে আসলে আমরা এক জাতি নই! সারা ভারতবর্ষকে এখনও বেঁধে রেখেছে ইংরেজি ভাষা! দক্ষিণ ভারত কিংবা গুজরাটে গেলে ইংরেজি বাদ দিয়ে অনেকের সঙ্গে একটি বাক্য বিনিময়ও সম্ভব নয়। তাই ইংরেজি হল ভারতের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা, সঙ্গত কারণেই। আগেকার তুলনায় এখন অনেক বেশি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল, ইংরেজিতে যারা ফ-র-র-র-ফ-র-র-র করে কথা বলতে পারে না এখনকার ভারতবর্ষের কোনও ক্ষেত্রেই তারা কল্কে পাবে না। প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি জ্ঞানী জৈল সিং ভালো ইংরেজি বলতে পারতেন না বলে অনেক পত্রপত্রিকায় বিদ্রূপ করা হয়েছিল। তবু, ইংরেজিকে আমরা কাজ চালাবার ভাষা বলেই গণ্য করি। কিন্তু অনেকে মাতৃভাষা ছেড়ে ইংরেজিতে গল্প, উপন্যাস, কবিতাও লেখে, আমার মনে হত ওসব এক ধরনের হ্যাংলামি, সাহেবদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা কিংবা এক লাফেই সর্বভারতীয় পরিচিতি আদায় করার বাসনা। আমরা ভাবতুম, ইংরেজি গল্প, উপন্যাস পড়তে হলে সাহেবদের লেখাই পড়ব, শুধু শুধু নেটিভদের ইংরেজি পড়ে সময় নষ্ট করি কেন?
কিন্তু স্বাধীনতার পর এত দিনে একটা দ্বিতীয় প্রজন্ম এসে গেছে। ইংরেজির গুরুত্ব এবং বাজার দর এত বেশি বলে অনেক বাবা-মা এখন ছেলেমেয়েদের মাতৃভাষা শেখার ব্যাপারে জোরই দেন না, তারা শুধু ইংরেজি শেখে, বাবা-মাকে ইংরেজিতে চিঠি লেখে, ইংরেজি গান গায়, সেই সঙ্গে নাচে, ইংরেজিতে স্বপ্নও দেখে বোধহয়। দিল্লি এয়ারপোর্টে একটি এক বছরের হামাগুড়ি দেওয়া শিশুকে তার পাঞ্জাবি মা বেবি, কাম হিয়ার, ডোন্ট গো দ্যাট সাইড ইত্যাদি বলছিল, তাই শুনে আমার মনে হল, জন্মসূত্রে ভারতীয় হলেও এই শিশুটির মাতৃভাষাই তো ইংরেজি! স্কুলে গেলেই ইংরেজি শিখতে হবে, তাই তার মা তাকে আর পারিবারিক ভাষা শেখানোর ঝামেলাই নিচ্ছে না। আমরা পছন্দ করি না করি, এটা একটা বাস্তব ঘটনা। একটা প্রজন্ম তৈরি হয়ে গেল, তারা ইংরেজিতেই ভাবনা-চিন্তা করে এবং তাদের মধ্যে কেউ কেউ যদি সাহিত্য, সংগীত রচনা করতে চায়, সেটাও আশ্চর্যের কিছু নয়।
বিদেশে কেউ পাত্তা পেলে তখন দেশে আমাদের টনক নড়ে। এই দ্বিতীয় প্রজন্মের ভারতীয় বা বাঙালি লেখকদের মধ্যে দু-একজন মাঝে মাঝে বিদেশে সাড়া জাগায়। 'টাইম' সাপ্তাহিকের প্রচ্ছদে একবার বাঙালি লেখিকা ভারতী মুখার্জির ছবি ছাপা হয়েছিল। ভারতী অবশ্য এখন আর বাঙালি বা ভারতীয়ও নয়, মুখার্জিও নয়, তার পদবি ব্লেইজ, স্বামী ক্যানেডিয়ান। 'দা গোন্ডেন গেইট' লিখে হঠাৎ বিখ্যাত বিক্রম শেঠ-এর জন্মই শুধু কলকাতা, সে বাংলা জানে কিনা সন্দেহ। কিন্তু সম্প্রতি দুজন বাঙালি লেখক ইংরেজি উপন্যাস লিখে যথেষ্ট সার্থক হয়েছেন।
অমিতাভ ঘোষ-এর 'দা সার্কল অফ রিজন' উপন্যাসটি আমি পড়তে শুরু করেছিলুম খানিকটা হেলাফেলার সঙ্গে। কিন্তু কয়েক পাতা পড়ার পরই বোঝা যায়, এই লেখক প্রকৃত লেখক। তাঁর ইংরেজি ভাষা কোথাও প্রকটভাবে ইংরেজি নয়। স্বাভাবিক, সাবলীল ইংরেজি। এই উপন্যাসের নায়কের নাম আলু এবং প্রয়োজনে বাংলা শব্দ ব্যবহার করতে তিনি দ্বিধা করেননি। একজন তরুণ লেখকের প্রথম উপন্যাস হিসেবে এই বইটি বিস্ময়কর রকমের পরিণত।
উপমন্যু চ্যাটার্জির 'ইংলিশ, অগাস্ট—অ্যান ইন্ডিয়ান স্টোরি'-ও এক তরুণ আই এ এস অফিসারের প্রথম উপন্যাস। ইংরেজিতে লেখা হলেও এই উপন্যাসের নায়ক রবীন্দ্রসংগীত শোনে, কাকাকে 'আংকল' বলে না, কাকুই বলে, এর চরিত্ররা ব্যথা পেলে 'উঃ' বলে, 'আউচ' শব্দ করে না। ভারতীয় মাটিতে যে লেখকের শিকড় তা অস্বীকার করেননি। পড়তে পড়তে মনে হয়, আমেরিকান ইংরেজি, অস্ট্রেলিয়ান ইংরেজি তৈরি হয়ে গেছে, ভারতীয় ইংরেজি তো এইরকমই হওয়া উচিত। ইংরেজি ভাষা ভারতে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে, এখন ভারতীয় ইংরেজিতে সাহিত্য সৃষ্টির বাধা থাকার কথা নয়।
বাংলায় এখন যে ধরনের গল্প-উপন্যাস লেখা হয়, তার সঙ্গে এই উপন্যাস দুটির তুলনা মনে এসেই যায়। এই বাঙালি পদবিধারী লেখকদ্বয় যদি বাংলাতেই বই দুটি লিখতেন, তা হলে তা কতটা উল্লেখযোগ্য হত? আমার মতে, বাংলাতেও বই দুটি যথেষ্ট আলোড়ন সৃষ্টি করত। সাম্প্রতিক বাংলা সাহিত্য এমন জোরালো উপন্যাস লেখা হয়নি বলা যেতে পারে। আমি জোরালো বলেছি, গভীর বলতে পারছি না, কারণ, দুটি উপন্যাসই বর্ণনামূলক, আধা-বাস্তব ভঙ্গিতে লেখা প্রথমটি খানিকটা বিমূর্তও বটে, দ্বিতীয়টিতে ইয়ার্কি বিদ্রূপের স্টাইল, কিন্তু হৃদয়ের কথা তেমন বলা নেই, মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের জটিলতা বিশেষ স্থান পায়নি। সেখানেই তো উপন্যাসের প্রকৃত মর্ম। লেখকদ্বয় যে ওইসব বিষয় নিয়ে লিখতে পারেন না, তা বলছি না, কিন্তু প্রথম উপন্যাসে ওই দিকে যাননি।
উপমন্যু চ্যাটার্জির উপন্যাসটি প্রথম থেকেই টানে। আজকাল ইংরেজিতে চার অক্ষরের কথা, কিংবা যৌন চিন্তা যা খুশি লেখা যায়, বাংলায় এসব এখনও অব্যবহার্য। ধারালো বিদ্রুপের জন্য যদৃচ্ছ শব্দ ব্যবহার যথেষ্ট প্রয়োজন, বাংলায় তার সীমাবদ্ধতা আছে। উপন্যাসটি আমার খুবই ভালো লাগলেও একটি ব্যাপারে ব্যক্তিগত আপত্তি আছে। নায়কের কলকাতার বান্ধবীর নাম নীরা কেন? ওই নামটি ব্যবহার করা উচিত হয়নি।
২৫/০৯/১৯৮৮
আনন্দবাজার পত্রিকা
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন