কয়েকটি ছোটখাটো জরুরি বিষয়

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

ভূতপূর্ব পূর্ব-পাকিস্তান থেকে যখন কোনও কোনও কবি, গল্পকার বা অধ্যাপক কলকাতায় আসতেন, তখন তাঁদের সঙ্গে আলাপের প্রথম কয়েকটি মুহূর্তে একটা সূক্ষ্ম অসুবিধা বোধ করতাম। পরস্পর নাম জানাজানির পর প্রথম সম্বোধনটা কীরকম ভাবে হবে?

হিন্দু পরিবারভুক্ত বাঙালিরা সদ্য পরিচয়ের পর হাত তুলে বলে, নমস্কার। করতল দুটি যুক্ত হয়ে কপাল বা বুকের কাছে চলে আসে। অভ্যেসবশত আমিও প্রথম প্রথম তাই করতাম। কিন্তু লক্ষ করেছি, বাংলাদেশের মুসলমানদের মধ্যে হাতজোর করে নমস্কার প্রথা সাধারণভাবে প্রচলিত নেই, কেউ কেউ আমার নমস্কারের উত্তরে ওই ভঙ্গিতে প্রতি নমস্কার করেননি।

তারপর থেকে আমি পূর্ব বাংলার সদ্য পরিচিত মুসলমান বন্ধুদের দেখাদেখি শুধু ডান হাতখানা কপালের কাছাকাছি তুলে সেলামের ভঙ্গি করতাম। সম্প্রীতির বিনিময় একই প্রকারের না হলে ঠিক সাবলীল হওয়া যায় না। মাঝখানে একটু ব্যবধান থেকেই যায়। সাহেবদের সঙ্গে পরিচয় হলে আমরা তাদেরই প্রথায় শেক হ্যান্ড করি। পশ্চিম বাংলার অনেক মুসলমান বন্ধু আমাদের সঙ্গে ঠিক একইভাবে হাত তুলে বলেন নমস্কার। যদিও, পশ্চিম বাংলার গ্রামে মফসসলে সাধারণ অপরিচিত মুসলমানকে কখনও হাত তুলে নমস্কার করতে দেখিনি সাধারণ হিন্দুও ডান হাত তুলে সেলাম করতে চায় না।

এক সময় আদাব শব্দটি খুব প্রচলিত ছিল, হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে, এখন আর প্রায় শোনাই যায় না। মুসলমানরা হিন্দুদের প্রতিও সম্বোধনে বলে, আসসালাম আলায়কুম, (অনেক সময় তাড়াতাড়িতে সালাম আলাকুম, কিংবা স্লাম আলেকুম) আর হিন্দুরা প্রত্যুত্তরে আলাকুম আসলাম বলতে পারে না।

একাত্তর সালের পর স্বাধীন বাংলার একজন মুক্তিসেনার সঙ্গে পরিচয় হবার সময় আমরা দুজনেই দু-এক মুহূর্ত দ্বিধা করার পর হাত বাড়িয়ে করমর্দন করলাম।

তারপর থেকেই ভেবেছি, স্বাধীন বাংলা ও পশ্চিম বাংলার সমস্ত হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সম্বোধন ও প্রীতি বিনিময়ের একটি সাধারণ প্রথা থাকা কি উচিত নয়?

সাহেবদের সঙ্গে করমর্দন করি, তারা খ্রিস্টান বলে নয়—অখ্রিস্টান সমাজতান্ত্রিক দেশের সাহেবদের সঙ্গেও ওইরকম ব্যবহার। সাহেবদের থেকে আমাদের কালচার একেবারে আলাদা। এদিকে, দুই বাংলার মুসলমান-হিন্দু নির্বিশেষে আমরা একই ভাষা ও কালচারের অধীন। সাধারণ সামাজিক আচার ব্যবহারে আমাদের সবরকম ব্যবধান দূর করে ফেলাই তো সঙ্গত।

নববর্ষে আমরা অনেক শপথ নিই। এইসব ব্যাপারে একটা নতুন কিছু ঠিক করা যায় না? স্বাধীন বাংলাদেশ আজ প্রতিষ্ঠিত সত্য এবং আমাদের আন্তরিক প্রতিবেশী স্বাধীন বাংলাদেশের মুসলমান-হিন্দু এবং পশ্চিম বাংলার সঙ্গে তার সাবলীল নিকট সম্পর্ক স্থাপনের জন্য এইসব ছোটখাটো গরমিলগুলো দূর করার উপায় এখুনি খুঁজে দ্যাখা দরকার।

হাতজোড় করে নমস্কারের ভঙ্গি এবং কথাটার মধ্যে কোনও হিন্দুয়ানি আছে কিনা আমি জানি না। খ্রিস্টানরা গির্জায় গিয়ে ওই একই ভঙ্গিতে অনেক সময় হাতজোড় করে। যদিও হিন্দুরা মূর্তি পূজা কিংবা অন্য কোনও পূজার সময় নানাভাবে নমস্কার ও প্রণাম করে, হাতজোড় বা হাঁটু গেড়ে বসে পড়া বা সাষ্টাঙ্গে, কিন্তু সামাজিক শিষ্ঠাচারে আত্মীয়দের সঙ্গে হাতজোড় করে নমস্কার করাই প্রথা। হিন্দু বাঙালি মেয়েরা কোনও সাহেবের সঙ্গে পরিচিত হলে করমর্দন করে না, হাতজোড় করেই নমস্কার জানায়। এরকম ক্ষেত্রে মুসলমান মেয়েরা কী করে আমি জানি না। অপরপক্ষে, কপালের কাছে ডান হাত ঠেকিয়ে সালাম আলেকুম বলা সারা পৃথিবীর মুসলমানদের মধ্যে পরিচিত সাহেবেদের সঙ্গে মুসলমানরা সাহেবি প্রথা মেনে করমর্দন করে, হিন্দুদের প্রতি নমস্কার করে না। আবার, বাঙালি হিন্দু যদি দারোয়ান বা বেয়ারার চাকরি নেয়, তখন বড় সাহেবকে দেখলেই (হোক না কালো রঙের বাঙালি হিন্দু সাহেব)—কপালে এক হাত ছুঁইয়ে অবিকল সেলামের ভঙ্গি করে। কিন্তু সে তার সমঅবস্থার মুসলমান প্রতিবেশীকে সেলাম জানায় না।

নমস্কার বা সেলামের বদলে যদি করমর্দনও সাধারণ বাঙালির প্রীতি বিনিময়ের রীতি হয়, তা হলেও আপত্তি জানাবার কোনও কারণ নেই, ব্যক্তিগত রুচির কথা আলাদা, কিন্তু সামাজিক ভাবে একটা নির্দিষ্ট রীতি থাকা ভালো। তাতে বিভেদ অনেক কমে। সেই রীতিটা কী হওয়া উচিত সে সম্পর্কে আমার মতামত দেওয়ার কোনও অধিকার নেই, দেশের সুধী ব্যক্তিরা ঠিক করুন।

সৌভাগ্যের বিষয়, স্বাধীন বাংলাদেশে এবং পশ্চিম বাংলার মধ্যে ভাষার তফাত প্রায় নেই। একই বাংলা ভাষা হয়েও দু-দিকে আলাদা অনেকটা হতে পারত। সেটা হয়নি, তার কারণ, পূর্ব বাংলার শিক্ষিত মানুষ সাহিত্য ও যোগাযোগের ভাষা হিসেবে কৃষ্ণনগর তথা কলকাতার ভাষাকে গ্রহণ করেছিলেন। ফলে, পূর্ব বাংলার খবরের কাগজ, রেডিয়ো, টেলিভিশনে এই কলকাতার ভাষা প্রচারিত হবার ফলে সমস্ত শিক্ষিত বাঙালির কাছে আজ এই ভাষা বোধগম্য। কলকাতার ভাষা মোটেই পশ্চিমবঙ্গের ভাষা বা হিন্দুদের ভাষা নয়, এটাই এখন বাংলা সাহিত্যের ভাষা। এবং এটা ঠিক হয়েছে, স্বাধীনতা বা ভারতভাগের অনেক আগে—মোটামুটি হিসেবে বলা যায়, যখন রবীন্দ্রনাথ 'ঘরে বাইরে' উপন্যাসটি লিখলেন।

বাঙালি হিন্দু অনাত্মীয় পরিচিত পুরুষদের নামের পরে বাবু যোগ করার প্রথা আছে। অনেক হিন্দু বাঙালি অবশ্য পরস্পরের সঙ্গে মিঃ বোস কিংবা মিঃ চ্যাটার্জি বলে সম্বোধন করেন—কিন্তু সেটাকে সংস্কৃতির বিকৃতি ছাড়া আর কী বলা যায়? মুসলমানদের সঙ্গে অবশ্য অনেক সময় আমরা বাধ্য হয়েই মিঃ আতাহার বা মিঃ রহমান বলি, ইউরোপীয়দের সঙ্গে করমর্দনের মতন। মুসলমানদের সঙ্গে বাবু যুক্ত হয় না। এক্ষেত্রে সাধারণ কোনও সম্বোধনের কথা ভাবা যায় না যা হিন্দু-মুসলমান সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য? মুসলমানদের নামের সঙ্গে অনেক সময় সাহেব যোগ করে ডাকার রেওয়াজ আছে—যেমন রহমান সাহেব বা আতাহার সাহেব। কিন্তু আবু সয়ীদ আইয়ুব-এর মতন বিদগ্ধ ব্যক্তি একবার জানিয়েছিলেন যে তিনি 'আইয়ুব সাহেব'—এরকম সম্বোধন পছন্দ করেন না এবং বাঙালি মুসলমানের নামের সঙ্গে সাহেব যোগ করার কোনও যুক্তি নেই। বাংলাদেশে অনেকে ভাই যোগ করেন, যেমন রহমানভাই, আতাহারভাই। শুনেছি এক সময় বাঙালি ব্রাহ্মণরাও এরকম করতেন। তবে ভাই বলতে বয়সে বড়দেরই বোঝায়, সমবয়সি বা কিছুটা ছোটদের ক্ষেত্রে কী হয়?

পোশাকের দিক থেকে হিন্দু-মুসলমাদের বিশেষ কোনও গরমিল নেই। পাজামা-পাঞ্জাবি বাঙালি হিন্দুদের মধ্যেও বেশ প্রচলিত। অনেকেই বাড়িতে লুঙ্গি পরেন। তবে, লুঙ্গি পরে বাইরে যাতায়াত করার মতন রেওয়াজ ক্রমশই কমে যাচ্ছে হিন্দুদের মধ্যে। আবার, বাঙালি মুসলমান সাধারণত ধুতি পরেন না। সে যাই হোক, ধুতির ব্যবহার তো প্রায় উঠেই যাচ্ছে। মুসলমান ও হিন্দুদের লুঙ্গিতেও কিছু তফাত আছে। মুসলমানরা ব্যবহার করে চেক লুঙ্গি, হিন্দুদের লুঙ্গি এক রঙা। হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সব ছেলে ছোকরা, চাকরিজীবী ও ব্যবসায়ীরা শার্ট-প্যান্টালুন পরে। চাষি মজুর ও নিম্নবিত্ত মানুষের মধ্যে মুসলমানরা শুধু লুঙ্গি ও হিন্দুরা হেটো ধুতি ব্যবহার করে। কিন্তু অর্থনীতির চাপে পিষ্ট গরিব মানুষরা পোশাক-আশাকের তফাতের মতন ছোটখাটো ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামাবার সময়ই পায় না। এবং শিক্ষিত সমাজের ছোঁয়া তাদের মধ্যে আস্তে আস্তে আসবেই। আজ থেকে পাঁচ কি দশ বছর বাদে, যদি বাংলাদেশের এবং পশ্চিম বাংলার চাষিদের খাটো প্যান্ট পরে চাষবাস করতে দেখা যায়, তাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। কারণ সেটাই সস্তা ও সুবিধাজনক। ভিয়েতনামের গরিব চাষিরাও তাই পরে।

আমার নিবেদন, দেশের সুধী ব্যক্তিরা এইসব ছোটখাটো ব্যাপার নিয়ে একটু ভাবুন। এ কথা অবশ্য ঠিক, মুষ্টিমেয় কয়েকজন মিলে ঠিক করে দিলেই যে দেশের বিরাট সংখ্যক মানুষ রুচি ও আচার ব্যবহার পাল্টে ফেলবে, তার কোনও মানে নেই। কিন্তু ইতিহাসের কোনও কোনও আবেগময় মুহূর্তে এরকম ঘটে যায়। এখন সেইরকম সময়—এটা যেন আমরা চিনতে ভুল না করি। এখন মিলনের ইচ্ছা আন্তরিক।

আর একটা ব্যাপারে পশ্চিমবঙ্গের দায়িত্ব আছে। সাধারণত শিক্ষিত বাঙালি মুসলমান মাত্রই কিছু কিছু রামায়ণ-মহাভারত ও রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক গান ইত্যাদির কথা জানেন। কারণ কাব্য সাহিত্যে এসবের বহুল ব্যবহার। কিন্তু অনেক শিক্ষিত হিন্দু বাঙালিও কোরান হাদিস বিষয়ে সম্পূর্ণ অজ্ঞ। অনেকে সুফি-দরবেশের জীবনী, এমনকী বিষাদ সিন্ধুর মতন অমর গ্রন্থেরও খোঁজ রাখেন না। এ জন্য, পশ্চিম বাংলার প্রাথমিক শিক্ষার স্তর থেকেই স্কুল পাঠ্য পুস্তকেই এসব বিষয়ে কিছু কিছু রচনা অবশ্য থাকা দরকার। এবং এই সিদ্ধান্ত নিতে হবে অবিলম্বে, নইলে ইতিহাসের এই মূল্যবান সন্ধিক্ষণটি অবহেলা করে আমরা আর একবার অন্ধত্বের পরিচয় দেব।

সকল অধ্যায়
১.
বাংলা ভাষার আত্ম-পরিচয়
২.
আ মরি বাংলা ভাষা
৩.
এ বার সমস্ত বিদ্যালয়ে বাংলা আবশ্যিক
৪.
বাংলা আছে, থাকবে
৫.
বাঙালি ও বাংলা ভাষা
৬.
বাঙালি কে? আমি কি বাঙালি?
৭.
আর কতদিন সহ্য করব?
৮.
বাঙালি, বাঙালিত্ব—জাতি ও সংস্কৃতি
৯.
দুই বাংলার বাঙালি
১০.
ইতিহাসের পরিহাস
১১.
ভাষার সূক্ষ্মতা ও সংস্কার
১২.
আমাদের হ্রস্সি দীর্ঘি জ্ঞান
১৩.
প্রবাসে বাংলা ভাষা
১৪.
প্রবাসী বাঙালি : সার্থকতা ও পরের প্রজন্ম
১৫.
কিন্তু মাতৃভাষা ছাড়া কি সাহিত্যসৃষ্টি সম্ভব?
১৬.
বাঙালি সংস্কৃতির উত্তরাধিকার
১৭.
আগামী প্রজন্মের বাঙালি
১৮.
বাঙালি অনেক, মুছে যাচ্ছে বাংলা
১৯.
হিস্ট্রি চ্যানেল হিন্দিতে কেন, বাঙালি আজও সর্বংসহা
২০.
বিশ্ব বইমেলা এবং প্রবাসে বাংলা
২১.
স্বাধীন বাংলাদেশ
২২.
সীমান্তে দুবার
২৩.
চলো, আমরাও যাই
২৪.
ওদের সংগ্রামের দিকে তাকিয়ে আমরা
২৫.
বাংলাদেশ কিছুটা অজানা, অচেনা
২৬.
সেদিনের স্মৃতি
২৭.
একুশে ফেব্রুয়ারির গভীর রাত্রে
২৮.
কয়েকটি ছোটখাটো জরুরি বিষয়
২৯.
পাশাপাশি এসে দাঁড়ানোই বড় কথা
৩০.
বাংলাদেশের সঙ্গে আমার নাড়ির টান
৩১.
ধনসম্পদ গেছে, মানসম্মানও যেতে বসেছে
৩২.
পশ্চিমবঙ্গে বাংলা চাইছি, আনন্দবাজারের আপত্তি কেন?
৩৩.
নাম বদলের সৎ প্রস্তাব তাতেই এত বিরুদ্ধ হইহল্লা?
৩৪.
রাকা রায় ওদিকে একলা লড়াই চালাবেন?
৩৫.
যত দূরেই যাই
৩৬.
দৃশ্যপটে বাংলা : প্রয়োজনে চাই ভাষা-পুলিশ
৩৭.
সামনে তাকালে বাংলা অক্ষর চোখেই পড়ে না!
৩৮.
প্রতিবাদের ভাষা কেন কলুষিত হবে?
৩৯.
নিজস্ব ভাষা
৪০.
আগে বাংলা অনুষ্ঠানের জন্য একটা আলাদা চ্যানেল চাই
৪১.
যে প্রশ্নের উত্তর এখনও জানি না
৪২.
বাঙালি কোথায় নেই? বাঙালি এখন কোথায়?
৪৩.
আগামী বছরে দুর্গোৎসব হবে ডিসেম্বর মাসে
৪৪.
মঞ্চে আবার যেন সোনালি যুগ

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%