আগে বাংলা অনুষ্ঠানের জন্য একটা আলাদা চ্যানেল চাই

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

প্রশ্ন : সুনীলদা, প্রথমেই আপনাকে জিগ্যেস করি, দূরদর্শেনে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি কোণঠাসা বলে যে আন্দোলন শুরু হয়েছে, আপনি তাতে যুক্ত হতে গেলেন কেন?

উত্তর : বিবেকের দায়ে আমি এসেছি বলা যেতে পারে। বাংলা ভাষার একজন কর্মী হিসেবে বাংলার অপমান আমার গায়ে লাগে। অনেকেই আমাকে বলে যে আপনি তো আনন্দবাজারের লোক। আপনি এতে কেন? এর সঙ্গে আনন্দবাজার বা আমার চাকরির কোনও সম্পর্ক নেই।

প্রশ্ন : কোণঠাসা বলতে আপনারা ঠিক কী বোঝাতে চাইছেন? ভারতের অন্যান্য দূরদর্শন কেন্দ্রগুলিতে অঞ্চলিক ভাষা ও সংস্কৃতির তুলনায়ও কি বাংলা অবহেলিত?

উত্তর : কোণঠাসা বলতে যা বোঝাতে চাইছি তা এই যে যাকে বলে 'প্রাইম টাইম' (৬টা থেকে ১০টা,) সেই সময়ে পশ্চিমবাংলায় বাস করে আমি কেন দূরদর্শনের কোনও একটা 'চ্যানেলে' বাংলা অনুষ্ঠান দেখতে পাব না? রেডিও-তে তো পাই। তার সম্বন্ধে তো এই অভিযোগ ওঠেনি। অন্যান্য আঞ্চলিক ভাষার ক্ষেত্রেও আমি মনে করি প্রত্যেকের নিজস্ব চানেল থাকা উচিত। গুয়াহাটি থেকে অসমিয়া, ভুবনেশ্বর থেকে ওড়িয়া ভাষায় অনুষ্ঠান প্রচারিত হওয়া উচিত।

প্রশ্ন : এই যে 'প্রাইম টাইমে' হিন্দি অনুষ্ঠান দেখতে হয়,—এটাকে কি আপনি হিন্দির আগ্রাসন বলে মনে করেন?

উত্তর : নিশ্চয়ই।

প্রশ্ন : তা হলে কিন্তু আরও একটা প্রশ্ন ওঠে, দূরদর্শন তো কেবল নয়, হিন্দি চাপিয়ে দেবার এই চেষ্টা তো অন্যভাবেও হয়েছে। হিন্দি সিনেমা, গান, ক্যাসেট ইত্যাদি। দূরদর্শনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামলে, এসবের বিরুদ্ধেও তো কিছু বলতে হয়। নয় কি?

উত্তর : হিন্দি ভাষার বিরুদ্ধে আমার আপত্তি নেই। হিন্দি সাহিত্য আমি পছন্দ করি। কিন্তু কুরুচিপূর্ণ হিন্দি অনুষ্ঠান, যা দূরদর্শনে প্রচারিত হয়, আমার আপত্তি সেইখানে। আর হিন্দি সিনেমা, সে তো তুমি ইচ্ছে করলে নাও দেখতে পারো। ছেলেমেয়েদের নাও দেখাতে পারো। কিন্তু দূরদর্শন যে শয়নকক্ষে এসে হাজির হয়েছে। একে ঠেকানো যাবে কী করে? আপাতত তাই দূরদর্শন দিয়েই আন্দোলন শুরু হোক।

প্রশ্ন : আপনার কি মনে হয় যে দূরদর্শন সরকারি বলেই, এই বিক্ষোভ? অর্থাৎ আমি বলতে চাইছি, সরকারিভাবে কুরুচিপূর্ণ অনুষ্ঠান প্রচারিত হওয়ার বিরুদ্ধেও কি এই বিক্ষোভ?

উত্তর : সরকারের ভুল নীতিই এর জন্য দায়ী। বেসরকারি উপদেষ্টা কমিটি যদি থাকত, তা হলে তাঁরা ভাষা ও অনুষ্ঠানের মানের উন্নতির দিকে নিশ্চয়ই নজর দিতেন।

প্রশ্ন : এ ক্ষেত্রে, আরও একটা প্রশ্ন ওঠে, তা হল, দূরদর্শন কিন্তু অনেকটাই এখন বেসরকারি হাতে। বিজ্ঞাপনদাতা ও বেসরকারি প্রয়োজকের হাতে সময় বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। এর পিছনে আছে রাজনৈতিক দলগুলির বহুদিনকার দাবি। সুতরাং আন্দোলন যদি করতেই হয় তা হলে বেসরকারিকরণের বিরুদ্ধে করতে হয় না?

উত্তর : না। বেসরকারিকরণের বিরুদ্ধে করতে হয় না। সময় বিক্রি করতে হলে, প্রথমেই শর্ত হবে আঞ্চলিক চ্যানেলগুলিতে আঞ্চলিক ভাষার অনুষ্ঠান করতে হবে। বাংলা সময় বিক্রি হয়ে গেল বোম্বাইয়ের কোম্পানির কাছে—যারা হিন্দি অনুষ্ঠান করবে, তা হবে না। তারপর সেই অনুষ্ঠানের মান কেমন হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। আর একটা কথা, সময় বিক্রি হচ্ছে ঠিক কথা—কিন্তু সরকারি একটা নিয়ন্ত্রণও আছে।

প্রশ্ন : দূরদর্শন থেকে যে বাংলা অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়, সিনেমা এবং গান উপলক্ষে, আমরা দেখি যে বাঙালি শ্রোতা সে বস্তুকে বেশ উপাদেয়ই মানে করে। তা কিন্তু মূলত হিন্দিরই অনুকরণ। সে ক্ষেত্রে ভাষার প্রশ্ন বাদ দিলে, অনুষ্ঠানের গুণগত মান কিন্তু কিছু পালটাচ্ছে না। এবিষয়ে আপনি কী বলেন?

উত্তর : বাংলা অনুষ্ঠানের মান খারাপ। আমি সাধারণভাবে বলছি। দেশ সদ্য স্বাধীন হবার পর অনেকে বলত যে ইংরেজ রাজত্বই ভালো ছিল। বাংলা অনুষ্ঠান খারাপ বলাটা সেইরকমই মূর্খের মতো কথা। আসলে বাংলা অনুষ্ঠানের স্বাধীনতা এত কম—টাকা এত কম দেয়, হিন্দিকে জনপ্রিয় করার জন্য ইচ্ছে করে বাংলাকে কোণঠাসা করা হয়। যদি বাংলার অধিকারটা স্বীকৃত হয়, তা হলে বাংলা অনুষ্ঠানের মানেরও পরিবর্তন হবে। অনেক ভালো ভালো পুরোনো, নতুন বাংলা সিনেমা আছে। তার বদলে হিন্দির অনুকরণে তৈরি বাংলা সিনেমাই দেখানো হয়। বাংলা থিয়েটার কত উন্নত—কিন্তু দূরদর্শনের নাটক দেখলে, সে কথা একবারও মনে হবে?

প্রশ্ন : কথা হচ্ছে, বেসরকারি হাতে দূরদর্শনের চ্যানেল চলে গেলে, সাধারণ এবং অধিকাংশ দর্শক যা পছন্দ করেন, অর্থাৎ হালকা আমোদ-প্রমোদ—তাঁরা তাই দেখতে চাইবেন। কারণ তাঁদের মূল লক্ষ হবে মুনাফা—সুস্থ সংস্কৃতির প্রসার নয়।

উত্তর : ব্যবসা-বাণিজ্যর কথা আমরা চিন্তা করব না। ওটা আমাদের বিষয় নয়, অনুষ্ঠানের মানের উন্নতির জন্য দরকার হলে, দ্বিতীয় পর্যায়ে আন্দোলন শুরু হবে। কিছু কিছু হস্তক্ষেপ দরকারই।

প্রশ্ন : 'দূরদর্শনে বাংলা চাই'—এই স্লোগান খুবই আন্তরিকতাপূর্ণ কিন্তু এটা তো বিচ্ছিন্ন কোনও ঘটনা নয়। আজকে যে 'খোলা বাজারের' নীতি মেনে নেওয়া হয়েছে তাতে গোটা দুনিয়াকেই বাজার হিসেবে ভাবা হচ্ছে। ভারতও তার অংশীদার। এই গোটা নীতিরই একটা অংশ সংস্কৃতি। তাকে কী ভাবে আলাদা ভাবে চিন্তা করা যাবে? এই ব্যবস্থায় সংস্কৃতিও পণ্য মাত্র। এই ব্যাপারে কিন্তু প্রতিবাদ হয়নি। তাহলে আজ প্রতিবাদ করে কী হবে?

উত্তর : তুমি যা বললে, তার সঙ্গে আমাদের দাবির কোনও সংঘাত তো নেই। বাংলা ভাষায় একটা চ্যানেল থাকবে, তাতে আমি ইচ্ছে করলেই বাংলা অনুষ্ঠান দেখতে পাব—এই দাবির সঙ্গে 'খোলা বাজারের' নীতির কোনও বিরোধ নেই।

প্রশ্ন : আরও একটা কথা : আজকের দূরদর্শন কঠিন এক আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার মুখোমুখি। উপগ্রহের সাহায্যে বিদেশি অনুষ্ঠান দেখার সুযোগ আছে। সে ক্ষেত্রে একটা চ্যানেল যদি বাংলাকে দেওয়াও হয়, তা হলে কি বাঙালি দর্শক-শ্রোতা তাতে মন দেবেন? এই প্রতিযোগিতায় বাংলা চ্যানেল টিকে থাকতে পারবে?

উত্তর : এই প্রতিযোগিতাতে নামতেই হবে। এখন তো, অসম প্রতিযোগিতা। প্রতিযোগিতায় নামতেই দিচ্ছে না। তা হলে আর তার উৎকর্ষ প্রমাণিত হবে কী করে? তোমার কোনও 'চয়েস' থাকবে না কেন? এখনই বাংলা অনুষ্ঠান দুর্বল বলছ। সুযোগ না পেলে, আরও দুর্বল হবে। দূরদর্শনে লোক সংগীতের কোনও স্থানই প্রায় নেই। রবীন্দ্রসঙ্গীত কমতে কমতে প্রায় পাঁচ মিনিটে এসে ঠেকেছে। এভাবে কী হবে! যে হিন্দি অনুষ্ঠানের জন্য তিন লক্ষ টাকা বরাদ্দ সেই অনুষ্ঠান বাংলায় হলে পঞ্চাশ হাজার দেওয়া হয়। এ ভাবে কি কোনও প্রতিযোগিতা হয়? আর তুমি যে প্রশ্ন করছ, বাঙালি দেখবে কি না? আমি বলব বাঙালির মধ্যে বাংলা ভাষার প্রতি সেই অনুরাগ আছে। তার একটা প্রমাণ যখন 'ন্যাশানাল প্রোগ্রাম' হয়, তখন অনেক বাঙালিই বাংলাদেশ দেখেন, বাংলাদেশের অনুষ্ঠান ভালো হয় বলে অনেকেই মনে করেন। এর কারণ তাতে জোর দেওয়া হয়।

প্রশ্ন : বিদেশি প্রতিযোগিতাকে নিয়ন্ত্রণ করার ওপর জোর দিয়ে লোকসভায় বিল এসেছে। তার প্রতিবাদও শোনা গেছে। কেউ কেউ একে সেন্সরশিপের সঙ্গে তুলনা করেন। আপনি কি মনে করেন এই ধরনের নিয়ন্ত্রণমূলক বিল প্রত্যাহার করা উচিত?

উত্তর : বিলটা এখনও পর্যন্ত ঠিকমতো আকার পায়নি। চব্বিশ ঘণ্টা দেখাবে, এইরকম বিদেশি চ্যানেলকে যদি সময় দেওয়া হয়, তা সেন্সর করা কারও পক্ষেই সম্ভব নয়। যেমন বিবিসি-র সংবাদ—তা কোথাওই সেন্সার করা যায় না। তা হলে তারা দেখাবেই না। বিলটা এখনও খুব স্পষ্ট নয় তাই মন্তব্য করতে পারছি না। এ ছাড়াও, অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। যেমন ধর, এখানে মদের বিজ্ঞাপন দেওয়া নিষেধ। কিন্তু স্টার টিভি-তে দেওয়া যায় এবং তা এখানে আমরা দেখছি। আমাদের বিজ্ঞাপনদাতারা কোটি কোটি টাকার বিদেশি মুদ্রায় সেইসব বিজ্ঞাপন দিচ্ছেন। সেটা আটকানো উচিত কি না, আগে সেই নীতি ঠিক করা দরকার।

সকল অধ্যায়
১.
বাংলা ভাষার আত্ম-পরিচয়
২.
আ মরি বাংলা ভাষা
৩.
এ বার সমস্ত বিদ্যালয়ে বাংলা আবশ্যিক
৪.
বাংলা আছে, থাকবে
৫.
বাঙালি ও বাংলা ভাষা
৬.
বাঙালি কে? আমি কি বাঙালি?
৭.
আর কতদিন সহ্য করব?
৮.
বাঙালি, বাঙালিত্ব—জাতি ও সংস্কৃতি
৯.
দুই বাংলার বাঙালি
১০.
ইতিহাসের পরিহাস
১১.
ভাষার সূক্ষ্মতা ও সংস্কার
১২.
আমাদের হ্রস্সি দীর্ঘি জ্ঞান
১৩.
প্রবাসে বাংলা ভাষা
১৪.
প্রবাসী বাঙালি : সার্থকতা ও পরের প্রজন্ম
১৫.
কিন্তু মাতৃভাষা ছাড়া কি সাহিত্যসৃষ্টি সম্ভব?
১৬.
বাঙালি সংস্কৃতির উত্তরাধিকার
১৭.
আগামী প্রজন্মের বাঙালি
১৮.
বাঙালি অনেক, মুছে যাচ্ছে বাংলা
১৯.
হিস্ট্রি চ্যানেল হিন্দিতে কেন, বাঙালি আজও সর্বংসহা
২০.
বিশ্ব বইমেলা এবং প্রবাসে বাংলা
২১.
স্বাধীন বাংলাদেশ
২২.
সীমান্তে দুবার
২৩.
চলো, আমরাও যাই
২৪.
ওদের সংগ্রামের দিকে তাকিয়ে আমরা
২৫.
বাংলাদেশ কিছুটা অজানা, অচেনা
২৬.
সেদিনের স্মৃতি
২৭.
একুশে ফেব্রুয়ারির গভীর রাত্রে
২৮.
কয়েকটি ছোটখাটো জরুরি বিষয়
২৯.
পাশাপাশি এসে দাঁড়ানোই বড় কথা
৩০.
বাংলাদেশের সঙ্গে আমার নাড়ির টান
৩১.
ধনসম্পদ গেছে, মানসম্মানও যেতে বসেছে
৩২.
পশ্চিমবঙ্গে বাংলা চাইছি, আনন্দবাজারের আপত্তি কেন?
৩৩.
নাম বদলের সৎ প্রস্তাব তাতেই এত বিরুদ্ধ হইহল্লা?
৩৪.
রাকা রায় ওদিকে একলা লড়াই চালাবেন?
৩৫.
যত দূরেই যাই
৩৬.
দৃশ্যপটে বাংলা : প্রয়োজনে চাই ভাষা-পুলিশ
৩৭.
সামনে তাকালে বাংলা অক্ষর চোখেই পড়ে না!
৩৮.
প্রতিবাদের ভাষা কেন কলুষিত হবে?
৩৯.
নিজস্ব ভাষা
৪০.
আগে বাংলা অনুষ্ঠানের জন্য একটা আলাদা চ্যানেল চাই
৪১.
যে প্রশ্নের উত্তর এখনও জানি না
৪২.
বাঙালি কোথায় নেই? বাঙালি এখন কোথায়?
৪৩.
আগামী বছরে দুর্গোৎসব হবে ডিসেম্বর মাসে
৪৪.
মঞ্চে আবার যেন সোনালি যুগ

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%