হেমেন্দ্রকুমার রায়
গল্পকে আমরা গল্প বলেই গ্রহণ করি এবং সত্যিকার মানুষের জীবনের সঙ্গে তার যে কোনো বিশেষ সম্পর্ক আছে, প্রায়ই এমন কথা মনে করি না। কিন্তু অনেক সময়ে সত্যিকার মানুষের জীবনও যে এমন কত বিচিত্র ঘটনা সৃষ্টি করতে পারে, যেসব হয়ে দাঁড়ায় গল্পের চেয়েও অদ্ভুত, এটা বোধহয় সকলে সহজে ধারণা করতে পারবেন না।
ঠিক তারিখ মনে নেই, তবে ছত্রিশ-সাঁইত্রিশ বৎসর কিংবা তারও আগেকার কথা।
'ইন্ডিয়ান ডেলি নিউজ' অথবা 'স্টেটসম্যান'-এর একটি খবরে জানা গেল যে, নিমতলার শ্মশানে এক অলৌকিক শক্তিশালিনী নবীন সন্ন্যাসিনীর আবির্ভাব হয়েছে এবং তাঁকে দর্শন করবার জন্যে চারিদিক থেকে আসছে দলে দলে লোক। খবরের কাগজে সন্ন্যাসিনীর বা ভৈরবীর একখানি ছবিও যেন দেখেছিলুম বলে মনে হচ্ছে।
কলকাতার শ্মশানগুলি হচ্ছে চিত্তাকর্ষক জায়গা। সেখানে কেবল অসাড় মৃতদের ঘিরে মুখর জীবন্তরা অশ্রু-করুণ নাটকীয় দৃশ্যেরই অবতারণা করে না, সেই সঙ্গে তাদের আকাশপথ দিয়ে আনাগোনা করে এমন সব অদ্ভুত চরিত্রের মানুষ, বড়ো বড়ো নাটকের পাত্রপাত্রীরূপেও অনায়াসে যারা আত্মপরিচয় দিতে পারে। মৃত্যুর সামনে বসেও তারা থাকে মৃত্যু সম্বন্ধে সম্পূর্ণ নির্বিকার।
বিশেষ করে ওদের দেখবার জন্যেই আমি এ শ্মশানে-ও শ্মশানে কতবার যে ঘুরে বেড়িয়েছি, তার আর সংখ্যা নেই। সাধারণত শ্মশানে যাই আমি রাত্রিকালেই। কারণ, ওসব জায়গায় ভালো করে জমে ওঠে রাত্রির দৃশ্যই।
একে সন্ন্যাসিনী অলৌকিক শক্তিশালিনী, তার উপর আবার নবীন বয়সেই হয়েছেন শ্মশানবাসিনী। সংবরণ করতে পারলুম না তাঁকে দেখবার প্রলোভন। দর্শনার্থীর জনতা হালকা হবে এই আশায় একটু বেশি রাতেই শ্মশানের দিকে যাত্রা করলুম।
আয়োজনের কোনো ত্রুটিই ছিল না।
সন্ন্যাসিনী আস্তানা গেড়েছেন শ্মশানের বাইরে, গঙ্গার ঢালু পাড়ের উপরে। সামনে জ্বলছে ধুনি। পাশেই মাটির ভিতরে পোঁতা সিন্দূরারক্ত ত্রিশূল। নবীন সন্ন্যাসিনী নিমীলিত নেত্রে একটা হ্যারিকেন লন্ঠনের আলোতে একখানা ছোটো বইয়ের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে যেন কী মন্ত্রপাঠ করছেন। পরনে তাঁর রক্তবসন। গায়ে জামা নেই, কাপড়ের ভিতর থেকে ফুটে উঠেছে পীবর বক্ষের সুডৌল গঠন। রং কালো হলেও দেহে আছে যৌবনের লালিত্য। টানা ভুরু, টানা চোখ, এলানো চুল। বয়স হবে চব্বিশ কি পঁচিশ। ভাবছিলুম, এই কাঁচা বয়সে ইনি তপস্যার দ্বারা অলৌকিক শক্তি অর্জন করলেন কেমন করে?
সন্ন্যাসিনী হঠাৎ চোখ তুলে আমার দিকে তাকালেন—ক্ষণিকের জন্যে। দৃষ্টির মধ্যে কোনো অলৌকিক উচ্চভাব নেই, আছে লৌকিক বিলাসের বিদ্যুৎলীলা। এতটা দেখবার জন্যে প্রস্তুত ছিলুম না। মনে লাগল চমক।
রাত এগারোটা হবে। কিন্তু তখনও সন্ন্যাসিনীর দিকে তাকিয়ে এখানে অপেক্ষা করছে কয়েকজন লোক তীর্থের কাকের মতো। লোকগুলির শ্রদ্ধাভক্তি যে মূল্যবান, ধুনির পাশে সাজানো তাম্রপাত্রের দিকে তাকালে সেটা বুঝতে বিলম্ব হয় না। তার উপরে জমে আছে পয়সা, সিকি, আধুলি, টাকা। অনেকে ফলমূলও উপহার দিয়েছে দেখলুম।
সন্ন্যাসিনীর দুইপাশে বসে আছে দুইজন পুরুষ। বোধহয় চ্যালা। একজন হেঁট হয়ে সন্ন্যাসিনীর কানে কানে কী বললে। বেশ শুনলুম, সন্ন্যাসিনী একটু হেসে মৃদুস্বরে বললে, 'মাইরি?'
আর কিছু দেখবার বা শোনবার প্রবৃত্তি হল না। ঢালু পাড়ের উপর দিয়ে চললুম শ্মশানঘাটের সিঁড়ির দিকে। সেখানেও আবার আর-এক দৃশ্য।
ঘাটের রানার উপরে আসনপিঁড়ি হয়ে জাঁকিয়ে বসে আছে এক দীর্ঘবপু হৃষ্টপুষ্ট পুরুষ। তার কালো রং, লম্বা লম্বা চুল উসকোখুসকো, জোড়া ভুরুর তলায় ছোটো ছোটো কিন্তু ধারালো চক্ষু, খোঁচা খোঁচা দাড়ি-গোঁফ, গায়ে একটা আধময়লা গেঞ্জি, কাপড় কোমর বেঁধে পরা। তার বয়স পঁয়তাল্লিশের কম হবে না। সামনে রয়েছে একটা দেশি মদের বোতল, তিন-চারটে মাটির ভাঁড়, আর একটা শালপাতার ঠোঙায় বোধহয় কিছু খাবারদাবার। তার এপাশে-ওপাশে বসে আছে আরও তিনজন লোক।
দীর্ঘবপু একটা মদভরা ভাঁড় এক চুমুকে নিঃশেষ করে বাঁ হাতের চেটো দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বললে, 'কেন রে তিনু, মদ খাবিনে কেন?'
তিনু নামধারী লোকটি বললে, 'তোমার এখানে বসে মড়া দেখতে দেখতে আমার মদ খেতে ইচ্ছে হয় না।'
'ওরে মুখ্যু, মড়াদের সঙ্গে আমাদের কতটুকু তফাত রে? গেল কাল ওরা ছিল আমাদেরই মতো জ্যান্ত। আবার আসছে কাল আমরা হতে পারি ওদেরই মতন মড়া। আমরা নিশ্বাস ফেলতে পারি, আর ওরা নিশ্বাস ফেলতে পারে না, তফাত তো খালি এইটুকু! তবে তুই মদ খাবিনে কেন?'
দার্শনিক মাতাল, মন্দ নয়। আরও দুই পা এগিয়ে দাঁড়ালুম।
দীর্ঘবপুর দৃষ্টি হঠাৎ আমার দিকে আকৃষ্ট হল। খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললে, 'তুমি আবার কে বাবা?'
বললুম, 'তোমার মতোই মানুষ।'
'তা তো দেখছি। এই বয়সে এত রাতে এখানে দাঁড়িয়ে কেন?'
'তোমার কথা শুনছি।'
লোকটা হো হো করে হেসে উঠে বললে, 'আমার কথা? আমি একটা ডাকসাইটে মাতাল, আমার কথার না আছে মুন্ডু, না আছে মাথা। তা আবার শুনবে কী?'
'তোমার নাম কী?'
'মাতাল।'
'ওটা নাম নয়। অন্য নাম বলো।'
'আমার পরিচয় জেনে লাভ নেই। সবাই আমাকে রাজা বলে ডাকে, তুমিও ডাকতে পারো। কিন্তু এত কথা জিজ্ঞাসা করছ, তুমি কে বলো তো? পুলিশের লোক নাকি?'
'না।'
'তোমার নাম?'
'তুমি নিজের নাম বললে না, আমিও বলব না।'
'নিধুবাবুর টপ্পায় আছে—''শুধু নামে কী করে''! তোমার নাম আমি জানতে চাই না। আমি তোমাকে বাবু বলে ডাকি, কেমন?'
'বেশ।'
'আচ্ছা বাবু, সত্যি করে বলো দেখি, এখানে তুমি কী করতে এসেছ।'
'ওই সন্ন্যাসিনীকে দেখতে।'
'দেখা হয়েছে?'
'হ্যাঁ।'
'দেখে কী বুঝলে বাবু?'
'কিচ্ছু বুঝিনি রাজা, কিচ্ছু বুঝিনি।'
রাজা মুখ ফিরিয়ে একবার সন্ন্যাসিনীর দিকে দৃষ্টিপাত করলে। তার চোখ দুটো একবার উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তারপর ধীরে ধীরে বললে, 'সাধুসন্ন্যাসীদের বাইরে থেকে দেখে ভেতরের কথা কজন লোক ধরতে পারে?'
'তুমি ওকে কদিন দেখছ?'
'হপ্তাখানেক।'
'কিছু বুঝেছ কি?'
'বোধহয় কিছু কিছু বুঝেছি।'
'কী বুঝেছ বলো।'
'আজ নয়, কাল এসো, বলব।'
'এইখানেই দেখা হবে তো?'
'হ্যাঁ, এই তো আমাদের রাতের বৈঠক। তবে রাত বারোটার আগে এসো না।'
'বেশ, তা-ই আসব।'
চলে যাবার উপক্রম করছি, রাজা আবার পিছু ডাকলে, 'বাবু, শুনছ?'
'আবার কী শুনব?'
'চকোরের জ্যোৎস্না ফুরোয়, মাতালের মদ ফুরোয়। তখন চকোর আর মাতালের দুঃখের অবধি থাকে না গো! এই দেখো, আমার বোতল ঢুঁ ঢুঁ।' রাজা বোতলটা তুলে দেখালে।
'তোমার মনের কথা কী?'
'খুব স্পষ্ট। সঙ্গে যা আছে, পুরো এক বোতলের দাম হবে না। একটা টাকা ছাড়তে পারো বাবু?'
তার অনুরোধ ঠেলতে পারলুম না।
পরদিন। রাত বারোটা।
নিমতলার শ্মশানের ভিতরে পা দিয়েই শুনলুম, গঙ্গার ওদিকে বসে কে গাইছে—
'সুরাপান করিনে আমি, সুরা খাই মা তারা বলে।
মন-মাতালে মেতেছে আজ, যত মদ-মাতালে মাতাল বলে।'
ঘাটে গিয়ে রাজা বা তার সাঙ্গোপাঙ্গদের দেখা পেলুম না। কিন্তু ডানদিকে ফিরেই সচমকে দেখি, ভৈরবীর আসরে রাজা বিরাজমান সদলবলে! ধুনির আলো আজ আরও জোরালো, হ্যারিকেন লন্ঠনও একটার বদলে দুটো।
গান ধরেছিল রাজাই, চোখ তার ঢুলুঢুলু, হাতে তার মদের ভাঁড়।
এগুব না পালাব ভাবছি, হঠাৎ রাজা আমাকে দেখতে পেলে। চেঁচিয়ে বলে উঠল, 'এই যে, বাবু যে! আরে, পরের মতো ওখানে দাঁড়িয়ে কেন, কাছে এসো বাবু, কাছে এসো।'
কাছে গিয়ে দেখলুম, প্রত্যেকেরই হাতে মদের ভাঁড়—এমনকী ভৈরবীরও। শুধালুম, 'আজ বাইরের ভক্তরা গেল কোথায়?'
রাজা বললে, 'সব শালা বাড়ি গিয়েছে।'
ভৈরবী এড়িয়ে এড়িয়ে বললে, 'যাবে না তো এইখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তোর গালাগাল শুনবে নাকি?'
রাজা সে কথায় কান না পেতে বললে, 'ভৈরবীর দয়ায় আমরাও সবাই আজ ভৈরব হয়েছি। তুমিও দলে ভিড়ে যাও বাবু।'
ভৈরবী দুলতে দুলতে বা টলতে টলতে বললে, 'তুমিও একটু কারণবারি নাও বন্ধু! এ যে-সে কারণ নয়, আমি নিজে মন্ত্র পড়ে দিয়েছি, এ খেলে নেশা হয় না।'
নেশাই হয় না বটে। ভৈরবী নিজেই নেশায় এমন বুঁদ হয়ে আছে যে, সোজা হয়ে বসতে বা ভালো করে চোখ মেলে তাকাতেও পারছিল না।
রাজা বললে, 'বেশ বাবু, মদ না খাও, খানিকটা মহাপ্রসাদ তো নিতে পারো?'
'মহাপ্রসাদ?'
'হ্যাঁ। অর্থাৎ সাক্ষাৎ মা-কালীর সামনে বলি-দেওয়া কচি পাঁটা-ভোগ। আজ ষোড়শোপচারে মায়ের সাধনা হবে।'
আমি বললুম, 'না রাজা, এইমাত্র খেয়েদেয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়েছি।'
ভৈরবী ঠোঁট ফুলোবার চেষ্টা করে বললে, 'বন্ধু, তুমি বদরসিক।' তার পরেই গুনগুন করে গান ধরলে—
'আমার এমন দিন কি হবে মা তারা।
যবে তারা তারা তারা বলে
তারা বেয়ে পড়বে ধারা!'
রাজা উৎসাহিত কণ্ঠে বলে উঠল, 'দেখো বাবু, দেখো। ভৈরবীদের বাইরে থেকে দেখে সব সময়ে চেনা যায় না। চেয়ে দেখো, সত্যি সত্যিই ভক্তিভরে ভৈরবীর চোখ দিয়ে আজ ধারা ঝরছে!'
হ্যাঁ, কাঁদছে বটে ভৈরবী—কিন্তু ভক্তির আতিশয্যে না নেশার মহিমায়, সেইটেই হচ্ছে প্রশ্ন।
রাজা আবার বললে, 'কেঁদো না ভৈরবী, কেঁদো না! এই নাও, আর-একটু কারণবারি খাও, প্রাণটা ঠান্ডা হবে।' সে নিজের ভাঁড়টা ভৈরবীর মুখের কাছে এগিয়ে দিলে।
ভৈরবী আর-এক চুমুক মদ্যপান করতে গিয়েও পারলে না, হঠাৎ টলে পড়ে মাটির উপরে হল লম্বমান।
রাজা চিৎকার করে বললে, 'ওরে তিনু, ওরে মোনা। ভৈরবীর ভাব হয়েছে রে, ভাব হয়েছে। ওকে হাওয়া কর, ওর মুখে জল দে!' (তারপর আমার দিকে ফিরে) 'দেখছ বাবু, ভক্তির জোর? এইবারে ভৈরবীকে চিনেছ তো?' তার কণ্ঠস্বর শুনে বোঝা গেল না, সে ব্যঙ্গ করছে কি না।
তারপর ভৈরবীর অচেতন দেহ নিয়ে সবাই যখন অত্যন্ত ব্যস্ত হয়ে উঠল, সেই ফাঁকে আমি চটপট সরে পড়লুম বুদ্ধিমানের মতো।
শ্মশানের বাইরে এসে অস্বস্তির নিশ্বাস ফেলে ভাবলুম, যাক, ভৈরবী-রহস্যটা একেবারে পরিষ্কার হয়ে গেল।
কিন্তু যে খবরের কাগজওয়ালারা ফোটো তুলে এদের নাম জ্ঞাপিত করে, তাদের হাঁড়ি হাটের মাঝে ভেঙে না দিয়ে ছাড়ব না।
তবু শেষ পর্যন্ত সেটা আর করা হয়নি। আমার দুর্বলতাই এখানে। রাগের মাথায় যা নিশ্চয়ই করব বলে মনে করি, রাগ জল হয়ে গেলে পর ইচ্ছা করলেও আর তা করতে পারি না।
কিন্তু ভৈরবী এবং রাজার বিচিত্র ইতিহাস এখনও শেষ হয়নি, অবশিষ্ট আছে আরও কিছু। এবং এই যৎকিঞ্চিতের মধ্যেই পাওয়া যাবে সত্যিকার মানুষের জীবন-নাট্য। যা বলব তা গল্পলেখকের কল্পনা নয়, আমার নিজের চোখে দেখা ঘটনা।
কেটে গেল মাস দেড়েক।
মনে একদিন প্রশ্ন জাগল, ভৈরবী আর রাজার খবর কী?
পায়ে পায়ে এগিয়ে চললুম নিমতলার শ্মশানের দিকে। রাত তখন প্রায় এগারোটা।
কিন্তু শ্মশানে প্রবেশ করবার আগেই দেখি, ভিতর থেকে প্রায় টলোটলো অবস্থায় বেরিয়ে আসছে স্বয়ং রাজা।
শুধালুম, 'কী হে রাজা, চিনতে পারো?'
রাজা একগাল হেসে বললে, 'এককথায় এক টাকার দম খাইয়েছিলে, চিনতে আবার পারব না?'
'আজ যে তুমি বড়ো একলা। তোমার স্যাঙাতরা কোথায়?'
'বাসায়। আজকাল বাসাতেই বৈঠক বসে কিনা? আমার বাসা দেখবে তো চলো আমার সঙ্গে। ময়নাও সেখানে আছে।'
'ময়না? ময়না কে আবার?'
'তোমাদের সেই শখের ভৈরবী গো! তার নাম যে ময়না।'
বিস্মিত কণ্ঠে বললুম, 'সে তোমার বাসায় কেন?'
'গঙ্গার ধারে আর তার থাকবার উপায় নেই। ময়না ভৈরবী সেজে যেখানে আস্তানা গেড়েছিল, সে জায়গাটা আগে ছিল আর-এক বুড়ি ভৈরবীর দখলে। হঠাৎ শরীর খারাপ হওয়ায় বুড়ি বুঝি দিনকয়েকের জন্যে কোথায় হাওয়া খেতে গিয়েছিল; তারপর ফিরে এসে দেখে তার আস্তানা বেদখল হয়ে গিয়েছে। তখন বুড়ি আর ছুঁড়ি দুই ভৈরবীতে লেগে গেল দস্তুরমতো চুলোচুলি কাণ্ড! আর সে কী কাঁচা খিস্তি রে বাবা, শুনলে কানে আঙুল দিতে হয়। কিন্তু কাঁচা খিস্তিতে বুড়ি ছিল পাকা, ময়না তার সঙ্গে পারবে কেন? কাজেই শেষটা তাকেই চম্পট দিতে হল তল্পিতল্পা গুটিয়ে। আমি তখন তাকে বললুম, ''ময়না, এই সোমত্ত বয়সে পথে-বিপথে টো টো করে ঘুরে মরবি কেন, তার চেয়ে আমার বাসায় চল, দুজনে মিলে মনের সুখে ঘরসংসার পাতব।'' ময়না বড়ো সেয়ানা মেয়ে, আমার কথায় রাজি হয়ে গেল তখনই। সেইদিন থেকে আমরা আছি মানিকজোড়ের মতো। ময়নাকে দেখতে চাও তো আমার সঙ্গে চলো।'
যাকে দেখেছিলুম ভৈরবীরূপে, এখন নতুন রূপে তাকে দেখতে কেমন হয়েছে, জানবার আগ্রহ হল। রাজার সঙ্গে চললুম গুটিগুটি।
জোড়াবাগান অঞ্চলের এক বস্তি। একখানা দোতলা মাঠ-কোঠার সামনে দাঁড়িয়ে রাজা বললে, 'এই আমার বাসা, বাবু।'
রাস্তার ধারে একখানা চাটের দোকানে পাশাপাশি সাজানো রয়েছে গলদাচিংড়ি, কাঁকড়া, ডিম, চপ ও কাটলেট প্রভৃতি। দোকানি বসে বসে সশব্দে ভাজছে বড়ো বড়ো পরোটা।
দোকানের পাশেই প্রবেশপথ এবং পথ জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে প্রাণপণে সেজেগুজে কয়েকটা নারীমূর্তি, চক্ষু তাদের বুভুক্ষু।
রাজা কর্কশকণ্ঠে বললে, 'সরে দাঁড়া। বাবুর দিকে অমন করে তাকাচ্ছিস কেন? বাবু তোদের খোরাক হতে আসেনি।'
কোনোরকমে পাশ কাটিয়ে মাঠ-কোঠার ভিতরে ঢুকলুম। সামনেই একখানা কাঠের সিঁড়ি। উপরে উঠতে উঠতে শুনলুম হারমোনিয়ামের সঙ্গে কে গান ধরেছে—
'কেটে দিয়ে প্রেমের ঘুড়ি আবার কেন লটকে ধরো?
এক টানেতে বোঝা গেছে তোমার সুতোয় মাজা খর।'
রাজা বললে, 'ময়না গাইছে। আড্ডা খুব জমে উঠেছে দেখছি। এসো বাবু, এই ঘরে।'
ঘরের একপাশে ধবধবে বিছানা-পাতা খাট। তার উপরে তাকিয়া ও বালিশের ভিড়। একপাশে একটা আয়না-বসানো আলমারি। দেওয়ালের গায়ে নানা আকারের কতকগুলো ছবি—বিলাতি ছবি, ঠাকুর-দেবতার ছবি, কালীঘাটের পট। দেওয়াল-আলনায় খানকয় কোঁচানো শাড়ি।
ঘরের মেঝেয় মাদুরের উপরে বসে আছে রাজার স্যাঙাতরা। সকলেই মদ্যপান করছে— কেউ কলাই-করা গেলাসে, কেউ হাতল-ভাঙা চায়ের পেয়ালায়। মাঝখানে বিরাজমান হারমোনিয়াম এবং ময়না খোঁপায় তার বেল ফুলের মালা; মুখে তার রং-পাউডার ও কাচপোকার টিপ; পরনে তার রামধনু-রঙের শাড়ি, নাকে, কানে, গলায় ও হাতে নাকছাবি, ইয়াররিং, চেন-হার, তাগা আর চুড়ি-বালা এবং তার কোলের উপরে আরাম করে বসে আছে একটা ল্যাজ-মোটা বিড়াল। শ্মশানবাসিনী, নিরাভরণা, রক্তাম্বরা ভৈরবীর অপূর্ব রূপান্তর!
আমি ঘরে ঢুকতেই থেমে গেল গান ও বাজনা।
রাজা বললে, 'কী রে ময়না, বাবুকে চিনতে পারিস?'
ময়না খিলখিল করে হেসে উঠে ভুরু নাচিয়ে বললে, 'একবার যাকে দেখি তাকে কি আর ভুলি ইয়ার? তুমি তো আমার সেই গঙ্গাতীরের বন্ধু।' বলেই সে একটা বিড়ি তুলে নিয়ে ধরিয়ে ফেললে।
আমার গা ঘিনঘিন করতে লাগল। তারপর আরও মিনিট পাঁচেক কোনোরকমে কাটিয়ে কেমন করে ওজর দেখিয়ে সেখান থেকে পালিয়ে এলুম, সেসব কথা আর না বললেও চলবে।
ছয়
মাস আষ্টেক পরের ঘটনা। এর মধ্যে রাজার সঙ্গে আর দেখা হয়নি। দেখা করবার ইচ্ছাও ছিল না।
একদিন সকালে প্রসন্নকুমার ঠাকুরের ঘাটে গঙ্গাস্নান সেরে উপরে এসে উঠেছি, হঠাৎ দেখি রাজা দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার উপরে।
তার চেহারা বদলে গেছে। কী শ্রান্ত-ক্লান্ত দেখাচ্ছে তাকে! চোখের তলায় কালি, উদাস দৃষ্টি, বিশীর্ণ দেহ, আদুড় গা, খালি পা।
সবিস্ময়ে বললুম, 'রাজা?'
ঠোঁটে একটু ম্লান হাসি মাখিয়ে রাজা বললে, 'হ্যাঁ বাবু।'
'এখানে কী করছ?'
'খুঁজছি।'
'কাকে?'
'ময়নাকে।'
'সে কোথায়?'
'সেইটেই তো জানি না।'
'এ আবার কী কথা?'
রাজা করুণস্বরে বললে, 'বাবু, ময়না আমার পালিয়ে গিয়েছে।'
'পালিয়ে গিয়েছে! কেন?'
'তা আমি জানি না। তাকে বড়ো আদরে রেখেছিলুম। জামা, কাপড়, গা-মোড়া গয়না কিছুই দিতে বাকি রাখিনি। তবু সে পালিয়ে গিয়েছে আর যাবার সময় আমার বাক্স থেকে নিয়ে গিয়েছে একশো পনেরো টাকা।'
'সেই টাকার জন্যেই কি তুমি ময়নাকে খুঁজছ?'
দুঃখিতভাবে মাথা নেড়ে ভর্ৎসনার স্বরে রাজা বললে, 'টাকা? না বাবু, না। আমি টাকা চাই না, আমি ময়নাকে চাই।'
'এমন একটা দুষ্ট স্ত্রীলোকের জন্যে তোমার এত খোঁজাখুঁজি কেন রাজা?'
হঠাৎ উত্তেজিত কণ্ঠে রাজা বলে উঠল, 'খুঁজব, খুঁজব! যতদিন তাকে ফিরে না পাই, ততদিন ধরে খুঁজে বেড়াব। ময়না দুষ্ট তো আমার কী? আমি তাকে ভালোবাসি বাবু, ময়নাকে আমি ভালোবাসি— হ্যাঁ, বড়ো ভালোবাসি।' বলতে বলতে সে হনহন করে চলে গেল।
রাজা ময়নাকে খুঁজে পেয়েছিল কি না জানি না। কারণ তার সঙ্গে আর আমার দেখা হয়নি।
মাসিক বসুমতী, অগ্রহায়ণ ১৩৫৫ (নভেম্বর ১৯৪৮)
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।