হেমেন্দ্রকুমার রায়
(ভামিনী-জীবনী—৪ পরিচ্ছেদ)
গঙ্গারাম হাতি মহাশয় বৈষ্ণবধর্মের চরম ভক্ত। বিষম শাক্ত ভামিনীভূষণের কিন্তু ইহাতে আপত্তি করিবার কিছুমাত্র কারণ ছিল না।
তবে হ্যাঁ, গঙ্গারাম আজকাল যে প্রত্যহ রাতদুপুর পর্যন্ত, একদল হেঁড়ে-গলা নেড়া-মাথা ভক্তের সঙ্গে সংকীর্তন সুধারসে প্রাণপণে প্রমত্ত হইয়া থাকেন, ভামিনীর ইহার বিরুদ্ধে অভিযোগ করিবার যথেষ্ট কারণ বর্তমান ছিল বটে।
সেরাত্রে ভামিনী শয়ন করিবার আগে জানলার কাছে গিয়া বিস্ফারিত নেত্রে দেখিলেন, গঙ্গারাম হাতি অনেকগুলি বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে ঊর্ধ্ববাহু হইয়া, ঘাড় ও কোমর বাঁকাইয়া বিপুল আনন্দে বিপুলতর ভুঁড়ি দুলাইয়া নৃত্য এবং সেই সঙ্গে ষণ্ড-কণ্ঠের চিৎকারের দ্বারা সংগীতের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সমাধা করিতেছেন,
'বোল হরিবোল, বোল হরিবোল,
যায় যাবে জীবন যাবে, তবু হরিবোল—'
'যায় যাবে জীবন যাবে তবু হরিবোল?—উঃ! এরা বলে কী?'—ভামিনী সভয়ে চমকাইয়া উঠিয়া তাড়াতাড়ি জানলা বন্ধ করিয়া দিলেন। কিন্তু জীবন গেলেও যে সাংঘাতিক 'হরিবোল' থামিবার নাম করে না, তুচ্ছ বদ্ধ জানলাকে সে কি কখনো ডরায়? জানলা ফুঁড়িয়া তাহা বেপরোয়ার মতো সবেগে ঘরের ভিতরে প্রবেশ করিতে লাগিল। 'হরিবোল'-এর মতন অমন মধুর ধ্বনি যে কতটা ভয়ানক হইয়া উঠিতে পারে, শবদাহীর মুখে ভামিনী অনেকবার তাহার প্রমাণ পাইয়াছিলেন! এখন তিনি দেখিলেন, এদিকে সময়ে সময়ে শ্রেণিবিশেষের কীর্তন-গায়করাও বড়ো কম যান না! একে তো পুরুষকে নাচিতে দেখিলেই ভামিনীর ধৈর্যের বহর বিলক্ষণ কমিয়া যাইত, তাহার উপর কিনা মরিয়া হইয়া হুংকার করিয়া এই 'জীবন গেলেও হরিবোল'! ভামিনী একেবারে হাল ছাড়িয়া দিয়া বলিয়া উঠিলেন, 'নাঃ, এ একটা ভূমিকম্প, একটা লম্ফঝম্প, একটা হত্যাকাণ্ড! এ বাড়ি থেকে তাড়ালে দেখচি!'
বারংবার চমকাইয়া আঁতকাইয়া শিহরিয়া, অনেকবার হতাশভাবে এপাশ-ওপাশ করিয়া, আপাদমস্তক লেপ মুড়ি দিয়া ভামিনী শেষটা সত্য সত্যই সেই প্রায়-অসাধ্য কার্যটি সম্পন্ন করিয়া ফেলিলেন—অর্থাৎ, কোনোগতিকে কায়ক্লেশে এ যাত্রা ঘুমাইয়া পড়িলেন।
* * *
ভামিনী ঘুমাইয়া ঘুমাইয়া হাস্যমুখে সুখস্বপ্ন দেখিতেছিলেন, এই বিকট হরিনামভীত স্বয়ং শ্রীহরির অব্যর্থ অভিশাপে, গঙ্গারাম প্রমুখ কীর্তনীয়ারা একেবারে বদ্ধ বোবা হইয়া গিয়া সাশ্রুনেত্রে নীরবে হাহাকার করিতেছেন, এমন সময়ে কে তাঁহার গা ধরিয়া ঘন ঘন নাড়া দিয়া বলিল, 'ওগো, শুনচ? ওঠো, ওঠো!'
অন্ধকার ঘরে চক্ষু মেলিয়া ভামিনী লেপের ভিতর হইতে অত্যন্ত অনিচ্ছাসত্ত্বেও মুখটি ঈষৎ বাহির করিলেন।
দুর্গাকালী ত্রস্তস্বরে বলিল, 'ওগো! ওঠো ওঠো—শিগগির! সর্বনাশ হয়েচে!'
ভামিনী বিছানার উপরে তাড়াতাড়ি উঠিয়া বসিয়া বলিলেন, 'অ্যাঁ? কী হয়েচে?'
'নীচের ঘরে চোর এসেচে!'
'চোর? বটে, বটে!'— ভামিনী তাড়াতাড়ি আবার শুইয়া পড়িয়া, সুড়সুড় করিয়া লেপের ভিতরে গিয়া ঢুকিলেন।
লেপখানা একটানে সরাইয়া দিয়া দুর্গাকালী বলিলেন, 'ও কী! চোর এসেচে শুনে শুয়ে পড়লে যে বড়ো?'
রাত্রের অন্ধকারে বাড়িতে চোর আসা, ভামিনী যারপরনাই অপছন্দ করিতেন। তাঁহার মতে, ভগবান রাত্রিকালটা সৃষ্টি করিয়াছেন, প্রিয়তমার কোমল বাহুবেষ্টনের মধ্যে নিশ্চেষ্টভাবে আপনার সর্বাঙ্গে এলাইয়া, নিরাপদে ঘুমাইয়া আরাম করিবার জন্য;—অন্তত বিপত্নীক না হইলে, এ সময়ে নির্বোধের মতো পরের বাড়িতে নৈশভ্রমণে যাওয়া কর্তব্য নয়! সুতরাং তিনি বিরক্তস্বরে বলিলেন, 'চোর এসেচে তো আমি কী করব?'
অন্য সময়ে এমন কথা শুনিলে দুর্গাকালী গালে হাত দিয়া দস্তুরমতো অবাক হইয়া হইয়া যাইতেন। কিন্তু এখন আর অবাক হইবার একতিলও সময় ছিল না,— সে ধিক্কার দিয়া বলিয়া উঠিল, 'ছি ছি গলায় দড়ি! হ্যাঁ গা, তুমি না পুরুষমানুষ!'
স্ত্রী-র মুখে এমন বিষম টিটকারি অতি বড়ো কাপুরুষেও সহিতে পারে না। ভামিনী কী আর করেন—আস্তে আস্তে উঠিয়া বসিয়া একবার শেষ চেষ্টা করিয়া বলিলেন, 'তোমার ভুল হয়েচে দুর্গাকালী! চোর-টোর কিছু আসেনি, খামোখা আমার ঘুমটা ভাঙিয়ে দিলে!'
'ভুল শুনেচি বই কী, নীচে গিয়ে একবার দেখেই এসো-না!'
এই যে নীচেয় গিয়া চোরের সঙ্গে দেখাশুনা করা, এইখানেই ভামিনীর ছিল পরম আপত্তি! তাঁর মনে পড়িল সেই এক রায়বাহাদুরের গল্প। এমনি এক ঘুটঘুটে অন্ধকার রাত্রে, রায়বাহাদুরের স্ত্রী-ও ঘুমন্ত স্বামীকে জাগাইয়া বলিয়াছিলেন, ওগো বেরিয়ে দেখো, বাড়িতে চোর এসেছে! রায়বাহাদুর শুনিয়া ঘৃণাভরে জবাব দিয়াছিলেন, আসুক গে! জানো, লাটসাহেব আমার সঙ্গে 'শেকহ্যান্ড' করেন, আর আমি যাব কিনা এই রাত্রে ঘুম থেকে উঠে যতসব ছোটোলোক চোরছ্যাঁচড়ের সঙ্গে দেখা করতে? লোকে শুনলে যে ছি ছি করবে—আমার কত বড়ো মান তা জানো?
হায় রে, ভামিনীর যদি নিদেন একটা রায়সাহেব খেতাবও থাকিত! তাহা হইলে তিনিও আজ এক দাবড়িতে দুর্গাকালীর মুখর মুখ বন্ধ করিয়া দিতে পারিতেন!
হঠাৎ নীচের ঘরে একটা হাঁড়ি ভাঙার শব্দ হইল!
দুর্গাকালী বলিয়া উঠিল, 'ওই যাঃ! মা-র কাছ থেকে আজ যে ক্ষীরমোহনগুলো এসেছিল, সেগুলো একটা হাঁড়িতে পুরে রেখেছিলুম, চোরে বুঝি সব খেয়ে ফেললে!'
ভামিনী ক্ষীরমোহন খাইতে ভারী ভালোবাসিতেন। তাঁহার সেই সাধের ক্ষীরমোহন যে চোরের ভুঁড়ির ভিতরে গিয়া একে একে বিনা বাধায় আশ্রয় লইতেছে, এটা আন্দাজ করিয়া তাঁহার চিত্তেও অত্যন্ত করুণরসের সঞ্চার হইল। চোর যে কত বড়ো ঘৃণ্য, জঘন্য এবং নগণ্য জীব, এতক্ষণে তিনি সেটা স্পষ্ট বুঝিতে পারিলেন।
দুর্গাকালী নির্দয়ভাবে বলিল, 'যাও, যাও! অমন ভূতের মতো হাঁ করে দাঁড়িয়ে রইলে কেন?'
ভূতেরা হাঁ করিয়া দাঁড়াইয়া থাকে কি না, ভামিনী তাহা ঠিকমতো জানিতেন না। তবে এটুকু তিনি বেশ জানিতেন যে, চোরকে যত বেশি পালাইবার সময় দেওয়া যায়, তাঁহার নিজের পক্ষে তত বেশি মঙ্গলের কথা।
কিন্তু অবশেষে স্ত্রী-র কাছে মুখরক্ষার জন্য, প্রাণরক্ষার আশায় জলাঞ্জলি দিয়া আস্তে আস্তে তিনি অগ্রসর হইতে বাধ্য হইলেন।
দুর্গাকালী বলিল, 'দেখো, চোরটাকে শেষটা রাগের মাথায় মেরে ফেলো না যেন!'
ভামিনী শুষ্কস্বরে প্রতিজ্ঞা করিলেন যে, না, চোরকে তিনি একেবারে হত্যা করিয়া ফেলিবেন না!
* * *
চোর যাহাতে সাবধান হইয়া পালাইতে পারে, সেজন্য খুব জোরে গলাখাঁকারি দিতে দিতে তিনি নীচেয় নামিয়া গেলেন। কিন্তু নীচে গিয়া দাঁড়াইবামাত্র, ভামিনীর পা দুটো ঠকঠক করিয়া রীতিমতো কাঁপিতে কাঁপিতে পরস্পরের সঙ্গে ঠোকাঠুকি শুরু করিল। তাঁহার মনে হইল, হাঁটুর নীচে থেকে দুটো পা-ই যেন খসিয়া গিয়াছে!
দুর্গাকালীও পিছনে পিছনে আসিতেছিল। সে আস্তে আস্তে বলিল, 'কী গো, কাঁপচ কেন, ভয় পেলে নাকি?'
'ভয় পাবার ছেলে আমি নই, বড্ড শীত করচে কিনা।'
ভাঁড়ার ঘরের ভিতর হইতে চোরের খসখস পায়ের শব্দ আসিল। ভামিনীর মাথার চুলগুলো পর্যন্ত যেন খাড়া হইয়া উঠিল এবং গলা দিয়া একটা অস্পষ্ট ঘড়ঘড় আওয়াজ বাহির হইতে লাগিল।
কোনোক্রমে কলতলা হইতে মস্ত বড়ো আঁশবঁটিখানা লইয়া আসিয়া, ধীরে ধীরে তিনি ভাঁড়ারঘরের দরজার পাশে গিয়া দাঁড়াইলেন। তারপর চেঁচাইয়া বলিলেন, 'ঘরের ভেতরে কে আছ?'
কোনো জবাব নাই।
'ঘরের ভেতরে কে আছ বলো, নইলে এখনই আমি পুলিশ ডাকব কিন্তু!'
তবু কোনো সাড়া আসিল না।
ভামিনী আন্দাজ করিলেন, এতক্ষণে চোর তবে নিশ্চয়ই পিঠটান দিয়াছে! অনেকটা ভরসা পাইয়া তিনি দুর্গাকালীকে ডাকিয়া বীরবিক্রমে বলিলেন, 'ওগো, তুমি শিগগির গিয়ে একটা আলো জ্বেলে নিয়ে এসো দেখি। আমি এই ঘাঁটি আগলে দাঁড়িয়ে রইলুম, ব্যাটা বেরিয়েচে কী, এক কোপ মেরেচি!'
দুর্গাকালী তাড়াতাড়ি তখনই একটা লন্ঠন জ্বালিয়া আনিল।
এক হাতে আঁশবঁটি উচাইয়া এবং অন্য হাতে লন্ঠন ধরিয়া, ভামিনী সতর্কভাবে ঘরের ভিতরে প্রবেশ করিলেন। তাঁহার ভয় হইতেছিল, কী জানি চোরটা যদি ঘরের ভিতরেই আশপাশে কোথাও লুকাইয়া থাকে!
না! ঘরের ভিতরে সত্যই কেহ নাই! শুধু মেঝের উপরে একটা ভাঙা হাঁড়ির টুকরো ও কতকগুলো ক্ষীরমোহন এদিকে-ওদিকে গড়াগড়ি যাইতেছে।
চোর পালাইয়াছে দেখিয়া ভামিনী অতিশয় আনন্দিত হইয়া, স্ত্রী-কে ডাকিয়া গর্বিত স্বরে বলিলেন, 'ওগো, ভেতরে এসো! ব্যাটা আমায় দেখেই ভয়ে পালিয়েচে!'
তীক্ষ্নদৃষ্টি দুর্গাকালী কিন্তু ঘরের ভিতরে ঢুকিয়াই হাউমাউ করিয়া চেঁচাইয়া বলিয়া উঠিল, 'ওগো মা গো, আলমারির পাশে ওরা কারা গো!'— বলিয়াই সে একছুটে অদৃশ্য!
'অ্যাঁ-অ্যাঁ-অ্যাঁ'—বলিতে বলিতে ভামিনী দ্রুতপদে পিছাইয়া দেয়ালে পিঠ রাখিয়া আড়ষ্ট হইয়া দাঁড়াইলেন— একসঙ্গে তাঁহার হাত হইতে লন্ঠন ও আঁশবঁটি দুইই খসিয়া পড়িল।
এদিকে হাতেনাতে ধরা পড়িয়া গিয়াছে দেখিয়া, চোরেরাও চেঁচাইয়া কাঁদিয়া উঠিয়া বলিল, 'বাবা, আমাদের মেরো না, আর কখনো এমন কাজ করব না!'
এ আবার কী? এ যে তাঁহারই ছেলে-মেয়ের গলা! এরা এখানে কেন?
আশ্চর্য হইয়া ভামিনী বলিলেন, 'কে রে? হেবো, পুসি? কোথায় তোরা?'
কান্নার সুরে উত্তর আসিল, 'আলমারির পেছনে, বাবা!'
'তোরা? আলমারির পেছনে তোরা? অ্যাঁঃ! এখানে কী করতে রে?'
ভামিনীর মেয়ে ফোঁপাইতে ফোঁপাইতে বলিল, 'আমি কিচ্ছু জানি না বাবা! তোমরা যখন ঘুমোচ্ছিলে, দাদা-হতভাগা আমাদের জাগিয়ে বললে—''পুসি, চল, দিদিমা ক্ষীরমোহন পাঠিয়েচে, নুকিয়ে নুকিয়ে এইবেলা খেয়ে আসি গে চল, কেউ ঢের পাবে না!'' এই বলে দাদা আমাকে এখানে জোর করে টেনে নিয়ে এল বাবা!'
* * *
তখন কীর্তন শেষ হইয়া গিয়াছে। গঙ্গারাম হাতি নিজের ঘরে জাঁকাইয়া বসিয়া, একখানা থালায় পাকা তিনটি দিস্তে মালপো সাজাইয়া, আসন্ন আহার-আনন্দে উল্লসিত স্বরে গুনগুন করিয়া গাহিতেছিলেন—
'হরি হরি হরি হরি, হরি বল মন,
অন্তিমকালেতে হবে বৈকুণ্ঠে গমন—'
এমন সময়ে হঠাৎ তিনি শুনিতে পাইলেন, ভামিনীর বাড়ি হইতে তাঁহার দুই ছেলে-মেয়ে প্রাণপণে আর্তনাদ ও ক্রন্দন করিয়া উঠিল!
ভারতী, অগ্রহায়ণ ১৩২৬ (নভেম্বর ১৯১৯)
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।