তরুণা

হেমেন্দ্রকুমার রায়

তাদের পরস্পরের প্রথম পরিচয় হয়—ঘরেও নয় পথেও নয়, একেবারে গহন বনে! জায়গাটি খুব চমৎকার না হইলেও, তাহাদের আলাপটি প্রথম দিনেই জমিয়া উঠিয়াছিল খুবই চমৎকার!

অতএব, দ্বিতীয় তৃতীয় বা চতুর্থ দিনের কথা রাখিয়া, সেই প্রথম দিনের কথাটাই সর্বপ্রথমে বলিয়া লইতে চাই।...

গোমো জংশনে হাওয়া বদলাইতে আসিয়া, প্রকৃতির রূপ দেখিয়া বসন্ত একেবারে মোহিত হইয়া গেল। তুমি-আমি প্রকৃতিকে যে চোখে দেখি, বসন্ত ঠিক সে চোখে দেখিল না; কারণ, সে ছিল চিত্রকর—প্রকৃতিকে দেখিল সে শিল্পীর চোখে!

তার পরদিনেই সে ছবি আঁকিবার সরঞ্জাম লইয়া বাহির হইয়া পড়িল। নদীর ধারে একটি মনের মতো জায়গা বাছিয়া, 'চিত্রাধার'টিকে দাঁড় করাইল। তারপর পটের উপরে প্রকৃতিকে আকৃতি দিবার চেষ্টায় একমনে লাগিয়া গেল।

এমনি করিয়া প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় তার ছবি-আঁকা কাজ চলিতে লাগিল।

বসন্তের ছবি প্রায় শেষ হইয়া আসিয়াছে, আর দু-একদিনেই তুলির কয়েকটি শেষ স্পর্শে চিত্রখানি সম্পূর্ণ হইয়া উঠিবে।

পশ্চিমের নীল সায়রে রবিকরের রঙিন ঢেউ তখন ক্রমেই মিলাইয়া আসিতেছে; দূরে আকাশভেদী 'পরেশনাথ'-এর নিথর শিখরে খানকয় ছোটো ছোটো মেঘ পতাকার মতো থরথর করিয়া কাঁপিতেছিল, বসন্ত অনিমেষে সেইদিকে চাহিয়া দাঁড়াইয়া ছিল। ভাবিতেছিল, চিত্রকরের হাতে যদি এমন জাদু থাকিত, যাতে করিয়া ছবির মেঘও ঠিক অমনিভাবেই কাঁপিয়া কাঁপিয়া উঠিত, তাহা হইলে—

তাহা হইলে কী হইত সেটা ঠিকমতো বুঝিতে-না বুঝিতে পিছন হইতে হঠাৎ কামিনী-কণ্ঠে কে বলিয়া উঠিল, 'ও দাদা! দেখো, দেখো, কী চমৎকার ছবি!'

সচমকে পিছন ফিরিয়া বসন্ত বিস্মিত নেত্রে দেখিল, একটি তরুণী তাহার ছবির উপরে হেঁট হইয়া দাঁড়াইয়া আছে! তাহার পিছনেই একটি যুবক,—সাহেবি পোশাকে।

যুবকটি আগাইয়া আসিয়া বলিল, 'তরু, দিনকে দিন তুমি বড়ো অভদ্র হয়ে উঠচ!'

এই ভর্ৎসনার স্বরে অপ্রস্তুত হইয়া তরুণী বসন্তের দিকে সসংকোচে চাহিল, লজ্জায় তার গাল দুটি রাঙা হইয়া উঠিল।

বসন্তের দিকে ফিরিয়া যুবক বলিল, 'মশাই, আপনি কে তা জানি না, কিন্তু আপনার ছবি আঁকার ব্যাঘাত দিলুম বলে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।'

বসন্ত হাসিয়া বলিল, 'বিলক্ষণ! দশজনকে দেখাবার জন্যেই ছবি আঁকা! আপনারা যে আমার ছবির প্রতি কৃপাদৃষ্টিপাত করেছেন, এজন্যে আমিই ধন্য!'

বিনয়ে এই অচেনা চিত্রকরটিকে হারানো শক্ত দেখিয়া যুবক আর কিছু না বলিয়া ছবিখানি ভালো করিয়া দেখিবার জন্য চিত্রাধারের দিকে অগ্রসর হইল। ছবির এককোণে বসন্ত নিজের নামসই করিয়াছিল,—ছবি দেখিতে দেখিতে যুবকের চোখ হঠাৎ সেই নামের উপরে পড়িল এবং তখনই মুখ তুলিয়া সে জিজ্ঞাসা করিল, 'অ্যাঁ, মাসিক কাগজে প্রায়ই যাঁর ছবি দেখি, আপনি কি সেই বসন্তবাবু?'

'আজ্ঞে হ্যাঁ!'

'আপনিই বসন্তবাবু!'—বলিয়া মহিলাটিও দু-পা আগাইয়া আসিলেন।

যুবক বিরক্তস্বরে বলিল, 'তরুণা, ফের!'

তরুণা থতমত খাইয়া তাড়াতাড়ি আবার পিছাইয়া গেল।

তারপর বসন্তের দিকে ফিরিয়া যুবক বলিল, 'মশাই, আমার এই বোনটি কিছু অন্যায় রকমের চঞ্চল! তার ওপর ও নিজেও কিছু কিছু আঁকতে জানে বলে, আজ ওর ছেলেমানুষি যেন বেড়ে উঠেছে!'

তরুণার লজ্জিত মুখের দিকে চাহিয়া বসন্ত বলিল, 'উনিও ছবি আঁকেন বুঝি? শুনে সুখী হলুম।'

যুবক বলিল, 'বসন্তবাবু, আপনাকে এর আগে আর কখনো দেখিনি বটে, কিন্তু তবু আমরা আপনাকে ভালোরকমেই জানি—আর, বলতে কী, আমরা আপনার ভক্ত!'

বসন্ত বলিল, 'লেখক বা চিত্রকরদের ওই এক মস্ত সুবিধে আছে, তাঁরা বিদেশ-বিভুঁয়েও পথে-ঘাটে-মাঠে—'

'এমনকী পাহাড়ে-পর্বতে, গভীর জঙ্গলেও বন্ধু কুড়িয়ে পান, এই বলতে চান তো? হ্যাঁ বসন্তবাবু, আপনি আমাদের যথার্থই বন্ধু বটে!'

বসন্ত কৃতজ্ঞস্বরে বলিল, 'আমি যে আপনাদের এতটা আনন্দ দিতে পেরেছি, এ আমার ভাগ্যের কথা! কিন্তু আমাদের পরিচয়টা যেন অত্যন্ত একতরফা হল বলে আমার বিশেষ সন্দেহ হচ্ছে!'

যুবক হাসিয়া বলিল, 'অবশ্য, অবশ্য! আমি হচ্ছি রজতভূষণ সেন আর ইনি হচ্ছেন শ্রীমতী তরুণা রায়—আমার ভগ্নী। এর চেয়ে বেশি করে পরিচয় দিতে পারি, আমাদের এমন গুণ আর কিছুই নেই!'

কয় ঘর রেলওয়ে কর্মচারী ছাড়া গোমো জংশনে লোকজন বড়ো বেশি নাই; বাঙালি 'বায়ুভুক'রা এখনও এই স্বাস্থ্যে ও সৌন্দর্যে অপূর্ব জায়গাটিকে ভালো করিয়া চিনিতে পারেন নাই, তাই পূজা বা বড়োদিনের ছুটির সময়েও কলিকাতার অসংখ্য বুটের মসমসানিতে এবং অট্টহাসির হট্টগোলে গোমোর নীরব পার্বত্য প্রকৃতি সরব হায় উঠে না!

কাজে কাজেই এমন নির্জন বিদেশে পরস্পরের দেখা পাইয়া বসন্ত ও রজতভূষণ, দুজনেই বর্তিয়া গেল; এবং তাদের আলাপটাও যথার্থ বন্ধুত্বে পরিণত হইতে বড়ো বেশি বিলম্ব হইল না।

সেদিন বৈকালের চায়ের বৈঠকে বসন্ত হঠাৎ জিজ্ঞাসা করে বসল, 'আচ্ছা রজতবাবু, আপনার ভগ্নীর স্বামী কী করেন?'

চায়ের পেয়ালায় চিনি দিতে দিতে তরুণা হঠাৎ থেমে পড়িল—তার মুখের মৃদু হাসির রেখাটিও সেই সঙ্গে মিলিয়ে গেল।

রজত চায়ের পেয়ালাটা মুখের সামনে তুলিয়া ধরিয়া বলিল, 'আমার ভগ্নীপতির কথা বলছেন?'

তরুণা আর সেখানে দাঁড়াইল না, আস্তে আস্তে হেঁটমুখে চলিয়া গেল।

রজত আবার বলিল, 'আমার ভগ্নীপতিটি একেবারেই মানুষ নয়, ব্যারিস্টারি শিখতে বিলেতে গিয়ে সে আর ফেরবার নাম করে না।'—একটু থামিয়া কিছু ইতস্তত করিয়া বলিল, 'বোধহয় আর ফিরবেও না!'

বসন্ত আশ্চর্য হইয়া বলিল, 'কেন?'

রজত বলিল, 'শুনছি সে নাকি মেম বিয়ে করেছে!'

'বলেন কী!'

'হ্যাঁ। আমার বোনের অদৃষ্ট! বাইরে বালিকা হলেও তরুণার মনটা বোধহয় আর তরুণ নেই।'

বসন্ত একটা সিগারেট ধরাইয়া সামনের মাঠের দিকে শূন্যদৃষ্টিতে তাকাইয়া গম্ভীরভাবে বসিয়া রহিল—

রজতও আর কিছু বলিল না।...

খানিক পরে পানের ডিবা হাতে করিয়া তরুণা ফিরিয়া আসিল। বলিল, 'বসন্তবাবু, পান খান।'

বসন্ত ব্যথিত দৃষ্টিতে একবার তরুণার দিকে চাহিয়া, ডিবা হইতে একটি পান তুলিয়া লইল।

বসন্তের সামনে একখানা বেতের মোড়ায় বসিয়া পড়িয়া তরুণা বলিল, 'কালকে আপনি যে বললেন, আমাকে মডেল করে আপনি একখানি ছবি আঁকিবেন, তার কী হল বসন্তবাবু?'

তরুণার দুর্ভাগ্যের কথা ভাবিতে ভাবিতে বসন্ত বলিল, 'না না—সে থাক, তাতে আপনার কষ্ট হবে!'

তরুণা মাথা নাড়িয়া বলিল, 'উঁহু, কিচ্ছু কষ্ট হবে না!'

রজত বলিল, 'বসন্তবাবু, আপনার ছবির মডেল হতে তরুর যখন এতই সাধ, তখন আপনি ইতস্তত করছেন কেন?'

বসন্ত তখন রাজি হইয়া বলিল, 'আচ্ছা, তবে কাল সকাল থেকেই কাজে লাগব!'

তরুণা হাততালি দিয়া বলিয়া উঠিল, 'ওহো, কী মজা! বসন্তবাবুর ছবির সঙ্গে আমিও অমর হব!'

যুবতি তরুণার সেই বালিকার মতো সরল হাসি-হাসি মুখখানির দিকে বসন্ত মুগ্ধ চোখে চাহিয়া রহিল!...

আজ এক মাস ধরিয়া রোজই সে সকালে-দুপুরে বিকালে-সাঁঝে এই তরুণাকে দেখিতেছে, কিন্তু তার আসল স্বভাবটি কিছুতেই ধরিতে পারিল না! প্রাচীন বাংলা পুঁথির মতো তরুণাকে যেন কতক বোঝা যায়, কতক যায় না। সে যখন তার আঁকা ছবিগুলি একটু-আধটু শুখাইতে দেয়, তরুণা হয়তো তখন অত্যন্ত অসংকোচে তাহার কাঁধের উপরে ঝুঁকিয়া পড়িয়া অবাক হইয়া তার নিপুণ হাতের টানগুলি দেখিতে থাকে। তখন বসন্তই হয়তো ব্যস্ত হইয়া একটু সরিয়া বসিত, কিন্তু তরুণা তাতে মোটেই ভ্রূক্ষেপ করিত না—তার মতো যুবতির পক্ষে যে এটা অশোভন, এ বুদ্ধি তার মাথায় ঢুকিত না! অথচ তাহার সমস্ত হাবভাবের ভিতরেই এমন একটি সহজ সরলতা থাকিত, যাতে করিয়া তাকে কেউ বেহায়া বলিয়াও ভাবিতে পারিত না।... কচি বয়সে বাপ-মা হারাইয়া একমাত্র ভাইয়ের হাতে সে মানুষ হইয়াছিল। রজত কিছু পাগলাটে ধরনের লোক; দুটি জিনিসকে সে সমান অন্যায়, অসহ্য ও যুক্তিহীন ভাবিত—বিবাহ এবং বাংলা মাসিকের সংক্ষিপ্ত সমালোচনা! এ দুটি জিনিসকে আজ পর্যন্ত সে সন্তর্পণে তফাতে রাখিয়া আসিয়াছে। বাড়িতে আর দ্বিতীয় স্ত্রীলোক না-থাকার দরুন তরুণা পুরুষের মতোই স্বাধীনভাবে বাড়িয়া উঠিয়াছিল। মেম-শিক্ষয়িত্রীর কাছে সে বই মুখস্থ করিয়াছিল তোতা পাখির মতো, কিন্তু বাঙালি মেয়ের যেমন শিক্ষার দরকার তার কিছুই পায় নাই।...

বিবাহিত জীবন ভোগ করাও তরুণার কপালে ঘটে নাই। বিবাহের পরেই তার স্বামী রজতের টাকাতেই বিলাতে চলিয়া যান। স্বামীর হাতে লেখা একখানি মাত্র চিঠি তার হাতে আসিয়াছিল—তারপর হইতেই তিনি নীরব। এখন সে এই নীরবতার কারণ, শুনিয়াছে—তার স্বামী এখন আর তার নয়, বিলাতে তিনি নূতন সংসার পাতিয়াছেন—হয়তো এতদিনে কতকগুলি 'অ্যাংলো ইন্ডিয়ান'-এর 'ফাদার' হইয়াছেন! কিন্তু এ আঘাত তরুণার কোমল প্রাণে যে কতটা বাজিয়েছিল, তার হাসিখুশি ও নিশ্চিন্ত চঞ্চলতা দেখিয়া বাহির হইতে কেহই সেটা আন্দাজ করিতে পারিত না। নির্ঝরের তরল ধারার তলাতেই যে জমাট পাথর থাকে, সংসারের চোখে সে সত্য সহজে ধরা পড়ে না।

যেখানে নিভৃত পাহাড়ের শীতল ছায়ায়, একখানি কালো পাথরের গায়ে নিকষে সোনার দাগের মতো গুটিকয় শিশিরে ভেজা হলদে ফুল ফুটিয়াছিল এবং ঠিক তারই তলায় বাধা পাইয়া নদীর জলতরঙ্গে কলরাগিণী উচ্ছ্বসিত হইয়া উঠিতেছিল, বসন্ত সেইখানটিতে লইয়া গিয়া তরুণাকে বসাইয়া দিল।

বসন্তের ছবির বিষয়, 'কায়া ও ছায়া' নদীর ধারে একখানি পাথরের উপর বসিয়া, এক রূপসি চপল জলে আপনার চঞ্চল রূপের লীলাচ্ছায়া দেখিয়া সরল পুলকে হাসিয়া উঠিতেছে—এই ছিল তার পরিকল্পনা।

বসন্ত জিজ্ঞাসা করিল, 'কেমন, এমন করে বসে থাকতে কষ্ট হবে না তো?'

'না, না, না! কতবার বলব বসন্তবাবু!'

তরুণার রাগ দেখিয়া বসন্ত হাসিয়া বলিল, 'বেশ, বেশ, তাহলেই হল!'—তারপর সে ক্ষিপ্রহস্তে ভবিষ্য ছবির একটা মোটামুটি নকশা আঁকিয়া লইতে লাগিল।

রজতও সঙ্গে আসিয়াছিল। সে মনে মনে প্রমাদ গনিয়া বলিল, 'এদের সময় তো দেখছি তোফা কেটে যাবে—কিন্তু আমি কী করি! আচ্ছা, এদিকে-ওদিকে পা দুটোকে একটু চালিয়ে নিয়ে আসা যাক!'— নানা জীবজন্তুর পদচিহ্ন-লেখা নদীর চরে জুতা খুলিয়া রাখিয়া, রজত আঁকাবাঁকা তার ধরিয়া আপনমনে আগাইয়া গেল,—তরুণা বসিয়া বসিয়া দেখিতে লাগিল, জলের ধারে একটা মহাগম্ভীর বক এক ঠ্যাং তুলিয়া স্থির হইয়া দাঁড়াইয়া আছে—সে-ও যেন তার মতো নিজের ছবি তুলাইতে চায়!

এমনিভাবে কয়েকদিন কাটিল। বসন্ত রোজ সকালে ও বিকালে একমনে ছবি আঁকে, তরুণা একমনে বসিয়া থাকে, আর তাহাদের ধৈর্যের অসীম বহর দেখিয়া রজত মনে মনে বেজায় গরম হইয়া ওঠে! 'এই দুই আস্ত পাগলের পাল্লায় পড়ে মাঝখান থেকে আমি বেচারি স্রেফ মারা পড়ব দেখছি—উঃ, আর তো পারা যায় না!'

এই বলিয়া রজত সেদিন বিরক্তিভরে দাঁড়াইয়া হাত ছড়াইয়া আগে একটা মস্ত হাই তুলিল, তারপর আমলকীবনের ভিতর দিয়া, সামনের পাহাড়ে উঠিতে লাগিল।...

ছবি আঁকিতে আঁকিতে বসন্ত বিভোর চোখে দেখিল, পাথরের উপরে আঁচল ছড়াইয়া তরুণা একগোছা বনফুল তুলিয়া, ঘাসের ভোরে আনমনে তোড়া বাঁধিতেছে; তার প্রতিমার মতো সুন্দর মুখখানি পড়ন্ত রোদে লাল-টুকটুকে হইয়া উঠিয়াছে, চোখ দুটি শ্রান্তিতে এলাইয়া পড়িয়াছে।

সেদিনকার মতো সে ছবি আঁকা শেষ করিবে ভাবিতেছে—এমন সময় তরুণা হঠাৎ সভয়ে আঁতকাইয়া উঠিল, 'মা গো—'

'কী—কী হল?'

'সাপ—সা—' তরুণার আড়ষ্ট মুখ দিয়া আর বাক্য সরিল না।

'সাপ!' বসন্তের হাত হইতে প্যালেট ও তুলি খসিয়া পড়িয়া গেল। একলাফে সে তরুণার কাছে গিয়া দাঁড়াইল—তরুণাও আতঙ্কে অজ্ঞানের মতো একেবারে দুই হাতে তাহাকে জড়াইয়া ধরিয়া তাহার বুকের ভিতরে মুখ লুকাইল!

চকিতে পাথরের উপর একটা সাপ কালো বিদ্যুতের মতো তীব্রবেগে বাহির হইয়াই মিলাইয়া গেল!... বসন্ত অভিভূত হইয়া দাঁড়াইয়া রহিল,—সর্পভয়ে নয়, তরুণার সেই অভাবিত স্পর্শে তার সর্বাঙ্গ যেন আচ্ছন্ন হইয়া গেল!

অনেকক্ষণ পরে তরুণা চোখ চাহিয়া মুখ তুলিল—তখনও তার মুখ ভয়ে ফ্যাকাশে, দৃষ্টি স্তম্ভিত, দেহ থরথর কাঁপিতেছে! থামিয়া থামিয়া অস্ফুটস্বরে সে বলিল, 'সাপটা চলে গেছে?'

বসন্ত বিহ্বলের মতো বলিল, 'হুঁ!'

তখন তরুণার হুঁশ হইল—নিজের অবস্থা বুঝিয়া সচমকে সে বসন্তকে ছাড়িয়া সরিয়া দাঁড়াইল—তার ভয়ভরা পাঙাশ মুখখানি গভীর লজ্জায় আবার আরক্ত হইয়া উঠিল! তরুণার খোঁপা খুলিয়া তার ধবধবে গৌর গ্রীবার উপরে এলাইয়া পড়িয়াছিল—বসন্তের দিকে পিছন ফিরিয়া সে ফের নিজের চুল বাঁধিতে লাগিল।

বসন্ত তখনও নির্বাক—নিজের বুকের অধীর স্পন্দন সে বুঝি শুনিতে পাইতেছিল!... তরুণার অপূর্ব স্পর্শটুকু তখনও তার দেহের ভিতরে শিরায় শিরায় যেন তরঙ্গের মতো উচ্ছ্বসিত হইয়া উঠিতেছিল!

ভালো করিয়া শালখানা মুড়ি দিয়া তরুণা প্রায় আপনা-আপনি বলিল, 'দাদা বুঝি এখনও পাহাড় থেকে নামেননি?'

বসন্ত কোনো সাড়া দিল না।

অস্তাচলের ভাঙা মেঘে তখন যেন রক্তগঙ্গা বহিতেছে—তাহারই ভিতরে সূর্য কখন তলাইয়া গিয়াছে,—কেউ তা লক্ষ করে নাই। চারিদিক নীরব নির্জন—শুধু অশ্রান্ত নদীর শান্ত কল্লোলের সঙ্গে মাঝে মাঝে দূর হইতে দু-একটা পাখির স্বর ও গৃহগামী গাভীর ডাক হাওয়ায় ভাসিয়া আসিতেছে।

বনভূমির একান্ত স্তব্ধতায় তরুণার প্রাণটা কেমন দুপদুপ করিয়া উঠিল। শোনা যায় কি না-যায় এমনি স্বরে সে ভয়ে ভয়ে বলিল, 'বসন্তবাবু, চলুন বাড়ি যাই!'

যেন স্বপ্ন দেখিতেছে—ঠিক তেমনিভাবে চাহিয়া বসন্ত আস্তে আস্তে ডাকিল, 'তরুণা,—তরুণা!'

নাম ধরিয়া বসন্ত এই তাকে প্রথম ডাকিল! তরুণা চমকিয়া মুখ তুলিয়া দেখিল, বসন্ত অপলক চোখে তার মুখপানে তাকাইয়া আছে—সে দৃষ্টির সামনে শিহরিয়া উঠিয়া সে আবার মাথা নিচু করিল।... সে-ও যেন অস্পষ্ট স্বপ্নের মতো দেখিল, বসন্ত ধীরে ধীরে আগাইয়া আসিল, তারপর তার কম্পমান হাত দুখানি নিজের দু-হাতে চাপিয়া ধরিল, এবং তার মুখের কাছে মুখ আনিয়া চুপি চুপি আবেগভরে বলিল, 'তরুণা, তরুণা, আমি তোমাকে ভালোবাসি!...' বসন্তের হাতের ভিতরে আপনার অসাড় হাত রাখিয়া, এবং তার ঘন ঘন তপ্ত শ্বাসে আচ্ছন্ন হইয়া, তরুণা একেবারে এলাইয়া নদীর তীরে বসিয়া পড়িল—এবং অস্ফুট প্রতিধ্বনির মতো তার কানের কাছে রহিয়া রহিয়া সেই একই কথা জাগিতে লাগিল—'আমি তোমাকে ভালোবাসি, আমি তোমাকে ভালোবাসি, আমি তোমাকে ভালোবাসি!...'

হঠাৎ একঝাঁক বক ডানার ঝটঝট শব্দ তুলিয়া তাহাদের মাথার উপর দিয়া সারে সারে উড়িয়া গেল!—

সেই শব্দে স্বপ্ন হইতে তারা সচমকে জাগিয়া উঠিল, অত্যন্ত মলিন মুখে তরুণার হাত ছাড়িয়া বসন্ত তাড়াতাড়ি পিছনে সরিয়া দাঁড়াইল এবং তরুণা মাটির উপরে হাঁটু গাড়িয়া বসিয়া দুই হাতে মুখ ঢাকিয়া কাঁদিয়া ফেলিল—হৃদয়ের উত্তেজনা আর সে সহ্য করিতে পারিল না!... সে কান্না বসন্তের মাথা একেবারে হেঁট করিয়া দিল, সে যেন মাটির সঙ্গে মাটি হইয়া মিশাইয়া গেল! এত অল্পক্ষণে এমন অঘটন ঘটিতে পারে সে তা জানিত না! সে কি হঠাৎ পাগল হইয়া গিয়াছিল?

একটু দূরে একটা শব্দ হইল। বসন্ত মুখ তুলিয়া দেখিল, পাহাড়ের উপর হইতে জঙ্গল সরাইয়া রজত নামিয়া আসিতেছে। ভয়ে-অপমানে-লজ্জায় কাঠ হইয়া সে দাঁড়াইয়া রহিল,—সে যে গুরুতর পাপ করিয়াছে এখনই সব প্রকাশ হইয়া যাইবে, তখন সে কি আর কোথাও মুখ দেখাইতে পারিবে?

আসিতে আসিতে দূর হইতেই রজত বলিয়া উঠিল, 'কী বসন্তবাবু, ছবি আঁকা হল তো?'

রজতের গলা পাইয়া পলক না পড়িতে তরুণাও উঠিয়া দাঁড়াইল। বসন্তের আকস্মিক আচরণে তরুণা যে আঘাতটা পাইয়াছিল, ততক্ষণে তা সামলাইয়া লইয়াছে। তাড়াতাড়ি উঠিয়া সে দাদার দিকে ছুটিয়া গেল।

তরুণার দিকে চাহিয়া রজত থমকিয়া দাঁড়াইয়া পড়িল। আশ্চর্য হইয়া বলিল, 'হ্যাঁ রে তরু—এ কী! তোর চোখে জল কেন?'

বসন্তের সামনে পৃথিবীর সমস্ত আলো হঠাৎ যেন দপ করিয়া নিবিয়া গেল!

দাদা তার চোখের জল দেখিতে পাইয়াছেন! তরুণা প্রথমটা থতমত খাইয়া গেল;—কিন্তু তার সে ভাব ক্ষণিকের জন্য,—পরক্ষণেই সে হাসিয়া উঠিয়া দাদার হাত ধরিয়া বলিল, 'দাদা, দাদা, একটা মস্ত সাপ বেরিয়েছিল—আরেকটু হলেই আমাকে কামড়ে দিত আর কী, ভাগ্যে বসন্তবাবু ছিলেন, তাই—'

রজত তড়াক করিয়া তিন হাত উঁচু একলাফ মারিয়া বলিয়া উঠিল, 'অ্যাঁ, অ্যাঁ, বলিস কী রে? সাপ? অ্যাঁ! সাপে কামড়ালে মানুষ যে আর বাঁচে না, জানিস না বুঝি? সাপ—বলিস কী রে—কই, কোথায়?'

তরুণা হাসিতে হাসিতে, সকৌতুকে বলিল, 'সাপ কি আর তোমার সঙ্গে আলাপ করতে চুপ মেরে বসে আছে দাদা, সে অনেকক্ষণ নিজের ধান্দায় চলে গেছে!'

তরুণার হাসিতে মহা চটিয়া রজত বলিল, 'সব সময়ে তোর হাসি ভালো লাগে না, থাম বলচি তরু! সাপ বেরিয়েচে বলে হাসি! দিনকে দিন তুই যেন বেশি ছেলেমানুষ হয়ে উঠছিস!'

দাদার রাগ দেখিয়া তরুণার হাসি আরও বাড়িয়া উঠিল।

পরদিন সকালে রজতের বাড়িতে চায়ের বৈঠকে বসন্তের দেখা পাওয়া গেল না।...

বিকালে বসন্ত বসিয়া বসিয়া চিন্তিত মুখে জিনিসপত্তর গুছাইতেছিল ও মোটমাট বাঁধিতেছিল, এমন সময়ে রজত ও তরুণা আসিয়া হাজির!

রজত বলিল, 'হ্যাঁ বসন্তবাবু, হঠাৎ অদৃশ্য হয়েছেন কেন বলুন দেখি? অসুখবিসুখ কিছু হয়েচে বুঝি? এ কী, এত মোটমাট বাঁধা হচ্ছে যে!'

বসন্ত বাধো বাধো স্বরে বলিল, 'কাল সকালের গাড়িতে কলকাতায় যাব ভাবচি!'

'অ্যাঁ, কলকাতায়! আমাদের খবর না দিয়েই?'

তরুণা অনুযোগের স্বরে বলিয়া উঠিল, 'বসন্তবাবু, আপনি বেশ মানুষ তো! না—না, সে হচ্ছে না! আমাদের একলা ফেলে চোরের মতো চুপি চুপি পলায়ন! এ অন্যায় বসন্তবাবু, এ অন্যায়!'

বসন্ত শুষ্ককণ্ঠে বলিল, 'আমাকে মাফ করুন—এ জায়গাটা আমার আর ভালো লাগচে না।'

তরুণা প্রবলবেগে মাথা নাড়িয়া বলিল, 'উঁহু, আপনার যাওয়া অসম্ভব! এখনও আমার ছবি শেষ হয়নি, এখনও ছবিতে আমার নাকটা খ্যাঁদা হয়েই রয়েছে। নিন? উঠুন, রং-টং নিয়ে চটপট বেরিয়ে পড়ুন!'

বসন্ত অত্যন্ত দমিয়া গিয়া বলিল, 'না না, ছবি আঁকতে যেতে আমি আর পারব না!'

রজত যেন ঠিক কারণটি ধরিয়া ফেলিয়াছে, এমনিভাবে হাসিয়া বলিল, 'ও, আপনি বুঝি সাপের ভয়ে নদীর ধারে যেতে চাইছেন না? বসন্তবাবু, কুছ পরোয়া নেই, আমি আপনাকে অভয় দিচ্ছি—এই দেখুন, সাপ দেখেচি কী মেরেচি!'—এই বলিয়া রজত তার হাতের মাথা-সমান উঁচু মোটা বাঁশের লাঠিটা সগর্বে তুলিয়া ধরিল।

তরুণা তার দাদার রকমসকম দেখিয়া আর হাসি রাখিতে পারিল না। তারপর মুখে কাপড় চাপা দিয়া কোনোরকমে হাসি থামাইয়া, বসন্তের হাত ধরিয়া বলিল, 'তবে আর কী, দাদা লাঠি কাঁধে পাহারা দেবেন আর আপনি অকুতোভয়ে ছবি আঁকবেন! দাদা আজ সর্পবংশ সমূলে ধ্বংস করবেন বলে প্রতিজ্ঞা করে বেরিয়েছেন! নিন—নিন, উঠুন, আর দেরি করবেন না!'

খুবই ইতস্ততের সহিত বসন্ত উঠিল,—তরুণার প্রতি কথা, প্রতি হাসি তিরের মতো তার বুকের মাঝখানে গিয়া বিঁধিতেছিল, তার মুখের দিকে লজ্জায়-অনুতাপে সে আর মুখ তুলিতে পারিতেছিল না!

নদীর ধারে গিয়া রজত আগে তন্ন তন্ন করিয়া—তরুণা যেখানে বসে সেখানটা খুঁজিয়া দেখিল। তারপর মুরুব্বিয়ানার সহিত বলিল, 'তরু, তুমি এখন বসতে পারো, সাপ আর নেই। হুঁ, সাপ দেখেচি কী মেরেচি!'—বলিয়া লাঠি দিয়া সজোরে ঠকাস করিয়া পাথরের উপরে সাপের উদ্দেশে একটা আঘাত করিল!

তরুণা বলিল, 'তুমি আজ যে প্রকাণ্ড লাঠি এনেচ দাদা, তাতে শুধু সাপ কেন, বাঘ-ভালুক পর্যন্ত ল্যাজ তুলে এ মুল্লুক ছেড়ে পালাবে!'

এই বলিয়া সে পাথরখানার উপরে গিয়া বসিয়া পড়িল।

রজত ততক্ষণে চারধারে অত্যন্ত মনোযোগের সহিত সাপ খুঁজিতে লাগিয়া গিয়াছে! যেখানে কোনো একটা গর্ত-টর্ত কিছু দেখে, সেইখানে আগ্রহ ও উৎসাহের সহিত লাঠিটা ভিতরে ঢুকাইয়া দেয় আর বলে, 'আজ সাপ দেখেচি কী মেরেচি!' এমনি করিতে করিতে সে খানিক তফাতে চলিয়া গেল।

বসন্ত তখনও তুলি হাতে করিয়া অপরাধীর মতো ম্লানমুখে দাঁড়াইয়া আছে।... একবার ফিরিয়া দেখিল, তরুণা ঠিক কালকের মতোই সহজভাবে বসিয়া ঘাসের ডোরে বনফুলের তোড়া বাঁধিতেছে!

অনুতপ্ত স্বরে বসন্ত বলিল, 'আপনি কি—'

তরুণা খিলখিল করিয়া হাসিয়া বলিয়া উঠিল, 'কাল আমাকে নাম ধরে ডেকে আজ ফের ''আপনি'' কেন বসন্তবাবু? আমাকে ''তুমি'' বলে ডাকুন।'

এ বিদ্রুপ, না কৌতুক? কিছুই না বুঝিয়া আরও কাতর হইয়া বসন্ত বলিল, 'আমাকে—'

বাধা দিয়া দুষ্টু তরুণা বলিল, 'থাক বসন্তবাবু, থাক! আপনি কী বলতে চান আমি বুঝেছি—ক্ষমা করবার কথা বলবেন তো? দরকার কী!'—বলিয়া, সে সদ্য-বাঁধা ফুলের তোড়াটি নাকের কাছে ধরিয়া একমনে তার গন্ধ শুঁকিতে লাগিল।

বসন্ত সত্য সত্যই ক্ষমা চাহিতে যাইতেছিল; কিন্তু এই কথায় তার মুখ একেবারে বোবা হইয়া গেল। তার মনে হইল, তরুণা যেন একটি মূর্তিমতী প্রহেলিকা—কোনোদিক দিয়াই তার মনের ভিতরটা ধরিবার-ছুঁইবার জো নাই, এ কী আশ্চর্য!

বসন্ত হতভম্বের মতো দাঁড়াইয়া আছে,—এমন সময় তরুণা হাসিতে হাসিতে মাটিতে আঁচল লুটাইয়া তার কাছে উঠিয়া আসিল। আগে বনফুলের ছোটো তোড়াটি যত্নের সহিত বসন্তের জামার বোতামের ছ্যাঁদায় ঢুকাইয়া দিল। তারপর হঠাৎ গম্ভীর হইয়া কোমল অথচ ব্যথাভরা স্বরে আস্তে আস্তে বলিল, 'বসন্তবাবু, কালকের কথা ভেবে আপনি অমন কিন্তু হয়ে আছেন কেন? কী আর আপনি করেছেন? আমাকে ভালোবাসেন, এই বলেছেন বই তো নয়? তাতে হয়েছে কী? কেন আপনি আমাকে ভালোবাসবেন না—ভাই কি বোনকে ভালোবাসে না!'—একটু থামিয়া, বসন্তের মুখের দিকে ছলছল চোখে চাহিয়া, তার একখানি হাত ধরিয়া বলিল, 'আর আমাকে ভুলবেন না—ছোটো বোনটি বলে মনে রাখবেন!'

বসন্তের চোখ দুটি অশ্রুজলে ছাপিয়া উঠিল।

তরুণা আবার একছুটে পাথরের উপরে গিয়া উঠিয়া বসিল। তারপর উচ্চহাসি হাসিয়া বলিল, 'দাদা, ও দাদা! সাপ-টাপ কিছু পাওয়া গেল কি?... বসন্তবাবু, নিন নিন, তাড়াতাড়ি ছবি আঁকুন, ছবিতে আমার নাক এখনও খ্যাঁদা-খ্যাঁদা দেখাচ্ছে—তুলি বুলিয়ে নাকটাকে শিগগির টিকোলো করে তুলুন!'

ভারতী ফাল্গুন ১৩২৪ (ফেব্রুয়ারী ১৯১৮)

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%