হেমেন্দ্রকুমার রায়
(বিদেশি গল্পের ছায়া অনুসরণে)
বাতের ব্যথায় পা দুটো ফুলে কলা গাছ হলেও, বিরিঞ্চি সেদিন তাঁর আপিসে কামাই দিলেন না। তাঁর হুন্ডির কারবার।
আপিসে গিয়েই দেখলেন, একটি মোটাসোটা স্ত্রীলোক তাঁর জন্যে অপেক্ষা করছে। তার মাথায় ঘোমটা, গায়ে এই দারুণ গরমেও একখানা পুরোনো আলোয়ান জড়ানো। বয়সেও প্রাচীনা। সাধারণত একশ্রেণির গরিব গৃহস্থ দেখা যায়— যারা ভদ্রলোকের মেয়ে হলেও পয়সার অভাবে সকলের সামনে বেরুতে বাধ্য হয়, এই স্ত্রীলোকটিও যে সেই শ্রেণির, দেখলেই তা স্পষ্ট বোঝা যায়।
বিরিঞ্চি একটু আশ্চর্য হয়ে বললেন, 'আমার কাছে তোমার কী দরকার গা?'
বুড়ি তখনই ভালো হয়ে বসে, মাথার ঘোমটা একটুখানি তুলে দিয়ে বললে, 'আমাকে রক্ষে করো বাবা! আমাদের কর্তা আজ পাঁচ মাস অসুখে ভুগচে—আপিস থেকে তাকে বিনি দোষে ছাড়িয়ে দিয়েচে বাবা! আমি তার পাওনা মাইনা চাইতে গেলুম,— কিন্তু মাহিনা পুরো পেলুম না— উলটে আট-আটটা টাকা কেটে নিলে। আমি বললুম, ''কেন?'' তারা বললে আপিসে নাকি কার কার কাছে কর্তার ধার ছিল! এও কি হতে পারে? তুমিই বলো-না এও কি হতে পারে? আমি জানলুম না শুনলুম না— কর্তার সাধ্যি কী সে ধার করে! এখন তুমি একটা বিহিত করো। আমি গরিব নাচার অবলা, আমার দিকে কেউ চোখ তুলে চায় না, সবাই আমার সঙ্গে ঝগড়া করে—কারু মুখে দুটো মিষ্টি কথাও শুনতে পাই না,' বলতে বলতে বুড়ির চোখ ছলছলিয়ে জলে ভরে এল।
বিরিঞ্চি ব্যস্ত হয়ে বললেন, 'শোনো, শোনো! তোমার কথা আমি কিছুই বুঝতে পারচি না। তোমার স্বামী এই আপিসে চাকরি করে?'
বুড়ি বললে, 'কর্তা রেল আপিসে কাজ করত!'
বিরিঞ্চি একটা আশ্বাসের নিশ্বাস ফেলে বললেন, 'তাহলে আমি কী আর করব বলো, তুমি ভুল জায়গায় এসেচ!'
বুড়ি বললে, 'সে কী বাবা, এর মধ্যে আমি যে আরও দু-জায়গায় গিয়েছিলুম, কিন্তু মুখপোড়ারা সবাই আমাকে তাড়িয়ে দিলে। এখন তুমিও পায়ে ঠেললে আমি আর কার কী চাইব বাবা?'
বিরিঞ্চি বললেন, 'আমাকে দিয়ে তোমার তো কোনোই উপকার হবে না। তোমার স্বামী যেখানে চাকরি করত, সেখানে যাও।'
বুড়ি করুণস্বরে বললে, 'আমি বাবা আর কাউকে চিনি না— তুমিই যে গরিবের মা-বাপ! দেখো, আমি মিছে কথা বলচি না, কর্তার সত্যিই অসুখ করেচে—এই দেখো ডাক্তারের চিঠি!'
বিরিঞ্চি বললেন, 'তোমার কথায় আমি বিশ্বাস করচি। কিন্তু রেল আপিসে আমার কোনোই হাত নেই। তোমার স্বামীকেই বরং জিজ্ঞাসা করে দেখো গে যাও।'
বুড়ি বললে, 'অ আমার ছার-কপাল, সে মিনসে কিছু করলে আজ কি আমার এমন হাঁড়ির হাল হত! ওকে কিছু জিজ্ঞেস করতে গেলেই সে বলে ওঠে, যাও, যাও, তুমি মেয়েমানুষ, এসব ব্যাপার তুমি বুঝবে না। 'আমি কিছু বুঝি না, বটে! তবে এত বড়ো সংসার চালাচ্ছে কে, শুনি?'
বিরিঞ্চি গভীরভাবে বোঝাতে লাগলেন, রেল আপিস থেকে হুন্ডির কারবারের মধ্যে কতটা আকাশ-পাতাল তফাত।
বুড়ি মনোযোগ দিয়ে সব শুনলে। তারপর বললে, 'আমি সব বুঝেচি। কিন্তু তোমার কথা তারা সবাই শুনবে। তাদের বলো কর্তার মাইনের আটটা টাকা দিয়ে দিতে!'
বিরিঞ্চি দীর্ঘশ্বাস ফেলে শ্রান্তস্বরে বললেন, 'কী আশ্চর্য, এখনও তোমার মাথায় ওই এককথাই ঘুরচে? রেল আপিসে আমার কথা খাটবে কেন? তোমার কথায় কথা বলতে গেলে তারা যে আমাকে পাগল বলে ভাববে!'
বুড়ি হাপুস চোখে কাঁদতে কাঁদতে বললে, 'তবে কি আমার আট-আটটা টাকা জোচ্চুরি করে ঠকিয়ে নেবে? আমি গরিব নাচার অবলা, আমার পানে কেউ মুখ তুলে তাকায় না—কী করে আমার দিন চলবে বাবা?'
একে বাতের ব্যথায় বিরিঞ্চির পা কটকট করছিল, তার উপরে এইবার তাঁর মাথাটাও দপদপ আর বুক ঢিপঢিপ করতে লাগল। তিনি আর-একবার তাকে প্রাণপণে বোঝাতে চেষ্টা পেলেন—কিন্তু বৃথা চেষ্টা! শেষটা হাল ছেড়ে দিয়ে তিনি চেঁচিয়ে ডাকলেন, 'নবীন, ওহে নবীন! তুমি এদিকে এসো তো! এই স্ত্রীলোকটিকে তুমি সব কথা বুঝিয়ে দাও— আমি আর সময় নষ্ট করতে পারচি না।' এই বলে তিনি নিজের ঘরে গিয়ে ঢুকলেন।...
ঘণ্টাখানেক পরে কতকগুলো কাগজপত্রে সই করে তিনি শুনলেন, পাশের ঘরে বসে নবীন তখনও সেই বুড়িকে হরেকরকমে আসল কথাটা বোঝাবার ব্যর্থ চেষ্টা করছে। শেষটা নবীনেরও ধৈর্যের ঝুলি খালি হয়ে গেল। বিল-সরকারকে নিজের কাজে নিযুক্ত করে নবীনও বকে বকে গলা শুকিয়ে সেখান থেকে সরে পড়ল।
বিরিঞ্চি নিজের মনে মনে বললেন, 'অসম্ভব রকমের নির্বোধ স্ত্রীলোক! আমার মাথা তো ঘুরিয়ে দিয়েচেই, আজ দেখচি, আমার সব লোককেই বুড়ি খেপিয়ে দেবে! ওঃ আমার বুকের দুপদুপুনি যে আবার বেড়ে উঠল।'
আধ ঘণ্টা পরে তিনি আবার নবীনকে ডাকলেন। নবীন এলে জিজ্ঞাসা করলেন, 'কী হে, ব্যাপার কী?'
নবীন বললে, 'স্যার, আমাদের সাধ্যি কী যে, ও বুড়িকে বোঝাই! আমরা বলি এককথা, আর ও বলে এককথা!'
পাশের ঘর থেকে আবার বুড়ির গলা শোনা গেল।
বিরিঞ্চি চেয়ারের উপরে এলিয়ে পড়ে বললেন, 'ওঃ, ওর গলার আওয়াজও আর আমার সহ্য হচ্ছে না! আমার বাতের ব্যথা আর বুকের অসুখ আবার বেড়ে উঠচে। তা-ই তো, কী করি, কীসে এ আপদ বিদেয় হয়!'
নবীন বললে, 'দরোয়ান ডেকে ওকে আপিস থেকে বের করে দেব নাকি?'
বিরিঞ্চি সভয়ে বলে উঠলেন, 'না,—না— খবরদার! তাহলে বুড়ি বেজায় গোলমাল বাধিয়ে দেবে! এ বাড়িতে আরও তিনটে আপিস আছে, তারা ভাববে আমরা স্ত্রীলোকের ওপরে অত্যাচার করচি! তার চেয়ে বুড়িকে কোনোরকমে বুঝিয়েসুঝিয়ে ভালোয় ভালোয় এখান থেকে সরিয়ে দাও!'
খানিক পরে শোনা গেল, বিল-সরকার হতাশভাবে বলছে, 'তোমাকে বোঝানো ভগবানেরও সাধ্যি নয়, উঃ— বকে বকে আমার গলা কাঠ হয়ে গেল!'
বিরিঞ্চি নিজের মনে বললেন, 'অসম্ভবরকম নাছোড়বান্দা স্ত্রীলোক! আমার বাতের ব্যথা আর বুকের দুপদুপুনি ক্রমেই বেড়ে উঠচে যে!'
নবীন তখন আর রাগ সামলাতে না পেরে বুড়িকে গিয়ে বললে, 'দেখো, তুমি এইবেলা মানে মানে সরে পড়ো, আমাদের আর পাগল কোরো না বলচি।'
বুড়ি আহতস্বরে বললে, 'চুপ, মুখ সামলে কথা কও!'
নবীন অধীরস্বরে বললে, 'বুড়ি, ভালো চাও তো এখান থেকে বিদায় হও!'
বুড়ি ফোঁস করে বলে উঠল, 'কী! যত বড়ো মুখ নয় তত বড়ো কথা! আমাকে গরিব নাচার অবলা পেয়ে অপমান করা! জানিস, কর্তা জানতে পারলে তোকে আর আস্ত রাখবে না। রোসো তো, আমার বোনপো পুলিশের জমাদার, আমি এখুনি গিয়ে তাকে ডেকে আনচি!' বুড়ির স্বর ক্রমেই চড়তে লাগল।
পাশের ঘর থেকে ব্যস্ত হয়ে বিরিঞ্চি আবার বেরিয়ে এলেন। দুই হাতে চেপে বুকের দুপদুপুনি বন্ধ করতে করতে তিনি বললেন, 'কী, কী, কী হয়েচে, এত হট্টগোল কেন?'
বুড়ি উত্তেজিতভাবে বললে, 'দেখো বাবা, দেখো। এই... এই লোকটা বলে কিনা বুড়ি... বিদায় হ,... এত অপমান আমি কখনো সইব না, আমার বোনপো পুলিশের জমাদার!'
বিরিঞ্চি মিনতির স্বরে বললেন, 'বাছা, তুমি অত চেঁচিয়ো না! যে তোমাকে অপমান করেচে, আমি তাকে শাস্তি দেব অখন। তুমি আস্তে আস্তে বাড়ি যাও, আজ আমার শরীর বড়ো খারাপ!'
বুড়ি বললে, 'তাহলে আমার কর্তার চাকরির কী হবে! আর আমার আটটা টাকা?'
বুড়ি ফের গোড়া থেকে শুরু করে দেখে বিরিঞ্চি হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, 'তোমাকে তো আমি বলেচিই, রেল আপিসের ওপরে আমার কোনোই হাত নেই!'
বুড়ি বললে, 'বাবা, সত্যি বলচি আমার কর্তার বড়ো অসুখ করেচে, এই দেখো ডাক্তারের চিঠি!'
বিরিঞ্চি খানিকক্ষণ বোবার মতো চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, 'তোমার স্বামীর মাইনে থেকে আট টাকা কেটে নিয়েচে তো?'
বুড়ি বললে, 'হ্যাঁ বাবা, অন্যায়টা দেখো একবার!'
বিরিঞ্চি নিজের পকেটে হাত দিয়ে বললেন, 'এই নাও আটটা টাকা। এখন বাড়ি যাও!'
একগাল হেসে, তাড়াতাড়ি হাত বাড়িয়ে টাকা আটটা নিয়ে বুড়ি বললে, 'বেঁচে থাকো বাবা, বেঁচে থাকো, তাহলে আমার কর্তার চাকরির জন্যেও তুমি তো রেল আপিসের সায়েবকে বলে দেবে?'
'ওঃ, আমার বুকের অসুখ ভারী বেড়ে উঠল— আমি বাড়ি চললুম, হা ভগবান—' বলতে বলতে বিরিঞ্চি তখনই আপিস থেকে বাইরে বেরিয়ে গেলেন।
পরদিন যথাসময়ে আপিসে এসে বিরিঞ্চি দেখলেন, বুড়ি ঠিক সেইখানেই, কালকের মতোই ঘোমটা টেনে একখানা পুরোনো আলোয়ান গায়ে চড়িয়ে তার অপেক্ষায় বসে আছে!
বিরিঞ্চির চোখের সামনে সারা পৃথিবীটা ধোঁয়ার মতো ঝাপসা হয়ে গেল।
বুড়ি কিছু বলবার আগেই একটা ঢোঁক গিলে তিনি বললেন, 'তোমার স্বামীকে আমার আপিসে আসতে বোলো। এইখানেই সে চাকরি করবে।'
ভারতী, শ্রাবণ ১৩২৯ (জুলাই ১৯২২)
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।