হেমেন্দ্রকুমার রায়
ক
সামনেই সাজানো ফুলবাগান,— তার উপরে বাঁকা শশীর তিলক-পরা রজনির খানিক কালো খানিক আলো মাখানো রয়েছে। বাড়ির চাতালে মাদুর পেতে আমরা সবাই শুয়ে-হেলে-বসে, মাঝে মাঝে যা-খুশি-তা-ই গল্প বা মাদল বাজিয়ে রবীন্দ্রনাথের গানের মুণ্ডচর্বণ করছিলুম—দুনিয়ায় যে কলকাতা বলে আবার একটা শহর আছে, সে কথা একেবারেই ভুলে।
আমাদের দলে ছিলেন কবি শ্রীগি—, সুলেখক শ্রীপ্রে—, কবি শ্রীন—, চিত্রকর শ্রীচা—, পুস্তক-প্রকাশক ও কালেভদ্রে সাহিত্যিক শ্রীসু—ও (বলা বাহুল্য) আমি। তা ছাড়া ছিলেন আরও দুইজন উদীয়মানা লেখিকা। পুজোর ছুটিতে আমরা কয়টি সুখের কপোত কার্মাটারে এসে একাত্তরে বাসা বেঁধেছিলুম এবং এক্ষেত্রে ব্রততী-বেষ্টিত বনস্পতিরূপে আমাদের সাদরে আশ্রয় দিয়েছিলেন শ্রীমতী ত— ও কবি শ্রীগি—।
হঠাৎ শ্রীপ্রে— বলে উঠলেন, 'দূর ঘোড়ার ডিম! এরকম করে আর তো ভালো লাগচে না—ঠিক কলকাতার মতো সবই কেমন একঘেয়ে! অ্যাডভেঞ্চার নেই, কিছু নেই—খালি গল্প আর গল্প,—ধ্যাৎ!'
আমরা মহাসমস্যায় পড়ে গেলুম। কারণ সকলেই জানেন, বাঙালি-জীবনে নিতান্ত ছোটোখাটো গোছের 'অ্যাডভেঞ্চার'-এর সুযোগ হওয়াও কতখানি শক্ত কথা! আমাদের বন্দুকের 'পাস' নেই যে, শিকারে যাব;—গায়ে জোর নেই যে, ডাকাতি করব; প্রাণে সাহস নেই যে, সাহেবের সঙ্গে হোটেলে বসে খানা খাব (সাহেবের সঙ্গে খানা খাওয়াও বাঙালি-জীবনে একটা মস্ত বড়ো 'অ্যাডভেঞ্চার')। কাজেই 'অ্যাডভেঞ্চার'-এর প্রস্তাবে আমাদের একটু সমস্যায় পড়বারই কথা।
একজন বললেন, 'চলো, কাল বনভোজনে যাওয়া যাক।'
এ প্রস্তাবে কারো অমত হল না। কিন্তু কোথায় যাওয়া যায়? অনেক কথা কাটাকাটির পরে ঠিক হল, কাল ঝাঁঝার পাহাড়ে গিয়ে সকলে মিলে বনভোজন করা যাবে। এবং এই ব্যাপারটার উপরে একটুখানি 'অ্যাডভেঞ্চার'-এর রং ফলাবার জন্যে আরও ঠিক করা হল যে, আজ রাত একটার ট্রেনেই ঝাঁঝায় যাত্রা করতে হবে। ঝাঁঝায় ট্রেন পৌঁছোবে রাত সাড়ে তিনটের সময়ে। তারপর বিদেশে, বিনা আশ্রয়ে, ঘুটঘুটে অন্ধকার রাতে প্রভাতের অপেক্ষায় হাপিত্যেশ করে বসে থাকা—এটা 'অ্যাডভেঞ্চার' নয় তো কী?
কিন্তু শেষ প্রস্তাবে আমার মনটা তেমন খুশি হল না। আমি সবে কলকাতার রোগশয্যা ছেড়ে এখানে এসেছি— দেহে এখনও রোগের চিহ্ন বর্তমান। কালকের দুপুরে মাতনের উপরে আবার সারারাত জাগরণের কথা শুনে আমার ভয় হবারই কথা। কিন্তু বন্ধুদের স্বাস্থ্যসবল ফুসফুসের জোরে আমার ক্ষীণ প্রতিবাদ অল্পক্ষণেই পলাতক হতে বাধ্য হল।
আমি ছাড়া আমাদের দলে আর-একজনও বড়োই দমে গেল— সে হচ্ছে সু। একে তো ভগবানের অবিচারে সে গজকচ্ছপ জাতীয় একটি দেহের অধিকারী হয়েছে—সে দেহে পানভোজন করা যেমন সহজ, নড়নচড়ন তেমনি অসম্ভব! সু-র দেহের কোমর থেকে গলা পর্যন্ত অংশটা ছিল অবিকল উদরাকৃতির! তার উপরে সু-র ঘুমিয়ে পড়বার ক্ষমতা ছিল এমনি অসাধারণ যে, শুনলে আপনারা হয়তো তা বিশ্বাস করতেই রাজি হবেন না। সু-র মতন নিদ্রাদেবীর অকৃত্রিম ভক্ত সাধক এই চিরঘুমন্ত বাঙালি জাতির মধ্যেও আমি আর দ্বিতীয় দেখিনি। কাজেই রাত জেগে 'অ্যাডভেঞ্চার'-এর নামে সু-র সদানিদ্রাকাতর চক্ষু যারপরনাই হতাশ হয়ে পড়ল। কিন্তু নান্যঃ পন্থা—'পড়েচি মোগলের হাতে, খানা খেতে হবে সাথে।'
খ
রাত একটার সময়ে ট্রেনে উঠলুম। সকলের আগেই সু তাড়াতাড়ি একখানা বেঞ্চের উপরে গিয়ে ধপাস করে সটান লম্বা হয়ে পড়ল এবং ট্রেনের স্টেশন ছাড়বার পোঁ বাজবার আগেই তার নাকের বাঁশি নিশ্চিন্ত পুলকে বেজে উঠল।
যথাসময়ে—অর্থাৎ রাত সাড়ে তিনটের ট্রেন গিয়ে ঝাঁঝায় থামল। আমরাও সবাই একে একে নেমে পড়লুম। আগে সঙ্গের বান্ধবী দুটিকে নিয়ে চা-পান করবার ঘরে বসিয়ে এক পাত্র চা খেয়ে বেরিয়ে এসে দেখি, সু স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে চুপটি করে দাঁড়িয়ে আছে। একবার তার নাম ধরে ডাকলুম। সাড়া পেলুম না। ভাবলুম, এই অভিযানের জন্যে আমাদের উপরে সে অভিমান করেচে। কিন্তু কাছে গিয়ে দেখি, অভিমান-টভিমান কিচ্ছু নয়,—মাথাটা কাঁধের একদিকে কাত করে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই অকাতরে সে ঘুমিয়ে পড়েচে। আমি তো অবাক! তাড়াতাড়ি আর সবাইকে ডেকে দ্বিপদের এই চতুষ্পদসুলভ অদ্ভুত ক্ষমতা দেখালুম। সকলের হাসির আওয়াজে সু-র ঘুম ভেঙে গেল। চোখ মেলে নিজের মনেই সে বলে উঠল, 'বাপ রে, পয়সা খরচ করে কী কষ্ট!'—কেবলমাত্র এই কয়টি কথা বলেই, আমাদের ঠাট্টা-বিদ্রুপকে একটুও আমল না দিয়েই সে ভুঁড়ি দুলিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে একখানা বেঞ্চির উপরে গিয়ে বসল এবং বসতে-না বসতেই আবার নিদ্রাহত হয়ে হেলে পড়ল। খানিক পরে আমরা সকলে 'অপেক্ষাগৃহে' আশ্রয় নিলুম। বলা বাহুল্য, এখানেও আগেই একখানা ইজিচেয়ার দখল করে সু সর্বাগ্রে ঘুমিয়ে পড়ল। আমি আর কোথাও ঠাঁই না পেয়ে সু-র দেহের উপরেই অর্ধশয়ান অবস্থায় শেষরাতটা কর্তন করে ফেললুম। আমার দেহের চাপে তার অসুবিধা হলেও নিদ্রার কিছুমাত্র ব্যাঘাত হল না। সে মাঝে মাঝে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে বার বার অস্ফুট স্বরে এই কথাগুলি মাত্র বলেছিল, 'উঃ, বড্ড লাগচে! উঃ, বড্ড লাগচে!'
গ
ভোরের হাওয়ায় রাতের মুখ থেকে অন্ধকারের নিবিড় ঘোমটা যখন খসে পড়ল, সামনেই দেখলুম পাহাড়ের পর পাহাড়ের সবুজ পাঁচিল চোখের গতিকে বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে।
তারই পাশ দিয়ে মালপত্তর ঘাড়ে করে আমরা আস্তে আস্তে অগ্রসর হলুম। প্রায় মিনিট দশেক চলে পাহাড়ের কোলের ভিতরে আমরা যে জায়গাটি নির্বাচন করলুম, তা যেমন নির্জন তেমনি মনোরম। চারদিকেই ছোটো-বড়ো সারি সারি পাহাড়,—তাদের আগাগোড়া সবুজ চাদরে মোড়া। একদিক দিয়ে সাদা বালির বিছানায় ছোট্ট একটি নদীর ঝরঝরে জল লুটোপুটি খেয়ে পরম কৌতুকে চলে যাচ্ছে,— তারই উপলসংকুল তটে দুটি গাছের তলায় আমরা শয্যা পেতে বসে পড়লুম।
খানিক পরে বন্ধু আর বান্ধবীরা হাট থেকে দরকারি তরিতরকারি কেনবার জন্যে চলে গেলেন। আমার রুগণ শরীর তখন অনিদ্রা আর পরিশ্রমে শ্রান্ত হয়ে পড়েছিল—কারণ সবচেয়ে বেশি মাল বইতে হয়েছিল আমাকে, তাই আমি আর বন্ধুদের সঙ্গী হলুম না। সু হাটে যাবার নাম শুনেই 'ওঃ, কাল সারারাত ঘুম হয়নি' বলে হাই তুলে শুয়ে পড়ল এবং বেশ একটি নূতন নিদ্রা দেবার বন্দোবস্ত করতে লাগল।
ইতিমধ্যে পাশের একটি ঝোপেই দুটি স্ত্রীলোকের একরাশ মাথার চুল ও দু-গাছা মোটা দড়ি আবিষ্কার করা গেল। হয় তারা সেখানে আত্মহত্যা করেচে, নয় কেউ তাদের হত্যা করেচে— অন্তত আমাদের তা-ই মনে হল।
সু-ও শুয়ে শুয়ে চক্ষু বিস্ফারিত করে সব শুনলে। আমি বললুম, 'যাও-না, উঠে গিয়ে ব্যাপারটা একবার দেখে এসো-না।'
'পাগল!' বলে সু ওপাশ ফিরে শুল।
আমি বললুম, 'সু, আমি এখন বনের ভেতরে বেড়াতে যাব!'
আসন্ন নিদ্রার জড়তাকে জোর করে তাড়িয়ে, ধড়মড়িয়ে উঠে বসে সু বললে, 'অ্যাঁ, বলেন কী?'
আমি বললুম, 'এখানে অনেক মালপত্তর রয়েচে—তুমি ওগুলো আগলে থেকো।'
সু পাশের ঝোপের দিকে ভয়ে ভয়ে তাকিয়ে বললে, 'আপনি চলে যাবেন, আর আমি একলা থাকব?'
'নিশ্চয়।'
সু তাড়াতাড়ি জামা আর চাদরখানা কাঁধে ফেললে, তারপর কোনোরকমে কাছাকোঁচা গুঁজতে গুঁজতে ও হাঁসফাস করতে করতে প্রায় দৌড় মারলে।
আমি বললুম, 'যাও কোথায়?'
সু বললে, 'ওদের সঙ্গে হাটে।'
আমি চাদরের উপরে হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়লুম। আমার সঙ্গে আর দুটি বালক বা তরুণ যুবক ছিল, তারাও শুয়ে ঘুমোবার চেষ্টা করতে লাগল।
ঘ
চমৎকার!... তখনও রোদ ওঠেনি, উষা তখনও নরম আলোর পিচকারি নিয়ে আকাশের হালকা মেঘগুলিকে রঙিন করে তুলছিল, আর তা-ই দেখেই যেন বনস্পতির অন্তঃপুরে বসে ভোরের পাখিরা সব খুশি হয়ে কলরবে কাজরি-গানের সুমধুর পালা শুরু করে দিলে। সেই বিজন উপত্যকার বিপুল শ্যামলোৎসবের মধ্যে রূপপিয়াসি নয়ন-মন ডুবিয়ে, আমি যেন লাবণ্য-সায়রের কোন অতলে তলিয়ে গেলুম।
আমি যে শহরে মানুষের একটি জীণ-শীর্ণ ও জামাকাপড়-চশমা-পরা ক্ষুদ্র সংস্করণ, সে স্মৃতি কিছুক্ষণের জন্যে মনের ভিতর থেকে মিলিয়ে গেল। উপরে আমার বিচিত্র রঙিন গগন, মাথায় আমার ঘনশ্যাম তরুছত্র, সর্বাঙ্গে আমার পেলব তৃণের পুলকস্পর্শ এবং সামনে আমার শৃঙ্খলিত শৈলমালার কঠোর বুক ঢেকে তরুণ সবুজের হিন্দোলা! সুন্দর! মনে হল, আমি যেন সেই সৃষ্টি-প্রভাতের আদিম শিশু, প্রকৃতি-মাতার কোলে শুয়ে অপূর্ব বিস্ময়ে তাঁর প্রশান্ত মুখের পানে চুপ করে তাকিয়ে আছি!
কবি-অকবি সব মানুষই প্রকৃতিকে স্নেহময়ী জননীর মতোই ভালোবাসে,—তবে কেউ জ্ঞাতসারে, আর কেউ বা অজ্ঞাতসারে। তাই কলকারখানা-শহর বসিয়ে যে প্রকৃতির মুখ আমরা ধুলো আর ধোঁয়ায় কালো করে দি, রোগে-শোকে-দুঃখে সেই প্রকৃতির কোলেই আবার পালিয়ে এসে সান্ত্বনা ও শক্তি লাভ করি। তাই তো সংসারের কাজের ফাঁকে ছুটি পেলেই আমরা বায়ুপরিবর্তনের অছিলায় শহর ছেড়ে সরে পড়তে চাই। প্রকৃতির উন্মুক্ত বক্ষই আমাদের স্বদেশ এবং শহরেই আমরা প্রবাসী।
বেলা বাড়তে লাগল। তেমনিভাবেই এক জায়গায় চুপচাপ শুয়ে রইলুম—আমি যেন প্রকৃতির ওই হাজার হাজার গাছ, অগণ্য পাহাড় ও শিলা আর লক্ষকোটি তৃণদলেরই একজন।...
রবীন্দ্রনাথের 'চয়নিকা' খুলে প্রথম যে পাতায় চোখ পড়ল, সেখানে দেখলুম, প্রকৃতির আজকের রূপটিই ছাপার হরফে বন্দি হয়ে আছে—
''চৌদিকে উঠিতেছিল মধুর রাগিণী
জলে-স্থলে নভস্তলে, সুন্দর কাহিনী
কে যেন রচিতেছিল ছায়া-রৌদ্রকরে
অরণ্যের সুপ্তি আর পাতার মর্মরে
***
যেন আকাশ-বীণার
রবি-রশ্মি-তন্ত্রীগুলি সুর-বালিকার
চম্পক-অঙ্গুলি-ঘাতে সঙ্গীত-ঝঙ্কারে
কাঁদিয়া উঠিতেছিল—মৌন স্তব্ধতারে
বেদনার পীড়িয়া মূর্চ্ছিয়া।''
ঙ
অনেকক্ষণ পরে হঠাৎ স্তব্ধতার ঘুম ভেঙে গেল— হাট-ফেরত বন্ধুদের কোলাহলে। উঠে বসে দেখি, তাঁদের সঙ্গে পেট ভরাবার সকলরকম আয়োজনই এসেচে—চাল, ডাল, তরকারি, মাছ, হাঁড়ি, সরা, দুধ ও খাবার প্রভৃতি। শ্রীমতী ত ও শ্রীমতী ক তাড়াতাড়ি নদীতে স্নান করে নিয়ে খিচুড়ির আয়োজনে লেগে গেলেন, আমরা সবাই কেউ বন থেকে শুকনো কাঠ কুড়িয়ে এনে, কেউ বা তরিতরকারি কুটে তাঁদের যতটা পারি সাহায্য করতে লাগলুম। ইতিমধ্যে কার্মাটার থেকে সকালের ট্রেনে আমাদের দ্বিতীয় দল এসে বনভোজনক্ষেত্রে অবতীর্ণ হলেন। এ দলে ছিলেন বনবাসী সওদাগর শ্রীরাঃ বাবু, তিনটি মহিলা আর জন-তিনেক বালক-বালিকা। এঁরা রাত্রের 'অ্যাডভেঞ্চার' বাদ দিয়ে সুচতুরের মতন সকালে এসেছেন কেবলমাত্র বনভোজনের নিরাপদ আনন্দ উপভোগ করতে। কিন্তু এঁরা ভ্রমেও বোধহয় ভাবতে পারেননি যে, এঁদের চাতুর্য দেখে অদৃষ্টের অদৃশ্য ওষ্ঠপ্রান্তে কতখানি নিষ্ঠুর হাস্য ফুটে উঠেছে!
এদিকে শ্রীমতী ত চারদিকে শুভসংবাদ রচনা করে দিলেন যে— খিচুড়ি প্রস্তুত, আহারে বসলেই হয়।
প্রে, চা, ন, সু ও আমি তখনই শ্রীমতীকে মনে মনে ধন্যবাদ দিয়ে, দ্রুতপদে বনপথে ধাবিত হলুম—একটু তফাতে গিয়ে নদীর জলে নামব বলে। শ্রীগি খিচুড়ির হাঁড়ির দিকে নিষ্পলক চোখে চেয়ে, গাছতলাতেই স্থিরভাবে ধ্যানস্থ হয়ে বসে রইলেন।
হঠাৎ আকাশের কোণের দিকে তাকিয়ে আমি চমকে বলে উঠলুম, 'ওহে, দেখো দেখো।'
বন্ধুরা বললেন, 'কী?'
'একখানা মেঘ। কী ভয়ানক কালো, দেখেচ!'
'ও কিছু নয়' বলে বন্ধুরা জলের ভিতরে লাফ মারলেন এবং বালকের মতো উচ্ছ্বসিত আনন্দধ্বনিতে সেই নির্জন বনভূমির শান্ত স্তব্ধতাকে চঞ্চল করে তুললেন। আমিও মেঘের কথা ভুলে সকলের সঙ্গে যোগ দিলুম। তারপর সেই ''স্তব্ধ নীরস গহন গভীর, সেথা কোনদিন আসে নি কেহ''—সেইখানে খানিকক্ষণ ধরে কয়জনে মিলে অশ্রান্ত জলক্রীড়ায় এমনি মেতে গেলুম যে, এক-একবার মনে হতে লাগল, আবার বুঝি সুখের শৈশব আমাদের শুকনো জীবনে দয়া করে ফিরে এসেচে। আমাদের নিশ্চিন্ত মনগুলি তখন থেকে থেকে খালি বলে উঠছিল—
''শুধু অকারণ পুলকে
নদীজলে-পড়া আলোর মতন
ছুটে যা ঝলকে ঝলকে।''
শহর আর সভ্যতা মানুষকে যৌবনেই বুড়ো করে তোলে, মনের উপরে অতি-বিজ্ঞতার জগদ্দল পাথর চাপা দেয়। কিন্তু প্রকৃতির সাজঘরে এলেই আমাদের সে কৃত্রিম বেশ আবার বদলে যায়,— আমাদের মুখের মুখোশ আবার খুলে পড়ে, আমাদের গোপন শিশুত্ব আবার স্বপ্রকাশ হয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে।
আমাদের চাপল্য দেখে ভয় পেয়ে 'ন' জলে না নেমেই দৌড়ে সরে পড়লেন।
চ
এরই মধ্যে আচম্বিতে চোখ তুলে দেখি—
''ওই আসে ওই অতি ভৈরব হরষে
জলসিঞ্চিত ক্ষিতি-সৌরভ-রভসে
ঘনগৌরবে নবযৌবনা বরষা
শ্যামগম্ভীর সরসা।''
সঙ্গে সঙ্গে মনে হল, অদূরে মাঠের মধ্যে গাছতলায় আমাদের পোঁটলাপুঁটলি, ব্যাগ ও খিচুড়ির হাঁড়ির কথা! বর্ষা তো নিজের নির্বোধ খেয়ালেই ''গুরুগর্জনে নীল অরণ্য''কে শিউরে তুলে মাথার উপরে এসে হাজির, এখন এই তেপান্তরে আমাদের দশা কী হবে?
টপ, টপ, টপ! বড়ো বড়ো ফোঁটা! আমরা তিরের মতো বনভোজনক্ষেত্রের দিকে ছুটলুম। নদী পার হতে গিয়ে চোরাবালির ভিতরে আমার পা গেল হুস করে ঢুকে। ভাগ্যে আমার আর-একখানা পা ছিল শক্ত জমিতে, এ যাত্রা তাই অল্পে অল্পেই মুক্তি পেয়ে ওপারে গিয়ে উঠলুম।
ততক্ষণে মালপত্তর সমস্ত গাছতলায় টেনে এনে গাদা করে রাখা হয়েচে এবং শ্রীমতী ত তাঁর অত-কষ্টে-রাঁধা খাবার দু-হাতে আগলে ম্লানমুখে বসে আছেন।
তারপর যে ধারাপাত শুরু হল, তা অবর্ণনীয় ব্যাপার! শয়তানের চেয়েও কালো, ''গুরুগুরু মেঘ গুমরি গুমরি গরজে গগনে গগনে'' এবং প্রত্যেক গর্জন ও পাহাড়ের শিখরে শিখরে তার ধ্বনি-প্রতিধ্বনি শুনে থেকে থেকে আমাদের হৃৎকম্প উপস্থিত হতে লাগল। কাব্যের বর্ষা প্রত্যক্ষে যে কতখানি মারাত্মক, আজ তা হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া গেল। 'গাছের ওপরে বাজ পড়বার ভয় বেশি' বলে জনকতক সঙ্গী চটপট সরে পড়লেন। খানিক তফাতে ছিল সাহেবদের এক গোরস্থান। তার ফটকের উপরে হাতকয়েক চওড়া একটু নামমাত্র আচ্ছাদন ছিল। মেয়েদের নিয়ে সবাই তারই মধ্যে গুঁতোগুঁতি করতে লাগলেন। শ্রীগি ও শ্রীমতী ত মেঘের চোখরাঙানিকে আমল না দিয়ে খিচুড়ির হাঁড়ির সামনে গাছতলাতেই দাঁড়িয়ে রইলেন। শ্রীগির মাথায় ছিল একটি ছাতা— কিন্তু সে কেবল 'শোভার্থে'। কলকাতায় ও পল্লিগ্রামে অনেক বৃষ্টি দেখেচি— কিন্তু... এ পাহাড়ে-বৃষ্টি অতুলনীয়। এক-একটা ফোঁটা যেন তরল ইট-পাথরের টুকরো! সেই সঙ্গে ঝড়,—চারদিকের গাছপালা উদ্দাম বাতাসের তোড়ে আহত হয়ে এলোমেলো চিৎকারে একবার এদিকে, আর-একবার ওদিকে ঠিকরে পড়তে লাগল— প্রকৃতি যেন হঠাৎ উন্মাদিনী হয়ে তার এলানো নীল চুল উসকোখুসকো করে তুলে ক্রন্দন শুরু করে দিলেন!
প্রাণপণে রবীন্দ্রনাথের বর্ষা-গান গেয়ে অস্থির মনকে প্রবোধ দেবার চেষ্টা পেলুম— কিন্তু সে অসম্ভব চেষ্টা। কারণ এক কলি গাই, আর পাঁচ মিনিট দাঁতে দাঁত লেগে হি হি করে শীতে কাঁপি! কাজেই ''এস হে এস সজল-ঘন-বরিষণে'' গাইবার ব্যর্থ চেষ্টা ছেড়ে দিয়ে, সঙ্গীদের দেখবার জন্যে একবার গোরস্থানের দিকে ছুটে গেলুম। দেখলুম তাঁদেরও অবস্থা তথৈবচ। সকলেই প্যাঁচার মতন গোমড়া মুখে ঠকঠক করে কাঁপচেন—কেবল মেয়েদের মুখের হাসিখুশি তখনও মুছে যায়নি।
পেটুক সু-কে বললুম, 'এসো, এইবেলা খিচুড়িটা সেবা করে নি!'
সু আহারের নামে আজ কিছুমাত্র উল্লাস প্রকাশ করলে না—বিমর্ষভাবে ঘাড় নেড়ে করুণস্বরে শুধু বললে, 'উঁহু!'
আবার গাছতলার দিকে ছুটলুম— ভিজেচি না ভিজতে আছি! আসতে আসতে দেখি, এই অল্প সময়ের মধ্যেই সেই শীর্ণকায়া গিরি নদীর বুকে যেন কোন কুহকীর মায়ামন্ত্রে অপূর্ব যৌবন-সমাগম হয়েচে—বিপুল স্রোতের ধারা দুই কূল ভাসিয়ে চক্রে চক্রে ফুলে উঠে, পাগলির মতো নেচে, উল্কাবেগে ছুটে চলেচে উৎকট আনন্দে,—তার ভিতরে পড়লে এখন গোটা মানুষকে-মানুষই কোথায় ভেসে যাবে।
শ্রীমতী ত বললেন, 'এত করে রাঁধলুম, সব নষ্ট হল!'
আমি উবু হয়ে বসে দুই হাত পেতে বললুম, 'সে কী কথা! আমরা প্রস্তুত, আপনি পরিবেশন করুন।'
গি, ন ও আমি তখনই হাতের উপরে শালপাতা বিস্তার করে ধরলুম, শ্রীমতী এক হাতা করে গরম খিচুড়ি দেন আর আমরা তীর্থের কাকের মতো তাড়াতাড়ি এক-এক গ্রাসে তা সাবাড় করি। সেই ঝড়ঝাপটা-বৃষ্টিতে, খোলা মাঠের ভিতরে বসে শীতে কাঁপতে কাঁপতে গরম অন্ন আহার—এ এক অপূর্ব অভিজ্ঞতা। যদি কেউ শুধোন— রান্না কেমন হয়েছিল? তবে আমরা এই সার্টিফিকেট দেব যে, শ্রীমতী ত সেদিন দ্রৌপদীরও গর্ব খর্ব করেছিলেন!
ন-এর পিঠের দিকে হঠাৎ চোখ বড়ল— দেখি, তার কাছার উপরে প্রকাণ্ড এক পাহাড়ে-বিছে। বিছে যে এত বড়ো হয়, না দেখলে আমি তা কখনোই বিশ্বাস করতুম না— প্রায় সাপের মতো বললেও চলে। এ পাহাড়ে-বিছে কামড়ালে কি আর বাঁচোয়া আছে?
তাড়াতাড়ি বলুম, 'ওহে, তোমার কাছার ওপরে বিছে—বিছে!'
শুনেই ন প্রবল আতঙ্কে ঠিক যেন খেপে গেলেন। দিগবিদিক জ্ঞানহারা হয়ে বিছেটাকে ছেড়ে ফেলবার জন্যে, দু-হাত শূন্যে তুলে তিনি মিনিট তিনেক ধরে এমন প্রচণ্ড তাণ্ডবনৃত্য করলেন যে, সে নাচ দেখলে তাণ্ডবের বিখ্যাত ওস্তাদ স্বয়ং মহাদেবেরও ত্রিনয়ন বিস্ময়ে নিষ্পলক হয়ে যেত!
বিছেটা নাচের ঠেলায় অবশ্যই মাটিতে পড়ে গেল এবং তৎক্ষণাৎ লগুড়াঘাতে তার প্রাণসংহার করা হল।
ছ
সেদিন বরুণের ভৃঙ্গার বোধ করি ছ্যাঁদা হয়ে গিয়েছিল—কারণ বৃষ্টি তো কমলই না, উলটে মেঘের কালো পটের উপরে নূতন করে মেঘের ঘটা জমতে লাগল। মাঠের উপরে থইথই করচে ঘোলা জল—যতদূর চোখ চলে খালি জল আর জল আর জল, পাহাড়ের এবড়োখেবড়ো ঢালু গা বেয়ে হু হু করে জলের ধারা লাফাতে লাফাতে নেমে আসচে, নদীও এক-এক জায়গায় উপচে পড়ে মাঠের উপরে এসে গড়াগড়ি দিতে শুরু করলে—আর-একটু পরেই হয়তো নদী আর মাঠের সীমারেখা লুপ্ত করে দিয়ে বান ডেকে উঠবে!
তখন যা থাকে কপালে বলে আমরা দলে দলে স্টেশনের দিকে যাত্রা করলুম। শ্রীরা বাবু ছোটোখাটো পাহাড়ের মতন একটা প্রকাণ্ড মোট কাঁধে নিলেন, আমিও আমার ভারী স্যুটকেসটা কাঁধে করে বেরিয়ে পড়লুম। জলমগ্ন পথ দিয়ে সেই মোট নিয়ে প্রায় মাইলখানেক যাওয়া,—সে যে কী কষ্ট, তা আর বলবার নয়!
কোনোরকমে একে একে স্টেশনে গিয়ে পৌঁছোলুম। সঙ্গে সঙ্গে সেই বিষম বৃষ্টি ঠিক স্বপ্নের মতোই মিলিয়ে গেল! স্টেশনের লোকেরা হাঁ করে অবাক হয়ে আমাদের পানে তাকিয়ে রইল। বোধহয় ভাবলে, আমরা সবাই পাগলাগারদ থেকে সদ্য সদ্য পালিয়ে আসচি!
ভাগ্যে সঙ্গে স্যুটকেসটা ছিল! তাই অনেকে আমার শুকনো জামা, কাপড়, চাদর—এমনকী তোয়ালে পর্যন্ত পরিধান করে সে যাত্রা তরে গেলেন। সেই অপূর্ব বেশেই আমরা যথাসময়ে ট্রেনে চড়ে বসলুম।
এই আমাদের এবারকার বনভোজনের সজল ইতিহাস! অনেকটা 'অ্যাডভেঞ্চার'-এরই মতন নয় কি? কিন্তু এই 'অ্যাডভেঞ্চার'-এর ফলে শ্রীচ-য়ের ট্রেনে চড়েই জ্বর এল, পরে শ্রীগিরও জ্বর হয়েছিল, আমার কর্ণমূল ফুলে ঢ্যাঁপ হয়ে উঠল এবং শ্রীমতী ত-কেও দীর্ঘকালের জন্যে রোগশয্যায় শুয়ে থাকতে হয়েছিল।
ভারতী, অগ্রহায়ণ ১৩২৯ (নভেম্বর ১৯২২)
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।