হেমেন্দ্রকুমার রায়
ইলা আমার কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল।
সে আমাকে তার দেহ দান করেনি, কারণ সেদিন তার দেহকে প্রার্থনা করবার মতো কোনো ভাষা প্রকাশ পায়নি আমার মুখে। মনে মনে চেয়েছিলুম তার মন; পেয়েছিলুম।
যদিও এই মন পাওয়ার ইতিহাস বলবার জন্যেই আজ আমি দশজনের মাঝখানে এসে বসিনি, তবু গোড়া বাঁধবার জন্যে সেদিনকার দু-চারটে কথা না বললে চলবে না।
বাবা ছিলেন জমিদার, আমি তাঁর একমাত্র সন্তান। সুতরাং আমাকে মানুষ করবার জন্যে বাবা যে অর্থব্যয়ের ত্রুটি করেননি, এ কথা বলা বাহুল্য। লোকেও আগে বলত আমি নাকি 'হিরের টুকরো ছেলে'! আমাদের বংশে একমাত্র আমিই বি. এ. পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে করেছিলুম বিপুল বিস্ময়ের সৃষ্টি। কিন্তু সেসব কথা এখন অবান্তর।
তখন আমি 'সেকেন্ড ইয়ার'-এর ছাত্র। আমাদের ঠিক পাশের বাড়িখানিতে নূতন ভাড়াটিয়া এলেন, নাম তাঁর মনোমোহনবাবু। বলে রাখি, পাশের বাড়ির মালিক ছিলুম আমরাই।
মনোমোহনবাবু কোনো বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। তাঁর ছেলে ছিল না, তিন মেয়ে এবং বড়োমেয়েটির নাম ইলা। তখন তার বয়েস হবে ষোলো কি সতেরো।
পাশাপাশি বাড়ি বলে মনোমোহনবাবুদের সঙ্গে আমাদের ঘনিষ্ঠতা হতে দেরি লাগল না। দু-বাড়ির মেয়েরা অবসর পেলেই করতেন দুই বাড়িতে আনাগোনা। মনোমোহনবাবুও প্রায়ই আমাদের বৈঠকখানায় এসে বাবার সঙ্গে গল্প-টল্প করে যেতেন।
ছেলেবেলা থেকেই আমার গানবাজনার শখ ছিল প্রবল। এদিকে বাবারও উৎসাহ অল্প ছিল না। বড়ো বড়ো ওস্তাদ এসে আমায় শেখাতেন গান এবং বাজনা। সুতরাং অল্প বয়সেই সংগীতকলাবিদ বলে আমি বেশ খানিকটা নাম কিনে ফেললুম। 'রেডিয়ো'র সাহায্যে আমার কণ্ঠস্বর ছুটোছুটি করে বেড়াতে লাগল ভারতবর্ষের দেশ-বিদেশ।
মনোমোহনবাবু একদিন আমাকে বললেন, 'অমল, আমার ইলার ইচ্ছা, তোমার কাছে গান শিখবে।'
আমি একটু সংকুচিত হয়ে বললুম, 'কিন্তু আমার কি যোগ্যতা আছে?'
মনোমোহনবাবু বললেন, 'তোমার যোগ্যতা সম্বন্ধে আমাদের কোনোই সন্দেহ নেই। আমরা খালি তোমার সম্মতি চাই।'
সম্মতি দিলুম—কারণ না-দেওয়া অসম্ভব। ইলাকে যে দেখেছে সে তার সান্নিধ্য লাভ করা সৌভাগ্য বলেই মনে করবে।
ইলা আমার কাছে গান শিখতে লাগল। কিন্তু যতটুকু সময় সে গান শিখত, তার চেয়ে ঢের বেশি সময় ব্যয় করত আমার গান শোনবার জন্যে। আমার গানের প্রতি তার ছিল অসাধারণ অনুরাগ।
রবীন্দ্রনাথের প্রেমসংগীত শোনবার জন্যে সে অত্যন্ত আগ্রহ প্রকাশ করত। রবীন্দ্রনাথের প্রেমের সংগীত হচ্ছে নিখিল মানুষের প্রাণের সংগীত, ইলাকে যে তা বিশেষভাবে আকর্ষণ করবে, এটা কিছু আশ্চর্য কথা নয়।
আমি গান গাইতুম, আর দুটি ভাবে ঢলঢল ডাগর চোখে আমার মুখের পানে তাকিয়ে ইলা গান শুনত নীরব মূর্তির মতো।
একদিন হেসে বললুম, 'ইলা, গান হচ্ছে কানে শোনবার জিনিস। কিন্তু গানের সময়ে আমার মুখের পানে অমন করে তাকিয়ে তুমি কী দেখো?'
ইলা বললে, 'গানের আত্মাকে।'
'গানের আত্মা?'
'হ্যাঁ। কান যে তান শোনে, তার আত্মা ফোটে গায়কের চোখে-মুখে।'
'আমার বিশ্বাস অন্যরকম। আমি জানি, বিশেষ কোনো গান গায়কের মনে বিশেষ যে ভাব জাগায়, তার চোখে-মুখে ফুটে ওঠে তারই ছায়া।'
'তাকেই আমি বলি গানের আত্মা। কারণ গায়কের মনে বিশেষ কোনো ভাব জাগাবার জন্যেই কবি করেন গীত রচনা। যে গায়ক সেই বিশেষ ভাবটি ধরতে পারে, আর কথা-সুর-ছন্দের ভিতর দিয়ে চোখে-মুখে সেই ভাবটি ফুটিয়ে তুলতে পারে, সে তো প্রকাশ করে গানের আত্মাকেই।'
'ইলা, তোমার কথা মানলে এটাও বলা যায়, গায়ক গানের সঙ্গে মুখের ভাবে প্রকাশ করে নিজেরই মনের ভাব।'
'হ্যাঁ অমলবাবু, গায়ক যদি নিজের মনের উপযোগী গান নির্বাচন করতে পারে, তাহলে একথাও বলা যায়।'
নিজের মনের উপযোগী গান নির্বাচন করতে পারতুম কি না জানি না, কিন্তু তারপর থেকে আমি রীতিমতো বেছে বেছে গান গাইতে শুরু করলুম।
ইলা তেমনিভাবে আমার মুখের পানে নির্নিমেষে তাকিয়ে চুপ করে গান শুনত। কোনোদিন তার চোখ হয়ে উঠত রোদের ছোঁয়া-লাগা সূর্যমুখীর মতো উজ্জ্বল, কোনোদিন-বা বর্ষাধারাচুম্বিত চাঁপার কলির মতো সজল। এক-একদিন শুনতে পেতুম তার দীর্ঘশ্বাসের ক্ষীণধ্বনি।
একদিন শুধালুম, 'ইলা, আমার গানের ভিতরে তুমি কি আমার মনের প্রতিধ্বনি শুনতে পাও?'
খুব মৃদুস্বরে ইলা বললে, 'পাই।'
'তার কোনো অর্থ বুঝতে পারো?'
'পারি।'
'কী বুঝতে পারো?'
'মন দিয়ে যা বোঝা যায়, সব সময়ে মুখ দিয়ে তা প্রকাশ করা যায় না।'
পূর্বদিকের দালান দিয়ে পূর্ণিমার চাঁদের আলোর খানিকটা এসে পড়েছিল ইলার দক্ষিণ বাহুর উপরে। আস্তে আস্তে তার সেই হাতখানি নিজের হাতের ভিতরে নিয়ে ভয়ে ভয়ে বললুম, 'কিন্তু তুমি যা প্রকাশ করতে পারছ না, আমি যদি তা মুখে প্রকাশ করি? গানে নয়, গদ্যে!'
'আমি লজ্জা পাব অমলবাবু!'
এইবারে আমি সাহসী হয়ে উঠলুম। বললুম, 'তবে কি আমাকে বুঝতে হবে, তোমার মনের কোণে আমার জন্যে একটুখানিও ঠাঁই নেই?
'না অমলবাবু, এ কথা আপনাকে বুঝতে বলি না।'
'তবে?'
ইলা কাতরভাবে বললে, 'আজ আর এর চেয়ে স্পষ্ট করে কিছু জানতে চাইবেন না।'
জানি না সেদিন আমার মনের ভিতরে এসেছিল কীসের উন্মাদনা—রবীন্দ্রসংগীতের, না চন্দ্রালোকের, না ইলার সৌন্দর্যের, না আমার উদ্দাম যৌবনের? আমি তার পুরন্ত শুভ্র বাহুখানি মুখের কাছে ডুবে ধরে চুম্বন না করে থাকতে পারলুম না।
ইলা বাধা দিলে না, হাত সরিয়ে নিলে না, নতমুখে চুপ করে বসে রইল।
খানিকক্ষণ পরে আর কোনো কথা না বলেই আস্তে আস্তে সে উঠে গেল।
তারপর আরও কিছুদিন সময় পেলে আমি আরও কতদূর হতুম বলতে পারি না, কিন্তু আরও কিছুদিন সময় আমি পেলুম না।
সেই পুরাতন ইতিহাসের শেষ কথাগুলো আর বিস্তৃতভাবে বলবার দরকার নেই।
কলকাতার বাইরে কোনো ইস্কুলে প্রধান শিক্ষকের পদ পেয়ে মনোমোহনবাবু হঠাৎ আমাদের বাড়ি ছেড়ে উঠে গেলেন।
যাবার আগে ইলা আমার কাছে বিদায় নিতে এসেছিল। সেদিন তার চোখে দেখেছিলুম অশ্রু! তার অশ্রু আমার বুকে আবার জাগিয়েছিল ভাবের জোয়ার, কিন্তু ভাঙতে পারেনি আমার সংযমের বাঁধ!
প্রথম কিছুদিন যে কষ্ট পাইনি, এ কথা বললে সত্য বলা হবে না। মন চঞ্চল হয়েছিল। এমনকী রবীন্দ্রনাথের প্রেমের সংগীত আমার মুখে কেউ শুনতে চাইলেও আমি করতুম আপত্তি।
এক বছর, দুই বছর, তিন বছর কেটে গেল। বাবা শেষনিশ্বাস ত্যাগ করলেন। একে একে অনেক অতি-আধুনিক বন্ধু—বিশেষ করে সান্ধ্য সঙ্গী—এসে জুটল। বাবার ব্যাঙ্কের বই খুলে বুঝলুম, আর কলেজি কেতাবের পাতা উলটে মূল্যবান যৌবনকে বাজে খরচ করে কোনোই লাভ নেই।
দিব্যদৃষ্টিতে দেখলুম, যার অর্থ আছে, যৌবন আছে, সাহস আছে, এই পৃথিবীতে সে ঈশ্বরের আসন কেড়ে নিতে পারে!
যেদিকে তাকাই সেইদিকেই চোখে পড়ে, শত শত চপল নয়নে বিদ্যুতের ইঙ্গিত, যেদিকে হাত বাড়াই আলিঙ্গনের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ে উত্তপ্ত রক্তে-মাংসে গড়া, উচ্ছ্বসিত কামনায় অধীর সব কুসুম-সুকুমার তনুলতা, যেদিকে অগ্রসর হই আমার জন্যে অপেক্ষা করে নব নব প্রলোভনে ভরা অপূর্ব স্বপ্নজগৎ!
সেই প্রবল আনন্দের আবর্তে গিয়ে পড়ে গত জন্মের বিস্মৃত যৌবনের মতো ইলার কথাও ভুলে গেলুম, একেবারে ভুলে গেলুম।
পনেরো বছর কেটে গিয়েছে।
পনেরো বছর সময় নাকি মানুষের জীবনের পক্ষে সুদীর্ঘকাল। এর মধ্যে বালক হয় যুবক, যুবক হয় প্রৌঢ় এবং প্রৌঢ় হয় পরলোকের যাত্রী!
আমি এখন কোথায় এসে পড়েছি? যৌবন আর প্রৌঢ়ত্বের মাঝখানে? কিন্তু এখনও আমি স্থির হয়ে দাঁড়াইনি, ছুটে চলেছি হালকা বসন্ত-বাতাসের মতো—প্রজাপতিদের পাখনায় ভর দিয়ে, দিকে দিকে না-ফোটা ফুল ফুটিয়ে পরাগধুলো উড়িয়ে।
কামনার শেষ নেই—অতৃপ্ত আকাঙ্ক্ষার মৃত্যু নেই। তা যদি থাকত তাহলে সেকালের নবাব-বাদশাহরা গণনাতীত কমনীয় তনুলতার একমাত্র অধিকারী হয়েও আবার নব নব নারীদেহ লাভ করবার জন্যে উন্মত্তের মতো মৃত্যু পণ করতেন না। ইতিহাসে এর অগুণতি উদাহরণ আছে। ফ্রান্সের বৃদ্ধ পঞ্চদশ লুই মৃত্যুকালে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছিলেন কেন?
আমার মুখে দার্শনিকের প্রশ্ন শুনে আপনারা বিস্মিত হচ্ছেন? হ্যাঁ, আমি হচ্ছি দার্শনিক ওমর খৈয়ামেরই মতো—গাই খালি সুরা, নারী আর উপভোগের গান! জীবন-নদীর তটে বসে চাই শুধু যৌবনী, শুধু কিছু দেহের খোরাক, শুধু কিছু কবিতার মাধুর্য!...
চৌরঙ্গি অঞ্চলের এক ইংরেজি হোটেল।
বাজছে ঐকতান, নাচছে প্রায়-উলঙ্গ শ্বেতাঙ্গ সুন্দরীর দল! সে বাদ্য আর সে নৃত্য প্রাণপণ চেষ্টা করে সচেতন মানুষকে অচেতন করবার জন্যে এবং জাগিয়ে তুলতে চায় তার হৃদয়ের মধ্যে নিদ্রিত পশুত্বকে।
চারিদিকে বকের পালকের মতন ধবধবে চাদরে ঢাকা ও ফুলদানি বসানো টেবিলের পর টেবিল এবং চেয়ারে চেয়ারে নৈশভোজের পোশাক-পরা শ্বেতাঙ্গ স্ত্রী-পুরুষরা। অনেকেরই সামনে সাজানো কাচের গেলাসে টলমল করছে 'তরল আগুন'-এর রক্তিমা।
এককোণে বসে এইসব লক্ষ করছি এবং 'পেগ'-এর ওপরে চড়াচ্ছি 'পেগ'। আজ সান্ধ্য বন্ধুদের ফাঁকি দিয়ে একলাই আসর জমাবার চেষ্টায় আছি।
হঠাৎ তিনটি পুরুষের সঙ্গে একটি তরুণী দিকে দিকে হাসির ঝরনা-তান ছড়িয়ে নৃত্যচপল গতিতে সেখানে এসে, আমার কাছ থেকে একটু তফাতে একখানা চেয়ারের উপরে বসে পড়ল। তার দেহের শুভ্রতা দেখলে প্রথমেই তাকে শাড়ি-পরা মেম বলে সন্দেহ হয়। কিন্তু ভালো করে লক্ষ করে বুঝলুম, না, সে আমাদের বাংলারই দুহিতা।
সুন্দরী ও তার সঙ্গীদের ভাবভঙ্গি এবং সাজপোশাকের উপরে পরম আধুনিক ইঙ্গ-বঙ্গের ছাপ মারা। এরা হচ্ছে সেই জাতীয় জীব, পার্ক স্ট্রিটের উত্তরদিকে যারা ভদ্রপল্লির অস্তিত্ব স্বীকার করে না।
'বয়' এসে তাদের টেবিলের গেলাসে গেলাসে ঢেলে দিলে হুইস্কি ও সোডা। লক্ষ করলুম, পূর্ণ হল চারটে গেলাস। কলকাতার দক্ষিণাঞ্চলে নিমন্ত্রিত হয়ে আমি বাঙালি মহিলাদেরও সঙ্গে সুরাপান করেছি। কিন্তু এখানকার হোটেলের প্রকাশ্য ভোজনাগারে যেসব মেয়েদের সুরাপান করতে দেখা যায়, সাধারণত তাদের আবির্ভাব হয় নিষিদ্ধপল্লির ভিতর থেকেই। এই মেয়েটিও তেমনি সুলভ ভেবে আমার শিকারি চোখ হয়ে উঠল লুব্ধ! মন বললে, জানতে হবে এ কোন ডালের পাখি, এতদিনে এ জগতে বিচরণ করছি, এমন রত্নের সন্ধান পাইনি! আশ্চর্য!
তারপরেই ভেসে গেলুম অভাবিত বিস্ময়ের প্রবল বন্যায়!
মেয়েটি মুখ তুলে হঠাৎ আমার দিকে দৃষ্টিপাত করলে। তারপর পাশের সঙ্গীর দিকে হেলে পড়ে চুপি চুপি কী বলে উঠে পড়ল এবং সোজা এসে দাঁড়াল একেবারে আমারই টেবিলের পাশে! তার রঙিন ওষ্ঠাধরে খেলা করছে রহস্যময় হাসি।
অবাক হয়ে তার মুখের পানে তাকিয়ে রইলুম। একটু অপেক্ষা করে সে বললে, 'আপনার মুখ দেখে মনে হচ্ছে অভাগিনি ইলার সঙ্গে আপনার কোনোকালেই পরিচয় হয়নি।'
ইলা! চোখের সুমুখ থেকে সরে গেল পনেরো বছরের ব্যবধান। হ্যাঁ, সেই কণ্ঠস্বর বটে, কিন্তু এই কি সেই ইলা? পনেরো বছর পরে আমি এসে দাঁড়িয়েছি যৌবন-সীমানার বাইরে, আর এ মূর্তি তো তাজা তারুণ্যের মূর্তি—আগেকার সেই ইলার চেয়ে ঢের বেশি সুন্দর! প্রসাধন-কলা কি এমন অসম্ভব সম্ভব করতে পারে?
সে হেসে ফেলে বললে, 'অমলবাবু, আপনি কি আমাকে ইলা বলে স্বীকার করতেই প্রস্তুত নন?'
উঠে দাঁড়িয়ে বললুম, 'সত্যই আমি অপ্রস্তুত। কী করে জানব ইলা, তুমি চিরযৌবনের আশীর্বাদ লাভ করেছ?'
উত্তরে ইলা একটু হেসে বললে, 'ভুল অমলবাবু, ভুল! বিংশ শতাব্দীর ''মেক-আপ'' করবার কৌশলকে যৌবনের লালিত্য বলে সন্দেহ করবেন না!'
'আচ্ছা, তাহলে থাক ওকথা। এখন আসন গ্রহণ করলে খুশি হব।'
ইলা একখানা চেয়ার দখল করে টেবিলের উপরে চোখ বুলিয়ে বললে, 'তাহলে আজ পেগ-টেগও আপনার কাছে অচল নয়?'
'এইমাত্র তোমার হাতেও কাচের গেলাস দেখেছি বলে মনে হচ্ছে।'
'ভুল দেখেননি।'
'উন্নতির চরম শিখরে উঠেছ দেখছি।'
'আরও উচ্চে ওঠবার ইচ্ছে আছে।'
'শুনে আমার লুপ্ত আশা আবার জাগ্রত হবার চেষ্টা করছে। তোমার সঙ্গে ওঁরা কে?'
'দুজন আমাদের বন্ধু, আর একজন হচ্ছেন আমার অধিকারী।'
'মানে?'
'আমার স্বামী।'
'তোমার স্বামী!'
'বিস্মিত হচ্ছেন?'
'তা একটু হচ্ছি বইকী! তোমার স্বামী তোমার ''পেগ''-এর বিরোধী নন!'
'না। বিলাতে গিয়ে উনি নিজেই আমাকে ''পেগ'' গ্রহণ করতে শিখিয়েছেন।'
'তুমি বিলাতে গিয়েছিলে নাকি?'
'হ্যাঁ। কিন্তু বাজে কথা ছেড়ে এখন নিজের কথা বলুন। আপনি কী করেন?'
'মদ খাই আর ফুলে ফুলে উড়ে বেড়াই।'
'আপনার স্ত্রী আপত্তি করেন না?'
'না। কারণ আমি বিবাহ করিনি।'
'বিবাহ করেননি! কেন?'
'তোমাকে ভুলতে পারিনি।'
'আপনার ''কমপ্লিমেন্ট'' আমি গ্রহণ করছি। জানেন তো অমলবাবু, পুরুষের মুখ থেকে নারী মিথ্যা কথাই শুনতে ভালোবাসে?'
'আমার মিথ্যা কথাটা এত সহজে ধরা পড়ে গেল বলে দুঃখিত হচ্ছি। যদি শুনতে চাও, আরও অনেক মিথ্যা কথা রচনা করতে পারি।'
'ধন্যবাদ! আজ আর সময় নাই। আমার স্বামী আর বন্ধুরা অপেক্ষা করছেন। যদি নিমন্ত্রণ করেন, আর-একদিন আপনার মিথ্যা কথার নমুনা দেখবার জন্যে এখানে পদার্পণ করতে পারি।'
আগ্রহভরে বললুম, 'কবে আসবে বলো। আমি এখনই নিমন্ত্রণ করছি।'
'বলেন তো কালই আসতে পারি।'
'উত্তম। কালকের জন্যে আজই আমি একটি কামরা ''রিজার্ভ'' করে যাব। সেখানে থাকব খালি আমরা দুজন।'
দুটি উজ্জ্বল ও চঞ্চল চক্ষ নাচিয়ে ইলা বললে, 'চমৎকার! নিরিবিলি গৃহকোণ, দুই পুরাতন বন্ধু আলোচনা করবে পুরাতন ইতিহাস নিয়ে, চমৎকার!'
'কিন্তু তোমার স্বামী আপত্তি করবেন না তো? স্বামী নামক মনুষ্যগুলিকে আমি বড়ো ভয় করি।'
'নির্ভর হোন। অতি-আধুনিক সত্যিকার সভ্যজগতে ওথেলোর মতন স্বামীর অস্তিত্ব নেই। আমার স্বামী আমাকে বিশ্বাস করেন নির্বোধের মতো। তাই তিনি আমাকে দিয়েছেন অবাধ স্বাধীনতা। তাহলে এই কথাই রইল। কাল রাত ঠিক আটটার সময়ে আমি একলা এসে আপনার নিমন্ত্রণ রক্ষা করব। নমস্কার!' পূর্ণদৃষ্টিতে একবার আমার দিকে তাকিয়ে ইলা আবার তার স্বামী ও বন্ধুদের টেবিলের দিকে চলে গেল।
তার ওই শেষ-দৃষ্টির মধ্যে আমি এক সুমধুর অর্থের সন্ধান পেলুম! আমি ইলাকে ভুলেছিলুম বটে, কিন্তু মেমসায়েব হয়ে, পনেরো বৎসর পরেও আমাকে ভুলতে পারেনি ইলা।
নারী-চরিত্র সম্বন্ধে আমি বিশেষজ্ঞ। তাদের চোখ দেখলেই তাদের মনের কথা বুঝতে পারি।
সেরাত্রে বাড়িতে ফিরে বড়ো আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের দেহকে একবার ভালো করে পরীক্ষা করলুম।
পরীক্ষার ফল হল সন্তাোষজনক। আমার মাথার সব চুল আজ কালো নয় বটে, কিন্তু আমার দেহ এখনও নারীর পক্ষে লোভনীয়। বিশেষত ইলার মতো নারী—একদিন যে নিঃশেষে আত্মসমর্পণ করেছিল আমার কাছে! আমার মুখের কথায় সে দান করতে পারত মন এবং দেহ!
একদিন যাকে লাভ করতে গিয়েও লাভ করা হয়নি, আজ এতকাল পরে তারই রক্তমাংসের তপ্ততাকে ইন্ধনরূপে গ্রহণ করবার জন্যে প্রজ্বলিত হয়ে উঠল আমার সমস্ত দেহ এবং মন!
ঠিক রাত আটটার সময়ে হোটেলে আমার কামরার দরজা ঠেলে দেখা দিলে, টিসিয়ানের আঁকা একটি পরমসুন্দরীর মতো ইলার মোহনীয় মূর্তি।
আজ সে সাজসজ্জা করেছে আরও মন দিয়ে। শুভ্র গ্রীবার উপরে দোলানো এলোখোঁপার চারিধারে জড়িয়েছে বেল ফুলের মালা, গলায় দুলিয়েছে জুঁই ফুলের হার এবং দুই হাতে পরেছে খুব ছোটো ছোটো বেল ফুলের কুঁড়ি দিয়ে গাঁথা চার গাছি করে চুড়ি। অলংকারের নূতনত্বটুকু ভালো লাগল।
পরনে তার গোলাপি রঙের 'ব্লাউজ' ও কাঁচা কলাপাতা রঙের একখানি মিহি শাড়ি। বিশ্ববিজয়ী দুই চক্ষের প্রান্তে আঁকা কাজলের রেখা এবং টোল-খাওয়া রঙিন কপোলের এক জায়গায় সুকৌশলে বসিয়েছে একটি কালো তিল!
সুনিপুণা অভিনেত্রীর মতো দন্ত দিয়ে সহাস্য ওষ্ঠ দংশন করে ইলা আমার দিকে তাকিয়ে রইল ঢুলুঢুলু চোখে।
বললুম, 'যে হতভাগা পনেরো বছর আগে হার মেনেছে, তাকে জয় করবার জন্যে অনেক আয়োজন করেছ দেখছি। কিন্তু এ কি মড়ার ওপরে খাঁড়ার ঘা নয়?'
ইলা লীলায়িত দেহে একখানা আসনের উপরে বসে পড়ে বললে, 'পনেরো বছর আগেকার কথা বলছেন অমলবাবু? কিন্তু সেদিন তো আপনার কাছে পরাজিত হয়েছিলুম আমিই!'
'আমি সেদিনের কথা বলবার জন্যে তোমাকে নিমন্ত্রণ করিনি। ইলা, আজ হবে খালি আজকের কথা!'
'খালি আজকের কথা? না অমলবাবু, মানুষের কাছে বর্তমান হচ্ছে চিরদিনই অতৃপ্তিকর। আমি পুরাতন ইতিহাস শুনতে এসেছি। আমি পুরাতন ইতিহাস ভালোবাসি।'
'কী ইতিহাস শুনতে চাও ইলা?'
'পনেরো বছর আগে আপনার কাছ থেকে আমি বিদায় নিয়েছিলুম। তারপর আপনি কী করেছিলেন?
'তুমি কি বিশ্বাস করবে যে, দিনের পর দিন আমি কেবল কেঁদেছিলুম আর পরিত্যাগ করেছিলুম দীর্ঘনিশ্বাস?'
'না।'
'কেন?'
'মেলোড্রামার সঙ্গে বাস্তব জীবনের সম্পর্ক নেই।'
'কিন্তু মেলোড্রামা রচনা করা হয় বাস্তব জীবনের ভিত্তির ওপরেই।'
'হ্যাঁ, যাকে বলা চলে বাস্তব জীবনের ''ক্যারিকেচার''।'
'বেশ, তাহলে না-হয় অশ্রুবর্ষণ আর দীর্ঘশ্বাসের কথা ত্যাগ করছি। কিন্তু ইলা,সবচেয়ে বড়ো সত্য কথা হচ্ছে, আমি তোমাকে ভালোবাসি।'
'বিশ্বাস করলুম। কিন্তু কাল আপনি নিজের মুখেই বললেন, ফুলে ফুলে উড়ে বেড়ানোই হচ্ছে আপনার পেশা। এইটেই বোধহয় ভালোবাসার মন্ত লক্ষণ?'
কোণঠাসা হয়ে কিঞ্চিৎ দমে গেলুম। সামলাবার জন্যে বললুম, 'মুখের কথাটাকেই তুমি বড়ো করে নিচ্ছ কেন ইলা? সত্যি বলছি, ভালোবাসি—আমি তোমাকে ভালোবাসি ইলা, ভালোবাসি!' বলেই আমি ইলার দুই হাত চেপে ধরে তার মুখের কাছে মুখ নিয়ে গেলুম।
নিজের মুখ সরিয়ে নিয়ে ইলা বললে, 'অমলবাবু, আপনার উচ্ছ্বাস দেখে আমার ভয় হচ্ছে।'
আরও দৃঢ় হস্তে ইলাকে নিজের দিকে আকর্ষণ করে নিজের অজ্ঞাতসারেই মনের আবেগে গলা চড়িয়ে আমি বললুম, 'ভয় হচ্ছে? আমাকে দেখে তোমার ভয় হচ্ছে? ইলা, ইলা, এ কথাও আজ তোমার মুখে শুনতে হল?
ইলা শান্তকণ্ঠে বললে, 'হাত ছাড়ুন অমলবাবু, আমাকে একবার বাইরে যেতে দিন।'
'কেন?'
'স্বামীর এক বন্ধু আমাকে অনুসরণ করে হোটেল পর্যন্ত এসেছেন। আপনার কথা তিনি শুনতে পেলে বিপদ হতে পারে।'
ইলার হাত ছেড়ে দিয়ে বললুম, 'তুমি কী করতে চাও?'
'স্বামীর বন্ধুকে হোটেল থেকে বিদায় করে দিতে চাই। আপনি এখানে একটু বসে থাকুন।' বলেই ইলা হঠাৎ দাঁড়িয়ে উঠে ঘরের বাইরে চলে গেল।
এক, দুই করে কেটে গেলে পাঁচ মিনিট। বসে বসে বিরক্ত মনে ভাবতে লাগলুম, স্বামী এবং তার বন্ধুগণ মানুষকে এত বিপদেও ফেলতে পারে!
'বয়' এসে কামরায় ঢুকল। তার হাতে এক টুকরো কাগজ।
কাগজে লেখা ছিল:
'অমলবাবু,
স্বামীর কোনো বন্ধুই আমার পিছনে পিছনে হোটেলে ছুটে আসেননি।
পুরাতন ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি আমার সহ্য হল না— তাই হোটেল ছেড়ে চললুম আবার স্বামীর কাছে। এই আমাদের শেষ দেখা।
ইলা।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।