রকমফের

হেমেন্দ্রকুমার রায়

(ভামিনী-জীবনী, ৩ পরিচ্ছেদ)

ভরসন্ধ্যা।—ভামিনীর বৈঠকখানায় তুমুল তর্ক চলিতেছে,—বিষয়, রূপবতীরা গুণবতী হন কি না।

গঙ্গারাম হাতি মহাশয় চক্ষু মুদিয়া হুঁকায় একটি সুখটান মারিয়া, হুস হুস করিয়া ধোঁয়া ছাড়িতে ছাড়িতে বলিলেন, 'আমার কথা যদি ধরো বাপু, আমি তাহলে এককথায় সরলভাবে স্বীকার করতে প্রস্তুত আছি যে, আমার অর্ধাঙ্গিনীটি গুণে যথার্থই লক্ষ্মীর মতো—'

সন্ন্যাসীচরণ বাধা দিয়া বলিলেন, 'যদিও তাঁর রূপের দিকটা নিবিড়তম অন্ধকারে বিলুপ্ত হয়ে গেছে।'

গঙ্গারাম একটুও না দমিয়া বলিলেন, 'হ্যাঁ, সেইজন্যেই তো আমার পূজনীয় শ্বশুরমশাই রীতিমতো মাথা খাটিয়ে, মেয়ের নাম রেখেছিলেন কৃষ্ণকালী।'

সন্ন্যাসী বলিলেন, 'আমার স্ত্রী-র রূপ সম্বন্ধে কিন্তু বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই—'

প্রতিশোধগ্রহণে বদ্ধপরিকর গঙ্গারাম বলিলেন, 'কিন্তু তাঁর গুণ সম্বন্ধে যেসব রিপোর্ট আমাদের কর্ণগত হয়েছে, সেসব শুনতেও ভালো নয়, বলতেও ভালো নয়। অতএব সে কথা চেপে যাওয়াই ভালো।'

ভামিনী বলিলেন, 'আমি কিন্তু নিজের স্ত্রী-সম্বন্ধে এরকম স্বাধীন মতপ্রকাশ করতে সম্মত নই। কারণ, আজ পর্যন্ত এমন একজন স্বামীও আমার চোখে পড়েননি, যিনি নিজের বিবাহিতা স্ত্রী-কে বিবাহের ছয় বছর পরে তিলোত্তমা বলে স্বীকার করেছেন। এক্ষেত্রে স্বামীদের মতামত প্রায়ই একতরফা হতে বাধ্য। তবে, আমি একবার এমন একটি মেয়েকে দেখেছিলুম, যার রূপে-গুণে আজ পর্যন্ত আমি অত্যন্ত আশ্চর্য হয়ে আছি। অতঃপর আপনাদের আদেশ পেলে সেই মেয়েটির কথা এখানে বলতে পারি।'

এ প্রস্তাবে কাহারোই অমত হইল না। অতএব ভামিনী তাঁহার কাহিনি আরম্ভ করিলেন।

'মাস দুয়েকের ছুটি নিয়ে সেবার যখন পশ্চিমে বেড়াতে গিয়েছিলুম, তখন আমার স্ত্রী দুর্গাকালী, যত রকমের অস্থাবর সম্পত্তি বাড়িতে থাকতে পারে সমস্তই সঙ্গে করে নিয়েছিলেন— মায় হাঁড়িকুড়ি ভাঁড়-কলসি জলচৌকি বিঁড়েটি পর্যন্ত। এত মালপত্তর নেবার হ্যাঙ্গামে, তিনি যে তাঁর গোবেচারি স্বামীটিকেও আঁচলে বেঁধে নিতে ভুলে যাননি, এইটেই কিন্তু সবচেয়ে বেশি আশ্চর্য!

রেলের ''পাসে''র দৌলতে, দ্বিতীয় শ্রেণির কামরায় আমাদের যাত্রা স্থির হয়েছিল। সুতরাং দুর্গাকালীকে যখন আমার মত জানিয়ে বললুম, ''সেকেন্ড ক্লাসে'' এত পোঁটলাপুঁটলি ছাইভস্ম নিয়ে উঠলে লোকে নিশ্চয়ই আমাদের প্রথম শ্রেণির বাঙাল ঠাওরাবে,—দুর্গাকালী তখন প্রজ্বলিত হয়ে বললেন যে, ''লোকেদের মুখে আগুন! বিদেশ-বিভুঁয়ে গিয়ে শেষটা যখন মুশকিলে পড়ব, লোকে কি তখন তাদের মাথা দিয়ে আমাদের মান বাঁচাতে আসবে?''

তাঁর এ যুক্তি অকাট্য! অতএব আমি আর কোনো উচ্চবাচ্য করতে ভরসা পেলুম না।

* * *

'এ সময়টায় গাড়ির কোনো কামরাতেই যাত্রীর ভিড় বড়ো থাকে না—বিশেষ প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে। দুর্গাকালীকে তাঁর মালপত্তর সমেত স্ত্রী-কামরায় ঠেলেঠুলে বোঝাই করে দিয়ে, আমি যখন আমার কামরায় এসে ঢুকলুম তখন দেখলুম, সে গাড়িতে একটি মেম ছাড়া আর জনপ্রাণী নেই।

আমি হচ্ছি গিয়ে খাস কলকাতার ছেলে। সুতরাং এ কথা আমি জোর করে বলতে পারি যে, মেম দেখে আমার অবাক হবার কথা নয়। কিন্তু গাড়ির মধ্যে সেই একাকিনী বিদেশিনিকে দেখে, আমি যে সেদিন শুধু বেবাক অবাক হয়ে গেলুম তা নয়,—সেই সঙ্গে আমার চোখ আর মন সেই মেমটির দিকে অত্যন্ত বিহ্বলভাবে একাগ্র হয়ে রইল। একরকম চিত্রার্পিত চমৎকৃত অবস্থা আর কী!

আহা, অসীমা সুন্দরী সে! এখনও তার হালকা ছিপছিপে চেহারাটি, আমার চোখের সামনে যেন জীবন্ত ছবির মতো জেগে আছে! সত্যি বলচি, নিতান্ত ভাগ্যবান না হলে তেমন রূপ চক্ষে পড়ে না। রং তার গোলাপপাতা নিংড়ানো, মাথার চুলগুলি তার সোনার জলের ঢেউয়ের মতো; খোঁপার বাঁধন থেকে ছাড়ান পেয়ে, কতকগুলো কুচো চুল কপালে-কপোলে ঘাড়ের উপরে এসে পড়ে সর্পশিশুর মতো এঁকেবেঁকে আছে, আর ভাসা ভাসা চোখ দুটি টলটলে নীলপদ্মের কোরকের মতো।

বন্ধুগণ, আমার স্ত্রী যখন সৌভাগ্যক্রমে এক্ষেত্রে উপস্থিত নেই, তখন আমি ভরসা করে আপনাদের কানের কাছে আমার একটি গোপনীয় মানসিক দুর্বলতার কথা চুপি চুপি স্বীকার করতে প্রস্তুত আছি। এ কথাটা শুধু যে আমারই মনের কথা, তা নয়,—অধিকাংশ পুরুষেরই আঁতের কথা। সে কথাটি হচ্ছে এই:—রূপসির রূপ দেখলে আমি একেবারে আহ্লাদে বিগলিত হয়ে যাই—দুনিয়ার কোনো কিছুরই তোয়াক্কা রাখি না! তখন শুধু আমার একটি কথাই, গানের মতো মনের মাঝে বাজতে থাকে—

''তুমি লক্ষ্মী-সরস্বতী,

আমি ব্রহ্মাণ্ডের পতি,—

হোক গে এ বসুমতী যার খুশি তার।''

কী বলচেন থাকহরিবাবু! ''মর্যালিস্ট''রা আমার কথা শুনলে তাঁদের দ্বিতীয় রিপুকে প্রকাশ করবেন? করুন গে, বড়ো বয়ে গেল! ''মর্যালিস্ট''দের রাগটা কেমন, জানেন? এই, ঠাট্টা করে বিয়ের কথা তুললে বয়স্কা কুমারী মেয়েদের রাগ দেখেছেন তো? ঠিক তেমনি! আমাদের প্রাণের কথা মুখের কথার প্রতিবাদ করতে অসময়ে বাইরে বেরিয়ে আসে না বলে, সমাজক্ষেত্রে অনেক হিপোক্রিট বেশ অম্লানবদনেই চরে বেড়াচ্ছে এবং করে খাচ্ছে।

যাক সে কথা। কী বলছিলুম—হ্যাঁ, একঘেয়ে রেলপথে সেই রূপরানি বিদেশিনিকে সঙ্গিনীরূপে লাভ করে, মনটা আমার যারপরনাই খুশি হয়ে উঠল।

খালি রূপবতী বললে ঠিক হবে না, কারণ সে যে কত বড়ো গুণবতী, সেই পরিচয় দেবার জন্যেই আমি এই কাহিনির অবতারণা করেছি। বলতে কী, মেমেদের মধ্যে যে তেমন গুণবতী মেয়ে থাকতে পারে, আগে আমার মোটেই সে বিশ্বাস ছিল না।

* * *

'বিচিত্র কলরব করতে করতে ট্রেন তখন ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটছে,—দু-পাশে পাহাড়ের পর পাহাড়, বনের পর বন, মাঠের পর মাঠ ক্রমাগত পিছনে ফেলে, এক-একখানি জ্যোৎস্নারঞ্জিত সমুজ্জ্বল স্বপ্নচিত্রের মতো।

রাত অনেক। রেলে আমার ঘুম হয় না, মেমটিরও বোধহয় তা-ই। সে চুপটি করে ঠায় বসে আছে। আমিও নীরবে, মুখের সামনে একখানা কেতাব তুলে ধরে, মাঝে মাঝে একটু একটু পড়ছি এবং মাঝে মাঝে একটু একটু পড়ছি এবং মাঝে মাঝে সামনের সেই জীবন্ত কাব্যখানির উপরে ভূষিত নয়ন দুটোকে যতটা পারি বুলিয়ে নিচ্চি।

থেকে থেকে তার সঙ্গে যে চোখাচোখি হয়ে যাচ্ছে না, তাও নয়। কিন্তু তার মুখ-চোখ দেখে কিছুমাত্র বোঝবার জো নেই যে,— আমার এই লোলুপ নয়নের রূপের ক্ষুধা দেখে সে বিরক্ত হচ্ছে কি না!

কোনো মহিলার দিকে বারংবার এমন হ্যাংলা-ক্যাংলার মতো দৃষ্টিপাত করা নিশ্চয়ই ভদ্রতাসংগত নয়। কিন্তু আমার ধৃষ্ট চোখ দুটো সেদিন বিদ্রোহী হয়ে উঠেছিল—মনের মানা কোনোমতেই মানতে রাজি হল না।

হঠাৎ জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে কী দেখে, মেমটি যেন কেমন অস্থির হয়ে উঠল। ভয়ে বিবর্ণ মুখে অস্ফুটস্বরে, আপনমনেই সে বললে, ''আমার—আমার ভয় হচ্ছে—আমার বড়ো ভয় করচে।''

ব্যাপার কী? কামরা থেকে আমিও মুখ বাড়িয়ে দিলুম। দেখলুম ''গ্র্যান্ড কর্ড লাইন''-এর একটা পাহাড়ে সুড়ঙ্গ বা ''টানেল''-এর দিকে গাড়ি ক্রমেই এগিয়ে যাচ্ছে। ওহো—বোঝা গেছে, এইজন্যেই মেমটি বোধহয় ভয় পেয়েছে! স্বাধীন বিলাতি মেয়ে হলে কী হয়—হাজার হোক স্ত্রীলোক তো!

আলাপ করবার এহেন সুযোগ আমি ছেড়ে দিলুম না। তাকে বললুম যে, গাড়ি রোজই এই সুড়ঙ্গের মধ্য দিয়ে যাওয়া-আসা করে, তার কোনো ভয় নেই—ইত্যাদি।

সে কিন্তু আমার কথার কোনোই জবাব দিলে না—আমার পানে ফিরেও চাইলে না। বাইরের দিকে স্তম্ভিত দৃষ্টিপাত করে, পাথুরে মূর্তির মতো স্তব্ধ হয়ে সে বসে রইল। আমার সাধনার কথাগুলো যেন অরণ্যে রোদনের মতো নিতান্ত অসার্থক বলে বোধ হল!

ইতিমধ্যে গাড়ি সুড়ঙ্গের মধ্যে প্রবেশ করল,—আর বাইরের চন্দ্রালোক যেন কোনো অদৃশ্য মুখের এক ফুৎকারে নিবে গেল!... সঙ্গে সঙ্গে মেমও আর্তনাদ করে উঠল!

চারদিক অন্ধকার—উপন্যাসে যাকে বলে সূচীভেদ্য অন্ধকার! দু-পাশের পাহাড়ের গায়ে বাধা পেয়ে, সেই বদ্ধ স্থানের মধ্যে গাড়ির লৌহচক্রের অবিশ্রাম শব্দ যেন দ্বিগুণ বেশি হয়ে কানের উপরে ক্রমাগত ঘা মারতে লাগল।

...আচম্বিতে, সেই অন্ধকারে দুখানি আকুল বাহু ব্যাকুলভাবে আমার দুই স্কন্ধ বেষ্টন করে ধরলে! আমি বুঝতে পারলুম, সে হাত দুখানি ভয়ে ঠকঠক করে কাঁপচে আর কাঁপচে! এই অভাবিত স্পর্শে আমার হৃদয়যন্ত্রটা যেন ধাক্কা খেয়ে থেমে গেল—আমার ভিতরে যেন আমি বলে আর কোনো কিছু রইলুম না! অর্থাৎ আমি একেবারে রীতিমতো স্তম্ভিত, আচ্ছন্ন হতভম্ব!

* * *

'একটা তীব্র আলোকতরঙ্গ এসে আমার চোখের উপরে আঘাত করলে। যেন একটা অসম্ভব স্বপ্ন থেকে ঝাঁকুনি খেয়ে জেগে উঠলুম। গাড়ি তখন সুড়ঙ্গের আঁধার জঠর ছেড়ে আবার বাইরে বেরিয়ে এসেছে।

মেমটিও আমাকে ছেড়ে দিয়ে তাড়াতাড়ি সরে দাঁড়াল। তার মুখ তখন লজ্জায় লাল হয়ে উঠেচে।

...খানিকক্ষণ গেল। আমি অপ্রস্তুত হয়ে বাইরের দিকে চেয়ে চেয়ে ভাবচি, এই দৃশ্যটা দেখলে শ্রীমতী দুর্গাকালী কী মনে করতেন, এমন সময়ে সেই সুন্দরী বাধো বাধো স্বরে থেমে থেমে আমাকে বললে, ''আমার এই ব্যবহারের জন্যে আপনি আমাকে ক্ষমা করবেন তো? এতটা বেহায়াপনা করা আমার উচিত হয়নি,— কিন্তু সত্যি বলচি, আমি বড়ো ভয় পেয়েছিলুম।''

মনে মনে বললুম, রমণী, আলতা মুছে শ্রীচরণে তুমি শিকারি বুটই পরো, আর কমল-কোমল কর-কমলে ঘোড়ার লাগামই ধরো, আর মাথার চুল খাটো করেই ছাঁটো, আর পুরুষের সমান অধিকারলাভের জন্যে যতই ''প্রাঞ্জল'' বক্তৃতা বৃষ্টি করো,— তুমি কিন্তু এখনও যে অবলা ঠিক সেই অবলাই আছ, এখনও রাজপথে তুমি বিবর্জিতা, এখনও অন্তঃপুরই তোমার নিরাপদ দুর্গ!

প্রকাশ্যে বললুম, আমার কাছে তার ক্ষমা চাইবার কোনোই দরকার নেই, ইত্যাদি।

* * *

'মাঝের একটা স্টেশনে নেমে, আমাকে হাসিমুখের আরও দুটো মিষ্টি কথা বকশিশ দিয়ে, মেমটি তাড়াতাড়ি চলে গেল।

শুনেছি মোগল আমলে সুন্দরীর মুখের হাসি লাখ টাকার দরে বিকিয়ে যেত। আজ কিন্তু বিনামূল্যে যে হাসিটুকু আমি উপহার পেলুম, আসলে তার মূল্য যে কত, মেমটি স্টেশন ছেড়ে চলে যেতে-না যেতেই আমি তা বিলক্ষণ টের পেলুম।

কারণ হঠাৎ আমার মনে হল, আমার বুকপকেটের ভার যেন অত্যন্ত অন্যায় রকম কমে গেছে! পরমুহূর্তেই আবিষ্কার করলুম, সুড়ঙ্গের মধ্যে অন্ধকারের মহাসুযোগে, আমার পকেট থেকে সোনার চেন-ঘড়ি আর নোটভরা মানিব্যাগটি আমার অজ্ঞাতসারে সম্পূর্ণরূপে অদৃশ্য হয়েছে!'

ভামিনী চুপ করিতেই গঙ্গারাম, সন্ন্যাসীচরণ, বিরিঞ্চিমোহন ও থাকহরি প্রভৃতি সকলেই সমস্বরে সবিস্ময়ে বলিয়া উঠিলেন, 'অ্যাঁঃ, বলেন কী!'

ভামিনী বলিলেন, 'হ্যাঁ! সেইজন্যেই তো আপনাদের আগেই বলে দিয়েছিলুম, সেই সুন্দরীর রূপে-গুণে আজ পর্যন্ত আমি আশ্চর্য হয়ে আছি।'

গঙ্গারাম বলিলেন, 'ভামিনীবাবু, কলকাতার ছেলে হয়ে আপনি কিনা শেষটা একটা স্ত্রীলোকের রূপ দেখে ভুলে গেলেন! আরে ছিঃ!'

ভামিনী বলিলেন, 'পুরুষকে ভোলাবার জন্যেই ভগবান রমণীর রমণীয় রূপ সৃষ্টি করেছেন। সেক্ষেত্রে আপনিও যে ভুলতেন না, তারও কোনো প্রমাণ নেই। এবং ভবিষ্যতে পকেট কাটার ভয় না থাকলে আমিও যে কেন ভুলব না, তারও কোনো স্পষ্ট কারণ দেখতে পাচ্ছি না! কিন্তু শুনুন, আমার গল্পের এখনও একটু বাকি আছে।

* * *

'তখনও ট্রেন ছেড়ে দেয়নি। যে মুহূর্তে আবিষ্কার করলুম আমার পকেট কাটা গেছে, সেই মুহূর্তেই আমি চিৎকার করে উঠলুম। আমার তৎকালীন চিৎকারটা যে কতদূর গগনস্পর্শী, স্বাভাবিক ও ভয়ানক হয়েছিল, সেটা না বললেও আপনারা বোধহয় আন্দাজ করে নিতে পারবেন।

বলা বাহুল্য, অবিলম্বে চারদিকে গোলমাল উঠল এবং তার ফলে সেই গুণবতী ইঙ্গবালাটি যথেষ্ট অনিচ্ছাসত্ত্বেও আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হলেন। এত শীঘ্র যে তাঁর রূপমুগ্ধ এই নির্বোধ কালা আদমিটি আত্মসংবরণ করে আপনার দুর্ভাগ্যের ইতিহাসটা জেনে ফেলবে, সম্ভবত তিনি অতটা খেয়াল করতে পারেননি।

ট্রেনের গার্ড যখন বজ্রমুষ্টিতে তার হাত ধরে, তাকে টানতে টানতে আমার সামনে এনে হাজির করলে,— তখন তাকে দেখাচ্ছিল, ঠিক ব্যাঘ্রকবলগত হতভাগ্য হরিণীর মতো;—লজ্জায়-ঘৃণায় সে তখন আর মাথা তুলতে পারছিল না।

গার্ডের হাতে আমার ঘড়ি, চেন আর মানিব্যাগটাও দেখতে পেলুম। বাঁ হাতে সুন্দরীর কাঁধের কাছটা খুব কষে চেপে ধরে, ডান হাতে সেই পকেট-কাটা মালগুলি আমার সামনে এগিয়ে দিয়ে, গার্ড জিজ্ঞাসা করলে, ''বাবু, এইগুলো তো আপনার জিনিস?''

সুন্দরী এতক্ষণে আমার মুখের দিকে মুখ তুলে চাইলে—কী হতাশ, অসহায়, করুণ মিনতিভরা সে দৃষ্টি সে চোখ দুটি যেন গভীর অনুতাপে ক্ষমা চাইছে আর বলছে, ''আমাকে বাঁচাও, আমাকে বাঁচাও!''

গার্ড জিনিসগুলো আমার হাতে দিলে। একটু ইতস্তত করে আমি সুন্দরীর মুখের দিকে তাকালুম। সে তখন কাঁদছে। জিনিসগুলো আবার গার্ডের হাতে ফিরিয়ে দিয়ে আমি বললুম, ''না, এগুলো আমার নয়!''

একবার আমার দিকে, আর-একবার সুন্দরীর দিকে সন্দিগ্ধ নেত্রে চেয়ে দেখে, গার্ডসাহেব বিস্ময়ে অবাক হয়ে রইল।... তারপর মুখ টিপে একটুখানি হেসে, সুন্দরীর হাত ছেড়ে দিলে।

বন্ধুগণ, পাপড়ির মধ্যে দুষ্ট কীট থাকে বটে, কিন্তু সুন্দর কুসুমকে সেজন্যে পায়ে থেঁতলানো আমার ধাতে সহ্য হয় না। রূপসির রূপ দেখলে আমি একেবারে বিগলিত হয়ে যাই। কী বলচেন? আমি একটি নিরেট বোকা? হ্যাঁ, আমার স্ত্রী দুর্গাকালীও বারংবার আমার উপরে ঠিক ওই বিশেষণটিই প্রয়োগ করে থাকেন—যদিও এই গল্পটি আজ পর্যন্ত সাহস করে তাঁকে আমি শোনাইনি।'

ভারতী, কার্তিক ১৩২৬ (অক্টোবর ১৯১৯)

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%