'বেস্পতিবারের বারবেলা'

হেমেন্দ্রকুমার রায়

(বা শাস্ত্রবাক্য না-মানার ফল)

ভামিনীভূষণের অপরার্ধের অধিকারিণী দুর্গাকালী হঠাৎ ঘরে ঢুকিয়া বলিল, 'ওগো শিগগির ওঠো,— শিগগির! রাস্তা দিয়ে মই যাচ্চে!'

দুধের হিসাবে গয়লা প্রায় আড়াই টাকার গরমিল করিয়া ফেলিয়াছে। ভামিনীভূষণ একমনে মাথা হেঁট করিয়া সেই হিসাবটা কাটছাঁট করিতেছিলেন। মাথা তুলিয়া তিনি বলিলেন, 'মই! মই কী হবে?'

'ছাতের ওই ভাঙা জায়গাটায় খানিক বিলিতি মাটি লেপে দিয়ে এসো গে! নইলে আজকেও ঘুমের দফায় ইতি!'

'কিন্তু, রাস্তা দিয়ে কোথাকার কে মই নিয়ে যাচ্চে, আমাকে দেবে কেন?'

'আহা, ওদের কাছে একবার চেয়েই দেখো-না ছাই! ওরা মুটে বই তো নয়, অমনি না দেয়—কিছু পয়সা দিলেই খানিকক্ষণের জন্যে মইখানা নিশ্চয় ছেড়ে দেবে! যাও যাও, আর দেরি কোরো না!'

একটি সুপ্রকাণ্ড জৃম্ভণ উত্তোলন করিয়া ভামিনীভূষণ তাড়াতাড়ি বাহির হইয়া গেলেন।

ব্যাপারটা আসলে খুব সামান্যও নয়,—খুব অসামান্যও নয়। ভামিনীভূষণ গেল কাল সবে এই নূতন বাড়িতে উঠিয়া আসিয়াছেন। কিন্তু কাল সারারাত ঘরের ছাদের একটা ভাঙা জায়গা হইতে এমনি হুড়হুড় করিয়া জল পড়িয়াছিল যে, বিছানাপত্তর সমস্ত দস্তুরমতো ভাসিয়া গিয়াছিল বলিলেই হয়। এ বাড়িতে একে ছাদে উঠিবার সিঁড়ি ছিল না, তায় এখন আবার বর্ষাকাল; বাড়িওয়ালাকে খবর দিয়া মিস্ত্রি আনাইতেও এক যুগের কম দেরি লাগিবে না;—কারণ, যেখানে সুরক্ষিত ট্যাঁক খালি হওয়ার সম্ভাবনা, কলিযুগের বাড়িওয়ালারা সেখানে ত্রেতাযুগের কুম্ভকর্ণের মতো অগাধ নিদ্রায় বধির হইয়া থাকেন, ভামিনীভূষণের বুদ্ধি চাণক্যের মতো খুব বেশি তীক্ষ্ন না হইলেও এটুকু তাঁহার অজানা ছিল না! সুতরাং আজ যদি ফের জল পড়ে, তবে তাহা বন্ধ করিবার উপায় কী,—ভামিনীভূষণ ও দুর্গাকালী কিছুতেই সেটা বুঝিয়া উঠিতে পারিতেছিলেন না।

ইতিমধ্যে রাস্তা দিয়া মস্ত লম্বা একখানা মই লইয়া দুটো মুটেকে যাইতে দেখিয়া, বুদ্ধিমতী দুর্গাকালী ধাঁ করিয়া একটা উপায় বাতলাইয়া দিলেন।

মুটেরা পরের মই লইয়া যাইতেছিল। বকশিশের লোভে ভামিনীভূষণের প্রস্তাবে তাহারা তখনই রাজি হইয়া গেল। রাস্তা হইতে মইখানা দু-তলার ছাদে লাগাইয়া, একটা মুটে বলিল, 'বাবু, আমাদের পয়সা দিয়ে আপনি ওপরে যান, ততক্ষণে বাজার থেকে আমরা জলপান খেয়ে আসি। দেখবেন বাবু, দেরি করবেন না,—আমরা বেশিক্ষণ দাঁড়াতে পারব না!'

মুটেদের পয়সা দিয়া ভামিনীভূষণ বলিলেন, 'না না, দেরি হবে কেন,—যাব আর নেমে আসব।'

মুটেরা চলিয়া গেল। একটা ভাঁড়ে খানিক বিলাতি মাটি ও আর-একটা ভাঁড়ে খানিক 'পিচ' লইয়া, বিস্যুৎবারের ভরা বারবেলায়, নব্য-যুবক ভামিনীভূষণ অতি সাবধানে ছাদের উপরে গিয়া উঠিলেন। কিন্তু ভামিনীভূষণ যদি পরম নিষ্ঠাবান প্রাচীন হিন্দু হইতেন, তাহা হইলে এত বড়ো একটা অকর্ম করিবার আগে, নিশ্চয়ই গুপ্ত প্রেস পঞ্জিকাখানা অন্তত একটিবারও খুলিয়া, 'জ্যোতিষ-বচনার্থে' 'বারবেলা'র অ-গুণ-বর্ণনাটা মন দিয়া পড়িয়া দেখিতেন।

যাহা হউক, উপরে উঠিয়া ভামিনীভূষণ দেখিলেন, ছাদের মাঝখানে একটা জায়গা ফাটিয়া একেবারে আট-চির হইয়া আছে। সেটা চলনসই রকমে মেরামত করিতেও বড়ো অল্প সময় লাগিবে না।

বাড়িওয়ালার অবিবেচনার উপরে যৎপরোনাস্তি অভিশাপ বর্ষণ করিতে করিতে ভামিনীভূষণ তাড়াতাড়ি কাজে লাগিয়া গেলেন। কোথাও খানিক বিলাতি মাটি লেপিয়া দিলেন, কোথাও খানিক 'পিচ' ঢালিয়া দিলেন। এমনিভাবে অনেকক্ষণ গেল।

ইতিমধ্যে মুটেরা ফিরিয়া আসিয়া রাস্তা হইতে বার দুয়েক 'বাবু বাবু' বলিয়া ডাক দিল। রাজমিস্ত্রির কর্মানুকরণে ব্যস্ত ভামিনীভূষণের শ্রবণ-বিবরে সে ডাক আদৌ প্রবেশপথ পাইল না। কাজেই মুটেরা ভাবিল, বাবু বোধহয় এতক্ষণে নীচে নামিয়া আসিয়াছেন। তাহারা মই লইয়া চলিয়া গেল।

রাজমিস্ত্রির কাজ সারিয়া আসিয়া ভামিনীভূষণ যখন এই অভাবিত ব্যাপারটা আবিষ্কার করিলেন, তখন উদবিগ্ন স্বরে স্ত্রী-কে ডাক দিলেন, 'ওগো! শুনচ? ওগো!'

বারকতক ডাকাডাকির পর সাড়া পাওয়া গেল, 'কী বলচ গো? ছাতে উঠে চিলের মতো চেঁচাও কেন?'

'চেঁচাবার যথেষ্ট কারণ আছে,—তাই চেঁচাই! বলি, মই কোথায় গেল?'

দুর্গাকালী হুমড়ি খাইয়া একটা ভাঙা জানলায় মুখ বাড়াইয়া দেখিল, রাস্তায় মইও নাই, মুটেও নাই! স্বামীর উদ্দেশে বলিল, 'ওই যাঃ! মুখপোড়ারা মই নিয়ে চলে গেছে যে!'

এখবরে কিছুমাত্র নূতনত্ব ছিল না! ভামিনীভূষণ একটুও খুশি না হইয়া গম্ভীরস্বরে বলিলেন, 'হুঁ, মুটেরা যে মই নিয়ে গেছে, সেটা আর তোমাকে কষ্ট করে স্পষ্ট করে বোঝাতে হবে না! এখন আমার কী গতি হবে বলো দেখি?'

দুর্গাকালী মহাফাঁপরে পড়িয়া বলিলেন, 'তা-ই তো, একটা কিছু উপায় করতে হবে তো!'

'কী উপায়? ছাদ থেকে লাফ মেরে নীচে যাব? কিন্তু আমার যে ল্যাজ নেই, সেটা তুমি জানো বোধহয়?'

'ও মা, লাফাবে কী গো! তাহলে কি বাঁচবে আর?'

'হ্যাঁ, এখান থেকে লাফ মারলে আমার পক্ষে বেঁচে থাকা, অতিশয় শক্ত হয়ে উঠবে বটে! কিন্তু ছাদের ওপরেও বেঁচে থাকবার আশা ভারী অল্প দেখচি। এই ইনফ্লুয়েঞ্জার সময়, তায় আমার খালি গা, ওদিকে আকাশে ক্রমেই মেঘ করে আসচে—সঙ্গে সঙ্গে সন্ধেও হয়ে এল। আমার অবস্থাটা বুঝচ কি? যতদূর সঙ্গিন হতে হয়!'

দুর্গাকালী আকাশের দিকে চাহিয়া দেখিল, সত্য সত্যই বৃষ্টির আর বেশি বিলম্ব নাই!

বন্ধুরা বলিতেন, ভামিনীভূষণের সুরসিক পিতা ঠাট্টা করিয়া ছেলের এহেন নাম রাখিয়াছিলেন। কারণ, স্বচক্ষে ভামিনীভূষণের চেহারা দেখিলে যেকোনো ভামিনীই, গুরুজনের কঠোর আদেশ ভিন্ন তাঁহাকে আপনার ভূষণরূপে গ্রহণ করিতে একান্ত আপত্তি প্রকাশ করিবেন! সত্য কথা বলিতে কী, আমাদের এই ভামিনীভূষণের চেহারাটি ঠিক সেই শ্রেণির— রাত্রে নির্জন রাস্তায় যে শ্রেণির লোকের সঙ্গে হঠাৎ দেখা হইয়া গেলে, আমাদের বুকের কাছটা যারপরনাই গুরগুর করিয়া ওঠে!

সুতরাং ও বাড়ির ছাদের উপরে এমন একটা ঘোর-কৃষ্ণ হৃষ্টপুষ্ট অশিষ্ট চেহারা দেখিয়া, পাড়ার বিশিষ্ট ভদ্রলোক গঙ্গারাম হাতি মহাশয় আদৌ হৃষ্টচিত্ত হইতে পারিলেন না। কাল যে ও বাড়িতে একঘর নূতন ভাড়াটিয়া আসিয়াছে, তাহাদের সঙ্গে পরিচয় না থাকিলেও এটুকু তাঁহার অজানা ছিল না। সবজান্তা হাতি মহাশয় আরও জানিতেন, ও বাড়িতে ছাদে উঠিবার সিঁড়ি নাই। সুতরাং এমন অসময়ে, এই ভরসন্ধ্যায় যখন ঝুপ ঝুপ করিয়া বৃষ্টি পড়িতেছে এবং শোঁ শোঁ করিয়া ঝড় বহিতেছে, তখন ও বাড়ির ছাদে ওই বদখত চেহারার লোকটিকে দেখিবামাত্র গঙ্গারামের মনে ভয়ানক সন্দেহ হইল।

তথাকথিত 'ভয়ানক সন্দেহ' আবার দুর্জয় ক্রোধে পরিণত হইল তখন, গঙ্গারামের যখন মনে পড়িল, গেল মাসে উপর-উপরি দুই রাত্রিতে তাঁহার বাড়ি হইতে ঘটিবাটি বাসনকোশন ও কাপড়চোপড় চুরি গিয়াছে এবং সেই ধূর্ত ও অভদ্র চোরকে আজ পর্যন্ত তিনি গ্রেপ্তার করিতে পারেন নাই। এই চোরই নিশ্চয় সেই চোর! যাঁহাতক এই কথা মনে পড়া, তাঁহাতক গঙ্গারামের ষণ্ডকণ্ঠে প্রাণপণে চিৎকার—'চোর, চোর! পুলিশ, পুলিশ! চোর! চোর! চোর! ধর! ধর! ধর! মার! মার! চোর! চোর!—' (চিৎকার সমানে চলিল)

চোর-নামে কী আকর্ষণ আছে! গঙ্গারামের উচ্চনাদে স্ফীত কণ্ঠ ভগ্নদশা প্রাপ্ত হইবার পূর্বেই, সেই ঝড়বৃষ্টি-বজ্রাঘাতকে আমলের মধ্যেই না আনিয়া চারিদিক হইতে সেখানে কাতারে কাতারে লোক ছুটিয়া আসিল।

কই কই? কোথায় সে শা—? ব্যাটা গেল কোথায়? পাহারাওয়ালা—এই পাহারাওয়ালা! জলদি—জলদি! চোট্টা—ডাকু!—এমনিতরো নানা কণ্ঠের বিচিত্র হাঁকডাকে বাজের আওয়াজ কোথায় তলাইয়া গেল!

একে তো মই হারাইয়াই মহাবিপদ উপস্থিত হইয়াছে, তাহার উপরে এই ঝড়বৃষ্টির হাঙ্গামা, তাহার উপরে আবার এই নূতন আপদ! বেচারি ভামিনীভূষণ রীতিমতো স্তম্ভিত ও নির্বাক হইয়া গেলেন।

ঝড়ের ঝাপট ও বৃষ্টির দাপট আরও বাড়িয়া উঠিল— শীতে ঠকঠক করিয়া কাঁপিতে কাঁপিতে ভামিনীভূষণ একধারের পাঁচিল ঘেঁষিয়া সরিয়া জড়সড় হইয়া দাঁড়াইলেন।

ইগলচক্ষু গঙ্গারাম হাতি অমনি চেঁচাইয়া উঠিলেন, 'ব্যাটা পালাচ্চে—ব্যাটা পালাচ্চে!'

'কী! আমাকে ব্যাটা বলা? তবে রে ছুঁচো!'—ভামিনীভূষণ মহাখাপ্পা হইয়া বিলাতি মাটির ও পিচের ভাঁড় দুটো গঙ্গারামকে লক্ষ করিয়া সজোরে ছুড়িয়া মারিলেন!

গঙ্গারাম হাতি মুহূর্তমধ্যে জানলার ধার হইতে হরিণের মতো চটপট অদৃশ্য হইলেন।

রাস্তার লোকেরা চেঁচাইয়া উঠিল, 'খুন! খুন! পাহারাওয়ালা— ও পাহারাওয়ালা!'

ভামিনীভূষণ দুই হাত ঊর্ধ্বে তুলিয়া ছাদের ধারে গিয়া উচ্চৈচঃস্বরে বলিলেন, 'মশাইরা, মশাইরা, আমি খুনেও নই, চোরও নই—আমি—' তিনি যে কী, তাহা প্রকাশ করিয়া বলিবার আগেই তাঁহার উদ্দেশে একঝাঁক ইষ্টকবৃষ্টি হইল। ভাগ্যে লোকগুলো ইট ছোড়ায় তেমন অভ্যস্ত ছিল না,—সে যাত্রা ভামিনীভূষণ তাই দু-এক জায়গায় অল্পস্বল্প চোট খাইয়াই ঈশ্বর-প্রদত্ত দেহখানির ঠাট কোনোক্রমে বজায় রাখিতে পারিলেন।

কনস্টেবল রামভজন রাস্তার মোড়ে পানের দোকানের আরশির সামনে দাঁড়াইয়া, বিনি পয়সার তাম্বূলরসে শ্মশ্রু-গুম্ফ ভিজাইয়া, পানের দোকানের স্বজাতীয়া অধিকারিণীর কাছে 'এমন ঘনঘোর বরিষা'য় যে কথাগুলি বলা যায়, প্রাণের সেই গোপন কথাগুলি অল্পে অল্পে হৃদয় উন্মুক্ত করিয়া একে একে দিব্য গুছাইয়া বলিতেছিল। এমন সময় আচমকা বেসুরো 'চোর চোর' চিৎকার শুনিয়া সে চোরের কাণ্ডজ্ঞানহীনতা এবং আপনার দূরদৃষ্টকে অশ্রাব্য ভাষায় ধিক্কার দিতে দিতে সেইদিকে বেগে ধাবমান হইল।

ঘটনাস্থলে হাজির হইয়া সমস্ত ব্যাপার শুনিয়া, উচ্চরবে সে ভামিনীভূষণের উদ্দেশে গ্রাম্য মেড়ুয়া-ভাষায় যে কথাগুলি বলিল, তাহার সোজাসুজি সভ্য বাংলা অনুবাদ এই:— ভামিনীভূষণ যদি সহজে উপর হইতে নামিয়া আসে, তবে তাকে মোটে বছরখানেকের জন্য শ্রীঘরবাস করিতে হইবে; আর সহজে নামিতে রাজি না হইলে তাহার শাস্তি কিন্তু অত্যন্ত কঠিন হইবে—যার নাম, পাকা দশটি বৎসর।

উপর হইতে সহজে নামিয়া আসা তাঁহার পক্ষে যে একটুও সহজ নয়, সেটা ভালো করিয়া সমঝাইয়া দিবার জন্য বেচারি ভামিনীভূষণ আবার ছাদের ধারে আসিয়া, আস্তে আস্তে সাবধানে সর্বপ্রথমে নাকের ডগাটি একটুখানি মাত্র বাড়াইলেন। কিন্তু নীচের লোকেরা অত্যন্ত বেশিরকম প্রস্তুত হইয়াছিল,—যেমন চোরের দেখা পাওয়া, অমনি বিনা বাক্যব্যয়ে গোটা তিনেক গুলতি হইতে গোটা তিনেক বড়ো বড়ো মার্বেল এবং অসংখ্য হস্ত হইতে অগুনতি ইট আর পাথর তাহার উপরে দুমদাম করিয়া বর্ষিত হইল—তার কাছে কোথায় লাগে শিলাবৃষ্টি!

হতাশ হইয়া ভামিনীভূষণ ছাদের উপরে সটান শুইয়া পড়িলেন এবং মনে মনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করলেন, জগৎ রসাতলে গেলেও অদূর-ভবিষ্যতে তিনি আর গাত্রোত্থান করিবেন না। একটা গুলতির মার্বেল আসিয়া এমন গভীর প্রেমে তাঁহার গণ্ড চুম্বন করিয়াছিল যে, তাঁহার সেই কালো গালও ফুলিয়া এবং রাঙা হইয়া উঠিল! সকলের চেয়ে দুর্গাকালীর উপরেই রাগটা তাঁহার বেশি মাত্রায় হইল। স্বামী যাহার মৃত্যুমুখে পড়ো-পড়ো সে কিনা লজ্জার অছিলায় অন্তঃপুরে গা-ঢাকা দিয়া নিশ্চিন্ত হইয়া আছে! আর তাহারই পরামর্শে বোকার মতো ছাদে চড়িয়া আজ তাঁহার এই বিপদ।

হঠাৎ রাস্তা হইতে নূতন চিৎকার উঠিল—'আগুন! আগুন!'— ভামিনীভূষণ কান পাতিয়া শুনিলেন, দুর্গাকালীও বাড়ির ভিতর হইতে আগুন আগুন বলিয়া চেঁচাইতেছে! প্রতিজ্ঞা ভুলিয়া তাড়াতাড়ি তিনি উঠিয়া বসিলেন। এ আবার কী ব্যাপার?

ব্যাপার আর কিছুই নয়। একটা লক্ষ্যচ্যুত ইট বা পাথর ছাদের বদলে ভামিনীভূষণের ঘরে ঢুকিয়া, কেরোসিনের জ্বলন্ত ল্যাম্প উলটাইয়া দিয়াছে। ফলে এই নূতন বিপত্তি।...

মিনিট পাঁচ-ছয়ের মধ্যে ফায়ার ব্রিগেড আসিয়া হাজির আগুনটা ভালো করিয়া জ্বলিতে-না জ্বলিতেই নিবাইয়া ফেলা হইল। ফায়ার ব্রিগেডের লোকেরা যে মই আনিয়াছিল, ভামিনীভূষণ তাহার সাহায্যে অবশেষে নিরাপদে নীচে নামিয়া আসিলেন।

তারপর অবকাশ পাইয়া ভামিনীভূষণ যখন আসল ঘটনাটা খুলিয়া বলিলেন, কনস্টেবল রামভজন তখন তাঁহার দিকে একটা অত্যন্ত ঘৃণা-বিরক্তিভরা দৃষ্টি প্রেরণ করিয়া দ্রুতপদে আবার সেইখানে চলিয়া গেল, অত্যন্ত অনিচ্ছাসত্ত্বেও যেখানে সে তাহার নিভৃত হৃদয়ের গোপন কাহিনি অসমাপ্ত রাখিয়া আসিয়াছিল।

বাড়ির ভিতরে ঢুকিতেই দুর্গাকালী তাড়াতাড়ি একচোখ জল লইয়া তাঁহার কাছে ছুটিয়া আসিল। ভামিনীভূষণ কিন্তু স্ত্রী-র কাতরতা একেবারে গ্রাহ্যের মধ্যে আনিলেন না। ক্রুদ্ধস্বরে বলিলেন, 'স্ত্রী বুদ্ধি যে প্রলয়ংকরী, আজ তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ পেলুম। হিন্দুর ছেলে আমি,—ভবিষ্যতে আর কখনো বিস্যুৎবারের বারবেলায় অব্যর্থ শাস্ত্রবাক্য অবহেলা করব না!'

ভারতী, শ্রাবণ ১৩২৬ (জুলাই ১৯১৯)

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%