চোর

হেমেন্দ্রকুমার রায়

সুনীতিকে বাঁচাতেই হবে! আমার এ আলিঙ্গনের ভিতর থেকে, আমাকে কাঙাল করে সে যেতে পারবে না,— পারবে না!

এতদিন আমার সঙ্গে থেকে মুখ বুজে সে যে সংসারের শত জ্বালা পুইয়ে এসেছে! দারিদ্র্যে, হতাশায় আমি যখন চারিদিক অন্ধকার দেখেছি, দুঃখের সাগরে সুখের দ্বীপের মতো সে তখন আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, তার মধুর হাসির আলোয় আমার মনের সকল কালো ঘুচিয়ে দিয়েছে, তার স্নেহে-যত্নে-প্রেমে আমার মৃতদেহে নূতন জীবনের সঞ্চার করেছে! সে যদি না থাকত, তাহলে এতদিনে আমি যে আশাহত হয়ে আত্মহত্যা করতুম!...

এতকাল পরে আজ সবে যেই সুখের আভাস পেয়েছি, আর অমনি অদৃষ্টের এ কী বিড়ম্বনা! আমার দুঃখে যে নিজের বুক পেতে দিয়েছে, বিধাতা কি তাকে আমার সুখে একটু হাসবার অবকাশও দেবেন না? কাঁদতে কাঁদতেই সে কি চিরবিদায় নিয়ে যাবে? আর, অসহায় আমি— বুকে পাথর বেঁধে হাত গুটিয়ে বসে বসে অম্লানবদনে তা-ই দেখব? না, সে হবে না— হতে পারে না!...

কিন্তু, কী করব? সুনীতিকে বাঁচাতে হলে ভালো ডাক্তার চাই— ডাক্তার ডাকতে হলে টাকা চাই! টাকা কে দেবে? দেনার দায়ে মাথা বিকিয়ে যেতে বসেছে, স্ত্রী-পুত্র নিয়ে অর্ধাহারে-অনাহারে কোনোরকমে দিন কাটছে, অর্থাভাবে বেঁচে থেকেও রোজ মরণাধিক যন্ত্রণা ভোগ করছি— আমার পানে মুখ তুলে তাকায় এমন দরদি তো কেউ কোথাও নাই! আমাকে বিশ্বাস করে আর কেউ টাকা দিতে চায় না— ভিখারির মতো সারাদিন দোরে দোরে হাত পেতে ঘুরে মরেছি, কিন্তু আমাকে কেউ তো একটি টাকাও ধার দিলে না!

জ্বরের ঘোরে সুনীতি অজ্ঞান হয়ে গেছে, চিকিৎসার অভাবে তার অবস্থা ক্রমেই সঙ্গিন হয়ে উঠছে; এই হাড়ভাঙা শীতে একখানা শতচ্ছিন্ন পাতলা র‌্যাপার গায়ে দিয়ে, অজ্ঞান অবস্থাতেও তার দাঁতে দাঁত লেগে যাচ্ছে। স্বামী হয়ে এ নিদারুণ দৃশ্য আর যে প্রাণ ধরে দেখতে পারছি না— এ যে অসহ্য!

পকেটে হাত দিয়ে দেখলুম, গন্ডাকতক পয়সা আর আমার দরখাস্তের উত্তরের চিঠিখানা রয়েছে। চিঠিখানা বের করে আর-একবার পড়লুম। কত কষ্ট, কত নিরাশার পর বিদেশের এক আফিসে আমার দরখাস্ত মঞ্জুর হয়েছে। সাহেব লিখেছেন, আর সপ্তাহ দুয়েকের মধ্যে কর্মস্থলে গিয়ে আমার হাজির হওয়া চাই।

এ সুখবরে আমার চেয়ে যে বেশি আনন্দিত হত, সেই সুনীতি আজ যেতে বসেছে! এতদিন যা চাচ্ছিলুম আজ তা পেয়েছি— কিন্তু সুনীতি যদি জন্মের মতো ফাঁকি দিয়ে পালায়, তবে কার মুখ চেয়ে আমি আর পরের চাকরি স্বীকার করব?

আস্তে আস্তে সুনীতির শিয়রে গিয়ে দাঁড়ালুম। তার কোটরগত চোখ দুটি মোদা,—ঠোঁট দুখানি ঘন ঘন কাঁপছে। প্রদীপের ম্লান আলোয় তার রোগশীর্ণ মুখখানি কী ভয়ানক ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে! তার কপালে হাত দিয়ে হাত যেন পুড়ে গেল,— মনে হল জ্বরের তাপে এরই মধ্যে তার প্রাণ যেন দগ্ধে অসাড় হয়ে গেছে! অসহ উদবেগে আমার বুকের ভিতরটা ধড়ফড় করতে লাগল।

কী করি— কী করি! সুনীতির জীবন যে পলে পলে ক্ষীণ হয়ে আসছে— কী করে তাকে রক্ষা করব?...

সেইখানে বসে বসে মাথায় হাত দিয়ে ভাবতে লাগলুম। সে যে কী ভীষণ ভাবনা, আমার অন্তর্যামীই জানেন!... ভাবনার সে অকূল পাথারে যখন কোনোদিকেই সুরাহা দেখতে না পেয়ে, আমার মন ক্রমেই নেতিয়ে পড়তে লাগল, তখন কে যেন হঠাৎ চুপি চুপি আমার কানে কানে বললে, 'তুমি চুরি করো!...'

চুরি?... হ্যাঁ, চুরি! তা ছাড়া আর উপায় কী? পৃথিবীতে কত লোক অর্থলোভে কত মহাপাপ কত নরহত্যা করছে আর আমি একজনের জীবনরক্ষার জন্যে একটি দিনের তরে যদি চুরি করি, তাতে দোষ কী?...

দু-হাঁটুর মাঝে মুখ গুঁজে মনে মনে ক্রমাগত এই কথা নিয়ে নাড়াচাড়া করতে লাগলুম। যতই ভাবি, ততই মনে হয়, এর চেয়ে সহজ উপায় নেই! কেউ জানবে না, দেখবে না, শুনবে না— চুরি করে সুনীতিকে যদি বাঁচাতে পারি, তবে আমি তা-ই করব, তা-ই করব।...

স্তব্ধ রাত্রি— শীতার্ত বিপুল নগরী এখন ঘুমে অচেতন। জানলা খুলে দেখলুম, কুয়াশায় চারিদিক ঝাপসা; দীর্ঘ পথে জনমনুষ্য নেই; কেবল গ্যাসের প্রদীপ্ত থামগুলো, চিরজাগন্ত নির্বাক প্রহরীর মতো সারি সারি দাঁড়িয়ে, একমনে যেন প্রহরের পর প্রহর গুনে যাচ্ছে!

পাগলের মতন ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়লুম।... এমনি করেই কি নিরাশায় পড়ে লোকে চোর হয়?

সেই অন্ধকার গলিতে, পরের বাড়ির প্রাচীরের উপরে দাঁড়িয়ে আমার বুক ধড়াস করে উঠল!

যদি ধরা পড়ি!...গরিব হলেও আমি ভদ্রলোক! চরিত্রবান বলে আমার খ্যাতি আছে, চোর বলে ধরা পড়লে আমার কী দশা হবে?

দূর থেকে হঠাৎ পাহারাওয়ালার উচ্চকণ্ঠের চিৎকারধ্বনি অস্পষ্ট শুনতে পেলুম। সেই প্রাচীরের উপরেই এলিয়ে বসে পড়লুম— ভয়ে আমার বুকের কাছটা যেন ঠান্ডা হয়ে গেল!

কতক্ষণ বসে রইলুম, জানি না! যে ভরসায় বুক বেঁধে বেরিয়ে পড়েছিলুম, সে সাহস আর করতে পারলুম না। মনে হতে লাগল, চারিদিকের আনাচকানাচ থেকে কারা যেন শত শত সতর্ক দৃষ্টি মেলে নীরবে আমার পানে তাকিয়ে রয়েছে! আর-একটু পরেই তারা সবাই যেন একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠবে, 'ওই চোর, চোর, চোর!'

তাড়াতাড়ি প্রাচীরের উপর থেকে নামতে গেলুম। অমনি হঠাৎ বিদ্যুতের মতো চোখের সামনে ফুটে উঠল সুনীতির মুখ!— সেই বিশীর্ণ, পাণ্ডুর, মরন্ত মুখ! আচ্ছন্নের মতো দেখলুম, তার মুখের চারিপাশ ঘিরে যেন শ্মশানের চিতা দাউদাউ জ্বলছে, সে আগুনে এখনই যেন সমস্ত পুড়ে ছারখার হয়ে যাবে...

সব ভয় ঘুচে গেল,— মরিয়া হয়ে পাঁচিল পেরিয়ে পাশের বাড়ির ছাদে গিয়ে পড়লুম।

সে ঘরের ভিতরে কারো সাড়াশব্দ পেলুম না। অন্ধকারে দেখা যাচ্ছিল না— আস্তে আস্তে দেশলাইয়ের একটা কাঠি ধরালুম। আধখানা কাঠের দেয়াল দিয়ে একটা বড়ো ঘরকে দু-ভাগ করা হয়েছে— তারই একটা অংশে আমি দাঁড়িয়ে। দেয়ালের মাঝে একখানা পরদা ঝুলছে, বোধহয় সেইখান দিয়ে ঘরের অন্য অংশে যাওয়া যায়।

একদিকে দুটো আলমারি আর একটা দেরাজ। আর-একদিকে একটি আলনা— তাতে স্ত্রীলোকের খানকত কোঁচানো কাপড় ঝুলছে; একটা আয়নাওয়ালা টেবিলও রয়েছে— তার উপরে পমেটম, এসেন্সের শিশি, সাবানের বাক্স, পাউডার ও সিঁদুরের কৌটো, চিরুনি এবং বুরুশ প্রভৃতি নানারকম জিনিস পাশে পাশে সাজানো। নকশা- করা মেদিনীপুরি মাদুরে ঘরের মেঝেটি আগাগোড়া ঢাকা।— বুঝলুম, এটি কোনো রমণীর সাজঘর; সে রমণী যে ধনীর ঘরনি— তাতেও কোনো সন্দেহ রইল না।

দেরাজের টানাগুলো একে একে টেনে দেখলুম বন্ধ। আলমারি দুটোতেও চাবি লাগানো। হতাশ হয়ে ভাবতে লাগলুম, এতদূর এগিয়ে শেষটা কি শুধু হাতে ফিরতে হবে?

আর-একটা দেশলায়ের কাঠি জ্বেলে, আয়না-বসানো টেবিলের দিকে এগিয়ে গেলুম। তার একটা টানার দিকে চোখ পড়তেই আমার হতাশ প্রাণ আবার আশার আনন্দে পূর্ণ হয়ে উঠল। দেখলুম একটি টানায় রিংসুদ্ধ একগোছা চাবি লাগানো রয়েছে! এই জঘন্য অপবিত্র কাজেও আমি না মনে করে থাকতে পারলুম না যে— ভগবান আজ আমার সহায়!

আস্তে আস্তে টানা খুলতেই, ভিতরে কী সব চিকচিক করে উঠল! আর-একটি কাঠি জ্বেলে দেখলুম, একগাছা হার, গাছকতক চুড়ি আর একজোড়া রতনচূড়,— সবই জড়োয়া গয়না! এত গয়নায় তো আমার দরকার নেই! আমি তো চুরির জন্যেই চুরি করতে আসিনি— আমি যে দায়ে পড়ে নাচার হয়ে এসেছি!

ভেবেচিন্তে ঠিক করলুম, রতনচূড় দুখানাই আমি নিয়ে যাব। এ গয়নাও বিক্রি করব না— শ-দুয়েক টাকায় আপাতত কোথাও বাঁধা রাখব। সেই টাকায় স্ত্রী-র চিকিৎসা চলবে। তারপর ধার শুধে, গয়না উতরে, যেমন করে পারি যার জিনিস তাকেই ফের ফিরিয়ে দেব!

রতনচূড়জোড়া কম্পিত হস্তে বার করে নিলুম। মনে মনে বললুম: ভগবান, আমাকে ক্ষমা করো! এই আমার প্রথম ও শেষ পাপ,— জীবনে এ পথ আর কখনো মাড়াব না।

টানাটা বন্ধ করে যেমন সরে আসতে যাব— আমার হাত লেগে টেবিলের উপর থেকে কী একটা জিনিস সশব্দে নীচে পড়ে গেল!

অন্ধকারে জড়সড় হয়ে কাঠের মতো দাঁড়িয়ে রইলুম— যদি কেউ শুনতে পেয়ে থাকে...

আমার মনে হল, যেন খসখস করে কার কাপড়ের আওয়াজ হচ্ছে— ঘরের মাঝে কে যেন পা টিপে টিপে চলছে! আতঙ্কে আমার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে এল!

খট করে কীসের শব্দ হল— সেই সঙ্গে সঙ্গে ইলেকট্রিকের প্রখর আলোকতরঙ্গ এসে আমার চোখের উপর যেন হঠাৎ একটা প্রবল ধাক্কা মারলে!— মুহূর্তের জন্যে আমি একেবারে অন্ধ হয়ে গেলুম।

চোখের জড়তা যখন কেটে গেল, তখন ভয়স্তম্ভিত নেত্রে দেখলুম— ঠিক আমার সুমুখেই একজন রমণী আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন!

রমণীও বিস্ময়ে-ভয়ে নির্বাক হয়ে আমার পানে বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে ছিলেন!

মাথাটা কেমন ঘুরে উঠল— পড়ে যেতে যেতে তাড়াতাড়ি দেয়ালটা ধরে ফেললুম। মনে হল, আমাতে যেন আর আমি নেই!

বিস্ময়ের প্রথম বেগটা কেটে যেতেই রমণী ব্যাকুলভাবে দরজার দিকে ছুটে গেলেন। তখন আমার হুঁশ হল। বুঝলুম, তিনি লোক ডাকতে যাচ্ছেন! পাগলের মতো একলাফে আমিও দরজার কাছে গিয়ে পড়লুম। ভয়ে একটা অস্ফুট চিৎকার করে তিনি দু-পা পিছিয়ে দাঁড়ালেন।

আমি মাটির উপর বসে পড়ে সকাতরে বললুম, 'মা, আমাকে ক্ষমা করুন— আমার সর্বনাশ করবেন না— লোক ডাকবেন না!'

অচল প্রতিমার মতো স্তব্ধভাবে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত সন্দেহের সহিত তিনি আমার দিকে চেয়ে রইলেন।

আমি আবার বললুম, 'মা, আমি ভদ্রলোকের ছেলে— দায়ে পড়ে আজ একদিনের জন্যে চোর হয়েছি— এ ভিন্ন আমার আর কোনো উপায় ছিল না— আমাকে বিশ্বাস করুন— আমাকে বিশ্বাস করুন!'

রমণী কোনো কথা কইলেন না— তেমনিভাবেই দাঁড়িয়ে রইলেন।

আমি মুখ তুলে তাঁর দিকে তাকালুম। মা বলে তাঁকে ডেকেছি বলেই হোক বা আমার কাতরতা দেখেই হোক,— তাঁর মুখ থেকে ভয়ের ভাবটা কেটে গেল। তিনি বোধহয় বুঝতে পারলেন যে, আমার দ্বারা তাঁর কোনো অহিত হবে না। নইলে, এতক্ষণে নিশ্চয়ই তিনি চেঁচিয়ে উঠতেন।

আমি নিম্নস্বরে, খুব সংক্ষেপে, আমার অবস্থা তাঁর কাছে প্রকাশ করে বললুম। আর, তা ছাড়া আমার অন্য উপায় তো কিছু ছিল না!

রমণীর দৃষ্টি কোমল হয়ে এল। আমার কথায় তিনি যেন বিশ্বাস করলেন! কিন্তু তখনও তিনি একটি কথাও বললেন না।

আমি বললুম, 'আমি চুরি করেছি— কিন্তু আমি চোর নই! আপনি টানা খুলে দেখুন, আমি আপনার আর কোনো গয়নায় হাত দিইনি। ভেবেছিলুম, এই গয়না বাঁধা দিয়ে আমার স্ত্রী-র প্রাণ বাঁচাব, কিন্তু এখন দেখছি ভগবানের সে ইচ্ছে নয়! নিন মা, আপনার গয়না আপনি ফিরিয়ে নিন,— আমি চোর হলুম বটে, কিন্তু স্ত্রী-কে তবু বাঁচাতে পারলুম না!'— এই বলে আমি সাশ্রুনেত্রে রতনচূড়জোড়া তাঁর পায়ের কাছে রেখে দিলুম।

রমণী একবার তাঁর গয়নার দিকে, একবার আমার মুখের দিকে চেয়ে দেখলেন। তারপর ঘাড় হেঁট করে ক্ষণকাল স্তব্ধ থেকে খুব মৃদুস্বরে বললেন, 'ও গয়না আপনি নিয়ে যান!'

আমি অবাক-অভিভূত হয়ে তাঁর দিকে কৃতজ্ঞ দৃষ্টিতে চেয়ে বসে রইলুম। তারপর উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বললুম, 'মা, আপনি দেবী! আপনার দয়ায় আজ আমার স্ত্রী-র প্রাণরক্ষা হল! এ উপকার আমি ভুলব না, এ গয়নাও যেমন করে পারি আবার আপনাকে ফিরিয়ে দেব।'

'আমি ফেরত চাই না, আপনি শীঘ্র এখান থেকে চলে যান'— বলে, রমণী দরজার দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করে দেখিয়ে দিলেন!

ধীরে ধীরে ঘর থেকে বেরিয়ে এলুম— আমার মন তখন নানাভাবে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল।

অন্যমনস্ক হয়ে ছাদের দিকে অগ্রসর হচ্ছি— হঠাৎ কে উচ্চস্বরে চিৎকার করে উঠল, 'চোর! চোর!'

আমার সর্বাঙ্গ যেন পাথর হয়ে গেল! মনে হল, পায়ের নীচে পৃথিবী ঘুরছে!

নীচের সিঁড়িতে কার দ্রুত পদধ্বনি শুনলুম— আরও নানাদিক থেকে নানা লোকের গলার স্বরও কানে এল!

জ্ঞানহারার মতো ছুটতে ছুটতে আবার রমণীর ঘরে এসে ঢুকলুম।

রমণীও সেই 'চোর' বলে চিৎকার শুনেছিলাম। অত্যন্ত বিবর্ণমুখে উৎকর্ণ হয়ে তিনি ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

বালকের মতো তাঁর পায়ের কাছে আছড়ে পড়ে বললুম, 'মা, আমাকে বাঁচান!'

চোখের পলক না পড়তে রমণী ইলেকট্রিকের আলো নিবিয়ে দিলেন। তারপর একটুও ইতস্তত না করে আমার হাত ধরে সেই অন্ধকারেই পাশের ঘরে টেনে নিয়ে গেলেন।

পিছনে পিছনে যে লোকটা ছুটে আসছিল, ঘরের বাইরে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই সে চেঁচাতে লাগল। বোধহয়, অন্ধকারে এ ঘরে ঢুকতে তার সাহসে কুলোল না।

আমার কানে কানে রমণী বললেন, 'বিছানায় উঠে গায়ে লেপ ঢাকা দিন!'

আমি বিস্মিতকণ্ঠে বললুম, 'আপনার বিছানায়!'

'উঠুন, দেরি করবেন না! আপনি আমাকে মা বলেছেন!'

'কিন্তু, আমি ধরা পড়লে, আপনার কী হবে?'

'ওরা এখনই এসে ঘর খুঁজবে, এ ছাড়া উপায়ও নেই। যদি বাঁচতে চান, আপনার স্ত্রী-কে বাঁচাতে চান, তাহলে উঠুন— বিছানার সঙ্গে একেবারে মিশিয়ে শুয়ে থাকুন।'

আমি আর কিছু বলতে পারলুম না— সেই অপূর্ব রমণী যা বললেন, তা-ই করলুম। আমার সঙ্গে সঙ্গে তিনিও বিছানায় উঠলেন, তারপর আমার সর্বাঙ্গ লেপ দিয়ে ঢেকে পালঙ্কের একপ্রান্তে সরে গিয়ে তিনি চুপ করে বসে রইলেন। বেশ বুঝতে পারলুম,—তাঁর দেহ থেকে থেকে থরথরিয়ে কেঁপে উঠছে!

দু-এক মুহূর্ত পরেই হুড়মুড় করে অনেক লোক ঘরে এসে ঢুকল।

কে একজন ব্যস্তভাবে বললে, 'মেজোবউদি, মেজোবউদি, তোমার ঘরে চোর ঢুকেছে!'

রমণী বেশ স্বচ্ছন্দভাবেই বললেন, 'আমার ঘরে চোর! ঠাকুরপো, তুমি পাগল হলে নাকি? মিছিমিছি চেঁচিয়ে আমার ঘুম ভাঙিয়ে দিলে!'

'না, না,— আমি স্বচক্ষে তাকে তোমার ঘরে ঢুকতে দেখেছি! এ কী, মেজদাদা আজকেও ঘরে আসেননি!... কিন্তু, এ তো ভারী আশ্চয্যি, চোর-ব্যাটা গেল কোথা?'

'ঠাকুরপো, স্বপ্নের চোরকে জাগলে আর ধরতে পারা যায় না!'

'না মেজোবউদি, আমি ঠিক দেখেছি,— তোমার দিব্যি!'

'দেখেছ তো, সে গেল কোথায়?'

'তা-ই তো ভাবছি!'

'কী ঠাকুরপো, বিছানার দিকে অমন করে তাকাচ্ছ কেন? তুমি কী ভাবছ, চোর এসে আমার লেপের ভিতর ঢুকে নাকে সরষের তেল দিয়ে ভালোমানুষটির মতো ঘুমিয়ে পড়েছে?' বলে রমণী উচ্চস্বরে হেসে উঠলেন! কিন্তু সে হাসির ভিতরেও তাঁর গলার স্বর কেমন যেন কাঁপছিল!

'না, না, তা ভাবছি না— তা ভাবছি না! চোরটা তাহলে এ ঘর থেকে কোনোগতিকে সরে পড়েছে দেখছি। কিন্তু, কোনদিক দিয়ে পালাল?'

'দুঃখের বিষয় ঠাকুরপো! চোরেরা যে কোনদিক দিয়ে পালায় সেটা চেঁচিয়ে জাহির করে তারা সৎসাহস দেখিয়ে যেতে পারে না।'

আর-একজন কে বললে, 'বাবু, আসুন! চোরটা বোধহয় অন্য কোথাও লুকিয়ে আছে!'

'চল, চল, দেখা যাক! এখানে দাঁড়িয়ে মিছে সময় নষ্ট করলে তাকে আর ধরতে পারব না!'

সকলে দ্রুতপদে ঘর থেকে আবার বেরিয়ে গেল।

সঙ্গে সঙ্গে রমণীও পালঙ্কের উপর থেকে নেমে পড়ে ঘরের দরজাটা বন্ধ করে দিলেন।

আমিও একটা আশ্বস্তির নিশ্বাস ফেলে শয্যাত্যাগ করে নীচে নেমে দাঁড়ালুম।

উদবেগে-ভয়ে-লজ্জায় মুখ মলিন করে আমার সেই দেবীরূপিণী রক্ষাকর্ত্রী হাঁটু গেড়ে কক্ষতলে বসে আছেন। অত্যধিক উত্তেজনায় তিনি তখন যেন হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে উঠছিলেন!

আমি তাঁর সামনে গিয়ে তাঁকে প্রণাম করে বললুম, 'মা, আমি এখন কী করে যাব? আর এখানে থেকে আপনাকে তো বিপদে ফেলতে পারব না!'

মাথা না তুলেই চিন্তিতস্বরে তিনি বললেন, 'আর-একটু অপেক্ষা করুন— সকলে আবার ঘুমোক।'

'কিন্তু যদি আপনার স্বামী এসে পড়েন?'

মাটির দিকে মুখ আরও নামিয়ে রমণী করুণস্বরে বললেন, 'রাত্রে তিনি তোবাড়ি আসেন না!'

আশ্চর্য! এমন রূপবতী-গুণবতী স্ত্রী যার ঘরে, কী আকর্ষণে সে বাইরে বাইরে রাত কাটায়!...

শোনা যায় কি না যায়, এমনি অস্পষ্টস্বরে, রমণী যেন আপনমনেই বললেন, 'স্ত্রী-র জন্যে স্বামী চোর হচ্ছে! আর, আমার স্বামী— আমার স্বামী... হঠাৎ আমার দিকে তাকিয়ে, বলতে বলতে থেমে পড়ে, তিনি দু-হাতে আপনার মুখ ঢেকে ফেললেন।

ভারতী, চৈত্র ১৩২৩ (মার্চ ১৯১৭)

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%