হেমেন্দ্রকুমার রায়
(Oscar Wilde-এর ‘The Nightingale and the Rose’ হইতে)
'সে বলেচে একটি রাঙা গোলাপ এনে দিলে আমার সঙ্গে নাচবে। কিন্তু হায়, আমার সারা বাগানে একটিও রাঙা গোলাপ নেই!'
গাছের ডালে বাসায় বসে পাপিয়া ছাত্রের এই করুণ কথাগুলি শুনতে পেলে। পাতার ফাঁক দিয়ে উঁকি মেরে দেখে, পাপিয়া অবাক হয়ে ভাবতে লাগল।
ছাত্রের বড়ো বড়ো চোখ দুটি অশ্রুজলে ভরে উঠল। কান্নার স্বরে সে আবার বললে, 'আমার সারা বাগানে একটিও রাঙা গোলাপ নেই! হায়, কী তুচ্ছ জিনিসের জন্যে প্রাণের সব শান্তি-সুখ ব্যর্থ হয়ে যায়! জ্ঞানীদের সব লেখা আমি পড়ে ফেলেচি, ষড়দর্শন আমার কণ্ঠস্থ,—কিন্তু তবু, সামান্য একটি রাঙা গোলাপের অভাবে আজ কিনা আমি এমন লক্ষ্মীছাড়া!'
পাপিয়া বললে, 'হ্যাঁ, এতদিনে একজন আসল প্রেমিকের দেখা পেলুম! প্রেমিককে চিনতুম না, কিন্তু রাতের পর রাত গলা ভেঙে তারই জন্যে গান গেয়েচি, তারায় তারায় তার বার্তা পাঠিয়েচি, আজ তাকে আমারই সামনে মূর্তিমান দেখতে পেলুম! তার চুলগুলি কালো যেন কৃষ্ণকলি; তার ঠোঁট দুখানি তারই চাওয়া গোলাপের মতন রাঙা! কিন্তু দুঃখ তার কপালে নিজের হাতের ছাপ রেখে গেছে, কষ্ট তার মুখকে সন্ধ্যার আকাশের মতো বিষণ্ণ করে তুলেছে!'
যুবক ছাত্র নিজের মনে গুনগুন করে বললে, 'রাজবাড়িতে আজ উৎসবের বাঁশি বেজেচে—আমি যাকে ভালোবাসি, সে-ও আমন্ত্রণ পেয়েচে! সে বলেচে, আমি যদি তাকে একটি রাঙা গোলাপ উপহার দি, তাহলে সে আমার সঙ্গে নাচবে। আমি যদি তাকে একটি রাঙা গোলাপ উপহার দি, তবে তাকে আমার এই আলিঙ্গনের ভিতরে ধরতে পারব, তার মুখখানি বিরাম করবে আমার এই কাঁধের উপরে, তার হাত দুটি এলিয়ে থাকবে আমার এই মুঠির ভিতরে। কিন্তু আমার বাগানে তো রাঙা গোলাপ নেই!... দোসরহারা আমি নীরবে বসে থাকব, আর আমারই সুমুখ দিয়ে সে চলে যাবে—আমার পানে একটিবার ফিরেও না তাকিয়ে! হায়, অবহেলায় বুক যে আমার ভেঙে যাবে!'
পাপিয়া বললে, 'হুঁ, লোকটি প্রেমিক না হয়ে আর যায় না! যা নিয়ে আমি গান গাই, তার জন্যেই এ ব্যথা পাচ্চে; আমার সুখ ওর দুঃখ! সত্যি, কী অপূর্ব এই প্রেম! পান্নার চেয়ে অমূল্য, মণির চেয়ে দুর্লভ! মুক্তার মালার বদলে তাকে পাওয়া যায় না, হাটেবাজারে তা কিনতে মেলে না!'
যুবক বললে, 'বাদকরা বীণার তারে তারে রিঞ্জিনী তুলবে, আর তারই তালে তালে প্রিয়া আমার নাচ শুরু করবে! তার গতি এমন মেঘের মতন লঘু, যে নরম-নধর পা দুখানি মাটি ছোঁয় কি না-ছোঁয় তা বোঝা যাবে না। তার চারপাশে ভক্তের দল এসে ভিড় করে থাকবে! কিন্তু আমার সঙ্গে সে নাচবে না—কারণ আমার বাগানে রাঙা গোলাপ ফোটেনি!'— যুবক ঘাসের উপরে লুটিয়ে পড়ল এবং দুই হাতে মুখ ঢেকে কাঁদতে লাগল।
একটা গিরগিটি ল্যাজ তুলে ছুটে যেতে যেতে বললে, 'লোকটা কাঁদে কেন?'
রবির একটি ঝিলমিলে কিরণধারায় স্নান করতে করতে প্রজাপতি বললে, 'সত্যিই তো, কাঁদে কেন?'
সরোবরে কমলিনী এক সখীর কানে কানে ফিসফিস করে বললে, 'সত্যিই তো, কাঁদে কেন?'
পাপিয়া বললে, 'একটি রাঙা গোলাপের জন্যে ও বেচারি কাঁদচে।'
'একটি রাঙা গোলাপের জন্যে! ও হরি, এমন সৃষ্টিছাড়া কথাও তো শুনিনি কখনো!'— গিরগিটি তো হেসেই অস্থির!
কিন্তু যুবকের বুকের দরদ পাপিয়ার বুকে বাজল। সে নীরবে গাছের ডালে বসে রইল আর ভাবতে লাগল, প্রেমের কী রহস্য!...
আচম্বিতে দুই ডানা ছড়িয়ে সে একদিকে উড়ে গেল— এক টুকরো ছায়ার মতো উপবনের পুষ্পকুঞ্জ পেরিয়ে!
খানিকটা ঘাসে ঢাকা জমি। মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে এক সুন্দর গোলাপ গাছ।
তারই এক ছোটো শাখায় গিয়ে বসে পাপিয়া বললে, 'আমাকে একটি রাঙা গোলাপ দাও। আমার সব গানের সেরা যে গান, তা-ই তোমাকে শোনাব।'
গাছ মাথা নেড়ে বললে, 'আমার গোলাপ যে সাদা—সুমুদ্দুরের ফেনার মতো! হিমালয়ের তুষারও তত সাদা নয়। তবে ঝরনার পাশে আমার ভায়ের কাছে গেলে তোমার আশা হয়তো মিটতে পারে।'
পাপিয়া আবার উড়ে গেল—ঝরনার ধারে যে গোলাপ গাছ বাসা বেঁধেছে তার কাছে। বললে, 'আমাকে একটি রাঙা গোলাপ দাও। আমার সব গানের সেরা যে গান, তা-ই তোমাকে শোনাব।'
গাছ মাথা নেড়ে বললে, 'আমার গোলাপ যে হলদে—তৈলস্ফটিকের আসনে পাতালের যে মৎস্যনারী বসে থাকে, তারই চুলের মতো। পীত কুমুদও তত হলদে নয়। তবে যুবক ছাত্রের জানলার তলায় আমার ভায়ের কাছে গেলে তোমার আশা হয়তো মিটতে পারে।'
পাপিয়া আবার উড়ে গেল— যুবক ছাত্রের জানলার তলায় যে গোলাপ গাছ বাসা বেঁধেছে তার কাছে। বললে, 'আমাকে একটি রাঙা গোলাপ দাও। আমার সব গানের সেরা যে গান তা-ই তোমাকে শোনাব।'
গাছ মাথা নেড়ে বললে, 'আমার গোলাপ রাঙা—কপোতের পায়ের মতো। সুমুদ্দুরের ঢেউয়ে ঢেউয়ে যে প্রবাল দোলে সে-ও তত রাঙা নয়। কিন্তু শীতে আমার শিরা-উপশিরা হিম হয়ে গেছে, তুষার আমার কুঁড়ির ওপরে খিমচি কেটে গেছে, ঝড় আমার ডালপালা ভেঙে দিয়ে গেছে! এবার সারাবছরে আমার গোলাপ ফুটবে না।'
পাপিয়া কাতরস্বরে বলে উঠল, 'একটি—শুধু একটি গোলাপ আমার দরকার! কিছুতেই কি তা পাওয়া যায় না?'
গাছ বললে, 'হ্যাঁ, এক উপায় আছে। কিন্তু সে এমন ভয়ানক উপায় যে তোমাকে বলতেও আমার মুখ বোবা হয়ে যাচ্চে!'
পাপিয়া বললে, 'বলো, বলো,— তুমি সব খুলে বলো। আমি ভয় পাব না।'
গাছ বললে, 'যদি তুমি রাঙা গোলাপ চাও, তবে চাঁদের আলোয় গানের সুরে তোমাকে তা রচনা করতে হবে, আর বুকের রক্তে তাকে রাঙাতে হবে। নিজের বুকে একটি কাঁটা বিঁধিয়ে আমার ডালে বসে তোমাকে গান গাইতে হবে। সারারাত ধরে তুমি গান গাইবে, কাঁটা তোমার বুকের ভেতর গিয়ে ঢুকবে আর তোমার প্রাণের রক্ত আমার শিরায় শিরায় ঢুকে আমারই রক্ত হয়ে যাবে।'
পাপিয়া করুণ-সুরে বললে, 'মরণের বদলে একটি রাঙা গোলাপ,— দাম যে বড়ো চড়া! জীবন কার প্রিয় নয়? সোনার রথে সূর্য ওঠা, মুক্তার রথে চাঁদ ওঠা— সবুজ বনে বসে সেইদিকে অবাক হয়ে চেয়ে থাকা কী আনন্দের! পাহাড়ের উপরে-নীচে বিচিত্র যেসব রঙিন ফুল ফোটে, তাদের গন্ধ কী মধুর!... তবু, জীবনের চেয়ে প্রেমই শ্রেয়, আর মানুষের প্রাণের তুলনায় একটা পাখির প্রাণের মূল্যই বা কতটুকু?'
পাপিয়া দুই ডানা ছড়িয়ে আবার উড়ে এল—এক টুকরো ছায়ার মতো উপবনের পুষ্পকুঞ্জ পেরিয়ে।
যুবক তখনও ঘাসের উপরে শুয়ে ছিল, তার ডাগর চোখ দুটি থেকে অশ্রু তখনও শুকিয়ে যায়নি।
পাপিয়া বললে, 'খুশি হও, খুশি হও! তোমার রাঙা গোলাপ তুমি পাবে। চাঁদের আলোয় গানের সুরে আমি তা রচনা করব, নিজের বুকের রক্তে আমি তা রাঙিয়ে তুলব! তোমার কাছ থেকে আমি খালি একটি প্রতিদান চাই। তুমি যেন খাঁটি প্রণয়ী হও—কারণ সব জ্ঞান-বিজ্ঞান-দর্শনের চেয়ে প্রেমই হচ্ছে শ্রেয়। আগুনের রঙের মতো তার পক্ষ দুটি, তার দেহও আগুনের রঙের মতো রঙিন। তার ওষ্ঠাধর মধুর মতো মিষ্ট, আর তার নিশ্বাসে ধূপ-ধুনার সুগন্ধ!'
যুবক মুখ তুলে পাপিয়ার স্বর শুনলে, কিন্তু তার কথা বুঝতে পারলে না,— কারণ কেতাবে যা লেখা আছে তা ছাড়া আর কিছুই সে বুঝতে পারে না।
কিন্তু শাল গাছ তার বাণী বুঝতে পারলে। কারণ পাপিয়াকে সে বড়ো ভালোবাসত, আর তারই ডালে পাপিয়ার বাসা। সে চুপি চুপি বললে, 'আমাকে তোমার শেষ-গান শুনিয়ে যাও। তোমাকে বিদায় দিয়ে একলাটি আমার মন বড়ো খাঁ খাঁ করবে।'
পাপিয়া তাকে নিজের গান শোনাতে লাগল—তার সে সুরের ধারা যেন রুপোর ঝারি থেকে উছলে-পড়া গন্ধ-জলের মতন।
পাপিয়ার গান থামলে যুবক ছাত্র আস্তে আস্তে উঠে বসল এবং কাগজ-কলম নিয়ে ভাবতে লাগল: 'আমার প্রিয়ার গড়ন সুডৌল, এটা সকলকেই মানতে হবে। কিন্তু তার প্রাণে কি মমতা আছে?— বোধ হয়, না। আসলে, সে আর আর কলাবিদের মতো; তার ভঙ্গি আছে, কিন্তু সরলতা নেই। সে দিনরাত খালি গান আর গান নিয়েই মেতে আছে, আর কে না জানে কলামাত্রই স্বার্থপর? তবু এটা বলতেই হবে যে, বাস্তবিকই তার সুরবোধ আছে। কিন্তু বড়োই দুঃখের বিষয়, সে সুরের অর্থ পাওয়া যায় না, আর তা সংসারের কোনো কাজেই লাগে না!' যুবক তার ঘরে গিয়ে ঢুকল, তারপর বিছানায় শুয়ে শুয়ে নিজের প্রেমের কথা ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ল।
স্বর্গের ছায়ায় যখন চাঁদের মুখ জেগে উঠল, পাপিয়া তখন গোলাপ গাছের ডালে গিয়ে কাঁটার উপরে বুক দিয়ে বসল। কাঁটায় বুক চেপে সারারাত ধরে সে গান গেয়ে গেল, আকাশের চাঁদ পশ্চিমে ঢলে পড়ে কান পেতে সে গান শুনতে লাগল।... পাপিয়া যত গান গায়, রাত তত গভীর হয়ে ওঠে, কাঁটা তত বুকের ভিতরে গিয়ে বেঁধে, আর তার প্রাণের রক্ত ততই কমে আসতে থাকে!
পাপিয়া প্রথমে গাইলে, বালক-বালিকার হৃদয়ে প্রেমের জন্ম-কাহিনি। সঙ্গে সঙ্গে গাছের টঙের ডালে অপূর্ব এক গোলাপের কুঁড়ি ফুটে উঠল। সুরের ধারার পর সুরের ধারা আসে, আর সে কুঁড়িতে পাপড়ির পর পাপড়ি ফোটে। প্রথমে সে ফুল ছিল পাণ্ডু—নদীর জলের উপরে দোলায়মান কুয়াশার মতো। রুপোর আয়নায় যেমন গোলাপের ছায়া, সরোবরের জলে যেমন গোলাপের ছায়া।— গাছের টঙের ডালে ফোটা তেমনি সেই অপরূপ গোলাপাটি!
গাছ হেঁকে বললে, 'আরও জোরে, আরও জোরে বুক চেপে ধরো, নইলে গোলাপ ফোটা শেষ হবার আগেই দিন এসে পড়বে!'
পাপিয়া কাঁটার উপরে আরও জোরে বুক চেপে ধরলে, তার গানের সুর পরদায় পরদায় আরও চড়তে লাগল—তখন সে যুবক-যুবতির হৃদয়ে প্রেমের জন্ম-কাহিনি গাইছিল।
গোলাপের পাতার উপরে একটুখানি কোমল লাল আভা ফুটে উঠল—বরের প্রথম চুম্বনে নববধূর কপোলে রঙের আভাসের মতন। কিন্তু কাঁটা তখনও পাপিয়ার অন্তরের মাঝখানে গিয়ে পৌঁছোয়নি, তাই গোলাপের হৃদয়ও শুভ্র হয়ে রইল— কারণ পাপিয়ার বুকের রক্ত ভিন্ন গোলাপের বুক রাঙা হতে পারে না।
গাছ হেঁকে বললে, 'আরও জোরে, আরও জোরে বুক চেপে ধরো, নইলে গোলাপ ফোটা শেষ হবার আগে দিন এসে পড়বে!'
পাপিয়া কাঁটার উপরে আরও জোরে বুক চেপে ধরলে, কাঁটা তার হৃদয়কে স্পর্শ করলে এবং তীব্র এক যাতনা বিদ্যুতের মতো তার সর্বাঙ্গ ভেদ করে বয়ে গেল— তিক্ত—বড়ো তিক্ত সে যন্ত্রণা! তার গানের সুর তখন ক্রমেই উদ্ভ্রান্ত হয়ে উঠতে লাগল— কারণ পাপিয়া তখন সেই প্রেমের কাহিনি গাইছিল, মরণের দ্বারা যা পরিপূর্ণ এবং শ্মশানের চিতা যাকে গ্রাস করতে পারে না।
অপূর্ব সেই গোলাপ লাল হয়ে উঠল—পূর্বাকাশে নিত্য-বিকশিত জ্বলন্ত গোলাপের মতো।
পাপিয়ার স্বর কিন্তু ক্রমেই ঢিমিয়ে এল, তার ডান হাত কাঁপতে লাগল, তার চোখের উপরে একটা পরদা ঘনিয়ে উঠল। তার গান হল মৃদু হতে মৃদুতর এবং তার মনে হল, গলা যেন বন্ধ হয়ে আসছে।
পাপিয়া তখন প্রাণপণে সংগীতে শেষ সুরের মূর্ছনা দিলে। চাঁদ তা-ই শুনে উষার কথা ভুলে আকাশের উপরে স্থির হয়ে রইল। রাঙা গোলাপ তা শুনতে পেলে, তার সর্বাঙ্গে একটা পুলক-হিল্লোল বয়ে গেল এবং শীতকালে ভোরের বাতাসে তার পাপড়িগুলি ছড়িয়ে পড়ল, পাপিয়ার শেষ সুরের ঝংকার নিয়ে প্রতিধ্বনি চারিদিকে ছুটে গেল, এবং রাখালদের রাতের স্বপন থেকে জাগিয়ে তুললে। তটিনীর জল-বাঁশির রন্ধ্রে রন্ধ্রে সে সুর ব্যাপ্ত হয়ে গেল এবং সমুদ্রের কাছে আপনার বার্তা পাঠিয়ে দিলে।
গাছ চেঁচিয়ে বললে, 'দেখো, দেখো। এতক্ষণে গোলাপ ফোটা শেষ হয়েচে!'
কিন্তু পাপিয়া শুনতে পেলে না। সে তখন ঘাসের 'পরে মরে পড়ে আছে—তার বুকের উপরে বেঁধা সেই নিদারুণ কাঁটা!
দুপুরবেলায় যুবক ছাত্র জানলা খুলে দেখে সবিস্ময়ে বলে উঠল, 'কী সৌভাগ্য! এই যে একটি রাঙা গোলাপ ফুটেচে... মরি, মরি, এমন গোলাপ তো জীবনে কখনো দেখিনি! আহা, কী সুন্দর! উদ্ভিদবিজ্ঞানে নিশ্চয়ই এর একটা কোনো জমকালো নাম আছে!' সে ঝুঁকে পড়ে গোলাপটি চয়ন করলে।
তাড়াতাড়ি জামাকাপড় পরে গোলাপটি হাতে করে সে তার অধ্যাপকের বাড়ির দিকে ছুটল—অধ্যাপকের কন্যাই তার প্রিয়তমা।
অধ্যাপকের কন্যা দরজার কাছে বসে বসে লাটিমে রেশমের সুতো জড়াচ্ছে, তার পায়ের তলায় ঘুমিয়ে আছে একটি ছোটো কুকুর।
যুবক উল্লাসভরে বললে, 'একটি রাঙা গোলাপ পেলে তুমি আমার সঙ্গে নাচবে বলেছিলে। এই নাও দুনিয়ার সবচেয়ে রাঙা গোলাপ! এটিকে তোমার বুকের ওপরে আজ সন্ধ্যায় গুঁজে রেখো! মনে রেখো, আমি তোমাকে কত ভালোবাসি!'
ভুরু কুঁচকে যুবতি বললে, 'উঁহু, আমার পোশাকের সঙ্গে এ গোলাপ তো খাপ খাবে না। আর, এখন আমার গোলাপের দরকারও নেই, আমার এক ধনী বন্ধু আমাকে আসল জড়োয়া গয়না পাঠিয়ে দিয়েচে। দামি গয়নার কাছে আবার ফুল!'
যুবক ক্রুদ্ধস্বরে বললে, 'তুমি কি পাষাণী!'—কাছ দিয়ে একখানা ময়লা-ফেলা গাড়ি যাচ্ছিল, যুবক হাতে গোলাপটি সেইদিকে নিক্ষেপ করলে, গাড়ির চাকা গোলাপটিকে ছিন্নভিন্ন করে থেঁতলে চলে গেল।
যুবতি বললে, 'আমি পাষাণী! তোমার কথা এমন অভদ্র কেন?... আর সত্যি কথা বলতে গেলে, তোমাতে-আমাতে কীসের সম্পর্ক? তুমি তো সামান্য এক গরিব ছাত্র! আমাকে যে গয়না পাঠিয়েচে, তার কত টাকা, সে খবর কিছু রাখো?'— এই বলে যুবতি বাড়ির ভিতরে চলে গেল।
যুবক ধীরে ধীরে চলতে চলতে আপনমনে বললে, 'প্রেম কী বোকামির ব্যাপার! ন্যায়শাস্ত্রের মতন উপকারীও নয়, তার দ্বারা কোনো কিছু প্রমাণিতও হয় না, সে যা বলে তা কখনো ঘটে না, সে যা বিশ্বাস করে তা কখনো সত্য হয় না। আসলে প্রেমটা মোটেই বস্তুতন্ত্র নয়, এই বাস্তব যুগে প্রেম একেবারেই অচল। আর আমার প্রেমে কাজ নেই, তার চেয়ে ষড়দর্শন আর মনোবিজ্ঞানে মনোযোগ দিলে ঢের বেশি লাভ হবে।'
যুবক তখনই বাড়িতে ফিরে এল এবং একখানা ধুলাভরা মস্ত বড়ো কেতাব টেনে নিয়ে পড়তে বসল।
ভারতী, বৈশাখ ১৩২৯ (এপ্রিল ১৯২২)
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।