ফাঁড়ার খাঁড়া

হেমেন্দ্রকুমার রায়

শ্রীযুক্ত ভারতী-সম্পাদক-যুগলেষু,

বলতে পারেন, এতদিন ধরে নিরাপদে সম্পাদকি করচেন কেমন করে? দেখতে পাই, অনেক লেখকের বইকেই তো প্রথম শ্রেণির রাবিশ বলে আপনারা অকুতোভয়ে প্রকাশ্যভাবে ঘোষণা করেন। এও দেখেছি কখনো কখনো কোনো কোনো লেখককে ঈষৎ সান্ত্বনার সঙ্গে জানিয়ে দেন যে, তাঁর বইখানি একেবারে ছাইভস্ম না হলেও তার চেয়ে উঁচুদরের জিনিস নয়! কিন্তু এমনভাবে সমালোচনা করেও আপনারা অদ্যাবধি ডবল গলার উপরে ডবল মাথা বজায় রেখেছেন কোন উপায়ে আমি তো কিছুতেই সেটা আবিষ্কার করতে পারছি না। বাঙালি লেখকরা কি এতই নিরীহ যে, হাটের মাঝখানে দাবড়ি খেয়েও ঘুসি পাকাতে নারাজ?

কিন্তু মশাই, আমায় দেখছি সম্পাদকি করাটা পোষাল না! আমরা—দৈনিক কাগজের সম্পাদক আপনাদের মতন ভাগ্যবান নই। অসহায়, মশাই আমরা একেবারে প্রথম শ্রেণির অসহায়! আগে ভাবতুম, কোম্পানির বাগানের ও গড়ের মাঠের বড়ো বড়ো লোকের পার্শ্ববর্তীগুলির মতো অসহায় এ দুনিয়ায় আর কিছু নেই। বিশিষ্টরা অনায়াসে তাদের নাক-কান কেটে দিতে পারে, মুখে আলকাতরা মাখিয়ে বা মাথায় গোবর-সুবাসিত গোবর ঢেলে দিতে পারে—আর কাক-চিল-চড়ুইরা প্রতিদিন তাদের সর্বাঙ্গে যে কাজ করে যাচ্ছে, তা আর বলে কাজ নেই! কিন্তু এখন দেখছি আমরা হচ্ছি তাদের চেয়েও অসহায়! এত দুর্দশার মাঝেও তাদের সেবাযত্ন করবার জন্যে সরকারি লোক নিযুক্ত আছে, কিন্তু আমাদের মাথার উপরে কেউ নেই, এক ভগবান ছাড়া—তাও না-থাকার মধ্যেই, কারণ বিপদে পড়ে প্রাণপণে ডাকলেও কোনোদিন তাঁর দেখা বা সাড়া পাওয়া যায় না।

আমরা সনাতন সমাজের বিরুদ্ধে একটি টুঁ করলেই গ্রাহকরা কাগজ বয়কট করবে—সঙ্গে সঙ্গে বিজ্ঞাপনও কমবে। ট্রাম-কোম্পানি বা বাংলা থিয়েটারের স্পষ্ট সমালোচনা করলেই 'ফ্রি-পাসে' বঞ্চিত হব। নেতাদের সম্বন্ধে নিরপেক্ষ আলোচনা করেছি কী অমনি মানহানির মকদ্দমা রুজু হয়েছে! আর প্রজাপক্ষ ছেড়ে রাজপক্ষের দিকে চোখ চাইলেই হাতে লোহার বালা ও পায়ে বেড়ি পরতে হবে! তার উপরে, কাগজের স্বত্বাধিকারী মাহিনা দেবে না, তবু কী কুহকে ভুলে আমরা যে দৈনিকের সম্পাদকি করি, আমরা নিজেরাই তা জানি না!

আরে মশাই, খালি কি তা-ই? এর উপরে আবার উড়ো-আপদও আছে! দেখছেন তো, কলকাতায় আজকাল কীরকম গুন্ডার উপদ্রব? ভাবলুম যাক, বাঁচা গেল, রোজ তবু কলম ভরাবার একটা নিরাপদ বিষয় জুটল। বিপুল উৎসাহে রোজ গুন্ডাদের অত্যাচার আর পুলিশের নির্বিকার ভাব নিয়ে লিখে লিখে দোয়াতের পর দোয়াত খালি করে ফেললুম—তার ফলে শহরে রাহাজানি কিছুমাত্র কমল না বটে, কিন্তু আমার কাগজের বিক্রি রীতিমতো বেড়ে উঠল।

একদিন গুন্ডা-ডিপার্টমেন্টের এক কর্মচারী এসে আমার সঙ্গে দেখা করে বললেন, 'মশাই, আমাদের বিরুদ্ধে এত লেখালেখি করচেন কেন?'

আমি সম্পাদকি-চালে গম্ভীরভাবে বললুম, 'ভদ্রলোকেরা ধনেপ্রাণে মারা যাচ্ছেন, তবু আপনারা হাত গুটিয়ে বসে আছেন বলে।'

'আমরা কী করতে পারি, বলুন। প্রতি পাড়াতেই গুন্ডার দল রয়েচে, আমরা তাদের নামধাম সব জানি। কিন্তু জেনেও তাদের গ্রেপ্তার করতে পারি না—কারণ, পাড়ার লোকে তাদের বিরুদ্ধে ভয়ে সাক্ষ্য দিতে রাজি হয় না।'

আমি একটু ভেবে দেখলুম, কাগজের নাম জমাবার এই এক মস্ত সুযোগ! আমি যদি আমাদের রিপোর্টারকে পাড়ায় পাড়ায় পাঠিয়ে, গুন্ডাদের অত্যাচারের কথা তাদের নামসুদ্ধ কাগজে প্রকাশ করে দি, তবে আমার কাগজের নাম ও বিক্রি বাড়তে দেরি লাগবে না। বিলাতি কাগজওয়ালারা পুলিশকে নানারকমে সাহায্য করে থাকে, আমরাই বা করব না কেন? এতে সরকারপক্ষও আমার উপরে তুষ্ট হবেন।

পুলিশের কর্মচারীকে বললুম, 'আচ্ছা, এবার থেকে আমরাও আপনাদের সাহায্য করবার চেষ্টা করব।...'

দু-চার দিন পরেই আমাদের রিপোর্টার দুজন নামজাদা গুন্ডার নতুন দুটি অত্যাচারের কাহিনি সংগ্রহ করে আনলে। একজন বাঙালি, নাম হরেকৃষ্ণ সাহা; আর-একজন বেহারি, নাম রামকানাইয়া। যাদের উপরে অত্যাচার হয়েছে, যারা অত্যাচার করেছে, আর যারা স্বচক্ষে দেখেছে—সকলেরই নামধাম আমি কাগজে প্রকাশ করে দিলুম।

সেইদিনই সন্ধ্যার সময়ে, আমি আপিসের একটি ঘরে টেবিলের সামনে বসে হেঁটমুখে, একমনে গুন্ডা-দমনের নিশ্চিত সদুপায় সম্বন্ধে একটি প্রাঞ্জল ভাষার প্রবন্ধ রচনা করছি, হঠাৎ বিনা মেঘে বজ্রাঘাতের মতো টেবিলের উপরে দড়াম করে একটা বেজায় আওয়াজ হল!

চমকে মুখ তুলে দেখি, টেবিলের উপরে প্রায় আড়াই ইঞ্চি মোটা একগাছা লাঠি এসে পড়েছে,—এ লাঠি যদি আমার মাথায় লাগত, তাহলে এক মুহূর্তের মধ্যে এই সম্পাদকীয় মস্তকের চিহ্নটি নিশ্চয়ই নিঃশেষ বিলুপ্ত হয়ে যেত!

আরও একটু মুখ তুলে লাঠির মালিককেও আমার সামনেই দেখতে পেলুম। মাথায় অন্তত ছ-ফুট এক ইঞ্চি উঁচু, চওড়াতেও দেহখানি বপুবিশেষ, আর গায়ের রং যেন অমাবস্যার নির্যাসে প্রস্তুত! চোখ দুটো ড্যাবডেবে, নাকটা থ্যাবড়া, ঠোঁট পুরু-পুরু, চোয়ালের হাড় মস্ত চওড়া,—যাকে বলে পাকা 'ক্রিমিন্যালে'র একটি মূর্তিমান টাইপ!

বুকটা কেমন দুরদুর করে উঠল!... হঠাৎ আমার গায়ের ওপরে ফোঁস করে কে নিশ্বাস ফেললে—তাড়াতাড়ি টেবিলের তলার চেয়ে দেখি, একটি বিতিকিচ্ছি বুলডগ বাঁকা বাঁকা চারখানা ঠ্যাঙের উপরে দাঁড়িয়ে একমনে, অত্যন্ত সন্দেহের সঙ্গে আমার পা শুঁকছে! তাঁর সঙ্গে চোখাচোখি হবামাত্র সে গররররর করে এক চাপা হুংকারে আমাকে স্পষ্টাস্পষ্টি জানিয়ে দিলে, তার দিকে তাকালে আমার পক্ষে মোটেই ভালো হবে না। তবে সরে যেতেও পারলুম না—কী জানি যদি খ্যাঁক করে কামড়ে দেয়?

আড়ষ্ট ও অসহায়ের মতো চেয়ারের উপরে বসে, আমার সেই মানবজাতীয় অনাহূত অতিথির দিকে চেয়ে করুণস্বরে জিজ্ঞাসা করলুম, 'আপনি কে মশাই?'

ঠিক যেন হাঁড়ির ভিতর থেকে আওয়াজ বের হল—'আমার নাম শ্রীহরেকৃষ্ণ সাহা!'

হরেকৃষ্ণ সাহা? সেই বিখ্যাত গুন্ডা—যার কীর্তিকাহিনি আজই আমি কাগজে জাহির করে দিয়েছি? আমার দেহের রক্ত যেন বরফ হয়ে গেল—হরেকৃষ্ণর এখানে কী দরকার? নিশ্চয়ই সে নিজের কবিতা ছাপাবার জন্যে আমার খোশামোদ করেত আসেনি।... যেজন্যে আসুক, তাকে চিনেছি একেবারে সে ভাবই না দেখিয়ে যথাসম্ভব সহজ স্বরে আমি বললুম, 'আপনি কী চান?'

'এডিটরের সঙ্গে দেখা করতে চাই।'

'কী দরকার?'

সে লাঠিটা নিয়ে মাটির উপরে অধীরভাবে ঠুকে খাপ্পা হয়ে বললে, 'অত কথার জবাব দিতে আমি পারব না, এডিটর কোথায় বল! তুমিই কি এডিটর? তুমিই কি কাগজে আজ আমাকে বদনাম দিয়েচ?' বলতে বলতে সে আমার দিকে উগ্রমূর্তিতে কয়েক পা এগিয়ে এল।

প্রাণের ভয় বড়ো ভয়। আমি তাড়াতাড়ি মিথ্যা কথা বললুম, 'না, না,—আমি এখানকার এক কেরানি।'

'তবে যাও—ডেকে আনো তোমাদের এডিটরকে!

'আজ্ঞে, এখনই ডেকে আনচি, কিন্তু আপনার কুকুরটাকে আগে ধরুন!'

হরেকৃষ্ণ হেঁট হয়ে কুকুরের বগলস ধরে বললে, 'যাও, বেশি দেরি হয় না যেন?'

'আজ্ঞে না, আমি দু-মিনিটের ভিতরেই এডিটরকে আপনার কাছে পাঠিয়ে দিচ্চি!' বলতে বলতে আমি তাড়াতাড়ি ঘর থেকে বেরিয়ে পড়লুম।

উঃ, কী বাঁচাই বেঁচে গেছি। হরেকৃষ্ণ নিশ্চয় প্রতিশোধ নিতে এসেছে! আমি আর দাঁড়ালুম না—প্রতি লাফে দু-দুটো ধাপ পার হয়ে সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামতে লাগলুম।

হঠাৎ দেখি, সিঁড়ির নীচে থেকে লাঠি-হাতে আর-একটা লোক লাফাতে লাফাতে উপরে উঠছে—তারও চেহারা হরেকৃষ্ণর মতোই লম্বা-চওড়া। আমি দস্তুরমতো দমে গেলুম। পাছে আমি পালাই, হরেকৃষ্ণ কি তাই এখানে একে পাহারায় রেখে গেছে?

তার পাশ কাটিয়ে নেমে যাচ্ছিলুম, সে কিন্তু আমায় ছাড়লে না। আমার একখানা হাত সবলে চেপে ধরে ভাঙা-ভাঙা বাংলায় রুক্ষস্বরে সে যা বললে, তাতে বুঝলুম তার নাম রামকানাইয়া, সে এডিটরবাবুর সঙ্গে এখনই 'মুলাকাত' করতে চায়!

রামকানাইয়া! এও এক বিখ্যাত গুন্ডা, এরও কীর্তিকথা আজকেই প্রকাশ করে দিয়েছি। হরেকৃষ্ণ যেজন্য আমাকে খুঁজছে, এরও উদ্দেশ্য যে তা-ই, তখনই সেটা বুঝে নিলুম।

ধাঁ করে মাথায় একটা ফন্দি জুটল। তাড়াতাড়ি বললুম, 'সিঁড়ি দিয়ে উঠেই বাঁদিকের প্রথম ঘরে এডিটরবাবু বসে আছেন। কিন্তু সাবধানে ঘরে ঢুকো, বাবুর সঙ্গে আছে একটা খেকি বুলডগ!'—রামকানাইয়া বেগে উপরে উঠল, আমিও বেগে নীচে নেমে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ে হাপ ছেড়ে বাঁচলুম।

ঘণ্টা-দুই পরে সন্তর্পণে ফিরে এসে আপিসঘরে ঢুকে দেখলুম, টেবিলের কাগজপত্তর সব তছনছ হয়ে গেছে। মেঝের উপর চেয়ারগুলো উলটে পড়ে রয়েছে, এখানে-ওখানে রক্তের দাগ, ছেঁড়া জামাকাপড়ের টুকরো, একগাছা ভাঙা লাঠি ও একপাটি জুতো!... হরেকৃষ্ণ আর রামকানাইয়া সেখান থেকে অদৃশ্য হয়েছে! কিন্তু আশা করি, আপাতত ছ-মাস ঝোল-ভাত না খেয়ে তার কেউ আর এ-মুখো হবে না!

রামঃ! এই নাক মলচি, কান মলচি মশাই, আমার গুন্ডা-দমনের চেষ্টা এই পর্যন্ত! সম্পাদকীয় সূক্ষ্মবুদ্ধি মহিমাতেই ফাঁড়ার খাঁড়া এবারে তাগ ফসকে ঘাড়ের পাশ দিয়ে চলে গেল, নইলে কী হত বলুন দেখি?

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%