উন্মাদ

হেমেন্দ্রকুমার রায়

আমাকে উঠিতে দেখিয়া শচীশ বলিল, 'সে কী, এরই মধ্যে! এলে যখন, গারদটা দেখেই যাও একবার!'

আমি বললাম, 'সে কথা মন্দ নয়,— চলো।'

শচীশ আমার বাল্যবন্ধু। এখন পাগলাগারদের ডাক্তার। কার্যগতিকে এ অঞ্চলে আসিয়া পড়াতে, অনেকদিন পরে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ।

কত রকমের পাগলই যে দেখিলাম! কেহ 'শিবনেত্র' হইয়া 'বোম ভোলানাথ'-এর মতোই ধ্যানাসনে বসিয়া আছে, কেহ হাসিতেছে-কাঁদিতেছে, কেহ নাচিতেছে-গাহিতেছে, কেহ-বা চেঁচাইয়া আকাশ ফাটাইতেছে! একজন আমাকে গম্ভীরভাবে কাছে ডাকিয়া চুপি চুপি কানে কানে বলিল, 'আপনি যদি কাউকে কিছু না বলেন, তাহলে একটি ভালো খবর দিতে পারি।'

আমি বলিলাম, 'আচ্ছা, কাউকে বলব না— বলুন।'

পাগল বলিল, 'আপনি কি রাতারাতি নবাব হতে চান?'

'খুব চাই!'

'শুনুন তবে। দেখবেন— কাউকে বলবেন না কিন্তু! আমি যখের ধনের সন্ধান পেয়েছি। সাত ঘড়া মোহর— এক বাক্স হিরে-জহরত! কোথায় আমি আপনাকে বলে দেব।'

আমি বলিলাম, 'বলুন।'

সে বলিল, 'এ কি ফস করে বলে ফেলবার কথা! আসুন, আগে একটু বসুন— বিশ্রাম করুন— তারপর ধীরেসুস্থে একে একে সব বলচি!'

আমি হাসিয়া বলিলাম, 'আচ্ছা, পরে আর-একদিন এসে সব শোনা যাবে, আজ আর সময় নেই।'

আর-এক জায়গায় দেখিলাম, একজন লোক একখানা কাচ লইয়া জলে ডুবাইতেছে, শানে ঘষিতেছে আর মাঝে মাঝে কাচখানা এক চোখ বুজিয়া দেখিতেছে।

আমি তাকে অনেক ডাকিলাম, সে তাও একবার মুখও তুলিল না— আমার কথার উত্তরে একটি টুঁ-শব্দও করিল না। শচীশ বুঝাইয়া দিল, 'এঁর বিশ্বাস, ইনি এই বিজ্ঞান-রাজ্যে যুগান্তর উপস্থিত করিবেন। ওঁর ব্রত, ওই কাচখানাকে মেজে-ঘষে একেবারে খাঁটি হিরে করে ফেলা। যতদিন এ মহৎ ব্রত-উদযাপন না হয়, এঁর পণ ততদিন ইনি মৌনী থাকবেন।'

আর-একজন আমাকে ডাকিয়া ব্যথিতভাবে নালিশ জানাইল, 'মশাই, এরা আমার ওপরে কীরকম যাচ্ছেতাই জবরদস্তি করে, জানেন?'

আমি বলিলাম, 'কীরকম?'

সে তার মাথাটি ঘুরাইয়া-ফিরাইয়া দেখাইয়া বলিল, 'দেখুন, মশাই দেখুন! আমার মাথার চুল খাটো করে ছেঁটে ফেলা আমার মন মানে না। মাথায় বাবরি কাটা চুলই যদি না রইল, লোকে আমাকে তবে কবি বলে চিনবে কীসে, বলুন তো?'

আমি হাসি চাপিয়া বলিলাম, 'তা যা বলেছেন!'

পাগল খুশি হইয়া বলিল, 'আপনাকে রসিক বলে আমার সন্দেহ হচ্ছে। আরও শুনুন, আমি কাগজ-কলম চাইলে এরা তা কিছুতেই দেয় না, উলটে দাঁত বার করে হাসে। হায়, হায়, ও কাগজ-কলমই যদি না রইল কবি তবে কেমন করে কবিতা লিখবে— কেমন করে দুঃখিনী বঙ্গভাষার মুখোজ্জ্বল করবে? এরা ভাবে আমি বুঝি পাগল,—'

তার কথা শেষ হইতে-না হইতেই আমি সরিয়া পড়িলাম।

পাগল কবি আমাকে ডাক দিয়া বলিল, 'আ আমার কপাল! আপনিও ওই দলে? মশাই, যাবেন না— যাবেন না! পাগলের সঙ্গে ''জিনিয়াস''-এর কতটা যে সম্পর্ক, আগে সেটা প্রাঞ্জল ভাষায় ব্যাখ্যা করে প্রাণ জল করে দি আসুন।'

শচীশ বলিল, 'ইনি ভাবেন, কবিতা লিখলেই ডাল-ছেঁড়া পাকা আমের মতো নোবেল প্রাইজ এঁর হস্তগত হবে। এঁর মনে দৃঢ় ধারণা, পাছে ইনি নোবেল প্রাইজ পেয়ে যান, সেই হিংসায় রবি ঠাকুরই ষড়যন্ত্র করে এঁকে এখানে নির্বাসিত করে রেখেছেন!'

বাস্তবিক,— এ এক নতুন দুনিয়া, এখানে সমস্তই আজব ব্যাপার! সকলেই এখানে সুখী— কেননা, এদের বিশ্বে বাস্তব বলিয়া কোনো কিছু নাই। আপনাদের বাসনাকে এরা ভাঙিয়া-চুরিয়া যেমন ইচ্ছা তেমনি করিয়া গড়িতেছে— যুক্তি, কারণ ও সহজ জ্ঞানের কোনো ধার ধারে না বলিয়া 'অসম্ভব' কথাটি এদের অভিধান হইতে মুছিয়া গিয়াছে!

সামনেই একটি ঘর। প্রথমে ভাবিয়াছিলাম, ঘরে কেউ নাই; কিন্তু তার পরেই দেখিলাম, এককোণে আধা-অন্ধকারে আবছায়ার মতো একটি মূর্তি, একেবারে যেন দেয়ালের সঙ্গে মিশিয়া স্তব্ধভাবে বসিয়া আছে। বিশীর্ণ তার দেহ— বিষণ্ণ তার মুখ!

আমাদের পায়ের শব্দে চমকিয়া, সে মুখ তুলিয়া চাহিল। শচীশকে দেখিয়া, তার কোটরগত অর্ধনিমীলিত চক্ষু দুটি একটু উজ্জ্বল হইয়া উঠিল। আস্তে আস্তে বলিল, 'কে, ডাক্তার?'

সে স্বর কি মানুষের? এমন অনৈসর্গিক স্বর আমি জীবনে আর কখনো শুনি নাই!

শচীশ বলিল, 'এখন কেমন আছেন?'

একটু ম্লান হাসি হাসিয়া, সে উঠিয়া দাঁড়াইল। তারপর পা দুটো যেন কোনোমতে টানিয়া টানিয়া আমাদের কাছে আসিয়া, শচীশের দিকে অস্থিচর্মসার একখানা হাত বাড়াইয়া দিয়া বলিল, 'দেখুন।'

এতক্ষণে ভালো করিয়া লোকটার চেহারা দেখিয়া আমার গা শিহরিয়া উঠিল। হঠাৎ দেখিলে মনে হয়, যেন শ্মশানের মড়াকে তুলিয়া আনিয়া ভূতুড়ে বিদ্যায় কে তাহাকে জিয়ন্ত করিয়া চলাইতেছে, ফিরাইতেছে! ওঃ, আর তার সেই বুকের ও কণ্ঠার হাড়গুলা! সেগুলার উপরে যেন মাংসের লেশমাত্র নাই— প্রতি নিশ্বাসেই ভয় হয়, উপরকার পাতলা চামড়ার ঢাকনি ফুঁড়িয়া এই মুহূর্তেই তাহারা বুঝি বাহির হইয়া পড়িবে! আমি স্তম্ভিত নেত্রে তাহার দিকে চাহিয়া কাঠ হইয়া দাঁড়াইয়া রহিলাম।

শচীশ তাহার হাত ধরিয়া যতক্ষণ তার নাড়ি পরীক্ষা করিতে লাগিল, ততক্ষণ সে উদবেগে ও আগ্রহে বিস্ফারিত চক্ষে শচীশের মুখের দিকে চাহিয়া রহিল।

শচীশ বলিল, 'আপনার নাড়িতে এখনও জ্বর আছে।'

কিঞ্চিৎ নিশ্চিন্ত হইয়া সে বলিল, 'বুকটা দেখো তো ডাক্তার!'

শচীশ তাহার বুকটা খানিকক্ষণ পরীক্ষা করিয়া বলিল, 'আপনার যক্ষ্মারোগ হয়েছে।'

রোগী একটা আশ্বস্তির নিশ্বাস ফেলিয়া আপনমনে মৃদুস্বরে বলিল, 'আঃ বাঁচলুম!' তারপর সে আবার ঘরের কোণে গিয়া বসিয়া পড়িল।

বাহিরে আসিয়া শচীশকে জিজ্ঞাসা করিলাম, 'কী ভয়ানক! এ কে শচীশ?'

শচীশ বলিল, 'আশ্চর্য পাগল! বছরের আর ক-মাস এ লোকটি অনেকটা সহজ মানুষের মতো থাকে; কিন্তু যতই বছর ঘনিয়ে আসে, এর পাগলামিও তত ভীষণ হয়ে ওঠে। তখন ওর কাছে ঘেঁষে, কার সাধ্য!'

আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, 'যক্ষ্মারোগ হয়েছে শুনে লোকটা অমন খুশি হয়ে উঠল যে?'

শচীশ হাসিয়া বলিল, 'যক্ষ্মা-টক্ষা ও কিচ্ছু হয়নি। ও আমার মিছে কথা।'

'সে কী হে?'

'হ্যাঁ; আমি যদি বলতুম, ''আপনি ভালো আছেন''— তাহলে ও রসাতল কাণ্ড বাধিয়ে দিত। তারপর খাওয়াদাওয়া ছেড়ে হয়তো উপোস করেই মরে যেত। প্রথম যখন এখানে ডাক্তার হয়ে আসি, তখন ওর হালচাল জানা না-থাকাতে ভারী মুশকিলেই পড়া গিয়েছিল।'

আমি বিস্মিতস্বরে বলিলাম, 'এরকম পাগলের কথা কখনো শুনিনি।'

শচীশ বলিল, 'ভদ্র বংশে লোকটির জন্ম, বেশ ভালো লেখাপড়াও জানে। ওর জীবনে ভাগ্য অদ্ভুত। গেল বছরে ওর পাগলামি এতটা বেড়ে ওঠেনি, আমি তখন কৌতূহলী হয়ে একদিন ওর পরিচয় জিজ্ঞাসা করি। সেদিন সে কিছু বললে না বটে, কিন্তু দিনকতক পরে ওর হাতে লেখা মস্ত এক চিঠি পেলুম। তাতে ওর নিজের কথা খুলে লেখা ছিল।'

আমি আগ্রহের সহিত বলিলাম, 'সে চিঠি তুমি ছিঁড়ে ফেলোনি?'

'না, সে ছিঁড়ে ফেলবার চিঠি নয়। সত্যি-মিথ্যে জানি না, কিন্তু সেই কাগজখানায় যা লেখা আছে, তা অতি ভয়ানক ব্যাপার। হয়তো তাতে পাগলের সংলাপও কিছু কিছু আছে। কারণ আমার বিশ্বাস যে, চিঠিতে ও লোকটি যেসব ঘটনার কথা বলেছে, সে ঘটনাগুলি ঘটবার আগেই ওর মাথায় পাগলামির ছিট ঢুকেছিল। তুমি বোধহয় জানো, লোকে কেন প্রথম পাগল হয়, তখন কোনো একটা বিশেষ বিষয়ে তার অস্বাভাবিক ঝোঁক পড়ে। সে অবস্থায় প্রথম প্রথম সে কার্য নিবারণের জ্ঞান হারায় না। কিন্তু, তারপর সেই ঝোঁকটা ক্রমে যতই বেশি হয়ে উঠতে থাকে, উন্মাদ-রোগ ততই তার ঘাড়ে চেপে বসে। হয়তো এ লোকটিরও সেই দশা হয়েছিল, চিঠি পড়লে তুমিও তা বুঝতে পারবে। তুমি কি সেই চিঠি পড়তে চাও? বিশ্বাস করো-না-করো, সে পড়বার মতো চিঠি বটে!'

আমি বলিলাম, 'পড়ব বই কী!'

* * *

শচীশের বৈঠকখানায় পাগলের পত্র লইয়া ইজিচেয়ারে শুইয়া পড়িলাম। চিঠিতে যা লেখা ছিল, তা এই—

'ডাক্তার,

আমি যে পাগল, আমার এই পরিচয়ই কি যথেষ্ট নয়?— পাগলের কথায় কে বিশ্বাস করবে? তোমার গারদে কত লোক আছে, তাদের কেউ মনে করে ''আমি কবি'', কেউ মনে করে ''আমি দেবতা'',— কিন্তু তোমরা জানো, তারা শুধু পাগল,— খেয়ালের স্বপনে মশগুল হয়ে আছে। তোমরা সে সম্রাটদের হাত থেকে রাজদণ্ড কেড়ে নিয়েছ, কবিদের বাণীর কমলকানন থেকে নির্বাসিত করেছ, দেবতাদের ফুল-চাল-কলা থেকে বঞ্চিত করে রেখেছ। তাদের মুখের কথাকে তোমরা সম্রাটের হুকুম বা কাব্যের শ্লোক বা দেবতার অভিশাপ বলে ভ্রম কোরো না। তাদের কথা তোমরা তুড়ি মেরে স্রেফ উড়িয়ে দাও— আমার কথাতেই বা তোমাদের বিশ্বাস হবে কেন? তবু আমার কথা কেন যে তুমি জানতে চেয়েছ তা-ই ভেবে আমি আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছি।

কিন্তু, জানতে যখন চেয়েছ, আমি যতটা পারি সব খুলে লিখব। মনের কথা মনে চেপে রাখায় বড়ো কষ্ট। পাগলরা তা পারে না বলেই তারা এত দিলখোলা হয়। আমি এখনও পাগলের সব গুণে গুণী নই,— মনের কথা তাই মনেই চেপে রাখতে পারি। কিন্তু এ কথা চাপবার চাপ মনকে আমার জাঁতাকলের মতো পিষে ফেলছে— এতদিন তাই যা পারিনি, আজ তা করব। সব তোমাকে বলব। বিশ্বাস করো ভালোই,— না করো পাগলামি বলে উড়িয়ে দিয়ো। আমি শুধু বলে খালাস হতে চাই।

আর-এক কথা। আমি পাগলাগারদে আছি বটে, কিন্তু এখন ঠিক পাগল নই। তুমি তো জানো, বর্ষাকালটায় উন্মাদ-রোগ এসে আমার ঘাড়ে চেপে বসে। কিন্তু অন্য সময়ে আমি আর পাগলামির স্বপ্ন দেখি না। এ সময়টায় মনে হয়, আমি যেন সবে ঘুম থেকে জেগে উঠেছি; কেন মনে হয় জানি না,— কিন্তু, মনে হয়, সবে ঘুম ভাঙলে মানুষের দেহ যেমন একটা অলস জড়তায় আচ্ছন্ন হয়ে থাকে, আমিও তেমনি আচ্ছন্ন হয়ে থাকি। পাগলামি না থাকলেও আমি যে এই সময়টাতে একেবারে সহজ মানুষ হয়ে উঠতে পারি না, তার মূলে ওই জড়তা! এ সময়টায় আমি ভাবতে পারি, সে ভাবনায় একটা কার্যকারণের ধারা পাই— যে ধারা পাগলের চিন্তায় থাকে না। এইতেই বুঝি, এখন আমি পাগল নই।

ছেলেবেলাতেই বাপ-মা আমার মারা যান,— আমি মানুষ হয়েছি মামার বাড়িতে। শুনেছি বাবা মরবার আগেই পাগল হয়েছিলেন। আমার অতিবৃদ্ধ পিতামহও পাগল ছিলেন। কাজেই বোঝা যাচ্ছে, আমাদের বংশে পাগলামির চর্চা হচ্ছে পুরুষানুক্রমে। মামাদের দৌলতে আমি বি.এ. পাশ দিয়ে বিয়ে করি। তারপর নিজেদের গ্রামে ফিরে গিয়ে সংসার পাতি। বাবার লোহার সিন্দুকে যা ছিল, তা নিয়ে বড়োমানুষি করতে না পারলেও মোটা ভাত-কাপড়ের অকুলান হল না। বলে রাখা ভালো, মামারা ছাড়া আমার আর কোনো আত্মীয়স্বজন ছিলেন না।

ক-বছর কাটল বেশ।

নির্মলা অল্প বয়সেই পাকা গিন্নি হয়ে উঠেছিল; তার যত্নে আমার গৃহস্থালির সর্বদাই লক্ষ্মীশ্রী বিরাজ করত। আমার আর কোনো দুঃখ ছিল না— কেবল এক সন্তানের অভাবে নির্মলা মাঝে মাঝে মুখখানি ভার করে থাকত। তার স্ত্রী-র মনে কেমন করে একটা কুসংস্কার বদ্ধ হয়ে গিয়েছিল,— যে রমণী বন্ধ্যা, পরলোকে তার সদগতি নেই!

নির্মলা যে শুধু গুণে লক্ষ্মী ছিল, তা নয়; রূপেও সে ছিল সরস্বতীর মতো। যেমন মুখ, তেমনি রং, তেমনি গড়ন, আমার মতো গৃহস্থের সংসারে সে ছিল ভাঙা ঘরে চাঁদের আলো! তাকে নিয়ে আমিও কিছু বিব্রত হয়ে থাকতুম। কেন তা বলছি।

নির্মলার রূপের খ্যাতি সারা গাঁয়ে ছড়িয়ে গিয়েছিল। পাড়ার কতকগুলো বখাটে ছোঁড়াকে আমার বাড়ির আনাচকানাচে ঘুরে বেড়াতে দেখতুম। দু-চারখানা উড়োচিঠিও আমার বাড়ির মধ্যে এসে পড়েছিল অবশ্য, সেসব চিঠির কথা আমি জানতে পেতুম না,— নির্মলা নিজেই যদি সেগুলো এনে আমাকে না দেখাত।

ডাক্তার, স্পষ্ট কথা বলতে কী স্ত্রীলোককে আমি তেমন ভালো চোখে দেখতুম না। নারী ঘরের লক্ষ্মী হতে পারে,— কিন্তু লক্ষ্মীর মতোই সে চঞ্চলা, কখন যে কার উপর সদয় হবে, বিধাতাও বলতে পারেন না। শক্ত পুরুষের জিম্মায় না পড়লে রমণী কখনো ঠিক থাকতে পারে না— এই ছিল আমার ধারণা। যে বাগানে মালিও নেই বেড়াও নেই সে বাগানের ফুল যে আর পাঁচজনে লুঠে নেবে— এ তো জানা কথা। কামিনী-কাঞ্চনকে চোখে চোখে রাখতে হয়,— নইলে, দিন দিন দেখবে, হয়তো তোমার গলার মালা অন্যের গলায় দুলছে?

সুতরাং নির্মলাকে আমি পইপই করে মানা করে দিতুম, অন্দরের আড়াল থেকে সে যেন কোনোমতে বাইরে না বেরিয়ে পড়ে।

নির্মলা কথা বড়ো বেশি কইত না— উত্তরে একবার ''আচ্ছা'' বলেই অন্য কাজে চলে যেত।

ঘরের দিকে এবং পরের দিকে— দু-দিকেই আমার দৃষ্টি ছিল সমান সতর্ক। ''কোলে থাকিলেও নারী রেখো সাবধানে''— এটা বোধহয় কবি ঠেকে শিখেছিলেন, কেননা, এর চেয়ে খাঁটি কথা আর হতে পারে না।

একদিন ভিন গাঁ থেকে ফিরে আসছি; বাড়ির কাছে এসে দেখি, একটা ছোঁড়া বাইরে থেকে দরজার ফাঁক দিয়ে আমার বাড়ির ভিতরপানে কী দেখছে। কী যে দেখছে, তা বুঝতে আমার দেরি হল না। এখানে কথার চেয়ে গায়ের জোরের দাম বেশি। অতএব, আমি ছুটে গিয়ে তার গণ্ডে এমন এক প্রচণ্ড চড় কষিয়ে দিলাম যে, সামলাতে না পেরে দড়াম করে সে মাটির উপরে পড়ে গেল। একেবারে অজ্ঞান! সেই অজ্ঞানতা থেকে গ্রামের আর আর সকলেই পরম জ্ঞানলাভ করলে;— কেননা এরপর হতে আর কাউকে আমার বাড়ির ত্রিসীমানায় উঁকিঝুঁকি মারতে দেখিনি। আমিও জেনে রাখলুম, এ লোকগুলোর রূপের প্রতি তৃষ্ণা যত, কিল-চড়ের প্রতি বিতৃষ্ণাও তত। এদের ফুল তোলবার শখ আছে বিলক্ষণ— কিন্তু কাঁটা দেখলেই হাত গুটিয়ে পিছিয়ে দাঁড়ায়। দুনিয়ার কত সাধু যে শুধু এই কাঁটার ভয়েই দায়ে পড়ে সাধু,— তা ঠিক করে বলা দায়!

একদিন বিকালে বাড়ির সুমুখে পায়চারি করছি,— হঠাৎ দেখলুম এদিকপানে একজন লোক আসছে।

লোকটি বয়সে যুবা, দেখতেও সুশ্রী। চোখে সোনার চশমা, হাতে বাঁধানো ছড়ি— পরনের কাপড়চোপড় দেখলে বোঝা যায়, বাবুয়ানার দিকে লোকটির ঝোঁক আছে ষোলোআনা। ছেলেবেলায় পরের বাড়িতে পরের খেয়ে মানুষ হয়েছি, নিজে কখনো বাবুয়ানার বায়না ধরবার সুবিধা পাইনি। এইজন্যে কি না জানি না,— যারা বাবুয়ানা করত তারা ছিল আমার চোখের বিষ। কাজেই এই সভ্য-ভব্য নব্যবাবুটির প্রতি গোড়া থেকেই আমার মন চটে গেল।

লোকটা বরাবর আমার সুমুখে এসে দাঁড়াল। ছড়ি দিয়ে আমার বাড়িটা দেখিয়ে সে বললে, ''এ বাড়িখানা কার মশাই?''

আমি শুষ্কস্বরে বললুম, ''মশায়ের সে খোঁজে দরকার?''

লোকটি একটু অপ্রস্তুত হয়ে বললে, ''না, না,— এটা কি বিনয়বাবুর বাড়ি,— আমি তাঁকেই খুঁজচি।''

''মশায়ের আসা হচ্চে কোথা থেকে?''

''আমি সম্প্রতি এখানকার সরকারি হাসপাতালের ডাক্তার হয়ে এসেছি।''

লোকটি পদস্থ বটে! কাজেই একটু নরম হয়ে বললুম, ''আজ্ঞে, আমারই নাম বিনয়বাবু।''

আগন্তুক একবার আমার পা থেকে মাথা পর্যন্ত চোখ বুলিয়ে নিয়ে বললে, ''আপনিই নির্মলার স্বামী? নমস্কার বিনয়বাবু, নমস্কার!''

হুঁ! ''বিনয়বাবু'' বলতে এ ঠিক করে নিলে,— ''নির্মলার স্বামী''! অর্থাৎ পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে, নির্মলাকে এ চেনে এবং কান টানলে মাথা আসে বলে, ''বিনয়বাবু''কে এ খুঁজছে নির্মলারই খোঁজ পাবার জন্যে!

আগন্তুক বললে, ''তাহলে বিনয়বাবু, বাড়ির ভিতরে একবার দয়া করে বলে আসুন গে, যে ললিত এসেছে দেখা করতে।''

কে এ ললিত?— ভাবতে ভাবতে অন্দরে গেলুম। নির্মলা তখন বসে বসে একটা বেড়ালের গলায় ঘুঙুর পরাচ্ছিল।

আমি বললুম, ''হ্যাঁ গা, ললিত নামে কাউকে তুমি চেনো?''

নির্মলা একবার চমকে উঠল। সে চমকানি আমার চোখ এড়াল না।

বেড়ালটাকে ছেড়ে দিয়ে নির্মলা বললে, ''কেন গা?''

নির্মলার মুখ-চোখের উপর নজর রেখে আমি বললুম, ''ললিত বলে একটি লোক তোমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে। কে সে?''

নির্মলার মুখ প্রথমে কেমন একরকম হয়ে গেল। তারপরেই সে কিন্তু খুব খুশি হয়ে উঠল। বললে, ''ললিত এসেছে? যাও, যাও, ডেকে আনো এখানে!''

আমি অটলভাবে বললুম, ''যা জিজ্ঞেস করলুম তার জবাব কই? ললিত তোমার কে হয়?''

নির্মলা একটু থতমত খেয়ে বললে, ''ললিতের বাপের সঙ্গে আমার বাবার খুব বন্ধুত্ব ছিল। ললিত আমাকে ছেলেবেলা থেকেই জানে।''

আমি অনেকক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলুম। তারপর স্থিরস্বরে বললুম, ''ললিত ছেলেবেলা থেকে তোমাকে যখন জানে, তখন এটাও বোধহয় জানে যে তুমি এখন পরস্ত্রী। সে তোমার আত্মীয় নয়, তার সঙ্গে তোমার দেখা হওয়া অসম্ভব।''

নির্মলা কাঠের পুতুলের মতো ঘাড় হেঁট করে বসে রইল।

বাইরে গিয়ে ললিতকে বললুম, ''আমার স্ত্রী এখন পাড়ায় নেমন্তন্নে গেছে।''

ললিত একবার আড়চোখে আমার দিকে চাইলে; বললে, ''আচ্ছা, কাল আমি আবার আসব অখন।''

''ললিতবাবু, কাল সে তার বোনের বাড়ি যাবে; তার সঙ্গে আপনার দেখা হল না বলে আমি দুঃখিত।''

সে বললে, ''নির্মলার বোন? সে কীরকম? সে তো এখানে থাকে না!''

আমি থতমত খেয়ে বললুম, ''আপনার বোন নয়— দূর-সম্পর্ক!''

আমার দিকে ব্যঙ্গদৃষ্টি নিক্ষেপ করে আর কিছু না বলে ললিত ছড়ি ঘোরাতে ঘোরাতে চলে গেল। বেশ বুঝলুম, আমার কথার ভাব সে ধরেছে।

বাড়ির দিকে ফিরবামাত্র দেখলুম, ছাদের এককোণে লুকিয়ে নির্মলা দাঁড়িয়ে আছে। ওখানে কেন সে?— ললিতকে দেখছিল?

মনে মনে নিজের বুদ্ধিকে ধন্যবাদ দিলুম। ভাগ্যে পতঙ্গের সামনে আগুনকে আনিনি!

নির্মলার এক বোন ছিল, নাম কমলিনী। সে আজ এক বছর হল বিধবা।

হঠাৎ একদিন খবর এল, কমলিনী কুলত্যাগ করেছে।

খবরটা শুনে আমি কিছুমাত্র আশ্চর্য হলুম না। এ তো স্বাভাবিক!

আরও সাবধান হলুম। কমলিনী যে রক্তে জন্মেছে, নির্মলার দেহেও তো সেই রক্তই আছে!

অতএব...

অতএব বাগানের মালিকে সতর্ক হতে হবে।

নির্মলা মাঝে মাঝে পাড়ার মেয়েমহলে তাস খেলতে যেত। আমি বারণ করে দিলুম, আমার হুকুম ছাড়া সে যেন আর কোথাও না যায়। নির্মলা ''হাঁ-না'' কিছুই বললে না।

এমনি সময় হঠাৎ আমাকে ঘুসঘুসে জ্বরে ধরলে। গাঁয়ে একজন বাংলায় পাশ-করা ডাক্তার ছিল, মাস দু-এক তার চিকিৎসায় রইলুম। তার ওষুধে সুফলের চেয়ে কুফল হল বেশি। দিনে দিনে আমি ক্রমেই কাহিল হয়ে পড়তে লাগলুম। তারপর জ্বরের সঙ্গে দেখা দিলে— খুকখুকে কাশি।

সেদিন সন্ধ্যাবেলায় আমার পা টিপে দিতে দিতে নির্মলা মৃদুস্বরে বললে, ''হ্যাঁ গা, এ ডাক্তারকে দিয়ে অসুখ যখন কমল না, অন্য ডাক্তার ডাকো-না!''

আমি বললুম, ''গাঁয়ে আর ডাক্তার কই?''

নির্মলা থেমে থেমে বললে, ''আচ্ছা, ললিতকে ডাকলে হয় না? সে তো সরকারি হাসপাতালের ডাক্তার, হাতযশ না থাকলে সে অত কাজ পেত না।''

আমি তীব্র তিক্তস্বরে বলে উঠলুম, ''না!''

আমার কণ্ঠস্বরে নির্মলা বোধহয় আঘাত পেয়েছিল। কারণ পা টিপতে টিপতে তখনই সে একবার থেমে পড়ল। অনেকক্ষণ চুপ করে বসে থেকে তবে সে আবার পা-টেপা শুরু করলে।

ললিত ডাক্তারের কথা যে আমার মনে ছিল না, তা নয়। কিন্তু তার সুন্দর মুখকে আমি ভয় করি। নির্মলা যে তাকে চায়, সে কথা সেইদিনই বুঝেছি, যেদিন সে ছাদ থেকে লুকিয়ে তাকে দেখছিল! সুতরাং এটা আন্দাজ করা শক্ত নয়, যে আমার এই অসুখের অছিলায় নির্মলা ললিতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা করতে চায়!...

ডাক্তার, চিঠি পড়তে পড়তে আমার মনের ক্ষুদ্রতা দেখে নিশ্চয়ই তুমি বিরক্ত হয়ে উঠছ। নিশ্চয়ই ভাবছ যে, আমি কী নীচ— কী হীন স্বভাবের লোক! বাস্তবিক, আজ এই গারদে বসে, নিজের চরিত্র বিশ্লেষণ করে চিঠি লিখতে লিখতে আপন স্বভাবের জন্য আমি আপনিই লজ্জিত হয়ে উঠছি।... সন্দেহ রোগটা আমার ধাতের সঙ্গে কেমন মিশে গিয়েছিল। এ রোগ যদি আমার না থাকত, তবে আজ কি আমাকে কেউ এই সুন্দর পৃথিবী থেকে, এই বিচিত্র সংসার থেকে, সেই বিমল প্রেমের আলিঙ্গন থেকে, সেই স্বাধীন উদ্দাম জীবন থেকে বঞ্চিত রাখতে পারত? ডাক্তার,— ডাক্তার, আমি লম্পট নই, মাতাল নই, অন্য কোনো পাপে পাপী নই— কিন্তু এক সন্দিগ্ধ প্রকৃতির জন্যই আজ আমি সকলহারা কাঙাল, মানুষ হয়েও অমানুষ, জগতে থেকেও জীবন্মৃত!...

থাক— যা বলছিলুম—

ললিত ডাক্তারকে ডাকা হল না।

পরদিন আমার চিকিৎসা করতে এক কবিরাজ এলেন। কবিরাজ প্রাচীন বটে, কিন্তু অর্বাচীন কি প্রবীণ সেটা জানতুম না।

তবে, তিনি যে স্পষ্টবক্তা এবং রোগীর কাছেও শিশুর মতো সরল, তার পরিচয় পেলুম।

চোখ বুজে অনেকক্ষণ আমার নাড়ি পরীক্ষা করে তিনি শুধু গম্ভীরভাবে মাথা নেড়ে বললেন, ''হুঁ।''

এই ''হুঁ''র মানে কী? জিজ্ঞাসা করলুম, ''জ্বর কতদিনে সারাতে পারবেন?''

কবিরাজ মাথা তুলে ঢুলুঢুলু চোখে কড়িকাঠের দিকে তাকালেন,— অর্থাৎ, সারা- না-সারা— সমস্তই ভগবানের হাত।

একটু বিরক্ত হয়ে বললুম, ''কোবরেজ মশাই, শুধু ভগবানকে ডেকে যদি জ্বর সারাতে হয়, তবে আপনাকে ডেকে লাভ কী?''

কবিরাজ বললেন, ''আমরা নিমিত্তমাত্র। বাবা, তোমার অসুখ কিছু গুরুতর!''

''অসুখটা কী?''

''যক্ষ্মা!''

আমার বুকটা ছাঁৎ করে উঠল।

দরজার কাছে ধুপ করে একটা শব্দ হল। সেখানে ঘোমটা দিয়ে নির্মলা দাঁড়িয়ে ছিল— চেয়ে দেখি, মাটির উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে আছে!

যক্ষ্মা!

সারাদিন বিছানায় অস্থির হয়ে শুয়ে রইলুম,— মনে হতে লাগল অশরীরী মৃত্যু যেন এখনই এসে অধীর অপেক্ষায় দরজা আগলে বসে আছে। যক্ষ্মা! এই দুটি অক্ষরের সঙ্গে কী বিপুল যন্ত্রণা গাঁথা আছে,— কী আতঙ্কের ভয় মেশানো আছে! আজ আমি যেন এই পৃথিবীতে থেকেও পৃথিবীর নই— এরই মতো পৃথিবীর সঙ্গে আমার সকল সম্পর্ক ঘুচে গেল। ফাঁসির হুকুম পেলে কয়েদির মনে কি এমনিতরো ভাবের উদয় হয়?

এতদিন জ্বর হলেও আমি উঠে, বই নড়েচড়ে বেড়াতুম,— তাতে কোনো ভয় হত না। কিন্তু, ব্যাধির নাম শুনে পর্যন্ত আমি একেবারে কাবু হয়ে পড়েছি; দস্যুর মতো কে যেন আমার বুকের উপর বিশাল পাথর চাপিয়ে দিয়েছে,— উঠে বসি সাধ্য কী!

নির্মলা এসে আমার মুখে ওষুধ ঢেলে দিল। উদাস চোখে তার দিকে তাকিয়ে ছিলুম। আজ তার মুখ মলিন, কেশেবেশে কোনো শ্রী নেই। কিন্তু এই বিষণ্ণতা-মলিনতার মধ্যেই তার রূপের শিখা আরও বেশি জ্বলন্ত হয়ে উঠেছে।

আস্তে আস্তে বললুম, ''নির্মল, আমি আর বেশি দিন নই।''

অন্য কোনো স্ত্রীলোক হয়তো এখানে শরীর কাঁপিয়ে কেঁদে উঠত। কিন্তু নির্মলা শুধু বললে, ''ভয় কী, তোমার কিচ্ছু হয়নি।''

''কিচ্ছু হয়নি! এত সহজে তুমি আমার এ রোগটাকে উড়িয়ে দিতে চাও? আরও বেশি কিছু হলে তোমার ও সিঁথের সিঁদুর কোথায় থাকবে নির্মল?''

নির্মলা হঠাৎ পিছন ফিরে দাঁড়াল— তারপর জানলাটা বন্ধ করে দিলে। আমি ভাবলুম সে পিছন ফিরেছে মুখের ভাব লুকোবার জন্যে— জানলা বন্ধ করে দেওয়া মাত্র।

আমি স্তব্ধ হয়ে রইলুম। নির্মলার বিড়ালটা বিছানার উপরে লাফিয়ে উঠল, তারপর আরামে ঘুমোবার মতলবে আমার বুকে চড়ে বসল। নির্মলা ছুটে এসে হঠাৎ তার বিড়ালকে এমন এক চড় মারলে যে, আয়েশের আশা ছেড়ে সে একলাফে আমার বুক থেকে নেমে ল্যাজ তুলে সরে পড়ল। ব্যাপারটা তোমাদের চোখে সামান্য ঠেকবে কিন্তু আমার কাছে এ তুচ্ছ নয়। কারণ, 'পুসি'কে এর আগে নির্মলার হাতে কখনো মার খেতে দেখিনি!

নির্মলাকে এইমাত্র কড়া কথা বলেছি বলে মনে একটা ঘা লাগল। গাঢ়স্বরে ডাকলুম, ''নির্মল!''

সে আমার কাছে এসে দাঁড়াল।

''বেড়ালটাকে তাড়িয়ে দিলে কেন?''

''কোত্থেকে এসে নোংরা পায়ে বিছানায় উঠেছিল, তাই।''

''কেন, আগেও তো সে গঙ্গাজলে পা না ধুয়েই বিছানায় উঠত, তখন তো ওকে মারতেও না, তাড়াতেও না।''

নির্মলা চুপ করে রইল।

''সত্যি করে বলো দেখি, পাছে আমার কষ্ট হয় বলেই তুমি ওকে মেরেছ কি না?''

সে কথা কইলে না।

''নির্মল—''

''বলো।''

''আমার কষ্টে তুমি কষ্ট পাও?''

নির্মলা একবার আমার চোখে তার চোখ রেখেই নামিয়ে নিলে।

''নির্মল, শোনো।''

''কী?''

''কাছে এসো, আরও কাছে।''

''বলো।''

''আমাকে তুমি ভালোবাসো?''

নির্মলার মুখে হঠাৎ একটি তরল হাসি খেলে গেল; তারপরেই,— বোধহয় আমার অসুখের কথা ভেবেই— তার সে হাসি থেমে গেল। বললে, ''তোমার আজ হয়েছে কী, এত আবোল-তাবোল বকছ কেন?''

''নির্মল, তুমি কি আমার কথার উত্তর দেবে না? আমাকে ভালোবাসো? বলো, বলো!''

নির্মলা খানিকক্ষণ অবাক-আশ্চর্য হয়ে আমার মুখের পানে তাকিয়ে রইল। তারপর আস্তে আস্তে মুখ নামিয়ে, আমার ঠোঁটের উপরে তার দুখানি তপ্ত ঠোঁট রেখে, দু-হাতে আমার গলা জড়িয়ে ধরলে।

স্বামী হতে গেলে স্বভাবটা কিছু কর্কশ, কিছু গম্ভীর হওয়া চাই— এই ছিল আমার ধারণা। কিন্তু কেন জানি না, সেদিন আমার মুখ থেকে গাম্ভীর্যের মুখোশ কী করে হঠাৎ খসে পড়েছিল। তার পরের দিন সকালে নিজের ছেলেমানুষির কথা ভেবে নিজেই যে লজ্জা পেয়েছিলুম— আজও তা ভুলিনি। সামান্য কারণেই কেন যে প্রাণ চঞ্চল হয়, মুখ দিয়ে কেন যে শিশুর হালকা কথা বেরিয়ে পড়ে, এ এক মহারহস্য!

কিন্তু তবু আজ আমার মনে হচ্ছে, সে সময় সত্যই যদি ছেলেমানুষ থাকতে পারতুম, আজ তাহলে আমাকে এই দুঃখের কাহিনি লিখতে হত না!

পরদিন ভিন্ন গ্রাম থেকে এক পাশ-করা ডাক্তার আনালুম। কারণ ''শতমারি''র বিষবড়ি খেয়ে মরার চেয়ে পাশ-করা ডাক্তারের হাতে মরা ঢের ভালো।

ডাক্তারের মুখে এই একটু ভরসা পেলুম যে, আমার রোগ এখনও সাংঘাতিক হয়ে ওঠেনি। হয়তো সেটা মিথ্যা প্রবোধ!

চিকিৎসা চলতে লাগল। ঘরে ওষুধের শিশি খুবই বাড়ল, কিন্তু রোগ একই রকম। এমনি সময় আর-এক ঘটনা ঘটল।...

সেদিন ভরসন্ধ্যায় বাদল নামল আষাঢ়ের প্রথম জলধারা। আমি বিছানার উপর বালিশে পিঠ রেখে বসে জানলাটা একটুখানি ফাঁক করে রাখলাম। গুমোট-করা ঘরের মধ্যে মিহি ঝুরুঝুরু জলের ছাট এসে গায়ে লাগল। আঃ, সে কী মিষ্টি! গাছের গাঁয়ের পথে, খানায়-ডোবায় বৃষ্টিধারা যেন শিশুর মতো খেলায় মেতে রঙ্গ কচ্ছিল,— আর আমি আনমনে বর্ষার ''জলতরঙ্গে'' বাদলের সেই সুর শুনছিলুম।

হঠাৎ নীচের পথে চোখ পড়ল; আবছায়ায় স্পষ্ট বোঝা গেল না। মনে হল, কে একটা লোক যেন মাথায় ঘোমটা দিয়ে আমার বাড়ির ভিতর এসে পড়ল।

প্রথমে ভাবলুম, ডাক্তার। কিন্তু— ডাক্তারের এখন আসবার সময়, কলকাতায় এই বৃষ্টি! আচ্ছা, ডাক্তার এখানেই আসবেন, দেখা যাক।

একে একে পাঁচটি মিনিট কেটে গেল না, ডাক্তার নয়; তবে, কে ও? আমার চোখের ভ্রম? না, তা-ই-বা কী করে হয়।

আস্তে আস্তে বিছানা থেকে উঠে দরজাটা ফাঁক করে দেখলুম, ঘরে নির্মলা নেই। এ সময় তার তো এখানে থাকবার কথা,— কোথায় গেল সে?

নিজের অসুখের কথা ভুলে ধীরে পা টিপে টিপে ঘর থেকে বেরিয়ে, দুটি ঘর পেরিয়ে এলুম,— নির্মলা নেই।

দেখলুম, বৈঠকখানা থেকে আলোর রেখা বাইরে এসে পড়েছে। চোরের মতন দরজার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম।

সূক্ষ্ম তিরের মতো একটা অচেনা আওয়াজ আমার কানে এসে লাগল। ''না বুঝে তখন বদ সঙ্গে মিশেছিলুম, বাবা তাই তোমার সঙ্গে আমার বিয়ে দিতে চাইলেন না। নির্মল, এখন আর মদ খাই না বটে, কিন্তু...''

তাকে থামিয়ে দিয়ে আমার স্ত্রী বললে, ''ললিত, ও কথা আর তুলো না। ছেলেবেলায় আমরা দুই ভাই-বোনের মতো একসঙ্গে ছিলাম, তেমনি করে আর থাকতে পারব, তুমি আমার ভাই, আমি তোমার বোন।''

নির্মলার স্বর কী অস্বাভাবিক!

এই সেই ডাক্তার ললিত, যে এক পরস্ত্রী-র সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ায় আমি সন্দেহ করে তাড়িয়ে দিয়েছিলাম। আমাকে লুকিয়ে তারই সঙ্গে সে কী কথা হচ্ছে!

দরজার দিকটা একবার দেখে নির্মলা বলল, ''ললিত, শোনো, আমার বেশি সময় নেই, টের পেলে আর রক্ষে রাখবেন না। এখানে আসবার জন্যে কেন বলেছি, তা তো জানো না?''

বললে, ''না।''

''আমার স্বামীর বড়ো অসুখ।''

''কী অসুখ?''

নির্মলা অল্প কথায় আমার রোগের বর্ণনা করলে।

ললিত বললে, ''আমাকে কী করতে বলো?''

''ললিত, তুমি ডাক্তার। রোগের যে লক্ষণ বললুম, তা শুনে তোমার কী মনে হয়? এখানকার পাড়াগেঁয়ে ডাক্তার-কোবরেজ সব হাতুড়ে। তাদের বিশ্বাস নেই।''

''মুখে শুনে কি রোগ ধরা চলে নির্মল?— রোগী দেখতে হবে।''

''সে হবে না।''

''কেন?''

একটু ইতস্তত করে নির্মলা বললে, ''না, সে আমি বলতে পারব না।''

ললিত খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে ক্ষুব্ধস্বরে বললে, ''থাক, আর বলতে হবে না, বুঝেছি। কিন্তু রোগী না দেখে এত বড়ো রোগ ধরা অসম্ভব।''

নির্মলা কাতরস্বরে বললে, ''ললিত, ললিত, তবে আমার কী হবে?''

ললিত বললে, ''একটা কথা বলি শোনো। তোমার স্বামীর যদি সত্যই যক্ষ্মা হয়ে থাকে, তবে তুমি বাপের বাড়ি যাও।''

''এ কী কথা ললিত!''

''হ্যাঁ। অবশ্য, যাবার আগে রোগীর সেবার জন্যে একজন ভালো লোক ঠিক করে যেতে হবে।''

''সে কি হয়?''

''হতেই হবে। এসব রোগীর কাছে স্ত্রী থাকলে রোগীরই অনিষ্ট!''

নির্মলা কিছুক্ষণ ভেবে বললে, ''ওঁকে যদি জানতে, ললিত! আমাকে উনি এখান থেকে এক-পা নড়তে দেবেন না।— অনেকক্ষণ হয়ে গেল, আর নয়। আজ আসি।''

আমি পা টিপে টিপে আবার উপরে উঠলুম। তখনও বৃষ্টি পড়ছিল— জলে আমার কাপড়চোপড় অল্প অল্প ভিজে গেল।

নির্মলা ঘরে এসে আমাকে জিজ্ঞাসা করলে, ''কেমন আছ?''

কোনো জবাব না দিয়ে পাশ ফিরে শুলুম। রাগে আমার সর্বাঙ্গ কাঁপছিল।

নির্মলা খানিকক্ষণ অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল,— বোধহয় ভাবছিল, আমি জবাব দিলুম না কেন!

হঠাৎ কী দেখে সে আমার পায়ে আর কাপড়চোপড়ে হাত দিলে। বেশ বুঝলুম, সে চমকে উঠল।

আমি মুখ ফিরিয়ে তার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলুম।

নির্মলা আমার দৃষ্টিতে যেন আহত হয়ে দু-পা পিছনে হটে গেল। তারপর উদবিগ্ন স্বরে বললে, ''তুমি— তুমি কি বাইরে গিয়েছিলে?''

যতটা পারা যায় গলাটা ভারী করে বললুম, ''হুঁ। তুমি মরো। আমিও তাহলে নিশ্চিন্ত হয়ে মরতে পারি।''

মড়ার মতো সাদা মুখে, ঘাড় হেঁট করে নির্মলা ঘর থেকে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে গেল, আমার দিকে আর চাইতেও পারলে না।

সে কি বুঝতে পেরেছে, আমার চোখে ধুলো দেওয়া কত শক্ত?

বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভাবতে লাগলুম।

আমি তো মরবই! যে রোগে যা, কথায় বলে, তা ''শিবের অসাধ্য' এই সংসারের খাতা থেকে আমার নাম কাটা গেল বলে।

আমি ম'লে নির্মলার কী হবে? ও কোথা থাকবে— কার কাছে? তার কেউ নেই, মা নেই,— এক ভাই আছে, সে গরিব আবার মাতাল। নির্মলার এই বয়স, এই রূপ,— সংসারের বিষম পাকচক্রে পড়ে সে কি আর আপনাকে সামলাতে পারবে?

তারপর,— ওই ললিত! নির্মলার সঙ্গে তার বিয়ের সম্বন্ধ হয়েছিল— সে এখনও নির্মলাকে ভুলতে পারেনি নিশ্চয়। ছোটোবেলা থেকে তারা দুজনে দুজনকে জানে। তাদের মধ্যে এখনও একটা ভালোবাসার টান থাকা খুবই স্বাভাবিক। নির্মলা এখনও তাকে দেখতে চায়— এর প্রমাণ হাতে হাতে পেয়েছি।

মাঝখান থেকে তাদের মেলামেশায় বাধা দিচ্ছি আমি। নির্মলা মনে মনে সত্যই আমাকে ভালোবাসে— না, স্ত্রী-র কর্তব্যের জন্যে যেটুকু করবার তা কি করে না? এটা ঠিক জানি না; কিন্তু সে যে আমায় ভয় করে, এ কথা বেশ বোঝা যায়।

ললিত এখনই পরামর্শ দিচ্ছে, আমায় একলা ফেলে নির্মলা চলে যাক। নির্মলা তার কথা শুনত— যদি না আমাকে ভয় পেত। আমি বেঁচে থাকতেই এই!

কমলিনী নির্মলার বোন— এক রক্তে দুজনের জন্ম। যতদিন সধবা ছিল, ততদিন কমলিনীর নামে তো কিছুই শুনিনি। বিধবা হয়ে কমলিনী বাপের বাড়ি গেল, তারপর বছর ঘুরতেই শুনলুম, সে কুলত্যাগ করে ছেড়ে অকূলে ভেসেছে!

কমলিনীর জীবনে যা ঘটেছে, নির্মলার জীবনেও তা ঘটবে না কেন?— বিশেষত, নির্মলার সামনে আর-এক প্রলোভন আছে; ললিত তার বাল্যবন্ধু, ললিতকে এখনও সে দেখতে চায়, ললিতের সঙ্গে তার বিয়ের কথাও হয়েছিল, ললিত এখনও বিয়ে করেনি। ওই সুপুরুষ ললিতকে আমি ভয় করি।

সেরাত্রে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে কেবল নির্মলা আর ললিতকে স্বপ্নে দেখতে লাগলুম। বার বার ঘুম ভেঙে যেতে লাগল। শেষবারে দেখলুম,— এই ঘরে, এই বিছানায় বিধবার বেশে বসে আছে নির্মলা, আর তার পায়ের তলায় ললিত! দরজার কাছে আমি অসহায়ের মতো, ম্লান-কাতর চোখে ওদের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। আমি তাদের দেখতে পাচ্ছি— তারা আমায় দেখতে পাচ্ছে না। কারণ, আমি তখন ভূত; দাঁড়িয়ে আছে,— সে আমার প্রেতাত্মা!

এক চমকে ঘুম ছুটে গেল। ঘর্মাক্ত দেহে, বিছানা থেকে লাফিয়ে মেঝেতে গিয়ে পড়লুম। জানলার কাছে ছুটে গেলুম। তখনও বৃষ্টি পড়ছিল।

চিৎকার করে বলে উঠলুম, ''এ হবে না, এ হবে না! নির্মলা আমার— আমি তাকে ভালোবাসি— মরে গিয়েও ভালোবাসব! মরবার আগে আমি তোমাকে সঙ্গে নিয়ে যাব নির্মল— নিয়ে যাব, নিয়ে যাব!''

অন্ধকারে হঠাৎ কে আমাকে দু-হাতে প্রাণপণে জড়িয়ে ধরলে। আমি বিহ্বলের মতো বললুম, ''কে তুমি?''

''ওগো, আমি— আমি—''

''অ্যাঁ নির্মল! শোনো, আমি তোমাকে নিয়ে যাব— ছাড়ব না!''

''কী বলছ গো—ও কী বলছ! তোমার কী হয়েছে?''

তখন আমার চমক ভাঙল। মাথাটা ঘুরে উঠল— পা টলতে লাগল। কোনোরকমে নির্মলার গা ধরে বেঁহুশের মতো মাটির উপরে ধুপ করে বসে পড়লুম।

ডাক্তার, ডাক্তার, সেইরাত্রে আমার মাথার ভিতরে যেরকম ভাব এসেছিল, এখনও ফি-বছরের যে সময়টায় আমি পাগল হয়ে যাই, আমার মাথায় ঠিক তেমনিধারা ভাব আসে!

সেরাত্রি থেকেই যে আমাকে এই উন্মাদ-রোগ আক্রমণ করেনি তা কে বলতে পারে?—

তুমি বলতে পারো, ডাক্তার?

ওঃ, সে স্বপ্নটা কি বাস্তব! লিখতে লিখতে এখনও আমার চোখের উপর সেই দৃশ্য আগুনের রেখায় জেগে উঠছে আর আমার সর্বাঙ্গ কাঁপছে। মনে হচ্ছে, আমি বুঝি আবার এখনই পাগল হয়ে যাব! মা গো, এ কী যন্ত্রণা—কী যন্ত্রণা!

দু-চার দিন পরেই বুকে ব্যথা হয়ে নির্মলা ভয়ানক জ্বরে পড়ল। বাড়িতে আমরা দুটি প্রাণী,— দুজনেই শয্যাশায়ী; কে যে কাকে দেখে তার ঠিক নেই। এ কদিন নির্মলা নিজে থেকে আমার সঙ্গে একটাও কথা বলেনি। যখনই তাকে দেখেছি, তখনই মনে হয়েছে সে যেন কী দুর্ভাবনা ভাবছে। আমি ডাকলে বিমর্ষ মুখে আমার কাছে এসে দাঁড়াত, কোনো কথা জিজ্ঞাসা করলে সে অত্যন্ত নীরস একটা সংক্ষিপ্ত উত্তর দিত, যেন নিতান্ত দায়ে পড়েই।

তার এমনধারা ভাবভঙ্গি দেখে, আমার গা যেন জ্বলে যেত। আমি কি তার চক্ষুশূল? কেন, এমন কী দোষে দোষী আমি?— ক্রমেই আমার রাগ বেড়ে উঠছিল, তার এই নির্লিপ্ত অবহেলার ভাব আমার রুগণ মাথাটাকে যেন বিগড়ে দিচ্ছিল!

কী ভাবছে সে? কেন ভাবছে? কার জন্যে এ ভাবনা? মনে মনে এমনি নানান প্রশ্ন জাগতে লাগল। সে কি আমাকে ঘৃণা করে? সে কি ললিতের কথা ভাবছে? আমাকে ছেড়ে পালাতে চায়? ললিতকে মনে পড়লেই, সেই গুপ্ত সাক্ষাৎ, সেই ভীষণ স্বপ্নদৃশ্য স্মরণ হয়— আর আমার মাথা যেন আগুনের মতো গরম হয়ে ওঠে— আমি যেন পাগল হয়ে যাই।

এমন সময় নির্মলা অসুখে পড়ল। আমাকে যে ডাক্তার দেখছিলেন, তিনি তাকে দেখতে লাগলেন। প্রথম দু-তিন দিন অসুখ ক্রমেই বেড়ে উঠতে লাগল, ডাক্তার পর্যন্ত ভয় পেয়ে গেলেন। কিন্তু আমার একটুও ভয় বা ভাবনা হল না।...

ডাক্তার! তুমি কি বিশ্বাস করবে যে, নির্মলার তখন মৃত্যু হলে, আমি খুশি হতুম! হ্যাঁ, সত্যি কথা। আমি মরবই,— তবে সে কেন বাঁচবে? আমাকে স্বার্থপর ভাবছ? না, আমি তা নই। নির্মলাকে আমি ভালোবাসি,— প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসি। সে ভালোবাসার তল নেই, সীমা নেই, অন্ত নেই। কিন্তু বলেছি সুন্দরী নারীর চঞ্চল মনকে আমি বিশ্বাস করি না। তার উপর নির্মলার বোন কমলিনী আমার চোখ খুলে দিয়েছে। আমি যদি মরি,— তবে তার নবীন, নধর, পুষ্পিত যৌবন নিয়ে, কুচক্রীর বিষাক্ত নিশ্বাসে নির্মলা কি নির্মল থাকতে পারবে? পারবে না— পারবে না! আর-একটা কথা শোনো, ডাক্তার।

নির্মলা একদিন জ্বরের ঘোরে ভুল বকছিল। আমি মাঝে মাঝে রোগশয্যা থেকে উঠে নির্মলাকে দেখে আসতুম। কিন্তু সেদিন গিয়ে কী শুনলুম জানো? শুনলুম, নির্মলা সকাতরে বলছে, ''ললিত, সেদিনের কথা ভুলে যাও— তুমি বিয়ে করো। তাহলেই আমি সুখী হব—'' তারপর সে চুপি চুপি বিড়বিড় করে আরও কী সব বলতে লাগল, আমি শুনতে পেলুম না। কিন্তু যা শুনেছি তা-ই শুনেই ঘরের ভিতর হতে আমার পা উঠল না; আচ্ছন্নের মতো আপন ঘরে এসে বিছানার উপর আছড়ে পড়লুম।

ডাক্তার, রোগের ঘোরেও সে ললিতকে ভোলেনি! তাই কামনা করছিলুম, নির্মলা মরুক— আমি মরবার আগে নির্মলা মরুক! রোগে যদি তার মৃত্যু হত,— তাহলে আজ জীবন শূন্য হয়ে গেলেও হয়তো আমি পাগল হয়ে যেতুম না।...

আজ দু-দিন নির্মলা কতকটা সামলে উঠেছে; কিন্তু ভয় যায়নি।

সেদিন বিকালবেলায় তার ঘরে গেলুম। ঢুকেই দেখি, নির্মলা শুয়ে শুয়ে একখানা চিঠি পড়ছে। চিঠি পড়তে পড়তে সে এমনি তন্ময় হয়ে উঠেছিল যে, আমার পায়ের শব্দ মোটেই তার কানে ঢুকল না।

যখন একেবারে তার বিছানার কাছে গিয়ে দাঁড়ালুম, তখন সে মুখ তুলে আমাকে দেখেই চমকে উঠল। তারপর, চিঠিখানা তাড়াতাড়ি কাপড়ের মধ্যে লুকিয়ে ফেললে।

দেখলুম, তার চোখের কানায় কানায় জল টলমল করছে। চিঠি পড়তে পড়তে সে কাঁদছে!— কেন?

কুতূহলী হয়ে জিজ্ঞাসা করলুম, ''কার চিঠি নির্মল?''

নির্মলার মুখ পাঙাশপানা হয়ে গেল। সে জবাব দিলে না।

আবার জিজ্ঞাসা করলুম, ''কার চিঠি?''

নির্মলা নিরুত্তর।

বিরক্তস্বরে আমি বললুম, ''বলবে না তাহলে?''

নির্মলা মুখ বুজে পাশ ফিরে শুয়ে রইল।

আর সইতে পারলুম না। রাগে কাঁপতে কাঁপতে চড়া গলায় বললুম, ''নির্মলা, তুমি ঠাউরেচ কী, আমি কি তোমার গোলাম? তুমি লুকিয়ে পরের সঙ্গে দেখা করবে— জ্বরের ঘোরেও পরপুরুষের নাম করবে— আড়ালে পরের চিঠি পড়বে, আমার বাড়িতে বসে আমারই কথা মানবে না-শুনবে না,— আমার অসুখে কি তোমার ফুর্তি বেড়েছে? আমি না মরতে এই, ম'লে কী করবে? তার চেয়ে তুমিও মরো, আমিও মরে জুড়োই!''

নির্মলা পাথরের মূর্তির মতো স্তব্ধ হয়ে শয্যায় পড়ে রইল।

''এখনও বলো বলছি, কার চিঠি?''

নারীর এ কী স্পর্ধা— তার এ নীরবতা অসহ্য!— আমার শিরায় শিরায় তপ্ত রক্ত ছুটতে লাগল। সামনে একটা জলের কুঁজো ছিল, নিষ্ফল আক্রোশে সেটা তুলে নিয়ে দুম করে মেঝেতে আছড়ে ফেললুম, সেটা সশব্দে ভেঙে একেবারে গুঁড়ো হয়ে গেল; ক-টুকরো ছিটকে নির্মলার গায়ের উপরেও গিয়ে পড়ল— তবু সে পাথরের মতো নিসাড়-নিথর হয়ে রইল,— কিছুতেই ভ্রূক্ষেপ করল না।

কোনোমতেই না পেরে উঠে ব্যঙ্গের হাসি হেসে শেষটা আমি তীক্ষ্নস্বরে বলে উঠলাম, ''বোঝা গেছে, এ সেই লম্পট ললিতের চিঠি। তোমার বোন বিধবা হয়ে কুলত্যাগ করেছে, তোমার বোধহয় অত দেরিও সইচে না; স্বামী বেঁচে থাকতেই তুমি কুলে কালি দিতে চাও! কুলটার বংশে তোমার জন্ম— তুমিও—''

ছিলা-ছেঁড়া ধনুকের মতো চকিতে সোজা হয়ে নির্মলা দাঁড়িয়ে উঠল— তার মাথার রুক্ষ এলোমেলো চুলগুলো ক্রুদ্ধ সাপের মতো চারিদিকে ঠিকরে ঠিকরে পড়ল— তার দুই চোখ স্থির বিদ্যুতের মতো আমার চোখের উপর জ্বলতে লাগল— তার মাথা থেকে পা পর্যন্ত থরথর করে কাঁপতে লাগল! কী যেন সে বলতে চায়— কিন্তু রাগের আবেগে তার কথা কণ্ঠের মধ্যে অবরুদ্ধ হয়ে গেছে!

অনেক কষ্টে শেষটা সে একনিশ্বাসে দৃপ্তস্বরে বলে উঠল, ''কী! কুলটার বংশে আমার জন্ম— আমি কুলটা!''

নির্মলাকে বরাবর নেতিয়ে-পড়া লজ্জাবতী লতার মতো সংকোচে জড়সড় দেখে আসছি,— আজ তার এ কী মূর্তি— এ কী ভাব!— এ যে কখনো কল্পনাতেও ভাবতে পারিনি। মুহূর্তে এমন পরিবর্তন কি সম্ভব!

আমি আর দ্বিতীয় বাক্যব্যয় না করে সে ঘর ছেড়ে চলে এলুম।

নিজের ঘরে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বসে পড়লুম। মাথার ভিতরে তখন সমস্ত ওলটপালট হয়ে গিয়েছিল। খানিকক্ষণ হতভম্বের মতো চুপচাপ বসে রইলুম।

তারপর সব ঘটনা মনে মনে একবার ভেবে নিলুম। নির্মলার সুমুখ থেকে অমন করে পালিয়ে এলুম কেন? আমি কি কাপুরুষ! নির্মলা দোষী হয়েও অনায়াসে আমাকে চোখ রাঙালে— আর, আমি পালিয়ে এসে তার স্পর্ধা বাড়িয়ে দিলুম! ছিঃ, ধিক আমাকে! পুরুষ হয়ে নারীকে— নিজের স্ত্রী-কে ভয়! গলায় দড়ি আমার।

আপনাকে আপনি বার বার ধিক্কার দিতে লাগলুম। কিন্তু তাতেও মন উঠল না। আমি যে ভয় পাইনি, আমি যে স্ত্রৈণ নই, আমি যে ইচ্ছে করলেই নির্মলাকে পায়ের নীচে থেঁতলাতে পারি,— এটা তাকে বুঝিয়ে দেবার জন্যে, এ ঘর থেকেই আমি হো হো করে তাচ্ছল্যের উচ্চহাসি হেসে উঠলুম। ও ঘর থেকে নির্মলা কি আমার হাসি শুনতে পায়নি? পেয়েছিল বই কী।

সেই চিঠির কথা মনে পড়ল। কার চিঠি? নিশ্চয়ই ললিতের। নইলে সে চিঠিখানা অমন করে লুকোত না। পাপী না হলে চিঠি দেখাতে তার অত ভয় কীসের? আমার সুকথা-কুকথা কিছুই সে গ্রাহ্য করলে না, চিঠিতে নিশ্চয়ই কোনো দূষ্য কথা আছে।

হ্যাঁ— চিঠি পড়তে পড়তে সে কাঁদছিল। আমার কড়াক্কড়িতে তার মনের ইচ্ছে পূরণ হচ্ছে না— সেইজন্যেই তার এ কান্না আর কী! কান্না তো দুর্বলেরই বল!— আর চিঠিখানা যে তার কত মনের মতো হয়েছিল তাও বেশ বুঝতে পাচ্ছি। আমার পায়ের শব্দও তার তন্ময়তা ভাঙতে পারেনি!

ললিত, ললিত, নির্মলা তোমাকেই ভাবছিল! তোমাকে যদি এখন হাতের কাছে পাই, তবে নির্মলার সামনে তোমাকে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে গিয়ে, এই দুই হাতে তোমার গলা টিপে ধরে, আস্তে আস্তে— ক্রমে ক্রমে— চেপে চেপে নিশ্বাস বার করে তোমাকে আমি মেরে ফেলি। তোমাকে চোখের সামনে মরতে দেখে নির্মলা কেঁদে উঠবে, আর তার কান্নার উত্তরে আমিও আকাশ ফাটিয়ে হেসে উঠব, হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ!...

হঠাৎ আমার হুঁশ হল— এ কী! বিছানার একটা বালিশ দু-হাতে চেপে ধরে সত্যি সত্যিই আমি যে বিকটস্বরে হাসছি! অ্যাঃ,— আমি কি পাগল হলুম— এ আমি করছি কী?

গা-ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়ালুম। বাতাসের সঙ্গে যুঝে কোনোই লাভ নেই। একটা কিছু করা চাই!

মরবার আগে আমাকে একটা কিনারা করতে হবেই হবে। সেদিনের স্বপ্ন আমি এখনও ভুলিনি। কিছু না করে আমি যদি আজ মরি, তবে কাল সেই স্বপ্নই সত্য হবে।

কিন্তু, কী করব— কী করতে পারি?...

একমনে ভাবতে লাগলুম— তেমন ভাবনা আর কখনো ভাবিনি।

ঝি এসে খবর দিলে, ডাক্তারবাবুর লোক এসেছে। তাকে উপরে আনতে বললুম। যে এল সে ডাক্তারের কম্পাউন্ডার।

কম্পাউন্ডার নির্মলার জন্যে দুটো ওষুধ এনেছিল। সে বললে, একটা খাবার, আর-একটা বুকে মালিশ করবার।

শিশি দুটো দেখলুম। মালিশের ওষুধের শিশিতে একখানা কাগজে বড়ো বড়ো ইংরেজি হরফে লেখা রয়েছে— ''বিষ।''

শিশিটা একমনে দেখতে দেখতে কম্পাউন্ডারকে জিজ্ঞাসা করলুম, ''এ খেলে কি মানুষ মরে?''

''মরে বই কী!''

খানিক ভেবে আবার জিজ্ঞাসা করলুম, ''যদি সমস্তটা খায়?''

''বারো ঘণ্টার মধ্যে মরে যেতে পারে।''

''আচ্ছা, যাও।''

সেই রাত্রি— কালরাত্রি! ওঃ, কে যেন ধারালো ছুরি দিয়ে ছেঁদা করে সেরাত্রির সমস্ত অন্ধকার আমার বুকের মধ্যে পুরে দিয়েছে। সে রাত্রি কি ভুলব— ভুলতে কি পারি?

ডাক্তার, সেরকম রাতও কখনো দেখিনি,— তেমন ঘুটঘুটে অন্ধকারও আর কখনো দেখিনি! খালি কি অন্ধকার? যেমন ঝুপঝুপ বৃষ্টি— তেমনি হু হু-হু হু ঝড়। মড়মড় করে বড়ো বড়ো গাছের ডালগুলো ভেঙে পড়ছে,— সেই সঙ্গে ক্রমাগত গুড়গুড় করে বাজ ডাকছে আর ডাকছে! সেরাতে পৃথিবীকে মনে হচ্ছিল, যেন শুধু শব্দের পৃথিবী!

এক-পা এক-পা করে নির্মলার ঘরের দিকে গেলুম। ঘরে ঢুকবামাত্র লক্ষ করলুম— নির্মলা চুপ করে উপরপানে চেয়ে শুয়ে ছিল, আমাকে দেখেই চোখ মুছলে। আমার উপর তার এত ঘৃণা! মনে একটু যে ইতস্তত ভাব ছিল, নির্মলার রকম দেখে তাও ঘুচে গেল।

খাটের পাশে গিয়ে ইচ্ছে করেই নীরস, কর্কশস্বরে বললুম, ''কেমন আছ?''

সে আমার দিকে পিছন ফিরে শুল। আমিও তখন তার ভালোমানুষি চাইছিলুম না— সে রাগ করে, তা-ই আমার ইচ্ছা!

আমি তেমনি স্বরে বললুম, ''আমার এই অসুখ শরীর, কখন আছি কখন নেই, এই দুর্যোগে বিছানা ছেড়ে উঠে, আমি এলুম তোমার কাছে— আর, তোমার কিনা এই ব্যবহার! যে রক্তে কমলিনী জন্মেছে, সেই রক্তেই তো তোমার জন্ম! স্বামীকে তুমি ভক্তি করবে কেন! আমি তো ললিত নই!''

এই কথাগুলো বলব বলে আমি আগে থাকতে অনেকক্ষণ ধরে মুখস্থ করে রেখেছিলুম।

নির্মলা বিছানায় উপুড় হয়ে পড়ে, দু-হাতে প্রাণপণে মাথার বালিশটা চেপে ধরলে,— যেন সে অনেক— অনেক কষ্টে আপনাকে সামলে নিচ্ছে!

আমি আবার বললুম, ''তুমি অসতী! তোমার মৃত্যুই ভালো!''

নির্মলা শিউরে উঠল।

''শোনো, যা বলতে এসেছি। মাথার উপরে যে শিশিটা রইল, ওটা বিষ। খেলেই লোক মরে যায়। ওটা বিষ— ভয়ানক বিষ, বুঝলে?''

কে এক পণ্ডিত বলেছিলেন, সঙ্গিন মুহূর্তে কারো মাথায় কোনো কুসংকেত ঢুকিয়ে দিলে সেটা সাংঘাতিক হয়ে ওঠে। সে কথা আমি ভুলিনি। আমি জানি, এইজন্যেই পৃথিবীতে অনেক মারাত্মক ঘটনা ঘটে গেছে! এই মুহূর্তে নির্মলার আচ্ছন্ন দুর্বল মস্তিষ্কের যে অবস্থা,— এখন কেমন করে কী ইঙ্গিত দিলে আমার কার্যোদ্ধার হবে,— আগে থাকতে তার প্রত্যেক কথাটি তন্ন তন্ন করে আমি ভেবে রেখেছিলুম।...

ঠক করে নির্মলার শিয়রে ওষুধের শিশিটা রেখে দিলুম। দেখলুম, শিশি রাখার শব্দে নির্মলা চমকে উঠল।

আস্তে আস্তে দরজা পর্যন্ত এসে, ফিরে দাঁড়ালুম। তারপর, প্রত্যেক কথাটিতে সমান জোর দিয়ে দিয়ে কর্কশস্বরে আবার বললুম, ''তুমি ম'লে আমি বাঁচি। কিন্তু শোনো, ওটা খাবার ওষুধ নয়, মারাত্মক বিষ। খেয়ো না যেন— ভয়ানক বিষ— খেলেই মরবে!''

নির্মলার ঘর থেকে বেরুতেই,— কেন জানি না, আমার প্রাণে কেমন একটা আতঙ্ক হল। ছুটতে ছুটতে নিজের ঘরে এসে ঢুকে পড়লুম। তাড়াতাড়ি দড়াম করে দরজাটা এঁটে বন্ধ করে দিলুম।

ঘরের এককোণে জবুথবু হয়ে বসে বসে কাঁপছি আর কাঁপছি। এত কাঁপছি কেন রে বাপু— শীত নেই, গা কাঁপে কেন? ভয়ে? ইঃ, ভয়টা কীসের— আমি কি কাপুরুষ? যার মরবার ভয় নেই, যে মরবে নিশ্চয়, যে মরতে প্রস্তুত, তার আবার কীসের ভয়— কাকে ডরায় সে? কিন্তু গা কেন তবু কাঁপে, বুকের কাছটা থেকে থেকে কেন দুদ্দুড় করে ওঠে?

ও কে— কে ও!— ওই যে নড়ছে, আমার পাশে পাশে— নীরবে, নীরবে!— একলাফে দাঁড়িয়ে উঠলুম— সে-ও যে দাঁড়িয়ে উঠল! হাঃ হাঃ, আরে দুৎ! এ যে আমারই ছায়া!

দাও পিদিমটা নিবিয়ে,— ছায়া আর পড়বে না!

উঃ, কী অন্ধকার— কী অন্ধকার! এত অন্ধকারও পৃথিবীতে ছিল? এ কি পৃথিবীর অন্ধকার,— না, নরকের? অন্ধকার যেন ঘুরছে-ফিরছে, এগিয়ে আসছে, পিছিয়ে যাচ্ছে, জমাট হচ্ছে, তাল পাকাচ্ছে! ওই যে শোঁ শোঁ করে ঘরের মধ্যে কী এসে ঢুকে পড়ল, ও কি ঝড়ের হাঁক, না অন্ধকারের দীর্ঘনিশ্বাস?

চুপ— চুপ! ওই শোনো, অন্ধকারে কে যেন যন্ত্রণায় কাতরে কাতরে কেঁদে উঠছে না? ওই যে— ওই যে! মাটিতে কান পেতে শোনো— ও কান্না ঠিক তোমার বুকে এসে লাগছে না কি? কে যেন বলছে না কি ''ওগো বুক গেল গো— ওগো বুক— উহু-হু-হু?''— হ্যাঁ, বলছে তো— বলছে তো! কই, না—কেউ তো কাঁদছে না— হ্যাঁ, কাঁদছে বই কী,— না, না, কাঁদছে না— ও তোমার ভ্রম!

না— দেখে আসি, সত্যি হোক মিথ্যে হোক— একবার দেখে আসি। এমন করে জড়ের মতো এই অন্ধকারে হাত-পা গুটিয়ে কি বসে থাকা যায়?

এলোমেলো কতরকম ভাবনাই যে মাথার মধ্যে এল-গেল— কে তার ঠিক রাখে?

আস্তে আস্তে একবার উঠে দরজার কাছে এগিয়ে গেলুম। দরজায় হাত দিতে-না দিতে সমস্ত ঘরখানা বিদ্যুতের তীব্র আলোয় দপ করে একবার জ্বলে উঠল। তারপর— বজ্রের সে কী ভয়ানক শব্দ! সে শব্দে বাড়িখানার ভিত পর্যন্ত যেন টলমল করে নড়ে উঠল— সঙ্গে সঙ্গে ঝড়ের একটা প্রচণ্ড ঝাপটা দুমদুম করে জানলা দুটো বন্ধ করে দিলে! কেমন একটা ভয়ে আমার বুকের রক্ত হিম হয়ে গেল— আমার পিছনে পিছনে, আমার সামনে সামনে, আমার আশপাশে— যেদিকে চাই সেইদিকে, যেদিকে যাই সেইদিকে— আকাশে-বাতাসে, ঝড়ে-বৃষ্টিতে, বিদ্যুতের আলোয় অন্ধকারের ভিতরে— কী একটা ভয়ংকর আতঙ্ক যেন শূন্য মূর্তিতে ফুটে উঠছে, ওত পেতে, প্রকাণ্ড হাঁ করে আমাকে গোগ্রাসে গিলে ফেলতে চেষ্টা করছে;— খানিক দেয়াল হাতড়ে হাতড়ে টলতে টলতে পিছিয়ে এসে আমি বিছানার উপর এগিয়ে ধপাস করে পড়ে গেলুম।

সত্যি সত্যি মনে হল, পাশের ঘরে কে যেন কাঁদছে, কে যেন যন্ত্রণায় ছটফট করছে! সে কী কান্না— সে কী ছটফটানি! থেকে থেকে আমি আঁতকে আঁতকে উঠতে লাগলুম! নিজের দেহকে যতটা পারি গুটিয়ে নিয়ে বিছানার চাদরখানায় সর্বাঙ্গ মুড়ি দিয়ে কুণ্ডলী পাকিয়ে বালিশে মুখ গুঁজড়ে পড়ে রইলুম, দু-হাতে প্রাণপণে দু-কান চেপে ধরলুম, তবু সে কান্না থামল না— থামল না। আমি বিকৃতস্বরে চিৎকার করে উঠলুম, ''নির্মল, নির্মল! কেঁদো না— আর কেঁদো না— সত্যি বলছি, তোমাকে ভালোবাসি— তোমাকে ভালোবাসি— তোমাকে ছেড়ে আমি থাকতে পারব না— আমি তো মরবই— আজ না হয় দু-দিন পরে,— তাই তোমাকে— তাই তোমাকে—''

নাঃ! তবু তো কান্না থামে না— এ কী সর্বনেশে কান্না গো!

আর সহ্য করতে পারলুম না— ধড়মড় করে উঠে ছুটে গিয়ে জানলা খুলে দিলুম। বাইরে মুখ বাড়াতেই ঝড়ের অট্টহাস্যে সেকান্নার শব্দ কোথায় মিলিয়ে গেল— ঝরঝর বৃষ্টির স্নিগ্ধ-শীতল জলধারায় আমার উত্তপ্ত শিরে যেন কার শান্ত আশীর্বাদ এসে পড়ল।

সেইভাবে চোখ মুছে দাঁড়িয়ে রইলুম— কতক্ষণ, কে জানে! যখন চোখ চাইলুম, তখন প্রাতঃসন্ধ্যার কোমল ছায়ালোকে নিদ্রোত্থিত পৃথিবী পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

কালকের রাতের ঘটনা স্বপ্ন বলে মনে হতে লাগল। কিন্তু, সে স্বপ্ন কী কঠোর সত্য!

আমার দেহ রুগণ বটে, কিন্তু মনের উত্তেজনায় রোগের কোনো লক্ষণ বুঝতে পাচ্ছিলুম না। এককথাই একশোবার মনে হচ্ছিল, নির্মলা কি আমার ইঙ্গিত বুঝতে পেরেছে? সে কি সেই শিশির ওষুধ...

দু-তিনবার ঘর থেকে বেরুতে গেলুম,— কিন্তু পা উঠল না। কে জানে গিয়ে কী দেখব?... তা-ই যদি সত্যি সত্যিই ঘটে থাকে, তবে সে দৃশ্য প্রাণ ধরে দেখতে পারব কি? সেই চিকন রেশমি চুল,— ঘাড়ের উপর কপালের উপর যা এঁকেবেঁকে কুঁকড়ে থাকত, সেই দুটি বড়ো বড়ো টানা টানা চোখ,— আমার চুম্বনে যারা আবেশে কাঁপতে কাঁপতে পদ্মকোরকের মতো মুদে থাকত, সেই দুটি কপোল— আমার স্পর্শে যাতে ধীরে ধীরে গোলাপের রং ফুটে উঠত,— সেই রূপের কুসুম যদি স্বর্গচ্যুত পারিজাতের মতো পরিম্লান হয়ে গিয়ে থাকে— আমি কি তবে তা দেখতে পারব— পাষাণে বুক বেঁধে, শুষ্কনেত্রে, স্থিরভাবে?

কিন্তু, দেখতেই হবে— দেখতেই হবে। আমার এ লক্ষ্মীশূন্য সংসারে আমাকে আর বেশি দিন জ্বালা পোহাতে হবে না। আমি আর কতদিন? তবে— ভয় কী?

ঝি-বামুন তখনও আসেনি, কোথাও জনপ্রাণীর সাড়াশব্দ নেই। আমার বাড়িখানা যেন প্রেতপুরীর মতো ভয়ংকর নিস্তব্ধ হয়ে আছে! সাহসে ভর করেই নির্মলার ঘরে গিয়ে ঢুকলুম।

প্রথমেই চোখ পড়ল খাটের উপরকার তাকের দিকে। মালিশের শিশিটা সেখানে নেই!

খুব জোরে দরজায় ঠেস দিয়ে দাঁড়ালুম— নইলে মাথা ঘুরে পড়ে যেতুম। বুকের ভিতরটা দুপদুপ করছিল— সে দুপদুপানি বন্ধ করতে দু-হাতে বুকের কাছটা চেপে ধরলুম— কিন্তু সে আওয়াজ থামল না।

বিছানার চাদরে মাথা থেকে হাঁটু পর্যন্ত ঢেকে, মেঝের উপরে স্থির হয়ে শুয়ে আছে— কে সে?— নির্মলা! তার আর কিছু দেখতে পেলুম না— কেবল পা দুটি ছাড়া। ওঃ! এই কি সেই নির্মলার পা? রক্তহীন— কালিমালিপ্ত আড়ষ্ট,—আঙুলগুলো সামনের দিকে বেঁকে বেঁকে দুমড়ে পড়েছে!

প্রাণ শিউরে উঠল— দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঠকঠক করে কাঁপতে লাগলুম।

যা দেখেছি, যথেষ্ট! চাদর খুলে ও মুখ কে দেখবে?— আমি? পারব না— পারব না! এত ভয়ানক,— মৃত্যু?— কে জানত!

মেঝের উপরে একখানা কাগজ পড়ে রয়েছে না? হ্যাঁ— নিশ্চয় সেই চিঠি! এ চিঠি এতক্ষণ প্রাণপণে যে আগলে ছিল, সে এখন কোথায়? তার প্রেতাত্মা কি ঘরের একপাশে মলিন মুখে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এখনও আমার কার্যকলাপ নিরীক্ষণ করছে?

ভয়ে ভয়ে গুঁড়ি মেরে এক-পা এক-পা করে এগিয়ে চিঠিখানা তুলে নিলুম। ও কি নির্মলা? নির্মলার গায়ের চাদরখানা নড়ে কেন? আমার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে গেল, মাথার চুলগুলো যেন মাথার উপর খাড়া হয়ে উঠল! বিস্ফারিত নেত্রে স্পষ্ট দেখলুম, চাদরের একপাশ জোরে জোরে নড়ছে— ভিতর থেকে কী যেন ঠেলে ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে!

বিকটস্বরে চিৎকার করে উঠলাম— চাদরের ভিতর থেকে নির্মলার পোষা বেড়ালটা বেরিয়ে এসেই একছুটে পালিয়ে গেল। আঃ— রক্ষা পাই! কিন্তু, তবু আমার ভয় ঘুচল না— বেড়ালটার সঙ্গে সঙ্গে আমিও একদৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়লুম।...

নিজের ঘরে এসে অনেকক্ষণ পরে মাথাটা একটু ঠান্ডা হল। তৃষ্ণায় গলা শুকিয়ে গিয়েছিল, এক গেলাস জল খেলুম। খানিকক্ষণ ঘরের মেঝেতে পায়চারি করলুম। তারপর, সেই চিঠিতে কী আছে, তা-ই জানবার আগ্রহ হল।

চিঠিখানা চোখের সামনে ধরলুম। প্রথমেই হাতের লেখা দেখে মন চমকে উঠল। এ কী, এ তো পুরুষের লেখা নয়!

''শ্রীচরণেষু,

দিদি, বড়ো লজ্জায়, মুখ পুড়িয়ে তোমাকে এই চিঠি লিখছি। সংসারে তুমি বই এ পোড়ারমুখির আপন বলতে আর কে আছে? দিদি, যার কথায় ভুলে ধর্ম ছেড়েছি, কুলে কালি দিয়েছি, সে এখন আমায় পথে বসিয়ে কোথায় পালিয়েছে। আমি এখন খেতে পাচ্ছি না, এ সময় তুমি যদি কিছু দাও, তবেই প্রাণে বাঁচব। আর কী লিখব। উপরে ঠিকানা দিলুম।

অভাগিনি কমলিনী।''

চিঠি পড়ে বজ্রাহতের মতো স্তম্ভিত হয়ে বসে রইলুম।

কমলিনীর পত্র! নির্মলা তাই আমাকে এ চিঠি দেখায়নি! তাই সে কাঁদছিল! আর আমি— আর আমি—

এতক্ষণ স্থির হয়ে ছিলুম, আর পারলুম না। মেঝেতে কপাল ঠুকতে ঠুকতে চেঁচিয়ে কেঁদে উঠলুম।

ডাক্তার! এই আমার কথা। আমি যে কী পাষণ্ড, তা কি বুঝতে পারছ? আমার মতন আশ্চর্য ও অস্বাভাবিক মানুষ তুমি কি আর কখনো দেখেছ?

কিন্তু সবুর করো, এখনও একটু বাকি আছে। সে ঘটনার পরের কথা আমি তোমাকে কিছুতেই বলতে পারব না; সুতরাং কী ফল সে বিফল চেষ্টায়? তবে, আমার নিজের কথাই আরও কিছু বলব। মাঝখানে বাদ দেওয়াতে যদি কোথাও খাপছাড়া বোধ হয়, তবে সেটুকু তুমি নিজেই পূরিয়ে নিয়ো।...

আমি শ্মশানে যাইনি— যেতে পারিনি। গাঁয়ের লোকেরাই এসে নির্মলাকে শ্মশানে নিয়ে গেল। তারা জানলে, নির্মলা ভুল করে মালিশের ওষুধটা খেয়ে ফেলাতে, এই বিপত্তি ঘটেছে। নির্মলা মরে গিয়েও নাকি শিশিটা হাত থেকে ছাড়েনি, সেটা তার মুঠোর মধ্যেই পাওয়া গিয়েছিল। আহা, ছাড়বে কেন,— সেই শিশিই যে তাকে আমার কবল থেকে মুক্তি দিয়েছে!...

খবর পেয়ে ললিতও এসেছিল। নির্মলার ঘর থেকে যখন বেরিয়ে এল, সে তখন কাঁদছিল। তার উপর আর আমার রাগ ছিল না। তার কান্নায় আমারও কান্না এল।

আমি কাঁদছি দেখে চোখের জল মুছে সে আমার কাছে এসে দাঁড়াল। আমাকে সান্ত্বনা দিতে লাগল।

আমি বললুম, ''ললিতবাবু, শুনেছি আপনি মস্ত ডাক্তার। একটা কথা রাখবেন কি?''

''বলুন।''

''আপনি ঠিক বলবেন— লুকোবেন না?''

''কী কথা আগে শুনি।''

''আমার যক্ষ্মা হয়েছে, জানেন তো?''

''শুনেছি বটে।''

''হ্যাঁ, আমার যক্ষ্মা হয়েছে। আপনি আমাকে একবার পরীক্ষা করে ঠিক বলুন দেখি, কত শীঘ্র আমি মরব। আপনার পায়ে পড়ছি, কিছু লুকোবেন না। মরণে আমার ভয় নেই।''

ললিত একটু কুণ্ঠিত হয়ে বললে, ''মাপ করবেন— এতে পায়ে পড়াপড়ির কী আছে? আপনি যখন জানতে চাইছেন, তখন কিছুই লুকোব না।''

ললিত খুব মন দিয়ে অনেকক্ষণ ধরে নানারূপে আমাকে পরীক্ষা করলে। তারপর বললে, ''আমার যতদূর বিদ্যা, তাতে বলতে পারি, আপনার একেবারেই যক্ষ্মারোগ হয়নি।''

''অ্যাঁ, ঠিক বলছেন?''

''হ্যাঁ।''

আমি দু-হাতে ললিতের হাত জড়িয়ে ধরে কাতরস্বরে বললুম, ''বলুন— বলুন, লুকোবেন না। আমার যক্ষ্মা হয়নি, বলেন কী?''

আমার রকম দেখে ললিত আশ্চর্য হয়ে বললে, ''আমি ঠিক বলছি, কিছুই লুকোইনি। আপনি আমার কথায় বিশ্বাস করুন।...''

আমার নির্মল!— আমার নির্মল!— এই আলোয় ভরা পৃথিবী আমার চোখে এক লহমায় আঁধার-ঢাকা হয়ে গেল! দু-চোখ মুছে যেন দেখলুম, সেই গভীর অন্ধকার ভেদ করে বিদ্যুতের মতো উজ্জ্বল একখানি মুখ জেগে উঠল— চোখে সেই মধুর লজ্জা, ঠোঁটে সেই মৃদু হাসি, মুখে সেই স্বর্গের শ্রী— সে যে তারই মুখ। চকিতে যেন মুখ কোথায় লুকিয়ে গেল,— তারপরেই আবার ও কী জেগে উঠল!— ও সেই পা দুখানা,— সেই আড়ষ্ট, রক্তহীন, আঙুল-দোমড়ানো পা দুখানা!

ভয়বিভোর চোখে সেই বিকৃত পা দুখানা দেখতে দেখতে আমি অজ্ঞান হয়ে পড়লুম...

যখন জ্ঞান হল— দেখলুম, স্মৃতির শ্মশানে আমি পরিত্যক্ত, উন্মত্ত, জীবন্মৃত!

ডাক্তার! না, আর থাক—'

* * *

এই অপূর্ব পাগলের বিচিত্র কাহিনি পড়া সাঙ্গ হইল। মনটা কেমন ভারগ্রস্ত হইয়া উঠিয়াছিল, তাড়াতাড়ি উঠিয়া পড়িয়া বলিলাম, 'চলো, চলো, তোমার এ গারদ থেকে বেরিয়ে হাঁপ ছেড়ে বাঁচি!'

শচীশের সঙ্গে বাহিরে আসিলাম। ফটকের দিকে যাইতে যাইতে পথে সেই পাগলের ঘর পড়িল।

সেদিকে তাকাইতেই দেখি, আকাশের দিকে স্থিরনেত্রে চাহিয়া সেই পাগল স্তব্ধভাবে দাঁড়াইয়া আছে। তাহার পাণ্ডুর মুখে সূর্যের কিরণ লাগাতে গালের উঁচু উঁচু হাড় দুখানা যেন আরও বেশি বাহির হইয়া পড়িয়াছে।

হঠাৎ শচীশকে দেখিয়া পাগল ডাকিল, 'ডাক্তার, ডাক্তার!'

শচীশ তার কাছে গেল।

হাতটা বাড়াইয়া দিয়া পাগল কহিল, 'হাতটা দেখুন তো একবার!'

শচীশ তার হাত ও বুক পরীক্ষা করিয়া বলিল, 'তা-ই তো, আপনার যে যক্ষ্মা হয়েছে!'

ম্লান হাসি হাসিয়া পাগল বলিল, 'আঃ, বাঁচলুম!'

শচীশ আমার কাছে আসিয়া নিম্নস্বরে বলিল, 'যখন ভালো থাকে, তখনও এর এই পাগলামিটুকু ঘোচে না।'

ভারতী, আশ্বিন ১৩২৩ (সেপ্টেম্বর ১৯১৬)

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%