বেচারির বেচাল

হেমেন্দ্রকুমার রায়

পাড়ার মেয়েমহলের তাসের আসর হইতে মোহিনী যখন ফিরিয়া আসিল, সেনেদের বাড়িতে তখন একটা খণ্ড কুরুক্ষেত্রের প্রচণ্ড অভিনয় হইতেছিল।

বাড়িতে ঢুকিতে-না ঢুকিতে মোহিনীর কানে প্রথমেই ঢুকিল, উপর হইতে সেন-গিন্নির চড়া গলার কড়া হুমকি! তারপর দেখিল উঠানের একপাশে পা দুটো সটান ছড়াইয়া বসিয়া বুড়ি থাক-ঝি, মুখের কথায় ছিঁচকান্নার নাকিসুর লাগাইয়া বলিতেছে, 'অ গ, আমার কপালে কি অ্যাই ছিল গ—!...' তারপর দোতলায় উঠিয়াই দেখিল, বাড়ির কর্তা ব্যাজার মুখে তাহার সুমুখ দিয়া তাহাকে নাদেখিয়াই আপনমনে বকিতে বকিতে চলিয়া গেলেন, 'দূর হোক গে, দূর হোক গে ছাই! গিন্নির বুদ্ধিশুদ্ধি কি সব লোপ পেয়েচে! ও করচে কী এ? ছি ছি!'

মোহিনী ভাবিল, 'গিন্নির সঙ্গে কর্তার আজ খুব একহাত হয়ে গেছে দেখচি!'

কিন্তু নিজের ঘরে ঢুকিয়াই সে একেবারে থ! তাহার সামনেই বিরাট বপু লইয়া সেন-গিন্নি, অচল মৈনাকের একটি ছোটোখাটো সচল সংস্করণের মতো ছুটোছুটি করিতেছেন,—আর ঘরের চারিদিকে সমস্ত জিনিসপত্তর লন্ডভন্ড, ওলটপালট হইয়া ছড়ানো!

মোহিনীকে দেখিয়াই গিন্নি ভ্যাবাচ্যাকা খাইয়া, হাঁসফাঁস করিতে করিতে ঘর হইতে তাড়াতাড়ি বাহির হইয়া গেলেন।

মোহিনী অবাক হইয়া দেখিল, তার প্যাঁটরাটাও খোলা পড়িয়া রহিয়াছে! ব্যাপার কী?

এমন সময় খুকির ঝি আসিয়া ঘরের ভিতরে ঢুকিল।

মোহিনী জিজ্ঞাসা করিল, 'হ্যাঁ রে খুকির ঝি, কী হয়েচে রে?'

খুকির ঝি দুই গালে দুই হাতে রাখিয়া, মাথা নাড়িতে নাড়িতে চোখ পাকাইয়া বলিল, 'মা, মা, মা! এমন কাজের মুখে সাত ঝাড়ু, সাত ঝাড়ু! অ্যাঃ! বলে কিনা আমরা চোর? হ্যাঁ বামুন-মেয়ে, তুমিই বলো বাছা, এ কি সহ্য করা যায় গা?'

মোহিনী আশ্চর্য হইয়া বলিল, 'চোর? কে চোর?'

'আমরা গো আমরা! গিন্নির বালা নাকি পাওয়া যাচ্ছে না, সব্বাইকে তাই চোর বলা হচ্চে! আমাদেরও যাই মরতে ঠাঁই নেই, তাই—'

'বালা চুরি গেছে তো আমার ঘর হাঁটকানো হচ্ছিল কেন?'

'সকলকার ঘরেই খুঁজে বেড়ানো হচ্ছে। আমার ঘরও বাদ পড়েনি—আমার আঁচলের খুঁটটি পর্যন্ত খুলে দেখা হয়েচে! সাত ঝাড়ু, সাত ঝাড়ু—অমন কাজের মুখে সাত ঝাড়ু! আমাদেরও যাই ঠাঁই নেই মরতে, তাই—'

মোহিনী আবার বাধা দিয়া আশ্চর্য স্বরে বলিল, 'কিন্তু আমার ঘর হাঁটকানো হচ্ছিল কেন?'

'বলচি তো বাছা, গিন্নির বালা চুরি গেছে! তাই তোমার ঘরে বালা লুকোনো আছে কি না দেখা হচ্ছিল। তা তোমার আর ভয়টা কীসের? তুমি তোআর চুরি করতে যাওনি?'

লজ্জায়-ঘৃণায় মুখ রাঙা করিয়া নিশ্বাস চাপিয়া মোহিনী বলিল, 'ছিঃ ছিঃ! আমার জিনিসে হাত দেবার উনি কে? আমি চোর!'

খুকির ঝি দীর্ঘশ্বাস টানিয়া বলিল, 'আর বাছা, পরের প্রাণে কি দরদ থাকে? তুমি ভদ্দরলোকের মেয়ে হলে কী হবে মা! তুমি যখন পরের চাকরি করচ তখন এসব লাঞ্ছনা মুখ বুজে সহ্য করতে হবে বই কী!'

খুকির ঝি চলিয়া গেল। মোহিনী হাঁপাইতে হাঁপাইতে মাদুরের উপরে ধুপ করিয়া বসিয়া পড়িল। তার জীবনে এমন অপমান এই প্রথম। ভদ্র ঘরের মেয়ে সে, গরিব বলিয়াই তাকে পরের বাড়িতে চাকরি স্বীকার করিতে হইয়াছে, আর তার উপরেই কিনা এই কুৎসিত সন্দেহ! হয়তো এখনই পুলিশ ডাকিয়া আনা হইবে, পুলিশ হয়তো তাহাকেই সন্দেহ করিয়া থানায় টানিয়া লইয়া যাইবে!... হায়, গরিব হওয়ার কত জ্বালা! দেশে তার বুড়ো অথর্ব বাপ আছেন, তাঁর জন্যই তার এই কষ্টস্বীকার। সে এখন যদি চাকরি ছাড়িয়া দেয়, তাহা হইলে বৃদ্ধ পিতাকে লইয়া কাহার আশ্রয়ে গিয়া দাঁড়াইবে? অল্প বয়সেই সে বিধবা, শ্বশুরবাড়িতেও এমন কেউ নাই, যে তাদের দুঃখে মুখ তুলিয়া চাহিবে।

বসিয়া বসিয়া অকূল পাথার ভাবিতেছে, এমন সময় বাহির হইতে ডাক আসিল, 'ওগো বামুন-মেয়ে, উনুনে আগুন দেওয়া হয়েচে, উনুন যে জ্বলে যাচ্ছে!—'

তাড়াতাড়ি গা ধুইয়া, কাপড় কাচিয়া মোহিনী রান্নাঘরের ভিতরে ঢুকিল।

রান্নাঘরের জানলা দিয়া সে দেখিতে পাইল, দালানের উপরে একখানি পশমের আসনে বসিয়া কর্তা জলখাবার খাইতেছেন, আর খানিক তফাতে বসিয়া গিন্নি, থাকিয়া থাকিয়া অগ্নিপাত উন্মুখ আগ্নেয়গিরির মতো গুমরাইয়া উঠিতেছেন।

কর্তা খুব আস্তে আস্তে বলিলেন, 'হ্যাঁ গা, একজোড়া বালা হারিয়েচে বলে তুমি এত বেশি হাঁকপাঁক করছ কেন?'

গিন্নি খনখনে গলা তুলিয়া বলিলেন, 'মরে যাই! কথার ছিরি দেখো-না! ঘরের ভেতর থেকে বালা গেল চুরি, আর আমি কিনা চুপ করে নিশ্চিন্তি হয়ে বসে থাকব! কোন বিধাতা তোমায় গড়েছিল গা? তার বুদ্ধিকে বলিহারি!'

কর্তা খানিকক্ষণ আর কিছু উচ্চবাচ্য করিতে ভরসা পাইলেন না। তারপর বেলের পানার শ্বেতপাথরের বাটিটি মুখের উপরে তুলিয়া, তাহার আড়ালে মুখ ঢাকিয়া বলিলেন, 'কিন্তু তুমি মোহিনীর ঘরে গিয়ে জিনিস ঘাঁটছিলে কেন? সে বেচারি ভদ্দরলোকের মেয়ে, কী মনে করলে বলো দেখি?'

গিন্নি খ্যাঁক করিয়া উঠিয়া বলিলেন, 'চুলোয় যাক! ভদ্দর-অভদ্দর কাউকে আমি বিশ্বাস করি না। বরং, বলতে গেলে বলতে হয়, ছোটোলোকের এত বড়ো বুকের পাটা হয় না! ওই বামনি ছুঁড়ি আবার লেখাপড়া জানে, ও সব করতে পারে!'

'চুপ চুপ, শুনতে পাবে যে!'

'শুনুক গে! ঝি-বামুনকেও আবার ভয় করে চলতে হবে নাকি?'

'ছিঃ, এসব তোমার অন্যায় হচ্ছে!'

'থামো, থামো! আখ চিবুচ্ছ, আখ চিবোও! চিবিয়ে চিবিয়ে ফের যদি কথা কইবে তো টের পাইয়ে দেব মজাটা!'

এক ধমকেই কর্তার মুখে রা হরিয়া গেল। দুর্দান্ত গুরুমহাশয়ের উদ্যত বেতের সামনে দুষ্টু ছেলের মুখ যেমন হয়, ঠিক তেমনিধারা মুখ করিয়া কর্তা হেঁট মাথায় মাটির দিকে ফ্যালফেলে চোখ মেলিয়া রহিলেন।

* * *

সেরাত্রে মোহিনী আর চোখ মুদিতে পারিল না। গিন্নির নিষ্ঠুর কথাগুলো কাঁটার মতো পটপট করিয়া তাহার বুকের মাঝখানে বিঁধিতে লাগিল। সে বেশ বুঝিল, গিন্নির সন্দেহ সবচেয়ে বেশি তাহার উপরেই। রাগে-অপমানে-ঘৃণায়-ভয়ে মোহিনীর প্রাণ আচ্ছন্ন হইয়া গেল। সে মনে মনে পণ করিল, না খাইয়া মরিবে তাও ভালো, তবু এ বাড়িতে আর একরাতও থাকিবে না।...

ভোরবেলা উঠিয়াই সব আগে মোহিনী তার প্যাঁটরা গুছাইয়া পোঁটলাপুঁটলি বাঁধিতে শুরু করিল। এ ঘরে আর একদণ্ড তিষ্ঠিতেও তার প্রাণ যেন হাঁপাইয়া উঠিতেছিল।

এমন সময় তাহার ঘরের সুমুখ দিয়া যাইতে যাইতে তাহাকে দেখিয়া কর্তা হঠাৎ দরজার কাছে দাঁড়াইয়া পড়িলেন। বিস্মিত স্বরে জিজ্ঞাসা করিলেন, 'এসব কী হচ্চে মোহিনী?'

মোহিনী নতমুখে, মৃদুস্বরে বলিল, 'গিন্নিমা কাল আমার যে অপমানটা করেছেন, তার পরেও এ বাড়িতে আমার আর থাকা পোষায় না। তাই আমি জিনিসপত্তর গোছাচ্ছি।'

কর্তা একবার ভয়ে ভয়ে চারিদিকে চাহিলেন। কেউ কোথাও নাই দেখিয়া, আস্তে আস্তে তিনি ঘরের ভিতরে আসিয়া দাঁড়াইলেন। তারপরে কাতরস্বরে বলিলেন, 'আমি সব বুঝেছি মোহিনী! ওদের যা খুশি করুক, তা বলে তুমি কেন চলে যাবে?'

মোহিনী মুখে কিছু বলিল না—আপনমনে যেমন জিনিস গুছাইতেছিল, তেমনি গুছাইতে লাগিল।

কর্তাও খানিকক্ষণ চুপচাপ দাঁড়াইয়া রহিলেন, কী যে বলিবেন সেটা যেন তিনি বুঝিয়া উঠিতে পারিতেছিলেন না।... তারপর ধীরে ধীরে বলিলেন, 'গিন্নিকে জানো তো, তার মাথা একটুতেই অমনি গরম হয়ে ওঠে। সে পাগলির কথায় কি আর রাগ করতে আছে?'

মোহিনী কোনো উত্তর দিল না।

'মোহিনী, গিন্নির যে দোষ হয়েচে, এ আমি মেনে নিচ্ছি। লক্ষ্মীটি, তুমি কিছু মনে কোরো না!'

মোহিনী এবারেও জবাব দিল না—পোঁটলাটা আরও ভালো করিয়া বাঁধিতে লাগিল। সে বুঝিল, কর্তার কাকুতিমিনতির মূল্য কিছুই নাই— এই ভিতু ভালোমানুষ লোকটিকে এ বাড়িতে কেহই ধর্তব্যের মধ্যে গণ্য করে না— এমনকি ঝি-চাকররা পর্যন্ত! তাঁহাকে প্রতিপদে সকলেরই মুখ চাহিয়া চলিতে হয়,— এ সংসারের সর্বেসর্বা হইতেছেন গৃহিণী! সুতরাং কর্তার কথায় কেমন করিয়া সে এ বাড়িতে থাকিবে?

মোহিনীকে তখনও নীরব দেখিয়া কর্তা বলিলেন, 'হুঁ!... এত করে বলচি, তবু তুমি কথা কইলে না। আচ্ছা, কী করলে তুমি তুষ্ট হও? আমাকে মাপ চাইতে বলো? বেশ, যা হয়েচে, তার জন্যে তোমার কাছে আমি ক্ষমা চাইছি। ক্ষমা! বুঝলে? আমি ক্ষমা চাইছি!'

কর্তা ঘরের এদিকে-ওদিকে একটু বেড়াইয়া, দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া বলিলেন, 'শুনছ মোহিনী? আমি ক্ষমা চাইছি।'

মোহিনী প্রাণের আবেগ চাপিয়া, কর্তার মুখের দিকে মুখ তুলিয়া বলিল, 'আপনার কোনো দোষ নেই, আমি জানি। আমার জন্যে কেন আপনি কষ্ট পাচ্ছেন?'

'না মোহিনী, তোমার জন্যে আমি কষ্ট পাচ্ছি না!... কিন্তু, কিন্তু, তুমি এখান থেকে চলে যেয়ো না! বলো, থাকবে?'

মোহিনী ঘাড় নাড়িয়া জানাইল, না।

কর্তা শূন্যদৃষ্টিতে দেয়ালের দিকে চাহিয়া, কোঁচায় খুঁটটা লইয়া আঙুলে জড়াইতে লাগিলেন। তাঁহার মুখ দেখিলে বোঝা যায়, তিনি যেন একমনে কী ভাবিতেছেন।

মোহিনীর পোঁটলা গুছানো শেষ হইল।

কর্তা ভাঙা-ভাঙা গলায় বলিলেন, 'মোহিনী, তুমি জানো না, তোমার ব্যবহারে আমার কী কষ্ট হচ্ছে! তুমি কি আমাকে জোড়হাত করতে বলো?—কীসে তোমার মন ফিরবে? যে কথা আমি কাউকে বলিনি, কাউকে বলবও না ভেবেছিলুম, তুমি কি তবে সেই কথাই শুনতে চাও? বেশ, শোনো!'

মোহিনী অবাক হইয়া চাহিয়া রহিল।

'গিন্নির বালা নিয়েছি আমিই। কেমন, এইবার তুমি তুষ্ট হলে তো? কিন্তু সাবধান, এ কথা যেন আর কেউ শুনতে না পায়!'

মোহিনী যেন নিজের কানকেই বিশ্বাস করিতে পারিল না! এ কী কথা! এও কি সম্ভব?

'আমার এক বন্ধুর অত্যন্ত টাকার দরকার হয়েছিল। ওই বালা বাঁধা রেখে তাকে আমি টাকা দিয়েছি। কী করব, এ ছাড়া আমার আর উপায়ও ছিল না। গিন্নির কাছে হাত পাতলে আমি সিকি পয়সাও পেতুম না!'

মোহিনী থামিয়া থামিয়া বলিল, 'কিন্তু—তা বলে চুরি—'

'না, আমি চুরি করিনি। ও বালা দিয়েচে কে? আমিই দিয়েচি! কিন্তু গিন্নি তো ভুলেও তা ভাবেন না—তিনি আমার সর্বস্ব দখল করে বসে আছেন, একটা পয়সার দরকার হলে আমাকে তাঁর কাছে হাত পাততে হয়। কিন্তু কী করব বলো—এজন্যে তো আমি নিজের স্ত্রী-র নামে আদালতে নালিশ করতে পারি না!... যাক সে কথা। এখন তুমি তো আর আমাকে ছেড়ে যাবে না?'

'না, এখানে আমার আর থাকতে ইচ্ছে নেই!'

কর্তা হতাশ, দুঃখিত স্বরে বলিলেন, 'বেশ, তবে যাও। এখান থেকে গেলে তুমি সুখী হবে বটে, কিন্তু এই নির্বান্ধব পুরীতে আমার দিকে মুখ তুলে চায়, এমন আর কেউ থাকবে না! যতদিন তুমি এসেচ, তোমার কাছ থেকে আমি মায়ের আদর, মেয়ের যত্ন পেয়েচি। তুমি চলে গেলে আমার বাঁচা-মরা দুই সমান হবে!'

বাহির হইতে গিন্নির গলা শোনা গেল— 'খুকির ঝি, অ খুকির ঝি! কর্তাকে ডেকে দে তো রে!'

বেচারি কর্তা! গিন্নির গলা শুনিয়াই তাঁহার পেটের পিলে যেন চমকাইয়া গেল—তাড়াতাড়ি লম্বা লম্বা পা ফেলিয়া তিনি ঘর হইতে বাহির হইয়া পড়িলেন। যাইবার সময়ে করুণ মিনতিভরা চোখে মোহিনীর দিকে চাহিয়া, চুপি চুপি শুধু বলিয়া গেলেন, 'যাসনে মা, যাসনে!'

...আঁচলে চোখের জল মুছিয়া মোহিনী, পোঁটলাপুঁটলি সব আবার খুলিয়া ফেলিল। বাহিরে গিয়া থাক-ঝি-কে ডাকিয়া বলিল, 'অ থাকি! বেলা হল যে, আজ কি আর উনুনে আগুন দিতে হবে না লা?'

ভারতী, বৈশাখ ১৩২৬ (এপ্রিল ১৯১৯)

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%