নিয়তি

হেমেন্দ্রকুমার রায়

রাত বারোটা।

ওই পোড়োবাড়ির ভাঙা, কালো প্রাচীরের উপরে আধখানা চাঁদ বাঁকিয়া আছে। চাঁদ কী পাণ্ডুর— যেন মড়ার মুখের মতো!... আর, আর— অন্ধকার কী গাঢ়,— যেন মূর্তিমান মৃত্যুর মতো! ও কীসের ডাক? পেচকের? না অন্ধকারের?

নবীন সে স্তব্ধতা, সে অন্ধকার সহিতে পারিল না— সেদিককার জানালা বন্ধ করিয়া দিয়া সে আর-একদিকে আসিয়া দাঁড়াইল। সেদিককার জানালা খুলিয়া দিতে-না দিতেই আলোর ঢেউয়ের পর ঢেউ আসিয়া তার ঘর যেন ভাসাইয়া দিল!

সুমুখেই বিবাহবাড়ি— উজ্জ্বল আলোয় ঘরে ঘরে হাসি-মাখা মুখ দেখা যাইতেছে। কেহ প্রাণ খুলিয়া হাসিতেছে, কেহ আনন্দের গান গাহিতেছে, কেহ ছুটাছুটি করিতেছে। চারিদিকে জীবনের লক্ষণ— পৃথিবীতে যেন দুঃখ-বিষাদ বলিয়া কোনো কিছু নাই!

নবীনের মনে হইল, সামনের বাড়িখানা যেন তাকে আর তার অদৃষ্টকে কঠোর উপহাস করিতেছে;— এর চেয়ে অন্ধকার যে ঢের ভালো! সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া আবার জানালা বন্ধ করিয়া দিল। ঘর আবার অন্ধকার।

সেই অন্ধকারে খানিকক্ষণ সে গুম হইয়া বসিয়া রহিল। তারপর আস্তে আস্তে উঠিয়া মাটির প্রদীপটি জ্বালিয়া দিল। প্রদীপে তৈল ছিল খুব অল্প। মিটমিট করিয়া কাঁপিয়া কাঁপিয়া দীপ জ্বলিতে লাগিল,— আসন্ন মৃত্যু রোগীর মতো!

দরিদ্রের ঘর,— চারিদিকে দারিদ্র্যের চিহ্ন! প্রদীপের ম্লান শিখা চারিদিকের দীনতা ও মলিনতা যেন আরও বেশি করিয়া প্রকাশ করিয়া তুলিল!

কতকগুলা ছেঁড়া ন্যাকড়া ও তুলার স্তূপে পরিবারের আর সকলে শুইয়া আছে— একটি রমণী, দুটি ছেলে, তিনটি মেয়ে। তাহাদের দিকে তাকাইয়া নবীন শিহরিয়া উঠিল।

রমণী তাহার স্ত্রী। অভাগীর ঘুমন্ত মুখ হইতেও দুশ্চিন্তার রেখা সরিয়া যায় নাই। তার চোখের কোলে কালি, গালের হাড় উঁচু হইয়া উঠিয়াছে, আর মুখে যেন হলদে রং মাখানো। নবীনের মনে পড়িল, যেদিন উৎসবের বাঁশি ও আনন্দের হাসির মাঝে এই রমণীর সঙ্গে মন্ত্রোচ্চারণ করিয়া পুরোহিত তাহার অদৃষ্টসূত্র বাঁধিয়া দিয়াছিল, সেদিন এই মুখেই, এই নয়নেই, সে কী সুষমা ও কী নবীনতা দেখিতে পাইয়াছিল!

নবীন ঘাড় হেঁট করিয়া ভাবিতে ভাবিতে ঘরের ভিতরে পায়চারি করিতে লাগিল।

আজ তিন মাস হইল, তাহার চাকুরিটি গিয়াছে। সে মাহিনা পাইত কুড়ি টাকা। তাতেই কোনোরকমে অর্ধাহারে পেট চলিয়া যাইত।

গেল তিন মাস ধার করিয়া, তৈজসপত্র বিক্রয় করিয়া কোনোক্রমে সে দিন কাটাইয়াছে। সকাল-সন্ধ্যা সে চাকুরির জন্য লোকের দ্বারে দ্বারে ঘুরিয়াছে; কিন্তু কোথাও চাকুরি পায় নাই। আজকাল পথে বাহির হইলে পাওনাদারেরা তাকে অপমান করে,— ধার চাহিতে গেলে সকলে তাকে তাড়াইয়া দেয়। একখানি ভাড়াঘরে তারা কয়টি প্রাণী মাথা গুঁজিয়া থাকিত; কিন্তু বাড়িওয়ালা অনেকদিন ভাড়া না পাইয়া আগুন হইয়া আছে। কাল নূতন মাসের পয়লা— তাহাদের এ ঘর ছাড়িয়া উঠিয়া যাইতে হইবে।

কিন্তু, কোথায় যাইবে সে? স্ত্রী-পুত্রের হাত ধরিয়া পথে দাঁড়ানো ছাড়া আর তো কোনো উপায় নাই!— আর, খাব কী? পথের ধুলা?

নবীন দুই হাতে মাথা ধরিয়া বসিয়া পড়িল। ঘরের কোণ হইতে একটা কুকুর এতক্ষণ একদৃষ্টিতে তাহার গতিবিধি দেখিতেছিল। কুকুরটা বুড়া হইয়াছে। সে যখন এক মাসের, নবীন তখন তাকে পথ হইতে কুড়াইয়া আনিয়াছিল; সেইদিন থেকে সে সুখে-দুঃখে নবীনের পরিবারেরই একজন হইয়া আছে।

নবীনকে বসিয়া পড়িতে দেখিয়া, কুকুরটা আস্তে আস্তে উঠিয়া প্রভুর কাছে আসিয়া দাঁড়াইল। তারপর আপনার বড়ো বড়ো চোখ দুটি মেলিয়া নবীনের দিকে চুপ করিয়া চাহিয়া রহিল। তার পশুনেত্রে যে দুঃখ ও সমবেদনার ভাব প্রকাশ পাইতেছিল, অনেক সময়ে নরনেত্রও তেমন গভীর ভাব প্রকাশ করিতে পারে না।

নবীন বলিল, 'কী গো ভুলো, তুই যে উঠে এলি বড়ো?'

ভুলো ল্যাজ নাড়িতে নাড়িতে নবীনের একখানা হাত আদর করিয়া চাটিয়া দিতে লাগিল; সে যেন নবীনকে সান্ত্বনা দিতে চায়!

নবীন তাহার মাথায় হাত বুলাইতে বুলাইতে বলিল, 'ভুলো, যা— আজকের রাতটা ঘুমিয়ে নে রে! কাল থেকে তোকেও পথে পথে ঘুরে বেড়াতে হবে। আহা, এ বুড়ো বয়সে এত কষ্ট তুই সইতে পারবি তো?'

ভুলো, নবীনের মুখের দিকে চাহিয়া একটা অস্ফুট ধ্বনি করিল;— যেন সে সব কথা বুঝিতে পারিয়াছে!

ঘরের ভিতরে হঠাৎ শিশুর কান্নার শব্দ হইল। সে নবীনের সবচেয়ে ছোটো মেয়ে— সবে আজ ছয় মাস পৃথিবীতে আসিয়াছে। নবীন তাড়াতাড়ি উঠিয়া তাকে কোলে তুলিয়া নিল।

মেয়েটিকে দেখিতে খুব সুন্দর। কোঁকড়া-কোঁকড়া চুল, ড্যাবরা-ড্যাবরা চোখ, ফুলো-ফুলো গাল, রাঙা-রাঙা ঠোঁট; কিন্তু মরুভূমিতে ফুলের মতো, গরিবের ঘরে দিন দিন সে শুকাইয়া যাইতেছে। আজ কয়দিন সে অর্ধাহারক্লিষ্টা জননীর স্তন্যপান করিয়াই কাটাইয়াছে,— অন্য দুগ্ধ তার অদৃষ্টে জুটে নাই।

আলোর দিকে মেয়ের মুখ ফিরাইয়া নবীন খানিকক্ষণ একদৃষ্টিতে শিশুর মুখ নিরীক্ষণ করিল। তারপর খুকির ননির মতন নরম গালে একটি চুমো খাইয়া বলিল, 'খুকি, আর জন্মে তুই কী মহাপাপ করেছিলি যে, এ জন্মে আমার ঘরে জ্বলেপুড়ে মরতে এলি?'

খুকি ঘন ঘন হাত-পা নাড়িতে নাড়িতে হাসিয়া বলিল, 'অক্ক, অক্ক, অক্ক!'

নবীন, মেয়েকে নাচাইয়া নাচাইয়া ঘুম পাড়াইল। শেষে স্ত্রী-র বুকের উপরে খুকিকে শোয়াইয়া দিল। সেই স্পর্শে তাহার স্ত্রী জাগিয়া উঠিল। চোখ মেলিয়া, সুমুখেই স্বামীকে দেখিয়া সে ঘুমের ঘোরেই হাত বাড়াইয়া নবীনের গলা জড়াইয়া ধরিল এবং পাশ ফিরিয়া সেই অবস্থায় আবার ঘুমাইয়া পড়িল।

নবীন ধীরে ধীরে আপনার গলা হইতে স্ত্রী-র হাতখানি নামাইয়া, তার ওষ্ঠে একটি চুম্বন দিয়া আপনমনে বলিল, 'ঘুমোও, ঘুমোও— যতটুকু পারো ঘুমিয়ে নাও। কাল থেকে ভিখারিদের সঙ্গে ছেলে-মেয়ে নিয়ে পথে শুয়ে ঘুমোতে হবে, লোকের কাছে হাত পেতে ভিক্ষে চাইতে হবে! কেউ একমুঠো চাল দেবে, কেউ দূর দূর করে তাড়িয়ে দেবে। আমার মুখের দিকে ছলছল চোখে তাকালেও কোনো ফল হবে না; কাঁদলেও— কেঁদে কেঁদে মরে গেলেও ভগবান মুখ তুলে চাইবেন না।'

টং করিয়া ঘড়ি বাজিয়া উঠিল।

টং! টং!— রাত দুইটা!

নবীন আপনমনে হিসাব করিয়া বলিল, 'দুটো, তিনটে, চারটে, পাঁচটা, ছ-টা— আর চার ঘণ্টা। ভিখারি সেজে পথে দাঁড়াতে আর চার ঘণ্টা বাকি। আর চার ঘণ্টা আমি ভদ্রলোক আছি! মা গো— ও মা! আমার মতো অভাগাকে তুমি গর্ভে ধরেছিলে কেন? আজ কি আমার কান্না তুমি শুনতে পাচ্চ না?'— নবীন অশ্রুভরা চোখে স্ত্রী-র মুখের উপরে মাথা রাখিয়া শুইয়া পড়িল।

প্রদীপটা দপ করিয়া একবার জ্বলিয়া উঠিয়া প্রাণপণে খানিকটা হলদে আলো বিকীর্ণ করিয়া হঠাৎ নিবিয়া গেল।

ঘর আবার অন্ধকার।

সেই অন্ধকারে, নবীনের ফোঁপাইয়া ফোঁপাইয়া চাপা কান্না শুনিয়া, ভুলো অস্থিরপদে ঘরের ভিতরে ঘুরিয়া বেড়াইতে লাগিল।

পরদিনের বেলা আটটা।

বাড়িওয়ালা ঘরের বাহিরে একখানা কাগজ মারিয়া দিতেছে; তাতে লেখা—

ঘর-ভাড়া

এই ঘর ভাড়া দেওয়া যাইবে।

ভাড়া-পত্র টাঙাইয়া বাড়িওয়ালা ঘরের ভিতরে ঢুকিল। ঘর তখন খালি। দরজার কাছে একখানা খাম পড়িয়া রহিয়াছে। বাড়িওয়ালা সেখানা তুলিয়া লইল। খামখানা কেহ খুলে নাই, উপরে ডাকঘরের ছাপ মারা। বাবু নবীনচন্দ্র ঘোষের নামে আসিয়াছে।

বাড়িওয়ালা বুঝিল, তাহার ভাড়াটেরা উঠিয়া যাইবার পর ডাকহরকরা কখন আসিয়া চিঠিখানা এখানে ফেলিয়া দিয়া গিয়াছে। একটু ইতস্তত করিয়া সে খাম ছিঁড়িয়া চিঠি পড়িল।

কোনো সওদাগরি অফিসের সাহেব, বাবু নবীনচন্দ্র ঘোষকে লিখিতেছে—

'তোমার দরখাস্ত মঞ্জুর হইল। এই মাসের পয়লা তারিখ হইতে আমাদের অফিসে তোমাকে একটি কুড়ি টাকা মাহিনার কাজ দেওয়া গেল। ইত্যাদি।'

কিন্তু, নবীন তখন কোথায় বসিয়া স্ত্রী-পুত্রের সঙ্গে চোখের জলে বুক ভাসাইতেছিল? বাড়িওয়ালা সে খোঁজ নেওয়া দরকার মনে করিল না।

মর্মবাণী ২ অগ্রহায়ণ ১৩২২ (নভেম্বর ১৯১৫)

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%