হেমেন্দ্রকুমার রায়
ক
পাশের বাড়িতে বিয়ে; কিন্তু গয়নাগুলো স্যাকরার বাড়িতে— গয়না নহিলে মেয়েদের নেমন্তন্ন রাখা হইবে না। গয়নাগুলো রং করিতে দেওয়া হইয়াছে— হুকুম করিলাম সেগুলো যেমন করিয়া হোক আজকেই ফিরাইয়া আনা চাইই চাই!
স্যাকরার দোকানে হাজির হইয়া গয়নাগুলো চাইলাম। সে হাতজোড় করিয়া বলিল, 'বসুন বাবু, অ্যাদ্দূর থেকে এলেন, একটু তামুক ইচ্ছে করুন।'
আমি হচ্ছি স্যাকরার একজন মস্ত খদ্দের। বুঝিলাম, সে আমাকে কিঞ্চিৎ আপ্যায়িত না করিয়া অমনি অমনি ছাড়িবে না। অতএব, বসিলাম।
স্যাকরার দোকানগুলিকে অনায়াসে সরকারি বৈঠকখানা বলিতে পারা যায়। তামাকের ধোঁয়ার সঙ্গে এখানে সকালের বিকালে পাড়ার যত সত্য-মিথ্যা গুজব, নিন্দা, কুৎসা ও ঘোঁট পাকাইয়া উঠিতে থাকে।
তামাকের মিঠেকড়া ধোঁয়ায় বেড়ে মশগুল হইয়া উঠিয়াছি, এমন সময় একটা আধবুড়ো লোক হাঁপাইতে হাঁপাইতে দোকানে ঢুকিয়া বলিল, 'ওহে শুনেছ!'
স্যাকরা বলিল, 'কী?'
নেশার আরামে তখন আমার চোখ দুটি স্তিমিত হইয়া আসিয়াছে। ধূম্রকুণ্ডলীর ফাঁক দিয়া সেই অবস্থায় দেখিলাম, আগন্তুকের মুখ-চোখ গল্প বলিবার আগ্রহে ও উৎসাহে প্রদীপ্ত হইয়া উঠিয়াছে। খবরটা নিশ্চয় যে-সে খবর নয়— শুনিবার জন্য কান খাড়া করিয়া রহিলাম।
'মুখুজ্জেদের বাড়িতে মস্ত ডাকাতি হয়ে গেছে যে!'
'কখন মশাই, কখন?'
'এইমাত্র। পাড়ায় থাকো— পাড়ার কোনো খবর রাখো না— কীরকম লোক হে!'
'এঁজ্ঞে, একটা গোলমাল শুনছিলুম বটে। কিন্তু নিজের দোকান ফেলে তো আর পরের বাড়ির ডাকাতি দেখতে যেতে পারি না মশয়, আমার দোকান দেখে কে?'
'হুঃ, দোকান দেখা! চোখে-কানে এরা দেখতে-শুনতে দিচ্ছে না হে বাপু— এরা সেই হাওয়াগাড়ির বাবু-ডাকাত, হাতে এদের ইয়া ইয়া পিস্তল! লোকের নাড়িনক্ষত্রের খবর রাখে! এই দেখো-না, মুখুজ্জেদের জমিদারি থেকে আজ অনেক টাকা এসেছিল, এরা ঠিক সে সন্ধান পেয়ে দেউড়িতে এসে হাজির! পিস্তলের একটি আওয়াজ শুনেই যতসব পাঁড়ে-দোবে-চোবের দল রাধা-কিষণকে টিকির মধ্যে লুকিয়ে ভোঁ-দৌড়, ডাকাতদের চেহারা দেখেই মুখুজ্জে মশাই ভিরমি খেয়ে চিতপটাং, ডাকাতবাবুরা সোজা এসে বুক ফুলিয়ে সোজাই চলে গেল, যাবার সময় সঙ্গে নিয়ে গেল জমিদারির সমস্ত টাকার তোড়া, মেয়েদের সমস্ত গয়না!'
'অ্যাঁ— বলেন কী, বলেন কী! তারপর?'
'তারপর— কাল শুনো সব। খবরটা টাটকা থাকতে থাকতে সবাইকে আগে শুনিয়ে আসি—' লোকটা যেমন হঠাৎ আবির্ভূত হইয়াছিল, তেমনি হঠাৎ অন্তর্হিত হইল।
এতক্ষণে আমার স্তিমিত নেত্র আশ্চর্যরূপে বিস্ফারিত হইয়া উঠিয়াছে।
স্যাকরা আমার পানে ফিরিয়া সভয়ে বলিল, 'মশয়, শুনলেন!'
'হুঁ!'— বলিয়া হুঁকায় একটি সুখটান মারিতে গিয়া দেখিলাম, বহুক্ষণ চুম্বন অভাবে অভিমানিনী হুক্কাসুন্দরীর প্রেমবহ্নি নিবিয়া গিয়াছে। হুকাটি স্যাকরার হাতে দিয়া বলিলাম, 'তা-ই তো, এখন উপায়?'
স্যাকরা দোকানে কুলুপ লাগাইতে লাগাইতে বলিল, 'আমি তো মশয়, বাসায় চললুম।'
'তা তো দেখতেই পাচ্ছি। কিন্তু আমি কী করব? সঙ্গে এতগুলো গয়না, যেতেই হবে অনেকটা!'
'আসি মশয়, নমস্কার!'— আমার কথার কোনো জবাব না দিয়া, স্যাকরার পো ভয়ে ভয়ে চারিদিকে চাহিতে চাহিতে চটপট চম্পট দিল।
খানিকক্ষণ হতভম্ব হইয়া বসিয়া রহিলাম। শীতের রাত্রি। কুয়াশা আর অন্ধকারে চারিদিক ঝাপসা।
খ
গয়নাগুলো পেট-কাপড়ে বাঁধিয়া উঠিলাম। এদিকে-ওদিকে চাহিয়া লোকজন। খারাপ নজরে ঠেকিল না— ডাকাতের ভয়ে যার বাড়িতে ঢুকিয়া দরজায় খিল আঁটিয়াছে।
বলির পাঁঠার মতো কাঁপিতে কাঁপিতে প্রাণটি হস্তগত করিয়া পথ চলিতে লাগিলাম। আমার বাড়ি শ্যামবাজার, এখান থেকে দেড় মাইলেরও বেশি। প্রত্যেক গলিঘুঁজির মুখ দিয়া যাই, আর বুকটা দুদ্দুড় করিয়া উঠে! মনে হয়, ওই অন্ধকারে, আনাচকানাচে নিশ্চয়ই কোনো একটা বদখত চেহারা পিস্তল বাগাইয়া লুকাইয়া আছে— দিল বুঝি মাথার খুলি উড়াইয়া! সেই লোকটার কথা মনে হইল, 'এরা লোকের নাড়িনক্ষত্রের খবর রাখে!'— ও বাবা, আমার কাছে গয়না আছে এরা কি সেটা টের পাইয়াছে? তা আর পায় নাই—যার যা কাজ! এসব খবর না রাখিলে কি এদের ব্যাবসা চলে? চারিদিকেই এদের চর ঘুরিতেছে— তাদের চোখে ধুলা দেওয়া সহজ নয়। যে লোকটা ডাকাতির খবর দিয়া গেল সে-ই যে চর নয় তা-ই বা কে বলিতে পারে! তারপর হঠাৎ মনে পড়িল, স্যাকরার কাছ থেকে গয়নাগুলো লইয়া আমি যখন কাপড়ে বাঁধিতেছিলাম, তখন রাস্তা দিয়া একটা চোয়াড়ে চেহারার লোক কটমট করিয়া আমার দিকে চাহিতে চাহিতে গিয়াছিল। নিশ্চয় সে ডাকাতের চর! এতক্ষণ সে তার দলকে কি আর খবর দেয়নি যে, আমার কাছে একরাশ গয়না আছে!
রাস্তার মাঝে মাঝে লোকজন চলিতেছে, তাদের সকলকেই ডাকাত বলিয়া সন্দেহ হইতে লাগিল। দু-পা যাই— আর চমকিয়া উঠি। হঠাৎ দেখি, একখানা মোটরগাড়ি দুই চোখে অগ্নিবর্ষণ করিতে করিতে আমার দিকেই ছুটিয়া আসিতেছে। গাড়িতে অনেকগুলো লোক! যতক্ষণ না গাড়িখানা আমাকে পার হইয়া চলিয়া গেল, ততক্ষণ আমি একটা বাড়ির রোয়াকে উঠিয়া গা-ঢাকা দিয়া দুরুদুরু প্রাণে দাঁড়াইয়া রহিলাম।
বড়োরাস্তায় আসিয়া প্রাণটা তবু কতকটা ধাতস্থ হইল। এখানে এত ভিড়, পুলিশের এমন কড়া পাহারা,— ডাকাতের দল এরকম জায়গায় নিশ্চয়ই কারো গলা টিপিয়া ধরিতে পারিবে না!
শ্যামবাজারের দিকে যতই আগাইতেছি, রাস্তার ভিড় ততই পাতলা হইয়া আসিতেছে— আর আমার ভয় ততই চরমে উঠিতেছে। তবে, ভরসা এই যে, আর মিনিট দশেক মা কালীর ইচ্ছায় ভালোয় ভালোয় কাটিয়া গেলেই বাড়ি পৌঁছিতে পারিব।
হঠাৎ আমাদের পড়শি রামবাবুর সঙ্গে দেখা। আমাকে দেখিয়া বলিলেন, 'এত তাড়াতাড়ি ঝোড়ো কাকের মতো কোত্থেকে হে?'
'স্যাকরার বাড়িতে গিয়েছিলুম, রামদা।'
'কেন?'
চুপি চুপি বলিলাম, 'গয়না আনতে।'
'দিনকাল ভালো নয়— খুব সাবধান।'
বলিয়া, তিনি যেদিকে যাইতেছিলেন, সেইদিকেই চলিয়া গেলেন।
খানিক আগাইয়া একবার পিছনে ফিরিলাম। কিছু তফাতে আর-একজন লোক! একটু তাড়াতাড়ি পা চালাইয়া দিলাম।
গ
রাত্রিকালে শ্যামবাজারের রাস্তায় একেই লোকজন কম চলে, তাহাতে এখন আবার শীতকাল। চারিদিক নিসাড়। আমার পায়ের জুতা ঠুকিয়া ফুটপাতে বেজায় খটখট শব্দ হইতেছিল। কিন্তু, সেই সঙ্গে পিছনে আর-একজনেরও পায়ের শব্দ পাইতে লাগিলাম। আবার ফিরিয়া দেখি, সেই লোকটা তখনও আমার পিছনে পিছনে আসিতেছে। গ্যাসের আলোয় যতটা বোঝা গেল,— লোকটা খুব ঢ্যাঙা, মোটাসোটা, ষণ্ডা, একরকম গুন্ডা বলিলেই হয়। তার হাতেও একগাছা ছড়ি,— না, তাকে শীর্ণ সংস্করণের বংশযষ্টি বলাই যুক্তিসংগত— কেননা, সেরকম লাঠি হাতে থাকিলে কোঁচানো কোঁচা ঝোলানো এবং অভাগার মাথা ফাটানো— এই দ্বিবিধ কার্যই সুচারুরূপে নির্বাহিত হইতে পারে।
এ ডাকাত-টাকাত নয় তো— আমার পিছু নেয় নাই তো? পরখ করিবার জন্য একটা পানওয়ালার দোকানের সুমুখে গিয়া দাঁড়াইলাম। অকারণে এক পয়সার পান কিনিলাম। পিছনের লোকটাও রাস্তার উপরে দাঁড়াইয়া পড়িল। পান কিনিয়া আমি অগ্রসর হইলাম, সে-ও অমনি চলিতে শুরু করিল। আমি একটা গলির ভিতর ঢুকিলাম, সে-ও সঙ্গে সঙ্গে ঢুকিল।
না— কোনো সন্দেহ নাই, এ আমারই পাছু লইয়াছে। মনে হইল, স্যাকরার দোকানে আমার দিকে যে কটমট করিয়া চাহিয়া গিয়াছিল, এ নিশ্চয় সেই লোক না হইয়া আর যায় না! আমার বাড়ি দেখিয়া গিয়া দলের লোককে খবর দিবে, তারপর সকলে মিলিয়া আমার বাড়ি লুঠিয়া টাকা ও গয়না সব লইয়া যাইবে।
আমার বুক ঢিপঢিপ করিতে লাগিল;— এখন উপায়? ইহাকে কিছুতেই আমার বাড়ি দেখানো উচিত হইবে না। সেখানে গিয়া যদি গুলি-টুলি চালায়, তাহা হইলে একসঙ্গে ধনেপ্রাণে মজিব এবং মরিব।
চলিতে চলিতে হঠাৎ ডানদিকের এক সরু গলিতে ঢুকিয়া পড়িলাম। তারপর যত বিপথ-কুপথ এমনকী আঁস্তাকুড় মাড়াইয়া অন্ধকারে হাতড়াইতে হাতড়াইতে, হোঁচট খাইতে খাইতে, মাথা ঠুকিতে ঠুকিতে যেখানে গিয়া নাক ঘষিয়া গেল, সেখানে আমার মাথার চাইতেও উঁচু এক পাঁচিল! সেখানে আলোও নাই— পথও নাই। তা-ই তো, কী করি? কোনোদিকেই যে সুরাহা নাই। যেদিকেই তাকাই, চোখে খালি সরষে ফুল দেখি! খানিক ভাবিয়া স্থির করিলাম, যাহা থাকে কপালে—পাঁচিল তো টপকাই, ওপারে হয়তো রাস্তা আছে। নহিলে, যে পথে আসিয়াছি সে পথে আবার যদি ফিরি— নাঃ, ফেরার কথা ভাবিবামাত্র বুকটা ধড়াস করিয়া উঠিল। আমি তার চোখে ধুলা দিবার ফিকিরে আছি দেখিয়া ডাকাত নিশ্চয়ই বেজায় খাপ্পা হইয়া আছে। বিঘোরে প্রাণ খোয়ানোর চেয়ে পাঁচিল টপকানো ঢের ভালো অথচ সহজ।
দিলাম একলাফ! তারপর— ওপারে নামিতে-না নামিতে, যুগপৎ হৃদয় এবং শ্রবণভেদী চিৎকারে আকাশ এবং পৃথিবী কম্পিত— প্রকম্পিত করিয়া ও আমাকে স্তম্ভিত করিয়া দিল, 'ওরে বাবা রে— চোর, চোর— খুন করলে— খুন!'
সেই অহেতুক, অন্যায় ও অতীব চিৎকার আমাকে একেবারে পাথরের মতো অচল করিয়া দিল বটে, কিন্তু, অচল হইলে চলিতে হইবে,— কী করি? ওই যে দুমদাম করিয়া জানলা-দরজা খুলিয়া গেল না?
ওরা কারা— কেউ লাঠি হাতে, কেউ বল্লম, কেউ বঁটি হাতে— এ যে জ্বলন্ত উনুন ছাড়িয়া ফুটন্ত তেলে আসিয়া পড়িলাম! আমার সংবর্ধনার জন্যই কি এই বিপুল আয়োজন? না মহাশয়গণ, আপনারা আমাকে ভুল বুঝিয়াছেন, এরূপ সশস্ত্র অভ্যর্থনায় আমি একেবারেই অভ্যস্ত নই, অতএব—
দিলাম আর-এক লাফ,— যে পথে আসিয়াছি সেই পথে ফিরিতে!
কিন্তু লোকগুলো বিষম চালাক এবং চটপটে। আমি নিরাপদ ব্যবধানে যাইতে-না যাইতেই তাদের একজন খপ করিয়া আমার একখানা পা যত জোরে পারে ধরিয়া ফেলিল।
আমি কিন্তু ততোধিক চালাক! ইঁদুরের মতো জাঁতিকলে পড়িয়াই আমার মাথা খুলিয়া গেল! কৃত্রিম যন্ত্রণায় কাতরাইয়া উঠিলাম,— 'ছাড়ো বন্ধু, ছাড়ো, পা ছাড়ো হে! পায়ে ফোড়া— উঃ, উঃ!'
ফোড়ায় হাত পড়িলেই হাত সরাইয়া লইতে হয়— এ হচ্ছে সংস্কার! যে আমার পা ধরিয়াছিল, তাহার বজ্রমুষ্টি চকিতে আলগা হইয়া গেল এবং সঙ্গে সঙ্গে আমিও— সর্পমুখচ্যুত ভেকের মতো— ঝুপ করিয়া অন্ধকারে খসিয়া পড়িলাম।
যে আমাকে এমন বাগাইয়া পাকড়াও করিয়াছিল, আমাকে ছাড়িয়া দিয়াই হতাশভাবে পাঁচিলের ওপাশ হইতে সে বলিয়া উঠিল, 'ওই যাঃ!'— অর্থাৎ, তার মনে পড়িয়া গিয়াছে যে, সাধুর পায়ে ফোড়া হইলেই ছাড়িয়া দিতে হয় আর চোরের পায়ে যত বড়োই ফোড়া হোক-না কেন, সে পা আরও জোরে চাপিয়া ধরা কর্তব্য!
পা উঁচু এবং মাথা নিচু করিয়া অন্ধকারে যে কোথায় ঠিকরাইয়া পড়িলাম— ভগবান জানেন, কিন্তু আমার মনে হইল যেন, ধড়ের উপর হইতে আমার মাথাটির অস্তিত্ব একেবারেই বিলুপ্ত হইয়াছে! পড়িয়াই উঠিলাম— কেননা, মাথা থাক আর যাক— পা যখন আছে, তখন এ সময়ে বনবন বেগে সেই পদযুগল ব্যবহার করা ছাড়া মুক্তিলাভের 'নান্যঃ পন্থা'! এবার ধরিলে আর কিছুতেই বাঁচিব না— আগে প্রহার, পরে কারাগার! আমার এ ডাকাতের গল্প শুনিবে কে?
উঠিলাম এবং— বলা বাহুল্য— ঘোড়দৌড়ের ঘোড়ার মতোই ছুটিলাম, এখানে-সেখানে দু-চারবার ধাক্কা খাইয়াও ছুটিলাম, ইটে লাগিয়া দুবার হোঁচট ও একবার ডিগবাজি খাইয়াও ছুটিলাম, কাছা খুলিয়া ও এক পাটি জুতা হারাইয়াও ছুটিলাম— একেবারে গলির মোড়ে গিয়া থামিলাম— কারণ, থামিতে হইল।
—গলির মুখ জুড়িয়া দাঁড়াইয়া আছে সেই বিপুলবপু— ডাকাত!
আমাকে দেখিয়াই সে হুংকার করিয়া উঠিল, 'এই যে— পেয়েছি!'
আমি একদম থ! দুর্গানাম জপিতে জপিতে ভাবিলাম, কার খপ্পরে পড়া উচিত? যে আমার ঠ্যাং ধরিয়াছিল, তার হাতে,— না, উপস্থিত যে আমার সুমুখে মূর্তিমান, তার হাতে? একদিকে দমাদ্দম বেদম প্রহার ও অন্ধকার কারাগার— আর-একদিকে মুহূর্তে সংহার— ডাঙায় বাঘ ও জলে কুমির— শ্রেয় কী? চালাক মন বলিল, পুনর্বার মধ্যপথের যাত্রী হও— শ্রেয় হচ্ছে, পলায়ন (পারো যদি)।
কোনোরকম পূর্বাভাস না দিয়া আচমকা ভয়ানক চেঁচাইয়া উঠিলাম, 'কে তুমি?' তেমন জোরে জীবনে আর কখনো চেঁচাই নাই।
ডাকাত বিনা মেঘে এমন বেয়াড়া বজ্রনাদের আশা একেবারেই করে নাই— সে চমকাইল, ভড়কাইল, পিছনে হটিল। সেই ফাঁকে পাশ কাটাইয়া পুনর্বার আমার প্রাণপণ পলায়ন!
আমার প্রাণ পলায়নের দিকে নিবিষ্ট থাকিলেও, কান ছিল ঠিক ডাকাতের দিকেই। দ্রুত পদশব্দে বুঝিলাম, সে-ও ছুটিতেছে। ভাগ্যলক্ষ্মী বুঝি এইবার আমার পক্ষ ত্যাগ করিলেন।
মোড় ফিরিতেই দেখি, সামনে মস্ত এক গাছ। পণ্ডিত-কথিত আমাদের পূর্বপুরুষের অভ্যাস এখনও ভুলি নাই; সুতরাং একটুও ইতস্তত না করিয়া চটপট গাছের উপরে উঠিয়া গেলাম।
ও রাস্তায় বহুকণ্ঠে বিচিত্র ধ্বনি উঠিল, 'ধর বেটাকে!' 'মার, মার!' 'পুলিশ পুলিশ!' কিছুক্ষণ এমনি হট্টগোল চলিল। তারপর সব চুপচাপ।
প্রথমটা কিছুই বুঝিতে পারিলাম না। তারপর মনে পড়িল, যারা আমার চরণ ধারণ করিয়াছিল, চোর ধরিবার আশা নিশ্চয়ই তারা ত্যাগ করে নাই। আমাকে না পাইয়া, ধাবমান ডাকাতকে দেখিয়া, চোর-সন্দেহে নিশ্চয়ই তারা সে গোঁয়ারটাকেই পাকড়াও করিয়াছে! গাছের টঙে বসিয়া ঘণ্টাখানেক ধরিয়া তেত্রিশ কোটিকে গড় করিতে লাগিলাম। তারপর নামিলাম।
হে মা কালী, এ যাত্রায় প্রাণে ভারী বাঁচাইয়া দিয়াছ; আমি অকৃতজ্ঞ সন্তান মা, কালীঘাটে কাল তোমার নামে আমার পয়সায় জোড়া পাঁঠা পড়িবে।
ঘ
পাশের বাড়িতে মেয়েদের নেমন্তন্ন যাইতে একটু রাত হইয়াছিল বটে, কিন্তু তারা নেমন্তন্নে গিয়াছিল এবং গয়না পরিয়াই। গয়না আনিতে এত দেরি হইল বলিয়া গিন্নির নথ প্রথমটা কিঞ্চিৎ চঞ্চল হইয়া উঠিয়াছিল বটে, কিন্তু আমার ইতিহাস শুনিয়া— মুখ নাড়া তো দূরের কথা— অচিরেই তাঁকে নথ নাড়াও বন্ধ করিতে হইল। তিনি আমার গায়ে-মাথায় হাত বুলাইতে বুলাইতে মেয়েলি অভিধান হইতে এমন কতকগুলো সুনির্বাচিত শক্ত শক্ত বিশেষণ ডাকাতদের সপ্তগোষ্ঠীর উপরে প্রয়োগ করিলেন, যাহা শুনিলে যেকোনো ভদ্র দস্যু কানে হাত দিয়া লজ্জায় এবং অপমানে মাথা হেঁট করিতে বাধ্য হইত! সেইরাত্রেই গৃহিণীর মুখে আমার অপূর্ব বিপদ এবং অপূর্বতর উদ্ধারলাভের কাহিনি পল্লবিত ও অতিরঞ্জিত হইয়া পাড়াময় রটিয়া গেল।
পরদিন সকালে বসিয়া বসিয়া গত রাত্রির ব্যাপারখানা ভাবিতেছি, এমন সময় বাহিরে আমার নাম ধরিয়া কে ডাকিল। গলাটা অচেনা।
নীচে নামিয়া আসিলাম। কিন্তু সদর দরজায় গিয়া যে ডাকিতেছে, তাহাকে দেখিয়া আমার অন্তরাত্মা শুকাইয়া ও মাথা ঘুরিয়া গেল। এ যে সেই,— ডাকাত! এখানে কেন? প্রতিশোধ নিতে?
ঠকঠক করিয়া কাঁপিতে কাঁপিতে পায়ে পায়ে বাড়ির ভিতরদিকে পিছাইতে লাগিলাম।
ডাকাত হাত তুলিয়া আদেশ দিল, 'দাঁড়ান!'
হতভম্বের মতো দাঁড়াইয়া পড়িলাম।
'আমার পিঠটা আগে দেখুন'— বলিয়া সে জামা তুলিয়া গম্ভীর বদনে আপনার পৃষ্ঠদেশ আমাকে দেখাইল। সমস্ত পিঠটা জুড়িয়া লম্বা, গোল নানা আকৃতির কালশিরা পড়িয়াছে, কত ঘা লাঠি, জুতা ও ঘুসি খাইলে মানুষের পিঠের দশা অমনধারা সাংঘাতিক হইতে পারে, সেটা অনুমান করা অসাধ্য।
ডাকাত চোখ পাকাইয়া বলিল, 'আমার এ দশা কার জন্যে, বলুন দেখি?'
কিছু বলিলাম না— আমার কাঁপুনি ক্রমেই বাড়িয়া চলিল।
ডাকাত আমাকে নিরুত্তর দেখিয়া নিজেই নিজের প্রশ্নের উত্তর দিয়া কঠোরস্বরে বলিল, 'আপনার জন্যে— বুঝেছেন, আপনার জন্যে।'
আমি বোবা বনিয়া ঘাড় হেঁট করিলাম।
ডাকাত বলিল, 'পাড়ায় যা রটিয়েছেন, তা আমি শুনেছি। তা-ই শুনেই বুঝে নিয়েছি, আপনি কে!— জানেন মশাই, কাল আমায় গারদে রাত্রিবাস করতে হয়েছিল? জানেন মশাই, কত কষ্টে আমি খালাস নিয়েছি? জানেন মশাই, হাজতে কত বড়ো বড়ো মশা আছে? জানেন মশাই, কাল সারারাত সজাগ থেকে হাজার হাজার মশার সঙ্গে আমায় একা লড়তে হয়েছে?'— ডাকাত ক্রমে আমার কাছে আসিয়া, আমার মুখের কাছে মুখ আনিয়া উচ্চস্বরে বলিল, 'আর জানেন কি— আমি কে?'
মনে মনে বলিলাম, 'বলা বাহুল্য।'
ডাকাত বলিল, 'একজন গোবেচারি বরযাত্রী। আপনার পাশের বাড়িতে নেমন্তন্নে আসছিলুম। থাকি দূর পাড়াগাঁয়ে। ট্রেন ফেল করাতে ঠিক সময়ে বরযাত্রীর দলে মিশতে পারিনি। কনের বাড়ি চিনি না— পথের লোককে জিজ্ঞেস করে করে আসছিলুম। একটি বুড়ো ভদ্রলোক আপনাকে দেখিয়ে দিয়ে বললেন, ''ওঁর বাড়ি কনের বাড়ির পাশে— ওঁর পিছু পিছু যান।'' (ভদ্রলোকটিকে রামদাদা বলিয়া আন্দাজ করিলাম) তাই আসছিলুম মশায়ের পেছনে পেছনে।'
নিজের কানকে বিশ্বাস করিতে পারিলাম না— যা শুনিতেছি, এ কি সত্য? বেকুব বনিয়া বাধো বাধো গলায় বলিলাম, 'আপনি— আপনি কি ডা—!'
হো হো করিয়া হাসিয়া সে বলিল, 'আমি কেন— আমার চতুর্দশ পুরুষের মধ্যে কেউ ডাকাত হয়নি। আপনি ভেবেছিলেন আমি ডাকাত। যারা আমায় হাজতে পাঠিয়েছিল, তারা ভেবেছিল আমি চোর কি খুনে। কিন্তু কেউ ভাবলে না যে, আমি নিরীহ বরযাত্রী-মাত্র। আজ সকালে যখন বিয়েবাড়িতে এসে হাজির হলুম, তখন মশায়ের ''অপূর্ব উদ্ধারলাভ''-এর গল্প শুনে নিজের দুঃখে কাঁদব কী, হাসতে হাসতে পেটের নাড়ি ছিঁড়ে যাবার জোগাড়! অ্যাঁ! এ যে একেবারে আস্ত উপন্যাস!'
ভারতী, কার্তিক ১৩২৩ (অক্টোবর ১৯১৬)
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।