হেমেন্দ্রকুমার রায়
ক
চারদিকে বাড়ির পর বাড়ি,—ধোঁয়ায় কালো, ধুলোয় কটা, মরুর মতন নিষ্ঠুর!...
আকাশের নীলিমাও এমন বেরঙা যে সেদিকে চাইলেও মনের ভিতর গুমোট ঘনিয়ে আসে।
জানলার ধারে একটি ছোট্ট টেবিলের সামনে বসে রোজ আমি লেখাপড়া করি। মুখ তুলে কোনোদিকে চেয়ে দেখি না—চেয়ে দেখবার আগ্রহও হয় না। এই শুকনো, কর্কশ ইট-কাঠ-পাথরের একঘেয়ে অটলতা জন্মাবধি দেখে আসছি, এর মধ্যে নূতনত্বের মধু কোথায়!
একদিন হাতে কিছু করবার নেই। চুপচাপ বসে আছি। একবার সামনের দিকে চাইলুম। সামনে আমাদেরই একটি দোতলা ছাদ। ছাদের আলশেতে হঠাৎ দেখলুম, সবুজের একটুখানি আমেজ! চোখ অমনি সচকিত হয়ে উঠল! তৃষার্ত সাহারায় করুণার ঝরঝরানি দেখলে কে না আশ্চর্য হয়?
ভালো করে চেয়ে দেখি, আলশের ফাটলে একরত্তি একটি অশথের চারা তার দুলদুলে মাথা তুলেচে! কোন অজানা মুহূর্তে দূরান্তরের দখিন বাতাস আনমনে বয়ে যেতে যেতে অশথের এই বীজটি হয়তো এখানে ফেলে দিয়ে গেছে!... দখিন বাতাস, তোমাকে ধন্যবাদ।
খ
অশথ-চারা ধীরে ধীরে বাড়তে লাগল। চারদিকে শুষ্কতা, কাঠিন্য আর নির্দয়তা;— কোনো ধাত্রীর দরদভরা দৃষ্টি একদিনও তার উপরে পড়ল না,—তবু সে আপনা-আপনি ডাগর হয়ে উঠতে লাগল।
সকালের সোনালি রোদের কচি আভা লেগে সবুজ রংটি তার ঝলমল করতে থাকে, দুপুরের উত্তাপে নিজের পদতলের এতটুকু ছায়ার দিকে সে নেতিয়ে পড়ে, সন্ধ্যায় আবার ডাঙা হয়ে হাওয়ার তালে তালে সর্বাঙ্গে নাচের ছন্দ জাগিয়ে তোলে! পূর্ণিমার রাত্রি তাকে ছোটো বলে অবহেলা করত না,— জ্যোৎস্না এসে নিজের রুপোর ঝারি উপুড় করে তার গায়েও রূপের ধারা ঢেলে দিত। চাঁদের আলোতে মনে হত, সে যেন স্বপন-পরির শৈশব-খেলার দোলনা।
লিখতে লিখতে যখনই মুখ তুললুম— তখনই আমার নয়ন-মন যেন অপূর্ব পুলকে ভরে উঠত। আমি এই সবুজ চারাটির পানে অপলক চোখে চেয়ে থাকতুম। এ অশথ বয়সে শিশু, এর কোনো বিপুলতা নেই, বাহুল্য নেই, পূর্ণতা নেই। পাপিয়া এসে এর পাতার আড়ালে বসে সুরের আলাপ জমায় না, মাঠের পথিক এসে এর ছায়ার তলায় আশ্রয় খোঁজে না, কবির দৃষ্টিও এর মধ্যে সৌন্দর্যের সমারোহ পায় না। কিন্তু তবু, সবুজের এই বিন্দুটিকে দেখলেই, আমার মনের ভিতরে সুদূর বনভূমির হারানো শ্যামল স্মৃতিটুকু যেন পরিপূর্ণ মহিমায় জেগে উঠত! একে আশ্রয় করেই আমার মন যেন ইটের কোটর ছেড়ে, কোথাকার কোন বনে-বনান্তরে, মাঠে-তেপান্তরে, ধানের খেতে খেতে স্রোতস্বিনীর কূলে কূলে পথহারা পথিকের মতন হেসে-গেয়ে ঘুরে ঘুরে বেড়াত।
গ
সেদিন রেণু এসে হঠাৎ আমার ছোটো ঘরখানিকে আক্রমণ করলে। চারদিকে একবার চোখ বুলিয়ে বললে, 'মা গো, ঘরময় খালি ধুলো—কেতাবে ধুলো, কাগজে ধুলো, টেবিলে ধুলো! এই ধুলোতে আছ কী করে,—তুমি মানুষ, না জন্তু?'
আমি বললুম, 'প্রিয়তমে, যখন তোমার স্বামিত্ব লাভ করেচি, তখন আমি যে কী তা তুমি ভালোরকমই জানো! অতএব আমাকে জিজ্ঞাসা করা বাহুল্যমাত্র!'
'কিন্তু এই ধুলোর দিকে কি তোমার চোখও পড়ে না গা?'
'সখী, আমার নজর এত ছোটো নয় যে, বীণাপাণির কমলকুঞ্জ ছেড়ে সে এই তুচ্ছ ধুলো-জঞ্জাল নিয়েই মেতে থাকবে।'
'থামো কথার ভট্টাচায্যি, থামো! কথা বেচে যে খায়, তার সঙ্গে দুটো কথা কয়েও সুখ নেই! এখন সরে বসো দেখি, ধুলোগুলোকে ঝেঁটিয়ে চুলোয় পাঠিয়ে দি।'
এই বলে রেণু হাতের চুড়ি রুনু রুনু বাজিয়ে, চটপট ঝাড়ন চালিয়ে ঘরখানাকে সাফ করে ফেললে। তারপর জঞ্জালগুলো জানলা গলিয়ে ফেলে দিতে গিয়ে, বাইরের দিকে তাকিয়েই বলে উঠল, 'ও কী!'
'অমন করলে কেন?'
'ছাতের ওপরে অশথ গাছ গজিয়েচে!'
'তা গজিয়েচে বই কী!'
'আর তুমি চুপচাপ বসে আছ?'
'ছাতের ওপরে অশথ গজালে চুপচাপ না থেকে চেঁচিয়ে বাড়ি মাত করতে হয় নাকি?'
'যাও, যাও—'
'যাব আবার কোথায়?'
'একখানা কাটারি নিয়ে এসো!'
'কাটারি!'
'হ্যাঁ গো হ্যাঁ! এইবেলা শিগগির ওটাকে কেটে ফেলো, নইলে ভালো করে শেকড় গেড়ে বসলে, কাটলেও আবার ও গজাবে!'
'আহা, ও কাটাকাটিতে আর কাজ কী! একটা ছোটো গাছ—'
'আহা, কী বুদ্ধি তোমার, বলিহারি যাই! খালি বই লিখেই বাহাদুরি নেবার ফিকিরে আছ,—আর এটুকু বুঝচ না যে, ওই অশথ যদি একবার শেকড় গেড়ে বসে, তাহলে বাড়ির ভিত নড়বড়ে হয়ে পড়বে?'
'হুঁ, হুঁ,— ঠিক! আচ্ছা, আনো তবে কাটারি!'
ঘ
কাটারি নিয়ে ছাদে গেলুম।
নতুন বর্ষার জল পেয়ে তরুণ অশথ দিব্যি তাজা হয়ে উঠেচে! নিজের ছোটো ছোটো পর্ণপুট বাড়িয়ে সে দাঁড়িয়ে ছিল—আকাশের নবীন মেঘের কাছ থেকে যেন আরও তৃষ্ণার জল পাবার আশায়।
মনে মনে বললুম, 'ওরে দুষ্ট, ভিতে ফাট ধরাবার ফিকিরে এখানে তুমি জাঁকিয়ে বসেচ? রও, দেখচি তোমাকে!'
মাথার উপরে কাটারি তুললুম।
আচম্বিতে একটা দমকা হাওয়া এল—সঙ্গে সঙ্গে অশথের চারা থরথর করে কাঁপতে লাগল!
মনের ভেতর থেকে যেন কে বলে উঠল, 'আহা, আহা,— করো কী! তোমার এই ইট-কাঠ-পাথরের স্তূপে ও যে বনলক্ষ্মীর শ্যামল বার্তা বহন করে এসেচে—তোমাদের শুকনো, তৃষিত প্রাণকে স্নিগ্ধ-সরস করবে বলে। কোন প্রাণে একে তুমি কাটবে? দেখো, তোমার মতো এরও জীবন আছে! রোদে এও এলিয়ে পড়ে, আলোতে এও খুশি হয়, দখিনায় এও নাচে-গায়, তেষ্টায় এও জল চায়,—একে মেরো না, একে মেরো না!'
কাটারিখানা নামিয়ে, অশথের চারার দিকে তাকিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলুম। তখনও তার কাঁপুনি থামেনি। ছোটো ছোটো পাতায় অতি-মৃদু মর্মরানি শুনলুম—যেন ভয়ের আর্তবাণী!
জানলা থেকে রেণু ডেকে বললে, 'হ্যাঁ গো, অবাক হয়ে ভাবচ কী? ও আপদ চুকিয়ে দাও-না!'
নিজের দুর্বলতায় নিজেরই হাসি এল। সামান্য একটা অশথের চারা, তাও কাটতে আবার এত ইতস্তত!... তুললুম কাটারি, মারলুম তার গোড়া ঘেঁষে এক কোপ।
অশথের ছোটো চারাটি ছিটকে আমার পায়ের উপরে এসে লটকে পড়ল।... পা ভিজে গেল তার কাটা দেহের রসে... না, সে তো রস নয়, আমার মনে হল, পায়ের উপর দিয়ে যেন কোন হত্যা-করা জীবের রক্তধারা গড়াচ্ছে!
আঁতটা ছাঁৎ করে উঠল! কোনোদিকে না চেয়ে তাড়াতাড়ি আমি পালিয়ে এলুম— দোষীর মতো, খুনির মতো!
ভারতী, ফাল্গুন ১৩২৯ (ফেব্রুয়ারি১৯২৩)
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।