হেমেন্দ্রকুমার রায়
(রুশ ঔপন্যাসিক ভাসিলি নেমিরোভিচ ডানশেঙ্কো হইতে)
রুশ ও তুর্কি উভয় দলের সৈন্যেরা সবেমাত্র গুলিবর্ষণ শুরু করিয়াছে।
চারিদিকে এমনি জমাট কুয়াশা যে, শত্রুপক্ষ প্রায় নজরের আড়াল হইয়াছে। একসঙ্গে জমায়েত বিশৃঙ্খল সৈন্যদিগকে দূর হইতে কতকগুলি টুকরা মেঘের মতো দেখাইতেছিল। সেদিকে চাহিয়া চাহিয়া কসাকেরা মিছা তাহাদের দৃষ্টিকে ব্যথিত করিতেছিল; কারণ, এমন তীক্ষ্ন দৃষ্টি কাহার আছে যে, আঁধারের সে যবনিকা ভেদ করিতে পারে!
প্রথমে তুর্কিরাই অগ্নিবৃষ্টি শুরু করিয়াছিল। রুশেরা শুধু জবাব দিতেছিল। কোনো পক্ষই শত্রুকে দেখিতে পাইতেছিল না। সকলের অগোচরে শত্রুরা গুঁড়ি মারিয়া পাছে একেবারে কাছে আসিয়া পড়ে, সেই ভয়ে অগ্নিবৃষ্টির বিরাম ছিল না। এমন অবস্থায় উভয় পক্ষের সৈন্যেরা একরূপ নারাজ হইয়াও, পরস্পরের প্রতি এলোপাথাড়ি গুলিবৃষ্টি করিয়া জানাইয়া দেয় যে, তাহারা খুব কাছে কাছেই আছে!
রজনি ধীরে ধীরে নামিয়া আসিতেছিল,— তুষারক্ষেত্রের উপর বিক্ষিপ্ত মৃতদেহগুলির উপরে একটা আঁধারের আস্তরণ বিছাইয়া দিয়া! রাত্রি যত গভীর হইয়া উঠিল, অগ্নিবৃষ্টিও তত কমিয়া আসিতে লাগিল এবং বন্দুকের শব্দও চারিদিককার স্যাঁতসেঁতে ভিজা আবহাওয়ায় ততই থামিয়া পড়িতে লাগিল। শেষে অন্য সব শব্দ বন্ধ হইয়া গেল। মাঝে মাঝে শুধু আহতের আর্তনাদ, বা মরন্ত ঘোড়ার চিৎকারে রণক্ষেত্রের নীরবতা ভাঙিয়া যাইতেছিল। সারাদিনের হাঁটুনি ও লড়াইয়ের শ্রমে সৈন্যদের দেহ একেবারে ভাঙিয়া পড়িয়াছিল। এমনকী, মৃত সঙ্গীদের সরাইয়া রাখিবার ভাবনাও তাহাদের আর ভাবিবার অবসর ছিল না। তখন তাহাদের প্রাণে শুধু একটিমাত্র কামনা জাগিতেছিল,— সে শুধু বিশ্রামের কামনা, নিদ্রার কামনা!
'নূতন বছরের আমোদ-আহ্লাদ সব মাটি!'— কথাগুলি যিনি বলিলেন, তিনি একজন কর্নেল, আকার ক্ষুদ্র হইলেও দেখিতে বেশ বলিষ্ঠ। কথাগুলি যাঁহাকে বলা হইল, তাঁহার আকৃতি দীর্ঘ, কৃশ; একখণ্ড বস্ত্রের বন্ধনীতে তাঁহার একখানা হাত ঝুলিতেছিল। একটি তুর্কি বাড়ির বারান্দায় তাঁহারা দুইজনে বসিয়া ছিলেন।
'কপাল বড়ো মন্দ হে! চিঠিপত্রও কিছু পাওয়া গেল না।'
'সেজন্যে আমি বড়ো মাথা ঘামাচ্চি না। যুদ্ধক্ষেত্রে ডাকঘরের বন্দোবস্ত যে কেমন চমৎকার, তা আমার বিলক্ষণ জানা আছে!'
'তবু ক-লাইন চিঠি পেলে মনটা কিছু খুশি থাকে। লড়াই করতে করতে বড়োদিনটা কোথা দিয়ে কেটে গেল, তা জানতেও পারলাম না, আবার আজকের হালখাতার দিনটাও তেমনি করেই কেটে গেল আর কী! হা ভগবান! দেশের বাড়িতে এখন কীরকম হাসিখুশিই চলছে! আমি চোখ বুজলেই যেন দেখতে পাই, ছেলেপুলেরা আহ্লাদে আটখানা হয়ে নেচেকুঁদে বেড়াচ্ছে! আমার বোধ হয়, তোমার স্ত্রী আর ছেলে-মেয়েরাও এতক্ষণে আমাদের বাড়িতে এসেছে! আমাদের কোনো খবর না পেয়ে নিশ্চয়ই তারা ভারী ভাবিত হয়ে উঠেছে—'
'আচ্ছা, তোমার হাত এখন কেমন?'
'খুব ভালো; তবে মন্দও হতে পারে, ভালো হতে পারে!'
'বেশ তো, এই অছিলায় তুমি ছুটির দরখাস্ত করো-না কেন?'
'বলো কী! ফৌজে এখন কর্মচারীদের অভাব হয়েছে! বিশেষ এতকাল আমরা একসঙ্গে আছি যে, ছাড়াছাড়ির কথা মনেও আমি ভাবতে পারি না। না— আমি যাব না। যদি আমরা কখনো ফিরতে পারি, তাহলে দুজনেই একসঙ্গে ফিরব।'
রাত্রি তখন বেশ থমথমে হইয়া আসিয়াছে। গাঁয়ের পথে হঠাৎ একটা জ্বলন্ত মশালের রাঙা আলো এবং একজোড়া গোঁফে দুই ভাগে ভাগ-করা একখানা মুখ দেখা গেল।
মশালের দিকে চাহিয়া কর্নেল বলিলেন, 'প্যান্টেলিফ আসছে, না?'
সেই গাঢ় অন্ধকারকে সমুজ্জ্বল করিয়া আঙিনায় ঢুকিল। একজন ঘোড়সওয়ার কর্নেলের সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইল।
কর্নেল জিজ্ঞাসা করিলেন, 'তুমি কোথায় যাচ্ছ?'
'ফাঁড়িতে, হুজুর! লড়াই ফের শুরু হয়েছে!'
'আচ্ছা, যাও। আরে— এ কী?'
আঙিনায় জনকয়েক সৈন্য ধস্তাধস্তি করিতেছিল।
প্যান্টেলিফ মশালটা উঁচু করিয়া তুলিয়া ধরিল। সেই আলোয় দেখা গেল, কয়জন লোক কাহাকে ঘিরিয়া দাঁড়াইয়া আছে।
'ওরে বুড়ো নেড়ে,— আয় বলছি, আয়! তোদের জ্বালায় কি একদণ্ড সুস্থির থাকতে পারব না? নিপাত যা— তোরা নিপাত যা!'
কর্নেল উঠিয়া পড়িয়া বলিলেন, 'ওহে বাপু— সব ওখানে দাঁড়িয়ে হচ্ছে কী?'
'হুজুর, এ একজন তুর্কি। লোকটা ঝোপের নীচে লুকিয়ে ছিল, আমরা হঠাৎ ব্যাটাকে ধরে ফেলেছি!'
'ঝোপের নীচে লুকিয়ে ছিল, কীরকম?'
'কাপুরুষের মতো জড়সড় হয়ে ঝোপের তলায় পড়ে ছিল, হুজুর! লেফটেন্যান্ট ভাসিলিয়েফ বললেন, একে আপনার কাছে হাজির করতে। এর নাম হচ্চে মামুদ।'
মশালটা বন্দির মুখের সামনে ধরা হইল; তাহার নাক খুব লম্বা, গোঁফ বেশ ঘন, নাকের মাঝখানটা ফুলা। কপালে একটা নূতন ক্ষত। পুরানো তাঁবু হইতে ছিঁড়িয়া- লওয়া একখানা ময়লা কাপড়ে তাহার মাথার ক্ষত বাঁধা।
বন্ধুর দিকে ফিরিয়া কর্নেল সোল্লাসে বলিলেন, 'বাহবা কী বাহবা! আমরা যে একজন হোমরাচোমরা অফিসারকে পাকড়াও করেছি!'
তাঁহার বন্ধু মেজর বন্দির দিকে তীক্ষ্ন নেত্রে মনোযোগের সহিত চাহিয়া ছিলেন।
'শুধু হোমরাচোমরা অফিসার নয় হে, লোকটা আমাদের চেনাশুনো। তুমি কি একে চিনতে পারছ না? ওর কপালের কাটা দাগটার দিকে চেয়ে দেখো দেখি! ওর বাঁ হাতে নিশ্চয়ই দুটো আঙুল নেই!'— সৈন্যদের দিকে ফিরিয়া তিনি হুকুম দিলেন, 'ওরে, ওকে ওর বাঁ হাতটা বার করতে বল তো!'
'হাঁ— হাঁ— ঠিক! এ হচ্ছে মামুদ বে, একজন তুর্কি কর্নেল।'
'হুঁ— ফেরার বন্দি। লোকটার বরাত ভারী খারাপ দেখছি। প্রধান সেনাপতি বোধহয় ওকে গুলি করে মারতে হুকুম দেবেন। আহা, বেচারার জন্যে আমার দুঃখ হচ্চে। ওকে এখানে নিয়ে আয় তো রে! তোরা খালি একজনকে এখানে পাহারায় রেখে যত শিগগির পারিস, সব সরে পড়!'
মামুদ বে ভিতরে আসিয়া দাঁড়াইলেন। দ্বারের কাছে একজন সিপাহি বন্দুক ঘাড়ে দাঁড়াইয়া রহিল।
বন্দিকে একটি দৈত্যবিশেষ বলিলেও চলে। তাঁহার বয়স পঞ্চাশের কিছু বেশি। চোখ দুটিতে ভারী একটা দুঃখের ভাব মাখানো। গোঁফজোড়া পাকিয়া ধবধবে হইয়া গিয়াছে। থাকিয়া থাকিয়া তাহা কাঁপিয়া উঠিতেছিল। তাঁহার পরনে ছেঁড়াখোঁড়া কাপড়। কাঁধের উপরকার কাপড়খানায় টাটকা রক্তের দাগ লাগিয়া রহিয়াছে!
কর্নেল কঠোরস্বরে কহিলেন, 'বন্দির কাঁধে ও কীসের রক্ত?'
'হুজুর, লোকটা যখন ঝোপের তলায় ছিল, তখন চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে আমাদের গলা প্রায় ভেঙে যাবার জোগাড় হয়েছিল। আমাদের ডাকাডাকির উত্তরে ও তার পা দুটোকে আমাদের দিকে রেখে গঙ্গাফড়িঙের মতো শুধু নাচাচ্ছিল। কাজেই কিরিলিয়েফ শেষটা মহাখাপ্পা হয়ে ওকে বেয়নেটের এক খোঁচা না দিয়ে আর থাকতে পারলে না। খোঁচা খেয়ে ও তখন সুড়সুড় করে বেরিয়ে পড়ল! লেফটেন্যান্ট ভাসিলিয়েফ মানা না করলে আমরা তখনই ওর দফা রফা করে দিতাম।'
'সাইমন, বন্দির জন্যে একখানা চেয়ার নিয়ে এসো!'
বন্দি আসনের উপর বসিলেন। তাঁহাকে এখন আরও ছন্নছাড়ার মতো দেখাইতেছিল। এই নূতন হুকুমদারদের কাছে আসিয়া তিনি বড়ো বেশি সান্ত্বনা পাইয়াছেন বলিয়া মনে হয় না। তাঁহার নাক যেন গোঁফজোড়ার ভিতরে বসিয়া গিয়াছিল, মাথা দুই কাঁধের মধ্যে অদৃশ্য হইয়াছিল!
মেজর তুর্কি ভাষা জানিতেন। তিনি বলিলেন, 'এর আগে আমাদের দেখাশোনা হয়েছে, না? আপনার নাম কি মামুদ বে নয়?'
তুর্কির মাথা যেন আরও নীচে নামিয়া গেল। তাঁহার ভাবগতিক দেখিয়া বেশ বুঝা গেল যে, তিনি একেবারে নিরাশার শেষ সীমায় আসিয়া পৌঁছিয়াছেন।
'যদি আমার ভুল হয়ে থাকে, বলুন! আপনি কি অন্য লোক?'
'আমি কখনো মিথ্যা বলিনি'— বন্দি উঠিয়া দাঁড়াইলেন। 'কাল আমি পালিয়ে এসেছি। আজ আবার আমি আপনাদের কাছে বন্দি হলুম। পায়ে হেঁটে বেশি দূর পালানো ভারী শক্ত'— বন্দি ম্লান হাস্য করিলেন— 'বিশেষ, পায়ে আর মাথায় চোট লাগলে তো কথাই নেই। এখন আবার আমার কাঁধ জখম হয়েছে,— সেটা—'
কণ্ঠস্বরে পদোপযুক্ত কাঠিন্যপ্রকাশের বিফল চেষ্টা করিয়া মেজর বলিলেন, 'বসুন আপনি। এ কথা জানেন তো, যে যুদ্ধের দস্তুর হচ্ছে—'
'আমাকে তা মনে করিয়ে দেবার দরকার নেই। আপনাদেরই জিত। আমাকে গুলি করে মারবার হুকুম দিন। সমস্ত দায়িত্ব ঘাড়ে নিয়েই আমি পালিয়েছিলাম। মৃত্যুখেলায় আমি হেরেছি। মৃত্যুই আমার দণ্ড।'
মেজরের স্বর করুণায় কোমল হইয়া আসিল।
'আপনার সঙ্গে কি কোনোরকম খারাপ ব্যবহার করা হয়েছে?'
'কিছু না। যাঁর কাছে আমি বন্দি ছিলাম, তাঁর চেয়ে দয়ালু লোক আর থাকতেই পারে না। তাঁর নিজের বিছানায় আমাকে তিনি শুতে দিয়েছিলেন। তাঁর কাছ থেকে আমি খাবারদাবার সব পেয়েছিলাম। তিনি আমাকে শত্রুর মতো না দেখে ভাইয়ের মতোই দেখেছিলেন।'
'তবে, আপনি কি ভেবেছিলেন যে, যখন আপনাকে রুশিয়ায় পাঠানো হবে, তখন আপনি কষ্ট পাবেন?'
'আমি জানি, রুশেরা তাদের বন্দিদের সঙ্গে কুব্যবহার করে না।'
'তবে আপনি পালালেন কেন?'
'কারণ জেনে এখন লাভ কী? আমি আপনাদের হাতের মুঠোয়। আপনারা কর্তব্য পালন করুন; কিন্তু কাজটা শীঘ্র শেষ করে ফেলুন— শীঘ্র শেষ করে ফেলুন।'
বৃদ্ধ তুর্কির বুকের মধ্য হইতে যেন একটা রুদ্ধ ক্রন্দনের অস্ফুট স্বর ফুটিয়া উঠিল। তিনি যেন এখনই একেবারে ভাঙিয়া পড়িবেন।
'কী আশায় যে আপনি পালাচ্ছিলেন, আমি তো কিছুতেই সেটা বুঝতে পারছি না। তুর্কিরা সব জায়গাতেই রণে ভঙ্গ দিচ্ছে। আপনাদের ফৌজে আহারের সংস্থান নেই। শহর ছেড়ে বাসিন্দারাও পালাচ্ছে। আপনার আর কিছুকাল ধৈর্য ধরে থাকা উচিত ছিল। এ যুদ্ধ শীঘ্রই শেষ হবে। তখন আপনাকে ছেড়ে দেওয়া হত; আপনিও অনায়াসে ঘরে ফিরে যেতে পারতেন।'
'ঘরে? কোথায় ঘর?'
'অপরাধ নেবেন না। আপনার কথা আমি বুঝতে পারছি না।'
'বুঝিয়ে দিচ্ছি। কী যে হচ্ছে, আমি তা ঠিক জানতে পারছি। আমি ভুল বলছি না। ইস্তানবুল থেকে হুকুমনামা বেরিয়েছে যে, রাজ্যের সব লোক যেন এশিয়া মাইনরে চলে যায়। অন্য অন্য সকলের সঙ্গে হয়তো আমার পরিবারবর্গও এশিয়া মাইনরে গিয়েছে। তাদের আমি কী করে আবার দেখতে পাব? বেশি বলা বাহুল্য। আমার যা কর্তব্য ভেবেছি, আমি তা করেছি। এখন আপনাদের কর্তব্য আপনারা করুন। মৃত্যুর হাত থেকে কোথাও ছাড়ান নেই। যা হবার, তা হবেই। এ যে কপালের লেখা! নিয়তি যেটুকু সময় দিয়েছে, তার বেশি কেউ বাঁচতে পারে না। আমি যা করেছি, তা আমার নিজের জন্য করিনি—'
বন্দির স্বরভঙ্গ হইল। হতাশভাবে তিনি মাথা নাড়িলেন।
মেজর নম্রভাবে কহিলেন, 'আপনি আপনার পরিবারের কথা বলছেন। আমারও পরিবার আছে।'
'আপনি যে আবার পরিবারের কাছে ফিরে যেতে পারবেন, এজন্যে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করুন। আপনি যে শত্রুর হাতে বন্দি হননি, এজন্য ভগবানকে ধন্যবাদ দিন।'
'আমি যে আপনাকে এত কথা জিজ্ঞাসা করছি, এসব আপনার পরিবারের মঙ্গলের জন্য, জানবেন।'
বহুক্ষণ সকলে স্তব্ধ রহিলেন।
কর্নেল বলিলেন, 'ওহে, জিজ্ঞাসা করো-না, ওঁর ক-টি ছেলে-মেয়ে!'
অতি অস্পষ্টস্বরে মামুদ বলিলেন, 'চারটি।'
'তারা কি বেশ বড়োসড়ো?'
'না— সব ছোটো। আমার বড়োমেয়েটি এই সবে ছ-বছরে পড়েছে।'
মেজর আপনমনে বলিলেন, 'আমারও বড়োমেয়েটির বয়স ঠিক ছয়।'
মেয়ের কথা মনে করিয়া বন্দি প্রফুল্ল হইয়া বলিলেন, 'আমার মেয়ে কালে রূপবতী হবে। তার ডাগর চোখ দুটি এখনই ঝলকে ওঠে। পাঁচ মাস হল, তাকে শেষ দেখেছি; বিদায় নেবার সময় সে কেঁদেকেটে রসাতল বাধিয়ে তুলেছিল। আমার ছোটোখোকাটির বয়স এখনও এক বছর হয়নি। আমি যখন বাড়ি ছেড়ে আসি, সে বেচারি তখনও হাঁটতে শেখেনি। তারা সবাই আদ্রিয়ানোপলের কাছে থাকে; সেখানে আমার চমৎকার একখানি বাড়ি আর বাগান আছে। আমরা বড়ো সুখে ছিলাম। তারপর এই যুদ্ধ বাধল। যে লড়াই বাধিয়েছে, আমার অভিশাপ তাকে দগ্ধ করুক! ভগবান ন্যায়বান। যারা এই রক্তের সাগর বইয়েছে আর আমাদের নিষ্পাপ সুখের সংসারে আগুন জ্বেলেছে, ভগবান নিশ্চয়ই তাদের শাস্তি দেবেন।'
মেজর বলিলেন, 'আপনার কথা ঠিক। এরকম যুদ্ধে কার উপকার হয়? আমি বার বার মনে মনে এই কথা নিয়ে তোলাপাড়া করে দেখেছি। আমারই কথা ধরুন না হয়! মনে করুন, আমি যদি কাল মরে যাই, তবে আমার পরিবারের কী হাল হবে?'
জেরা করার ধরনধারণ একেবারে বদলিয়া গেল। তিনজনে একসঙ্গে বসিয়া বসিয়া এখন আপন আপন পরিবারের সুখ-দুঃখের কথা লইয়া নাড়াচাড়া করিতে লাগিলেন। মেজর বন্দির সকল কথা তরজমা করিয়া কর্নেলকে বুঝাইয়া দিতে লাগিলেন। কর্নেলও বন্দির প্রতি গভীর সহানুভূতি প্রকাশ করিলেন।
কর্নেল কহিলেন, 'ওঁকে বলো যে, ছেলে-মেয়েদের ভালোর জন্যে উনি রুশিয়ায় না গিয়ে এরকমভাবে জীবনকে বিপন্ন করতে গেলেন কেন? মাসকতকের হেরফেরে এমন আর কী হত?'
মামুদ দুঃখিতভাবে বলিলেন, 'আমার দেশের লোকেরা,— বিশেষ স্ত্রীলোকেরা যদি রুশদের ভালো করে জানত! তাহলে যতদিন আমরা না ফিরে যেতাম, ততদিন তাঁরা বাড়িঘর ও ছেলে-মেয়েদের নিশ্চিন্ত হয়ে দেখতে-শুনতে পারত। কিন্তু তারা তো তা বোঝে না। আর দিনকয়েকের মধ্যে বাসিন্দারা সবাই পালাবে; আপনাদের সৈন্যেরা যখন আদ্রিয়ানোপলে গিয়ে হাজির হবে, শহর তখন একেবারে খালি হয়ে পড়বে। শহরে পড়ে থাকবে শুধু জনকতক ক্রিশ্চান।
'কেন আমি পালিয়ে এসেছি? আমার স্ত্রী আর ছেলে-মেয়েদের বাঁচাতে। যাদের আমি ভালোবাসি, তাদের কী দশা হবে, আপনি কি তা জানেন? না, জানেন না। বলছি, শুনুন। আমার স্ত্রী আতঙ্কে সারা হয়ে, বাড়ি, ঘর, বাগান, সব ছেড়ে পালাবে। যা পড়ে থাকবে, গ্রিক কি আর্মেনিয়ানরা তা লুঠতরাজ করবে। আমার স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে ইস্তানবুলে যাবে বটে, কিন্তু সরকার থেকে সে কোনো সাহায্য পাবে না। আর এতগুলো হতভাগ্য পরিবারকে সাহায্য করবার টাকা সরকার কোথা থেকেই বা পাবেন? সরকার শুধু তাদের এশিয়া মাইনরে, কিংবা ''স্কুটারি''তে পাঠিয়ে দেবেন। তারপর আমার পরিবারের কথা সকলেই ভুলে যাবে। একাকিনী অবলা রমণী সে, এমন বিপাকে পড়লে কী করবে বলুন তো? তার হাতে একমাত্র উপায় আছে। আমার মেয়েগুলি নীরোগ সুন্দর, সে তাদের বেচে ফেলবে। বাঁদির মতো পরের ঘরে তারা মানুষ হবে, বাপের নাম পর্যন্ত জানবে না, শুনবে না। বড়ো হলে, কোনো ধনীর কাছে আবার তাদের বিক্রি করা হবে। আমার ছেলেরাও দাস হবে। আর আমার স্ত্রী? তার দুঃখ কমে গেলে সে-ও কোনো হারেমে গিয়ে ঢুকবে। আমি যদি এক বছর পরে দেশে ফিরি, তখন গিয়ে কী দেখতে পাব? কিছু না! না বাড়িঘর, না স্ত্রী, না পুত্র-কন্যা! তাদের যে কী দশা হল, তাও আমি জানতে পারব না। তাদের খোঁজ দিতে পারে, এমন কোনো লোককেও আমি দেখতে পাব না। আমি আমার সব হারাব। আমার বাড়ির মালিক হবে অন্য কেউ। আপনি আমাকে জিজ্ঞাসা করেছেন, কেন আমি পালিয়েছি! মনের যাতনা সইবার সাহস আমার আর ছিল না, তাই আমি পালিয়েছি।'
মেজর বলিলেন, 'হ্যাঁ— হ্যাঁ। যুদ্ধ ভারী নিষ্ঠুর, ভারী নিষ্ঠুর ব্যাপার।'
বন্দি আবার বলিলেন, 'এই হতচ্ছাড়া যুদ্ধের আগে আমি বাড়ির বাইরে সহজে পা বাড়াতাম না। আমি আমার সব ছেলে-মেয়েগুলির জন্মকালে উপস্থিত ছিলাম। দিনে দিনে তাদের আমি বাড়তে দেখেছি। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে তাদের বুদ্ধি কীরকমে পেকে উঠেছে, তাও আমি লক্ষ করে দেখেছি। তাদের সবগুলিই কখন আমাকে সর্বপ্রথমে চিনতে পেরেছিল, আমার তা বেশ মনে আছে। কখন তারা প্রথমে কথা কইবার চেষ্টা করেছিল, আমার প্রাণে তা গাঁথা আছে। খুদে খুদে তাদের পলকা পাগুলি, পাখির ছানার মতোই তাদের ছোট্ট মুখের সেই রাঙা রাঙা হাঁ,— সমস্ত— সমস্ত— আমার সমস্তই মনে আছে। প্রতিদিন এখন কে তাদের খাওয়াবে-দাওয়াবে? তাদের গর্ভধারিণী? সে অভাগিনিও যে এখন বিপাকে পড়ে! আগে—'
বন্দি কথা শেষ করিতে পারিলেন না। তাঁহার শক্তি ও সাহস, দুইই লুপ্ত হইয়াছিল।
কর্নেল অত্যন্ত অসন্তাোষের সহিত ঘরের মধ্যে পায়চারি করিতে করিতে বলিলেন, 'বৃদ্ধ, আপনার আর আমাদের মাঝে তফাতটা কী? হ্যাঁ, আমরা সকলেই ওই এক গর্তে পড়ে আছি।'
মেজর বলিলেন, 'আচ্ছা, বন্দিকে নিয়ে আমরা কী করব? এঁকে আজই সেনাপতির কাছে না পাঠিয়ে, আমাদের কাছে রাখলে হয় না?'
'হ্যাঁ— হ্যাঁ— বেশ তো! আজ উনি এখানেই থাকুন। ঠিক কথা— যা বলেছ। আজ উনি থাকুন।'
'কাল পর্যন্ত ওঁকে আমাদের সঙ্গে রাখা চলবে তো?'
'কেন চলবে না! উনি এখানেই থাকুন, আমি সাইমনকে ওঁর জন্যে বিছানাপত্তর তোয়ের করতে বলব। চার-চারটি সন্তান! আহা, চার-চারটি সন্তান!'
'আচ্ছা, সেনাপতি যদি ওঁকে গুলি করে মারতে হুকুম দেন?'
'হুঁ, কী বলচ— সেনাপতি যদি ওঁকে গুলি করে মারতে চান? এসবই দৈবের উপর নির্ভর করে। বন্দির যে চারটি ছেলে-মেয়ে, সেনাপতিকে কি এ কথা কোনোগতিকে জানিয়ে দেবার উপায় নেই?'
'তোমার কি মনে হয় না যে, যুদ্ধের মধ্যে অনেক ঘৃণাকর ব্যাপার আছে?'
'অ্যাঁ, তা— যা বলেছ,— হ্যাঁ, আছে বই কী!'— কর্নেল বড়োই অপ্রকৃতিস্থ হইয়া উঠিলেন— 'কিন্তু কর্তব্য তো পালন করতেই হবে। আমরা শপথ করেছি, মনে আছে তো?— যাক, সব চুলোয় যাক! এ লক্ষ্মীছাড়া ব্যাপারটা মন থেকে এখনকার মতো মুছে ফেলতে পারলে অন্তত কাল পর্যন্ত শান্তিতে থাকা যাবে। বন্দি মদ খান কি না, জিজ্ঞাসা করো। উনি আজ রাতে আমাদের সঙ্গেই খাওয়াদাওয়া করবেন।'
কর্নেল ও মেজরের সহিত বন্দি শয়ন করিলেন। বাহির হইতে মাঝে মাঝে দুই-চারিটা বন্দুকের আওয়াজ আসিতেছিল। তা ছাড়া আর সব নীরব-নিঝুম।
মেজরের ঘুম চটিয়া গিয়াছিল। তিনি কেবলই এপাশ-ওপাশ করিতেছিলেন। লেপখানা একবার ছুড়িয়া ফেলিতেছিলেন, আবার গায়ের উপর টানিয়া লইতেছিলেন। এইবার লইয়া দশবার তিনি খবরের কাগজ পড়িবার চেষ্টা করিলেন; কিন্তু কাগজখানা হাত হইতে খসিয়া পড়িয়া গেল। মাঝে মাঝে তিনি ঘুমন্ত বন্দির দিকে চাহিয়া দেখিতেছিলেন; অভাগার ওষ্ঠ হইতে দুঃস্বপ্নের অস্পষ্ট ভাষা বাহির হইতেছিল। মেজরের চিন্তাও ঘুরিয়া ঘুরিয়া ক্রমাগত সন্তানের দিকে ফিরিয়া আসিতেছিল। বন্দির সন্তান নয়,— তিনি ভাবিতেছিলেন, নিজের সন্তানের কথা।
অবশেষে, যখন তিনি চোখের পাতা মুদিলেন, তখনও তিনি সে ভাবনা ভুলিতে পারিলেন না। তাঁহার চিন্তা সেই রক্তাক্ত রণক্ষেত্র হইতে হাজার হাজার মাইল পার হইয়া, যেখানে, চারিদিকের নিরালা শস্যক্ষেত্রের শ্যামলতার মাঝে তাঁহার শান্তিপূর্ণ পরিবারবর্গ বাস করিতেছিল, সেইখানে ছুটিয়া গেল। সেখানে যুদ্ধ নাই, মৃতদেহ নাই, ধ্বংসপাথারে রক্তের ঢেউ নাই!
হঠাৎ তাঁহার মনে হইল, তিনি একটি মাঝারি গোছের ঘরে গিয়া হাজির হইয়াছেন। এককোণে ছোটো বাতির মৃদু আলোয় দুটি ছোটো বিছানা দেখা যাইতেছে। বিছানার মশারির মধ্য হইতে ঘুমন্তের নিশ্বাস-শব্দ আসিতেছে। মেজর একটি বিছানার মশারি তুলিয়া ধরিলেন। ভিতরে একটি ছোট্ট মেয়ে ঘুমাইয়া আছে,— গা হইতে লেপখানা সে খুলিয়া ফেলিয়া দিয়াছে। আপনার মোটা মোটা পা দুখানি সে জড়াইয়া পেটের কাছে গুটাইয়া আছে, ঠোঁট দুখানি তার ফাঁক-করা। এই চুলবুলে মেয়েটি সারাদিনের দুরন্তপনার পর এখন একেবারে এলাইয়া পড়িয়াছে। মেজরের স্নেহ-মাখা দৃষ্টি বহুক্ষণ ধরিয়া সেই ঘুমন্ত ননির পুতলির পানে স্থির হইয়া রহিল।
মেজর আপনমনে বলিলেন, 'ঘুমাও দুলালি, ঘুমাও স্বর্গের পরি!'
তিনি দ্বিতীয় বিছানার দিকে গেলেন। মনুষ্যত্বের এই ছোটো টুকরাটির দিকে একবার চাহিয়া দেখো! এখনও বয়স তাহার দুই বছর হয় নাই, কিন্তু ইহারই মধ্যে এই বীরপুরুষ দিনভর শুধু যুদ্ধং দেহি, যুদ্ধং দেহি রব ছাড়া আর কিছুই জানে না। তার কচি কচি গাল দুটিতে আঁচড়া-আঁচড়ির দাগ। শত্রুদের একজনের সঙ্গে সে ক্ষণিক সন্ধি করিয়াছে তাহার পাশে যে বিড়ালটি পায়ের মধ্যে মাথা লুকাইয়া শুইয়া ঘুমাইতেছে, তাহাকে দেখিলে এ কথা স্পষ্ট বুঝা যায়। মেজরের খোকাটি কেমন মোটাসোটা। গোল মাথাটি তাহার কোঁকড়া কোঁকড়া চুলে ভরা। জাদুর রাঙা রাঙা নধর গালে ওই যে ছোটো টোলটি, ওইখানটিতে চুমা খাইবার জন্য মেজরের মনে ভারী সাধ হইতে লাগিল। কিন্তু না,— চুমা খাইতে গেলে সোনামণির ঘুম ভাঙিয়া যাইবে!
পায়ের আঙুলে ভর দিয়া মেজর আস্তে আস্তে পাশের ঘরটিতে গেলেন। সেখানে তাঁহার স্ত্রী বড়োছেলের সঙ্গে শুইয়া আছেন। বড়োখোকার বয়স ছয় বৎসর। আপনার ভাই-বোনের চেয়ে বয়সে বড়ো বলিয়া মনে মনে তাহার বড়োই গর্ব! বাতির শিখা কমাইয়া দেওয়া হইয়াছে; নীল রঙের মৃদু আলোয় মাতা-পুত্রের দেহ রঞ্জিত। বিছানার পাশটিতে ছোটো টেবিলের উপর মেজরের ফোটোগ্রাফ ও একখানা খোলা খবরের কাগজ রহিয়াছে। মেজর বুঝিলেন, ঠিক ঘুমাইবার আগেই তাঁহার প্রিয়তমা খবরের কাগজে তাঁহারাই কথা পড়িতেছিলেন। ঘরের দেওয়ালে দেওয়ালে মেজরের আরও কয়খানি ছবি টাঙানো। তাঁহার স্মৃতি এখানে কেহ ভুলে নাই। সাবধানে হেঁট হইয়া মেজর তাঁহার প্রিয়ার ওষ্ঠে চুম্বনের দাগ আঁকিয়া দিলেন। তারপর চোখ বুজিয়া তিনি স্ত্রী-র কপালে আর-একটি চুম্বন করিলেন।
এখানে চারিদিকে অগাধ শান্তি, গভীর সুপ্তি ও মধুর প্রেম বিরাজ করিতেছে! এইসব ঘুমন্ত মস্তিষ্ক হইতে সমস্ত অশুভ, হতাশা ও ঘৃণা-হিংসার চিন্তা দূর করিবার জন্য এখানে যেন কোনো অশরীরী দেবদূত একান্ত প্রাণে প্রার্থনারত রহিয়াছে।
তখন সুস্বপ্নমুগ্ধ সুপ্ত মেজরের দিকে কেহ লক্ষ করিলে দেখিতে পাইত, তাঁহার মুখে পুলক-হাসির লীলা ফুটিয়া উঠিয়াছে।
হঠাৎ তাঁহার মুখের হাসি মুছিয়া গেল। হাসির পরিবর্তে তথায় জাগিয়া উঠিল একটা বিস্ময় ও ভয়ের ভাব। তিনি উঠিবার চেষ্টা করিলেন, পারিলেন না। তিনি যেন তখন একটা বিচিত্র-ভয়াল দৃশ্য দেখিতেছিলেন, তাঁহার শোণিতপ্রবাহ শীতল হইয়া শিরায় শিরায় বহিয়া চলিয়াছিল।
তাঁহার স্বপ্নদৃষ্ট বাড়ির যে ঘরখানি একটু পূর্বে এমন নিঃসাড় ছিল, তাহা এখন অস্পষ্ট স্বরলহরিতে ভরিয়া গিয়াছে। ছেলে-মেয়েরা বিছানার উপর উঠিয়া বসিয়াছে। তাহাদের মাথার উপর একখানা মিশমিশে কালো মেঘ ঘনাইয়া আসিতেছে, তাহারা সভয়ে ঊর্ধ্বমুখে সেইদিকপানে তাকাইয়া! কী লুকানো ওই মেঘের মধ্যে,— কী লুকানো আছে? পিতার বুকের স্পন্দন দ্রুততর হইল— সে বুক যেন এখনই ফাটিয়া চৌচির হইয়া যাইবে!
ধীরে ধীরে ধীরে কালো মেঘ দুলিতে দুলিতে নামিয়া আসিতেছে, কাঁপিতে কাঁপিতে নামিয়া আসিতেছে!
শিশুরা সব বিছানার উপর হইতে লাফাইয়া পড়িল। তাহারা ভয়ে চেঁচাইতে লাগিল, কিন্তু কোনোখান হইতে কোনো উত্তর আসিল না। তাহারা মা-কে ডাকিতে লাগিল, কিন্তু কালো মেঘ মাঝখানে পড়িয়া তাহাদের মা-কে চোখের আড়াল করিয়া দিল। সেই রহস্যময়, ভীষণ অস্পষ্ট মেঘখানা ক্রমে ক্রমে পরিবর্তিত হইয়া যেন একটা স্পষ্ট আকার ধারণ করিল। অবশেষে সকলেই দেখিতে পাইল— কী সে জিনিসটা! সে এক দীর্ঘাকৃতি লোকের মৃতদেহ এবং সেই দেহের চারিপাশ ঘিরিয়া চারিটি শিশু! শিশুরা যাতনায় ফুলিয়া ফুলিয়া কাঁদিতেছে— তাহাদের ছোটো বুক যেন ভাঙিয়া নুইয়া যাইতেছে।
খানিক পরে সাহসে ভর করিয়া মেজরের ছেলে-মেয়েরা মৃতদেহের কাছে আগাইয়া আসিয়া দেখিতে লাগিল। মেজরের বুঝিতে বাকি রহিল না যে, সে শব কাহার? কপালে সেই কাটা দাগ, সেই সাদা চুলে ভরা মস্ত মাথা, সেই ঘন ধবধবে গোঁফ! কাঁধের সেই নূতন ক্ষতচিহ্ন, রক্তাক্ত বস্ত্র ও ছেঁড়াখোঁড়া ইজার পর্যন্ত ঠিক ঠিক দেখা যাইতেছে।— না, কোনো সন্দেহ নাই! মেজরের বুকটা ধড়াস ধড়াস করিতে লাগিল, তাঁহার সর্বাঙ্গ রোমাঞ্চিত হইয়া উঠিল।
মেজরের ছোটোমেয়েটির রাঙা গাল পাঙাস হইয়া গেল। সে জিজ্ঞাসা করিল, 'কে,— কে এ কাজ করেচে?'
মেজরের বড়োছলেটি জিজ্ঞাসা করিল, 'কে মারলে একে?'
শবকে ঘিরিয়া যে চারিটি অচেনা কালো শিশু বিদ্যুতের মতো চোখ লইয়া বসিয়া ছিল, তাহারা সকলেই আঙুল তুলিয়া মেজরকে দেখাইয়া তাঁহাকেই দোষী করিল।
'ও-ই আমাদের বাপকে মেরেচে! ও-ই আমাদের পথে বসিয়েচে— আমাদের ভিখারি করেচে!'
মেজর কথা কহিতে গেলেন। কিন্তু তাঁহার ওষ্ঠ যেন পক্ষাঘাতগ্রস্তের মতো আড়ষ্ট হইয়া পড়িয়াছিল। তাঁহার নিজের সন্তানেরা শঙ্কিত মুখে তাঁহার কাছ হইতে সরিয়া গেল। ছোটো ছেলে-মেয়ে দুটি যেন আত্মরক্ষার জন্য আপনাদের হাতগুলি তুলিয়া ধরিল। মেজর তাঁহার মেয়ের কাছে আগাইয়া আসিলেন, কিন্তু সে-ও পলাইয়া গেল। তারপর সে মেজরের হাত দেখিয়া আঁতকাইয়া উঠিল, 'রক্ত! রক্ত!'
মেজর নিজের হাতের দিকে চাহিলেন। শিশুর কথা ঠিক। তাঁহার হাত দুটি— রক্তে রাঙা।
মেজর আবার কথা কহিবার জন্য নিষ্ফল চেষ্টা করিলেন। তাঁহার মনে হইল, যেন কাহার লৌহহস্ত সজোরে তাঁহার কণ্ঠ চাপিয়া শ্বাসরোধ করিতে চাহিতেছে! তিনি মুক্তির জন্য প্রাণপণে যুঝিতে লাগিলেন,— হাঁ, মরিয়া হইয়া! সমস্ত শক্তি একত্র করিয়া। তারপর আর-একবার শেষ চেষ্টা— তারপর জাগরণ!
গায়ের লেপখানা ছুড়িয়া ফেলিয়া তিনি একলাফে বিছানা ছাড়িয়া মাটিতে পড়িলেন।
বন্দি তখন উঠিয়া বসিয়াছেন। কর্নেলও টেবিলের ধারে বসিয়া আছেন।
'কী হে মেজর, তুমি তো দেখছি দিব্যি একচোট ঘুমিয়ে নিলে!'
'হ্যাঁ, আমি স্বপ্ন দেখছিলাম।'
একটু বিচলিত হইয়া কর্নেল বলিলেন, 'কী! তুমিও?'
'—''তুমিও'' বলছ, তার মানে?'
'আমি নিজে এক বিশ্রী স্বপ্ন দেখেছি।'
'তুমি কী স্বপ্ন দেখেছ? বন্দির বিষয়ে কিছু?'
'তা-ই বটে। নইলে আর কী দেখব, বলো? তুমি আমার একরত্তি ভলোডিয়াকে জানো তো?'
'বেশ জিজ্ঞাসা করছ, যাহোক! আমি না তার ধর্মপিতা? আমি তাকে জানি না?'
'তা-ই তো হে— আমি যে দেখছি বেজায় গাধা! আমার মাথাটা নিশ্চয় খারাপ হয়ে গেছে। যাক— শোনো বলি। ভলোডিয়া কাল সারারাত স্বপ্নে আমার পা ধরে মিনতি করেছে,— যাতে বন্দিকে ছেড়ে দেওয়া হয়। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ''কেন?'' সে বললে, ''বন্দির ঘরেও ছোটো ছোটো ভলোডিয়া আছে। তাদের কাছে যাবার জন্যে বন্দিকে আমি ছেড়ে দিতে বলছি।''— আচ্ছা, কাল রাতে মদে কিছু ছিল বলে কি তোমার মনে হয়?'
মেজর পলকহীন নেত্রে কর্নেলের দিকে তাকাইয়া রহিলেন।
'তোমার স্বপ্নের কথা আমাকে বলো।'
মেজর তখন স্বপ্নের কথা খুলিয়া বলিলেন।
কর্নেল কহিলেন, 'বাস্তবিক, এসব শুনলে আপনা-আপনি মনে একটা কুসংস্কার জন্মে যায়। ওসব কথা থাক— এখন ব্যাপারটার একটা নিষ্পত্তি করতে হবে তো। যত শীঘ্র পারা যায় বন্দিকে সেনাপতির কাছে পাঠানো ছাড়া আর তো কোনো উপায় দেখি না। তার নসিবে কী আছে সে কথা সেনাপতিই বলতে পারেন, আমরা না। বন্দিকে আর বেশিক্ষণ আমাদের কাছে রাখলে, আমরা পাগল হয়ে যাব।'
'তোমার কাছে আমার একটি অনুরোধ আছে। বন্দিকে আমি নিজে সেনাপতির কাছে নিয়ে যাব। কী বলো?'
কর্নেল নানা দিকে চাহিতে লাগিলেন, যাহাতে মেজরের সঙ্গে তাঁহার চোখাচোখি না হয়। বলিলেন, 'বেশ তো! তাতে আর আমার আপত্তি কী?'— তাহার পর পদস্থ কর্মচারী তাঁহার অধীনস্থ কর্মচারীকে যে স্বরে হুকুম দেন, সেইরূপ স্বরে তিনি কহিলেন, 'এখন যত শীঘ্র ইচ্ছা তুমি যেতে পারো। সেনাপতির কাছে গিয়ে, বন্দিকে তুমি তাঁর হাতে সঁপে দিয়ে আসবে।'
* * *
মামুদ বে-কে সঙ্গে লইয়া মেজর ঘোড়ায় চড়িয়া ধীরে ধীরে চলিলেন। তাঁহার মনের ভিতরটা আগেকার মতোই গুমোট করিয়া ছিল। খানিক পরে তাঁহারা রুশ ফৌজের শেষ ফাঁড়িতে গিয়া পৌঁছিলেন।
কুয়াশার ভিতর হইতে একজন কসাক সওয়ার বাহির হইয়া আসিল।
সামনের একটা সুঁড়িপথ দেখাইয়া দিয়া মেজর জিজ্ঞাসা করিলেন, 'আচ্ছা বাপু, এ পথটা কোথায় গিয়েছে, বলতে পারো?'
'শত্রুদের আড্ডায়, হুজুর!'
'আজ কোনো তুর্কিকে তুমি দেখতে পেয়েছ?'
'না হুজুর— একজনকেও না। তারা দেখছি আজকে বেজায় ঠান্ডা বনে গেছে। কিন্তু কাল তারা পাগলের মতো বিষম গোলমাল করেছিল। ভগবানের দয়ায় আজ আমরা একটু শান্তিতে আছি।'
মেজর বন্দিকে তাঁহার পিছনে আসিতে ইঙ্গিত করিয়া সেই সুঁড়িপথের ভিতর ঢুকিলেন। কিন্তু তাঁহারা বেশি দূর যাইতে-না যাইতেই সেই কসাক সওয়ার ঘোড়া ছুটাইয়া আবার তাঁহাদের কাছে আসিয়া হাজির হইল।
মেজর জিজ্ঞাসা করিলেন, 'কী হে, ব্যাপার কী?'
'হুজুর, একটা কথা আপনাকে বলতে ভুলে গিয়েছি। তুর্কিরা বেশি তফাতে নেই, তারা হঠাৎ একটা হাঙ্গাম বাধিয়ে তুলতে পারে।'
'বহুত আচ্ছা! আমিও চোখ বুজে থাকব না।'
'হুজুর, আপনার বন্দি পালাতে পারে।'
'কোনো ভয় নেই। তুর্কিরা কোথায়, কীরকমে আছে, বন্দি আমাকে সেসব দেখিয়ে দেবে বলেছে। তুমি যেতে পারো।'
কসাক প্রস্থান করিল। অশ্বপৃষ্ঠে তাঁহারা দুইজনে নীরবে বহু দূর অগ্রসর হইলেন।
তারপর মেজর ঘোড়া থামাইয়া দাঁড়াইয়া পড়িলেন।
'মামুদ বে, আমার কথা শুনুন। এখান থেকে তুর্কি ফৌজ বেশি তফাতে নেই। আপনি পালান! আদ্রিয়ানোপলে আপনার ছেলে-মেয়েদের কাছে যান। শুনতে পাচ্ছেন, যা বলছি? আমারও ছেলে আছে, মেয়ে আছে। এ কী, কী জন্যে আপনি এখনও যাচ্ছেন না? আর সময় নেই। আপনি যদি বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকেন, তাহলে আমার মন বদলে যেতে পারে। দোহাই আপনার।— মশাই, আপনি কি আমার কথা বুঝতে পারছেন না?'
মামুদ বে যেন পাথরে পরিণত হইয়া গিয়াছেন! কেবল তাঁর চোখ দুটি জ্বলিয়া জ্বলিয়া উঠিতেছিল। তিনি যেন স্বপ্ন দেখিতেছিলেন।
অতি ধীরভাবে মেজর কহিলেন, 'আপনাকে আবার বলছি, আপনি স্বাধীন, নিজের বাড়িতে ফিরে যেতে পারেন।'
এই কল্পনাতীত সত্য যেন বন্দি এতক্ষণে বুঝিতে পারিলেন। মামুদ বে হঠাৎ হেঁট হইয়া মেজরের হাত ধরিয়া আবেগভরে তাহা চুম্বন করিলেন।
'রুশ, শুনুন। আপনি আমাকে এমন ঋণের পাশে বাঁধলেন, যা আমি কখনো শোধ করতে পারব না। আপনি কোনোদিন বন্দি হলে শত্রু শিবিরে আপনারই মতো সদাশয় এক তুর্কিকে দেখতে পাবেন— এ কথা বলা আমার পক্ষে সংগত নয়। কিন্তু,— একটি কথা। ঈশ্বর এক। ধর্ম ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু ঈশ্বর এক। আমি শপথ করছি, আমি আর আমার ছেলে-মেয়েরা যতদিন বাঁচব, ভগবানের কাছে ততদিন প্রত্যহ আপনার জন্য প্রার্থনা করব যে, আপনার ছেলে-মেয়ের মুখ চেয়ে তিনি যেন আপনাকে রক্ষা করেন, যেমন আমার ছেলে-মেয়ের মুখ চেয়ে আপনি আমাকে বাঁচালেন। ভগবান আপনাকে দীর্ঘজীবী করুন। বিদায়, রুশ! বিদায়।'
তারপর,— পাছে মেজর তাঁর মন বদলান যেন এই ভয়েই— হঠাৎ ঘোড়াকে জোরে চাবুক কষাইয়া মামুদ বে অদৃশ্য হইয়া গেলেন।
মেজর খানিকক্ষণ দাঁড়াইয়া রহিলেন। বোধ হয়, আরও কিছু আগাইয়া নিরাপদ ব্যবধানে চলিয়া যাইবার জন্য তুর্কিকে তিনি সময় দিতে চাহেন।
যখন তিনি রুশ ফাঁড়ির কাছে ফিরিয়া আসিলেন, তখন সেই কসাক অশ্বারোহীর সহিত আবার তাঁহার সাক্ষাৎ হইল।
মেজর কহিলেন, 'ওহে বাপু, তুমি তো ঠিক বলেছিলে! বন্দি পালিয়ে গেছে!'
কসাক ভালো করিয়া তীক্ষ্ন নেত্রে মেজরের মুখটা দেখিয়া লইল। পদস্থ কর্মচারীর দিকে কোনো সাধারণ সৈনিক সেরকম দৃষ্টিতে চাহে না! তারপর বলিল, 'তার জোর বরাত, হুজুর! আমাদেরও বন্দির অভাব নেই।'
মেজর যখন ঘরে ঢুকিলেন, কর্নেল তখন জিজ্ঞাসা করিলেন, 'কী হল হে?'
'হুজুর, আমাকে গ্রেপ্তার করুন। আমি বন্দিকে ছেড়ে দিয়েছি।'
কর্নেল কিছু বলিলেন না। সামনে আসিয়া নীরব আনন্দে মেজরকে আলিঙ্গন করিলেন।
সেই তাঁহার উত্তর।
ভারতী, শ্রাবণ ১৩২২ (জুলাই ১৯১৫)
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।