বিধবা

হেমেন্দ্রকুমার রায়

গঙ্গার ঘাটে জটলা

সেনেদের বাঁধা-ঘাটে পাড়ার মেয়েরা স্নান করিতে আসিয়াছেন। কেহ বৃদ্ধা, কেহ প্রৌঢ়া, কেহ যুবতি, কেহ কিশোরী, কেহ বালিকা।

ঘোষ-গিন্নির সামনে তামার টাটে মাটির শিব, পঞ্চপাত্রে গঙ্গাজল, ছোট্ট একটি ঝাঁপিতে ফুল আর বেলপাতা।

ঘোষ-গিন্নি যে পূজা করিতেছিলেন না, তাঁহাকে এমন অপবাদ যে দেয়, সে নিশ্চয়ই চোখের মাথা খাইয়াছে। তিনি অবশ্যই পূজা করিতেছিলেন, তবে তাঁর চোখ-কান-মন ছিল ঘাটের জটলার দিকে। একসঙ্গে যদি রথও দেখা যায়, কলাও বেচা হয়, তবে সেটা আর বিশেষ মন্দ কথা কী?

বামুনদিদি স্নান সারিয়া ভিজা কাপড় নিংড়াইতে নিংড়াইতে যখন ঘরমুখো হইলেন, ঘোষ-গিন্নির শিবপূজা তখন আশ্চর্যরূপে হঠাৎ সাঙ্গ হইয়া গেল। তিনি তাড়াতাড়ি শিবের মাথায় কুশি করিয়া একটু গঙ্গাজল ছিটাইয়া, চারিদিকটা সতর্ক দৃষ্টিতে একবার দেখিয়া লইয়া বলিলেন, 'ও বামুনদিদি, বলি চললে নাকি?'

বামুনদিদি বলিলেন, 'হ্যাঁ ভাই, বেলা হল— বউ-ঝিগুলো ছেলেমানুষ, আমি না গেলে হয়তো হাঁড়িই চড়বে না— ছেলেদের আপিসের ভাত দিতে হবে তো!'

সেনেদের বাড়ির দিকে আর-একবার অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে চাহিয়া ঘোষ-গিন্নি, হাতছানি দিয়া ডাকিয়া বলিলেন, 'বলি, শোনোই-না, কথা আছে।'

ঘোষ-গিন্নির রকমসকম দেখিয়া বামুনদিদির মাথার টনক নড়িল। তিনি ফিরিতে ফিরিতে কহিলেন, 'হাঁ বল বাপু বল, কী বলবার আছে বল।'

ঘোষ-গিন্নি চাপা গলায় বলিলেন, 'আর শুনেছ,— সেনেদের বাড়িতে বিধবা-বিয়ে হবে যে!'

বামুনদিদি কপালে চোখ তুলিয়া বলিলেন, 'কার লো— কার? নলিনীর ঠাকুমার নাকি?'

ঘোষ-গিন্নি হাসিয়া ঢলিয়া পড়িয়া বলিলেন, 'দিদির কথা শুনে আর বাঁচি না! ও আমার পোড়াকপাল! ঠাকুমার কি আর সে বয়স আছে? তোমাদের নলিনীর গো— নলিনীর!'

বামুনদিদি ছেলেদের আপিসে যাওয়ার কথা বেবাক ভুলিয়া ঘাটের চাতালে ধপাস করিয়া বসিয়া পড়িলেন, বলিলেন, 'এ কথা কার মুখে শুনলি রে?'

ঘোষ-গিন্নি বিনাইয়া বিনাইয়া বলিলেন, 'আমার কামিনী যে নলিনীর সই,— আমি যে সব শুনব, তাতে আর আশ্চর্য কী বলো! কামিনী কাল সন্ধ্যাবেলা আমাকে ডেকে চুপি চুপি বললে, কাউকে বোলো না মা, সইয়ের ফের বিয়ে হবে— আমি তো গালে হাত দিয়ে একেবারে অবাক!'— বলিতে বলিতে ঘোষ-গিন্নি সেনেদের বাড়ির দিকে সন্দিগ্ধনয়নে আবার চাহিয়া দেখিলেন। ঘাটসুদ্ধ মেয়ে ততক্ষণে ঘোষ-গিন্নির ঘাড়ের উপরে হুমড়ি খাইয়া পড়িয়াছে।

বামুনদিদি ভালো করিয়া জাঁকিয়া বসিয়া বলিলেন, 'তারপর?' তাঁর ভাব দেখিলে বোঝা যায়, ছেলেদের আজ অন্নাভাবে আপিস কামাই গেলেও, তিনি সব কথা না শুনিয়া এখান থেকে এক-পা নড়িবেন না।

ঘোষ-গিন্নি ভিজা চুলগুলা লইয়া, মাথার সামনের দিকে চূড়া করিয়া নুটি বাঁধিতে বাঁধিতে বলিলেন, 'কামিনীকে আমি জিজ্ঞেস করলুম, কে বললে তোকে? কামিনী ফিক করে একটু হেসে বললে, কেন, সই নিজে।— নলিনী-ছুঁড়ির বেহায়াপনাটা দেখো একবার! শুনলুম, বিয়ের কথা শুনে অবধি ছুঁড়ি নাকি ধিঙ্গি হয়ে বাড়িময় নেচে নেচে বেড়াচ্চে।'

বামুনদিদি নাক শিকায় তুলিয়া বলিলেন, 'টাকার দেমাক বাছা, টাকার দেমাক! কিন্তু বলে রাখলুম, বোন, ধম্মে এত সইবে না। এখনও সুয্যি উঠচে, দিনরাত হচ্চে!'

যাত্রার বীরপুরুষ যেমনভাবে দু-হাতে ভিড় ঠেলিতে ঠেলিতে রণক্ষেত্রে প্রবেশ করে, তেমনিভাবেই পুরুত-বউ এই অবকাশে অগ্রসর হইয়া হাত ও মাথা ঘন ঘন নাড়িতে নাড়িতে বলিলেন, 'ও মা, যাব কোথা! কালে কালে এ হল কী! যাই, মিনসেকে বলে দিই গে, ওদের বাড়ি যেন আর না মাড়ায়।'

ঘোষ-গিন্নি ত্রস্তভাবে বলিলেন, 'তা, যা করো তা করো বাছা, আমার নামটি যেন করে বোসো না। জানো তো, আমার কামিনী, নলিনীর সই।'

মুখ বাঁকাইয়া পুরুত-বউ বলিলেন, 'অমন স'য়ের মুখে ছাই! তোমার কামিনীকে বলে দাও, ম্লেচ্ছের বাড়ি গেলে তারও জাত যাবে।'

ঘোষ-গিন্নি বিরক্ত হইয়া কহিলেন, 'বালাই, কামিনী আমার তেমন মেয়েই নয়— তার জাত যাবে কেন? ওদের বাড়ির চাল-কলা খেয়ে আর শাঁখ-ঘণ্টা নেড়ে যারা মানুষ, জাত যাবার ভয় তাদেরই বেশি—'

পুরুত-বউ বাধা দিয়া খনখনে গলা তুলিয়া বলিলেন, 'চাল-কলা আর শাঁখ-ঘণ্টার খোঁটা, কাকে ঠেস দিয়ে বলা হল শুনি? জাতের ডবডবানি আমাদের আর দেখিয়ো না গো ঘোষ-গিন্নি, দেখিয়ো না। জাত রাখতেও আমরা— মারতেও আমরা।'

ঘোষ-গিন্নি বলিলেন, 'থামো পুরুত-বউ, থামো— এখানে দাঁড়িয়ে আর দশ-বাই-চণ্ডীর মতো চেঁচিয়ো না!'

মুখঝামটা দিয়া পুরুত-বউ বলিলেন, 'চেঁচাব না। কেন চেঁচাব না? আমি কি কোনো শতেকখোয়ারির আটচালায় বাস করি যে, ভয় করতে যাব? আ মর! আবার বলা হচ্চে, চেঁচিয়ো না! চেঁচাব— খুব চেঁচাব। আমি জোর-গলায় বলচি, মিনসেকে দিয়ে সেনেদের আর তোমাদের জাত মারব, মারব, মারব— তবে ছাড়ব।'

আসল কথা চাপা পড়িয়া গেল দেখিয়া বামুনদিদি ব্যাকুল হইয়া বলিয়া উঠিলেন, 'না, মা কেউ তোমায় ঠেস দেয়নি। গায়ে পড়ে তুমি কোঁদল করতে আসলে! এটা তোমার অন্যায় বাছা!' পুরুত-বউ আরও উঁচু পরদায় বলিতে লাগিল, 'বিধবাবিবাহ সম্বন্ধে সব শেয়ালের এক রা! আচ্ছা মিনসেকে গিয়ে বলব।'

অন্যান্য স্ত্রীলোকেরা বলিল, 'আচ্ছা, জাত মারতে হয় বাড়িতে গিয়ে মেরো— এখন একটু থামো, কথাটা ভালো করে শুনতে দাও।'

পুরুত-বউ বলিলেন, 'তোমরাও ওই দলে? আচ্ছা, মিনসেকে গিয়ে বলব, বলব, বলব— এই তিন সত্যি করলুম, তোমাদের সব্বারই জাত মারব তবে ছাড়ব।'

এমন সময়ে দেখা গেল, সেনেদের বাড়ির ভিতর থেকে একটি যুবতি বাহির হইয়া এইদিকেই আসিতেছেন। বোধ হয়, পুরুত-বউয়ের মিষ্ট গলার স্বর বাড়ির ভিতরেও গিয়াছিল।

ঘোষ-গিন্নি থতমত খাইয়া বলিয়া উঠিলেন, 'ও মা, নলিনী যে!'

বামুনদিদি চটপট উঠিয়া পড়িয়া বলিলেন, 'গঙ্গা, গঙ্গা, গঙ্গা! যাই মা, বেলা হল, আপিসের ভাত দিতে হবে।'

পুরুত-বউ গজগজ ও ফোঁস ফোঁস করিতে করিতে— বোধ করি, 'মিনসে'র কাছে নালিশ জানাইতেই চলিলেন।

ঘোষ-গিন্নি ততক্ষণে (এবারে চোখ চাহিয়া নয়) ভক্তিভরে আবার শিবের ধ্যানে বসিয়াছেন। অন্যান্য রমণীরাও— কেহ গঙ্গায় গিয়া ডুব দিলেন, কেহ একান্তমনে কাপড় কাচিতে লাগিলেন, কেহ 'বাজার বড়ো মাগগি, চারটে খুদে খুদে চিংড়িমাছের ভাগা পাঁচ পয়সা— গেরস্তের দিন চলা ভার হয়ে উঠল দেখচি'— বলিয়া অতিশয় নিরীহের মতো ঘরকন্নার কথা পাড়িলেন।

নলিনী ঘাটে আসিয়া দেখিল, অভিনয় শেষে রঙ্গালয়ের মতো সব একেবারে চুপচাপ হইয়া গিয়াছে। একবার সকলকার মুখের দিকে তাকাইয়া বলিল, 'হ্যাঁ গা পুরুত-বউ, ''জাত মারব, জাত মারব'' বলে চেঁচাচ্ছিলেন কেন?'

কাপড় কাচা বন্ধ করিয়া একজন যেন আকাশ থেকে পড়িয়া বলিলেন, 'কই, আমরা তো শুনিনি বাছা!'

নলিনী বিস্মিতস্বরে বলিল, 'সে কী গো, পুরুত-বউয়ের গলার চোটে আকাশ ফেটে যাচ্ছিল, আর তুমি শোনোনি কীরকম?'

'জানিনে বাপু, আমরা কারো সাত-পাঁচে থাকিনি, কে কী বললে-না বললে আমরা তা কি জানি? ওই ঘোষ-গিন্নিকে জিজ্ঞেস করো।'

ঘোষ-গিন্নি তাড়াতাড়ি পূজার জিনিসপত্র তুলিতে তুলিতে দুই চক্ষু বিস্ফারিত করিয়া বলিলেন, 'তুমি কেমন মেয়ে গা, পুরুত-বউ! আমি কচ্ছিলুম পুজো, কে কার জাত মারবে, আমি তার কি ধার ধারি? মুখ দিয়ে ফস করে একটা কথা বলে ফেললেই হল!'— বলিতে বলিতে তিনি তাঁর নাদুসনুদুস মোটা দেহখানি লইয়া, যত তাড়াতাড়ি পারা যায় সরিয়া পড়িলেন।

একটি বালিকা নলিনীর কাছে গিয়া বলিল, 'হ্যাঁ, নলিনীমাসি, তুমি নাকি আবার বিয়ে করবে?'

নলিনীর মুখ রাঙা হইয়া উঠিল। ব্যাপারটা যে কী, সে কথা বুঝিতে আর তার দেরি হইল না। কোনো কথা না কহিয়া মুখ নিচু করিয়া আস্তে আস্তে আবার সে ফিরিয়া গেল।

ঘাটের রমণীরা পরস্পরের দিকে চোখ-ঠারাঠারি করিয়া নীরবে হাসিতে হাসিতে এ উহার গায়ে ঢলিয়া পড়িতে লাগিলেন। সে হাসি দেখিয়া বোঝা যায়, নলিনীর প্রাণের ব্যথাটা তাঁহারা বেশ ভালোরূপেই উপভোগ করিতেছিলেন।

একালের সুসংস্কার

আমরা সবাই গোলাপ ফুলটিকে চাই— কিন্তু কাঁটা বাদ। সুরেশবাবুও কলিকাতার সুবিধাটুকু ষোলোআনা ভোগ করিতে চান; কিন্তু কলিকাতার রাস্তার ধুলা, গাড়ির ঘড়ঘড়ানি আর লোকজনের হট্টগোল সহ্য করিতে একেবারেই নারাজ।

অতএব, কলিকাতার কাছাকাছি গঙ্গার পারেই তিনি বাড়ি তৈয়ারি করাইয়াছেন। কলিকাতার কোন কোর্টের তিনি ম্যাজিস্ট্রেট। তাঁর পিতাও, যৎকিঞ্চিৎ সঞ্চয় না করিয়া পরলোকে প্রস্থান করিয়া পুত্রকে ইহলোকে বিপদগ্রস্ত করেন নাই।

বিলাতের মাটি না মাড়াইয়াও যে কতটা পুরো সাহেব হওয়া যায়, তার প্রমাণ দিতে হইলে লোকে সুরেশবাবুর নাম করিত। বাড়ির ভিতরে বা বাহিরে সুরেশবাবুকে কেউ কখনো বাঙালির পোশাক পরিতে দেখে নাই। আকারে-প্রকারে, আহারে-বিহারে সুরেশবাবু একেবারে 'কেতা'দুরস্ত খাঁটি সাহেব।

সুরেশবাবু বিপত্নীক। বিবাহের ফলে তাঁহার এক পুত্র ও এক কন্যা লাভ হইয়াছিল। ছেলের নাম রমেশ, মেয়ের নাম নলিনী।

রমেশ সম্প্রতি বিলাতে গিয়া ব্যারিস্টার হইয়া আসিয়াছে। এখনও ব্যবসায় আরম্ভ করে নাই।

নলিনী বিধবা। বিবাহের এক বৎসর পরেই তার স্বামী মারা যান। 'খাওদাও— আনন্দে রহো'— সুরেশবাবুর জীবনে এইটিই মূলমন্ত্র হইলেও, নলিনীর ওই কাতর মুখখানি তাঁহার বুকের ভিতরে সর্বদা একটা খোঁচার মতো লাগিয়া থাকিত।

সংসারে আর-একটি লোক ছিলেন, তিনি সুরেশবাবুর বৃদ্ধা মাতা। নলিনীর এই ঠাকুরমাটি একেবারে সেকেলে হিন্দু মহিলা; আপনার ঠাকুরঘরে বসিয়া সারাদিন তিনি দেবতার সেবা ও পূজা-অর্চনা লইয়াই ব্যস্ত থাকিতেন, সন্ধ্যাবেলায় প্রতিদিনই নলিনীর মুখে গলদশ্রুমোচনে রামায়ণ-মহাভারতের অমৃতকথা শ্রবণ করিতেন। পড়িতে বসিবার আগে নলিনীকে রোজ কাপড় ছাড়িয়া, গা ধুইয়া আসিতে হইত। যে কাপড় পরিয়া নলিনী তার বাপকে ছুঁইয়াছে, সে কাপড়ে ঠাকুরমাকে ছুঁইলে, তিনি তখনই 'রাম রাম' বলিয়া গঙ্গায় গিয়া ডুব দিয়া আসিতেন।

সুরেশবাবু মেয়েকে সকলরকমে নিজের আদর্শমতো গড়িয়া তুলিতে চেষ্টা করিতেন। আবার, ঠাকুরমা তাহাকে নিজের দলে টানিতেন। তিনি বলিতেন, 'দেখ মা নলিনী, তুই হিন্দুর ঘরের বিধবা, বাপের কথায় যেন ম্লেচ্ছ আচার শিখিসনি। ঠাকুর তাহলে রাগ করবেন।'— নলিনী হাসিয়া ঠাকুরমার গলা জড়াইয়া ধরিয়া বলিত, 'না ঠাকুরমা, আমি তোমার কথা শুনব।'

এই দোটানায় পড়িয়া নলিনীর চরিত্রে একাল-সেকালের অপূর্ব মিলন হইয়াছিল। বাপের যত্নে একালের শিক্ষিতা মহিলার মতো সে বিদুষী হইয়া উঠিয়াছিল; আবার ঠাকুরমার সংস্কার ও প্রভাবও তাহার জীবনের পরতে পরতে মিশিয়া গিয়াছিল। ফলে, সে তার বাপকেও খুশি রাখিত, ঠাকুরমাকেও খুশি রাখিত।

* * *

রমেশের সহপাঠী অমিয়কুমার ছেলেবেলা হইতেই সুরেশবাবুর বাড়িতে আসা-যাওয়া করিত, এমন সুশ্রী পুরুষ বাঙালির ভিতরে বড়ো একটা দেখা যায় না।

রমেশের সঙ্গে অমিয়ও বিলাতে গিয়াছিল,— ডাক্তারি পড়িতে। অল্প দিন হইল, সে দেশে ফিরিয়াছে। অমিয় অবিবাহিত।

বিলাত হইতে ফিরিয়া প্রথম যেদিন শ্বেতবসনা নলিনীকে দেখিল, সেদিন সে স্তম্ভিত হইয়া গেল। নলিনীকে দেখিয়া গিয়াছিল সে চপলা কুমারীর বেশে, বাতাসে উড়ন্ত ফুলের একটি পাপড়ির মতো, তখন সে মনের খুশিতে বাড়িময় ছুটাছুটি করিয়া বেড়াইত,— আর আজ, সেই হাস্যময়ী চঞ্চলার এ কী রূপ, এ কী বেশ! এই দু-দিনের ভিতরে সংসারের বিষাক্ত নিশ্বাসে তাহার মুক্ত সুখের নির্ঝর একেবারে শুকাইয়া গিয়াছে? অমিয়ের চোখ সজল হইয়া উঠিল,— সে প্রথমে কোনো কথাই কহিতে পারিল না।

নলিনী তাহাকে নমস্কার করিয়া বলিল, 'ভালো আছেন তো অমিয়বাবু? আপনার চেহারা যে একেবারে বদলে গেছে!'

অমিয় জোর করিয়া মুখে হাসি আনিয়া বলিল, 'বদলে গেছে! কীরকম বলো তো!'

নলিনী বলিল, 'বিলেত যাবার আগে আপনি বেশ ছেলেমানুষটির মতো দেখতে ছিলেন; আর এখন—'

'একেবারে জোয়ান পুরুষমানুষ হয়ে উঠেচি— না নলিনী? ভগবান এমনি করে ছেলেকে যুবা আর যুবাকে বুড়ো করে চিরকালই খেলায় মেতে আছেন— মানুষ বড়ো হইলেই যুবা হয়, নাকের তলায় গোঁফ গজায়, মাথায় লম্বা হয়ে ওঠে— উঃ! সৃষ্টির কী ভীষণ হেঁয়ালি! কিন্তু তোমার-আমার তো আর এতে কোনো হাত নেই, কী করব বলো, এজন্যে আমি আন্তরিক দুঃখিত।'

নলিনী হাসিয়া বলিল, 'অমিয়বাবু, চেহারা বদলালেও আপনার কথা কইবার ধরনটুকু একেবারেই বদলায়নি।'

অমিয় বলিল, 'এককথা বললে দশ কথা শুনিয়ে দি? হাঁ— ও রোগটা আমার বরাবরই আছে— তবে আশা করি, বরাবর থাকবেও।'

'আচ্ছা অমিয়বাবু, বিলেত কেমন জায়গা?'

'সে কথা তো আমাদের এক কবি প্রাঞ্জল ভাষায় বুঝিয়ে দিয়েছেন, ''বিলেত দেশটা মাটির, সেটা সোনা-রুপোর নয়, তার আকাশেতে সূর্য ওঠে, মেঘে বৃষ্টি হয়'', ব্যাস! এই দু-লাইনেই বিলেতের অবিকল ফোটো। তবে কিনা, তফাত কী জানো? সে দেশের মেয়েরা তোমার মতন এমন সাদা কাপড় পরে, এমন মুখ শুকিয়ে থাকে না—' একটু থামিয়া, গম্ভীর হইয়া অমিয় বলিল, 'নলিনী, তোমাকে এমন দেখতে হবে, এটা কখনো স্বপ্নেও মনে করিনি।'

নলিনী মুখ ফিরাইয়া কিছুক্ষণ চুপ করিয়া রহিল। তাহার পর বলিল, 'অমিয়বাবু, ঠাকুরমার সঙ্গে দেখা করবেন না?'

অমিয় বলিল, 'হ্যাঁ, হ্যাঁ— ঠাকুরমার ঠাকুরের প্রসাদ অনেক খেয়েছি,— তাঁর সঙ্গে দেখা না করলে মস্ত অকৃতজ্ঞতা হবে। চলো।'

ঠাকুরমা তখন ঠাকুরঘরে বসিয়া নৈবেদ্যের চাল সাজাইতেছিলেন। অমিয় ঠাকুমার শুচিবাইয়ের কথা জানিত। তাই সে বাহির হইতেই ডাকিল, 'ঠাকুরমা— অ ঠাকুরমা।'

অমিয়র গলা শুনিয়াই ঠাকুরমা ধড়মড় করিয়া উঠিয়া বলিলেন, 'কে রে, ''ওমে'' এলি নাকি? কেমন, ভালো আছিস তো?'

অমিয় বলিল, 'তোমায় প্রণাম করতে এসেছি ঠাকুরমা! হুকুম দাও— ঘরে ঢুকে পা ছুঁয়ে দণ্ডবৎ হয়ে ভক্তিভরে প্রণাম করব, না এইখানে দাঁড়িয়ে তফাত থেকেই প্রণামটা আলগোছে সেরে নেব?'

ঠাকুরমা তাড়াতাড়ি দরজার কাছে আসিয়া ব্যস্তভাবে বলিলেন, 'না বাবা, ঘরে আর ঢুকতে হবে না, ওইখান থেকেই কর, ওইখান থেকেই কর।'

'জো হুকুম'— বলিয়া অমিয় ঠাকুরমাকে প্রণাম করিল।

'বেঁচে থাকো বাবা, চিরজীবী হও; সংসারে আমাদের দিন তো ফুরিয়ে এসেছে, এখন তোমরা ঘরসংসার পেতে, বিয়ে-থা করে সুখেস্বচ্ছন্দে থাকো— মা কালী যেন এই করেন।'

অমিয় বলিল, 'সে কী ঠাকুরমা, তোমার দিন ফুরুবে কেন? বালাই, মা কালী তোমার জন্যে এত শীঘ্র যদি ব্যস্ত হয়ে ওঠেন, তাহলে তিনি ভুল করবেন। দাঁড়াও, আগে তোমার রমেশের একটি টুকটুকে রাঙা বউ দেখো, তার নাতি দেখো।'

ঠাকুরমা বলিলেন, 'না বাবা, তা আর দেখতে চাই না, এখন তোমাদের রেখে যেতে পারলেই বাঁচি।'

'যেতে পারলে তো বাঁচো,— কিন্তু তোমাকে ছাড়ে কে? রমেশের নাতির বিয়েটা দেখো।'

'না বাবা, তোমার অমন কামনার আর দরকার নেই।'

'উঁহু! রমেশের নাতির খোকাকে দেখবে—'

'না বাবা—'

'সে কি হয়, নাতির নাতি দেখলে স্বর্গে দেদার বাতি জ্বলে জানো তো?'

'দেখ ওমে, থাম বলচি, নইলে ঠাকুরের পেসাদ পাবিনি।'

'পেসাদ না পেলে তোমাকে ছুঁয়ে দেব। জানো তো আমাদের পেটের ভেতর আস্ত আস্ত রামপাখি সর্বদাই ক্যাঁচরম্যাচর করচে?'

ঠাকুরমা ভয়ে ভয়ে ঘরের ভিতরে ঢুকিয়া পড়িয়া বলিলেন, 'তা তুই পারিস বাবা! আচ্ছা, এখন বাইরে গিয়ে রমেশের সঙ্গে গল্পটল্প কর গে যা। আগে পুজো হোক, তারপর পেসাদ পাঠিয়ে দেব। আর দেখ ওসব অখাদ্য-কুখাদ্য খাসনে, ঠাকুর রাগ করবেন।'

'ঠাকুর যদি রাগ করেন, তাহলে তাঁকে স্বর্গে গিয়ে বেশি করে ভাত খেতে বলো; কিন্তু রেগে যেন পেসাদের ভাগ কমিয়ে না দেন, এটুকু দেখো'— বলিয়া হাসিতে হাসিতে অমিয় বাহিরে চলিয়া গেল।

নলিনী এতক্ষণ একপাশে দাঁড়াইয়া দাঁড়াইয়া মৃদু মৃদু হাসিতেছিল। এখন অমিয় চলিয়া গেলে পর বলিল, 'কেমন ঠাকুরমা, অমিয়বাবুর কাছে তুমি ভারী জব্দ হও।'

ঠাকুরমা সস্নেহে বলিলেন, 'আহা, অমিয় বড়ো ভালো ছেলে রে, মা দুর্গা ওর ভালো করুন।'— বলিয়া, ঠাকুরমা একবার নলিনীর দিকে চাহিলেন। তারপর চুপি চুপি বলিলেন, 'নলিনী, মা, একে তোমার সোমত্ত বয়েস, তাতে তুমি বিধবা। একটু সাবধানে থেকো বাছা, পুরুষের সঙ্গে বেশি মিশো-টিশো না।'

* * *

অমিয় দেশে আসিবার মাসখানেক পরে সুরেশবাবু একদিন রমেশকে নিজের ঘরে ডাকিলেন।

রমেশ ঘরে ঢুকিয়া দেখিল, পিতা ইজিচেয়ারে শুইয়া খবরের কাগজ পড়িতেছেন। রমেশ বলিল, 'বাবা কি আমাকে ডাকচেন?'

খবরের কাগজখানা সম্মুখের ত্রিপায়ার উপর রাখিয়া দিয়া সুরেশবাবু বলিলেন, 'হ্যাঁ, তোমার সঙ্গে বিশেষ একটা পরামর্শ আছে। ওই চেয়ারখানায় বোসো।'

রমেশ বসিল। সুরেশবাবু খানিকক্ষণ আনমনে সিগার টানিতে লাগিলেন। তারপর হঠাৎ চেয়ারের উপরে সিধা হইয়া বসিয়া বলিলেন, 'আচ্ছা রমেশ, বিধবাবিবাহ সম্বন্ধে তোমার মতামত কী?'

রমেশ বিস্মিত নেত্রে পিতার দিকে চাহিয়া রহিল।

সুরেশবাবু বলিলেন, 'ভেবো না, এ কথাটা আমি তোমাকে কথাচ্ছলে হালকাভাবে জিজ্ঞাসা করছি। আমি তোমার ঠিক মতটি কী, তা-ই জানতে চাই।'

রমেশ বলিল, 'আপনি কী জিজ্ঞাসা করচেন? বিধবার বিবাহ দেওয়া উচিত কি অনুচিত— এই তো?'

'হ্যাঁ।'

'আমার বিশ্বাস, দেওয়া উচিত। বিশেষ, আমাদের দেশে।'

'কেন?'

'এ দেশে বিধবার জীবন— লক্ষ্যশূন্য জীবন। সংসারের একজন হয়েও তিনি সংসারের বাইরে থাকেন। আমরা তাঁকে মানুষ বলে জানি; কিন্তু তাঁকে মানুষের অনেক অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখি। এখানে বালিকা-বিধবাকে কঠোর ব্রহ্মচর্য-ব্রত পালন করানো হয়; কিন্তু সেই বালিকার সামনে বসে তার বৃদ্ধ পিতা-মাতা জীবনকে যতটা পারেন, হাসিমুখে ভোগ করে নেন।'

সুরেশবাবু চুপ করিয়া কিছুকাল বসিয়া রহিলেন। তাহার পর বলিলেন, 'আচ্ছা রমেশ, নলিনীর যদি আবার বিবাহ দি, তাহলে তোমার কোনো আপত্তি-টাপত্তি আছে?'

তাহার পিতা যে এই কথা বলিবেন, রমেশ তাহা তাঁহার কথা কহিবার ধরনধারণ দেখিয়া আগে থাকিতেই আন্দাজ করিতে পারিয়াছিল। এদিকে তারও একটা আন্তরিক ইচ্ছা ছিল; কিন্তু ভরসা করিয়া এত বড়ো কথাটা সে পিতার সুমুখে তুলিতে পারে নাই। সে পুলকিত হইয়া বলিল, 'আমার এতে কোনো অমত নেই বাবা!'

'দেখো, নলিনীর জন্যে দিনরাত আমার মনে শান্তি নেই— তার শুষ্ক মুখ দেখলে আমার বুকের রক্ত জল হয়ে যায়। অনেক ভেবেচিন্তে তবে আমি ঠিক করেচি যে, নলিনীর আবার বিবাহ দেব। এতে তোমারও মত আছে জেনে আমি সুখী হলাম;— কিন্তু, এখন একটা কথা। বিধবা বলে তো নলিনীকে যার-তার হাতে সঁপে দিতে পারি না— ভালো পাত্র না পেলে তার বিবাহ কিছুতেই দেব না; কিন্তু তেমন পাত্র পাই কোথায়?'

রমেশ বলিল, 'আচ্ছা বাবা, অমিয় যদি নলিনীকে নিতে রাজি হয়, তাহলে আপনার কোনো অমত হবে কি?'

সুরেশবাবু বলিলেন, 'অমিয়! বলো কী! এমন ভাগ্য কি আমার হবে?'

রমেশ বলিল, 'কেন, অমিয়ের অমত হবার কারণ দেখচি না। নলিনীর মতো শিক্ষিতা আর সুন্দরী স্ত্রী কি যার-তার ভাগ্যে ঘটে? বিশেষ, অমিয়ের বাপ-মা নেই, সে একেবারে স্বাধীন; সুতরাং সেদিক থেকেও কেউ তাকে বাধা দেবে না। আর তার নিজের কথা যদি ধরেন, আমি তাহলে বলতে পারি, তার কোনোরকম কুসংস্কার নেই।'

সুরেশবাবু উঠিয়া দাঁড়াইয়া বলিলেন, 'বেশ, তুমি তাহলে অমিয়ের মতামত জেনে এসো। অবশ্য, এ বিবাহ হলে আমাদের আত্মীয়স্বজনেরা চটে যাবেন; কিন্তু কী করব, তাঁদের খুশি রাখবার জন্যে তো ওই নির্দোষ মেয়েটার সারাজীবন নষ্ট করে দিতে পারি না। আর-এক বিপদ হবে, আমার মা-কে নিয়ে; কিন্তু সেকেলে বুড়িদের কুসংস্কার মেনে চলতে গেলে সংসারটা পদে পদে অচল হয়ে উঠবে। যাক— যা-ই হোক তা-ই হোক— এ বিবাহ আমি দেবই দেব।'

আলো ও ছায়া

নলিনী যখন কথাটা শুনিল, তখন তার প্রাণ-মন হঠাৎ কেমন একটা অজানা বিদ্রোহী ভাবে অভিভূত হইয়া গেল।

আমার বিবাহ! আপনার পোড়াকপালের কথা ভাবিয়া সে অনেক দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়াছে; কিন্তু তার মনের ব্যথা শুধু মনই জানিত, সে গভীর ব্যথার কথা তো ঘুণাক্ষরেও বাহিরে প্রকাশ পায় নাই! সে বিধবার জীবন যাপন করিতেছিল, বিলাসিতাকে সকল দিক দিয়া পরিহার করিয়া চলিতেছিল; তার যে আবার বিবাহ হইবে, সেটা যে সম্ভব, এমন ব্যাপার সে স্বপ্নেও কোনোদিন কল্পনা করে নাই।

কথাটা শুনিয়াই তার মন যেন ঘৃণাভরে বলিয়া উঠিল, 'না, না, না!'— তাহার ইচ্ছা হইতে লাগিল— তখনই সে ছুটিয়া গিয়া পিতার দুটি পায়ে পড়িয়া বলে, 'ওগো সে হবে না, সে হবে না, বাবা, সে হবে না।'— কিন্তু সে পিতার দৃঢ়তা জানিত। বুঝিল, এমন অনুরোধে তাহার নিজের লজ্জাহীনতাই প্রকাশ পাইবে,— পিতা তাহার কাকুতিতে কর্ণপাতও করিবেন না।

তখন সন্ধ্যা হইয়াছে। পশ্চিমের জ্বলন্ত রবি-চিতার আকাশভরা আলো অনেকক্ষণ নিবিয়া গিয়াছে, দু-চারিটা দলছাড়া বক তখনও তাড়াতাড়ি উড়িয়া যাইতেছিল এবং রহিয়া রহিয়া দূর মন্দির হইতে আরতির শঙ্খ-কাঁসরের গম্ভীর নিনাদ এলোমেলো বাতাসে ভাসিয়া ভাসিয়া আসিতেছিল। অস্পষ্ট ছায়ালোকে সংগীতমুখর গঙ্গার ওপারের গাছপালার সবুজ রঙের সঙ্গে একটু একটু করিয়া অন্ধকার জমাট বাঁধিতেছিল। একখানা পানসি সাদা পাল তুলিয়া ভাসিয়া যাইতেছিল,— তাহার দাঁড়ি-মাঝিগুলাকে দেখাইতেছিল, ঠিক যেন জীবন্ত ছবির মতো! নলিনী বাষ্পাকুল চোখে সেইদিকে তাকাইয়া রহিল; তাহার উদাসী মন যেন ওই পানসিখানার সঙ্গে সঙ্গে ঘর ছাড়িয়া বাহিরে ছুটিয়া যাইতে চাহিল।

অনেকদিন আগেকার এক শুভদিনের কথা তাহার স্মরণ হইল,— আলো আর হাসি আর গানের মাঝে যেদিন এক নবীন অতিথি আসিয়া নিজের জীবনের সহিত তাহার জীবনকে এক করিয়া দিয়াছিল। হায় রে, অকাল শীতের উদয়ে সে বসন্তের পাখি আজ মৌন হইয়াছে বটে,— কিন্তু দু-দিনের তরে ডাকিয়া তাহার সারাজীবনকে সে যে বিচিত্র রাগিণীতে পরিপূর্ণ করিয়া দিয়া গিয়াছে, আর কি তাহা ভোলা যায় গো, আর কি ভোলা যায়? সেই মুখ, সেই চোখ, সেই হাসি শ্মশানের নিষ্ঠুর চিতা তাহা স্পর্শ করিতেও পারে নাই, নলিনীর স্মৃতির তীর্থে আজও তাহা স্বর্ণরেখায় তেমনই উজ্জ্বল হইয়া আছে,— নির্বোধ পৃথিবী, নির্দয় সংসার এ সত্য বুঝিতে পারে না কেন, কেন পারে না? জীবনে জীবনে, জন্মে জন্মে, ইহলোকে-পরলোকে দেবতা সাক্ষী করিয়া চিরসম্বন্ধ যাহার সঙ্গে,— ছার রক্তমাংসের তুচ্ছ উপভোগের জন্য আজ কি সে সম্বন্ধকে অস্বীকার করিতে হইবে?— নলিনী ভাবিতে লাগিল।

বাহির হইতে রমেশ ডাকিল, 'নলি, ঘরে আছিস?'

নলিনীর সাড় হইল। তাড়াতাড়ি চোখের জল আঁচলে মুছিয়া সে উত্তর দিল, 'দাদা ডাকচ?'

'হ্যাঁ, বাইরে চল— অমিয় এসেছে।'

নলিনীর বুকটা ধড়ফড় করিয়া উঠিল। বুকে হাত দিয়া খানিকটা সে চুপ করিয়া দাঁড়াইয়া রহিল। তারপর বলিল, 'দাদা, আমার বড়ো মাথা ধরেচে, বাইরে যেতে ইচ্ছে করচে না।'

'মাথা ধরেচে তো ঘরের ভিতরে বন্ধ হয়ে আছিস কেন? ওতে যে অসুখ বাড়বে! আয়, আয়— বাইরে আয়।'

নলিনী ক্ষীণস্বরে আরও দু-চারবার আপত্তি জানাইল; কিন্তু রমেশের জেদের কাছে তাহার কোনো আপত্তিই টিকিল না। অগত্যা তাহাকে দরজা খুলিয়া অপ্রসন্ন মনে রমেশের সঙ্গে সঙ্গে যাইতে হইল।

বাহিরের ঘরে গিয়া সে দেখিল, অমিয় একেলা বসিয়া আছে। নলিনী ঘরে ঢুকিতেই অমিয়ের চোখ উজ্জ্বল হইয়া উঠিল।

সে হাসিয়া বলিল, 'এই যে নলিনী, কখন থেকে তোমার জন্যে হাপিত্যেশ করে বসে আছি, কিন্তু তুমি যে দেখচি বেঁটে লোকের কাছে উঁচু দরজার শিকলির মতো একান্ত দুর্লভ হয়ে উঠেছ!'

উত্তরে নলিনী হাসিবার চেষ্টা করিল,— চেষ্টামাত্র; কিন্তু সে চেষ্টায় তার মুখে হাসির চেয়ে কান্নার ভাবটাই বেশি মাত্রায় প্রকাশ পাইল। সে এতদিন অমিয়ের সঙ্গে অসংকোচে কথাবার্তা কহিয়া আসিয়াছে,— আজ কিন্তু কথা কওয়া দূরে থাক, অমিয়ের দিকে মুখ তুলিয়া চাহিতেই তার ঘাড় যেন নুইয়া নুইয়া পড়িতেছিল।

অমিয় বলিল, 'নলিনী, আজ যে দেখচি তুমি মিশরের ''স্ফিংক্সে''র চেয়েও, পাথরের প্রতিমার চেয়েও বেশি নীরব। ব্যাপার কী?'

রমেশ বলিল, 'নলির আজ ভারী মাথা ধরেচে। ও তো কিছুতেই আসবে না, আমি একরকম জোর করে ধরে নিয়ে এসেচি।'

অমিয় বলিল, 'তুমি অতিশয় পাষণ্ড, রমেশ! না নলিনী, তোমার শরীর যদি ভালো না থাকে, তবে তুমি ভেতরে যাও।' নলিনী চলিয়া যাইতে উদ্যত হইল। 'দাঁড়াও, আর-একটা কথা।'

নলিনী কোনোরকমে বলিল, 'কী?'

অমিয় সুমুখের টেবিলের উপর হইতে একখানা চকচকে, নূতন বাঁধানো বই তুলিয়া লইয়া বলিল, 'নলিনী, আমার একখানা কবিতার বই বেরিয়েছে। যে দেবীর নামে বইখানা উৎসর্গ করা হয়েছে, সে দেবী যদি প্রসন্না হন, তবেই আমার কলম ধরা সার্থক।' বলিয়া, অমিয় বইখানি নলিনীর হাতে দিল।

বইখানি হাতে করিয়া লইবার সময়ে নলিনী দেখিল, অমিয় কাতর অথচ মধুর মিনতিভরা চোখে তাহার দিকে তাকাইয়া আছে। সে দৃষ্টি যেন তিরের ফলার মতো নলিনীর প্রাণের মাঝখানে গিয়া বিঁধিল। বইখানা লইয়া সে দ্রুতপদে চলিয়া গেল।

আপনার ঘরে গিয়া নলিনী মেঝের উপরে বসিয়া পড়িল। তাহার বুক তখনও ধড়াস ধড়াস করিতেছিল।

অনেকক্ষণ পরে তার বুকের কাঁপন থামিল। তখন সে আস্তে আস্তে অমিয়ের বইখানা লইয়া পাতা উলটাইতে লাগিল। প্রথম দুই পৃষ্ঠা উলটাইতেই দেখিলে, উৎসর্গপত্র। সেখানে বড়ো বড়ো হরফে লেখা রহিয়াছে—

'স্নেহ ও ভালোবাসার চিহ্নস্বরূপ আমার এই কবিতাগুলি শ্রীমতী নলিনীদেবীর নামে উৎসর্গ করিলাম।'

উৎসর্গপত্রের দিকে নলিনী শূন্যদৃষ্টিতে চাহিয়া মূর্তির মতো বসিয়া রহিল। অনেকক্ষণ পরে সে বইখানা হাতে করিয়া উঠিয়া দাঁড়াইল। ঘরের এককোণে কেরোসিনের উজ্জ্বল 'ল্যাম্প' জ্বলিতেছিল। নলিনী কিছুমাত্র ইতস্তত না করিয়া বইখানা চিমনির উপরে ধরিল।

অমিয়ের সাধের উপহার লইয়া নলিনী অগ্নিদেবকে উপহার দান করিল। অগ্নিদেব সর্বভুক— এ উপহারে তাঁহার অরুচি হইল না।

* * *

বুড়া বয়সে কাঁদিয়া কাঁদিয়া ঠাকুরমার চোখ বুঝি গেল। যেদিন থেকে নলিনীর বিয়ের কথা শুনিয়াছেন, সেইদিন থেকে তিনি যেন পাগলের মতো হইয়া উঠিয়াছেন।

ছেলেকে তিনি অনেক বুঝাইলেন, তাহার কাছে অনেক কান্নাকাটি করিয়াছেন; কিন্তু তাঁহার প্রাণের বেদনা সে তো কিছুতেই বুঝিল না!

চোখের জল মুছিতে মুছিতে ঠাকুরমা বলিলেন, 'তবে আমাকে কাশীতে পাঠিয়ে দে বাবা! আমি থাকতে সংসারে এত বড়ো অধর্ম কখনোই ঘটতে দেব না।'

'হ্যাভানা' চুরুটে একটা টান দিয়া সুরেশবাবু বলিলেন, 'সে ভালো কথা। তোমাকে আমি কাশী পাঠাতেও রাজি আছি মা, কিন্তু নলির বিয়ে বন্ধ করতে কোনোমতেই রাজি নই।'

ঠাকুরমা বলিলেন, 'আচ্ছা, আমি অমিয়কে একবার বলে-কয়ে দেখব, আমার কথায় হয়তো নলিকে সে বিয়ে না করতেও পারে।'

সুরেশবাবু বিরক্ত হইয়া বলিলেন, 'সেসব কিছু কোরো না মা, তাতে কোনো ফল হবে না। অমিয় যদি নারাজ হয়, আমি তাহলে অন্যত্র নলির বিয়ে দেব।'

ঠাকুরমা হতাশ হইয়া চলিয়া গেলেন। ঠাকুরঘরে গিয়া কুলদেবতার উদ্দেশে তিনি জোড়হাতে কাতরে বলিলেন, 'হে ঠাকুর, সুরেশের মতিগতি ফিরিয়ে দাও, সংসারে এত বড়ো পাপকে ঢুকতে দিয়ো না, হে মা কালী, হে মা দুর্গা!'

ঠাকুরমা যে বংশের মেয়ে, সে বংশ সতীত্বের খ্যাতির জন্য বিখ্যাত। ঠাকুরমার দিদিমা স্বামীর সঙ্গে সহমরণে গমন করিয়াছিলেন। কেমন করিয়া সেই পরমা সতী আত্মীয়স্বজনের কোনো মানা না মানিয়া অটল পদে, একমাথা সিন্দূর ও সর্বাঙ্গে গহনা পরিয়া হাসিতে হাসিতে চিতায় গিয়া উঠিয়াছিলেন, নলিনীর কাছে ঠাকুরমা কতবার উজ্জ্বল ভাষায় সেই বর্ণনা বর্ণন করিয়াছেন। ঠাকুরমার মা-ও বিধবা হইবার পর 'তেরাত্রি' পোহাইতে-না পোহাইতে বিনা অসুখে কেবল মনের জোরে, প্রাণত্যাগ করিয়াছিলেন। সেসব পুণ্যকথা বলিতে বলিতে ঠাকুরমার চোখ দিয়া ঝরঝর করিয়া জল ঝরিয়া পড়িত। 'এমন বংশের রক্ত যার দেহে আছে, সে-ই কিনা আজ বিধবার বিয়ে দিতে চায়। হে হরি, হে দয়াময়, সুরেশকে সুমতি দাও ঠাকুর, আমি থাকতে তার যেন এ দুর্মতি না হয়।'

* * *

সেদিন গঙ্গার ঘাটে নলিনী যে কানাকানির আভাস পাইয়া আসিয়াছিল, সে কথাগুলা ক্রমে বড়ো হইয়া তাহার কানে প্রবেশ করিল। নলিনী শুনিল, পাড়ার বুদ্ধিমতীরা স্থির করিয়াছেন, এই বিবাহে সকলকার চেয়ে বেশি আগ্রহ নলিনীর। কথাগুলা শুনিয়া লজ্জায় যেন নলিনীর মাথা-কাটা যাইতে লাগিল। মুখে যারা হাসিয়া কথা কয়, বন্ধুত্ব জানায়, সুযোগ পাইলে তাহাদের জিভ যে কতটা নিষ্ঠুর হইয়া উঠিতে পারে, নলিনী সেদিন তাহা বেশ বুঝিতে পারিল।

এদিকে সুরেশবাবু বিবাহের দিন স্থির করিয়া ফেলিলেন।

রমেশ ঠিক করিল, বিবাহের আগে একবার নলিনীর মতটা জানা দরকার। তাই, সেদিন বৈকালে যখন অমিয় তাহাদের বাড়িতে আসিল, রমেশ তখন বলিল, 'দেখো অমিয়, নলিকে একবার জিজ্ঞাসা করে দেখো দেখি, এ বিবাহে তার মত আছে কি না।'

অমিয় বলিল, 'না ভাই, ও কাজটার ভার তোমরা কেউ নিলেই ভালো হয়। নলিনী যতই লেখাপড়া শিখুক, সে বাঙালির মেয়ে;— সে যদি বিড়ালাক্ষী মেরি হত, তা হলে আমি ''প্রোপোজ'' করতে পারতুম। মিছামিছি বেচারিকে লজ্জা দিয়ে লাভ কী?'

রমেশ বলিল, 'না না। সে যখন তোমার পত্নী হবে, তখন তোমার পক্ষে বিবাহের আগে ভালো করে তাকে বোঝা দরকার। তুমি বোসো, আমি নলিকে ডেকে আনছি।'

অল্পক্ষণ পরেই নলিনীকে সঙ্গে করিয়া রমেশ ফিরিয়া আসিল। নলিনী অত্যন্ত কুণ্ঠিতভাবে টেবিলের সামনের একখানা চেয়ারে বসিয়া পড়িল।

অমিয় বলিল, 'কেমন আছ, নলিনী? আজ তো তোমার মাথা ধরেনি?'

নলিনী সংক্ষিপ্ত উত্তর দিল, 'না।'

টেবিলের উপরে একখানা বাংলা মাসিক পত্র পড়িয়া ছিল, নলিনী হেঁট হইয়া অন্যমনস্কভাবে তাহার পাতা উলটাইতে লাগিল। এক জায়গায় একখানা ছবি রহিয়াছে, নাম 'বিধবা'। বিবাহবাড়ি, চারিদিকে হাসি-মাখা মুখ। এয়োরা সাজগোছ করিয়া কেহ শাঁখ, কেহ বরণ-ডালা, কেহ থালা লইয়া বর-কন্যাকে ঘিরিয়া উৎসবানন্দে মাতিয়া আছেন,— কাহারো মুখে বিষণ্ণতার চিহ্নমাত্র নাই।— এদিকে আঙিনার পাশে অন্ধকার ঘরে, মলিন শ্বেতবাস পরিয়া, এক নিরলংকারা বিধবা যুবতি একাকী দাঁড়াইয়া, কাতর চোখে বাহিরের সেই বিবাহ-সমারোহের দিকে তাকাইয়া আছেন। হায়, ওই উৎসবের মধ্যে তাঁহার প্রবেশাধিকার নাই, তাঁহার স্পর্শে নবদম্পতির অকল্যাণ হইবে।

নলিনী আগ্রহের সহিত ছবিখানি দেখিতে লাগিল।

এই অবসরে রমেশ ঘর ছাড়িয়া বাহির হইয়া গেল,— নলিনী কিছুই জানিতে পারিল না।

অমিয় বসিয়া বসিয়া নলিনীর মুখের দিকে— ভক্ত যেমন করিয়া প্রতিমার মুখের দিকে চাহিয়া থাকে, তেমনই করিয়া— চাহিয়া রহিল।

নলিনী তাহার সুমুখে কখনো মাথায় কাপড় দিত না— আজও দেয় নাই। সে তার কালো চুলগুলিকে এলাইয়া দিয়াছে,— কতক চুল তার পিঠে, কতক বুকের উপরে, কতক-বা কাঁধের উপরে আসিয়া ঘুমন্ত সাপের মতো এলাইয়া আছে। পরনে তার থান-কাপড়,— সেই শ্বেতবস্ত্রে তাহার সৌন্দর্যের দীপ্তি ও পবিত্রতা যেন আরও উজ্জ্বল হইয়া উঠিয়াছিল।

বিলাত যাইবার আগে অমিয় যখন নলিনীকে দেখিয়া গিয়াছিল, তখন তাহার বয়স কৈশোর ও যৌবনের মাঝামাঝি; কিন্তু ভরা যৌবন আসিয়া নলিনীর সেই ফুটন্ত দেহলতাকে এখন অপূর্ব শ্রীছাঁদে বসন্তের নবীন মালঞ্চের মতো পুরন্ত ও সুন্দর করিয়া তুলিয়াছে। নলিনীর সুডৌল নাসিকার ছায়ায় অধরের উপরে শিশিরবিন্দুর মতো ওই যে ঢলঢলে ঘামের ফোঁটাগুলি, ডানদিকের ফুলের মতো রাঙা নধর কপোলে ওই যে একটি ছোটো কালো তিল,— ওগুলি দেখিলে মনের ভিতর দিয়া যেন কীসের একটা প্রাণ-পাগল-করা ঝড় বহিয়া যায়!

নলিনী অত মনোযোগ দিয়া অবাক হইয়া কী দেখিতেছে? অমিয় একটু ঝুঁকিয়া পড়িয়া দেখিয়া লইল। ছবিখানি সে আগেই দেখিয়াছিল; সুতরাং নলিনীর এই মনোযোগের কারণ বুঝিতে তাহার দেরি হইল না।

সে বলিল, 'বাস্তবিক নলিনী, আমাদের দেশে বিধবাদের যে দুঃখ, তা ভাবলেও প্রাণ কেঁদে ওঠে।'

নলিনী লজ্জিতভাবে তাড়াতাড়ি মাসিক পত্রখানা মুড়িয়া বলিল, 'ভগবানের দণ্ড যারা মাথা পেতে নিতে জানে না, তাদের দুঃখ কে ঘোচাবে বলুন? পৃথিবীর দুঃখকে সহ্য করতে পারা, তাকে অস্বীকার করতে পারা, যে একটা মহাগৌরবের কাজ, এ কথা কি আপনি মানেন না অমিয়বাবু?'

অমিয় নলিনীর মুখ হইতে এরূপ উত্তরের প্রত্যাশা করে নাই। সে খানিক চুপ করিয়া রহিল; তারপর বলিল, 'কিন্তু ততটা মনের জোর, ততটা সহ্য করবার শক্তি এই দুর্বল পৃথিবীতে কজনের আছে?'

নলিনী, মুখ না তুলিয়াই তেমনইভাবে বলিল, 'হ্যাঁ, যারা সহ্য করতে পারে না, যারা মনুষ্যত্বকে কলঙ্কিত করতে পারে, তাদের জন্য সমাজ একটা উপায় স্থির করুক।'

'কী উপায়, বলো।'

'ধরুন, বিধবাবিবাহ।'

'এতে তোমার মত আছে?'

'আমার মত নেই; কারণ মানুষের এমন শোচনীয় অবস্থা, আত্মার এমন অধঃপতন আমি কল্পনাও করতে পারি না; তবে এইটুকু বলতে পারি যে, যারা দুঃখকে দুঃখ বলে স্বীকার করে না, যারা বৈধব্যকে ব্রত বলে, পূর্বজন্মের পাপের প্রায়শ্চিত্ত বলে গ্রহণ করে, তাদের যিনি বিবাহ দিতে চান, তিনি মহা অধর্ম করেন। আপনিও কি তা-ই বলেন না, অমিয়বাবু?'

অমিয় সোজাসুজি কোনো জবাব না দিয়া বলিল, 'দেখো, বিধবাদের বিবাহ দিলে, দেশ থেকে অনেক গুপ্ত পাপের বীজ নষ্ট হয়ে যায়।'

নলিনী মুখ রক্তবর্ণ করিয়া বলিল, 'দেখুন অমিয়বাবু, কম পাওয়া যায় বলেই জগতে ভালো জিনিসের আদর বেশি। সবাই সীতা-সাবিত্রী হলে, কবিরা আর বিশেষ করে সীতা-সাবিত্রীর কাহিনি রচনা করতেন না। বিধবাদের ভিতরেও হয়তো সকলে মনের মধ্য থেকে বল পান না, হয়তো কারো পদস্খলন হয়, হয়তো এমনই দুর্বলা বিধবার সংখ্যাই বেশি দেখা যায়। আমার তো মনে হয়, প্রকৃত বিধবার দেবীত্বও এইখানে; কিন্তু আদর্শ বিধবা অল্প বলে, আপনি সকলকার উপরে এক আইন জারি করে আদর্শের অপমান করতে পারেন না। কেমন, পারেন কি?'

অমিয় মৃদুস্বরে বলিল, 'না, তা পারি না।'

নলিনী বলিল, 'আদর্শ বিধবা দুঃখকে দুঃখ বলে স্বীকার করেন না। আপনারা যাকে দুঃখ বলে মনে করচেন, বিধবা হয়তো তাকে ব্রত বলে, কর্তব্য বলে, অগ্নিপরীক্ষা বলে হাসিমুখে সব সহ্য করে থাকেন। আপনি বলবেন, এরকম দুঃখকষ্ট সওয়া মানুষের পক্ষে স্বাভাবিক নয়। আমি বলি, স্বাভাবিক নয়, তাই বিধবার গৌরব। ইন্দ্রিয়সংযম করে লোকে যে সন্ন্যাস-ব্রত নেয়, বৈধব্য-ব্রতের চেয়ে তাতে কি কম কঠোরতা? নিশ্চয়ই নয়। বিধবাদের বৈধব্য-ব্রত পালন করতে হয় বলে আপনাদের যখন কান্না পায়, তখন সন্ন্যাস-ব্রতের বেলায় আপনারা বিদ্রোহিতা করেন না কেন? আমি তো বলি, সন্ন্যাস-ব্রতকে যাঁরা সম্মানের চোখে দেখেন, বৈধব্য-ব্রতকেও তাঁদের সেইভাবে দেখা উচিত।'

অমিয় বলিল, 'এইখানে তুমি মস্ত ভুল করচ নলিনী! মানুষ সন্ন্যাস-ব্রত নেয়— স্বেচ্ছায়। আর অসহায়া রমণীর উপরে বৈধব্য-ব্রত এসে পড়ে— বজ্রাঘাতের মতো— তার অনিচ্ছাকে অগ্রাহ্য করে। যাতে ইচ্ছা নেই, তাকে কি সহ্য করা চলে?'

নলিনী বলিল, 'কেন চলবে না? গোড়া থেকে আমরা যদি তেমন শিক্ষা পাই, এই দুঃখের পৃথিবীতে সকলরকম দুঃখের জন্য সর্বদাই যদি আমরা প্রস্তুত থাকতে পারি, সর্বত্রই আমরা যদি ভগবানের মঙ্গল হস্ত, কর্মফলের পরিণাম দেখতে পারি, তাহলে আর দুঃখ কী, দুঃখ কোথায়? যারা এমন শিক্ষা পায়নি, সংসারে ইন্দ্রিয়ই যাদের কাছে বড়ো, তারা আপনাদের বিধানমতো চলতে চায়, চলুক অমিয়বাবু! কিন্তু এক কাঠগড়ায় সকলকে পুরে বিধবার অপমান করবেন না, করবেন না।'

নলিনী অত্যন্ত উত্তেজিত হইয়া এতক্ষণ পরে মাথা তুলিয়া অমিয়ের দিকে চাহিল; দেখিল, অমিয়ের নিষ্পলক মুগ্ধ নেত্র তাহার মুখের উপরে চিত্রের মতো স্থির হইয়া আছে। সে দৃষ্টিতে নলিনী তর্কের কোনো ভাব পাইল না— যাহা পাইল, তাহাতে সে চকিত, ভীত ও স্তব্ধ হইয়া গেল,— আরে, এ কী! দাদা কোথায়?

রমেশ তাহাকে এখানে একেলা রাখিয়া চলিয়া গিয়াছে, আর সে এতক্ষণ ধরিয়া অমিয়বাবুর সঙ্গে নিজে বিধবা হইয়াও বিধবাবিবাহ লইয়া তর্ক করিতেছে! নলিনী বুঝিল, রমেশের চলিয়া যাওয়ার কোনো গূঢ় অর্থ আছে।— কী অর্থ? নলিনী একেবারে বোবা হইয়া আবার মাথা হেঁট করিয়া বসিয়া রহিল।

কেহ কোনো কথা কহিল না,— এমনই অনেকক্ষণ গেল। অমিয় একদৃষ্টিতে তাকাইয়া দেখিতে লাগিল, তর্কের তাপে নলিনীর কপোলে যে গোলাপি আভা ফুটিয়া উঠিয়াছিল, এখন কেমন করিয়া সে রংটুকু অল্পে অল্পে মিলাইয়া যাইতেছে।

নলিনী বলিল, 'আমি এখন আসি অমিয়বাবু।'

অমিয় একটু দুঃখিতভাবে বলিল, 'তোমার দাদা চলে গেছেন বলে, তোমারও পালাবার কোনো দরকার নেই। আমি নরমাংসপ্রিয় রাক্ষস নই, মানুষকে ভক্ষণ করা আমার অভ্যাস নয়।'

নলিনী উঠিতে উঠিতে অপ্রস্তুত হইয়া আবার বসিয়া পড়িল।

একটু ইতস্তত করিয়া অমিয় বলিল, 'নলিনী, ভালো করে শোনো, তোমার সঙ্গে একটা কথা আছে।'

কথা! এই কথাটার ভয়েই নলিনী যে এখান হইতে পলাইয়া বাঁচিতে চায়! সে কোনো জবাব দিল না, চেয়ারের উপরে জড়সড় হইয়া বসিয়া ঘামিতে লাগিল।

চেয়ারখানা সরাইয়া নলিনীর আর-একটু কাছে সরিয়া আসিয়া অমিয় বলিল, 'তোমার পিতা, আমার সঙ্গে তোমার বিবাহ দিতে চান, এ কথা তুমি নিশ্চয়ই জানো।'

নলিনী মুখ তুলিতে গিয়া পারিল না। সে কাপড়চোপড়গুলো ভালো করিয়া গায়ের উপরে টানিয়া দিয়া আড়ষ্ট হইয়া রহিল।

অমিয় তাহার সুমুখে হেঁট হইয়া বলিল, 'এ বিবাহে আমার দিক থেকে কোনো আপত্তি নেই; কিন্তু বিবাহের আগে তোমার মত জানাটা দরকার মনে করি।'

নলিনী মৃদু, অস্পষ্ট, কম্পিতস্বরে থামিয়া থামিয়া বলিল, 'কী জানতে চান?'— তাহার পর ঘন ঘন শ্বাস পড়িতে লাগিল।

অমিয় একবার চোখ তুলিয়া দেখিল, নলিনীর পাতলা পাতলা ননির মতো নরম ঠোঁট দুখানি নড়িয়া নড়িয়া উঠিতেছে আর ফাঁকে ফাঁকে কর্পূরর মতো ধবধবে, মুক্তার মতো সার-গাঁথা দাঁতগুলি দেখা যাইতেছে। সে মিনতিপূর্ণ কোমলস্বরে বলিল, 'তুমি আমাকে বিবাহ করবে কি না, আমি তা-ই জানতে চাই নলিনী! মনে রেখো, তোমার একটি ''না'' কি ''হাঁ''র উপরে আমার সমস্ত ভবিষ্যৎ, সমস্ত সুখ-দুঃখ, সমস্ত আশাভরসা নির্ভর করচে। চুপ করে থেকো না— বলো, বলো, বলো।'— অমিয় হঠাৎ আবেগ সামলাইতে না পারিয়া, দুই হাতে নলিনীর দুই হাত চাপিয়া ধরিল।

নলিনীর মুখ একেবারে মড়ার মতো সাদা হইয়া গেল এবং প্রথমটা সে স্তম্ভিত হইয়া বসিয়া রহিল। তাহার বুক একবার উঠিতে ও একবার নামিতে লাগিল,— হৃদয়ের ভিতরে তার বন্দি প্রাণ তখন যেন গভীর যন্ত্রণায় ছটফট করিতেছিল! কিন্তু তাহার পরেই চকিতে আপনার হাত টানিয়া লইয়া উচ্চ, তীব্র ভর্ৎসনার স্বরে নলিনী বলিল, 'অমিয়বাবু!'

অমিয় মূঢ়ের মতো চাহিয়া দেখিল, নলিনীর কুপিত নয়ন যেন বাজের মতো আগুনভরা।

নলিনী দাঁড়াইয়া উঠিয়া ভ্রূকুটি করিয়া বলিল, 'অমিয়বাবু! জানেন আমি বিধবা! আপনি আমাকে অপমান করতে সাহস করেন?'

অপরাধীর মতো মাথা নিচু করিয়া জড়িতস্বরে অমিয় বলিল, 'আমাকে মাপ করো নলিনী। আমি তোমাকে অপমান করতে যাইনি।'

নলিনী নীরবে দ্বারের দিকে অগ্রসর হইল।

অমিয় সকাতরে বলিল, 'যেয়ো না নলিনী! আমার কথার একটা উত্তরও দিয়ে যাও।'

'আপনি আমার গায়ে হাত দিয়ে উত্তর চান! আপনার যা জিজ্ঞাসা করবার আছে, বাবাকে জিজ্ঞাসা করবেন— আমাকে নয়!'

না দাঁড়াইয়া, পিছনপানে না তাকাইয়া, এই কথা বলিতে বলিতে নলিনী রাজ্ঞী-মহিমায় বিদ্যুতের মতো ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল।

সেকেলে ঠাকুরমা

সাঁঝের সময়ে ঠাকুরঘরে সন্ধ্যা দিয়া, ঠাকুরমা দরজার চৌকাঠের পাশটিতে বসিয়া হরিনামের মালা ফিরাইতেছিলেন।

নলিনী আসিয়া ধন্না দিয়া পড়িল, 'ঠাকুরমা, আজ একবার তোমার দিদিমার সহমরণের গল্প বলো।'

হরিনামের ঝুলিটি তিনবার কপালে ছুঁয়াইয়া ঠাকুরমা বলিলেন, 'যে পাপ সংসারে এসে পড়েচি, এখানে সেসব পুণ্যের কথা বলতে আমার মন সরে না বাছা!'

নলিনী ঠাকুরমার পায়ে হাত বুলাইয়া দিতে দিতে বলিল, 'যেখানে পাপ, সেইখানেই তো পুণ্যের কথা বলতে হয় ঠাকুরমা!'

ঠাকুরমা ম্লান হাসি হাসিয়া বলিলেন, 'তবে শোন বাছা!'

হরিনামের ঝুলিটি দেয়ালের একটি পেরেকে টাঙাইয়া রাখিয়া ঠাকুরমা আরম্ভ করিলেন, 'দাদাবাবু যখন বিদেশে মারা পড়েন, আমরা তখন জন্মাইনি। মারা যাবার আগে দাদাবাবু, দিদিমাকে আনবার জন্যে ছেলেকে দেশে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। এদিকে রাতে কু-স্বপন দেখে দিদিমা সারা সকালটা কারো সঙ্গে কথাবার্তা কননি। ছেলে যখন কাঁদো-কাঁদো মুখে এসে তাঁর সঙ্গে দেখা করল, তখন কিছু বলবার আগেই দিদিমা বললেন, ''বুঝেচি বাবা, আমার পোড়াকপাল পুড়েচে। চলো, এখুনি আমি তোমার সঙ্গে যাব।''— ছেলের সঙ্গে দিদিমা দাদাবাবুর কাছে গিয়ে দেখেন, সব শেষ। দেখে তিনি কাঁদলেনও না, একফোঁটা চোখের জলও ফেললেন না। খালি বললেন, ''তোমরা সব জোগাড়যন্ত্র করো, আমি সহমরণে যাব।'' তা-ই শুনে, সেখানে আত্মীয়স্বজন যাঁরা যাঁরা ছিলেন, সবাই মিলে দিদিমাকে হাতে-পায়ে ধরে মানা করতে লাগল। দিদিমা প্রথমে কারো কোনো কথায় জবাব দিলেন না। শেষটা বিরক্ত হয়ে বললেন, ''তোমরা আর আমায় জ্বালার ওপরে জ্বালা দিয়ো না। আমি ওঁর সঙ্গে না গেলে, স্বর্গে গিয়েও উনি শান্তি পাবেন না।''— এ কথার ওপরে কেউ আর কোনো কথা কইতে পারলে না। দিদিমা নতুন লালপেড়ে শাড়ি পরলেন, এক-গা গয়না পরলেন, ভালো করে মাথায় জ্বলজ্বলে সিঁদুর, পায়ে টকটকে আলতা পরলেন; স্বামীর সঙ্গে স্বর্গে যাবেন, মুখে হাসি আর ধরে না! চারিদিকে হইচই পড়ে গেল, রাজ্যের যে যেখানে ছিল, সবাই শ্মশানের ওপরে ভেঙে পড়ে দো-সারি কাতার দিয়ে দাঁড়াল, সবাই ধন্যি-ধন্যি করতে লাগল; কেউ এসে পায়ের ধুলো নেয়, এয়োরা এসে দিদিমার মাথার সিঁদুর চেয়ে নেয়, ঢুলিরা ঢাকঢোল বাজাতে শুরু করলে, চন্নন কাঠের চিতায় ঘড়া ঘড়া ঘি ঢালা হল, ধূপ-ধুনো জ্বেলে দেওয়া হল,— আহা, কে বলবে সে শ্মশান, যেন রাজ-অট্টালিকা! দিদিমার মুখে কথা নেই, কিন্তু হাসি আছে,— হাসতে হাসতেই তিনি শ্মশানে এসেছিলেন, হাসতে হাসতেই চিতায় গিয়ে উঠলেন, হাসতে হাসতেই স্বামীর পায়ে প্রণাম করে, তাঁর পাশে গিয়ে শুলেন। ধু ধু করে আগুন জ্বলে উঠল— কিন্তু দিদিমা একটুও নড়লেন না, একটুও শব্দ করলেন না— তিনি সতীত্বের জোরে ডঙ্কা মেরে হাসতে হাসতেই স্বর্গে স্বামীর সেবা করতে চলে গেলেন। চারিদিক থেকে এয়োরা সব প্রণাম করে বলতে লাগল, ''এমন মরণ যেন জন্মে জন্মে মরি!'' ...'

বলিতে বলিতে চোখের জলে ঠাকুরমার বুক ভাসিয়া যাইতে লাগিল,— সেই পবিত্র, স্বর্গীয় দৃশ্য তাঁহার চোখের সামনে যেন উদ্ভাসিত হইয়া উঠিল, সন্ধ্যার আধ-অন্ধকার আকাশের দিকে চাহিয়া বহুক্ষণ নীরবে বসিয়া বসিয়া তিনি যেন তাহাই দেখিতে লাগিলেন। অবশেষে হঠাৎ তিনি নলিনীর দুই হাত চাপিয়া ধরিয়া আবার বলিলেন, 'কী বংশের রক্ত তোর গায়ে আছে, একবার ভেবে দেখ দেখি বাছা! তোর কী হবে নলি, তোর কী হবে!'

নলিনীও কাতরস্বরে ঠাকুরমার কথার প্রতিধ্বনির মতো বলিল, 'আমার কী হবে ঠাকুরমা, আমার কী হবে!'

ঠাকুরমা দুঃখের সহিত বলিলেন, 'তুই তো এ বাড়ির মতো নোস নলি! তবে বিধাতাপুরুষ তোর কপালে এমন কলঙ্কের কালি মাখিয়ে দিচ্চেন কেন?'

নলিনী সবেগে মাথা নাড়িয়া কহিল, 'না ঠাকুরমা, না! কলঙ্কের কালি যে মাখে সে মাখুক, আমি মাখব না— কক্ষনো না, কক্ষনো না!'

ঠাকুরমা নলিনীর চোখের উপরে স্থির দৃষ্টিপাত করিয়া বলিলেন, 'তা-ই হোক বাছা, তা-ই হোক! দেখ-না নলি, তুই আমার বুকের নিধি— দেবতা ছাড়া তোর মতো আর কাউকে আমি এত ভালোবাসি না; তোর পায়ে কাঁটা ফুটলে মনে হয়, সে আমার প্রাণে বিঁধল! কিন্তু আজ যদি তুই মরে যাস, তাহলে আমার মতো সুখী আর কেউ হয় না, আর কেউ হয় না!'

নলিনী ঠাকুরমার বুকের ভিতরে মুখ লুকাইয়া দুই হাতে তাঁহার গলা জড়াইয়া ধরিয়া ফুঁপাইতে ফুঁপাইতে বলিল, 'সত্যি ঠাকুরমা, আমি যদি মরি, তুমি তাহলে কাঁদো না— তুমি হাসো?'

ঠাকুরমা নলিনীর গালে সস্নেহে চুমা খাইয়া অশ্রুরুদ্ধ কণ্ঠে বলিলেন, 'হ্যাঁ মা, কলঙ্কের চেয়ে বিধবার মৃত্যু ভালো!'

নলিনী ঘুমাইতে গেল।

ঘরের দেওয়ালে তাহার স্বামীর একখানি 'ফোটো' টাঙানো আছে, নলিনী অপলক ঊর্ধ্বনেত্রে সেই চিত্রের দিকে তাকাইয়া, দাঁড়াইয়া ছিল। ছবির মূর্তির মুখে সেই সরল, মধুর হাসি,— যে হাসি দেখিয়া একদিন সে বিশ্বের সমস্ত ভুলিয়া যাইত।

নলিনী ছবিখানি দেওয়াল হইতে নামাইয়া প্রাণপণে আপন বুকের উপরে চাপিয়া ধরিল,— এত জোরে যে,— কাচখানা 'ফ্রেম' হইতে ভাঙিয়া টুকরা টুকরা হইয়া ঘরের মেঝেতে ছড়াইয়া পড়িল; কিন্তু সেদিকে নলিনী ভ্রূক্ষেপও করিল না,— দুই চক্ষু বুজিয়া গভীর শান্তিতে যেন সে অনেকদিন পরে আবার হারিয়ে-যাওয়া দুখানি বাহুর নিবিড় আলিঙ্গনের ফিরিয়ে-পাওয়া স্পর্শসুখ অনুভব করিতে লাগিল।

নলিনীর মনে পড়িল, বিবাহের কিছুদিন পরে স্বামীর সঙ্গে একদিন তার তর্ক বাধিয়াছিল যে, আগে কে মরিবে?

তাহার স্বামী বলিয়াছিলেন, 'দেখো, তোমার আগে আমি যাব, আমাকে তুমি ফাঁকি দিতে পারবে না।'

নলিনী, স্বামীর কোলে মাথা রাখিয়া জোরের সহিত বলিয়াছিল, 'আমি যদি সতী হই, তবে আমি তোমাকে রেখে যাবই যাব।'

তার সে জোর আজ কোথায়? যে সতীত্বের বড়াই সে করিয়াছিল, আজ যে তাতেও কলঙ্কের ছাপ পড়িবার জো হইয়াছে! তিনি যখন গিয়াছেন, শূন্য প্রাণের মায়া তখনও সে ছাড়িতে পারে নাই; আর আজ, কলঙ্কের আশঙ্কার ভিতরেও সে এই অন্ধকার, নিঃসঙ্গ জীবনকে এখনও আঁকড়াইয়া ধরিয়া বাঁচিয়া আছে,— হা রে ছার মায়া!

নিঝুম রাতে ঘরের চিরজাগন্ত ঘড়িটা অশ্রান্তভাবে আওয়াজ করিতেছিল,— টিক, টিক, টিক। নলিনীর বোধ হইল, ঘড়ি যেন টিটকিরি দিয়া তাহাকে বলিতেছে,— ধিক, ধিক, ধিক।

আস্তে আস্তে সে বাক্সটা খুলিল। ভিতরে লাল, রেশমি সুতায় বাঁধা একতাড়া কাগজ,— সেগুলি তার স্বামীর চিঠি। নলিনী বাঁধন খুলিয়া এক-একখানি করিয়া চিঠিগুলি পড়িতে লাগিল, আর সঙ্গে সঙ্গে অতীত যেন জীবন্ত হইয়া তাহার প্রাণের লুকানো ঘরটি ভরিয়া তুলিল। এই চিঠিগুলির প্রত্যেকখানি কত আশার, কত অপেক্ষার, কত পথ-চাওয়ার পর ডাক-পিয়োনের 'ব্যাগ' হইতে তাহার হাতে আসিয়া পড়িত! এগুলি পড়িতে পড়িতে প্রেমের সোহাগে কতদিন সে না কাঁদিয়া থাকিতে পারিত না,— কোনো কোনো চিঠির হরফে এখনও সেই শুষ্ক অশ্রুর দাগ লাগিয়া রহিয়াছে। পত্রপাঠ করিতে করিতে অশ্রুজলে আজও তাহার চোখ ছাপিয়া উঠিল;— কিন্তু সে ছিল আনন্দের অশ্রু; আর এ সে আজ নিরানন্দের নয়নধারা!...

নলিনী ঘরের সামনের বারান্দায় গিয়া দাঁড়াইল।

উপরে ঘুমন্ত নীলিমা— সুমুখে চঞ্চল গঙ্গা। আকাশ উপচাইয়া চাঁদের আলো পৃথিবীতে ঝরিয়া যেন মৌন গীতিময়ী স্বপ্নপুরী রচনা করিতেছে; গঙ্গাজলে তরঙ্গদল দীপালি উৎসবে মত্ত হইয়া কলহাস্যে নৃত্য করিয়া তীরে তীরে টলিয়া পড়িতেছে!

দূরের কোন নৌকা হইতে দখিনা বাতাস এক মেঠো সুর বহিয়া আনিল—

'যা রে কোকিলা তুই

আমার প্রাণপতি গেছে যে দেশে,—

শুনে তোর কুহুস্বর

উসকে ওঠে পরান আমার,

প্রাণপতি মোর গেছে গাঙের পার—

(ও তুই) ছাড় গে তথা কুহুস্বর—'

কিন্তু, পোড়া কোকিল তবু থামিল না; কোথায় লুকাইয়া সে অবোধ আপনমনে যেমন ডাকিতেছিল, তেমনই ডাকিতে লাগিল, কুহু কুহু কুহু!

আর-একদিন অমনই কোকিল ডাকিয়াছিল। নলিনীর প্রাণপটে স্মৃতি কবেকার এক ছবি আঁকিয়া দিল। এমনই এক পূর্ণিমার রাতে, এমনই ঝলমলে জ্যোৎস্নায়, এমনই ঝলমলে গঙ্গাজলে স্বামীর সঙ্গে বোটে করিয়া, তীর ছাড়িয়া সে কতদূর চলিয়া গিয়াছিল। তাঁহার কোলে মাথা রাখিয়া নলিনী চাঁদকে দেখিতে দেখিতে, ঢেউয়ের হাসি, হাওয়ার গান শুনিতে শুনিতে ঘুমাইয়া পড়িয়াছিল— তারপর স্বামীর আদরভরা চুম্বনে আবার সে জাগিয়া উঠিয়াছিল।

নলিনী আজ আবার ঘুমাইবে। হাঁ, মনকে শক্ত করিয়া অনেকক্ষণ থেকে সে প্রস্তুত হইয়া আছে! আর দেরি নয়।

স্বামীর ছবি বুকে চাপিয়া, নলিনী পা টিপিয়া টিপিয়া অতি সন্তর্পণে নীচে নামিয়া গেল।...

এই তো গঙ্গার ঘাট! কোনোদিকে কোনো সাড়াশব্দ নাই— শুধু গঙ্গাজলে মৃদু মৃদু ঢেউয়ের বীণায় রহিয়া রহিয়া জ্যোৎস্না-রাগিণী বাড়িয়া উঠিতেছে।

রাত্রি যেন স্তব্ধ হইয়া নেত্রহীন নেত্র মেলিয়া নলিনীর দিকে দৃষ্টিপাত করিয়া আছে!

নলিনী ঘাটের সোপান দিয়া নামিতে লাগিল,— ধীরে, ধীরে, ধীরে। মৃত্যুঘুমে তাহার আত্মা আচ্ছন্ন হইয়া আসিল। এই নিরালা জগতে, এই ফুটফুটে চাঁদের আলোকে, এই সংগীতময়ী রজনিতে স্বামীর ছবি বুকে করিয়া এবার ঘুমাইবে, সে ঘুমাইবে!...

মর্মবাণী ২০ আশ্বিন ১৩২২ (সেপ্টেম্বর ১৯১৫)

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%