হেমেন্দ্রকুমার রায়
অমন যে সোনার টুকরো ভামিনী,— চুরুট-তামাক তো দূরের কথা, পান-সুপুরি পর্যন্ত তিনি স্পর্শ করতেন না! তাঁরও কিন্তু মস্ত একটি নেশা ছিল;—সেটি হচ্ছে গোয়েন্দা-কাহিনি পড়া।
আপিস থেকে বাড়ি ফেরা এবং ঘুমিয়ে পড়ার মধ্যে যে নিজস্ব সময়টুকু পাওয়া যেত, সেটুকু ভামিনী গোয়েন্দা-কাহিনি পড়ে দিব্যি অনায়াসেই কর্তন করে ফেলতেন। এডগার আলেন পো, গে-বোরিও, কন্যান ডইল, ডিক ডনোভ্যান ও মরিস লেবলাঙ্ক প্রভৃতি বিখ্যাত লেখকদের গোয়েন্দা-কাহিনিগুলি, ভামিনীভূষণ দস্তুরমতন গুলে ভক্ষণ করেছিলেন বললেও চলে। তা ছাড়া আজেবাজে ডিটেকটিভ উপন্যাসও তিনি যে কত পড়েছেন, তা আর গুনতিতে আসে না। সেসব গল্পের ঘটনা পড়লে ভামিনীভূষণ ছাড়া অন্য যেকোনো লোকের মাথার চুলগুলো নিশ্চয়ই শজারুর কাঁটার মতো খাড়া হয়ে উঠত। কিন্তু ভামিনীর মাথার চুল যে খাড়া হয়ে উঠত না, তার একমাত্র যুক্তিসংগত কারণ, যৌবনেই তাঁর উত্তমাঙ্গের শীর্ষদেশে প্রকাণ্ড একটি টাকের সৃষ্টি হয়েছিল এবং সেই মরুভূমির মধ্যে প্রাণপণে চুলের আবাদ করতে চেষ্টা করেও, ভামিনী কিছুতেই তাতে কৃতকার্য হতে পারেননি।...
সেদিনও ভামিনী সন্ধের সময়ে ঘরের কোণে বসে, চিমনির আধখানায় কালি-মাখা একটা হ্যারিকেন লন্ঠনের আলোতে, খুব মন দিয়ে শার্লক হোমসের একটি বাহাদুরির ইতিহাস পড়ছিলেন। দু-তিনখানা পাতা ওলটাবার পর, কেতাবের মাঝখান থেকে হঠাৎ কী একখানা কাগজ বেরিয়ে মাদুরের উপরে পড়ে গেল। ভামিনী আস্তে আস্তে সেখানা তুলে নিয়ে দেখলেন, একখানা চিঠি। তিনি লেখাগুলোর উপরে একবার চোখ বুলিয়ে গেলেন, লেখা আছে,—
'জীবনেশ্বর,
যাবার দিনে সেই যে তুমি রাগ করে চলে গেলে, তারপর আজ পর্যন্ত আর একখানিও চিঠি লিখলে না। প্রাণেশ্বর, তোমার বিরহে এখানে আমি যে কী মনঃকষ্টে দিন কাটাচ্ছি, তা তো তুমি জানো না! হে নাথ, দয়া করে একখানা চিঠি লিখো, দুটো ভালোবাসার কথা বোলো! তা নইলে আমি এখানে থাকতে পারব না, পালিয়ে তোমার কাছে চলে যাব। লোকে নিন্দা করে করুক। হেবোকে নিয়ে কোনোরকমে—'
এইখানেই চিঠিখানা হঠাৎ শেষ হয়েচে,— যেন লিখতে লিখতে আর লেখা হয়নি।
...ভামিনীর হাত থেকে শার্লক হোমসের বাহাদুরির ইতিহাসখানা ধুপ করে পড়ে গেল। চিঠিখানা হাতে নিয়ে আড়ষ্ট হয়ে তিনি বসে রইলেন— অনেকক্ষণ।
তারপর তিনি আবার একবার চিঠিখানা পড়ে দেখলেন। নাঃ,—কোনো সন্দেহ নেই, এ দুর্গাকালীর হাতের লেখাই বটে তার উপরে চিঠিতে হেবোর নাম রয়েচে—হেবো তাঁর নিজের ছেলের নাম! চিঠিখানা তিনি উলটে-পালটে দেখলেন, যে কাগজে লেখা হয়েচে তাও তাঁরই আপিসের কাগজ। আপিস থেকে তিনি প্রায়ই কাগজ হাতিয়ে (বলা বাহুল্য, গোপনে) নিয়ে আসতেন, এ তারই একখানা।
ভামিনীর বুকের শিরগুলো যেন পটপট করে ছিঁড়ে গেল! কী ভয়ানক! যে দুর্গাকালীর মুখ চেয়ে তিনি মাথার ঘাম পায়ে ফেলে পরের দাসত্ব করচেন, যাকে তিনি স্বর্গের দেবী ভেবে প্রাণমন দিয়ে এতদিন ভালোবেসে আসচেন,— তার কিনা এই কাজ! স্বামীর সংসারে বসে পরপুরুষকে কুৎসিত চিঠি লেখা!
তাঁর ভ্রম হয়নি তো? না,— ভ্রম কী করে হবে? দুর্গাকালীর হাতের লেখা যে তিনি সহস্রবার দেখেচেন,— নিজের স্ত্রী-র লেখা—সে কি ভুল হবার জো আছে? তার উপরে চিঠির কাগজেও তাঁর আপিসের মার্কা মারা, চিঠিতে হেবোর নাম রয়েচে, চিঠিখানা পাওয়াও গেছে তাঁর কেতাবের ভিতরে,— নিশ্চয়ই দুর্গাকালী লিখতে লিখতে শেষ না করতে পেরে, চিঠিখানা তাঁর কেতাবের ভিতরে ভুলে ফেলে রেখে গিয়েচে— ধর্মের কল বাতাসে নড়েচে।
আবার লিখেচে কিনা লোকনিন্দার ভয় না রেখে পালিয়ে যাবে! অ্যাঁ, এত বড়ো শক্ত কথাটা লিখতে তার হাত একটুও কাঁপল না?
কেন, কীসের অভাব তার? অবশ্য, তাঁর চেহারাটি দেখতে ঠিক কার্তিকের মতো ততদূর সুশ্রী নয়,— কিন্তু তিনি ন্যায়িত ধর্মত তার স্বামী তো বটে! সীতা-সাবিত্রীর দেশে জন্মে, হিন্দু-স্ত্রী হয়ে স্বামীতে অরুচি! জগতে সুশ্রী চেহারাই কি সব? যত্ন-স্নেহ, মমতা-আদর, প্রেম-ভালোবাসার কি কোনোই মূল্য নেই?
ভাবতে ভাবতে ভামিনীর চোখে জল এল,— না কেঁদে তিনি থাকতে পারলেন না।
হেবো সামনে বসে দুলতে দুলতে পড়া মুখস্থ করছিল— মনের আবেগে ভামিনী তার কথা একেবারেই ভুলে গিয়েছিলেন। অকারণে তাঁকে কাঁদতে দেখে তার পড়া ও দোলা, দুইই একসঙ্গে এক মুহূর্তে বন্ধ হয়ে গেল। সে যারপরনাই আশ্চর্য হয়ে চক্ষু বিস্ফারিত করে বললে, 'বাবা, তুমি কাঁদচ কেন?'
ভামিনী এক ধমক দিয়ে মুখ খিঁচিয়ে বলে উঠলেন, 'রাস্কেল, বাপের সঙ্গে জ্যাঠামো? আমি কাঁদচি? কোথায় কাঁদচি? যাঃ— বেরো এখান থেকে!'
এত সহজে পড়ার দায় থেকে নিস্তার পেয়ে হেবো একটিমাত্র লাফে একেবারে চৌকাঠ ডিঙিয়ে বাইরে গিয়ে পড়ল।
ভামিনী মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে ফেললেন, এর একটা হেস্তনেস্ত করে তবে আমি ছাড়ব! পাপিষ্ঠা দুর্গাকালীকে এখন কোনো কথা বলা হবে না— কোন শয়তান আমার বংশে কলঙ্ক দিতে চায়— আগে তার সন্ধান নিতে হবে, তারপর দুর্গাকালীর শাস্তি। আমি নরম হতেও পারি, শক্ত হতেও জানি।
একগাছি মাত্র চুলের, একটিমাত্র ভাঙা বোতামের, জামা থেকে ছেঁড়া একটি সুতোর সাহায্যে, ডিটেকটিভ উপন্যাসের গোয়েন্দারা কত বড়ো বড়ো অপরাধীকে গ্রেপ্তার করেচে, আর এত বড়ো প্রমাণ হাতে পেয়েও আমি এই স্পষ্ট ব্যাপারটার একটা কিনারা করতে পারব না? নিশ্চয়ই পারব!
খ
ভামিনীভূষণ বেশ জানতেন যে, গোয়েন্দাগিরির প্রথম কথা হচ্ছে, কাউকেই বিশ্বাস না-করা। কিন্তু নিজের স্ত্রী-কে অবিশ্বাস করতে তাঁর মন কিছুতেই রাজি হচ্ছিল না। আজ পাকা দশটি বৎসর দুর্গাকালীকে বিশ্বাস করে করে, বিশ্বাস করাটাই তাঁর একটা বদ অভ্যাসের মধ্যে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল।
আর আসল কথা বলতে কী, স্ত্রী-কে অবিশ্বাস করবার কোনো চাক্ষুষ প্রমাণ আজ পর্যন্ত তিনি পাননি। দুর্গাকালীর জিভ একটু বেশিরকম ধারালো হলেও, স্বামীকে যত্ন-আদর করতে কোনোদিনই সে নারাজ ছিল না। আপিস থেকে বাড়ি ফিরেই তিনি জলখাবারের থালাটি ঠিক নিয়মিত সময়েই হাতের কাছে পেয়েছেন। যেচে এসে গায়ে হাত বোলানো, পরিপাটি করে চাদর-কাপড় কুঁচিয়ে রাখা, ঝিনুক দিয়ে ঘামাচি মেরে দেওয়া, গুমোটের সময়ে নিজে জেগে পাখার হাওয়া করে স্বামীকে ঘুম পাড়ানো,—এসব আদরের খাঁকতি ভামিনীভূষণ কোনোদিনই অনুভব করেননি।
কিন্তু দুর্গাকালীকে অবিশ্বাস না করলে তো চলবে না,—কাজেই ভামিনীভূষণ আজকাল মনকে চোখ ঠেরে বুঝিয়ে, জোর করে তাকে অবিশ্বাস করতে লাগলেন।
দুর্গাকালী তাঁকে আদর করলে তিনি এখন আর একটুও গলে যান না, খুব শক্ত হয়ে মনে মনে বলেন, সাবধান মন, সাবধান! আজ দশ বচ্ছর কামিনীর ছলনায় তুমি বেকুব বনে আসচ—আর নয়, এবারে সচেতন হও—উত্তিষ্ঠত! জাগ্রত!
দুর্গাকালীকে হাতেনাতে ধরে ফেলবার জন্যে আজকাল প্রায়ই তিনি আপিস থেকে অসময়ে ছুটি নিয়ে হঠাৎ বাড়িতে ফিরে আসেন,—কিন্তু কোনোদিন দেখেন, দুর্গাকালী একখানা হালফ্যাশনের তুলোর প্যাড দিয়ে রেশমে বাঁধানো নভেলকে বালিশে পরিণত করে, নিদ্রাসুখে নিমগ্ন হয়ে আছে, কোনোদিন বা দেখেন, পাড়ার মেয়েদের সঙ্গে পরম উৎসাহে সে তাস খেলচে, গল্প করচে।
কিন্তু দুর্গাকালীর বিরুদ্ধে যতই প্রমাণের অভাব হতে লাগল, ভামিনীভূষণের সন্দেহ ততই বাড়তে থাকল। তিনি বুঝলেন, রহস্য ক্রমেই গভীর হয়ে উঠচে।
দুর্গাকালীও স্বামীর এই আকস্মিক ও অভাবিত পরিবর্তনে প্রথমটা ভারী অবাক হয়ে গেল। স্বামীর গায়ে হাত বুলিয়ে দিতে গেলে, ভামিনী এখন বিরক্ত হয়ে জোর করে তার হাতটা ঠেলে সরিয়ে দেন, হেসে দুটো ভালোবাসার কথা বললে তিনি মুখ গোমড়া করে বলেন, 'যাও, যাও,— আর অত আত্তি দেখাতে হবে না,—ঢের হয়েচে।' তা-ই তো, এ হল কী? দুর্গাকালী ভাবলে, তার বয়স বাড়চে বলেই স্বামীর আদর ক্রমেই এখন কমে আসচে,— পুরুষজাতটাই হচ্ছে প্রজাপতির মতো— এক ফুলের মধু খেয়ে বেশিক্ষণ তারা খুশি থাকতে পারে না;— তার স্বামীও তো পুরুষ, তাই তাঁর মধ্যেও এইবার পুরুষত্বের লক্ষণ ফুটতে শুরু হয়েচে।...
অতএব দুর্গাকালী স্বামীর বাঁকা মনকে আবার সিধে করবার জন্যে, নিজের চেহারাকে নূতন করে চটকদার করে তুলতে চেষ্টা পেলে। আজকাল সে রংবেরঙা কাপড়খানি না পরে, কপালে ছোট্ট একটি খয়েরের টিপ না কেটে, ঘাড়ের উপরে লোটানো এলোখোঁপাটি না বেঁধে কিছুতেই আর স্বামীর সামনে বেরুত না।
ভামিনী কিন্তু স্ত্রী-র এই ছেড়ে-দিয়ে-তেড়ে-ধরা চেহারার কারুকার্য দেখে আরও বেশি সন্দিহান হয়ে উঠলেন। মাঝে মাঝে আড়চোখে যখন তিনি স্ত্রী-র দিকে চুরি করে চাইতেন, তখন তাঁর মনে একটু একটু লোভের উদয় হত বটে কিন্তু তখনই তিনি নিজের মনকে এমন এক কড়া দাবড়ি দিতেন যে, মন আর আত্মপ্রকাশ করতে পারত না! তাঁর স্ত্রী-র সাজসজ্জা যতই বাড়তে লাগল, তিনিও তাঁর পাহারাকে ততই সজাগ করে তুলতে লাগলেন! তিনি বুঝলেন, হাতেনাতে ধরা পড়তে দুর্গাকালীর আর বেশি দেরি নেই!
শেষটা সত্যি সত্যিই একদিন চাক্ষুষ প্রমাণ পাওয়া গেল। সে প্রমাণটা পেয়ে ভামিনী বুঝতে পারলেন না বটে, কাকে দেখে দুর্গাকালী তাঁকে ভুলেচে, তবে এটা বেশ জানা গেল, তার স্বভাবের সঙ্গে কেতাবি সতীদের বর্ণনা কিছুই মেলে না। অবশ্য এ অমিলটা ভামিনী যেন আজ এই প্রথম আবিষ্কার করলেন, তা নয়— তবে এটার দিকে এতদিন তিনি দেখেও দেখেননি। আর সত্যি বলতে কী, ভামিনী জটিল ডিটেকটিভ উপন্যাসের রহস্য জলের মতো বুঝতে পারলেও, রামায়ণী-মহাভারতী সতীদের সতীত্বের মর্ম, তেমন ভালোরকম বুঝতেও ছাই পারতেন না! ইন্দ্রকে আলিঙ্গন করেও অহল্যা, বিধবা হয়ে বিবাহ করেও মন্দোদরী ও তারা, সূর্যকে আত্মদান করেও কুমারী কুন্তী, আর পাঁচের চেয়ে সংখ্যা বাড়াতে চেয়েও দ্রৌপদী প্রভৃতির সতীত্বের সার্টিফিকেট কেন যে এখনও গ্রাহ্য হয়, ভামিনী বিস্তর ভেবেও এ সমস্যার কোনো সমাধান করতে পারেননি।
সেদিন রবিবার। ভামিনীভূষণ খাওয়াদাওয়ার পর একটুখানি নিশ্চিন্ত দিবানিদ্রার জন্যে প্রস্তুত হচ্ছেন, এমন সময়ে জানলা দিয়ে তিনি দেখতে পেলেন, রাস্তার ওপারে ঘোষদের বাড়ির বারান্দায়, একটি লোকের দৃষ্টি তাঁর বাড়ির ছাদের দিকে নিষ্পলক ও স্থির হয়ে আছে। তার সে দৃষ্টিটা এমন সন্দেহজনক যে, ভামিনীর আসন্ন ঘুম তৎক্ষণাৎ আধ মিনিটের মধ্যেই চমকে গেল। তিনি ধড়মড়িয়ে উঠে তিরের মতো ছাদের উপরে ছুটলেন। ছাদে উঠে ভামিনী দেখলেন, তাঁর সন্দেহ মিথ্যে নয়। সেখানে দুর্গাকালী পিঠের উপরে ভিজে চুল এলিয়ে চুপটি করে বসে আছে।
ভামিনী চটে লাল হয়ে বললেন, 'তোমার এ কী হচ্চে শুনি?'
দুর্গাকালী তাঁর ক্রুদ্ধ স্বর শুনে আশ্চর্য হয়ে বললে, 'আজ যে একেবারে তেরিয়া মেজাজ! দেখতে পাচ্চ না, চুল শুকোচ্চি!'
'চুল শুকোচ্চ! দেখতে পাচ্চ, ওদিকে কে দাঁড়িয়ে আছে?'
দুর্গাকালী রাস্তার ওপারে একবার চেয়েই 'ও মা' বলে হেঁট হয়ে পড়ে মাথায় কাপড় তুলে দিলে। তারপর বললে, 'আ মর পোড়ারমুখো, অমন চোখে আগুন লাগে না গা!'
ভামিনী কিন্তু ভোলবার ছেলে নন; টিটকিরি দিয়ে বললেন, 'আমাকে দেখে ওকে এখন গালাগাল দিচ্চ, কিন্তু এতক্ষণ যে তোমার মাথার কাপড় পিঠের ওপরে এসে পড়েছিল!'
ভামিনী তাকে সন্দেহ করেচেন বুঝেই দুর্গাকালী রেগে তিনটে হয়ে বললে, 'তা পড়েছিল তো পড়েছিল, তাতে হয়েচে কী? ও হতভাগা না হয় আমার পানে তাকিয়ে একটু স্বস্তি পাচ্চে, তাতে তো আমার গায়ে ফোসকা পড়ে যাচ্চে না! ফের যদি অমন ছাই কথা বলো, তাহলে এখনই আমি আবার মাথার কাপড় খুলে দেব! যার খুশি হয় আমাকে দেখুক গে, তাতে আমার কী বয়ে গেল? ও দেখা-টেখায় ডরাব, তেমন মেয়ে আমি নই!'
ভামিনীভূষণ বেশ বুঝলেন যে, খাঁটি সতীদের কথা কখনোই এরকম স্পষ্টাস্পষ্টি হওয়া উচিত নয়, তবু কিন্তু তিনি মনের ঝাল না ঝেড়ে চেপে গেলেন। ভাবলেন, না, এখনই বেশি ঘাঁটিয়ে কাজ নেই, তাতে হিতে বিপরীত হবে।—তবে ছাদ থেকে নামবার আগে তিনি রাস্তার ওপারে এমন এক জ্বলন্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে এলেন যে, বারান্দার সেই রূপ-গদগদ লোকটি তখনই ঘাড় হেঁট করে ঘরের ভিতরে ঢুকে পড়ল।
গ
সন্ধ্যা উতরে গেছে। ভামিনীর সতর্ক চোখ দেখলে, রাস্তায় দাঁড়িয়ে একটা লোক তাঁরই বাড়ির দিকে তাকিয়ে আছে। যুদ্ধের জন্য কলকাতার রাস্তায় গ্যাসের আলো কমিয়ে দেওয়া হয়েছে,— তাই তার মুখটা চিনতে পারা গেল না।
কিন্তু তাঁর বাড়ির দিকে লোকটাকে চেয়ে থাকতে দেখেই ভামিনী বেজায় খেপে উঠলেন। মনে মনে বললেন, স্টুপিডরা ভেবেচে কী, আমি কি মরে গেছি? দাঁড়াও, দেখাচ্চি মজাটা!
গোয়েন্দা-কাহিনি পড়ে পড়ে ভামিনীর মাথা এমন চমৎকার সাফ হয়ে গিয়েছিল যে, খুব চট করে তাতে ফন্দি জোগাত। লোকটার মতলব কী তা বোঝবার জন্যে, ভামিনী তখনই কোঁচার কাপড়টা খুলে গায়ে ও মাথায় দিয়ে, মুখের গোঁফ পর্যন্ত ঢেকে জানলার কাছে এগিয়ে গেলেন। তারপর খড়খড়িটা ধরে নাড়তেই লোকটা মুখ তুলে চেয়ে দেখলে। ভামিনী হাত নেড়ে ইশারা করে তাকে ডাকলেন।
লোকটা মৃদুস্বরে জিজ্ঞাসা করলে, 'কে, দুর্গাকালী?'
গলায় আওয়াজ স্ত্রীলোকের মতো সরু করে ভামিনী বললেন, 'হুঁ।'
লোকটা পায়ে পায়ে সদর দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
নিষ্ঠুর আনন্দে ভামিনী চোখের পলকে আঁটসাঁট করে কোমর বেঁধে ফেললেন। যখন তাঁর স্ত্রী-র নাম পর্যন্ত জানে, তখন এ নিশ্চয় সেই লোক—যাকে তাঁর স্ত্রী চিঠি লিখেছিল।
চৌকির তলা থেকে মস্ত এক লম্বা-চওড়া লাঠি বার করে ভামিনী বাঘের মতো লাফাতে লাফাতে নীচে নেমে গেলেন। সে লোকটা তখন নীচে উঠোনের পাশে দাঁড়িয়ে দেওয়ালে হাত দিয়ে উপরে ওঠবার সিঁড়ি খুঁজছিল। ভামিনী নীচে গিয়ে মুখে তাকে কিছুই বললেন না, শুধু হাতের লাঠিটা মাথার উপরে তিনবার ঘুরিয়ে সটান এক ঘা বসিয়ে দিলেন। সেই পাকা বাঁশের লাঠিটা যদি যথাস্থানে পড়ত, তাহলে সেই মুহূর্তেই লোকটার দেহ থেকে মস্তকের অস্তিত্ব লোপ পেয়ে যেত। কিন্তু তার সৌভাগ্যক্রমে মাথায় না পড়ে লাঠিটা পড়ল গিয়ে তার কাঁধের উপরে। 'ওরে বাপ রে, গেছি রে' বলে চেঁচিয়ে উঠে, সে দড়াম করে উঠোনের উপরে আছড়ে পড়ল।
তার ভীষণ চিৎকার শুনে দুর্গাকালী রান্নাঘর থেকে তাড়াতাড়ি ছুটে এল। লোকটাকে দেখবার জন্যে ভামিনীও একটা আলো নিয়ে এলেন,—তাঁর মন তখন ভারী খুশি হয়ে উঠেছে।
কিন্তু আলোটা তিনি উঁচু করে তুলে ধরতেই, দুর্গাকালী চেঁচিয়ে কেঁদে উঠল, 'ওগো, এ কী গো, এ যে দাদা গো!'
ভামিনীর হাত থেকে আলোটা খসে মাটির উপরে পড়ে নিবে গেল! তা-ই তো, এ দুর্গাকালীর দাদা যোগেনই বটে!
যোগেন কাতরাতে কাতরাতে বললে, 'দুগগা! তাড়াতাড়ি ডাক্তার ডাকতে লোক পাঠা রে, আমার ''কলার-বোন'' ভেঙে বোধহয় গুঁড়ো হয়ে গেছে! ভামিনী, আমার ওপরে তোমার এত যে রাগ ছিল, তা জানলে আমি তো এখানে আসতুম না ভাই!'
ভামিনী জড়সড় হয়ে, চোখে সরষে ফুল দেখতে দেখতে বললেন, 'আমি—ভেবেছিলুম— চোর!'
দুর্গাকালী ততক্ষণে জল-ন্যাকড়া নিয়ে এসে যোগেনের কাঁধের উপরটা বেঁধে দিতে বসেচে। সে বললে, 'কী করে এ কাণ্ড হল দাদা?'
যোগেন বললে, 'আমি তো তোদের এই নতুন বাসাটা চিনতুম না, খালি নম্বরটাই জানতুম। তোদের বাড়ির সামনে এসে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ভাবছিলুম, এইটেই তোদের বাড়ি কি না—এমন সময়ে বাড়ির ওপর থেকে একটি মেয়ে আমাকে ডাকলে। এখানে আর কে ই-বা আমাকে ডাকবে, কাজেই আমি বুঝলুম, এই বাড়িটাই তোদের। তবু একবার সন্দেহ মেটাবার জন্যে আমি জিজ্ঞাসা করলুম,—কে দুগগাকালী? তুই বললি,—হুঁ।'
দুর্গাকালী আশ্চর্য হয়ে চোখ বিস্ফারিত করে বললে, 'আমি বললুম ''হুঁ''? দাদা, তুমি কী বলচ?'
—ভামিনী চেপে গেলেন। তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন, 'ওগো, তোমার দাদাকে এখন মিছে বকিয়ো না—ওঁকে ওপরে নিয়ে যাও। আমি ততক্ষণে ডাক্তার ডেকে আনি।'
ঘ
সেই ভয়াবহ ঘটনার পর দু-মাস কেটে গেছে। ইতিমধ্যে যোগেনকে লাঠি মারার দরুন দুর্গাকালীর মুখ থেকে ভামিনীকে অনেক গঞ্জনা সহ্য করতে হয়েচে। দুর্গাকালী যখন-তখন তাঁকে 'খুনে', 'গুন্ডা', 'ঠ্যাঙাড়ে', 'গোঁয়ার' বলে টিটকারি দেয়, ভামিনী কিন্তু সেসব কথার বিরুদ্ধে একটিও আপত্তি প্রকাশ করেন না। যখন বড়োই অসহ হয়ে ওঠে, তখন তিনি ঘুমিয়ে পড়েন। স্ত্রী-র কবল থেকে মুক্তিলাভের এই একটি চরম নিরাপদ উপায় তিনি আবিষ্কার করেছিলেন—বিনা বাক্যব্যয়ে ঘুমিয়ে পড়া! দুর্গাকালী যখন কোনো সঙ্গিনীর হাতে নতুন গয়না দেখে এসে রাত্রে স্বামীর কাছে সেই গয়নার সম্বন্ধে সলোভ সুখ্যাতি করতে বসত, কিংবা অনেকদিন পশ্চিমে বেড়াতে যাওয়া হয়নি বলে গৌরচন্দ্রিকা ফাঁদত, কিংবা সামনের শনিবারের থিয়েটারের হ্যান্ডবিল পড়ে শোনাত, তখনও ভামিনী ভূমিকা সমাপ্ত হওয়ার আগেই উপসংহারের আয়োজন করে আশ্চর্য তৎপরতার সঙ্গে অনায়াসে ঘুমের কোলে ঢলে পড়তেন। ঘুম ছিল তাঁর পোষ-মানা কুকুরের মতো;—তু বলে ডাকলেই ছুটে আসত।
কিন্তু ভামিনী এখনও হাল ছাড়েননি। এখনও তিনি সর্বদাই চোখ-কানকে সজাগ করে আছেন, এ ব্যাপারটার আদি-অন্ত সমস্ত রহস্য না জেনে কিছুতেই তিনি ছাড়বেন না। তারপর,—দুর্গাকালীকে একবার দেখে নেবেন—হুঁ!
একদিন শেষরাত্রে হঠাৎ যেন কীসের শব্দে তাঁর ঘুম ভেঙে গেল। ভামিনীর ঘুম তো ঠুনকো কাচের পেয়ালার মতো অত সহজে ভেঙে যায় না! কেন এমন অসময়ে ঘুম ভাঙল, বিছানার উপরে উঠে বসে গালে হাত দিয়ে অবাক হয়ে তিনি তা-ই ভাবতে লাগলেন।
এমন সময়ে নীচে সদর দরজা খোলার শব্দ হল। শুনেই তাঁর মনে একটা খটকা লেগে গেল, বালিশের তলা থেকে তাড়াতাড়ি দেশলাই বার করে তিনি তখনই জ্বেলে ফেললেন।
যা ভেবেছেন তা-ই! দুর্গাকালী তার বিছানায় নেই, সেখানে শুধু ছেলে-মেয়ে দুটো পরস্পরের পা জড়িয়ে ধরে ঘুমোচ্চে।
ভামিনী তড়াক করে বিছানা থেকে লাফিয়ে পড়লেন। তারপর উঠি-কি-পড়ি এমনিভাবে নীচে নেমে গেলেন।
নীচে কেউ কোথাও নেই। কিন্তু সদর দরজাটা টেনে যা দেখলেন, তাতে তাঁর বুকের রক্ত শুকিয়ে জল হয়ে গেল! সদর দরজায় বাইরে থেকে তালাবন্ধ।
তবে কি দুর্গাকালী... না— না— আর কোনোই সন্দেহ নেই—দুর্গাকালী নিশ্চয়ই তাঁকে ফেলে চম্পট দিয়েচে! পাছে তিনি তার পিছনে ছোটেন, সেই ভয়ে সে সদর দরজায় বাইরে থেকে তালাবন্ধ করে দিয়ে গেছে!
হায় হায়, কেন তিনি আর-একটু আগে জেগে ওঠেননি— তাহলে তো এমন সব্বনাশ হত না।
হঠাৎ ভামিনীর মনে পড়ে গেল,— তাঁদের বাড়ির পিছনে একটা খিড়কির দরজা আছে। তিনি তখনই সেইদিকে দৌড়ে গেলেন। তারপর দরজা খুলে গলি দিয়ে বড়োরাস্তায় বেরিয়ে পড়লেন।
নির্জন পথ দিয়ে খানিক তফাতেই একটা পুরুষের সঙ্গে একজন রমণী হনহন করে চলে যাচ্চে। ভামিনীর বুঝতে দেরি হল না যে, তারা কে। শিকারের উপরে লাফিয়ে পড়বার সময়ে বাঘের চোখ যেমনধারা হয়, তাঁরও চোখ দুটো ঠিক তেমনি জ্বলে উঠল। তিনি তাড়াতাড়ি এগিয়ে গিয়ে রমণীর একখানা হাত দু-হাতে কষে চেপে ধরে, গলা থেকে এক ভয়ানক গম্ভীর আওয়াজ বার করে বললেন, 'দুগগাকালী!'
ছিলে ছিঁড়ে গেলে ধনুক যেমন ঠিকরে ওঠে, তেমনি করে ঠিকরে উঠে রমণী ভয়ে শিউরে বললে, 'ওগো মা গো, এ কে গো!'
কী সর্বনাশ— এ তো দুর্গাকালী নয়! ভামিনী দস্তুরমতো ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে তার হাত ছেড়ে দিয়ে, পিছন-হাঁটা ইঞ্জিনের মতো সাঁ করে সরে গেলেন।
রমণীর সঙ্গে যে পুরুষটা ছিল, সে রুখে এসে বললে, 'তবে রে পাজি, গেরস্তর মেয়ের গায়ে হাত!' বলেই সে দু-হাতে দুই ঘুসি তুললে।
ভামিনী মিনতির স্বরে বললেন, 'মশাই, মশাই, চেঁচাবেন না,—মারবেন না! আগে আমার কথা শুনুন!'
ঠিক সেই সময় পাশের একটা বাড়ির রোয়াক থেকে বাজখাঁই আওয়াজ এল— 'আরে কোন শ্বশুরা রে!'
ভামিনী স্তম্ভিত নেত্রে দেখলেন, লাল পাগড়ি হাতে করে এক পাহারাওয়ালা রোয়াকের উপর থেকে নেমে আসচে।
সেই লোকটা বললে, 'পাহারাওয়ালাজি, হাম লোক গঙ্গাস্নান করকে আতা হায়, আর এই বদমাশটা হামারা স্ত্রী-র গায়ে হাত দিয়া হায়!'
লাল পাগড়িটা মাথায় পরে নিয়ে পাহারাওয়ালা প্রকাণ্ড একটা হাই তুলতে তুলতে বললে 'কেয়া!'
এই যেমনি 'কেয়া' বলা, ভামিনী অমনি দিগবিদিক জ্ঞানহারা হয়ে দে দৌড়! কিন্তু পাহারাওয়ালাও ছোড়নেওয়ালা নয়—সে-ও সঙ্গে সঙ্গে ছুটতে শুরু করলে!
দ্রুতধাবনে ভামিনীর পক্ষে অসুবিধা ছিল একাধিক। কারণ ছুটতে গেলেই তাঁর দোদুল্যমান ভুঁড়িটি প্রতিপদেই তাঁকে ভূতলের দিকে সবেগে আকর্ষণ করত,—তার উপরে তাঁর বপুখানিও ছিল বিপুলজাতীয়। কিন্তু এসব অসুবিধা ভামিনীকে আজ একটুও কাবু করতে পারলে না—বলতে কী, নিজের ছোটবার ক্ষমতা দেখে ভামিনী আজ নিজেই বিস্মিত হয়ে গেলেন। কিন্তু রাতের পাহারাওয়ালারা হচ্ছে কুম্ভকর্ণের আধুনিক সংস্করণ—অসময়ে তাদের ঘুম ভাঙিয়ে দিলে আর বাঁচোয়া নেই।
ভামিনী প্রথমটা যৎপরোনাস্তি বেগেই ছুটেছিলেন বটে, কিন্তু তিনটে রাস্তা পার হবার পর তিনি বেশ বুঝতে পারলেন, তাঁর ও পাহারাওয়ালার মাঝখানকার ব্যবধান ক্রমেই অত্যন্ত অন্যায়রকম কমে আসচে।
চতুর্থ রাস্তার মোড়ে একটা মাতাল গ্যাসপোস্টে ঠেসান দিয়ে দাঁড়িয়ে, কলের পুতুলের মতো আপনমনেই টলমল করে টলছিল। ভামিনীর দ্রুত পদশব্দে অত্যন্ত চমকে মুখ তুলে সে বলে উঠল, 'এই, এই! ছুটিসনে ছুটিসনে, অত জোরে ছুটিসনে বাবা, টলে পড়ে মারা যাবি—হাত-পা খোঁড়া করবি!'
ভামিনীর মাথায় অমনি একটা ফন্দি জুটে গেল। তিনি সামনের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলে উঠলেন, 'ধর, ধর! চোর, চোর!'
চোর ধরায় বোধহয় মদের চেয়ে বেশি মাদকতা আছে। চোরের নাম শুনেই মাতাল লাফিয়ে উঠল। গ্যাসপোস্টের আশ্রয় ছেড়ে সে বললে, 'কই, কোথায় চোর?'
'ওই! ওই! ওইদিকে পালাচ্চে!'
'অ্যাঁ, আবার পালাচ্চে! তবে রে বেটা!'—বলেই সেই মাতালটা অনির্দিষ্ট চোরের উদ্দেশে প্রাণপণে লম্বা এক দৌড় মারলে।
সাহসে ভর করে কপাল ঠুকে ভামিনী দাঁড়িয়ে পড়লেন, সেই সঙ্গে পাহারাওয়ালাও রাস্তার মোড় ফিরে তাঁর কাছে এসে পড়ল। ভামিনী ধাবমান মাতালের দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করে বললেন, 'পাহারাওয়ালাজি ওই দেখো, আসামি পালাচ্চে!'
পাহারাওয়ালা ভামিনীর দিকে চেয়েও দেখলে না—বেচারি মাতালকেই আসামি ঠাউরে সে তার পিছনেই ছুটল।
বুদ্ধির জোরে উপস্থিত বিপদ থেকে নিস্তার পেয়ে, ভামিনী আবার নিজের বাড়ির দিকে দ্রুতপদে ফিরে এলেন।
সদর দরজায় তখনও তালাবন্ধ। একটা দীর্ঘশ্বাস নিক্ষেপ করে খিড়কি দিয়ে তিনি বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করলেন।
ঙ
দুর্গাকালীকে তিনি যে এত বেশি ভালোবাসতেন, এতদিন ভামিনী তা নিজেই আন্দাজ করতে পারেননি। দুর্গাকালী তাঁকে ত্যাগ করে চলে গেছে, এটা ভেবে এখন তাঁর মনে রাগের চেয়ে দুঃখই হল বেশি। তিনি একেবারে বিছানায় গিয়ে মুষড়ে পড়ে কান্না শুরু করলেন।
হায় রে, ঠিক বেলা ন-টার সময় আর কেউ তাঁকে ভাত-তরকারির থালা সাজিয়ে দেবে না, এটা খাও-ওটা খাও বলে আর কেউ তাঁকে যত্ন করে খাওয়াবে না, পিঠের যেখানে নিজের হাত যায় না সেখানটা আর কেউ আদর করে নরম হাতে চুলকে দেবে না, ময়লা জামাকাপড় পরে বাড়ির বাইরে যেতে গেলে, আর কেউ তাঁর জুতো-চাদর কেড়ে নেবে না, বন্ধুদের আড্ডায় গিয়ে বাড়ি ফিরতে রাত হলে আর কেউ তেমন মিষ্টি বকুনি বকবে না— এবং সবচেয়ে যা ভাবনার কথা, গরমে রাত্রে যখন ঘুম হবে না তখন হাতের চুড়ি রুনু রুনু বাজিয়ে, পাখার বাতাস করে আর কেউ তাঁকে ঘুম পাড়াবে না! অসহ্য শোকে মুহ্যমান হয়ে, ভামিনী গড়াতে গড়াতে বিছানার একপাশ থেকে আর-একপাশে চলে গেলেন।
* * *
ভোর হতে আর দেরি নেই। কাদের আস্তাবল থেকে একটা মুরগি ডেকে উঠল,—সঙ্গে সঙ্গে সদর দরজা খোলার শব্দ পেয়ে, ভামিনী কান খাড়া করে বিছানার উপরে উঠে বসলেন।
একটু পরেই দুর্গাকালী এসে ঘরের ভিতরে ঢুকল। ভামিনীকে দেখে আশ্চর্য হয়ে সে বললে, 'ও মা এ কী! আজ যে বড়ো সুয্যি না উঠতেই তুমি উঠেচ!'
ভামিনী যেন তখনও নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না! হাঁদারামের মতো ফ্যালফেলে চোখে চেয়ে, তোতলার মতো থেমে থেমে তিনি বললেন, 'তুমি! তুমি— তাহলে—ফিরে—এসেচ?'
দুর্গাকালী বললে, 'আজ আবার এ কী ঢং! ফিরে আসব না তো যাব কোন চুলোয়?'
ভামিনী বললেন, 'তুমি কোথায় গিয়েছিলে?'
'আজ যে বারুণী, গঙ্গাচানে গিয়েছিলুম।'
'গঙ্গাচানে? একলা?'
'একলা কেন? পাশের বাড়ির সরোজিনী ছিল, তার মা, তাদের একজন চাকরও ছিল।'
'আমাকে বলে গেলেই তো পারতে।'
'তোমার তখন নাক ডাকছিল। ঘুম ভাঙালে তুমি যে রেগে চেঁচিয়ে বাড়ি মাথায় করে তুলতে।'
ভামিনী চেপে গেলেন। কথায় কথা বাড়িয়ে আসল কথা ফাঁস করে ফেলাটা তিনি নিরাপদ মনে করলেন না।
চ
স্ত্রী-হারানোর ভাবনা যেই গেল, ভামিনীর সন্দেহ অমনি জেগে উঠল। সেই চিঠিখানা তখনও বঁড়শির মতো তাঁর বুকের মাঝখানে গেঁথে ছিল— সেটা তো ফস করে উড়িয়ে দেবার জিনিস নয়!
কিন্তু সে চিঠি নিয়ে আর গোয়েন্দাগিরি করতেও ভামিনীর সাহসে কুলোল না। দু-দুবার যে ফ্যাসাদেই তিনি পড়েছিলেন! একবার বেপরোয়া লাঠি চালিয়ে ফাঁসি যেতে যেতে বেঁচে গিয়েছেন, আর-একবার পরস্ত্রীর গায়ে হাত, পাহারাওয়ালার তাড়া— বাপ রে, সে কথা ভাবলে আর জ্ঞান থাকে না!
ভেবেচিন্তে ভামিনী শেষটা স্থির করলেন, চিঠিখানা একেবারে দুর্গাকালীর সামনে ধরা যাক! দেখি তার মুখের ভাব কীরকম হয়—তাহলেই সব বোঝা যাবে!
সেইদিনেই সন্ধের সময়ে দুর্গাকালী যখন খাটের উপরে বসে বালিশে ওয়াড় পরাচ্ছিল, তখন ভামিনী তার কাছে গিয়ে বললেন, 'দেখো দেখি, এই চিঠিখানা কার লেখা?'
দুর্গাকালী চিঠিখানা দেখে খুব সহজস্বরেই বললে, 'ওখানা তুমি কোথায় পেলে গা?'
'আমার একখানা বইয়ের ভেতরে ছিল।'
'দেখেচ আমার ভোলা মন! কত খুঁজেও আমি পাইনি! ওখানা ওই পাশের বাড়ির সরোজিনীর চিঠি।'
'কিন্তু এ যে দেখচি তোমারই হাতের লেখা!'
'হ্যাঁ, সরোজিনী যে লিখতে জানে না। তার বর রাগ করে চলে গিয়েছিল, আমি তাই তার হয়ে চিঠিখানা লিখে দিয়েছিলুম। সেদিন লিখতে লিখতে বেলা হয়ে গেল বলে, চিঠিখানা শেষ না করেই বইয়ের ভেতরে রেখেছিলুম, কিন্তু তার পরদিন খুঁজে না পেয়ে, আমি তাকে আর-একখানা নতুন চিঠি লিখে দিয়েছি।'
'কিন্তু তোমার সরোজিনীর চিঠিতে আমার ছেলের নাম কেন?'
'কী আশ্চয্যি, তা জানো না বুঝি? সরোজিনীর ছেলেরও ডাকনাম যে হেবো!'
ভামিনী একটা আরামের নিশ্বাস ফেলে বললেন, 'দেখো, ভবিষ্যতে আর কোনোদিন পরের জন্যে প্রেমপত্র লিখে, আমার কেতাবের ভেতরে গুঁজে রেখো না।'
ভামিনীর কথা কইবার ধরন শুনে, দুর্গাকালী সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে তাঁর দিকে চেয়ে বললে, 'কেন, তাতে তোমার আপত্তি কীসের শুনি?'
কিন্তু ভামিনী আবার চেপে গেলেন। তার দাদার উপরে লাঠি চালানোর আসল কারণটা জানতে পারলে, দুর্গাকালীর জিভ যে কতটা অসংযত হয়ে উঠবে, ভামিনী সেটা আন্দাজ করেই শিউরে উঠলেন। হৃদয়েশ্বরীকেও হৃদয়ের সমস্ত কথা জানানো নিরাপদ নয়!
অতএব তিনি তাড়াতাড়ি কথা ফিরিয়ে নিয়ে বললেন, 'দুগগাকালী, আজ কী চমৎকার চাঁদ উঠেচে! চলো, ছাতের ওপরে বেল ফুলের টবের পাশে গিয়ে বসে খানিক গল্প করে আসি!'
ভারতী, শ্রাবণ ১৩২৭ (জুলাই ১৯২০)
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।