মৌরি

হেমেন্দ্রকুমার রায়

এক

আমার মনের চিত্রশালায় কয়েকটি সুবিচিত্র চরিত্র-চিত্র আছে। সেইসব ছবি আমি সংগ্রহ করে রেখেছিলুম জীবনের রাজপথে চলতে চলতে। আজ তারই একখানি ছবি আপনাদের দেখাতে চাই।

তার নাম পাগলা। এটা তার পিতৃদত্ত নাম কিংবা জনসাধারণের কেউ তার এই নামকরণ করেছিল, সে কথা আমি জানি না। কিন্তু আমিও তাকে পাগলা বলে ডাকতুম।

সে ছিল এক জগতের লোক, আর আমি ছিলুম অন্য জগতের বাসিন্দা। আমাদের দুজনের মধ্যে ছিল না কিছুমাত্র ঘনিষ্ঠতার সুযোগ। কিন্তু তবু দিনে দিনে তার সঙ্গে ধীরে ধীরে জমে উঠল আমার পরিচয়।

পূর্ণবেগে চলছিল তখন আমার সাহিত্যসাধনা। সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত আমার নীচেকার পড়বার ঘরটিতে একলা বসে থাকি। কখনো কলম চালাই, কখনো কেতাবের পাতা ওলটাই, কখনো কল্পনালোকে বেড়িয়ে বেড়াই এবং কখনো টেবিলের সামনে বসে ওপাশের জানলা দিয়ে রাজপথের প্রবহমান জনস্রোতের দিকে তাকিয়ে থাকি। সারাদিন কোথা দিয়ে কেটে যায় কিছুই বুঝতে পারি না।

একদিন হঠাৎ আমার জানলার সুমুখে এসে দাঁড়াল একটি মূর্তি। মাঝারি আকারের চেহারা, শ্যামবর্ণ, মাথায় লম্বা লম্বা চুলগুলো রুক্ষ ও উসকোখুসকো। পরনের আধময়লা কাপড়খানির খানিকটা খুলে উত্তরীয়ের মতন গায়ে জড়ানো, পায়ে জুতো নেই। মূর্তিটি উল্লেখযোগ্য না হলেও, তার মুখে-চোখে ছিল এমন একটি বুদ্ধির ও মিষ্ট ভাবের আভাস যে, তার দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকতে নিতান্ত মন্দ লাগে না।

আমার সঙ্গে চোখাচোখি হতেই সে অত্যন্ত পরিচিতের মতন একটুখানি হেসে দুই হাত জোড় করে আমাকে একটি নমস্কার করলে।

আমি তার দিকে তাকিয়ে রইলুম নীরবে।

সে বলল, 'আমার নাম পাগলা।'

আমি হেসে ফেলে বললুম, 'তা-ই নাকি? তুমি কী চাও বাপু?'

সে বলল, 'একটা গান শুনবেন?'

'তুমি গান গাইতে জানো?'

'গান গেয়েই তো আমার পেট চলে স্যার!'

'ও, গান গেয়ে তুমি ভিক্ষা করো?'

ভিক্ষা শব্দটা পাগলার কানে বোধহয় কটু শোনাল।

সে মাথা নেড়ে বলল, 'না স্যার, আমি ভিক্ষে করি না। আমি গান শোনাই বটে, কিন্তু মুখ ফুটে কারুর কাছে চাই না!'

'তাহলে তোমার পেট চলে কী করে?'

'আমার গান শুনে সকলে খুশি হয়ে আমায় কিছু কিছু বকশিশ দেন। সেটা কি ভিক্ষে স্যার? বড়ো বড়ো গাইয়েরাও তো গান গেয়ে টাকা আদায় করে।'

আমি হাসতে হাসতে বললাম, 'পাগলাবাবু, তোমার যুক্তি অকাট্য। আচ্ছা, আমাকেও তুমি একটা গান শোনাতে পারো।'

পাগলা আমার পড়বার ঘরের দরজার চৌকাটের উপরে উবু হয়ে বসে গান গাইতে আরম্ভ করল।

তার কণ্ঠস্বরকে মধুর বলা যায় না এবং সে যে একজন ভালো গাইয়ে তাও নয়। কিন্তু তার গলায় ছিল দরদ ও আকর্ষণী শক্তি।

আমাকে সবচেয়ে আকৃষ্ট করলে তার গানের কথাগুলো। এ গান যিনি রচনা করেছেন তিনি আধুনিক নন বটে, কিন্তু তাঁর মধ্যে যে খাঁটি কবিত্ব আছে সে বিষয়ে কোনোই সন্দেহ নেই।

গান শেষ হলে পর পাগলার হাতে চারটে পয়সা দিয়ে আমি জিজ্ঞাসা করলুম, 'এ গান তুমি কার কাছ থেকে শিখেছ?'

পাগলা বললে, 'আমাদের গাঁয়ে একটা লোক থাকে, সে গান বাঁধে। তার কাছ থেকে আমি অনেক গান শিখেছি।'

'বটে! তোমাদের গ্রামের নাম কী?'

উত্তরে বর্ধমান জেলার একটি গ্রামের নাম শুনলুম, কিন্তু নামটি এখন আর আমার মনে নেই।

জিজ্ঞাসা করলুম, 'তুমি কী জাত?'

'কায়স্থ।'

একটু বিস্মিত হয়ে বললুম, 'তুমি কায়স্থের ছেলে! তোমার কি আত্মীয়স্বজন কেউ নেই?'

পাগলা মাটির দিকে মুখ নামিয়ে বললে, 'দেশে আমার বাবা আছেন, মা আছেন, ছোটো ছোটো দুটি ভাই আছে।'

অধিকতর বিস্ময়ে বললুম, 'তবু তুমি কলকাতার পথে পথে এমন ছন্নছাড়ার মতন টো টো করে ঘুরে বেড়াও? ছিঃ!'

পাগলা হঠাৎ উঠে দাঁড়াল। তারপর নতচোখে মৃদুস্বরে বলল, 'আমার মা সৎমা। এ পক্ষের দুটি ছেলে হবার পরেই বাবা আমাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছেন।'

পাগলার জীবনে 'ট্র্যাজেডি'র আভাস পেয়ে আমার মনটা কিঞ্চিৎ নরম হয়ে এল। ধীরে ধীরে দরদভরা গলায় বললুম, 'তুমি চাকরি করো না কেন?'

'পেটে তো বিদ্যে আছে স্যার ফিফথ ক্লাস পর্যন্ত! যা পড়েছিলুম তাও ভুলে মেরে দিয়েছি! আমায় চাকরি দেবে কে?'

'এমন অনেক কাজ আছে যাতে পুঁথিগত বিদ্যার দরকার হয় না। তুমি যদি চাকরি করো, তাহলে তোমার জন্যে আমি সেইরকম কোনো কাজের চেষ্টা করতে পারি।'

'থ্যাঙ্ক ইউ স্যার! কিন্তু আমি কারু চাকর হতে পারব না স্যার! আচ্ছা নমস্কার!' এই বলেই পাগলা তার যুক্তকর কপালে ছুঁইয়ে তাড়াতাড়ি সেখান থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল।

বসে বসে ভাবতে লাগলুম, এর চরিত্রে কিছু কিছু নূতনত্ব আছে বলেই মনে হচ্ছে। ভিক্ষাও করে, অথচ ব্যবহার ভিখারির মতন নয়। ভদ্রতার ভাবটা এখনও ভুলতে পারেনি। কিন্তু একটা বড়ো ভুল হয়ে গেল যে! ওর গানের রচনাটি ভালো, যদিও গ্রাম্য কবির রচনা। গানটি আমার 'নোটবুকে' তুলে নেওয়া উচিত ছিল। লোকটা হঠাৎ চলে গেল, হয়তো জীবনে আর এ পথ মাড়াবে না।

দুই

হপ্তাখানেক পরে।

'ভারতী' পত্রিকার জন্যে একটি গল্প রচনা করছিলুম। বেলা প্রায় বারোটা, রাজপথে পথিকের পদশব্দ ক্রমেই কমে আসছে।

একমনে লিখছি, হঠাৎ জানালার ওপাশ থেকে কণ্ঠস্বর জাগল, 'দাদাবাবু, আজ আর-একটা গান শুনবেন নাকি?'

মুখ তুলে চেয়ে দেখি, হাসি-হাসি মুখে পথের উপরে দাঁড়িয়ে আছে পাগলা।

বললুম, 'সেদিন ছিলুম স্যার, আজ আবার দাদাবাবু হলুম কেন?'

পাগলা বললে, 'স্যার কথাটা বিলিতি। ও নামে অচেনা লোককেই ডাকা চলে। কিন্তু আপনাকে দেখলে কেমন যেন আপনার লোক বলেই মনে হয়, তাই দাদাবাবু বলে ডাকছি। এবার থেকে মাঝে মাঝে এসে আপনাকে গান শুনিয়ে যাব।'

'বেশ, তাহলে তোমার ইচ্ছা পূর্ণ করো।'

পাগলা আবার আমার দরজার চৌকাটের উপরে উবু হয়ে বসে গান শুরু করে দিলে।

আজকে একটা নতুন গান গাইলে এবং এ গানের ভাষার ভিতরেও আছে সত্যিকার কবি-প্রাণের সুমধুর অভিব্যক্তি।

গান শেষ হলে পর বললুম, 'পাগলা, তুমি এরকম গান আরও কত জানো?'

পাগলা বললে, 'কত গান জানি, তার কি আর হিসেব রেখেছি দাদাবাবু? তবে অনেক গান জানি, অনেক!'

'তোমার যে গানগুলি ভালো লাগবে, আমার খাতায় সেগুলি টুকে রাখতে চাই। তুমি রাজি আছ?'

পাগলা একটু ভেবে সন্দিগ্ধস্বরে বললে, 'আমার গান নিয়ে আপনি কী করবেন?'

আমি হেসে বললুম, 'ভয় নেই পাগলা, তোমার গান গেয়ে আমি ভিক্ষাও করব না, কি অন্য কাউকে শেখাবও না। আমার কী শখ জানো? ভালো গান শুনলেই আমি নিজের খাতায় টুকে রাখি।'

পাগলা নাচারভাবে বললে, 'দাদাবাবু যখন বলছেন তখন আমি তো আর না বলতে পারি না!'

আমি পাগলার হাতে একটি সিকি গুঁজে দিয়ে বললুম, 'আমাকে নতুন নতুন গান শোনাতে পারলে, প্রত্যেক গানপিছু তোমাকে একটি করে সিকি বকশিশ দেব।'

পাগলার মুখে জাগল খুশির হাসি। তাড়াতাড়ি আমার পা দুটো ধরে বললে, 'থ্যাঙ্ক ইউ দাদাবাবু। আপনি হুকুম করলেই আপনাকে নতুন নতুন গান শুনিয়ে যাব।'

সত্য সত্যই তখন আমার অভ্যাস ছিল, অজানা কবির রচিত উল্লেখযোগ্য গান শুনলেই খাতার ভিতরে তাকে বন্দি করে রাখা। এইভাবে বাংলার নানা জেলার বহু গ্রাম্য বা মেঠো কবির গান আমি সংগ্রহ করেছিলুম। দুর্ভাগ্যক্রমে খাতাখানি এখন হারিয়ে গিয়েছে।

তারপর থেকে পাগলা প্রায়ই আমার কাছে এসে নতুন নতুন গান শুনিয়ে যেত। আগেই বলেছি, গানের ভিতর দিয়ে ফুটে উঠত তার প্রাণের দরদ। তাই সে যখন আমাকে গান শোনাতে বসত, তখন পথের উপরে জমত একটি ছোটোখাটো জনতা। এমনকী আমার আশপাশের বাড়ি থেকেও গান শোনাবার জন্যে তার ডাক আসত। এবং বলা বাহুল্য, কোনো বাড়ি থেকেই তাকে শূন্যহস্তে ফিরে আসতে হত না। এইভাবে তার পসার ক্রমেই এমন বেড়ে উঠল যে পাথুরেঘাটা অঞ্চলে সে হয়ে পড়ল একটি দস্তুরমতো সুপরিচিত ব্যক্তি।

একদিন খুব সকালে পাগলা হন্তদন্তের মতো আমার কাছে এসেই হাত পেতে বললে, 'দাদাবাবু গান পরে শোনাব, আগে আনাকয়েক পয়সা দিন।'

পাগলাকে এমন দাবি করতে কোনোদিন শুনিনি।

বিস্মিত হয়ে চোখ তুলে দেখি, তার মুখে-চোখে কেমন একটা শ্রান্তিভরা যাতনার চিহ্ন। বিনা বাক্যব্যয়ে তার হাতে গুঁজে দিলুম কয়েক আনা পয়সা। সে প্রায় ছুটে চলে গেল আমাদের গলির ভিতরদিকে।

কৌতূহলী হয়ে চেয়ার থেকে উঠে দরজার কাছে এসে বাইরে উঁকি মেরে দেখলুম, পাগলা দ্রুতপদে অদৃশ্য হয়ে গেল আলগু সর্দারের আস্তানার ভিতরে!

আলগু বাইরে ছিল গোরু বা মোষের গাড়ির গাড়োয়ানদের সর্দার। কিন্তু ভিতরে ভিতরে সে পুষত একটি দুর্দান্ত গুন্ডার দল। তার আড্ডায় নিয়মিতভাবে চলত জুয়াখেলা। এবং এ অঞ্চলে তার চেয়ে বড়ো কোকেন-বিক্রেতা আর কেউ ছিল না।

অবাক হয়ে সেইখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগলুম, পাগলের মতন লোক অমন ব্যস্ত হয়ে আলগুর আড্ডায় ঢুকল কেন?

একটু পরেই দেখি, দুই হাতে ছোটো এক টুকরো কাগজ মুখের কাছে নিয়ে সাগ্রহে চাটতে চাটতে পাগলা বেরিয়ে আসছে আলগুর আড্ডার ভিতর থেকে। বুঝতে পারলুম পাগলার কোকেন খাওয়ার অভ্যাস আছে।

পাছে সে লজ্জিত হয়, এই ভয়ে পাগলা আমাকে দেখবার আগেই আমি নিজের ঘরের ভিতর ঢুকে পড়লুম।

তিন

পাগলা কেবল তার গান শোনাত না, আমার কাছে বসে বসে তার জীবনের অনেক কাহিনিই বলত। সেসব কাহিনি শুনতে আমার খারাপ লাগত না। কারণ তার মধ্যে আমি পেতুম মনুষ্য-হৃদয়ের চিরবিচিত্র আলো এবং ছায়ার ছন্দ।

কিছুদিন পরেই আমার মনে হতে লাগল, পাগলা যেন আমাকে তার অভিভাবকের পদেই প্রতিষ্ঠিত করতে চায়! সম্প্রতি লক্ষ করলুম, পাগলা ধীরে ধীরে শৌখিন হয়ে উঠছে। আগে তার মাথায় চুল থাকত রুক্ষ এবং তার উপরে থাকত না চিরুনি-চালনার কোনোই চিহ্ন। আজকাল সে তার তেল-চকচকে চুলের উপরে সুদীর্ঘ টেড়ি কেটে আমার কাছে এসে বসে তার গান শোনাবার জন্যে। আগে তার গায়ে জামা ছিল না, এখন সে পরতে শুরু করেছে রঙিন গেঞ্জি। তার উপরে ফরসা কাপড় পরে, কোঁচা দোলায় এবং পায়ে পরে সস্তা দামের বার্নিশ করা জুতো।

পরিবর্তনটা রহস্যময়। কিন্তু আমার স্বভাব, কেউ যদি নিজে থেকে কিছু না বলে, আমি তাকে যেচে কোনো কথাই জিজ্ঞাসা করি না। কারণ আমার বিশ্বাস, এসব ক্ষেত্রে কৌতূহলী হয়ে প্রশ্ন করা হচ্ছে অরসিকের লক্ষণ! কারো আত্মপ্রকাশ হয় যখন সহজ ও স্বতঃস্ফূর্ত তখনই তার মধ্যে লাভ করা যায় মনস্তত্ত্বের স্বাভাবিক সৌন্দর্য।

পাগলার শৌখিনতার কারণ বোঝবার জন্যে বেশি দিন অপেক্ষা করতে হল না।

একদিন পাগলা এল। তারপর দরজার চৌকাটের উপরে চুপ করে বসে রইল।

খানিকক্ষণ পরে আমি বললুম, 'কী পাগলা, চুপ করে কেন? তোমার গানের পুঁজি ফুরিয়ে গেছে নাকি?'

পাগলা বললে, 'না দাদাবাবু, এখনও আমার গানের পুঁজি ফুরোয়নি। আমি অন্য কথা ভাবছি।'

আমি আর কিছু বললুম না। যে বইখানা পড়ছিলুম দৃষ্টি নিবদ্ধ করলুম আবার তার দিকেই।

খানিকক্ষণ পরে পাগলা হঠাৎ বাধো বাধো গলায় ডাকলে, 'দাদাবাবু!'

বই থেকে মুখ তুলে জিজ্ঞাসু চোখে আমি তার দিকে তাকালুম।

'আপনাকে একটা কথা বলব কি না ভাবছি।'

'কথা বলবে তার জন্যে আবার ভাবনা কীসের?'

'আজ্ঞে, আপনি যদি রাগ করেন?'

'তুমি এখন কী কথা বলবে পাগলা, যার জন্যে আমার রাগ হবে?'

'আপনি যদি অভয় দেন তো কথাটা বলেই ফেলি!'

'আমি রাগ করব না। তোমার যা বলবার আছে বলো।'

পাগলা তবু খানিকক্ষণ ইতস্তত করে তারপর নীচের দিকে মুখ নামিয়ে সলজ্জ কণ্ঠে বললে, 'দাদাবাবু, আমি আপনাকে নেমন্তন্ন করতে এসেছি।'

আমি সবিস্ময়ে বললুম, 'নিমন্ত্রণ! কীসের নিমন্ত্রণ?'

'আজ্ঞে দাদাবাবু, কাল আমার বিয়ে।'

'কাল তোমার বিয়ে! কার সঙ্গে?'

পাগলা তার ডান হাতখানি কপালের তলায় রেখে নিজের চোখ-মুখ ঢাকবার চেষ্টা করে বললে, 'একটি মেয়ের সঙ্গে আমার ভাব হয়েছে। জাতে সে বাউরি। আজকাল আমাদের বাসাতেই থাকে।'

'তুমি হচ্ছ কায়স্থের ছেলে, বিয়ে করবে বাউরির মেয়েকে?'

পাগলা হঠাৎ মুখ তুলে কিঞ্চিৎ তপ্তস্বরেই বললে, 'বাড়ি ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জাত রেখে এসেছি আমি বাবার কাছেই। দুনিয়ায় যার কেউ নেই, তার আবার জাত কী দাদাবাবু?'

পাগলার মনে আঘাত লেগেছে দেখে তাড়াতাড়ি আমি প্রসঙ্গ বদলে বললুম, 'কিন্তু তুমি কোথায় থাকো সে কথা তো আমায় কোনোদিন বলোনি!'

'দাদাবাবু, আমি আপনাদের কাছেই থাকি।'

'কোথায়?'

'এই শেঠের বাগানে ভিখিরিপাড়ায়। আপনি দয়া করে যাবেন তো?'

শেঠের বাগানের ভিখারিপাড়া! তার নাম আমি শুনেছি এবং সেখানে গেলে দেখতে পাওয়া যায় নাকি জীবন-নাট্যের সেইসব দৃশ্যই, যা থাকে জনসাধারণের চোখের আড়ালে, আলোকোজ্জ্বল রঙ্গমঞ্চের বাইরে। তখন আমি প্রায় প্রতিরাত্রেই কলকাতার বহু নিষিদ্ধ পল্লিতে পল্লিতে বিচরণ করতুম জনসাধারণের চোখের সামনে অদৃশ্য জীবন-নাট্যের এইসব দৃশ্য দেখবার জন্যেই। আবার তারই কোনো নতুন নিদর্শন দেখবার সম্ভাবনায় আমার বোহেমিয়ান চিত্ত তখনই হয়ে উঠল সচেতন এবং উত্তেজিত!

মনের ভাব বাইরে প্রকাশ না করে শান্ত ও সহজ স্বরেই বললুম, 'পাগলা, তোমাকে যখন ভালোবাসি তখন তোমার নিমন্ত্রণ কি আমি ঠেলতে পারি? বেশ, আমি যাব— কিন্তু কাল তোমাকে নিজেই এসে আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে যেতে হবে।'

পাগলা তখনই দণ্ডবৎ হয়ে মেঝের উপরে পড়ে দুই হাত দিয়ে আমার দুই পা জড়িয়ে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বললে, 'আমি জানতুম দাদাবাবু, আপনি যে আমার কথা ঠেলতে পারবেন না, আমি তা জানতুম! থ্যাঙ্ক ইউ দাদাবাবু, থ্যাঙ্ক ইউ! আপনি কেবল আমার দাদাবাবু নন, আপনি আমার মা, আপনি আমার বাপ, আপনি আমার চোদ্দোপুরুষ! থ্যাঙ্ক ইউ!'

এই হচ্ছে মনুষ্য-চরিত্র! যে হচ্ছে সর্বহারা, পৃথিবীর সকলের স্নেহ থেকে বঞ্চিত, সে যদি কারো কাছ থেকে পায় সহানুভূতির মাধুর্য, তবে তার পায়ে গোলামের মতো নত হয়ে থাকতে কোনো আপত্তিই করে না।

চার

চিৎপুর রোডের নতুনবাজারের সামনেই হচ্ছে শেঠের বাগান। ঠিক তার দক্ষিণদিকেই ছিল প্রকাণ্ড একটা বস্তি, এখন তার জায়গায় আকাশে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে মস্ত মস্ত বাড়ির পর বাড়ি।

শ্যাম মল্লিক লেনের ভিতর দিয়ে ঢুকে সেই সুদীর্ঘ বস্তিটা বাঁ পাশে রেখে আমি পাগলার সঙ্গে অগ্রসর হতে লাগলুম। পথের ধারে পাশাপাশি পায়রার খোপের মতো সারি সারি পনেরো-বিশখানি ঘর এবং প্রায় প্রত্যেক ঘরের সামনেই দাঁড়িয়ে আছে এক-একজন করে হাড়-কুৎসিত স্ত্রীলোক। কুরূপের পসরা সাজিয়ে তারা দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চায় তাদের চেয়েও অধঃপতিত পুরুষদের!

সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হয়ে গেছে। পাগলা আমাকে নিয়ে বস্তির ভিতরে ঢুকে অলিগলির ঘুটঘুটে অন্ধকার ভেদ করে এগিয়ে হঠাৎ এক জায়গায় থেমে দাঁড়িয়ে পড়ল। তারপর চিৎকার করে ডাকলে, 'ক্ষীরি! অ ক্ষীরি! ওরে কালা মাগি! আলো নিয়ে শিগগির এদিকে আয়।'

বাড়ির ভিতর থেকে খনখনে গলায় জবাব এল, 'ভারী যে নবাবপুত্তুর হয়েছিস রে, আলো না দেখালে ভেতরে আসতে পারবি না?'

পাগলা খাপ্পা হয়ে বললে, 'ওরে হারামজাদি মাগি, আমার জন্যে তোকে আলো দেখাতে বলছি নাকি? বাইরে বেরিয়ে দেখ আমার সঙ্গে কে এসেছে!'

'তুই আবার কোন রাজা-মহারাজাকে সঙ্গে করে এনেছিস রে!' বলতে বলতে একটা জ্বলন্ত কেরোসিনের ডিপে নিয়ে দরজার সামনে এসে দাঁড়াল বীভৎস এক মূর্তি!

ম্লান হলদে আলোতে তার সমস্ত বীভৎসতা ভালো করে প্রকাশ পাচ্ছিল না বটে, কিন্তু যেটুকু দেখতে পেলুম আমার পক্ষে সেইটুকুই হল যথেষ্ট।

সেই পেতনি-মূর্তির তৈলাক্ত, কালো-কুচকুচে, শীর্ণ দেহের উপরার্ধ্ব ছিল সম্পূর্ণ নগ্ন! আমাকে দেখেই এতখানি জিভ বার করে আলোর ডিপেটা সশব্দে মাটির উপরে বসিয়ে রেখে, দুই হাত দিয়ে বুকের উপরকার দোদুল্যমান ও কদর্য স্ত্রী-চিহ্ন দুটো ঢাকবার চেষ্টা করতে করতে মূর্তিটা সাঁৎ করে মিলিয়ে গেল অন্ধকারের ভিতরে।

এমন চেহারার ভিতরেও লজ্জার অস্তিত্ব দেখে মনে মনে কৌতুক অনুভব করলুম।

পাগলা মাটি থেকে ডিপোটা তুলে নিয়ে বললে, 'ক্ষীরি-বাড়িউলি আপনাকে দেখে পিঠটান দিয়েছে। আসুন দাদাবাবু, আমিই আপনাকে পথ দেখাই।'

কয়েক পদ অগ্রসর হয়ে উঠানের সামনে গিয়ে পড়লুম। উঠানটা বেশ লম্বা এবং তার অন্য প্রান্তে রয়েছে বড়ো রোয়াকের মতো খানিকটা বাঁধানো উঁচু জায়গা। রোয়াকের মাঝখানে বসানো একটা হ্যারিকেন লন্ঠনের ধোঁয়া-কালো চিমনির অস্পষ্ট আলোকে দেখা গেল, সেখানে বসে জটলা করছে পনেরো-ষোলোজন স্ত্রী-পুরুষ। সেখানে যে গাঁজার কলকে চলছে ঘ্রাণের দ্বারা সেটা বুঝতেও দেরি লাগল না।

তাদের ভিতর থেকে কে একজন চেঁচিয়ে বলে উঠল, 'কে রে, পাগলা নাকি?'

পাগলা জবাবে বললে, 'এই যে, তোরা সব এসে জুটেছিস দেখছি!'

সেই লোকটা বললে, 'এসে তো জুটেছি, কিন্তু আমাদের পাঁট আর চাট কই রে?'

পাগলা তার কথার কোনো জবাব না দিয়ে আমার দিকে ফিরে গলা নামিয়ে বললে, 'দাদাবাবু, আমি আগে ওদের ঠান্ডা করে আসি। আপনি পাশের ঘরটাতে গিয়ে একটু বসুন, ওটা আমারই ঘর। ওখানে গেলে মৌরির সঙ্গেও দেখা হবে।'

'মৌরি কে?'

'মৌরি আমার হবু বউ!'

'মৌরি আবার নাম হয় নাকি?'

'মৌরির দিদির নাম গৌরী। তারই নামের সঙ্গে মেলাবার জন্যেই ওর মা ওই নাম রেখেছে।'

পাশের ছোট্ট ঘরখানাতে ঢুকেই হ্যারিকেনের আলোতে প্রথমে চোখে পড়ল, সামনের দেওয়াল জুড়ে বিরাজ করছে মস্ত বড়ো একখানা বিজ্ঞাপনের ছবি।

তারপর চোখ নামিয়েই দেখি, এক প্রকাণ্ড ষণ্ডা চেহারার ও কাফ্রির মতন কালো লোক ঊর্ধ্বমুখে একটা দেশি মদের বোতল থেকেই সুরাপান করছে এবং তার কোলের উপরে উপুড় হয়ে শুয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে একটি যুবতি স্ত্রীলোক।

মুখ থেকে বোতলটা নামিয়ে লোকটা সবিস্ময়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। লক্ষ করলুম তার মুখখানা কেবল কুৎসিতই নয়, সে একটি চক্ষু থেকেও বঞ্চিত।

লোকটা কর্কশস্বরে বললে, 'এ আবার কী মূর্তি বাবা!'

ভুল করে অন্য কারো ঘরে ঢুকে পড়েছি ভেবে আমি তাড়াতাড়ি আবার বাইরে বেরিয়ে এসে ডাকলুম, 'পাগলা!'

পাগলা আবার আমার কাছে ফিরে এসে বললে, 'কী বলছেন দাদাবাবু?'

'এ ঘরে যে অন্য কারা রয়েছে!'

'কই, দেখি' বলে পাগলা ঘরের ভিতর ঢুকেই কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইল স্তম্ভিতের মতো।

তারপর সে কুপিত কণ্ঠে বললে, 'হ্যাঁ রে খ্যাঁদা, তুই নিজেদের বস্তি ছেড়ে আমার এখানে এসে জুটেছিস বড়ো যে? আমি তো তোকে নেমন্তন্ন করিনি।'

ঘরের ভিতর থেকে সেই খ্যাঁদা নামক ব্যক্তি উচ্চকণ্ঠে হো হো করে হেসে উঠল। তারপর হাসতে হাসতেই বললে, 'কে তোর এখানে পাত চাটতে এসেছে রে? আমি এসেছি মৌরিকে নিয়ে যাবার জন্যে।'

পাগলা যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারলে না, থতমত খেয়ে বললে, 'কী, কী বললি?'

'ওরে ন্যাকারাম, মৌরিকে আমি আবার নিজের ঘরে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে এসেছি।'

'কিন্তু মৌরির সঙ্গে আজ আমার বিয়ে হবে, তা কি তুই জানিস না?'

খ্যাঁদা আবার হো হো স্বরে হেসে উঠে বললে, 'ওরে ক্যাবলাকান্ত, আমি তো মৌরির বিয়ে দেখতেই এসেছিলুম, কিন্তু আমাকে আবার দেখেই মৌরির মন বদলে গেছে যে! বলছে, ও আমাকে ছেড়ে আর কারো সঙ্গে থাকতে পারবে না! ওকে এখান থেকে নিয়ে যাবার জন্যে মৌরি এখন আমার পায়ে পড়ে কান্নাকাটি করছে! আমিও রাজি না হয়ে কী আর করি বল? নিজেই ঝগড়া করে পালিয়ে এসেছিল, নিজেই আবার ফিরে যেতে চাইছে!'

পাগলা অভিভূত স্বরে বললে, 'হ্যাঁ মৌরি, এ কথা কি সত্যি?'

বাহির থেকে মৌরিকে দেখতে পেলুম না, কিন্তু তার কণ্ঠস্বর শুনলুম, 'হ্যাঁ ভাই পাগলা, খ্যাঁদাকে আমি এখনও ভুলতে পারিনি! ও যদি আজ এখানে না আসত, তাহলে আমি নিশ্চয় তোকেই বিয়ে করতুম! কিন্তু খ্যাঁদাকে দেখে আজ আমার খালি কাঁদতে ইচ্ছে করছে।'

পাগলা ভাঙা-ভাঙা গলায় বললে, 'এই এক মাস ধরে তোকে কত আদর করলুম, কত ভালো খাবার খাওয়ালুম, একসুট রুপার গয়না পর্যন্ত গড়িয়ে দিলুম! তুই বললি, খ্যাঁদা তোকে উঠতে-বসতে লাথিঝাঁটা মারে, পেটে খেতে, পরতে কাপড় দেয় না, তুই আর তার নাম মুখেও আনবি না! আর আজ আমার বিয়ের দিনে এ কী তুই বলছিস?'

মৌরি খিলখিল করে সকৌতুকে হেসে উঠে বললে, 'ওরে পাগলা, পিরিতের রীত, তুই কী বুঝবি রে? যাকে ভালোবাসি তার হাতে মার খেয়েও কত সুখ! এ যে আমার সোনার খ্যাঁদা!'—তার পরই একটা চুম্বনের শব্দ!

পাগলা নীরবে ঘরের বাইরে এসে অবসন্নের মতো বসে পড়ল। দেখলুম তার চোখ দুটো চকচক করছে, খুব সম্ভব সে কেঁদে ফেলেছিল।

ইতিমধ্যে রোয়াকের ওধারে বসে যে মূর্তিগুলো জটলা করছিল, তারাও ঘরের বাইরে এবং ভিতরে এসে জনতার সৃষ্টি করেছে।

তাদেরই একজন ক্রুদ্ধস্বরে বলে উঠল, 'না, না! পাগলার সঙ্গে আমরা মৌরি ছুঁড়ির বিয়ে দেবই। নইলে আমাদের মস্ত মাইফেল একেবারে মাটি হয়ে যাবে!'

খ্যাঁদার কণ্ঠ বললে, 'মাইফেল? কীসের মাইফেল?'

'পাগলা বলেছে আজ আমরা যত চাইব তত খাঁটির বোতল পাব! কিন্তু মৌরি যদি তোর সঙ্গে চম্পট যায়, পাগলা আমাদের বোতল দেবে কেন?'

'ও, এই কথা? পাগলা তো ভিখিরি, ওর সাধ্যি কতটুকু? আমি তোদের এক ডজন বোতল জোগাতে পারি—সঙ্গে সঙ্গে পেট ঠেসে খ্যাঁটের ব্যবস্থা! এরপর তোদের আর কিছু বলবার আছে?'

'কিছু না, কিছু না! খ্যাঁদার মুখে ফুল-চন্নন পড়ুক— মৌরি-বেটির জন্যে আর আমাদের কোনো মাথাব্যথাই নেই!'

ঘরের ভিতর থেকে আবার খিলখিল করে হেসে উঠে মৌরি গান ধরে দিলে—

'আমার বাড়ি যেয়ো বঁধু রাখব তোমায় আদরে,

আর, যাবার সময় বেঁধে দেব মিছরি বঁধুর চাদরে!'

আমি আর সেখানে দাঁড়ালুম না।

* * *

দিন পনেরো পরে একটি সকালে পড়বার ঘরে বসে রচনাকার্যে নিযুক্ত আছি, রাস্তা থেকে হঠাৎ পরিচিত কণ্ঠস্বরে শুনলুম, 'দাদাবাবু, একটি গান গাইব কি?'

সাগ্রহে চোখ তুলে পাগলার মুখের দিকে তাকালুম। তার মনের ভিতরে এখনও ঝড় বইছে কি না জানি না, কিন্তু তার মুখের উপরে খেলা করছে মৃদু মৃদু হাসি। মানুষের মুখ আর মানুষের মন, এদের মধ্যে মিলন হয় কালেভদ্রে, কদাচ।

আমার সম্মতি পেয়ে সেদিনও পাগলা আগেকার মতোই ঘরের চৌকাটের উপরে বসে গান শুনিয়ে গেল।

আমিও তার বিয়ের প্রসঙ্গ তুললুম না, সে-ও আর কোনো কথা বললে না।

মাসিক বসুমতী, কার্তিক ১৩৫২ (অক্টোবর ১৯৪৫)

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%