হেমেন্দ্রকুমার রায়
(বা ভামিনী-জীবনীর ২য় পরিচ্ছেদ)
ক
আপিস হইতে বাড়ি ফিরিয়া গলদঘর্ম ভামিনী সেদিন সবেমাত্র ঘরের চৌকাঠে পদার্পণ করিয়াছেন, দুর্গাকালী অমনি ছুটিয়া আসিয়া চোখ কপালে তুলিয়া বলিল, 'ওগো টিকিট? টিকিটখানা কোথায়?'
ভামিনী বোকার মতো ফ্যালফ্যাল করিয়া চাহিয়া রহিলেন—সাপ-ব্যাং কিছুই বুঝিতে পারিলেন না।
দুর্গাকালী হতাশস্বরে বলিয়া উঠিল, 'আর কী, যা ভেবেচি তা-ই! হারিয়েচ তো? আমার মাথাটি খেয়েচ তো? বেশ করেচ!'
দুর্গাকালীর নয়নতটে বাঁধ ভাঙিয়া অশ্রুবন্যা উথলিয়া উঠিবার উপক্রম করিতেছে দেখিয়া ভামিনীভূষণ তাড়াতাড়ি বলিয়া উঠিলেন, 'কী বিপদ! আহা, আগে কী হয়েচে সেটা খুলেই বলো ছাই! তা নয়,—একেবারে অশ্রুবর্ষণের চেষ্টা! একেই তো বাইরের বর্ষার চোটে পায়ের জুতো পর্যন্ত টেকা শক্ত হয়ে উঠেচে, তার উপরে ঘরের ভেতরেও তুমি যদি এত ঘন ঘন অশ্রুবৃষ্টি শুরু করো, তাহলে এখানে আমার মন টেকাও আরও বেশি শক্ত হয়ে উঠবে।'
দুর্গাকালী ভাঙা-ভাঙা গলায় বলিল, 'হবে আর কী! যা হবার তা-ই হয়েচে! যে পাথর-চাপা কপাল আমাদের! এতকাল ধরে যদিই-বা একটু সুরাহা হল, তা টিকিটখানা তুমি তো হারিয়ে বসে আছ?... কী হয়েচে জানো? আমরা লটারিতে জিতেচি! এই দেখো চিঠি! হায়, হায়, হায়!'
তখন ভামিনীর ধাঁ করিয়া মনে পড়িয়া গেল! হ্যাঁ, মাসকতক আগে একজন লোক জোর করিয়া তাঁহাকে একখানা 'বিচিত্র লটারি'র টিকিট গছাইয়া গিয়াছিল বটে! স্ত্রী-র হাত হইতে ফস করিয়া চিঠিখানা টানিয়া একনিশ্বাসে তিনি পড়িয়া ফেলিলেন। চিঠিতে লেখা আছে, ভামিনীভূষণ 'বিচিত্র লটারি'র দ্বিতীয় পুরস্কার লাভ করিয়াছেন। এক সেট গৃহসজ্জার দ্রব্য তাঁহার পাওনা।
পত্র হইতে মুখ তুলিয়া ভামিনী দেখিলেন, দুর্গাকালীর গাল বহিয়া ততক্ষণে সত্য সত্যই অশ্রুবৃষ্টি হইতেছে।
তিনি হাসিতে হাসিতে বলিলেন, 'কান্নায় ক্ষান্ত দিয়ে শান্ত হও প্রিয়ে, শান্ত হও! তোমার টিকিট আমি হারাইনি গো!'
মধুর দখিনায় যেন এক মিনিটে ঝর বর্ষা কাটিয়া গেল! দুর্গাকালী একেবারে স্বামীর বুকের উপরে পাগলের মতো ঝাঁপাইয়া পড়িয়া বলিল, 'হারাওনি? যাও—যাও, এক্ষুনি জিনিসগুলো নিয়ে এসো—আঃ, বাঁচলুম শুনে!'
'নাও কথা! হুট বললেই কি ছুট দেওয়া যায়? দাঁড়াও, আগে আপিসের জামাকাপড় ছাড়ি, মুখ-হাত ধুয়ে জল-টল খেয়ে একটু ঠান্ডা—'
'না না, আগে জিনিসগুলো নিয়ে এসে বাড়িতে পুরে তারপর যত খুশি ঠান্ডা হোয়ো! দেরি হলে যদি সব আবার ফসকে যায়! যে আমাদের কপাল! গেলেই হল।'
খ
গৃহসজ্জার দ্রব্য দেখিয়া ভামিনীভূষণের চক্ষুস্থির! এ যে রাজ-অট্টালিকার যোগ্য! তাঁহার সেই ছাদ-ভাঙা, স্যাঁতসেঁতে, এঁদো-পড়া বাসাবাড়ির পায়রা-খোপের মতো পাঁচটি ঘর—তাহার মধ্যে এই চকচকে-ঝকঝকে দামি জিনিসগুলি দেখিতেও মানাইবে না, রাখিতেও ধরিবে না! এ তো ভারী মুশকিলের কথা!
ভামিনী প্রথমেই দেখিলেন, একটা প্রকাণ্ড—যেমন উঁচু তেমনি চওড়া—আলমারি, তাহার ভিতরে চেষ্টা করিলে হয়তো একটা আস্ত ঘোড়াকেই পুরিয়া ফেলা যায়! একটা দেরাজ-টানাসুদ্ধ বনাত-মোড়া মস্ত টেবিল, তাহার উপর অনায়াসে ভামিনীভূষণ স্ত্রী-পুত্র-কন্যা লইয়া পরম নিশ্চিন্তভাবে শুইয়া থাকিতে পারেন! একখানা বিরাট আরশি, তাহার মধ্যে চার-চারজনের পূর্ণ-প্রতিবিম্ব পড়িতে পারে, একসঙ্গে! আর একটা সাজগোছ করিবার টেবিল—তাহার উপরেও দু-দুখানা বড়ো বড়ো আয়না! এ ছাড়া মার্বেলের দুটি ত্রিপায়া, দুখানা কৌচ, দুখানা আরামকেদারা ও চারখানা গদি-মোড়া চেয়ার প্রভৃতি জিনিসও আছে! ভামিনীভূষণের বুকটা ধুকপুক ধুকপুক করিতে লাগিল। 'এইসব জিনিস আমার বাড়িতে? লোকে বলিবে কী!' সৌভাগ্যের মধ্যে এত বড়ো দুর্ভাগ্য লুকাইয়া থাকিতে পারে, ভামিনীভূষণ আগে তা মোটেই জানিতেন না!
সন্ধ্যার সময় জন-চল্লিশ মুটে যখন 'হট যাও, হট যাও' করিতে করিতে লোক তাড়াইয়া ভামিনীভূষণের বাসার সামনে আসিয়া সারে সারে দাঁড়াইয়া গেল, তখন পাড়ায় দস্তুরমতো একটা উত্তেজনার সৃষ্টি হইল। এবং আশপাশের বাড়িগুলোর জানলায় জানলায় কৌতূহলী পাড়াপড়শিদের মুখ দেখিয়া ভামিনীভূষণ ক্রমেই অধিক মাত্রায় দমিয়া যাইতে লাগিলেন।
এমনকী পাড়ার মুরুব্বি এবং পাঠকদের পূর্বপরিচিত গঙ্গারাম হাতি মহাশয়ও বিস্ময় সংবরণ করিতে না পারিয়া, খড়ম পায়ে নীচে নামিয়া আসিয়া বলিলেন, 'হ্যাঁ ভামিনীবাবু, এ জিনিসগুলো কাদের?'
ভামিনী অত্যন্ত ম্রিয়মাণ স্বরে, অপরাধীর মতো কাঁচুমাচু মুখে বলিলেন, 'আমাদের!'
গঙ্গারাম ভারী হতভম্ব হইয়া গেলেন,—ভামিনীর কথায় বোধহয় তিনি বিশ্বাস করিলেন না।
এরপর বাড়ির উপরে আসবাব তোলার পালা। সে কি যে-সে ব্যাপার? সমস্ত বাড়িখানা থরথর করিয়া কাঁপিতে লাগিল—যেন ভূমিকম্প উপস্থিত! তারপর সরু সিঁড়ির উপরে যখন আসবাবে ও মুটেতে কুস্তি বাধিয়া গেল, ভামিনীভূষণ তখন নিরাপদ ব্যবধানে সরিয়া গিয়া মনে মনে ঠিক দিয়া রাখিলেন, আসবাব, মুটে আর সিঁড়ি—আজ আর কাহারোই অস্তিত্ব থাকিবে না!
দুর্গাকালী একটা হ্যারিকেনের লন্ঠন লইয়া সিঁড়ির উপরে দাঁড়াইয়া উদবিগ্ন স্বরে বলিল, 'ওরে এই মুটেরা! আস্তে আস্তে তোল! জিনিস ভাঙলে তোরা পয়সা পাবি না, তা কিন্তু আগে থাকতে বলে দিচ্ছি।'
সবচেয়ে হুলস্থুল বাধিল বড়ো আলমারিটা লইয়া। সিঁড়ির বাঁকের মুখে গিয়া সেটা কোনোমতেই আর মোড় ফিরিতে চাহিল না—লাভের মধ্যে দু-চারিবার ধস্তাধস্তি করিতেই সিঁড়ির পচা, ঝরঝরে রেলিংগুলো হুড়মুড় করিয়া ভাঙিয়া পড়িল। তখন দড়ি বাঁধিয়া বারান্দা বাহিয়া সেটাকে অনেক কষ্টে দ্বিতলে হিড়হিড় করিয়া টানিয়া তোলা হইল।
চল্লিশটা মুটেকে কুড়ি টাকা পারিশ্রমিক দিয়া ভামিনীভূষণ মুখটি চুন করিয়া আস্তে আস্তে উপরে উঠিলেন।
দুর্গাকালী ততক্ষণে মহা-উৎসাহের সহিত গাছ-কোমর বাঁধিয়া ঝাঁটা হাতে আসবাবগুলোকে ঝাড়পুঁছ করিতে লাগিয়া গিয়াছে।
ভামিনীভূষণ শয়নকক্ষে ঢুকিতে গিয়া, প্রথমেই টেবিলের গায়ে একটা বিলক্ষণ কষ্টদায়ক ধাক্কা খাইলেন। তারপর টাল সামলাইয়া চাহিয়া দেখিলেন, ঘরের ভিতরে আর তিলধারণের ঠাঁই নাই! খাটখানাকে একেবারেই অকেজো ও অনাবশ্যকবোধে টানিয়া এককোণে সরাইয়া, আলমারির জন্য স্থানসংকুলান করা হইয়াছে। খাটের সামনে কতকগুলো আসবাব এমনভাবে সাজানো রহিয়াছে যে, হরেকরকম জিমনাস্টিকের কসরত না জানিলে খাটের উপরে কোনোমতেই উঠিতে পারা যাইবে না। ঘরের আর-একদিকে দুটো জানলার দেড়খানা ঢাকিয়া দাঁড়াইয়া আছে আরশিখানা।
ভামিনীভূষণ সমস্ত দেখিয়া খানিকক্ষণ বোবা বনিয়া থ হইয়া রহিলেন। তারপর শুকনো গলায় বলিলেন, 'ওগো, শুনচ?'
দুর্গাকালী চেয়ারগুলো ঝাড়িতে ঝাড়িতে বলিল, 'কী?'
'আসবাবগুলো বেচে ফেলো। অনেক টাকা পাওয়া যাবে!'
দুর্গাকালীকে কে যেন ভারী শক্ত রকমের একটা গালাগালি দিল! ফিরিয়া দাঁড়াইয়া সে ফোঁস করিয়া বলিয়া উঠিল, 'অমন লক্ষ্মীছাড়ার মতো কথা মুখেও এনো না। এমন সব জিনিস পেলে লোকে ভাগ্যি মেনে বর্তে যায়, তিন পুরুষ ধরে ভোগদখল করে— আর উনি চাইচেন কিনা সব বিক্রি করতে! বুদ্ধির বালাই নিয়ে মরি!'
স্ত্রী-র সঙ্গে ঝগড়া করার স্বভাব ভামিনীভূষণের ছিল না, তিনি এতক্ষণ পরে নীরবে আপিসের জামাকাপড় খুলিতে লাগিলেন।
দুর্গাকালী তারিফ করিয়া বলিল, 'দেখো দেখি কী চমৎকার দেখতে হয়েচে, চোখ যেন জুড়িয়ে যায়! আমি যেমন ঘর সাজাবার জন্যে হেদিয়ে মরতুম,—তা এতদিনে ভগবান আমার সে সাধ পূর্ণ করলেন!'
ভামিনীভূষণ বলিলেন, 'এ কি আর ঘর সাজানো হয়েচে, না ঘরটাকে অন্ধকার গুদোম করে তোলা হয়েচে! এ ঘরে বাস করা আমার দ্বারা হয়ে উঠবে না।'
দুর্গাকালী খুব সহজভাবেই বলিল, 'এ ঘরে থাকবে কে? সেদিন মকরের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলুম, মকরের বাড়ির পাশেই একখানা দিব্যি বড়োসড়ো খালি বাড়ি দেখে এসেচি। তুমি কালকেই গিয়ে সেই বাড়িখানা ভাড়া করে এসো গে!'
এইবারে ভামিনীভূষণ একটু বিদ্রোহ প্রকাশের চেষ্টা করিয়া বলিলেন, 'তুমি বলো কী! আজ এই চল্লিশটা মুটের ঠ্যালা সামলাতেই আমার আধ হাত জিভ বেরিয়ে পড়েচে, এর ওপরে যদি আবার আমাকে বাড়িভাড়া আর মুটেভাড়া করতে হয়, তাহলে—'
দুর্গাকালী বাধা দিয়া বলিল, 'তবে কি এই দামি জিনিসগুলো—'
'তোমার দামি জিনিস চুলোয় যাক। ওসব বাড়ি ভাড়া-টাড়া আমাকে দিয়ে হবে না—আমার মাইনের দিকে আগে দেখতে হবে তো? এদিকে খিদেয় আমার পেট চুঁইচুঁই করচে, তোমার আলমারি-দেরাজ টেবিল-চেয়ার ভক্ষণ করে তো আমার পেট ভরবে না,— এখন আমাকে খেতে-টেতে দেবে কি না বলো!'
দুর্গাকালী ঝংকার দিয়া উঠিল, 'খালি পেটের কথাই ভাবতে শিখেচ, আমি তোমার কেউ নই—না?'— এই বলিয়া সুর করিয়া সে আরও যেসব কথার তুবড়ি ফুটাইয়া গেল, 'তাহার সংক্ষিপ্ত সারমর্ম এই যে, ভামিনীভূষণ ক্রমেই অধিকতর অভদ্র হইয়া উঠিতেছেন, বিবাহের পূর্বে এতটা জানিতে পারিলে, সে কখনোই তাঁহাকে— ইত্যাদি, ইত্যাদি,— এবং এইসব কথা বলিতে বলিতেই দুর্গাকালীর দুঃখিত নয়ন দুটির প্রান্তে সেই বিখ্যাত জিনিসের সঞ্চার হইল, যাহার কাছে পুরুষের সকল যুক্তিতর্কই নাকে খত দিতে বাধ্য!
ভামিনীভূষণ ফাঁপরে পড়িয়া বাহিরের দিকে চাহিবামাত্র দেখিলেন, সরু গলির ওপারে নিজের বাড়ির বারান্দায় দাঁড়াইয়া, ইগলচক্ষু গঙ্গারাম হাতি মহাশয় নির্নিমেষ নেত্রে তাঁহাদের দুজনের দিকে হাঁ করিয়া তাকাইয়া আছেন। গঙ্গারামের মুখ-চোখ দেখিয়া বেশ বোঝা যাইতেছিল, প্রতিবেশীর শয়নকক্ষের দৃশ্যটা তিনি ষৎপরোনাস্তি উপভোগ করিয়া লইতেছেন!
ভামিনীভূষণ তখনই দুমদাম করিয়া ঘরের জানলাগুলো বন্ধ করিয়া দিলেন।
এমন একটা সরস অভিনয়ের উপরে অসময়ে যবনিকা পড়িয়া গেল দেখিয়া, গঙ্গারাম হাতি নিরাশ হইয়া আপনমনেই বলিলেন, 'কাঙালের ঘোড়া-রোগ হয়েচে রে! দেখো, হাতই ভাঙে কি ঠ্যাংই খোঁড়া করে!'
গ
সপ্তাহখানেক কাটিয়া গেল। ইতিমধ্যে ভামিনীভূষণ খাটের উপরে আসবাব ডিঙাইয়া চটপট লাফাইয়া উঠিতে এবং লাফাইয়া নামিতে রীতিমতো ওস্তাদ হইয়া উঠিয়াছেন।
দুর্গাকালীও এ কয়দিন ভামিনীভূষণকে অসম্ভবরকম যত্নাদর করিতেছে—নূতন বাড়িভাড়ার কথা ভুলিয়াও মুখে আনে না। কিন্তু অর্ধাঙ্গিনীর এই নীরবতা দেখিয়া ভামিনীভূষণ বিশেষ আশ্বস্ত হইতে পারিলেন না। কারণ, তিনি স্বচক্ষে সমুদ্র দর্শন না করিলেও কেতাবে পড়িয়া জানিয়াছিলেন যে, ঝড়ের পূর্বে দুরন্ত সমুদ্রও থাকে অত্যন্ত শান্ত।
অবশেষে একদিন ঝড়ের পূর্বলক্ষণ দেখা গেল।
সেদিন নূতন আলমারিটা কী কারণে খুলিয়াই দুর্গাকালী হঠাৎ তীক্ষ্নস্বরে চেঁচাইয়া উঠিল।
ভামিনীভূষণ তখন গৃহতলে স্থানাভাবের জন্য বড়ো টেবিলটার উপরে বসিয়া, একখানা কাপড় কোঁচাইতে ব্যস্ত ছিলেন। স্ত্রী-র আর্তনাদে মাথা তুলিয়া বলিলেন, 'কী, কী? কী হল?'
দুর্গাকালী আলমারির ভিতরদিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করিয়া বলিল, 'দেখো তোমার কীর্তি এসে!'
ভামিনীভূষণ স্ত্রী-র কাছে গিয়া দেখিলেন, আলমারির নীচের তাকে কাচ্চাবাচ্চা-সমেত একটা অনাহূত নেংটি ইঁদুর আসিয়া উপনিবেশ স্থাপন করিয়াছে।
ভামিনীভূষণ চটিয়া বলিলেন, 'এটা আমার কীর্তি কীরকম?'
দুর্গাকালী স্বামীর মুখের কাছে হাত নাড়িয়া বলিল, 'তোমার কীর্তি নয়? বললুম, এ বাড়ি ছেড়ে উঠে যেতে, তা সেদিন আমায় তুমি যেন তেড়ে মারতে এলে! এখন দেখচ তো ব্যাপার! এরই মধ্যে নেংটি ইঁদুর এসে বাসা বেঁধেচে, আর দু-দিন বাদেই আমার এত সাধের জিনিসগুলো কেটেকুটে সব ছারখার করে দেবে!' (একটু থামিয়া, স্বামীর কাছ ঘেঁষিয়া, স্বর বদলাইয়া) 'হ্যাঁ গা, তোমার পায়ে পড়ি, আমার কথা তুমি শুনবে না? লক্ষ্মীটি, আমার মাথা খাও! শুনচ? ওগো!' এই বলিয়া দুর্গাকালী স্বামীর কণ্ঠে দুখানি বাহু রাখিয়া, তাঁহার শ্মশ্রু-গুম্ফাবৃত ওষ্ঠাধরে বকশিশ দিল প্রেমসরস একটি চুম্বন।
এই আচমকা আদরে ভামিনীভূষণের মনটা অবশ্যই একটু গলিয়া আসিল—কিন্তু মনের ভাবটা যাহাতে বাহিরে প্রকাশ না পায়, সে বিষয়ে তিনি যথেষ্ট সতর্ক হইয়া রহিলেন।
তথাপি ভামিনীভূষণের অবস্থাটা সমাধিগ্রস্তের মতো দেখিয়া, দুর্গাকালী বিনাইয়া বিনাইয়া তাহার সাধা গলার পুরোনো সুর ধরিল, 'ওগো মা গো, এমন লোকের হাতে পড়েছিলুম গো—'
আবার অশান্তির সূত্রপাত! ভামিনীভূষণ হতাশভাবে বিরক্তির স্বরে বলিয়া উঠিলেন, 'দেত্তোরি! বিয়ে করা কত ঝকমারি! রোজ রোজ আর ঘ্যানর ঘ্যানর ভালো লাগে না, এ বাড়ি ছেড়ে উঠে যেতে চাও, তা-ই হবে! ওঃ, কী একগুঁয়ে তুমি! বলচি আমার অত টাকা নেই— তা কিছুতেই শুনলে না? তোমরা—মেয়েরা হচ্ছ চালকহীন রেলগাড়ির মতো, সামনের পোল ভাঙা দেখেও সেইদিকেই মরিয়া হয়ে ছুটবে!'
ঘ
ভামিনীভূষণ নূতন বাড়িতে উঠিয়া আসিয়াছেন। আগেই মুটে-ভাড়ায় তাঁহার কুড়ি টাকা খরচ হইয়া গিয়াছিল। এবারেও মুটে ও বাড়ি ভাড়ায় তাঁহার পঁচিশ ও পঞ্চাশ টাকা খরচ হইয়া গেল! তাহার উপরে এই বড়ো বাড়িখানার ভাড়া তাঁহাকে মাসে মাসে গুনিয়া দিতে হইবে।
ভামিনীভূষণ চিন্তাগ্রস্ত হইয়া মানসনেত্র ঈষৎ উন্মুক্ত করিয়া দেখিলেন, তাঁহার ভবিষ্যতের বর্ণ কাফ্রির চেয়েও ঘুটঘুটে কালো! যেদিন তিনি লটারির টিকিট কিনিয়াছিলেন, অনুতপ্ত ভামিনীভূষণ এখন সেই অমঙ্গুলে দিনটার উপরে বারংবার অভিশাপ বর্ষণ করিতে লাগিলেন।
দুর্গাকালী কিন্তু ভাবনাচিন্তার কোনোই ধার ধারে না। সাজানো ঘর পাইয়া সকল কথাই সে ভুলিয়া গিয়াছে, দিনরাত হাসি-হাসি মুখে এ ঘর-ও ঘর ঘুরিয়া বেড়াইতেছে, এটা মুছিতেছে, ওটা ঝাড়িতেছে। দুর্গাকালী এখন সেই স্থানে,— যাহার নাম আনন্দের সপ্তম স্বর্গ।
কিন্তু দুর্গাকালীর দগ্ধাদৃষ্টে ভগবান বেশি দিন স্বর্গবাস লিখেন নাই। অত্যন্ত হঠাৎ একদিন বিনা মেঘে বজ্রাঘাত হইল।
ব্যাপারটা খুলিয়া বলাই ভালো।
* * *
ভামিনীভূষণ একদিন আপিস হইতে বাড়ি ফিরিয়া আশ্চর্য হইয়া দেখিলেন, বড়ো ঘরটা ভিতর হইতে সেই মস্ত মস্ত আলমারি, টেবিল, আরশি, কৌচ ও চেয়ার প্রভৃতি সমস্ত আসবাব যেন আলাদিনের বাড়ির মতো কোথায় অদৃশ্য হইয়া গিয়াছে এবং শূন্য ঘরের মেঝেতে পড়িয়া দুই হাতে মুখ চাপা দিয়া ফুলিয়া ফুলিয়া কাঁদিতেছে দুর্গাকালী, আর তাঁহার ছোটোভাই তারিণীভূষণ অনেক চেষ্টা করিয়াও বউদিদির সে বিষম কান্না থামাইতে পারিতেছে না!
স্বামীর সাড়া পাইয়া দুর্গাকালী আরও চেঁচাইয়া কাঁদিয়া উঠিল, 'ওগো আমার সর্বনাশ হয়েচে গো!'
ভামিনীভূষণ বিস্মিতস্বরে ছোটোভাইকে জিজ্ঞাসা করিলেন, 'হ্যাঁ রে তারিণী, এ কী ব্যাপার? ও-ই-বা কাঁদচে কেন, আর আসবাবগুলোই-বা গেল কোথায়?'
তারিণীভূষণ যাহা বলিল, তাহার সারমর্ম এই:—
'বিচিত্র লটারি'র স্বত্বাধিকারী সঞ্চিত টাকাকড়ি লইয়া অন্তর্হিত হইয়াছে। আসবাব-বিক্রেতা 'মুখার্জি কোম্পানি'র নিকট হইতে যে জিনিসগুলো সে ভাড়া করিয়া আনিয়াছিল, ভামিনীভূষণের বাসায় সেই জিনিসগুলোর সন্ধান পাইয়া, পুলিশ আসিয়া সমস্ত লইয়া গিয়াছে।
দুর্গাকালী বলিয়া উঠিল, 'ওরা পুলিশ নয় গো, ওরা ডাকাত, ডাকাত!'
তারিণী আবার বলিল, 'দাদা, ইনস্পেকটর বলে গেছে, তোমাকে থানায় গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করতে!'
ভামিনীভূষণ দুম করিয়া বসিয়া পড়িয়া গুম হইয়া বলিলেন, 'হুম!'
ভারতী, আশ্বিন ১৩২৬ (সেপ্টেম্বর ১৯১৯)
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।