মেঘের ছায়া

হেমেন্দ্রকুমার রায়

ট্রেন থেকে যখন নামলুম, তখন ঝিকিমিকি বেলা।

মাঠের পারে কচি-সবুজ বনভূমির শিয়রে, নিরেটের মতো কালো মেঘের বুকের উপরে, চপলার তরাস-চোখের ইঙ্গিত জেগে উঠছে বারংবার।

যেতে হবে অনেকখানি; ঝড়বৃষ্টির সম্ভাবনায় মনটা ভরে এল। আমার এখানে আসবার কথা ছিল না। তখন যদি আসতুম, জমিদারবাড়ির পালকি পেতুম। কিন্তু দৈবগতিকে তখন আসতে পারিনি সুতরাং এবেলা শুধুই নিজের শ্রীচরণ ভরসা।

বেয়ারাকে পিছু নিতে বলে, যতটা তাড়াতাড়ি পারলুম পা চালিয়ে দিলুম।

কিন্তু মেঘেরা বোধহয় আমার মতলব ধরে ফেললে, কারণ হঠাৎ তারা এত চটপট এগিয়ে এল যে, খানিক পরে আকাশের এধার থেকে ওধার পর্যন্ত খালি দেখতে লাগল, মেঘের ছুটোছুটি,—সঙ্গে সঙ্গে ঘুম ভেঙে জেগে ওঠে, খ্যাপা বাতাস টলমলে গাছের মাথায় মাথায় মাতামাতি করে বেড়াতে লাগল।

বেয়ারা বললে, 'বাবু, এখুনি ঝড় উঠবে!'

'তা-ই তো দেখচি রে, কী করা যায় বল দেখি?'

'এইবেলা ওইখানে গিয়ে উঠি চলুন'—বলে সে একদিকে আঙুল তুলে দেখালে।

খানিক তফাতেই বেড়-বাতাড়ের মাঝখানে একখানা হেলে-পড়া নড়বড়ে চালাঘর। তার পিছনেই একটা মস্ত বাঁশঝাড়, বাতাসের তালে তালে ক্রমাগত মাথা নাড়া দিয়ে ঠকঠক করে দোল খাচ্ছে আর খাচ্ছে!

ওদিকে মাঠের উপরে ধুলোর ধ্বজা উড়িয়ে, বিচিত্র কলরব তুলে আচমকা ঝড়ের আবির্ভাব হল—সেইসঙ্গেই তীব্র একটা অগ্নিস্রোতে আকাশের বুক ভাসিয়ে ফুটে উঠল বজ্রের প্রচণ্ড অট্টহাস্য!

'আমার দাদা বাজ পড়ে মরেছিল বাবু'—বলেই আমার বেয়ারাটা তার মনিবকে পিছনে ফেলে, সেই চালাঘরখানার দিকে ঘাড় গুঁজে চোঁ চাঁ দৌড় মারলে।

কিন্তু তখন তার বেয়াদবি দেখে রাগ করবার সময় আমার ছিল না। আমিও ছুটলুম।

দাওয়ায় উঠে দস্তুরমতো হাঁপাচ্ছি— হঠাৎ পিছন থেকে শুনলুম, 'তোমরা কে বাছা?'

ফিরে দেখি, একটা বুড়ি আমার মুখপানে চেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চেহারা দেখেই বুঝলুম, ভারী গরিব সে।

বললুম, 'আমরা ঈশানপুরের জমিদারবাড়ি যাচ্ছিলুম, হঠাৎ দুর্যোগ দেখে তোমাদের বাড়িতে এসে উঠেছি।'

বুড়ি আমার আগাপাশতলায় তার স্তিমিত দৃষ্টি বুলিয়ে সসম্ভ্রমে জিজ্ঞাসা করলে, 'তা বেশ করেচ, এসেচ বাবা— এ তো আমাদের পরম ভাগ্যি! হ্যাঁ বাবা, তুমি কি জমিদারবাবুদের কেউ হও?'

আমার বেয়ারাটা বলে উঠল, 'না রে বুড়ি না! আমাদের বাবু কলকাতার খুব হোমরাচোমরা উকিল, অনেক টাকা ওঁর আয়—বড়ো বড়ো সাহেব-জজ পর্যন্ত ওঁর কথা মেনে চলে—বুঝেচিস? জমিদারবাড়িতে যাচ্ছে মামলার তদবিরে।'

আমার প্রতি বুড়ির সম্ভ্রমের বহর যাতে বেড়ে ওঠে সেইজন্যেই বেয়ারাটা এই জাঁকের কথাগুলো শুনিয়ে দিলে তার উপর চালাকি আমার কিন্তু ভালো লাগল না। সে আরও কী বলতে যাচ্ছিল—ধমক খেয়ে থেমে গেল।

বুড়ির পিছনে পিছনে ঘরের ভিতরে গিয়ে ঢুকলাম ছোটো মেটে ঘর—স্যাঁতসেঁতে, অন্ধকার। খড়ের আঁটি ঘুঁটের বোঝা, দড়িদড়া, চটের বস্তা, হাঁড়িকুড়ি, বাসনকোশন, চৌকি-মাচা, ঝুড়ি-ঝোড়া, ছেঁড়া মাদুর, চাদর-বিছানা, ওয়াড়হীন তৈলাক্ত বালিশ প্রভৃতি হরেকরকমে ছোটো-বড়ো জিনিস সেই একখানি মাত্র ঘরের মধ্যে চারিদিক যেখানে-সেখানে ছড়ানো রয়েছে। এর মাঝে মানুষের ঠাঁই হয় কী করে, অবাক হয়ে তা-ই ভাবছি, এমন সময় বুড়ি ডেকে বললে, 'খেঁদি, অ খেঁদি, একখানা পিঁড়ি আনত বাছা!'

'পিঁড়ি কী হবে ঠাকুমা?'—বলে যে মেয়েটি আমার সামনে এসে দাঁড়াল, এই দারিদ্র্যের মধ্যে তাকে তো একেবারে দেখবার প্রত্যাশা করিনি! তার বয়স বছর দশ; রংটি শামলা, গড়নটি গোলগাল, মুখ-চোখ চমৎকার। সে আসছিল নাচের ভঙ্গিতে হেলতেদুলতে, হঠাৎ আমাকে দেখেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়তে ঘাড় বেঁকিয়ে অপলক চোখে অবাক হয়ে আমার দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে, সে স্পষ্টাস্পষ্টি জিজ্ঞাসা করে বসল, 'তুমি আবার কোত্থেকে এলে?'

বাঃ, এর প্রশ্ন শুনলে মনে হয়, এর সঙ্গে যেন তার অনেকদিনের জানাশুনো!

আমি বললুম, 'আকাশ থেকে।'

খেঁদি বিশ্বাস করলে না। চোখ কুঁচকে বললে, 'আমার সঙ্গে ঠাট্টা?'

'তবে তোমার সঙ্গে কী করব? গল্প শুনবে?'

খেঁদি এগিয়ে এসে একেবারে আমার হাত ধরে বলল, 'গপ্প? ওঃ, গপ্প আমি বড্ড ভালোবাসি! ঠাকুমাটা রোজ রোজ এক গপ্পই বলে! তুমি নতুন গপ্প কিছু জানো?'

খেঁদি দেখছি, এককথায় আমার সঙ্গে দিব্যি ভাব করে নিলে! আমি বললুম, 'হুঁ নতুন গল্প জানি বই কী!'

'ক-টা জানো?'

'তুমি যত শুনতে চাইবে তত বলতে পারি।'

'কই, বলো না!' এই বলে খেঁদি আমাকে নিয়ে অভিমত জানিয়ে বসবার চেষ্টা করছে, এমন সময়ে পাশ থেকে একটা কর্কশ স্বর শুনলুম,— 'দেখো একবার মেয়ের ঘটা!'

এ ঘরে আরও লোক আছে! সচকিতে ফিরে দেখি, খড়ের গাদার এককোণে একটা হাড়-চামড়াসার বুড়ো-বুড়ো মূর্তি একেবারে যেন খড়ের সঙ্গে মিশিয়ে, আধশোয়া অবস্থায় বসে আছে! তরল অন্ধকারের মধ্য থেকে তার চোখ দুটো মাঝে মাঝে নড়ে নড়ে উঠছিল! আচমকা দেখলে মনে হয়, এ যেন গঙ্গাযাত্রী রোগী!

সেই মূর্তি তার বেরিয়ে-পড়া চোখ দুটো আরও বেশি ড্যাবডেবে করে, খনখনে গলায় বললে, 'হ্যাঁ রে খেঁদি! তোর কি একটুও আক্কেল নেই রে? যে আসবে তার কাছেই গল্প শুনতে চাওয়া? ভারী মজা পেয়েছিস না?' বলেই সে সাঁইসাঁই করে এমনি বিষম হাঁপাতে লাগল। আমার ভয় হল— যায় বুঝি-বা বুড়ো দম আটকে এখনই মরে!

খেঁদি চুপিচুপি আমার কানে কানে বললে, 'ঠাকুদ্দা ভারী বকে! ঠাকুমা বলে বুড়োর ভীমরতি হয়েচে! আর-একটু পরে গপ্প শুনব—বুঝলে?'

বৃষ্টি তো থামলই না—উলটে আরও বেড়ে উঠল। একবার ঘরের দরজা খুলে দেখলুম, —অন্ধকারের মস্ত একটা ঘেরাটোপের মধ্যে, আকাশ আর পৃথিবী যেন মিলেমিশে একশা হয়ে গেছে! আমি মহাসমস্যায় পড়ে গেলুম। রাতও ক্রমে বেড়ে উঠছে, আমি এখন যাই কোথায়?

খেঁদির ঠাকুমা বোধহয় আমার মনের ভাবটা ধরে বললে। সে বললে, 'এ বৃষ্টিতে তোমার তো যাওয়া হতে পারে না বাবা। আজ আমার এখানে খেয়েদেয়ে কোনোরকমে মাথা গুঁজে রাতটা কাটিয়ে দাও। তোমার কষ্ট হবে, কিন্তু কী করবে বলো!'

আমি ঘাড় নেড়ে বললুম, 'না, না—তাও কি হয়!'

বুড়ি বললে, 'গরিব বলে ঘেন্না কোরো না বাবা!'

এ কথার উপরে আর কথা চলে না। অতএব বুড়ির হাতের গরম গরম পরোটা আর ভাজাভুজি খেয়ে, উদরদেবকে সেদিনের মতো ঠান্ডা করলুম।

ওদিকে খেঁদি ঠিক ওত পেতে বসে ছিল! খাওয়াদাওয়ার পরই সে এসে আবার ধন্না দিয়ে পড়ল, 'এইবার গপ্প বলো!'

খড়ের গাদার পিছন থেকে খেঁদির ঠাকুরদার খনখনে গলার আওয়াজ এল, 'খেঁদি আবার! ভদ্দরলোককে একটু জিরুতে দে!'

বুড়িকে জিজ্ঞাসা করলুম, 'তোমার স্বামীর কী কী অসুখ হয়েচে?'

বুড়ি বিরক্তস্বরে বললে, 'ব্যামো বলে ব্যামো বাবা। বাতের জন্যে উঠতে পারে না, হাঁপানির জন্যে কথা কইতে পারে না—মিনসে আমার হাড়মাস ভাজা-ভাজা করে খেলে! ও শুধু বসে বসে হাঁপাবে, খাবে আর বকবে—আর সংসারের সমস্ত ভাবনা ভেবে মরব আমি!'

আমি বললুম, 'কেন, তোমার ছেলে—'

মাথায় করাঘাত করে বুড়ি আমাকে বাধা দিয়ে বলে উঠল, 'আ আমার পোড়াকপাল, তাহলে আজ আর আমার ভাবনা কী ছিল! আমি রাক্ষুসি ব্যাটা-বউ দুটো খেয়ে বসে আছি, থাকবার মধ্যে আছে খালি ওই নাতনিটি।'

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বুড়ি আবার বললে, 'খেঁদিও বড়ো হয়ে উঠল, এখন আবার ওর বিয়ের ভাবনা ভাবতে হচ্ছে!'

খেঁদি আমার পাশে দু-থাবা পেতে বলে হাঁ করে সব শুনছিল। সে বলে উঠল, 'না, না, আমি বিয়ে করব না ঠাকুমা, ছিদামটা ভারী পাজি—আজ আমাকে সে বড়ো মেরেচে!'

বুড়ি হেসে বললে, 'চুপ কর হাবা মেয়ে, চুপ কর যত বুড়ো হচ্চিস ততই যেন ধিঙ্গি হয়ে উঠছিস রে! বেশ করেচে ছিদাম তোকে মেরেচে!'

খেঁদি চোখ-মুখ ঘুরিয়ে বললে, 'হ্যাঁ, বেশ করেচে নাকি! ফের যদি সে আমার গায়ে হাত তোলে, আমি তাহলে কামড়ে তার কান কেটে নেব, দেখো-না!'

আমি জিজ্ঞাসা করলুম, 'ছিদাম কে?'

খেদি ভয়ে-ভয়ে ঠাকুমার মুখের দিকে চেয়ে, চুপি চুপি আমাকে বললে, 'ছিদাম কে জানো না বুঝি? আমার বর!'

বুড়ি বললে, 'আহা, ছিদাম বড়ো ভালো ছেলে গো! খেঁদির সঙ্গে খেলা করে করে খেঁদিকে তার ভারী মনে ধরেছে! খেঁদির সঙ্গে বিয়ে হলেই বেশ হত, কিন্তু তা আর কী করে হবে বলো? ছিদামের বাপ যে দেড়শো টাকা চায়! দুধ বেচে যে পয়সা পাই, তাতেই খেতে গেলে পরতে কুলোয় না, অত টাকা কোথায় পাব বাছা?'

খেঁদি রেগে বললে, 'তোকে আর বকবক করতে হবে না ঠাকুমা, তুই—যাঃ! আমি এখন গপ্প শুনব!'—এই বলে সে একেবারে আমার কোল ঘেঁষে বসে, আমার মুখটা জোর করে টেনে তার দিকে ফিরিয়ে নিয়ে আবার বললে, 'ঠাকুমার সঙ্গে আর কথা কইতে হবে না, এবার আমাকে গপ্প বলো!'

ভোরের বেলায় উঠে ব্যাগটা গুছিয়ে-গাছিয়ে নিচ্ছি, বুড়ি এসে ঘরে ঢুকল। তার হাতে একবাটি গরম দুধ আর খানকতক বড়ো বড়ো বাতাসা।

আমি বললুম, 'ওসব কী হবে?'

বুড়ি বললে, 'বাবা, গরিবের ঘরে এসেচ, গরিবের মতোই একটু জল খেয়ে যাও! অনেকখানি হাঁটতে হবে, সকালবেলায় খালি পেটে তো যেতে দেব না!'

বুড়ির মনের পরিচয় যতই পাচ্ছি, ততই মুগ্ধ হচ্ছি। আমার মতো অচেনা এক পথিককে কাল থেকে এরা যে যত্ন-ভালোবাসা দিয়েছে, তা আমি আর কখনো ভুলব না।

আস্তে আস্তে একখানি দশ টাকার নোট বার করে বুড়ির হাতে দিতে গেলুম।

বুড়ি ঘাড় নেড়ে জিভ কেটে বললে, 'অতিথিসেবা পুন্যির কাজ—পুন্যি কি বেচা-কেনার জিনিস বাবা? ও টাকা তুমি ফিরিয়ে নাও!'

খড়ের গাদার পাশ থেকে আওয়াজ এল, 'নে রে মাগি! বাবু দয়া করে যা দিচ্চে, সেটা নিতে দোষ কী আমরা তো আর চেয়ে নিচ্চি না!'

বুড়ি বেজায় চটে বলে উঠল, 'মিনসেকে বাহাত্তরে ধরেচে! ওর কথায় কান দিয়ো না বাবা, টাকা পেলে সব করতে পারে! টাকা আমি চাই না, খালি একটু আশীর্বাদ করে যাও, আমার খেঁদি যেন সুখে থাকে। তার মুখে হাসি দেখে আমরা যেন চোখ বুজতে পারি!'

খেঁদির ঠাকুরদা হাঁপাতে হাঁপাতে বললে, 'কী বলব মরে আছি! হাতি যখন খানায় পড়ে, ব্যাংও তখন লাথি মারে!'

* * *

দাওয়ায় বেরিয়ে এসে দেখি, আকাশ পরিষ্কার—ভোরের চিকন রোদে গাছের জলভরা পাতাগুলি মণিমুক্তার মতো ঝলমল করছে।

সামনেই পেয়ারা গাছের একটা ডালে, খেঁদি আর একটি পনেরো-ষোলো বছরের জোয়ান ছেলে পাশাপাশি বসে একমনে পেয়ারা খেতে ব্যস্ত। আন্দাজে বুঝল ওই ছেলেটিই শ্রীদাম।

বাল্যপ্রেমের এই সরল লীলাটি আমার চোখে এত ভালো লাগল যে, তখনই ব্যাগ থেকে ফোটোগ্রাফ 'কোড্যাক' বার করে একখানা ছবি তুলে নিলুম। কলকাতা ছেড়ে বাইরে বেরুলেই বরাবর আমি একটা 'কোড্যাক' নিয়ে আসি—নতুন কিছু দেখলেই তখনই তুলে নি।...

খেঁদি আমাকে দেখতে পেয়েই একলাফে নীচে নেমে পড়ল। তারপর মাথার চুল উড়িয়ে হাসতে হাসতে আর এক-পায়ে নাচতে নাচতে আমার কাছে ছুটে বললে, 'একটা পেয়ারা খাবে? ভারী মিষ্টি!' বলে জোর করে আমার হাতে একটা পেয়ারা গুঁজে বললে, 'নাও, খেয়ে ফেলো!'

আমি বললুম, 'খেঁদি, গাছের ওপরে ও কে?'

খেঁদি মুখ গম্ভীর করে বললে, 'ও-ই তো আমার বর!'

'এর মধ্যে ফের ভাব হয়ে গেছে বুঝি?'

খেঁদি আঙুল দিয়ে বরকে দেখিয়ে বললে, 'ছিদাম নেই আঁকড়া। আমার সঙ্গে সেধে সেধে ভাব করে—কিছুতেই ছাড়লে না যে।'

'বেশ, বেশ, তুমি এখন আবার তোমার বরের কাছে যাও, নইলে সে রাগ করবে! আমিও চললুম।'

সচকিত চোখে খেঁদি বললে, 'কোথায় চললে তুমি?'

'আমি এখন বাড়ি যাচ্ছি।'

'আর আসবে না?'

'বোধহয় না।'

খেঁদি একেবারে দু-হাতে আমার কোমর জড়িয়ে ধরে বলে, 'হুঁ, যাবে বই কী! আমি তোমায় ছেড়ে দেব না।'

'সে কী খেঁদি, ছেড়ে দেবে না কী? আমি কি তোমাদের বাড়িতে থাকতে এসেছি? ছাড়ো, ছাড়ো!'

অনেক ধস্তাধস্তির পর সে আমার দিকে তার দুটি নয়ন তুলে বললে, 'বলো, আবার আসবে?'

'হ্যাঁ, হ্যাঁ, আসব বই কী!'

'বলো আসব, আসব, আসব— তিন সত্যি গালো!'

'আসব, আসব, আসব!'

'এবার এসে সেই কঙ্কাবতীর গপ্পটা বোলো—?'

আচ্ছা বলে তাড়াতাড়ি আমি পা চালিয়ে দিলুম; কিন্তু সহজে সঙ্গ ছাড়লে না,—ছলছল চোখে মুখখানি করে অনেক দূর পর্যন্ত আমার সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে এল।

আমি ফিরে বললুম, 'খেঁদি, এইবার তুমি বাড়ি যাও!'

'যাই' বলেই হঠাৎ ঠোঁট ফুলিয়ে কেঁদে ফেলে, দৌড়ে সে চলে গেল।

এক মমতাভরা প্রাণ! এমন মেয়ে আমি আর দেখিনি! তার সেই শেষ-বিদায়ের কান্না এখনও বুকের মাঝখানে লেগে আছে।

কলকাতায় ফিরে এসেই আমার প্রথম কাজ হল, ঠাকুমার হাতে দুশো টাকা পাঠিয়ে দেওয়া। সেই একখানা চিঠিতে লিখলুম, 'দেড়শো টাকা খেঁদির জন্যে, আর পঞ্চাশ টাকা তার বিয়েতে যেন খরচ হয়। খেঁদিকে বলো, তাকে আমি ভুলিনি।'

খেঁদির সঙ্গে যে শ্রীদামের খুব ভালোবাসা, তা আমি বেশ বুঝেছিলুম। বিবাহ হলে এদের দুজনের জীবন হাসি মাখা হয়ে থাকবে। তাই আমি তাদের মিলনে বাধা দূর করে দিলুম। আর কৃতজ্ঞতা বলেও তো একটা জিনিস আছে! খেঁদির ঠাকুমা লেখাপড়া জানে না, ভদ্র ঘরের মেয়েও নয়,—কিন্তু তার মধ্যে আমি যে দুর্লভ প্রাণের সন্ধান পেয়েছিলুম, দুশো টাকা তো তুচ্ছ কথা—লক্ষ টাকাতেও তেমন উচ্চপ্রাণ আর কখনো দেখতে পাব না,—সে হচ্ছে স্বর্গের পারিজাত।

তারপর তিন বৎসর কেটে গেল। এর মধ্যে সংসারের কোলাহলে ডুবে, খেঁদির কথা আমি একরকম ভুলেই গিয়েছিলুম। কখনোসখনো মাঝে মাঝে মনে হত বটে খেঁদির সঙ্গে আবার দেখা করব বলে আমি অঙ্গীকার করে এসেছি—কিন্তু খেঁদি তো জানে না, সংসারীর কাছে অঙ্গীকারের মূল্য একটা কানাকড়িও নয়!

এমনি সময়ে ঈশানপুরের জমিদারের একমাত্র পুত্রের অন্নপ্রাশনে নিমন্ত্রণ এল। এত বড়ো একটা বাঁধা মক্কেলের নিমন্ত্রণ অবহেলা করা ঠিক নয়। স্থির করলুম, এইসঙ্গে খেঁদিকেও একবার দেখা দিয়ে আসব। কেন জানি না সেই দু-দণ্ডের আলাপেই খেঁদির উপরে আমার কেমন একটা মায়া পড়ে গিয়েছিল! আমার নিজের ছেলে-মেয়ে কিছুই হয়নি, পরের মেয়েকে দেখে তাই কি আমার এতটা ভালোবাসতে সাধ হচ্ছে? হবে!

খেঁদির বিবাহে কিছু যৌতুক দিইনি। তার জন্যে একছড়া হার, আর তার যে ফোটোখানা তুলেছিলুম সেখানাও যাবার দিনে তাকে উপহার দেব বলে সঙ্গে নিয়ে গেলুম।

সেদিন আশ্বিনের ষষ্ঠী। বাংলার ঘরে ঘরে মায়ের প্রাণ সেদিন পরিপূর্ণ আনন্দে টলটল করছে—চারিদিকের তৃণ-শস্য-তরুর বিপুল শ্যামলোৎসবের মধ্যে নৃত্যলীলা জাগিয়ে, শরৎ-সমীর সেদিন উমার আগমনি-গান গেয়ে বসে চলেছে কোথায়, কতদূরে! গ্রামে গ্রামে সানাই ধরেছে সাহানা, পথে পথে রঙিন কাপড়ের স্রোত ছুটেছে পুজোবাড়ির দিকে, বাঙালির বুক থেকে খসে পড়েছে আজ দাসত্বের পাষাণভার!

...আজ শুধু হাসি, হাসি, হাসি—সবাই আজ হাসির ফোয়ারা খুলে দিয়েছে। এমন প্রাণভরা হাসির দিন বাংলায় আর দ্বিতীয় নেই।

দূর থেকে দেখতে পেলুম, সেই বাঁশঝাড়ের তলায় ঝোড়ো-বাতাড়ের মাঝখানে পরিচিত চালাঘরখানি—তেমনি হেলে-পড়া তেমনি নড়বড়ে। ভাবলুম, না-জানি খেঁদি আজ কেমনধারা হয়েছে,—তার সেই সরল চপলতা আজ আর হয়তো নেই, আমায় দেখে আজ হয়তো সে মুখে টেনে দেবে একহাত ঘোমটা!

পায়ে পায়ে এগিয়ে দাওয়ায় গিয়ে উঠলুম। আস্তে আস্তে সাড়া দিয়ে ডাকলুম।

ভিতর থেকে খনখনে গলায় আওয়াজ এল—'কে ডাকে?'

এ খেঁদির ঠাকুরদা! বুড়ো এখনও বেঁচে আছে! তার যে মূর্তি দেখে গিয়েছিলুম!

খেঁদির ঠাকুমা বেরিয়ে এল! বয়সের ভারে তার দেহ এখন সামনের দিকে আরও বেশি ঝুঁকে পড়েছে, চোখদুটোও আরও বেশি ঘোলাটে হয়ে এসেছে।

আমার দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে, বুড়ি আমাকে ঠিক চিনতে পারলে। খুশি হয়ে বললে, 'ও মা, তুমি! এসো বাবা, এসো এসো!'

ঘরের মধ্যে ঢুকে দেখলুম, এই তিন বছরেও তার কিছুমাত্র পরিবর্তন হয়নি—চারিদিকে ঠিক তেমনি এলোমেলভাবে হরেকরকমের ছোটো-বড়ো জিনিস গাদা করা আছে, খড়ের আঁটির পাশে ঠিক তেমনি করেই খেঁদির ঠাকুরদাদার অস্থিচর্মসার মূর্তি বসে বসে মরো-মরো হয়ে ক্রমাগত হাঁপাচ্ছে আর হাঁপাচ্ছে!

আমি হারছড়া আর ফোটোগ্রাফখানা বার করে মেঝের উপরে রাখলুম। বুড়ো-বুড়ি দুজনেই অবাক হয়ে সেইদিকে চেয়ে রইল।

আমি বললুম, 'দেখো দেখি এই ছবিখানি!'

খেঁদির ঠাকুমা ফোটোখানা চোখের খুব কাছে নিয়ে গিয়ে, দেখেই অবরুদ্ধস্বরে আর্তনাদ করে উঠল! কে তার বুকে হঠাৎ একখানা ছুরি বসিয়ে দিলে!

বুড়ো তার বেরিয়ে-পড়া চোখ দুটো আরও বেশি বিস্ফারিত করে বললে, 'ও কী, ও কী!'—

'ওগো, এ যে আমার খেঁদির ছবি গো!'—এই বুড়ো-বুড়ি ছবিখানাকে প্রাণপণে আপনার বুকের উপরে চেপে ধরলে!

বুড়ো তাড়াতাড়ি একখানা শীর্ণ আগ্রহভরা হাত বাড়িয়ে দিয়ে উত্তেজিতস্বরে বললে, 'খেঁদির ছবি? খেঁদির ছবি— কই, দেখি দেখি দেখি!'

কিছুই বুঝতে না-পেরে, দ্বিধাভরে আমি জিজ্ঞাসা করলুম, 'তোমরা এমন করচ কেন? খেঁদি কোথায়?'

বুড়ো খানিকক্ষণ আমার দিকে নির্নিমেষ নেত্রে দেখে স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। তারপর উপরদিকে এক কম্পমান হাত তুলে বললে, 'স্বর্গে।'

'অ্যাঁ!'

'বাবু, গেল বছরে খেঁদিকে হারিয়েচি। বেঁচে থাকব আমরা—' বৃদ্ধ বুক চাপড়ে হাহাকার করে উঠল।...

না, না, বিশ্বাস হচ্ছে না। এই জরাজীর্ণ রোগ মরণাপন্ন বৃদ্ধ, আর এই শোকক্ষীণা সহায়হীনা একান্ত নারী, এদের চোখে চোখে আগলে-রাখা শেষ সম্বলটুকু করতে পারেন—ভগবান কি এমন নিষ্ঠুর চোর!

... এ পৃথিবীতে ফোটা ফুল বোঁটা ছিঁড়ে পড়ে একরাতে, কিন্তু ঝরা ফুলের শুকনো পাতা থাকে অনেকদিন!

বুড়ো-বুড়ি দুজনেই পলকহারা চোখে ছবির উপর হুমড়ি খেয়ে নিশ্চেষ্ট হয়ে পড়ে আছে,—সেই অবস্থায় আস্তে আস্তে ঘর থেকে আমি বেরিয়ে এলুম। কেউ সহ্য করতে পারে না।

বাইরে, তেমনি করেই আগমনির সানাই সমানে বেজে চলেছে।

আজ শুধু হাসি, হাসি, হাসি—সবাই আজ ফোয়ারা খুলে দিয়েছে। কিন্তু এ হাসির সুর যাদের আজ বেসুরো বাজছে, তাদের কথা ভেবে হৃদয় মূর্ছিত হয়ে পড়ল। খেঁদি! খেঁদি!

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%