হেমেন্দ্রকুমার রায়
(রুশ গল্পলেখক আন্তন শেখভ হইতে)
সাসা স্মারনভ, তার মায়ের 'সবেধন-নীলমণি!' খবরের কাগজে কী-একটি জিনিস মুড়িয়া বগলদাবা করিয়া সে নামজাদা ডাক্তার কোসেলকফের রোগী দেখিবার ঘরে গিয়া ঢুকিল।
ডাক্তার তাহাকে দেখিয়া বলিলেন, 'কী হে ছোকরা, খবর কী? আজ সকালে তুমি কেমন আছ?'
সাসার চোখ মিটমিট করিয়া উঠিল। বুকের উপরে এক হাত রাখিয়া, বাধো-বাধো গলায় সে বলিল, 'আপনি আমাদের যে উপকারটা করেচেন সেজন্যে মা আপনার কাছে বড়োই ঋণী আছেন। মায়ের আমি এক ছেলে। আপনি আমার প্রাণ বাঁচিয়েছেন!'
ডাক্তার খুশি হইয়া সদয়স্বরে বলিলেন, 'আহা, থাক— থাক! ওসব কথা আর তুলতে হবে না! আমার জায়গায় অন্য কেউ এলে যা করত আমি শুধু তা-ই করেচি বই তো নয়!'
সাসা বলিল, 'মায়ের আমি এক ছেলে। আমরা ভারী গরিব ডাক্তার সায়েব! আপনার ভিজিটের টাকা ঠিক দিতে পারিনি বলে আমরা বড়োই লজ্জিত। তবে,— মা আপনাকে একটি জিনিস ভেট পাঠিয়েছেন। এটি হচ্চে অষ্টধাতুর পুতুলঅলা বাতিদান, বাজারে এখন আর এ কিনতে মেলে না।'
ডাক্তার বলিলেন, 'না, না— তোমাদের ভেট-টেট আর কিছু দিতে হবে না।'
সাসা মোড়কটি খুলিতে খুলিতে ঘাড় নাড়িয়া বলিল, 'সে কি হয় ডাক্তার সায়েব। তাহলে আমরা বড়ো দুঃখিত হব। আমার বাবার সেকালকার জিনিসপত্তর কেনার বাতিক ছিল কিনা! তাই এটিকেও তিনি কিনেছিলেন। এ বড়ো দুর্লভ রত্ন ডাক্তার সায়েব, বড়ো দুর্লভ রত্ন!'
সাসা মোড়ক খুলিয়া জিনিসটি গর্বিতভাবে টেবিলের উপরে রাখিল। ডাক্তার দেখিলেন, সেটি একটি সুন্দর বাতিদান— চমৎকার কারিগরি! দুটি নগ্ন রমণীর মূর্তি বাতিদানটি কাঁধে করিয়া দাঁড়াইয়া আছে। মূর্তি দুটির চোখে-মুখে দুষ্টামিভরা হাসি। তাদের ভাবগতিক দেখিলে মনে হয়, বাতির ভার বহিতে তারা যেন নেহাত নারাজ;— এমনকী, তারা দুটিতে যেন, যেকোনো মুহূর্তে মাথার উপর হইতে বাতিদানটা ছুড়িয়া ফেলিয়া দিয়া, এমন এক বিষম অভদ্র নাচ শুরু করিয়া দিতে পারে, যার কথা ভাবিতে গেলেও লজ্জায় মুখ রাঙা হইয়া উঠে!
পুতুল দুটির দিকে অনেকক্ষণ কঠোর দৃষ্টিতে চাহিয়া থাকিয়া, ডাক্তার আস্তে আস্তে দু-চারবার কাশিয়া ও কান চুলকাইয়া বলিলেন, 'হুঁ, পুতুল দুটিতে যে খুব ভালো কারিগরি আছে, তাতে আর সন্দেহ নেই। কিন্তু— কিন্তু— বুঝচ হে ছোকরা— কিন্তু—'
সাসা কহিল, 'আপনি কী বলচেন?'
ডাক্তার বলিলেন, 'বলচি কী জানো? শয়তানও বোধহয় এমন বিদঘুটে পুতুল গড়তে পারে না। এ বাতিদানটা কী করে আমি টেবিলে সাজিয়ে রাখি?'
সাসা ক্ষুব্ধস্বরে বলিল, 'বলেন কী ডাক্তার সায়েব! আপনার সংকোচ কীসের? এ যে আর্ট! দেখুন-না এতে কী সৌন্দর্য। একেবারে পৃথিবীকে ভুলে যেতে হয়! এর মাপজোখ কেমন নিখুঁত, খোদকারির হাত কী সাফ, পুতুল দুটির চেহারাই বা কী জলজ্যান্ত!—'
ডাক্তার বলিলেন, 'হুঁ, হুঁ, সেসব আমিও বেশ স্পষ্ট বুঝতে পারচি। তবে কী জানো বাপু, আমি বিবাহিত পুরুষ, আমার ঘরে ভদ্রমহিলারা আর ছেলেপুলেরা হামেশাই আসা-যাওয়া করে থাকে।'
সাসা বলিল, 'হ্যাঁ, আপনি যে চোখে দেখচেন, সে চোখে দেখলে এরকম উঁচু দরের আর্টেও খারাপ ভাব পাওয়া যায় বটে! কিন্তু, ডাক্তার সায়েব, আপনার মতো শিক্ষিত লোক অসভ্য চাষাভুসোর মতো হলে চলবে কেন? বুঝচেন তো, আপনি যদি আমাদের এ সাধের উপহারটি ফিরিয়ে দেন, তাহলে মায়ের আর দুঃখ রাখবার ঠাঁই থাকবে না। মায়ের আমি এক ছেলে,— আপনি আমার প্রাণ বাঁচিয়েছেন।'
ডাক্তার বলিলেন, 'আচ্ছা, আচ্ছা,— আমি এ উপহার নিলুম। তোমার মা-কে আমার ধন্যবাদ জানিয়ো।'
সাসা খোশমেজাজে ডাক্তারকে নমস্কার করিয়া চলিয়া গেল।
ডাক্তার একলা একলা বসিয়া বাতিদানটার দিকে তাকাইয়া রহিলেন। দু-চারবার কান চুলকাইলেন। খানিকক্ষণ কী ভাবিলেন।
'হুঁ, এটা নিশ্চয়ই খুব উঁচু দরের আট! একে ফেলে দেওয়াও বোকামির কাজ, অথচ এখানে রাখাও বেজায় মুশকিল! আচ্ছা, এটাকে অন্য কারো ঘাড়ে চাপিয়ে দিলে হয় না?'
হঠাৎ প্রাণের বন্ধু উকিল ঔকফের কথা ডাক্তারের মনে উদয় হইল। সে তাঁর কাজ করে, অথচ টাকা দিতে গেলে নেয় না।
'ঠিক! সে বিয়ে করেনি, সুতরাং এমন উপহার পেলে নিশ্চয়ই সে কোনো আপত্তি-টাপত্তি করবে না!'
ডাক্তার আর একটুও সময় নষ্ট করিলেন না। ভালো করিয়া বাতিদানটা কাগজে মুড়িয়া তিনি সোজা তাঁর বন্ধুর বাড়িতে গিয়া হাজির হইলেন।
'সুপ্রভাত, বন্ধু! আজ তোমার জন্যে একটি উপহার এনেছি। আমার কাজে তুমি যখন টাকাকড়ি কিছু নাও না, তখন এ উপহারটি না নিলে তোমায় কিছুতেই ছাড়চি না!'
বাতিদানটা দেখিয়া ঔকফ একেবারে অবাক ও মোহিত হইয়া গেলেন।
'কী ভয়ানক কল্পনা! অথচ কী সুন্দর! বাঃ বাঃ! কোত্থেকে এটা পেলে হে?'
'তোমাকে দিলুম।'
অসোয়াস্তির সঙ্গে দরজার দিকে চাহিয়া একটা ঢোঁক গিলিয়া, ঔকফ আমতা আমতা করিয়া বলিলেন, 'মাপ করো ভায়া, আমি তোমার উপহার নিতে পারলাম না! এটাকে শিগগির এখান থেকে সরিয়ে ফেলো।'
ডাক্তার যেন আকাশ থেকে পড়িয়া বলিলেন, 'সে কী! কেন?'
'কী জানো? আমার মা এখানে আসেন, মক্কেলরা আসে, চাকরবাকরেরা আসে, ওটা কি এখানে সবার সুমুখে ফেলে রাখা যায়? সরিয়ে ফেলো, জলদি সরিয়ে ফেলো!'
একসঙ্গে হাত নাড়া ও মাথা নাড়া দিয়া ডাক্তার বলিলেন, 'না ভাই, না! এটা ফিরিয়ে দিলে আমি ভারী দুঃখিত হব। তোমার লজ্জা কীসের?— এ তো আর্ট! এর প্রতি তুমি অবিচার কোরো না।'
'সব তো বুঝচি। কিন্তু পুতুল দুটোতে যদি কাপড় পরানো থাকত, তাহলেও বরং—'
কিন্তু ঔকফের কথা শেষ হইবার আগেই ডাক্তার ঘর থেকে তাড়াতাড়ি সরিয়া পড়িলেন। এই বিষম আর্টের বোঝা ঘাড় হইতে নামাইয়া, ডাক্তার যেন হাঁপ ছাড়িয়া বাঁচিলেন।
ঔকফও ডাক্তারের মতো একলাটি বসিয়া অনেকক্ষণ বাতিদানটার দিকে তাকাইয়া রহিলেন। দু-চারবার সেটাকে আষ্টেপৃষ্ঠে নাড়িয়া-চাড়িয়া দেখিয়া ভাবিতে লাগিলেন, কী করা উচিত।
'খুব উঁচু দরের আর্ট বটে! একে ফেলে দেওয়াও যায় না, রাখাও চলে না। আচ্ছা, এটা কাউকে গছিয়ে দিতে পারলে তো বেশ হয়। ঠিক! স্যাসকাইন থিয়েটার করে, আজ তার সাহায্য-রজনি— বিশেষ, এরকম জিনিস সে খুব ভালোবাসে!'
ঔকফ আর দেরি করিলেন না। বাতিদানটা কাগজে মুড়িয়া লইয়া, কোনোদিকে না চাহিয়া তিনি একেবারে স্যাসকাইনের বাড়িতে গিয়া উঠিলেন।
উপহার দেখিয়া স্যাসকাইন ভারী খুশি। সেদিন তাঁহার ঘরে যত বন্ধুবান্ধব আসিলেন, সবাই মিলিয়া বাতিদানের কী তারিফটাই যে করিলেন! কিন্তু এই হাসি-ঠাট্টা-হট্টগোলের মাঝখানে যখন একজন অভিনেত্রী আসিয়া হঠাৎ দরজায় ঘা মারিলেন, স্যাসকাইন তখন চমকিয়া তড়াক করিয়া চেয়ার হইতে লাফাইয়া উঠিলেন; তাঁহার মুখ শুকাইয়া একেবারে এতটুকু হইয়া গেল।
দরজার পিছন হইতে মহিলাটিকে উদ্দেশ করিয়া ব্যস্তভাবে তিনি বলিলেন, 'এখন ভেতরে এসো না গো, এসো না! আমি কাপড় পরচি!'
সেরাতে, অভিনয়ের পর বাড়িতে ফিরিয়া স্যাসকাইন উপহারটির দিকে তাকাইয়া, ঘন ঘন মাথা চুলকাইতে শুরু করিলেন।
'তা-ই তো, কী মুশকিল! এখানে যখন-তখন অভিনেত্রীরা এসে থাকেন, অত বড়ো জিনিসটাকে টপ করে যে টানায় পুরে ফেলব তারও জো নেই। এটাকে ফেলে দিলেও লোকে আমাকে বদরসিক ঠাওরাবে,— এ যে আর্ট!'
তাঁহার জামা খুলিয়া দিতে দিতে চাকর পরামর্শ দিল, 'আচ্ছা, তার চেয়ে এটা বিক্রি করে ফেলুন-না! বাজারে একটা বুড়ো স্ত্রীলোক আছে, সে এরকম জিনিস কেনে-বেচে,— তার দোকানে এটা পাঠালে হয় না?'
তাহাই হইল। স্যাসকাইন তখন নিশ্বাস ফেলিয়া বাঁচিলেন।
দু-দিন কাটিয়াছে। ডাক্তার কোসেলকফ আরামকেদারায় বসিয়া বসিয়া আপনমনে এটা-সেটা ভাবিতেছেন।
হঠাৎ দরজাটা দুম করিয়া খুলিয়া গেল! সাসা হাঁপাইতে হাঁপাইতে ঘরের ভিতরে ঢুকিয়া পড়িল,— তার ঠোঁটের পাশ দিয়া হাসি যেন উপচাইয়া পড়িতেছে!
খবরের কাগজে মোড়া একটা জিনিস টেবিলের উপরে যত্নভরে রাখিয়া সে বলিয়া উঠিল, 'ডাক্তার সায়েব! বড়ো সুখবর! আমাদের আর ছিল না বলে, আপনাকে একটা বাতিদানই দিয়েছিলাম। আজ বাজারের এক স্ত্রীলোকের দোকান থেকে ঠিক অমনিধারা আর-একটা বাতিদান কিনে এনেছি। এইবারে আপনার জোড়া মিলল ডাক্তার সায়েব! মায়ের আমি এক-ছেলে,— আপনি আমার প্রাণ বাঁচিয়েছেন!'
কী আপদ! হতভম্ব ডাক্তার হাঁ করিয়া আড়ষ্ট হইয়া রহিলেন। তিনি কথা কহিতে গেলেন,— পারিলেন না।
ভারতী, আশ্বিন ১৩২২ (সেপ্টেম্বর ১৯১৫)
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।