হেমেন্দ্রকুমার রায়
ক
অমলা যখন এতটুকু মেয়ে, তখন এক দৈবজ্ঞ ব্রাহ্মণ বলিয়াছিল, 'এ মেয়ে রাজরানি হবে।' অমলার রানির মতো রূপ দেখিয়া দৈবজ্ঞ এ কথা বলিয়াছিল, না তার ভাগ্যলিপি পড়িয়া এরূপ ভবিষ্যদবাণী করিয়াছিল, সেটা আগে কেহ ভাবিয়া দেখে নাই। তবে কথাটা শুনিয়া অমলার বাপ হাসিয়াছিলেন, তার বিধবা পিসি অমলার মৃত মা-কে স্মরণ করিয়া কাঁদিয়াছিলেন এবং 'দক্ষিণায় পূর্ণহস্ত' হইয়া দৈবজ্ঞ ঠাকুর সহর্ষে গৃহে ফিরিয়াছিলেন।
কলিতেও ব্রাহ্মণ-বাক্য মিথ্যা হইবার নহে। তবে কল্পনার রাজা, বাস্তবে রাজেন্দ্রে পরিণত হইল। বাঙ্গালা দেশে তাঁহার কন্যার করপ্রার্থী রাজা-মহারাজার অন্যায় এবং আশ্চর্য রকমের অভাব দেখিয়া অমলার পিতা শেষটা বাধ্য হইয়া রেলওয়ে অফিসের পঁয়ত্রিশ টাকা মাহিনার কেরানি রাজেন্দ্রবাবুর হাতে মেয়েকে সঁপিয়া দিলেন। কন্যাদায় হইতে উদ্ধার পাইয়া অমলার বাপ আর-একবার হাসিলেন। অমলার মৃত মা-কে স্মরণ করিয়া পিসিমা আর-একবার কাঁদিলেন, এবং লুচির কোণ ভাঙিতে ভাঙিতে পাড়ার দৈবজ্ঞ ঠাকুর আর-একবার ভবিষ্যদবাণী করিলেন, 'দেখে নিয়ো, ওই রাজেন্দ্রই পরে রাজরাজেন্দ্র হবে। আমার গণনা মিথ্যা হবার নয়!'
সে আজ আট বৎসরের কথা।
খ
সেদিন মাসকাবার।
অফিস হইতে ফিরিয়া রাজেন্দ্র মাসের খরচ দেখিতেছিল। 'বাড়ি-ভাড়া আঠারো টাকা, ঝিয়ের মাহিনা তিন টাকা, দুধ-বার্লি চার টাকা, মাসকাবারি জিনিসপত্রের জন্যে মুদির দোকানে কম করে ধরেও অন্তত ছয় টাকা, সকলকার জলখাবার চার টাকা। মাইনে পাই চল্লিশ টাকা— হাতে রইল পাঁচ টাকা। আর কী কী খরচ বাকি রইল গা?'
অমলা বলিল, 'বাজার খরচ ভুলে গেলে বুঝি?'
রাজেন্দ্র বলিল, 'কিচ্ছু ভুলিনি— আমি ভুললেও তোমরা ভুলবে কেন? তবে কথাটা কী জানো? আর আর খরচের কথা মনে করতেও আমার ভয় হচ্চে।'
অমলা বলিল, 'এ মাসে অন্তত দু-জোড়া কাপড় না হলে চলবে না, তা জানো?'
মুখ বেঁকাইয়া রাজেন্দ্র বলিল, 'জানি না আবার! খুব জানি! তারপর?'
'রজকের তিন মাসের পাওনা বাকি আছে। এবারে দাম চুকিয়ে না দিলে সে আর কাপড় কাচবে না।'
'বলে যাও—'
'খুচরো খরচ আছে।'
'যথা—?'
'সে কি আর হিসেব করে বলা যায়? হঠাৎ আপদ-বিপদ, কোথাও যাওয়া-আসা, আত্মীয়-কুটুম্বিতে (রাজেন্দ্র হতাশভাবে আড় হইয়া মাদুরে শুইয়া পড়িল) নাপিত-নাপতিনি, ছেলের স্কুলের মাহিনা— এমন আরও কত কী?'
শুইয়া শুইয়া দুই চোখ বুজিয়া রাজেন্দ্র বলিল, 'ওগো, একটা হিসাব ভুলেছ।'
'কী?'
'অর্ধেক রাজত্ব কেনার কথাটা। এ মাসে সেটাও তো অবিশ্যি করে কেনা চাই?'
অমলা স্বামীর মুখের দিকে চাহিল। তারপর হাসিয়া বলিল, 'চাই বই কী! জ্যোতিষ ঠাকুর বলেছিল, তুমি নিশ্চয় রাজা হবে— মনে নেই? রাজত্ব নইলে চলবে কেন?'
রাজেন্দ্র উঠিয়া বসিয়া মুখভার করিয়া বলিল, 'তোমার হাসি আসছে অমলা? আমার তো কান্না পাচ্চে!'
অমলা উচ্চহাস্য করিয়া বলিল, 'এখনই কান্না? এখনও যে চাল আর করলার ফর্দ বাকি আছে!'
রাজেন্দ্র গুম হইয়া বসিয়া রহিল। মাঝে মাঝে ঘরের এদিকে-ওদিকে চাহিয়া দেখিতে লাগিল। যেদিকে চায়, সেইদিকেই সে এক-একটা নূতন অভাবের চিহ্ন দেখে, আর তার বুকটা ধড়াস করিয়া ওঠে। ওই ওদিকের কুলুঙ্গিতে একটা চিমনিহীন ল্যাম্প রহিয়াছে; চিমনিটা কাল ভাঙিয়া গিয়াছে, আজ আর-একটা না কিনিলে নয়। এদিককার দেওয়ালে একখানা ছেঁড়া কুটি কুটি গামোছা ঝুলিতেছে। এখানে একখানা ভাঙাচোরা আয়না, ওখানে একটা ছেঁড়া কামিজ। সমস্ত অভাব যেন মূর্তি ধরিয়া রাজেন্দ্রকে ভয় দেখাইতে লাগিল। হাতে পয়সা না থাকিলেও মাসের অন্যান্য দিনগুলা যেমন-তেমন করিয়া কাটিয়া যায়; কিন্তু কেরানির সংসারে যেদিন টাকা আসে, সেই কাঙ্ক্ষিত মাসকাবার অতি— অতি ভয়ানক!
অমলা বলিল, 'কী ভাবচ?'
তিক্তস্বরে রাজেন্দ্র বলিল, 'চিতার আগুনের কথা।'
'ভাবলে আগুন জ্বলবে বই নিববে না।'
'জ্বলুক। সমস্ত জ্বলেপুড়ে খাক হয়ে যাক। আমি বাঁচি।'
'ছিঃ, তুমি না পুরুষ?'
'ভগবান, আসচে জন্মে আমি যেন স্ত্রীলোক হয়ে জন্মাই। কী বলো অমলা, স্ত্রীলোক হলে আর তো আপিসে কেরানিগিরি করতে আর কলম পিষে মরতে হবে না?'
'হ্যাঁ গো, আমরা কি বড়ো সুখে আছি?'
'সুখে নেই? যে হাসতে পারে, তার আবার দুঃখ কী? তুমি হাসছ, আমি হাসতে পারচিনে কেন?'
'ওসব কথা আর ভেবো না। এখন কী করবে, বলো?'
'করব আমার মাথা আর মুন্ডু। বাকি আছে বাজার খরচ, কাপড়, ধোপার মাইনে, খুচরো খরচ আর চাল, কয়লা। অন্য খরচ করে হাতে থাকে পাঁচ টাকা— সে তো সমুদ্রে শিশির। আমার অবস্থায় পড়লে অন্য কেউ কী করত জানো?'
'জানি।'
'কী?'
অমলা দুষ্টামির হাসি হাসিয়া বলিল, 'স্ত্রী-কে চুম্বন।'
'আত্মহত্যা— আত্মহত্যা করত! এখনও ঠাট্টা? এই রইল তোমার পাঁচ টাকা— তোমার যা খুশি করো!' বলিয়া, রাজেন্দ্র একখানা পাঁচ টাকার নোট অমলার গায়ে ছুড়িয়া দিয়া ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল।
চারিদিক আচ্ছন্ন করিয়া সন্ধ্যা আজ শুধু পৃথিবীতে নামিয়া আসিল না;— নামিয়া আসিল অমলার অন্ধকার প্রাণের ভিতরেও। হাতের উপরে মুখ রাখিয়া স্তব্ধ হইয়া শূন্যদৃষ্টিতে অমলা সেইখানে মূর্তির মতো বসিয়া রহিল। তাহার মুখে তখন হাসি নাই, চোখে অশ্রু।
গ
অমলা তিন সন্তানের মা, কিন্তু তাকে দেখিলে সে কথা বলিবার জো ছিল না। তার গড়ন ছিল পাতলা, ছিপছিপে, রং টকটকে গৌর, মুখ-চোখ প্রতিমার মতো। মাতৃত্বের পূর্ণগৌরব তার দেহ থেকে যৌবনকে শুকনা ফুলের মতো খসাইয়া দিতে পারে নাই।
কিন্তু দরিদ্রের ঘরে সৌন্দর্যচর্চার অবকাশ কোথায়? যেখানে অর্থ নাই, সেখানে রূপযৌবন সব ব্যর্থ। রাজেন্দ্র তাহাকে ভালোবাসিত; কিন্তু নিত্যনূতন গহনায়, বিলাসের উপহারে ও মিষ্ট কথায় সে ভালোবাসাকে জাহির করিবার সময় তার ছিল না। সংসারের টানাটানিতে তার মন সর্বদাই তিতবিরক্ত হইয়া থাকিত;— এমনকী, অমলাকে ভালো কথা বলিতে গেলেও, তার জিভ ফসকাইয়া মন্দ কথা বাহির হইয়া যাইত। এর জন্যে পরে সে নিজেই মনে মনে দুঃখিত হইত। অমলাও মুখ বুজিয়া এই ভালোবাসার অত্যাচার সহিয়া থাকিত।
মন তবু বুঝিয়াও বোঝ মানে না। আত্মীয়-কুটুম্বের বাড়িতে একরকম খালি হাতে খালি গায়েই সে নিমন্ত্রণে যাইত। তাহার স্বভাব-সুন্দর রূপ গহনা না-থাকার দরুন বড়ো বেশি কমিয়া যাইত না বটে, কিন্তু যখন কোনো ধনীর ঘরনি, গায়ের জড়োয়া গহনায় আলোর ঢেউ তুলিয়া, চোখে অবজ্ঞার বিদ্যুৎ হানিয়া, দেমাকে ডগমগ হইয়া অমলার নিরলংকার দেহের দিকে বাঁকা চোখে চাহিয়া উপেক্ষার হাসি হাসিত, অমলার তখন মনে হইত, সে যেন সকলকার পায়ের তলায় ধুলার মতো মিশিয়া আছে।
কোনো কোনো মুখরা আবার আত্মীয়তা জানাইয়া বলিত, 'তোমার বর কী কাজ করে ভাই?'
অমলা মৃদুস্বরে বলিত, 'কেরানিগিরি।'
'তা এমন রাঙা বউয়ের গায়ে দুখানা সোনাদানাও দিতে পারে না গা? আহা—'
অমলা অতিকষ্টে বলিত, 'আমি কখনো চাইনি—'
'ও মা, চাইতেই বা যাবে কেন? চাইলে দেবে, নইলে দেবে না, এমন কথাও তো কখনো শুনিনি! আমরা যে গয়না পরি, এ কি ভিক্ষে করে পরা? এমন মেয়ে আমরা নই— জিভ কেটে ফেলব, তবু সেধে মুখ ফুটে কিছু চাইতে পারব না—'
অমলা ম্রিয়মাণ হইয়া উত্তর দিত, 'সংসারে গয়নাই তো সব নয়! আর, আমার স্বামীর এমন অবস্থা নয় যে, তিনি আমাকে—'
'তা-ই বলো বাছা, তা-ই বলো! ওসব—'
কথা শেষ হইবার আগেই অমলা সেখান হইতে চলিয়া যাইত।
ঘ
মুখে অমলা যা-ই বলুক, মনে মনে সে বড়ো সুখী ছিল না। হাজার হোক মানুষের মন তো!
সেদিন অমলার এক আত্মীয়ের বাড়ি হইতে বিয়ের এক নিমন্ত্রণ আসিল।
রাজেন্দ্রের কাছে গিয়া অমলা বলিল, 'ওগো, আইবুড়ো ভাতের কাপড় আর মিষ্টি পাঠাতে হবে যে!'
রাজেন্দ্র বিরক্ত হইয়া বলিল, 'পয়সা কোথায়?'
অমলা বলিল, 'সংসার করতে গেলে এরকম দু-একটা বাজে খরচ না করলে চলবে কেন? মান বাঁচিয়ে চলতে হবে তো!'
'চুলোয় যাক মান! মান কি আছে, যে রাখবে? লেখাপড়া শিখে যেদিন সায়েবের বুটের তলায় দাসখত লিখে দিয়েছি, সেইদিনই যে মানে ছাতা ধরে গেছে! তোমার পয়সা থাকে, তুমি আইবুড়ো ভাতের তত্ত্ব পাঠাও!'
'আমি কোথায় পয়সা পাব?'
'তবে তত্ত্বের কথা ভুলে যাও।'
'তারা কী মনে করবে?'
'গনতকার হলে সে কথা আগে থাকতে তোমাকে গুনে বলে দিতে পারতাম।'
অস্তগামী সূর্যের স্নিগ্ধ আলো অঙ্গে মাখিয়া দীপ্ত-নীল আকাশের তলায় একঝাঁক পায়রা একছড়া উড়ন্ত জুঁই ফুলের মালার মতো ঘুরিয়া ঘুরিয়া উড়িয়া যাইতেছিল।
ছাদে কাপড় তুলিতে গিয়া, অমলা সেইদিকে তাকাইয়া দাঁড়াইয়া ছিল।
হঠাৎ অমলার পায়ের কাছে সশব্দে কী একটা জিনিস আসিয়া পড়িল। অমলা চমকিয়া দেখিল, একটা ঢিল। তার সঙ্গে খানিকটা সুতা বাঁধা। সুতার ডগায় একখানা কাগজ—
এর মানে কী?
অমলা হেঁট হইয়া কাগজখানা তুলিয়া লইল। তাহাতে ভুরভুরে এসেন্সের গন্ধ। কাগজের ভাঁজ খুলিয়া অমলা দেখিল, ভিতরে পরিষ্কার হাতের অক্ষরে কয় ছত্র লেখা—
'তোমার জন্য আমি পাগল। আমার দিকে মুখ তুলে তাকালে তুমি যা চাও তা-ই দেব। গরিব কেরানি তোমার কদর বুঝবে না।
দয়া করো। নইলে আমি বাঁচব না।'
অমলা চিঠি পড়িয়া মনে মনে বলিল, 'তোমার পক্ষে মরাই ভালো।'
এ চিঠি কার? কে লিখিতেছে? পত্রে কাহারো নাম ছিল না।
আমার পায়ের কাছে কাগজখানা আসিয়া পড়িল কেন? তবে কি—
অমলা এক পলকে সব বুঝিল।
গোধূলির আলো তার গৌর বাহুকে কাঁচা সোনার মতো উজ্জ্বল করিয়া তুলিয়াছিল। অমলার চোখ তার উপরে পড়িল। সে হাত দুটি কেমন নধর, কেমন নিটোল!
এ চিঠি লইয়া কী করিবে সে? ছিঁড়িয়া ফেলিবে, না স্বামীকে দেখাইবে? অমলা ভাবিতে লাগিল।
অমলাদের বাড়ির সুমুখে একটা রাস্তা। ওপারে, ঠিক সামনাসামনি একখানা মস্ত বাড়ি। পল্লিগ্রামের কোনো ধনী জমিদার মাসখানেক হইল, এই বাড়িখানা ভাড়া লইয়াছেন।
অমলার দৃষ্টি আচমকা সেই বাড়ির ছাদের উপরে পড়িল।
সেদিকে চাহিয়াই, মাথায় ঘোমটা টানিয়া অমলা তাড়াতাড়ি ছাদ হইতে নামিয়া গেল।
সে বাড়ির ছাদের উপরে এক সুশ্রী যুবা, নিষ্পলক নেত্রে হাস্যমুখে অমলার দিকে তাকাইয়া, নিস্পন্দভাবে দাঁড়াইয়া ছিল।
যাইবার সময়ে অমলা, চিঠিখানা রাস্তায় ছুড়িয়া ফেলিয়া দিয়া গেল।
কিন্তু, স্বামীকে সে কোনো কথা বলিল না।
ঙ
অমলা কয়দিন আর ছাদে উঠে নাই।
সেদিন বৈকালে সে রুটি সেঁকিতেছিল আর তাহার ঠিকা ঝি রুটি বেলিয়া দিতেছিল।
বেলিতে বেলিতে কী বলিল, 'একটু হাত চালিয়ে নাও দিদিমণি!'
অমলা বলিল, 'ক্যান লা, তোর এত তাড়াতাড়ি কীসের বল তো?'
ঝি বলিল, 'এই মাগগি বাজারে এক জায়গায় ঠিকে কাজ করে তো পেট চলে না দিদি! কাজেই আর-এক জায়গায় কাজ না করলে পোষায় না।'
অমলা উনানের আঁচ একটু কমাইয়া দিয়া বলিল, 'আর কোথায় কাজ করিস তুই?'
'এই, তোমাদের সামনের বাড়িতে।'
অমলা চমকিয়া উঠিল। উনান হইতে চাটুখানা নামাইয়া, মনের চাঞ্চল্য মনেই চাপিয়া সহজস্বরে সে বলিল, 'ওখান থেকে কত মাইনে পাস?'
'সকালে-বিকালে যাই, পাঁচ টাকা করে দেয়।'
অমলার চমকানি ঝিয়ের নজর এড়ায় নাই। কিন্তু সে কথা নিয়া কিছু বলিল না— আপনমনে সে মৃদু মৃদু হাসিল মাত্র।
অমলা খুন্তি দিয়া একখানা রুটি কড়ার উপরে উলটাইয়া দিতে লাগিল। খানিক ইতস্তত করিয়া বলিল, 'হ্যাঁ রে, ও বাড়িতে কে থাকে?'
'এক জমিদারের ছেলে গো!'
'আর কে?'
'বাবুর মা, বিধবা বোন আর এক খুড়তুতো ভাই।'
'বাবুর বউ থাকে না?'
'বাবুর বিয়ে তো হয়নি।'
'অত বয়েস হয়েছে, বিয়ে হয়নি কী লো?'
'বাবুকে তুমি কী করে দেখলে দিদি?'
অমলার মুখ কালিপানা হইয়া গেল। তাড়াতাড়ি আপনাকে সামলাইয়া বলিল, 'হ্যাঁ রে, ওরা বুঝি খুব বড়ো মানুষ?'
ঝি চোখ ঘুরাইয়া বলিল, 'ও মা, তা আবার নয় দিদি! বড়ো মানুষ বলে বড়ো মানুষ? বাসাবাড়ি, তবু লোকজন চারিদিকে রইরই করছে! গাড়িঘোড়া জিনিসপত্তর দেখলে চোখ যেন জুড়িয়ে যায়! শুনলে অবাক হবে দিদি, ওরা সব রুপোর বাসনে ''সরে!''...'
অমলা আনমনা হইয়া বলিল, 'তা হবে না কেন; বড়োলোকের ভিন গোত্তর! এ কি আর আমরা, যে ছেঁড়া ন্যাকড়াতেই জীবন কেটে যাবে?'
ঝি দরদ দেখাইয়া বলিল, 'তা সত্যি দিদিমণি! তোমার অমন প্রতিমের মতো রূপ, অমন নিটোল গড়ন, ওতে কি দুখানা সোনাদানা না পরলে মানায়?'
'কোথায় পাব বাছা, সোনাদানা তো পথের ধুলো নয়!'
'কেন, দাদাবাবুকে বলতে পারো না?'
'বলে কী হবে? খেতে-পরতেই কুলোয় না, তা আবার সোনাদানা!'
'হ্যাঁ দিদিমণি, দাদাবাবু তোমায় আদর-আয়িত্তি করে তো?'
অমলা কৌতুকভরে হাসিয়া বলিল,
'আলুনি আদর ঢ্যাঁপের খই—
আদরের কথা কার কাছে কই!'
বলিয়াই হঠাৎ গম্ভীর হইয়া কহিল, 'নে, রুটি বেল— উনুন যে কামাই যাচ্চে!'
কিছুক্ষণ কেহই কোনো কথা কহিল না। রুটি বেলা শেষ হইয়া গেলে পর, বেলুন ও চাকিখানা সরাইয়া ঝি অমলার মুখের ভাবখানা খানিকক্ষণ নীরবে চাহিয়া চাহিয়া দেখিতে লাগিল। তারপর মৃদুস্বরে বলিল, 'পুরুষগুলো কীরকম বেআক্কেল দিদিমণি!'
অমলা চাটু হইতে মুখ না তুলিয়াই বলিল, 'পুরুষগুলো আবার কে?'
'এই ও বাড়ির জমিদারের ছেলে গো, এতক্ষণ যার কথা হচ্চিল!'
'কেন সে কী করেচে?'
'বলব?'
'বল।'
'আমরা গরিব মানুষ, গতর খাটিয়ে খাই— কারু সাতেও থাকি না, পাঁচেও থাকি না। বললে শেষটা তো আমার ওপরে রাগ করবে না?'
অমলা চকিতে ফিরিয়া, ঝিয়ের দিকে তীক্ষ্ন নেত্রে চাহিল। বলিল, 'বুঝেচি। কী বলেচে, সব খুলে বল।'
অমলার কণ্ঠস্বর কঠোর!
ঝি থতমত খাইয়া গেল। সে যা বলিতে যাইতেছিল তা আবার চাপা দিবার চেষ্টা করিল, কিন্তু পারিল না। অমলার দৃষ্টি যেন তার মনের কথাগুলোকে হিড়হিড় করিয়া টানিয়া তাহার জিভের ডগায় আনিয়া দিল। কলের পুতুলের মতো সে বলিয়া গেল, 'ও বাড়ির বাবু কাল আমাকে ডেকে বললে, ঝি, ওই সামনের বাড়ির বউকে তুমি যদি আমার কথা জানিয়ে আসতে পারো, আমি তোমাকে একশো টাকা দেব।''— আমায় বললে, আমি কী করব দিদি?'
অমলা কিছু বলিল না। উত্তেজিতভাবে ফিরিয়া, সে উনানে কড়া চড়াইয়া দিতে গেল; কিন্তু তাহার হাত ফসকাইয়া কড়াখানা ঘিয়ের কেঁড়ের উপরে পড়িল। কেঁড়েটাও সশব্দে উলটাইয়া গেল। সেই শব্দে উপর হইতে রাজেন্দ্র নামিয়া আসিল। মেঝেতে তখন ঘি গড়াইতেছে। রাজেন্দ্র বিরক্তস্বরে বলিল, 'কাজ যত না হোক, অকাজ করতে তোমরা খুব মজবুত! বেশ যাহোক!'
উত্তেজিত অমলা আরও উত্তেজিত হইয়া বলিল, 'পুড়ে মরতে মরতে বেঁচে গেলুম, আর তুমি কিনা উলটে ক্যাঁটক্যাঁট করে কথা শুনিয়ে দিতে এলে?'
রাজেন্দ্র চটিয়া উঠিয়া বলিল, 'কথা শোনাব না কেন! অতটা ঘি যে খামোখা নষ্ট হল, এই মাগগির বাজারে সেটা কোথা থেকে আসে শুনি?'
অমলার মন সেদিন হঠাৎ আগুন হইয়া উঠিল। স্বামীর অন্যায় ও নিষ্ঠুর কথা সে কিছুতেই মুখ বুজিয়া সহিতে পারিল না। উঠিয়া দাঁড়াইয়া বলিল, 'আমি কি সাধ করে তোমার লোকসান করেছি? খেটে খেটে দেহ ক্ষয়ে গেল, বলতে তোমার লজ্জা হচ্চে না?'
রাজেন্দ্র তখন সবে আপিস থেকে ফিরিয়াছে, তাহার মেজাজটাও বিলক্ষণ চড়া ছিল। সে-ও মহাখাপ্পা হইয়া বলিল, 'বড়ো যে লম্বা লম্বা কথা হচ্চে, ওসব আমার বাড়িতে বসে হবে না— বুঝলে? এটা তোমার বাপের বাড়ি হলে, আমি তোমার গোলাম হয়ে থাকতুম।'
'কী! তুমি আমার বাপ তুললে? এত বড়ো—'
অমলা আর কথা শেষ করিতে পারিল না। ঝড়ের মতো সেখান হইতে চলিয়া গিয়া আপনার ঘরের ভিতরে ঢুকিয়া দুম করিয়া দরজাটা বন্ধ করিয়া দিল।
চ
অমলার চোখ সুমুখের বাড়ির উপরে পড়িল।
সেখানে বাড়ির এক জানালায় দুটি ক্ষুধিত নয়নের লোলুপ দৃষ্টি অমলার ঘরের দিকে স্থির হইয়া ছিল।
অমলা সে দৃষ্টি দেখিল। যাহার সে দৃষ্টি, সে-ও অমলাকে দেখিল।
অমলা ছবির মতো নির্বাক ও নিশ্চল হইয়া দাঁড়াইয়া রহিল। তাহার মনে হইল, সে দৃষ্টি যেন সর্পের মতো তাহার সর্বাঙ্গকে বেষ্টন করিয়া ধরিতেছে! কিন্তু, তবু সে সেখান হইতে এক-পা-ও নড়িতে পারিল না।
ছুটিয়া গিয়া সামনের জানালাটা বন্ধ করিয়া দিবার জন্য, তাহার মনের ভিতরে একটা ইচ্ছা জাগিয়া উঠিতেছিল; কিন্তু কেমন একটা অন্যায় দুর্বলতা তাহার হৃদয়ের মধ্যে সেই ইচ্ছার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিতেছিল।
জানালা খোলাই রহিল!
সে দৃষ্টি তখনও স্থির— এবং, তেমনই ক্ষুধিত, তেমনই ব্যগ্র!
সে যেন অমলাকে গ্রাস করিতে চায়, তাহার অস্তিত্ব লোপ করিয়া দিতে চাহে!
সে দৃষ্টির কী মোহ!— চারিদিকের অন্ধকারের মধ্যে প্রদীপ্ত অগ্নির মতো সে দৃষ্টি জ্বলিতেছিল, জ্বলিতেছিল!
হঠাৎ পাশের ঘর হইতে অমলার মেয়ে কাঁদিয়া উঠিল। সেই কান্নায় অমলার সাড় হইল।
থরথর করিয়া কাঁপিতে কাঁপিতে অমলা মেঝের উপরে বসিয়া পড়িল।
সেদিন স্বামী-স্ত্রী-তে আর কথাবার্তা হইল না; তার পরদিন না— তার পরের দিনও না! অভাবের সংসারে ঝগড়া কিছু নূতন ব্যাপার নয়; তার আগেও অনেকবার ঝগড়া করিয়াছে। কিন্তু এবারকার ঝগড়ার এই নীরবতা কিছু নূতনতর।
মুখ ফসকাইয়া হঠাৎ একটা খারাপ কথা বাহির হইয়া গিয়াছে বলিয়া রাজেন্দ্র এখন মনে মনে অনুতপ্ত। স্ত্রী-র সঙ্গে আবার মিটমাট হইয়া গেলে সে বর্তিয়া যায়; কিন্তু আগে থাকিতে সাধিয়া কথা কহিলে পাছে তাহার স্বামিত্ব-গৌরব খর্ব হইয়া পড়ে, সেই ভয়ে সে আপনার মৌনব্রত ভঙ্গ করিল না।
সংসারে কোনো বড়ো ঘটনার কারণ খুঁজিতে গিয়া আমরা ছোটো ঘটনাকে অবহেলা করিয়া এড়াইয়া যাই। কিন্তু সাংসারিক ক্ষুদ্র ঘটনাগুলি সাধারণের চোখে তুচ্ছ হইলেও অনেক সময়ে তাহারাই বড়ো ঘটনার জন্ম দেয়— বীজ যেমন ছোটো হইয়াও বড়ো গাছের জন্ম দেয়। আমরা এটা বুঝি না বলিয়াই অনেক সময়ে অনেক বড়ো ঘটনার সংগত কারণ খুঁজিয়া পাই না।
ছ
এ কয়দিন অমলা রোজ ছাদে উঠিয়াছে, আর রোজ চিঠি পাইয়াছে।
চিঠিগুলা যখন সে কুড়াইয়া লইত, তখন সে স্পষ্ট বুঝিতে পারিত, অন্য বাড়ির ছাদ হইতে আর-একজনের তীক্ষ্ন দৃষ্টি তাহার উপরে স্থির হইয়া আছে। অমলার মনে হইত, সে দৃষ্টি হইতে যেন একটা অসহ্য উত্তাপ আসিয়া তাহার দেহের মাংস ভেদ করিয়া বুকের ভিতরে গিয়া স্পর্শ করিতেছে। পাছে চোখাচোখি হয়, সেই ভয়ে সে আপনার দৃষ্টিকে নত করিয়া রাখিত।
কতবার সে মনে করিয়াছে, চিঠি পাইলেই ছাদের উপরে দাঁড়াইয়াই কুটি কুটি করিয়া ছিঁড়িয়া ফেলিয়া দিবে! কিন্তু চিঠি পাইয়া তাহার মনে হইত, ভিতরে না জানি কত রহস্যই আছে; একবার না পড়িয়া কি ফেলিয়া দেওয়া যায়?
তাহার রূপ নিয়া যতটা অত্যুক্তি প্রকাশ করা যাইতে পারিত, পত্রলেখক তাহা করিত। সেসব পড়িয়া অমলা খুশি হইত এবং মনে মনে গর্ব অনুভব করিত। পত্রে আরও কত কথা ছিল,— প্রেমের কথা, নিরাশার কথা, মিলন ও বিরহের কথা!
কথাগুলা অমলার মন্দ লাগিত কি? বোধ হয়, না। কারণ, সেইটেই স্বাভাবিক। অমলা দরিদ্র-ঘরনি, সংসারের অভাব ও জ্বালা-ঝঞ্ঝাটের ভিতরে তাহার রূপ বনফুলের মতো অনাদৃত হইয়া থাকিত, এ কথা আগেই বলা হইয়াছে। আপনার যৌবন-বসন্তে ভালো করিয়া কোকিলের সাড়া সে কখনো শুনিতে পায় নাই— তাহার জীবনের একটা মধুর অংশ অনেকটা অপুরন্ত হইয়া ছিল। আজ এক ধনীর নন্দন তাহার চরণপূজা করিতে চাহিতেছে, ইহাতেও অবিচল থাকা অমলার পক্ষে বড়ো শক্ত কথা। হয়তো তেমনধারা মনের বলও তাহার নাই। আর এই সঙ্গিন মুহূর্তে তাহাকে সৎপরামর্শে সাবধান করিবার লোকও সংসারে স্বামী ছাড়া আর কেহ ছিল না। কিন্তু স্বামীর সঙ্গেও তাহার কথা বন্ধ!
* * *
আরশিতে অমলা মুখ দেখিতেছিল,— হাঁ, তাহার চোখের কোণ হইতে অটুট যৌবনের চঞ্চল বিদ্যুৎ এখনও সরিয়া যায় নাই; কপোলের গোলাপি রং অযত্নে একটু মলিন হইলেও এখনও বিবর্ণ হইয়া যায় নাই। ঝি-মুখপুড়ি ঠিক বলিয়াছে,— প্রতিমার মতো রূপই বটে! এ রূপ কি দুখানা সোনাদানা না হইলে মানায়?
আপনার হাত দুখানি সে ঘুরাইয়া-ফিরাইয়া দেখিল। ক-গাছা কালো রঙের 'জলতরঙ্গ' চুড়ি রিনি রিনি করে তাহাকে যেন উপহাস করিতেছিল। চুড়িগুলাকে আছড়াইয়া ভাঙিয়া ফেলিবার জন্য তাহার মনে একটা দুর্দম বাসনা প্রবল হইয়া উঠিল। কিন্তু এ চুড়ি ভাঙিলে ফের কাচের চুড়ি কেনাও যে তার পক্ষে শক্ত কথা!— ভ্রূ সংকোচ করিয়া অমলা বিরক্তিভরে হাত নাড়া দিল— কাচের চুড়িগুলা কৌতূহল হাস্যে কলধ্বনি করিয়া উঠিল, রিনিঝিনি রিনিঝিনি রিনিঝিনি!
পরনের কাপড়খানা ছেঁড়াখোঁড়া, রান্নাঘরের ধোঁয়া মাখানো। ছেঁড়া মেঘের চাঁদের আলোর মতো, ছিন্নবস্ত্রমধ্য দিয়া তাহার শুভ্র দেহের লাবণ্য স্থানে স্থানে বাহির হইয়া পড়িয়াছে।
তাহার স্বামীর সকল ব্যবহারের ভিতরে আজ সে একটা গভীর অবহেলা অনুভব করিল। সকলেই কিছু বড়োলোক হয় না, মুখের দুটো মিষ্টি কথাতে তো আর পয়সা লাগে না! তার স্বামী যে তাতেও নারাজ!
তিক্তবিরক্ত চিত্তে অমলা জানালার ধারে গিয়া দাঁড়াইল।
ঘোর ঘটা করিয়া সেদিন অবিরাম বাদল নামিয়াছে। শূন্যপথে ধূর্জটি যেন আজ মহাতাণ্ডবে মাতিয়া আছেন,— ওই নিকষকালো মেঘপুঞ্জ যেন তাঁহারই নৃত্যোৎক্ষিপ্ত জটাজূটের রুদ্রলীলা প্রকাশ করিতেছে এবং বিদ্যুতে বিদ্যুতে যেন তাঁহারই নেত্রবহ্নি রহিয়া রহিয়া জ্বলিয়া উঠিতেছে! পথ প্রায় জনশূন্য, কেবল মাঝে মাঝে এক-একজন পথিক ছাতিতে কোনোরকমে কাঁধ পর্যন্ত বাঁচাইয়া নির্জীবের মতো আস্তে আস্তে চলিয়া যাইতেছে। দূরের বাড়িগুলা অস্পষ্ট, তাহাদের পিছন হইতে দুই-তিনটি তাল গাছের ঝাপসা-সবুজ মাথা ঝোড়ো বাতাসে হেলিয়া হেলিয়া পড়িতেছিল। কতকগুলা কাক উড়িয়া উড়িয়া তাল গাছের উপরে বসিতেছিল, আবার উড়িতেছিল,— অমলা উদাস চোখে তাহাই দেখিতে লাগিল।
হঠাৎ পিছনে দরজা খোলার শব্দ হইল। অমলা ফিরিয়া দেখিল, ঝি।
একটু আশ্চর্য হইয়া জিজ্ঞাসা করিল, 'এই বৃষ্টিতে তুই কোথা থেকে এলি?'
মুখ টিপিয়া টিপিয়া একটু রহস্যের হাসি হাসিয়া ঝি বলিল, 'আকাশ থেকে পড়লুম দিদিমণি!'
অমলা বেশ বুঝিতে পারিল, ঝিয়ের এই হঠাৎ আবির্ভাব ও ধরনধারণে একটা কিছু ব্যাপার লুকোনো আছে। সন্দিগ্ধস্বরে সে বলিল, 'তোর কী দরকার রে?'
'একজন পাঠিয়েচে।'
অমলার মুখ বিবর্ণ হইয়া গেল। আস্তে আস্তে সে বসিয়া পড়িল।
ঝি বলিল, 'আমি কী করব বলো দিদিমণি! আমরা চাকরি করি, যা বলে তা দাঁতে কুটো নিয়ে তখনই করতে হয়।'
অমলা চুপ করিয়া রহিল।
ঝি ভরসা পাইয়া বলিল, 'আর তাও বলতে হবে দিদি, মানুষটা তোমাকে দেখে পাগলের মতো হয়ে গেছে।'— কথাটা শুনিয়া অমলার মুখ কীরকমধারা হয়, তাহা দেখিবার জন্য সে সুমুখে ঝুঁকিয়া পড়িল।
কিন্তু অমলার মুখ একেবারে ভাবশূন্য, সে একেবারে চুপচাপ।
'শুধু কি তা-ই দিদি? আবার দেখো-না কী সব পাঠিয়েচে!' বলিয়া ঝি তাহার কাপড়ের ভিতর হইতে একটি মখমলের বাক্স বাহির করিল। বাক্সের ডালা খুলিয়া আবার বলিল, 'দেখচ দিদি, কেমন সব ভারী ভারী গয়না! এই দেখো চন্দ্রহার, এই দেখো তাগা, বালা, আর এগুলো কী দেখচ? পালিসপাতার চুড়ি! আরও কত গয়না গড়তে দিয়েচে,— ভালো সাচ্চা সলমা-চুমকির কাপড়ের ফরমাজ দিয়েচে! কী গো! অমন করে বসে রইলে যে? একবার তবুও জিনিসগুলো নেড়েচেড়ে দেখো!'
অমলা নড়িল না। সে গহনার বাক্সের দিকে তাকাইয়া স্থিরনেত্রে কাঠের মতো বসিয়া রহিল।
জ
ঝি যখন অমলাকে ঘরের ভিতরে একলা রাখিয়া চলিয়া গেল, তখনও সে তেমনি আড়ষ্ট হইয়া রহিল।
তাহার সামনে সেই গহনার বাক্স। বাক্সের ডালা খোলা; ভিতর হইতে গহনাগুলা বর্ষার ম্লান আলোকেও ঝকমক করিয়া উঠিতেছিল। অমলা নিষ্পলক নেত্রে সেইদিকে তাকাইয়া রহিল।
এ গহনা তাহার! অমলার সর্বশরীর শিহরিয়া উঠিল। কিন্তু কে দান করিতেছে, আর— আর কেন এ দান? সে কথা ভাবিবামাত্র তাহার বুক ধড়াস করিয়া উঠিল।
আস্তে আস্তে সে হারছড়া কম্পিত হস্তে তুলিয়া নিল। এ আর কত ভরির, কত দামের?— কে জানে! হারছড়া গলায় পরিলে কেমন মানায়, একবার সেটা পরখ করিয়া দেখিবার সাধ হইল,— কিন্তু সাহসে কুলাইল না। যদি কেহ দেখিতে পায়!
বাক্সের ভিতরে ওটা কী? চিঠি বুঝি?— হুঁ, তা-ই বটে।
অমলা চিঠিখানা খুলিয়া, পড়িল—
'সামান্য উপহার পাঠালুম, না নিলে আমার কষ্ট হবে। পরে আরও পাঠাব, তুমি যা চাও, তা-ই দেব। এখনও কি তুমি আমায় দয়া করবে না? স্বপ্নে আমি তোমাকে দেখি, তোমা বই আমি আর কিছু জানি না। আর চুপ করে থেকো না, চিঠির উত্তর দিয়ো। উত্তর না পেলে আমি আত্মহত্যা করব।'
আবার উত্তর চায়! উত্তর? হাঁ, উত্তর না পেলে আত্মহত্যা করবে!
আচ্ছা, মানুষটা যদি উত্তর পেলেই তুষ্ট হয়, তাহলে দু-লাইন লিখতে দোষ কী? তাতে কি পাপ হবে? অমলা আপনাকে আপনি প্রবোধ দিয়া বলিল, না, পাপ আর কী? সে তো অন্য কিছু করিতেছে না— শুধু দু-লাইন উত্তর দিতেছে। কিন্তু না,— সে পরস্ত্রী হইয়া পরপুরুষকে কী কথা লিখিবে? তাহার লিখিবার কথা কী আছে?
হালভাঙা নৌকার মতো অমলার মন, তাহার বুকের ভিতর দোলা খাইতে লাগিল। কী যে করিবে, কিছুই সে ঠিক করিতে পারিল না। নৌকা যখন এমনি লক্ষ্যহীন, তখন সে সহজেই ডুবুডুবু হয়।
গহনাগুলা যেন অমলাকে আপনাদের মৌন ভাষায় ডাক দিয়া বলিতেছিল, 'ওগো রানি, আমাদের প্রতি বিমুখ হোয়ো না— তোমার দেহখানিকে সুন্দর করতে পারলেই আমাদের জীবন সার্থক হবে! তোমার ওই পেলবশুভ্র কণ্ঠ, বাহু ও হস্তের স্পর্শ পেলে আমরা ধন্য হয়ে যাব!'
কী করিব? চিঠি লিখিব, না গহনা ফিরাইয়া দিব? এতগুলা গহনা!
অমলার মাথা ঘুরিতে লাগিল; সে আর ভাবিতে পারিল না। হঠাৎ সিঁড়িতে পায়ের শব্দ হইল। অমলার মুখ মড়ার মতো সাদা হইয়া গেল। এ পদশব্দ তাহার স্বামীর!
অমলা হুমড়ি খাইয়া বাক্সের উপরে পড়িল। তাড়াতাড়ি তালা বন্ধ করিয়া বাক্সটা আপনার কোলের ভিতরে টানিয়া নিয়া তাহার উপরে আঁচল চাপা দিল।
ঝ
রাজেন্দ্র, একেবারে ঘরের ভিতরে ঢুকিল। তাহার মন আজ প্রফুল্ল।
অমলা তাহার দিকে পিছন ফিরিয়া বসিয়াছিল। রাজেন্দ্র অমলার প্রতি চাহিয়া আপনমনে মৃদুহাস্য করিল। তারপর আলনার সুমুখে দাঁড়াইয়া আপিসের জামাকাপড় খুলিতে লাগিল।
জামাকাপড় ছাড়িয়া রাজেন্দ্র আস্তে আস্তে অমলার পাশে গিয়া বসিল।
অমলার বুক দুরুদুরু করিতে লাগিল। তাহার প্রাণ যেন কণ্ঠের কাছে উঠিয়া আসিল।
স্ত্রী-র মুখের দিকে কৌতুকপূর্ণ দৃষ্টিতে চাহিয়া রাজেন্দ্র কহিল, 'ইস, আর কতদিনে এ দুর্জয় মান ভাঙবে?'
অমলা মাটির দিকে চাহিয়া রহিল। রাজেন্দ্র যে হঠাৎ কেন তাহার সহিত সাধিয়া কথা কহিতে আসিল, সেটা সে আদপেই বুঝিতে পারিল না।
রাজেন্দ্র, অমলার এই স্তব্ধভাব দেখিয়া বোধহয় ব্যথিত হইল। ক্ষুণ্ণকণ্ঠে সে ধীরে ধীরে বলিল, 'দেখো অমলা, আমাদের মতো গরিব কেরানির সংসারে দুজনেই দুজনার মন বুঝে চলা উচিত। দেখচ তো, গাধার মতো খেটে খেটেও সায়েবের মন পাই না, সর্বদাই বকুনি খাই। এরপরে সংসারের টানাটানিতে বাড়ি এসেও মনে কোনো সুখ নেই। এ খাটুনি, এ কষ্ট একলা হলে কি এতদিন সহ্য করতাম? খালি তোমাদের মুখ চেয়ে এত অপমান আর কষ্ট সয়ে আছি বই তো নয়! সময়ে-অসময়ে মুখ দিয়ে যে ছোটো অকথা-কুকথা বেরিয়ে যায়, এ কি আমি ইচ্ছে করে করি, অমল?'
অমলার মাথা ক্রমেই নিচু হইয়া পড়িতেছিল।
রাজেন্দ্র বলিতে লাগিল, 'তোমাকে যে আমি ভালোবাসি, এটা আমি মুখের কথায় বা কাজে প্রকাশ করতে পারি না বলে আমাকে তুমি সন্দেহ কোরো না। দেখো আপিস থেকে আমি তোমারই মুখ ভাবতে ভাবতে, রাস্তায় আসতে আসতে এই ভেবে শান্তি পাই যে, বাড়িতে আমার অপেক্ষায় একজন যত্ন করবার লোক পথ চেয়ে বসে আছে! তোমাকে আমি যত্ন করতে পারি না, এজন্যে আমিও মনে মনে কষ্ট পাই, কিন্তু কী করব, উপায় নেই— উপায় নেই।' একটু থামিয়া আবার বলিতে লাগিল, 'আজ চার বছর আমি আমার জলখাবারের চারটি করে পয়সা জমিয়ে আসচি। এ কথা তুমি জানো না। আজ কদিন হল, আমার মাইনে বেড়েচে, এ কথা শুনলে তুমিও বোধ করি সুখী হবে, তাই সাহস করে সেই জমানো টাকার ওপরে আরও কিছু টাকা ধার করেচি। কেন জানো? এইজন্যে।'— বলিয়া, রাজেন্দ্র কাপড়ের ভিতর হইতে একটি বেগুনি রঙের কাগজের মোড়ক বাহির করিল। মোড়কটি খুলিলে দেখা গেল, তাহার ভিতরে ক-গাছা নূতন সোনার চুড়ি রহিয়াছে।
অমলার মনে হইল, কে যেন তাহাকে খুব একটা উঁচু জায়গা হইতে ধাক্কা মারিয়া নীচে ফেলিয়া দিল। যে স্বামীর ভালোবাসাকে এতদিন সে সন্দেহ করিয়াছে, সেই স্বামী যে তাহাকে মৌখিক ভালোবাসা জানাইতে না পারিলেও, তাহার জন্য নিজের সামান্য জলখাবারের পয়সা কয়টিও বাঁচাইয়া আসিতেছেন, এই অজ্ঞাত সত্য কথাটা আজ অমলার সারাজীবনটাই যেন মিথ্যা করিয়া দিল। স্বামীর উপরে মিছা অভিমানে ও শয়তানের প্রলোভনে এখনই সে হয়তো কী করিতে কী করিয়া বসিত! তাহার মন যে এত সহজে বেঁকিয়া যাইতে পারে, এটা সে আদপেই জানিত না;— ভাগ্যে এখনও এই মুহূর্তের ভুলকে শোধরাইবার উপায় আছে! অমলা আপনার রূপকে ধিক্কার দিল, আপনার মনকে ধিক্কার দিল, আপনার অভিমান ও সন্দেহকে ধিক্কার দিল। সোনার চুড়ি পাইয়া অমলার প্রাণ আজ কোনো আনন্দই হইল না; তাহার নারী হৃদয়ের গোপন দুর্বলতা এমনভাবে ধরা পড়িয়া যাওয়াতে, সে আর আপনাকে সামলাইতে পারিল না; নিজের কোলের ভিতরে মুখ লুকাইয়া অমলা একেবারে শিশুর মতো ডাক ছাড়িয়া কাঁদিয়া উঠিল।
রাজেন্দ্র অবাক হইয়া গেল। ভাবিল, সেদিনকার কটু কথা অমলা বুঝি এখনও ভুলিতে পারে নাই। অত্যন্ত দুঃখিত স্বরে সে বলিল, 'মুখ ফসকে একটা কথা হঠাৎ বেরিয়ে গেছে বলে কতদিন আর এমন করে থাকবে অমল?'
অমলা প্রায় রুদ্ধকণ্ঠে বলিয়া উঠিল, 'ওগো আমার বুকটা তুমি দু-পায়ে দলে-পিষে দিয়ে যাও— তোমার পায়ের তলায় আমি ধুলোর মতো গুঁড়ো হয়ে মরে যাই।'
রাজেন্দ্র অমলার কথার আসল মানে আদপেই বুঝিতে পারিল না। বোকা বনিয়া, মাথা চুলকাইতে চুলকাইতে বলিল, 'অমল, তুমি কী বলচ?'
অমলা বুঝিল, সে যদি আপনার পাপের প্রায়শ্চিত্ত করিতে চায়, তাহা হইলে আর লুকাচুরি করিলে চলিবে না। এটা বুঝিয়া সে শক্ত হইয়া উঠিয়া বসিল। তারপর চোখের জল মুছিয়া স্বামীর দিকে মুখ তুলিয়া বলিল, 'আমার আর চুড়ি চাই না।'
'অ্যাঁ,— সে কী?'
'হ্যাঁ,— আমার গয়না আছে।'
'কী?— কী?—'
'আমার গয়না আছে। এই দেখো।'— বলিয়াই, অমলা তাহার কাপড়ের ভিতর হইতে গয়নার বাক্সটা বাহির করিয়া দুম করিয়া মেঝের উপরে ছুড়িয়া ফেলিয়া দিল। গহনাগুলা চারিদিকে ছিটকাইয়া পড়িল।
রাজেন্দ্র প্রথমটা হতভম্বের মতো গহনাগুলার দিকে চাহিয়া রহিল। তারপর জড়িতস্বরে কহিল, 'এসব কী অমলা? গয়না তুমি কোথা থেকে পেলে?'
অমলা সহজস্বরে বলিল, 'একজন দিয়েচে।'
'দিয়েচে!— কে?'
'ওই চিঠিখানা পড়ে দেখো।'
গহনাদাতার পত্রখানা তুলিয়া নিয়া রাজেন্দ্র বিস্ফারিত নেত্রে তাহা পাঠ করিল। তারপর জিজ্ঞাসা করিল, 'এ চিঠি লিখলে কে?'
অমলা নিজেই বুঝিতে পারিল না, তার এত জোর, এত সাহস কী করিয়া আসিল? সে উঠিয়া দাঁড়াইয়া স্পষ্টস্বরে বলিল, 'যে চিঠি লিখেচে, তাকে দেখবে?'
বিবর্ণ ও চিন্তিত মুখে রাজেন্দ্র বলিল, 'হুঁ।'
জানালার কাছে আগাইয়া গিয়া অমলা বলিল, 'এদিকে এসো।'
সুমুখের বাড়ির জানালায় সেই হিংস্র চক্ষু দুটো জ্বলন্ত অগ্নির মতো তেমনি সজাগ হইয়া ছিল। অমলাকে দেখিবামাত্র সে চোখ উজ্জ্বল হইয়া উঠিতেছিল, কিন্তু অমলার পাশে রাজেন্দ্রকে দেখিয়াই হঠাৎ আবার কুঞ্চিতফণা সর্পের মতোই নত হইয়া পড়িল।
রাজেন্দ্র এতক্ষণে সব ব্যাপারটা আন্দাজ করিতে পারিল। সে স্তব্ধ হইয়া দাঁড়াইয়া রহিল।
* * *
অমলা ঘরের মেঝে হইতে একে একে গহনাগুলা কুড়াইয়া আনিয়া, জানালা গলাইয়া অবজ্ঞাভরে রাস্তার উপরে ফেলিয়া দিল। শয়তানের চোখ দেখিয়া আজ সে একটুও ভয় পাইল না।
তাহার অশান্ত বুকটা যেন এতক্ষণ ভারী পাথর হইয়া ছিল; এখন সে শান্তির নিশ্বাস ফেলিয়া বাঁচিল,— তাহার মনের সকল ময়লা একেবারে যেন পরিষ্কার হইয়া গেল।
গৃহতলে হাঁটু গাড়িয়া, সে স্বামীর দেওয়া সোনার চুড়ি পরিতে বসিল।
মর্মবাণী ১৩ শ্রাবণ ১৩২২ (জুলাই ১৯১৫)
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।