হেমেন্দ্রকুমার রায়
দিনটা ভারী মেঘলা; সকাল থেকে সেই যে ইলশেগুঁড়ি শুরু হইয়াছে, থামিবার আর নামটি নাই। সমস্ত আকাশটার রং যেন বর্ষার স্তব্ধ, ঘোলা গঙ্গাজলের মতো! পথঘাট কাদায় কাদায় একেবারে প্যাচপ্যাচ করিতেছে।
পরেশের বৈঠকখানায় বসিয়া সন্ধ্যাবেলায় জনকতক যুবা সিগারেট ফুঁকিতেছিল, তামাক টানিতেছিল, গল্পগুজব করিতেছিল।
মানিক আকাশের দিকে তাকাইয়া বলিল, 'ভাগ্যে আজ রবিবার,—নইলে এই বাদলার জুতো বগলে করে, হাঁটুর উপর কাপড় তুলে, পা পিছলোতে পিছলোতে আপিসে ছুটতে হত। ওঃ, বড্ড বেঁচে যাওয়া গেছে হে!'
সুরেন মুখভার করিয়া বলিল, 'মরে যাই! বেঁচেছ তো ভারী! এমন বেঁচে লাভ কী,— হপ্তায় একটিমাত্র রবিবার—বাদল নেমে সেটিও বাজে খরচ হল!'
পরেশ হাই তুলিয়া তুড়ি দিতে দিতে বলিল, 'বাজে খরচই বা হবে কেন,—পারো তো কাজে খাটিয়ে নাও-না! শীত, গ্রীষ্ম, শরৎ, বসন্ত প্রভৃতি ঋতুর মতো বর্ষারও তো একটা বিশেষত্ব আছে— সে বিশেষত্ব যে উপভোগ করতে পারে, তার কাছে কিছুই বাজে খরচে যায় না।'
সুরেন বলিল, 'কবির মতো একঝুড়ি বাক্যব্যয় তো করলে, কিন্তু তোমার মতো আমরা সবাই তো আর কবি নই,— কাজেই বর্ষা নামলে আমাদের বলতে হয়— ''পায়ে জুতো পথে কাদা যাই কেমন করে!'' এই শহুরে বর্ষার রাস্তায় কাদা ঘেঁটে মরা কিংবা ঘরের কোণে সেই সাক্ষাৎ গদ্যরূপিণী চিরপুরাতন স্ত্রী-র কাছে হাত-পা গুটিয়ে বসে গয়নার বায়না শোনা ছাড়া আর কোনো বিশেষত্ব আমি তো দেখতে পাই না।'
নবীন হুস করিয়া সিগারেটের একমুখ ধোঁয়া ছাড়িয়া বলিয়া উঠিল, 'ভুল সুরেন ভুল! প্রথমত, যা বললে সেগুলো তোমার বিশেষত্ব হতে পারে— বর্ষার নয়। দ্বিতীয়ত, আমাদের সকলকার স্ত্রী পুরাতনও নন, গদ্যরূপিণীও নন, স্বামীকে পাশে পেলে গয়নার বায়নাও ধরেন না!'
রমেশ আলবোলার নলটা পরেশের হাতে দিয়া কহিল, 'নিশ্চয়, আমি তোমার বাক্য সমর্থন করি নবীন!'
সুরেন চটিয়া বলিল, 'তুমি আর মুখ নেড়ো না রমেশ! তোমার তো বিয়ে হয়েচে আজ তেরো বছর, তুমি কি তোমার স্ত্রী-কে এখনও নবীনা বলতে সাহস করো?'
রমেশ বলিল, 'আলবত! কেননা, আমি আমার স্ত্রী-কে ফি-মাসে দিন পনেরোর জন্যে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে পুরাতনে নূতনত্বের রসান দিয়ে নি।'
রমেশ কোনোদিকেই আঁটিতে না পারিয়া শেষটা হাল ছাড়িয়া বলিল, 'আচ্ছা, বর্ষার বিশেষত্বটা কী, শুনি!'
মানিক বলিল, 'সেটা আমি ব্যাখ্যা করতে পারি।'
'কী?'
'প্রথম, আড্ডায় বসে পাঁচজনে মিলেমিশে গল্পসল্প করা।'
'সে তো হচ্ছেই।'
'দ্বিতীয়, কচি শসা, নারিকেল কুচি আর গরমাগরম ফুলুরি সহযোগে মুড়িভক্ষণ। তৃতীয়, সেই সঙ্গে দাবা-বোড়ে, পাশা বা তাস খেলা, কিংবা—'
'তাস-দাবা-পাশা— ওঃ, ভারী বিশেষত্ব!'
'কিংবা ভূতের গল্প শোনা।'
পরেশ সোৎসাহে বলিয়া উঠিল, 'Bravo! ঠিক বলেছ! মুড়ি-টুড়ি আমি এখনই আনিয়ে দিচ্ছি, কিন্তু ভূতের গল্প বলবে কে?'
চন্দ্রনাথ এতক্ষণ তাকিয়ার উপরে নিশ্চেষ্টভাবে আড় হইয়া চক্ষু মুদিয়া তাম্বূলরস উপভোগ করিতেছিল। এখন গা-ঝাড়া দিয়া উঠিয়া বলিল, 'মুড়ি-ফুলুরির ভার যদি পরেশ নেয়, গল্প বলার ভার তাহলে আমি নিতে পারি।'
'কিন্তু, ভূতের গল্প!'
'অবশ্য, অবশ্য!'
'আর সত্য ঘটনা!'
'নিশ্চয়। গল্পের নায়ক হচ্ছি, আমি।'
'আর, নায়িকা?'
'আমার প্রিয়তমা।'
'সাধু! সাধু!— এতদিনে একজোড়া বাস্তব নায়ক-নায়িকার সন্ধান পাওয়া গেল! ওহে পরেশ, মুড়ি আনাও, ফুলুরি ভাজাও!'
বন্ধুরা সবাই সাগ্রহে চন্দ্রনাথের চারিদিক ঘিরিয়া বসিল।
* * *
বাহিরের মেঘলা আকাশের দিকে একবার চাহিয়া চন্দ্রনাথ আরম্ভ করিল:
'সে সময়ে হাওয়া খেতে আমরা মধুপুরে গিয়েছিলুম।
যে বাড়িতে আমরা ছিলুম,— সেখানা খুব বড়োসড়ো, সামনে বাগান, কাছেই নদী।
তোমরা সবাই জানো তো, মধুপুরে গিয়ে আমরা— গারদরক্ষীরা, মেয়েদের পায়ের বেড়ি বেপরোয়া হয়ে খুলে দি। মেয়েরাও এমন দুর্লভ সুযোগের ষোলোআনাই কাজে খাটিয়ে নিতে কিঞ্চিন্মাত্র গাফিলতি করেন না, রোদ গাফিলতি পড়লেই তাঁরা আলতা-পরা পদযুগলের সদব্যবহার করতে দলে দলে রাস্তায় বেরিয়ে পড়েন।
কমলাও (বলা বাহুল্য, আমার স্ত্রী— এই গল্পের নায়িকা) এ স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত হয়নি। সে-ও রোজ মাথায় আধঘোমটা টেনে, গ্রীষ্মেও গায়ে একখানি শীতের আলোয়ান জড়িয়ে, আলতা-পরা পায়ে রাস্তায় বেড়াতে বেরুত।
মেয়েদের বন্ধুসংগ্রহের ক্ষমতাও অদ্ভুত। বেড়িয়ে এসে কমলা প্রায়ই বলত, ''আজ একটি বউয়ের সঙ্গে ভাব হল।''
''কে?''
''অমুকবাবুর বউ। কলকেতায় বাড়ি। গায়ে এক-গা গয়না।''
কার গায়ে কত গয়না মেয়েরা সকলের আগে সেটা ভালো করে চোখ বুলিয়ে দেখে...। কমলাও গয়নার ''কম-বেশিত্ব'' দেখে আমার কাছে সমালোচনা করত, ''দেখো, অমুকের গায়ে এত গয়না— নিশ্চয় খুব বড়ো মানুষের বউ। অমুকের হাতে শুধু দু-গাছা বালা আর চুড়ি—তার বর নিশ্চয় তাকে দেখতে পারে না।''
স্ত্রী-র মুখে শুনে আরও বুঝতুম, কমলার এই নিতুই-নূতন বন্ধুর দল একদিনের আলাপেই বেফাঁস হয়ে এত হাঁড়ির খবর বলে ফেলত যে, আমরা— পুরুষরা, দশ বছরের আলাপেও কোনো বন্ধুর কাছ থেকে তত পেটের কথা আদায় করতে পারি না।
কমলা একদিন নিয়মিত প্রাতর্ভ্রমণ সমাপ্ত করে এসে বললে, ''ওগো, আজ আমার নেমন্তন্ন।''
আমি বিস্মিতস্বরে বললুম, ''নেমন্তন্ন! কোথায়!''
''সেই যে অমুকবাবুর পরিবার— যার কথা পরশু দিন তোমায় বলেছিলুম!''
''কী মুশকিল, পথে পথে আলাপ আর পথে পথেই নেমন্তন্ন!''
কমলা চোখ-মুখ ঘুরিয়ে বললে, ''অবশ্য!—
'আমি তো তেমন মেয়ে নই!
আকাশ জুড়ে আমি সখা,
পাতিয়ে নিছি সই!'
পথেই এখন আমার আস্তানা,— সুতরাং পথেই নেমন্তন্ন!''
''কিন্তু পথেই যে পাত পাতবে না, সে বিষয়ে আমি নিশ্চিন্ত। তাদের বাড়িতে তো পুরুষমানুষ আছে, তুমি একলা যাবে কী করে?''
কমলা কৃত্রিম কোপকটাক্ষে আমার গোঁফ টেনে নিয়ে বললে, ''হে জটিল-কুটিল নিপট-কপট শঠ, হে সন্দেহের মূর্তিমান অপদেবতা! আশ্বস্ত হও, তোমার এ সন্দেহ অমূলক! কেননা, পুরুষের ভেতরে একটি পনেরো-ষোলো বছরের ভাই, হঠাৎ কী দরকার পড়াতে বউটির বর কলকেতায় গেছেন, কাল আসবেন। বাড়িতে থাকবার মধ্যে শুধু একপাল মেয়ে আর ওই বাচ্চা পুরুষটি। সেসব না জেনেই কি নেমন্তন্ন নিয়েছি? আমি কি তেমনি হাঁদা গা? আর, এখান থেকে এমন কিছু দূরেও নয়— এই খান তিনেক বাড়ির পরেই। যাবার সময় ঝি-চাকরকে সঙ্গে নিয়ে যাব,—না গেলে তারা কী মনে করবে বলো দেখি?''
আমার এই স্ত্রী রত্নটি কিঞ্চিৎ অতিরিক্ত এবং অন্যায় রকমের মুখরা। সুতরাং তার মুখবন্ধের জন্য আমি বললুম, ''প্রিয়ে, লেকচার থামাও— আমি রাজি!''
কমলা উঁচু হয়ে আমার গলা জড়িয়ে (আমি লম্বায় ছ-ফুট তিন ইঞ্চি, প্রিয়তমা সহজে আমার নাগাল পান না।) ধরে বললে, ''তুমি আমার পোষ-মানা স্বামী— তাই তো তোমার চরণে কায়মনোপ্রাণে আমার এ জীবন-যৌবন সঁপে নিশ্চিন্তে আছি। হে প্রিয়তম, তোমার উঁচু মাথা নিচু করো, নইলে আমার চুম্বন অতদূর পৌঁছুবে না!''...'
চন্দ্রনাথ হঠাৎ মাঝপথে থামিয়া পড়িয়া বলিল, 'ওহে, মুড়ি-ফুলুরি এখনও এল না যে!'
পরেশ বলিল, 'ধৈর্য ধরো, এল বলে। তপ্ত তৈলে এখন সৎ ব্রাহ্মণের দ্বারা মহাসমারোহে ফুলুরির অভিষেকক্রিয়া সম্পন্ন হচ্ছে, রান্নাঘর থেকে ওই যে শ্যামের বাঁশির চেয়েও সুমধুর ছ্যাঁক-কলকল ধ্বনি আসচে—শুনচ না?'
রমেশ বলিল, 'ওহে চন্দর, ভূত কই— বিনামূল্যে মুড়ি-ফুলুরি খেতে চাইলে তো চলবে না! বলো গল্প, খাও মুড়ি— ফেলো কড়ি, মাখো তেল,—ভদ্দরলোকের এককথা!'
চন্দ্রনাথ বলিল, 'রও, আগে গোড়াটা ফেঁদে নি! নইলে শেষটা তোমাদের জেরার মুখে টেকব কেমন করে! তারপর, শোনো।—
সন্ধ্যার একটু আগে শোবার ঘরে ঢুকে দেখি, বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে কমলা জামার একটা হাতা সেলাই করছে।
আমি বললুম, ''এ কী, সাজগোছ করে অসময়ে সুচ নিয়ে কী হচ্ছে?''
কমলা মুখভার করে বললে, ''দেখো-না, পোড়ারমুখি 'ঝুমি'র কীর্তি! আমি কাপড় পরচি, জামাটা ওখানে বার করে রেখেছি, আর ঝুমি এসে কিনা জামার হাতাটা দাঁতে করে ছিঁড়ে দিলে! ভাগ্যে রেশমের সুতোর বান্ডিলটা সঙ্গে এনেছিলুম, তাই তাড়াতাড়ি সেলাই করে নিচ্চি। দাও তো হতভাগার দাঁতগুলো ভেঙে!''
যার নামের গোড়ায় কমলা দু-দুটো সুন্দর বিশেষণ প্রয়োগ করলে, সেই ঝুমি হচ্ছে আমার শখের কুকুর। কমলা যখনই তার দাঁত ভাঙবার আদেশ দিলে, তখনই সে বুঝে নিলে তার বিরুদ্ধে মস্ত একটা ষড়যন্ত্র হচ্ছে। আমি যেই তার দিকে তাকালুম, সে অমনি পেটের তলায় ল্যাজ ঢুকিয়ে ফুড়ুক করে ঘর থেকে সরে পড়ল।
কমলা হেসে বললে, ''দেখেচ, হতভাগা মানুষের চেয়েও চালাক। বোঝে সব, জামা ছিঁড়েচে দুষ্টুমি করে।''
এমন সময় চাকর এসে খবর দিলে, কমলাকে নিয়ে যাবার জন্যে লোক এসেছে।
কমলা বললে, ''বল গে যাচ্ছি। তুই আর ঝি আমার সঙ্গে যাবি।''
চাকরটা একটু জড়সড় হয়ে বললে, ''মা, আপনি কি সেখানে বেশি রাত পর্যন্ত থাকবেন?''
''কেন, সে খোঁজে তোর দরকার কী?''
''না মা, মালি বলছিল ও বাড়িতে ভূত আছে। রাত হলে তারা গান গায়—তবলা বাজায়!''
কমলা তো হেসেই অজ্ঞান! বললে, ''আচ্ছা, আচ্ছা, ভূতকে আমি মানা করে দেব—সে যেন তোর ঘাড় না মটকায়। নে, এখন চল!''
অত্যন্ত অনিচ্ছার সঙ্গে সে কমলার পিছু পিছু গেল।
কমলা চলে গেলে পর, আমি জুতো খুলে বিছানার উপর গিয়ে শুয়ে পড়লুম। হাতের কাছেই রবীন্দ্রনাথের গল্পগ্রন্থাবলি পড়ে ছিল, সেখানা তুলে নিয়ে একটা গল্প পড়তে লাগলুম। সেটা ভূতের গল্প।
রাত্রিতে তোমরা কেউ যদি ভূতের গল্প পড়ে থাকো, তাহলে নিশ্চয়ই জানো যে, পড়তে পড়তে কীরকম একটা অকারণ, অজ্ঞাত আতঙ্কে মনটা গুমোট হয়ে আসে। বিশেষ, গল্পটি যদি আবার ভালো লেখকের লেখা হয়! কারণ, ভালো লেখকরা আজগুবির রংটা এমন করে ফলিয়ে তুলতে পারেন, যে মনে হয়, যা পড়চি তা সব সত্য—একেবারে বাস্তব আর স্বাভাবিক। রবীন্দ্রনাথের কবলে পড়ে আমারও সেই হল। পড়তে পড়তে বোধ হতে লাগল, গল্পের সেই ভূতুড়ে কাণ্ড আমি যেন স্বচক্ষে দেখতে পাচ্ছি!
হঠাৎ মনে পড়ল, নেমন্তন্নে যাবার সময় চাকরটা কমলাকে বলেছিল, যে বাড়িতে সে যাচ্ছে সেটা হানাবাড়ি। আশ্চর্য কী! মধুপুরের এই ভাড়াটে বাড়িগুলোতে কত রকমের রুগি আসে আর মরে—এখানে কোথায় কী আছে, কে বলতে পারে?
এই, আমি যে বাড়িতে আছি, এটাও তো ভাড়াটে বাড়ি, এখানেও লোক মরেছে নিশ্চয়, এ বাড়িতেও তো ভূত থাকতে পারে!... কথাগুলো মনে হতেই গা-টা কেমন ছমছম করতে লাগল। ভূতের ভয় রাত্রিকালে প্রবল হয় কেন? কারণ, রাত্রির সঙ্গে এমন একটা রহস্যের ভাব আছে, যাতে করে সম্ভব-অসম্ভবের মাঝখানকার তফাতটা একেবারে ঘুচে যায়। দিনের আলো হচ্ছে বাস্তব, তার মধ্যে আবছায়া, আধঢাকা বা গোপন কিছুই থাকবার জো নেই; আর রাতের অন্ধকার হচ্ছে অবাস্তবের বাসা, তার মধ্যে নজর চলে না, তাই যত কিছু কাল্পনিক, অদেখা, অচেনা ব্যাপার আড়ালে আড়ালে উঁকিঝুঁকি মারতে থাকে।...
একটা মেঠো হাওয়া এসে আচমকা ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে আলোটা গেল নিবে।
আস্তে আস্তে বিছানা থেকে নামলুম। অন্ধকারেই জুতো পরে দেশলাইটা কোথায় আছে হাতড়ে হাতড়ে খুঁজতে লাগলুম। দেশলাইটা খুঁজে বের করে আলোর দিকে যাচ্ছি—হঠাৎ পিছনে কীসের একটা শব্দ হল।
থমকে দাঁড়িয়ে পড়লুম। অন্ধকারে কিছু দেখা গেল না— শব্দও আর নেই। ভাবলুম, বাতাসে বোধহয় ঘরের কোনো জিনিস নড়ে উঠেছে।
কিন্তু, আবার যেই আলোর দিকে এগুব,— ফের সেই শব্দ!—না, এ তো বাতাসে জিনিস নড়ার শব্দ নয়! ফস করে দেশলাই জানলুম, ঘরে কেউ কোথাও নেই। তবে কীসের শব্দ এ?
না, এ সময় অন্ধকারে থাকা সুবিধের নয়— আগে আলো জ্বেলে তবে অন্য কথা। কিন্তু যতবার আমি আলোর দিকে এগুতে যাই, ততবারই ঠিক আমার পিছনে কীসের শব্দ হয়, অথচ আমি থমকে দাঁড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই শব্দটাও থেমে যায়। ক্রমাগত দেশলাই জ্বালতে লাগলুম,— কিন্তু ঘরের ভিতরে আমি ছাড়া আর দ্বিতীয় প্রাণী নেই।
এ ঘরে একখানা খাট, একটা ছোটো টেবিল আর খান দুই ''বেন্টউড'' চেয়ার ছাড়া আর কিছু আসবাব ছিল না— সুতরাং কেউ যে কোথাও লুকিয়ে থাকবে, সে সম্ভাবনাও নেই।
ঘরে কেউ নেই— অথচ শব্দ হচ্ছে, এর মানে কী? তবে কি যা ভাবছিলুম, তা-ই? এটা কি হানাবাড়ি?— আমার সমস্ত দেহ ভয়ে রোমাঞ্চিত হয়ে উঠল।
এতক্ষণ ঘর ছিল ঘুটঘুটে অন্ধকার, এখন মেঘের ফাঁক থেকে আবার চাঁদ ফুটে উঠল। জানলা দিয়ে ঘরের মাঝে মাঝে জ্যোৎস্নার শিখা এসে পড়ল।
অন্ধকার যে ছিল ভালো! এই খানিক কালো, খানিক আলোতে সমস্ত ঘরখানা যেন অপার্থিব হয়ে উঠল। মনে হতে লাগল, আমার চারদিকে যেন অনেকগুলো ছায়াশরীরী রক্তপিপাসু প্রেতাত্মা, তাদের লিকলিকে কঙ্কাল-বাহু আমার দিকে বাড়িয়ে ওত পেতে গুম হয়ে বসে আছে, যেকোনো মুহূর্তে তারা সবাই মিলে একসঙ্গে হুড়মুড় করে আমার ঘাড়ের উপর লাফিয়ে পড়তে পারে!
অনেকক্ষণ আড়ষ্টভাবে দাঁড়িয়ে রইলুম, কিন্তু আর কোনো শব্দ পেলুম না। তবে কি এতক্ষণ আমি মিথ্যা ভয়ের কুস্বপ্ন দেখছিলুম? তা-ই হবে! ভূতের গল্প পড়ে মাথাটা আমার বিগড়ে গিয়েছিল, নিশ্চয়!
একটু আশ্বস্ত হয়ে আবার এক-পা এক-পা করে এগুতে লাগলুম। আবার—আবার সেই শব্দ! শব্দটাও ঠিক আমার পিছনে পিছনে এক-পা এক-পা করে এগুচ্ছে। চকিতে ফিরে দাঁড়ালুম,— কেউ কোথাও নেই! আমি খুব জোরে জোরে পা ফেলে জানলার দিকে এগিয়ে গেলুম,— সে অজ্ঞাত, অদৃশ্য, অমানুষ শত্রুর পদশব্দও আমার পিছনে পিছনে এগিয়ে এল— থুপ, থুপ, থুপ!
ভয়ে আর পিছনপানে চাইলুম না। কে জানে—কী দেখতে কী দেখব! প্রাণপণে জানলার গরাদগুলো দু-হাতে আঁকড়ে রইলুম।
দেখলুম, রাস্তা দিয়ে গান গাইতে গাইতে একটা লোক যাচ্ছে। সে আমার এত কাছে,— কিন্তু আমার মনে হল, কাছে থেকেও সে যেন বহু দূরে! তার আর আমার মাঝখানে যেন প্রেতলোকের একটা অদৃশ্য যবনিকা পড়ে গেছে। তাকে চেঁচিয়ে ডাকতে গেলুম— কিন্তু আমার গলা দিয়ে কোনো আওয়াজ বেরুল না।
আকাশের গায়ে উড়ন্ত তিমিরপিণ্ডের মতো একটা প্যাঁচা, ভীষণ কর্কশ চিৎকারে মৌন নিশীথকে বিদীর্ণ করে দিয়ে কোথায় উড়ে গেল। আমার প্রাণ যেন গলা পর্যন্ত উঠে ধুকপুক করতে লাগল।
ওই যে— পথ দিয়ে লন্ঠন নিয়ে কারা আসচে না?—এ কী—কমলা আসছে! হ্যাঁ, তা-ই তো—ওই যে, ওরা আমার বাড়ির বাগানের ভিতর ঢুকল। আঃ—বাঁচলুম!
তাড়াতাড়ি জানলা ছেড়ে দরজার দিকে ছুটে গেলুম— সঙ্গে সঙ্গে ঘরের একখানা ''বেন্টউড'' চেয়ার হড়হড় করে আমার দিকে সরে এল— তারপরেই পিছন থেকে কে যেন আমার একখানা পা টেনে ধরেই ছেড়ে দিলে!... আমার পা দুটো ঠিক পাথরের মতো হয়ে গেল, বুকের মধ্যে প্রাণটা যেন ধড়ফড় করে আছড়ে মরে গেল—ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে আমি সেখানেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলুম।'
চন্দ্রনাথ গল্প থামাইয়া শ্রোতাদের মুখের দিকে চাহিল। বাহিরে তখনও ঝুরুঝুরু করিয়া বৃষ্টি ঝরিতেছে—মাঝে মাঝে ঘরের ভিতরে জোলো হাওয়া ঢুকিয়া 'অ্যালম্যানাকে'র ছবিগুলো দোলাইয়া দিয়া যাইতেছে। গল্পটাও রীতিমতো জমিয়া উঠিয়াছে। ঘরের দেয়ালে কালো কালো ছায়া ফেলিয়া শ্রোতারা চন্দ্রনাথের মুখের দিকে রুদ্ধনিশ্বাসে বিস্ফারিত চক্ষে চাহিয়া ছিল, হঠাৎ গল্প বন্ধ হওয়াতে সকলে মহা উদবেগে, সাগ্রহে, সমস্বরে জিজ্ঞাসা করিল, 'তারপর! তারপর!'
চন্দ্রনাথ গদাইলশকরি চালে থামিয়া থামিয়া বলিল, 'তারপর? তারপর— বুঝেছ কিনা—যা ঘটল, সে একেবারে—ওর নাম কী— অবর্ণনীয় ব্যাপার। আচ্ছা, আমার গল্পটি ক্রমপ্রকাশ্য হলেই ভালো হয় না কি? আজ তো কাটল,— আগামী বাদলে এটি সমাপ্য!'
'না, না! শিগগির বলো বলচি! নইলে মুড়ি-ফুলুরির থালা কেড়ে নেব এখনই!'
'স্বচ্ছন্দে। তোমরা বোধহয় জানো যে, খালি থালা ভক্ষণ করা আমার অভ্যাস নেই—মুড়ি, ফুলুরি ইত্যাদি সমস্তই এখন আমার উদর-সিন্দুকে আবদ্ধ। তবে সবাই যখন এতই নাছোড়বান্দা, আমার ''মধুরেণ সমাপয়েৎ'' করতে আপত্তি নেই। শোনো...
যখন জ্ঞান হল, দেখলুম, শিয়রে হেঁট হয়ে কমলা আমার মাথায় জল ঢালছে—ঝি বাতাস করছে, চাকরটা লন্ঠন হাতে দাঁড়িয়ে আছে।
আমার জ্ঞান হতে দেখে কমলা উদবিগ্ন স্বরে জিজ্ঞাসা করলে, ''হ্যাঁ গা, কী হয়েছে তোমার!''
আমি ভয়ে ভয়ে চারদিকে চাইতে চাইতে উঠে বসলুম। তারপর বললুম, ''কমলা, ঘরে কোনো শব্দ-টব্দ হচ্ছে না? ভূতটা চলে গেছে তো?''
''ভূত! ভূত কী গো?''
''হ্যাঁ, ভয়ানক ভূত—দেখা যায় না অথচ শব্দ করে; মানুষ ধরে!''
''ও মা, তুমি বলছ কী! স্বপ্ন-টপ্ন দেখেছ নাকি?''
''স্বপ্নই বটে! এও যদি স্বপ্ন হয়, তবে আমি স্বপ্ন—তুমি স্বপ্ন—সবই স্বপ্ন!''—এই বলে কমলাকে একে একে সব কথা খুলে বললুম।
সব বলা হয়ে গেলে মুখ তুলে দেখি, লন্ঠনটা ফেলে চাকর পাখাখানা ফেলে ঝি-মাগি সে মুল্লুক ছেড়ে সরে পড়েছে।
পরদিন ভোরবেলায় হঠাৎ চটুল হাসির কলরোলে আমার ঘুম ভেঙে গেল। উঠে চোখ কচলে চেয়ে দেখি, ঘরের মেঝেতে বসে কমলা মুখে কাপড় দিয়েও কোনোমতে হাসি চাপতে পারছে না। হাসতে হাসতে তার চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছে।
''হয়েচে কী, অত হাসির ঘটা কেন?''
কমলা হাসতে হাসতে হাত নেড়ে আমাকে সবুর করতে বললে;—অর্থাৎ, আগে সে প্রাণ ভরে হেসে নিক, তারপর কথাবার্তা। আমি অবাক হয়ে বসে রইলুম।
তারপর হাসির ধুম যখন একটু কমল, কমলা তখন উঠে, আমার কাছে এসে দাঁড়াল। বললে, ''গুণমণি, কালকের সে দুরন্ত ভূতটাকে, তদন্ত করে আমি আজ এই ঘটনাস্থলেই গ্রেপ্তার করেচি।''
''কী?''
''ভূত, মশাই, ভূত! যে ভূত দেখা যায় না অথচ শব্দ করে, মানুষ ধরে! এই দেখো!''
কমলার হাতে খানিকটা রেশমের সুতো!
''ও তো দেখচি, সুতো!''
''হুঁ, এটুকু তোমার ওই 'আলবার্ট স্লিপার'-এর ভেতর থেকে আবিষ্কার করলুম।''
''বেশ তো, হয়েছে কী?''
''ঘরের চারদিকে চেয়ে দেখো। তাতেও যদি মশাই বুঝতে না পারেন, তবে আপনার গোঁফজোড়া আমাকে বাধ্য হয়ে কর্তন করতে হবে।''
তা-ই তো! ঘরের যেদিকে চাই—খালি দেখি কালো কালো রেশমের সুতো! দরজার কাছে, জানলার কাছে, টেবিলের চারদিকে, চেয়ারের পায়ায়, সুতো—খালি রেশমের সুতো!
কমলা যা বললে, তার মর্ম এই: নেমন্তন্নে যাবার সময় সুতোর বান্ডিলটা সে বিছানাতেই তাড়াতাড়িতে ফেলে গিয়েছিল। আমার পা লেগে বা যেমন করেই হোক—বান্ডিলটা বিছানা থেকে মাটিতে পড়ে যায়, সেই সময়ে কোনোগতিকে খানিকটা খোলা সুতো গিয়ে পড়ে আমার জুতোর ভিতরে। তারপর ঘরের আলোটা যায় নিবে। ভূতের গল্প পড়ে আচ্ছন্ন অবস্থায় যখন আলো জ্বালতে নীচে নামি, তখন আমি সেই সুতোসুদ্ধ জুতো পায়ে দি। কাজেই, যখনই আমি চলতে গেছি, সেই পায়ে আটকানো বান্ডিল সঙ্গে সঙ্গে শব্দ করে উঠেছে। এই হল ভূত দেখার প্রামাণিক ইতিহাস!
কমলার কথা অনেকক্ষণ ধরে ভেবে দেখলুম!
Circumstancial evidence-এ তার কথা সত্য বলে মেনে নিতে হয় বটে! কিন্তু কী জানো—বলা তো যায় না—'
ভারতী, শ্রাবণ ১৩২৪ (জুলাই ১৯১৭)
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।