ফুটবলের বিপদ

হেমেন্দ্রকুমার রায়

ফুটবল হচ্ছে পায়ের সাহায্যে খেলবার জিনিস। কিন্তু ফুটবল খেলতে সুপটু যে পা, তার সাহায্যে যে মস্তিষ্কেরও অভাব পূরণ করে নেওয়া যায়, এ সত্যটা আজকাল নিত্যই দেখতে পাওয়া যাচ্ছে!

অবশ্য মাথার চেয়ে পা যে বড়ো, অন্তত বাঙালি জাতি সে কথা কখনো অস্বীকার করতে পারবে না। কারণ বড়ো বড়ো মাথাওয়ালা এম.এ. বি.এ. ডিগ্রিধারী বাঙালিকেও দেখেছি, ট্রেনে-ট্রামে বা চৌরঙ্গি অঞ্চলের পথেঘাটে গৌরাঙ্গ-প্রভুর সবুট-চরণের ভয়ে সদাই তটস্থ হয়ে আছেন এবং তাঁদের মাথা তখন তাঁদের মান ও প্রাণ রক্ষা করতে পারে না। ঘোড়া ও শৃঙ্গীর কাছ থেকে কত হাত তফাতে থাকা উচিত, প্রবাদ তা স্পষ্ট ভাষায় বলে দিয়েছে। অথচ বুট-পরা পায়ের কাছ থেকে কত হাত তফাতে থাকা দরকার, সে সম্বন্ধে মাথাওয়ালা লোকেরা এখন পর্যন্ত একটা প্রবাদ সৃষ্টি করেননি কেন?

কিন্তু যাদের মাথার চেয়ে পায়ের জোরই বেশি, বাঙালি হলেও তারা যে ইংরাজের একটা ধাক্কার বদলে পাঁচটা ধাক্কা ফিরিয়ে দেয়, ফুটবল খেলার মাঠে এ দৃশ্য তো হামেশাই আমাদের চোখে পড়েছে!

মোহন বাগান সেদিন 'শিল্ড' দখল করে সমগ্র জাতির কাছে যে সম্মানটা পেয়েছিল, দ্বিতীয় পলাশির যুদ্ধ জিতলেও তার চেয়ে বেশি সম্মানের দাবি তারা করতে পারত না। তাদের এ সম্মানের কারণ কী? কেবলমাত্র পায়ের জোর মশাই, কেবলমাত্র পায়ের জোর।

অতএব মাথাওয়ালা লোকদের ঢের উপরে আমি ঠাঁই দি তাদের, পায়ের মতো পায়ের অভাব যাদের নেই এবং পায়ের সাহায্যে ফুটবল খেলে যারা নিজেদের প্লীহারক্ষার জন্য শক্তি সংগ্রহ করতে পারে! বাংলা দেশে এখন এইরকম লোকেরই দরকার হয়েছে।

কিন্তু আমাদের স্কুলের প্রধান শিক্ষক নকুড়বাবু এ কথা কিছুতেই মানতে চাইতেন না।

নকুড়বাবু সেকেলে লোক এবং যেমন কঠোর তেমনি স্পষ্টবক্তা। বয়সের ভারে তাঁর দেহখানি ধনুকের মতন ভেঙে পড়েছে বটে, কিন্তু রেগে গেলেই তিনি রুলে টানা লাইনের মতোই সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারতেন এবং তিনি যখন সোজা হতেন সমস্ত স্কুলে তখন সাড়া পড়ে যেত! তার উপরে আবার নকুড়বাবু ছিলেন অত্যন্ত টেরা এবং টেরা মাস্টার যে ছাত্রদের পক্ষে কত বড়ো অভিশাপের মতো, ভুক্তভোগীদের সে কথা নিশ্চয়ই আর বলে দিতে হবে না! কারণ টেরা চোখ যেদিকেই তাকিয়ে থাকুক, সকলেই মনে করে তার দিকেই চেয়ে আছে।

নকুড়বাবুর জীবনের সব চেয়ে বড়ো জাঁক হচ্ছে, তিনি সেকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাঁকি দিয়ে পাশ করা এম.এ. বি.এ. নন দস্তুরমতো আদা-জল খেয়ে তবে তিনি লেখাপড়া শিখেছেন, ইত্যাদি!

সম্প্রতি একেলে গ্র্যাজুয়েটদের উপরে নকুড়বাবুর বিরাগ একটু বেশিরকমই বেড়ে উঠেছে।

উপরওয়ালারা আজকাল নকুড়বাবুকে প্রায়ই জ্বালাতে শুরু করেছেন, এইবারে তাঁর অবসর নেবার বয়স হয়েছে এবং তাঁর স্থানে তাঁরা অবনীবাবুকে প্রতিষ্ঠিত করতে চান।

অবনীবাবু হচ্ছেন বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক ও একেলে গ্র্যাজুয়েট। একে তো অবসর নিতে নকুড়বাবুর বিশেষ আপত্তি, তার উপরে ওই একেলে গ্র্যাজুয়েট অবনী যে তাঁর আসন কেড়ে নেবে, এ কথা শুনে অবধি তিনি আজকাল বারংবার সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে উঠছেন!

এখানকার আর-এক শিক্ষক হচ্ছেন শ্যামবাবু। তাঁর যত্নে আর উৎসাহে আমাদের স্কুল ফুটবল খেলায় শহরের আর সমস্ত স্কুলের উপরে টেক্কা মারতে পেরেছে।

শ্যামবাবুর মস্ত গুণ, নানা স্থান থেকে তিনি ভালো ভালো খেলোয়াড়কে এনে আমাদের স্কুলে ভরতি করে নিতে পারেন!

এই খেলোয়াড় ছেলেগুলি লেখাপড়ায় প্রায়ই হত যারপরনাই বাজে মার্কা, এমনকী খেলা না জানলে আমাদের স্কুলে তাদের পক্ষে ভরতি হওয়াই হয়তো অসম্ভব হয়ে উঠত! কিন্তু ফুটবল খেলার দৌলতে স্কুলে তারা যে আদরটা পেত, খুব ভালো ছেলেদের কপালেও সেটা জুটত না।

এই ছেলেগুলিকে শ্যামবাবু যখন স্কুলে ভরতি করতেন, তখন তাঁর সহায় থাকতেন অবনীবাবু। শ্যামবাবুর মতন অবনীবাবুও চাইতেন, খেলাধুলায় আমাদের স্কুল যেন অদ্বিতীয় হতে পারে। তিনি নিজেও একসময়ে নামজাদা খেলোয়াড় ছিলেন, কাজেই এ ছেলেগুলি মা সরস্বতীর চোখের বালি হলেও এদের দাবি তিনি ঠেলতে পারতেন না।

এইভাবে দিন যাচ্ছে, এমন সময়ে নকুড়বাবু, হঠাৎ একদিন মাথা চাগাড় দিয়ে উঠলেন!

একটি ভালো খেলোয়াড়কে শ্যামবাবু স্কুলে ভরতি করে নিচ্ছেন, আচম্বিতে নকুড়বাবু এসে তাকে লেখাপড়া সম্বন্ধে গোটাকয়েক মৌখিক প্রশ্ন করিলেন। ছেলেটি যে তাঁর প্রশ্নের উত্তর দিতে পারল না সে কথা বলাই বাহুল্য।

নকুড়বাবু তাঁর দুমড়ে-পড়া দেহযষ্টি সোজা করে বললেন, 'ওহে শ্যাম, তুমি কি আমাদের স্কুলের নাম ডুবোতে চাও? এই গর্দভটিকে তুমি কোন আক্কেলে সেকেন্ড ক্লাসে ভরতি করে নিচ্ছিলে? ও যে ফোর্থ ক্লাসেও ভরতি হবার যুগ্যি নয়।'

শ্যামবাবু মাথা চুলকোতে চুলকোতে বললেন, 'আজ্ঞে, ও ছোকরা খুব ভালো ফুটবল খেলতে পারে।'

নকুড়বাবু একটা শামুকের খোলের ন্যাকড়ার ঠুলি খুলে ঘন ঘন কয়েক টিপ নস্য নিয়ে বললেন, 'ফুটবল খেলতে পারে; আমার স্কুল কি ফুটবল ক্লাব, যে এখানে যত মায়ে-তাড়ানো বাপে-খেদানো ছোঁড়া এসে জুটবে?'

শ্যামবাবু এ প্রশ্নের কোনো জবাব দিলেন না।

নকুড়বাবু বললেন, 'যতদিন এ বুড়ো এখানে আছে, ততদিন ওসব অনাচার কিছুতেই চলবে না। এখনও কোনো একেলে গ্র্যাজুয়েট তোমাদের হেডমাস্টার হয়নি, তা জানো তো? ব্যাপারটা আমি আজকেই উপরওয়ালাদের কাছে রিপোর্ট করে দেব।' বলতে বলতে আবার ধনুকের মতন বেঁকে পড়ে তিনি সে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। 'একেলে গ্র্যাজুয়েট' অবনীবাবু সেই ঘরেই হাজির ছিলেন। তিনি বেশ বুঝলেন যে, রিপোর্টটা যাবে তার ছাড়া আর কারো নামে নয়।

তারপর থেকে এমন ঘটনা প্রায়ই ঘটতে লাগল। ফলে দাঁড়াল এই যে, সে বৎসরে আমাদের স্কুল খেলার মাঠে উপর-উপরি কয়েকবার হেরে গেল।

এই পরাজয়ে শ্যামবাবু আর অবনীবাবু যতটা দুঃখিত হলেন, নকুড়বাবুর আনন্দও বেড়ে উঠল ঠিক ততটাই।

অথচ বলবারও কিছু নেই। কারণ প্রথমত নকুড়বাবু এখানকার প্রধান শিক্ষক এবং দ্বিতীয়ত স্কুলের তরফ থেকে দেখলে তাঁর এই বিরুদ্ধাচরণকে দোষ দেওয়াও যায় না।

কিন্তু আমাদের বিরুদ্ধ বিদ্যালয়ের ছাত্ররা যখন আমাদের স্কুলের সুমুখ দিয়ে 'শিল্ড' নিয়ে শোভাযাত্রা করে জয় জয় নাদে চলে গেল, তখন খালি ছাত্ররা নয়,—মাস্টাররা পর্যন্ত লজ্জা ও অপমানে মাথা হেঁট করতে বাধ্য হলেন।

আমরা বেশ বুঝলুম নকুড়বাবুর হঠাৎ এতটা সচেতন হবার একমাত্র কারণ হচ্ছে, কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিপন্ন করা যে, অবনীবাবু আদৌ বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ হবার উপযুক্ত নন।

ফলে অবনীবাবুর মন যে নকুড়বাবুর উপরে অত্যন্ত প্রসন্ন হয়ে উঠল, তা বলা যায় না। বরং আমরা লক্ষ করলুম, দুজনের মধ্যে কথাবার্তা প্রায় বন্ধ হয়ে এসেছে।

ইতিমধ্যে শ্যামবাবু হঠাৎ একদিন অবনীবাবুর ঘরের ভিতর ঢুকে উত্তেজিতভাবে বলে উঠলেন, 'ওঃ, খাসা এক খেলোয়াড় পাওয়া গেছে!'

অবনীবাবু কী লিখতে লিখতে মুখ তুলে বললেন, 'খেলোয়াড়! কীরকম?'

শ্যামবাবু বিপুল উৎসাহের সঙ্গে বললেন, 'এমন অদ্ভুত সেন্টার-ফরওয়ার্ড আমি আর কখনো দেখিনি! গোলের সামনে অব্যর্থ তার লক্ষ্য,—বল পেয়েচে কী গো। দিয়েচে! একে যদি পাই মশাই, আমাদের স্কুলের সামনে দাঁড়ায় কার সাধ্য! একে ভরতি করে না নিলে চলবে না।'

অবনী কিন্তু কিছুমাত্র উৎসাহ না দেখিয়ে, রীতিমতো শুষ্কস্বরেই বললেন, 'হুঁ। ছেলেটির নাম কী?'

'নিমাইচাঁদ।'

'লেখাপড়ায় কেমন?'

'ওইখানেই কিঞ্চিৎ গোল আছে, মশাই! শুনলুম, নিমাইচাঁদ যে স্কুলে পড়ে, সেখানে থার্ড ক্লাসেই আজ চার বৎসর বসে আছে! নিমাইচাঁদের পিতার ধারণা, স্কুলের দোষেই তাঁর ছেলে প্রোমোশন পাচ্চে না! তাই তিনি তাকে অন্য স্কুলে ভরতি করে দিতে চান।'

অবনীবাবু চিন্তিত মুখে বললেন, 'তবেই তো!'

'না মশাই, তা বললে চলবে না! নিমাইচাঁদ খালি ফুটবল নয়, হকি আর ক্রিকেটও খেলে চমৎকার! আবার স্পোর্টের নানান বিভাগে আশ্চর্য তার দক্ষতা! একটি উজ্জ্বল রত্ন বললেই হয়! যেমন করেই হোক, নিমাইচাঁদকে আমাদের স্কুলে ভরতি করে নিতেই হবে,— নইলে অন্য যেকোনো স্কুল তাকে পেলে আর ছাড়বে না!'

অবনীবাবু ধীরে ধীরে বললেন, 'শ্যামবাবু, আপনি ভুলে যাচ্চেন যে, আমাদের মাথার উপরে আর-একজন শাহানশা বাদশা জলজ্যান্ত বিদ্যমান আছেন। তিনি যদি শাসনদণ্ড উত্তোলন করেন, আমি এক তুচ্ছ একেলে গ্র্যাজুয়েট, আমার সাধ্য কী যে সেই সর্বশক্তিমানকে নিবারণ করি? আমি তাঁর হুকুম তামিল না করলেই তিনি এখনই আমার নামে রিপোর্ট লিখতে প্রবৃত্ত হবেন!'

শ্যামবাবু প্রবলভাবে মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন, 'সে হবে না মশাই, কিছুতেই হবে না! নিমাইচাঁদকে ছলে-বলে-কৌশলে যেমন করেই হোক, আমি এই স্কুলে নিয়ে আসব,—আপনার ওই শাহানশা বাদশার হুকুম এবারে আমি মানব না।'

অবনীবাবু মুক্তকণ্ঠে হাস্য করে বললেন, 'বেশ তো শ্যামবাবু, আমার তাতে কোনোই আপত্তি নেই! তবে আমি শুধু এইটুকু করতে পারি, জেনেশুনেও আপনার ওই নিমাইচাঁদকে আমি কোনো বাধা দেব না!'

শ্যামবাবু উৎফুল্ল কণ্ঠে বললেন, 'আচ্ছা, আপনার এইটুকু সাহায্যেই আমার কাজ হাসিল হয়ে যাবে!'

'আপনি কী করবেন, শুনি?'

'কাল দুজন নতুন ছাত্র আমাদের স্কুলে ভরতি হবে। তাদের একজন হচ্চে নিমাইচাঁদ আর একজনের নাম হরেন্দ্রনাথ। হরেনের জন্যে আমি কিছুই ভাবি না, কারণ সে খেলতে না জানলেও লেখাপড়ায় খুব ভালো। নকুড়বাবু প্রশ্ন করেও তাকে ঠকাতে পারবেন না।'

'হুঁ, তারপর?'

'নিমাই আর হরেনকে আমি কাল সকালে সাড়ে নয়টার সময়ে স্কুলে আসতে বলে দিয়েছি। নকুড়বাবু সাড়ে দশটার সময়ে এখানে আসেন, আমি কিন্তু তার আগেই আপনার সাহায্যে নিমাইচাঁদকে স্কুলে ভরতি করে নেব। হপ্তাখানেক নকুড়বাবুকে এ ব্যাপারটা না জানালেই আমাদের কার্যসিদ্ধি হয়ে যাবে, কারণ ব্যাপারটা একেবারে পাকাপাকি হয়ে গেলে পর নকুড়বাবু বাধা দিলেই আমাদের আর কিছুই করতে পারবেন না!'

অবনীবাবু খুশি হয়ে বললেন, 'হ্যাঁ, আপনার এ উপায় মন্দ নয়! তবে খুব সাবধান, শাহানশা যেন ঘুণাক্ষরেও এ ষড়যন্ত্র টের না পান, তিনি সন্দেহ করলেই সব ভেস্তে যাবে!'

একটা বড়ো ঘরের মাঝখানে কাঠের পাঁচিল দিয়ে যে কামরা তৈরি করা হয়েছিল, অবনীবাবু বসতেন সেইখানেই।

কাঠের দেওয়ালের ওপাশে বসে আফিম খেয়ে ঝিমুতেন আঁকের মাস্টার রামতারণবাবু এবং আরও অনেকে।

শ্যামবাবু আর অবনীবাবুর ভিতরে যে কথাবার্তা হল, কাঠের দেওয়ালের পিছন থেকে রামতারণবাবু তার প্রত্যেক কথাটি একাগ্র মনে শ্রবণ করলেন। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে একটা হাই তুলে তুড়ি দিতে দিতে তিনবার দুর্গানাম উচ্চারণ করে নকুড়বাবুর ঘরের দিকে গুটিগুটি চললেন।

নকুড়বাবু বসে বসে তামাকুর ধূমপান করছেন, এমন সময়ে রামতারণবাবু এসে তিনি যা শুনেছেন, তার প্রত্যেক কথাটি পুনরাবৃত্তি করে গেলেন।

শুনতে শুনতে নকুড়বাবুর মুখের ভাব যেরকম হয়ে উঠল, তা একটা দেখবার বিষয়! রাগে তাঁর দুই টেরা চোখ দিয়ে যেন আগুন ঠিকরে পড়তে লাগল! অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে নিয়ে তিনি বললেন, 'হুঁ, শাহানশা-বাদশার প্রতাপটা তোমরা এবারে হাড়ে হাড়ে টের পাবে। কাল কখন এ ব্যাপারটা হবে?'

'আজ্ঞে সাড়ে নয়টার সময়ে।'

'আমি কাল সকালে ন-টার আগে স্কুলে আসব। ছোঁড়া দুটোর নাম কী বললে?'

'নিমাইচাঁদ আর হরেন্দ্রনাথ।'

'ওরা নিমাইচাঁদকে ভরতি করবার জন্যেই এই চক্রান্ত করেচে, কেমন?'

'আজ্ঞে হ্যাঁ, হরেন ছেলেটি শুনলুম ভালো—'

'ফুটবল খেলে না?'

'না।'

'তাহলে নিশ্চয়ই ভালো। আচ্ছা কাল আমি তবে শ্রীমান নিমাইচাঁদের সঙ্গেই আলাপ করব। অবনীবাবাজির নামে এবারে যে রিপোর্ট যাবে, দেখি সে তার তাল সামলায় কেমন করে! একে তো বেআইনি কাজ, তার উপরে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র! এ গুরুতর অভিযোগ! তার কাজ না যাক, স্কুলের হেডমাস্টার সে আর নিশ্চয়ই হতে পারবে না! রামতারণ তোমার এ উপকার আমার মনে থাকবে।'

'আজ্ঞে, সে আপনার অনুগ্রহ!'

'রামতারণ, সবাই তোমার নামে অভিযোগ করে, তুমি নাকি ক্লাসে বসে আফিম খেয়ে ঘুমোও এবং স্বপন দেখো। আমি বেশ বুঝচি, এ অভিযোগ মিথ্যা! কারণ আফিম খেয়ে তোমার ঝিমুনোর অভ্যাস থাকলে তুমি কি বার বার শ্যাম আর অবনীর খবর আমার কাছে এনে দিতে পারতে? তুমি আছ বলেই তো আমি অবনীকে এতবার জব্দ করতে পেরেচি!'

রামতারণ বললেন, 'আজ্ঞে, লোকে আমার নামে কীরকম মিথ্যে বদনাম দেয় তা দেখচেন তো!'

পরদিন সকালবেলায় অবনীবাবু আর শ্যামবাবু যখন আফিসঘরে এসে বসলেন, তখনও সাড়ে নয়টা বাজতে দেরি আছে।

যে দুটি ছাত্রের ভরতি হবার কথা, তারা আগে থাকতেই হাজির ছিল এবং অবনীবাবুর হুকুমে স্কুলের কেরানিবাবুও আজ একটু সকাল সকালই নিজের চেয়ারে এসে বসেছেন, কারণ ছেলে দুটিকে ভরতি করে নিতে তাঁকেও দরকার।

শ্যামবাবু আগে ছাত্র দুটিকে পরীক্ষা করতে লাগলেন। গোটাকয়েক প্রশ্ন করে ও উত্তর শুনেই তিনি বললেন, 'আচ্ছা, তোমরা ভরতি হতে পারো।'

ঠিক সেই সময়ে ঘরের বাইরে পরিচিত পায়ের শব্দ শোনা গেল,—শ্যামবাবু একবার অবনীবাবুর মুখের দিকে ফিরে তাকালেন।

নকুড়বাবু ধনুকের মতন দুমড়ে পড়ে ঘরের ভিতরে ঢুকলেন—তাঁর পিছনে রামতারণবাবু।

শ্যামবাবু বিস্মিত কণ্ঠে বললেন, 'এ কী, আজ যে আপনি এত সকাল সকাল?'

নকুড়বাবু মুখ টিপে হাসতে হাসতে বললেন, 'একেলে গ্র্যাজুয়েটরা যখন সকাল সকাল আসতে পারে, তখন আমিই বা পারব না কেন,—আমি তো আর শাহানশা-বাদশা নই!... এ ছোকরা দুটি কে?'

'আজ্ঞে, এরা আমাদের ইস্কুলে ভরতি হতে এসেচে!'

'বটে? ভালো, ভালো!'

'আমি ওদের পরীক্ষা করে দেখেচি, ওরা ভরতি হতে পারে!'

'তা-ই নাকি? আচ্ছা, আমিও যদি দু-একটা প্রশ্ন করি, তাহলে সেটা অনধিকার চর্চা হবে না তো?'

'আজ্ঞে, তার আর কোনো দরকার নেই।'

'কিন্তু আমি মনে করি দরকার আছে!'

শ্যামবাবু যেন অত্যন্ত হতাশভাবেই বলিলেন, 'ওহে হরেন, এদিকে এগিয়ে এসো, ইনি তোমাকে কী জিজ্ঞাসা করবেন শোনো।'

হরেন সংকুচিতভাবে এগিয়ে এল।

নকুড়বাবুর কানে কানে রামতারণবাবু কী বললেন। নকুড়বাবু সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বললেন, 'হ্যাঁ হে শ্যাম, ওই যে আর-এক ছোকরা দাঁড়িয়ে আছে, ওর নাম কী?'

'নিমাইচাঁদ সেন।'

'নিমাই, তুমি এদিকে এসো।'

নিমাই তাঁর আজ্ঞা পালন করল।

নকুড়বাবুর ঠোঁটের উপরে একটা নিষ্ঠুর আনন্দ জেগে উঠল। তিনি ঘাড় নাড়তে নাড়তে বললেন, 'নিমাই, তোমার মুখ এমন গাধার মতো হল কেন? লেখাপড়া কখনো করেছ কি?'

এই বিচিত্র প্রশ্নের কোনো উত্তর না দিয়ে নিমাই ঘাড় হেঁট করে দাঁড়িয়ে রইল।

নকুড়বাবু তাঁর আক্রমণ শুরু করলেন। প্রথমে কয়েকটি সহজ প্রশ্ন, নিমাই অনায়াসে তার উত্তর দিল। প্রশ্ন কঠিন থেকে কঠিনতর, কিন্তু তখনও সঠিক উত্তরের অভাব হল না। নকুড়বাবু কিঞ্চিৎ বিস্মিত হলেন। তিনি ভেবেছিলেন, খুব সহজেই নিমাইচাঁদকে কাত করে ফেলবেন! হঠাৎ তাঁর চোখ পড়ল শ্যামবাবুর দিকে, শ্যামবাবু ঠিক নিমাইচাঁদের পিছনে দাঁড়িয়ে আছেন। হুঁ, নিশ্চয় নিমাইকে উত্তরগুলো বলে দেওয়া হচ্ছে! বোঝা গেছে, রোসো!

নকুড়বাবু বললেন, 'শ্যাম, তুমি ওখানে কেন, নিজের চেয়ারে এসে বোসো, নিমাই তোমার সাহায্য চায় না।'

শ্যামবাবু অত্যন্ত বিরক্ত মুখে, ইচ্ছার বিরুদ্ধেও নিজের আসনে এসে বসে পড়লেন।

বগল থেকে একখানা কেতাব বার করে নকুড়বাবু এবারে শক্ত শক্ত প্রশ্ন করতে লাগলেন, কিন্তু নিমাই আগেকার মতোই অনায়াসে তার জবাব দিতে লাগল!

বিষম ক্রোধ ও আক্রোশে নকুড়বাবুর মুখ রাঙা হয়ে উঠল—কী, সামান্য একটা ফুটবল খেলোয়াড়, গাধার মতন মুখ, এখনও সে কিনা তার এই প্রবল আক্রমণের সামনে অটল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে!

আরও খানিকক্ষণ প্রশ্নোত্তর চলল— তারপর আক্রমণের আর নতুন কোনো অস্ত্র না পেয়ে নকুড়বাবু সজোরে তার হাতের বইখানা মুড়ে ফেলে বললেন, 'বাছা নিমাইচাঁদ, তোমার মুখখানা গাধার মতো হলেও তোমার মাথাটা দেখছি এখনও মানুষের মতোই আছে'—বলেই আর কোনোদিকে না তাকিয়ে তিনি দরজার দিকে অগ্রসর হলেন।

শ্যামবাবু বিনীত কণ্ঠে বললেন, 'হরেনকে প্রশ্ন না করেই আপনি চলে যাচ্ছেন কেন?'

'দরকার নেই' বলে নকুড়বাবু রাগে ফুলতে ফুলতে সে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।

আফিসঘর থেকে বাইরে এসে হাঁপ ছেড়ে বললে, 'নিমাই, আমি বড্ড বেঁচে গেছি। ও প্রশ্নগুলো বুড়ো যদি আমাকে করত তাহলে আমার দফা রফা হয়ে যেত। আমি একটারও জবাব দিতে পারতুম না।'

নিমাই বললে, 'আমার যেন মনে হল, বুড়ো আগে থাকতেই আমার উপরে চটে ছিল। কিন্তু আমাকে বধ করে বুড়োর যে কী লাভ হত, তা ভগবানই জানে।'

হরেন বললে, 'ওঃ, আমার কপাল খুব ভালো তাই আমার দিকে বুড়ো চেয়েও দেখলে না, জবাব দেব কী, তাকে দেখেই আমার বুক গুরগুর করে উঠছিল! অদৃষ্ট আজ আমার প্রতি সুপ্রসন্ন বলতে হবে!'

হরেন ভাবলে অদৃষ্টের জোরেই এ যাত্রা সে বেঁচে গেল, কিন্তু আসলে এ ব্যাপারটায় অদৃষ্টের হাত কিছুই ছিল না। তাই হরেনের কথা শুনতে পেয়ে আমি মনে মনে হাসতে লাগলুম।

ব্যাপারটা হচ্ছে এই। রামতারণ যে তাঁদের পরামর্শ আড়ি পেতে শুনে নকুড়বাবুর কাছে বহন করে নিয়ে যায়, অবনীবাবু এবং শ্যামবাবু এ সত্যটা সম্প্রতি আবিষ্কার করে ফেলেছিলেন! কাঠের দেওয়ালের ওপাশে রামতারণ কান পেতে আছে জেনেই তাঁরা নিমাই আর হরেনের প্রসঙ্গ নিয়ে সেদিন আলোচনা করেছিলেন।

আসলে ফুটবল, হকি, ক্রিকেটের পাকা খেলোয়াড় হচ্ছে হরেন্দ্রনাথই এবং তাকেই স্কুলের দলে টেনে আনবার জন্যে শ্যামবাবুর এতটা আগ্রহ! তার উপর থেকে নকুড়বাবুর দৃষ্টি ফেরাবার জন্যেই হরেনের জায়গায় নিমাইকে এনে দাঁড় করানো হয়েছিল, কারণ লেখাপড়ায় নিমাই ভালো ছেলে, প্রশ্নোত্তরে তাকে ঠকানো যাবে না!

ভারতী, আশ্বিন ১৩৩৩ (শারদ সংখ্যা ১৯২৬)

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%