অন্ধকার

হেমেন্দ্রকুমার রায়

জমিদার ভুবন চৌধুরির পুত্র নগেন সেদিন একটু বেশি রাতে বাড়ি ফিরিল! তাহার মাথার চুল উসকোখুসকো, জামার বোতামগুলো খোলা, পা দুটো টলমল, কাপড়চোপড় এলোমেলো—পিছনের কাছা বেপরোয়ারূপে অগ্রবর্তী হইয়া সামনের কোঁচাকে স্থানান্তরিত করিয়াছে!

বাড়ির সকলে ঘুমাইয়া পড়িয়াছে; জাগিয়া আছে শুধু নূতন ব্রাহ্মণী। গিন্নিমার হুকুম, নগেনকে না খাওয়াইয়া সে যেন ঘুমাইয়া না পড়ে। তাহার নাম রাইমণি, বয়সটি কাঁচা।

নগেন এখানে-ওখানে ঠোক্কর খাইতে খাইতে দালানে আসিয়া, দেয়াল ধরিয়া দাঁড়াইল; কোনোমতে এড়াইয়া এড়াইয়া বলিল, 'খাবার কোথা?'

খাবারের থালা হাতে করিয়া রাইমণি আস্তে আস্তে দালানের ভিতরে ঢুকিল। তাহার মুখে ঘোমটা, ভাবভঙ্গি সংকুচিত।

রাইমণি আসা পর্যন্ত নগেনের পিপাসী চোখ শিকারির দৃষ্টির মতো তাহার পিছনে পিছনে ঘুরিতেছে। কিন্তু রাইমণি এমনি সাবধানি যে, নগেন কিছুতেই তাহার মুখ দেখিতে পায় নাই! তবে, তাহার সুডৌল গড়ন ও নিটোল হাত দুখানি দেখিয়াই সে বেশ বুঝিয়া লইয়াছিল যে, এত সুশ্রী যার দেহ, তার মুখ কখনোই বিশ্রী নহে!

নগেন দাঁড়াইয়া দাঁড়াইয়া দেখিল, রাইমণি জলছড়া দিয়া খাবারের থালাখানি মেঝের উপরে রাখিল; তারপর আসনখানি বিছাইয়া ও জলের গেলাসটি আগাইয়া দিয়া এককোণে সরিয়া দাঁড়াইল।

এমন নিঝুম রাতে রাইমণিকে এতটা কাছে নগেন আর কখনো পায় নাই! তাহার মনে এর আগে একটু যে ইতস্তত ছিল, আজ নেশার রঙ্গে সেটুকুও ঢাকিয়া গিয়াছে।

রাইমণির দিকে বাঁকা-চোখে একবার চাহিয়া, নগেন আসনের উপরে গিয়া বসিয়া পড়িল; অত্যন্ত উত্তেজনায় তাহার নাকের ডগাটা তখন ফুলিয়া ফুলিয়া উঠিতেছে!

খান দুয়েক লুচি খাইয়া নগেন বলিল, 'একটু নুন দিয়ে যাও তো!'

রাইমণি কুণ্ঠিতভাবে নগেনের সামনে আসিয়া, হেঁট হইয়া থালায় নুন দিতে গেল।

নগেন দেখিল, পাতলা কাপড়ের ঘোমটার ভিতর হইতে রাইমণির ডাগর চোখ দুটির আভা ফুটিয়া উঠিতেছে! এবং সেই সঙ্গে মাথা-ঘষা মশলার একটা মিশ্র ও মিষ্ট গন্ধ আসিয়া নগেনের মাতাল প্রাণকে পাগল করিয়া তুলিল,—সে আর আপনাকে সামলাইতে পারিল না—হঠাৎ সুমুখদিকে ঝুঁকিয়া এক টান মারিয়া রাইমণির মুখের ঘোমটা খুলিয়া দিল!

'ওগো মা গো!'—বলিয়া রাইমণি বিদ্যুতাহতের মতো ঘরের মেঝেতে হুমড়ি খাইয়া পড়িয়া গেল।

নগেন বলিল, 'চুপ, চুপ—চেঁচিয়ো না, সবাই শুনতে পাবে!'

ঠিক পাশের ঘরেই থাকিতেন গৃহিণী; সেদিন অসময়ে তাঁহার ঘুম ভাঙিয়া গিয়াছিল। রাইমণির আর্তস্বর তাঁহার কানে ভেজিল। তিনি তাড়াতাড়ি বাহিরে আসিলেন।

দেখিলেন, রাইমণি দু-হাতে মুখ ঢাকিয়া মেঝের ওপরে পড়িয়া আছে আর নগেন ভ্যাবাচ্যাকা খাইয়া থালার সামনে কাঠ হইয়া বসিয়া আছে।

তাঁহার এই গুণধর পুত্রটির স্বভাবচরিত্রের কথা তিনি বেশ ভালোরকমেই জানিতেন, সুতরাং ব্যাপারটা বুঝিতে গৃহিণীর বিলম্ব হইল না। অত্যন্ত বিরক্তির স্বরে তিনি ডাকিলেন, 'নগা!'

নগেন একেবারে কেঁচো! একটিও কথা না বলিয়া সেখান হইতে সে সুড়সুড় করিয়া উঠিয়া গেল।

গৃহিণী, রাইমণির গায়ে হাত দিয়া আস্তে আস্তে ব্যথিতস্বরে বলিলেন, 'ওঠো মা, ওঠো! নগার যে এতটা সাহস হবে, আমি তা জানতুম না। জানলে, তার সামনে কি তোমাকে একলা বেরুতে দিতুম?'

সপ্তাহখানেক পরে একদিন দুপুরবেলায় রাইমণি, গিন্নির মাথার পাকচুল তুলিয়া দিতেছিল। এই ব্রাহ্মণকন্যাটিকে পাইয়া গিন্নি যেন বর্তিয়া গিয়াছেন; রাইমণি তাঁহাকে মায়ের মতো ভক্তি করে, মেয়ের মতো যত্ন করে; রান্নাবান্না ও গেরস্থালির কাজে সে এতটা নিপুণা, যে তাহার হাতে সংসারের সব ভার সঁপিয়া গিন্নি যেন নিশ্চিন্ত হইয়া আছেন।

গিন্নি বলিলেন, 'বামুন-মেয়ে, কাল মা তোমাকে একটু সকাল সকাল উঠতে হবে।'

রাইমণি জিজ্ঞাসা করিল, 'কেন মা?'

'কাল আমাদের গুরুঠাকুর আসবেন। তাঁর জন্যে আলাদা হেঁশেল কেঁড়ে রান্নাবান্না সেরে, তবে আমাদের হাঁড়ি চড়বে। সকাল সকাল উনুনে আগুন না দিলে ওদিকে অনেক বেলা হয়ে যাবে কিনা!'

রাইমণি ঘাড় নাড়িয়া বলিল, 'আচ্ছা।'

খানিক পরে গিন্নি আবার বলিলেন, 'হ্যাঁ মা, রোজই তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করব-করব ভাবি, তা পোড়ামন এমনি বেভুল যে, রোজই কেমন ভুলে যাই।'

রাইমণি বলিল, 'কী কথা মা?'

'শুনেছি, তোমার স্বামী আছেন। কিন্তু এতদিন এখানে রইলে, কই, একখানা চিঠি লিখেও তিনি তো তোমার খোঁজখবর নিলেন না!'

চুল বাছিতে বাছিতে রাইমণি হঠাৎ থামিয়া পড়িল— তাহার সরল হাসি-হাসি মুখখানি চকিতে যেন একটা কালো ছায়ায় অন্ধকার হইয়া গেল।

গিন্নি তাহার মুখ দেখিতে পাইতেছিলেন না; তাই সহজভাবেই আবার বলিলেন, 'চুপ করে রইলে কেন? বলো-না!'

রাইমণি জোর করিয়া কথা কহিল; বলিল, 'জানি না!'

'এখানকার ঠিকানা তোমার স্বামী জানেন তো?'

'না। আমি যে এখানে আছি, তাও তিনি জানেন না।'

গিন্নি অত্যন্ত আশ্চর্য হইয়া বলিলেন, 'সে কী! তোমার স্বামী জানেন না?'

রাইমণি যেন ভাঙিয়া পড়িল; কোনো কথা না বলিয়া চুপ করিয়া সে বসিয়া রহিল।

গিন্নি একটু ভাবিয়া বলিলেন, 'হ্যাঁ বামুন-মেয়ে, স্বামীর সঙ্গে কি ঝগড়া করে তুমি এখানে এসেছ?'

রাইমণি কুণ্ঠিতস্বরে সংক্ষিপ্ত উত্তর দিল, 'না।'

'তবে?'

'তিনি আমাকে নিতে চান না!'

গিন্নি যেন আকাশ থেকে পড়িলেন। বলিলেন, 'অ্যাঁ! তোমাকে নিতে চায় না! তোমার এত রূপ, এত গুণ,—তোমাকে নিতে চায় না, কেমন লোক সে?'

রাইমণি পুতুলের মতো বোবা ও স্থির হইয়া বসিয়া রহিল। গৃহিণী যদি পিছন ফিরিয়া না থাকিতেন, তবে দেখিতে পাইতেন যে, রাইমণির বড়োসড়ো চোখ ধীরে ধীরে জলে ভরিয়া উঠিতেছে!

গিন্নি আবার কী জিজ্ঞাসা করিতে যাইতেছিলেন, হঠাৎ কর্তা আসিয়া ঘরে ঢুকিলেন; তাড়াতাড়ি ঘোমটা টানিয়া, সেখান হইতে গলাইয়া, রাইমণি যেন হাঁপ ছাড়িয়া বাঁচিল।

রাইমণি কিন্তু বুঝিল, এমন লুকোচুরি আর বেশি দিন চলিবে না, তাহার সব কথা একদিন-না-একদিন বাহির হইয়া পড়িবেই!

তার স্বামী? হ্যাঁ, তিনি আছেন বটে, কিন্তু পৃথিবীতে থাকিয়াও তিনি আজ বহু দূরে, বহু দূরে! এ ব্যবধান তাহার নিজের পাপে ঘটে নাই—নিষ্ঠুর নিয়তি আজ তাহার জীবনদেবতাকে জোর করিয়া ছিনাইয়া লইয়া গিয়াছে,—তাহার কাকুতি, তাহার অশ্রু, তাহার বেদনা-ব্যাকুলতা এ চিরবিচ্ছেদকে ঠেকাইয়া রাখিতে পারে নাই! আজ তাহার এ দেহ যেন জীবনহীন যন্ত্রচালিত শবের মতো; এ শব কবে কোন বাঞ্ছিত মুহূর্তে বৈতরণীর খরস্রোতে পড়িয়া পরপারে গিয়া ঠেকিবে—ভগবান জানেন—মনে মনে সে এখন শুধু সেই কামনাই করিতেছে! সে জানে, এমন মরিয়া বাঁচিয়া কোনো লাভ নাই; কিন্তু দুর্ভাগ্যের শেষ সীমায় গিয়াও মানুষ যে মন থেকে আশার ছবি মুছিতে পারে না! নিরাশার মরুভূমির মাঝে পথহারা হইয়াও রাইমণি আজও তাই এই মরণভরা জীবনকে কোনোক্রমে কায়ক্লেশে টানিয়া লইয়া চলিয়াছে!

তাহার স্বামী ছিলেন স্নেহময়, প্রেমময়, সহৃদয়। সে-ও তাহার স্বামীকে ভালোবাসিত সমস্ত জীবন-যৌবন ঢালিয়া। স্বামী বিনা আর কাউকে সে চিনিত না, জানিত না। চরিত্রে সীতা-সাবিত্রীর চেয়ে সে-ও কিছু খাটো ছিল না; কিন্তু যে আমাদের ধর্ম সীতার পায়ে পুষ্পাঞ্জলি দিয়া তাঁহাকে আকাশে তুলিয়াছে, সেই আমাদেরই সমাজ তাঁহাকে আবার পাতালে পাঠাইতে যখন ইতস্তত করে নাই, তখন তুচ্ছ রাইমণির সুখের মেঘে আগুন লাগিবে না কেন?... রাইমণির সজল নেত্রের সম্মুখে সমাজের সিংহদ্বার সশব্দে রুদ্ধ হইয়া গিয়াছে, তাহার বুকফাটা কান্নার এখন দেবতার আসন টলিলেও, সমাজপতির হৃদয় গলিবে না!

রাইমণি কাঁদিতেছে—কাঁদুক; এমন কত রাইমণির নিম্ফল অশ্রু সমাজের পায়ে নিয়ত ঝরঝর ঝরিতেছে, কে তার খবর রাখে?

ভুবন চৌধুরির বাড়িতে আজ সকলেই শশব্যস্ত হইয়া উঠিয়াছে, অনেকদিন পরে গুরুদেব আজ এখানে পায়ের ধুলা দিয়াছেন।

পুরু পশমের আসনে গুরুদেব তাঁহার নধর-নিটোল দেহটি লইয়া রীতিমতো জাঁকিয়া বসিয়াছেন। গুরুর সে গুরুভার হৃষ্টপুষ্ট দেহখানিতে ব্রহ্মচর্যের কোনো লক্ষণ না থাকিলেও তাঁহার বোঁটাওয়ালা বেলের মতো ন্যাড়া মাথায় দিব্য আধ হাত টিকি, তেল-চকচকে কপালে ফোঁটা, খ্যাঁদা নাকে তিলক, গলায় কণ্ঠির মালা, হাতে হরিনামের ঝুলি ও পরনে পট্টবস্ত্র প্রভৃতি গুরুত্বের গুরুতর মালমশলার কিছুমাত্র ত্রুটি নাই।

সকলের আগে বাড়ির কর্তা আসিয়া গুরুদেবের পা ধরিয়া মাটিতে দণ্ডবৎ হইয়া প্রণাম করিলেন। তাঁহার পরে গৃহিণী, পুত্র ও অন্য অন্য আত্মীয়স্বজনের পালা। তারপর, মাথায় একহাত ঘোমটা টানিয়া রাইমণি আসিয়া সলজ্জভাবে প্রণাম করিল।

গুরুদেবের চক্ষু দুটি এতক্ষণ ভাবভরে ঢুলুঢুলু করিতেছিল; পরের প্রণাম লইয়া লইয়া তাঁহার শ্রীচরণকমল দুটি এমনি অসাড় হইয়া গিয়াছিল যে, এতগুলো কৃষ্ণের জীব আসিয়া তাঁহার পা ধরিয়া এত যে টানাটানি করিয়া গেল, সেদিকে তাঁহার কিছুমাত্র চৈতন্য ছিল না; কিন্তু, ঘোমটার ভিতর হইতে রাইমণির মুখ দেখিবামাত্র তাঁহার ঘুমন্ত দৃষ্টি সজাগ হইয়া উঠিল।

তাকিয়া ছাড়িয়া সোজা হইয়া উঠিয়া বসিয়া, কর্তার দিকে চাহিয়া তিনি বলিলেন, 'ভুবন, এ মেয়েটি কে?'

কর্তা বলিলেন, 'এ মেয়েটি আমার বাড়িতে রাঁধে।'

'কই, গেলবারে যখন এসেছিলুম, তখন তো মেয়েটিকে দেখিনি!'

'ও সবে মাস তিনেক এখানে আছে।'

'মাস তি-নে-ক! তবে কি'—বলিতে বলিতে থামিয়া পড়িয়া, গুরুদেব সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে রাইমণির দিকে চাহিলেন।

রাইমণি তখন অত্যন্ত জড়সড় হইয়া আস্তে আস্তে চলিয়া যাইতেছিল—গুরুদেবকে দেখিয়া সে-ও যেন কেমন থতমত খাইয়া গিয়াছিল।

খানিক স্তব্ধ থাকিয়া গুরুদেব আবার জিজ্ঞাসা করিলেন, 'মেয়েটির নাম কী?'

'রাইমণি!'

'রাইমণি! ও কি তড়া-আঁটপুর গাঁ থেকে এসেছে?'

গিন্নি একটু আশ্চর্য হইয়া বলিলেন, 'হ্যাঁ। কিন্তু ঠাকুর, আপনি জানলেন কী করে?'

সে কথার কোনো জবাব না দিয়া, গুরুদেব হতাশভাবে তাকিয়ার উপরে আড় হইয়া পড়িয়া বলিলেন, 'ভুবন, এখানে আর আমার দেবতার ভোগ হতে পারে না— তোমার জাত গিয়েছে!'

গাঁয়ের সমাজপতি ভুবন চৌধুরি,—যিনি কত লোককে একঘরে করিয়া 'পতপত রবে' হিন্দুধর্মের জয়ধ্বজা উড়াইয়াছেন, যাঁহার ভয়ে ছেলেছোকরার দল চোরের মতো আটঘাট না বাঁধিয়া শ্রীশ্রীরামপক্ষীর বিখ্যাত মাংস ভক্ষণ করিতে পারিত না, যাঁহার একটু ইঙ্গিতেই ধোপা-নাপিতের অভাবে অনেক অভাগার কাপড় হইয়াছে কয়লার মতো ময়লা এবং দাড়ি-গোঁফ হইয়াছে যাত্রা-থিয়েটারের মুনিঋষিদের মতো নাভিচুম্বনোদ্যত,—তাঁহারই এত যত্নে বাঁচানো পৈতৃক জাতিটি খামোখা মারা গিয়াছে? গুরুদেব বলেন কী! 'মেঘনাদ-বধ'-এর রাবণ যখন ভগ্নদূতের মুখে 'নিশার স্বপনসম বারতা' শুনিয়াছিলেন, তখন তিনিও বোধ করি আমাদের ভুবন চৌধুরির চেয়ে বেশি আশ্চর্যান্বিত হইবার সুযোগ পান নাই! কর্তা বসিয়া ছিলেন, লাফাইয়া উঠিয়া বলিলেন, 'প্রভু, এ কী নিদারুণ কথা! আমার জাত গিয়েছে? অ্যাঁ! অ্যাঁ!'

'হ্যাঁ, তোমার জাত গিয়েছে! এতে আর কোনো সন্দেহ নেই।'

'রাইমণি কি বামুনের মেয়ে নয়?'

'হ্যাঁ, সে বামুনের মেয়ে।'

ভুবন চৌধুরি ভুরু কুঁচকাইয়া খানিক ভাবিয়া বলিলেন, 'তবে কি ও কুলত্যাগ করেছে?'

'না।'

তা-ই তো! ভুবন চৌধুরি অতিশয় ভয়ংকর সমস্যায় পড়িয়া গেলেন! তিনি জানিলেন না শুনিলেন না—অথচ তাঁহার এত সাধের জাতিটি কোন ফাঁকে স্রেফ কর্পূরের মতো উবিয়া গেল! অনেক ভাবিয়া-চিন্তিয়া শেষটা তিনি হাল ছাড়িয়া হতাশভাবে বলিলেন, 'তবে?'

হরিনামের ঝুলির ভিতরে ঘন ঘন অঙ্গুলিচালনা করিতে করিতে গুরুদেব বলিলেন, 'শোনো বলি। রাইমণির স্বামী আমারই শিষ্য। ওর স্বভাবচরিত্র খুব ভালো—কারো দিকে উঁচু নজরে চাইতে ওকে কেউ দেখেনি। কিন্তু গত জন্মে ও কী পাপ করেছিল জানি না, এ জন্মে তাই বুঝি তারই শাস্তিভোগ করছে। হরি হে, তোমারই কৃপা!'

ভুবন চৌধুরি গুরুদেবের এ গোলকধাঁধার ভিতরে কিছুতেই ঢুকিতে পারিলেন না, শুধু ফ্যালফ্যাল চোখে হাঁ করিয়া বসিয়া রহিলেন।

গুরুদেব আবার বলিলেন, 'মাস চারেক হল, একদিন রাত্রে রাইমণিদের বাড়িতে হঠাৎ ডাকাত পড়ে। ডাকাতরা যাবার সময়ে রাইমণিকেও ধরে নিয়ে যায়। গাঁয়ের লোকেরা তার চিৎকার আর কান্না শুনেও ডাকাতের ভয়ে কোনো উপায়ই করতে পারলে না। পরে পুলিশ এসে রাইমণিকে খুঁজে বার করলে। গ্রামের বাইরে একটা জঙ্গলের ভিতরে সে অজ্ঞান হয়ে পড়ে ছিল।'

সকলে স্তম্ভিতভাবে বসিয়া রহিল, কাহারো মুখ দিয়া বাক্যস্ফূর্তি হল না।

ভুবন চৌধুরির দিকে চাহিয়া গুরুদেব আবার বলিতে লাগিলেন, 'পুলিশ তদারকের পর জনকতক ডাকাত ধরা পড়ল— তাদের কেউ হিন্দু, কেউ মুসলমান। কিন্তু ডাকাত ধরা পড়লে কী হবে—তাদের সংস্পর্শে রাইমণি যে অমূল্য রত্ন হারাল, সে তো আর ফিরে পাবার নয়! স্বামীর পা ধরে সে অনেক কাকুতিমিনতি, অনেক কান্নাকাটি করলে; বললে সে নিষ্পাপ। ভগবান জানেন, সে কথা সত্য কি মিথ্যা! কিন্তু মানুষের মনের সন্দেহ তো চাপা দেওয়া যায় না। এর জন্যে সীতাকেও অগ্নিপরীক্ষা দিতে হয়েছিল। ওর স্বামীও ওকে আর ঘরে ঠাঁই দিতে পারলে না।'

ভুবন চৌধুরি বিহ্বলভাবে গুরুদেবের দুই পা জড়াইয়া ধরিয়া বলিলেন, 'ও মাগি নিজের জাত খুইয়ে কুল মজিয়ে শেষটা কিনা আমাকে মজাতে এল! আমার কী উপায় হবে প্রভু, আমার কী উপায় হবে?'

গুরুদেব বলিলেন, 'ওকে কি তুমি জানতে না?'

'জানলে কি ওকে ঘরে ঠাঁই দিতুম—ধুলোপায়েই বিদেয় করতুম! যত নষ্টের গোড়া নাপতিনি-মাগি, সেই জেনেশুনে ওকে আমার ঘাড়ে গছিয়ে দিয়ে গেছে। ছি, ছি, এ কথা প্রচার হলে সমাজে আর মুখ দেখাব কেমন করে?'

গুরুদেব তাঁহার গ্যাসভরা বেলুনের মতো ফোলা, মোটাসোটা ভুঁড়িটির উপরে হাত বুলাইতে বুলাইতে ঈষৎ হাসিয়া বলিলেন, 'ভয় নেই। এ তোমার অজ্ঞানকৃত পাপ। তবে, প্রায়শ্চিত্ত আবশ্যক। আর রাইমণিকেও এখান থেকে তাড়িয়ে দিতে হবে।'

ঘরের মেঝেতে রাইমণি উপুড় হইয়া পড়িয়া আছে—তাহার দুই গাল দিয়া ঝরঝর অশ্রুর ধারা বহিয়া যাইতেছে।

হঠাৎ কে তার পিঠে হাত দিয়া ঠেলিল; চমকিয়া, মুখ তুলিয়া সে দেখিল, ঠিক তার সামনেই নগেন—সন্ধ্যার তরল আঁধারে তাহার চোখ দুটো গিরগিটির চোখের মতো জ্বলিয়া জ্বলিয়া উঠিতেছে! ভয়ে একটা অস্ফুট আর্তনাদ করিয়া রাইমণি তাড়াতাড়ি উঠিয়া দাঁড়াইল।

নগেন চাপা-গলায় বলিল, 'চেঁচিয়ো না—চেঁচিয়ো না! আমি যা বলতে এসেছি, শোনো।'

ঘোমটায় মুখ ঢাকিয়া, রাইমণি থরথর করিয়া কাঁপিতে লাগিল।

নগেন বলিল, 'দেখো, সমাজে কেউ তোমাকে ঠাঁই দেবে না—যেখানে যাবে সেখান থেকেই তাড়িয়ে দেবে। কিন্তু সমাজ তোমাকে না চাইলেও আমি তোমাকে ফেলতে পারব না। তুমি যদি আমার সঙ্গে যাও, আমি তোমাকে রাজরানির মতো রাখব—তোমার কোনো অভাব থাকবে না। তোমার ধর্ম তো গিয়েছেই, তবে তুমিই-বা কেন ধর্মকে আঁকড়ে ধরে মিছে পরের লাঞ্ছনা সহ্য করবে?'

রাইমণি যেমন ছিল, তেমনি দাঁড়াইয়া রহিল, হ্যাঁ-না কিছুই বলিল না।

নগেন বুঝিল, মৌনই সম্মতির লক্ষণ। সে আস্তে আস্তে বলিল, 'আমি তোমাকে ভালোবাসি রাইমণি! এত ভালোবাসি, যে বলবার নয়। আমি তোমার গোলাম হয়ে থাকব। আজ শেষরাতে খিড়কির দরজায় আমি তোমার জন্যে অপেক্ষা করব,—তোমাকে অন্য জায়গায় নিয়ে যাবার জন্যে। তুমি কিছু ভেবো না, তুমি যা চাইবে তা-ই পাবে—বাড়িঘর, কাপড়-গয়না, দাসী-বাঁদি! জানো তো টাকা আমার হাতের ধুলো।'

হঠাৎ বাহিরে কাহার পদশব্দ হইল। নগেন ব্যস্তভাবে বলিল, 'ওই কে আসছে—আমি চললুম। মনে রেখো—শেষরাতে খিড়কির দরজায়।'—বলিয়াই, সে তাড়াতাড়ি চলিয়া গেল।

দুই হাতে মুখ ঢাকিয়া রাইমণি সেখানে বিবশ হইয়া বসিয়া পড়িল। ঘরের অন্ধকার ক্রমেই গাঢ় হইয়া উঠিতে লাগিল... সেদিন সে ঘরে সন্ধ্যাপ্রদীপ আর জ্বলিল না।

নিঝুম রাত্রি। আকাশ জুড়িয়া দুধের ধারার মতো জ্যোৎস্নার রূপের ঢেউ চলকাইয়া উঠিয়াছে, ভাঙা মেঘের ধারে ধারে চাঁদের হাসি আলোক-পদ্মের পাপড়ির মতো ছড়াইয়া পড়িয়াছে।

চৌধুরি-বাড়ির দরজা খুলিয়া এই নীরব নিশীথে এক রমণী বাহিরে আসিয়া দাঁড়াইল। তারপর কোনোদিকে না চাহিয়া ধীরে ধীরে একাকিনী চলিতে লাগিল।

ঘুমের কোলে শুইয়া গ্রামখানি নিসাড় হইয়া আছে। তাহারই মাঝখান দিয়া নানা পদচিহ্ন-লেখা আঁকাবাঁকা পথের রেখাটি স্বপ্নের ছবির মতো চলিয়া গিয়াছে,— কখনো আলোকে জাগিয়া, কখনো ছায়ায় মিলাইয়া।

রমণী সেই পথ ধরিয়া চলিল— চন্দ্রালোকে সেই শুভ্রবসনা রহস্যময়ী মূর্তি দেখিয়া গেঁয়ো কুকুরগুলো ভয় পাইয়া পথ ছাড়িয়া পলাইয়া গেল।

মাঠের ধারে পথের শেষ।— রমণী কিন্তু থামিল না, সেই ধু ধু মাঠের ভিতর দিয়াই সে স্বপ্নাবিষ্ট অন্ধের মতো সমান অগ্রসর হইতে লাগিল;— দূরে জলাভূমিতে ভৌতিক ব্যাপারের মতো আলেয়া নাচিয়া বেড়াইতেছে; আরও দূরে শ্মশানের চিতার মতো কী একটা আগুন দাউদাউ জ্বলিতেছে;— তার কিন্তু কোনোদিকেই ভ্রূক্ষেপ নাই, সে যেন মরণকে একটুও ডরায় না!

চাঁদ যখন পাণ্ডুমুখে পশ্চিমে নামিতেছে, মাঠ তখন শেষ হইল। সামনেই গভীর অরণ্য, তার মধ্যে পথ নাই আলো নাই শব্দ নাই; শুধু কষ্টিপাথরের চেয়েও কালো, একটা বিরাট নিস্পন্দ জমাট অন্ধকার, এক অনন্তদেহ পিশাচের মতো বিশ্বকে গিলিয়া ফেলিবার জন্য যেন হাঁ করিয়া ওত পাতিয়া বসিয়া আছে!

হঠাৎ কোন দূর কুঞ্জবনে পাপিয়ার ঘুম ভাঙিয়া গেল। চারিদিকের থমথমে স্তব্ধতার মধ্যে পাপিয়ার আকস্মিক গান শুনিয়া রমণীও থমকিয়া দাঁড়াইয়া পড়িল, এত বড়ো দীর্ঘ পথে এই প্রথম সে পিছন ফিরিয়া চাহিয়া দেখিল, চাঁদের অন্তিম হাসি প্রান্তরের শ্যামলতার উপরে তখনও মূর্ছিত হইয়া পড়িয়া আছে... বিদায়ের মলিন হাসি!...

রমণীর বুক ঠেলিয়া একটি চাপা নিশ্বাস উঠিল—সে যেন চুপে চুপে অস্ফুট হাহাকার!...

তারপর, সেই চাঁদের আলো, পাপিয়ার গান পিছনে রাখিয়া, রমণী সুমুখপানে অগ্রসর হইল;—চারিদিক আচ্ছন্ন করিয়া বিপুল অন্ধকার তাহার দিকে আগাইয়া আসিতে লাগিল, ধীরে ধীরে, ক্রমে ক্রমে... মৃত্যুর মতো!

ভারতী, কার্তিক ১৩২৪ (অক্টোবর ১৯১৭)

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%