হেমেন্দ্রকুমার রায়
রূপকথার গুহা।
গৌরীশৃঙ্গ। রোদ-মাখা ভোরবেলা। চারিদিকে অকলঙ্ক তুষারের শুভ্র আবরণ। আকাশ দিয়ে পেঁজা তুলোর মতো তুষার ঝরচে—বাতাসে তুষারের কণা উড়চে।
থমথমে গভীর শুদ্ধতা, এত স্পষ্ট যে, হাত দিয়ে যেন স্পর্শ করা যায়!
একটি গুহা। ভিতরে কেবলমাত্র একটি পাখি চুপি চুপি নিসাড় গলায় গান গাইচে—সুদূর কাননভূমির শ্যামল গান! গুহার ফাটলে ফাটলে দু-চারটি সবুজ তৃণ, ভয়ে-থরোথরো মাথা বার করে একমনে সেই গান শুনচে। তৃণগুলির গায়ে গায়ে গুটিকয় ছোটো ছোটো রঙিন ফুল,—গানের সুরের দীর্ঘশ্বাসে তারা কেঁপে কেঁপে উঠচে।
গুহার ভিতরে আলো-আঁধারের আবছায়া। নীচের উপত্যকা থেকে পেড়ে-আনা কচি ফুল-পাতার বিছানা পেতে, গুহার একধারে রূপকথা শুয়ে আছে—ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপন দেখে রাঙা ঠোঁট দুখানি ফাঁক করে সে হাসচে। গোলাপি মুখখানির আশপাশে ভ্রমররা ঘুম-ভাঙানো গুঞ্জনধ্বনি করচে—তারা এসেচে মানস সরোবরের কমলরেণু গায়ে মেখে। রূপকথার নিশ্বাসে মলয়-হাওয়ার সুগন্ধ, অল্প-খোলা চোখ দুটিতে জ্যোৎস্নার আভাস, পরনে বাসন্তী রঙে ছোপানো, সুতায় বোনা একখানি হালকা-মিহি কাপড়। নধর-নিটোল ডান হাতখানি একটি কুসুমলতার মতন বুকের উপরে এলিয়ে আছে, শিথিল মুষ্টিতে একগুচ্ছ পদ্মকলি।
গুহার বাইরে নীরবতার স্তব্ধ একতান আচম্বিতে শিউরে উঠল! নীরবতা যেন নীরবে সভয়ে বলে উঠল, ও কে গো, ও কে গো, ও কে?
রূপকথার ঘুম ভেঙে গেল। ধড়মড়িয়ে উঠে বসে, অবাক হয়ে সে গুহার দরজার দিকে খানিকক্ষণ অপলক চোখে তাকিয়ে রইল।
কিছুই বুঝতে না পেরে বললে, কেন আমার ঘুম ভাঙল?... এ কী! আমার শ্যামা পাখির গান থেমেচে, তৃণ-ফুল সব বেরঙা হয়ে ঝরে পড়েচে, কমলকলি শুকিয়ে গেচে!... কেন এমন হল? অসময়ে কেন আমার সোনার স্বপন মিলিয়ে গেল?
গুহার দরজার উপরে সূর্যালোকের খানিকটা কালো করে কার ছায়া এসে পড়ল!
রূপকথা তাড়াতাড়ি আপনার ধবধবে আদুড় বুকখানির উপরে আঁচল টেনে দিলে। ভয়ে ভয়ে বিবর্ণ মুখখানি এগিয়ে নিয়ে গিয়ে বাইরে একবার উঁকি মেরে দেখলে, তারপর অস্ফুট আর্তনাদে বলে উঠল, মানুষ!
সে-ও রূপকথাকে দেখতে পেয়েছিল। দরজার কাছে এসে বিস্ময়ে নির্বাক হয়ে সে রূপকথার মুখের পানে তাকিয়ে রইল।
রূপকথা আমায় ঘোমটা টেনে বললে, কে তুমি?
—মানুষ।
—কোথায় থাকো?
—তিব্বতে।
—এখানে কেন?
—সায়েবদের সঙ্গে এসেচি।
—সায়েব! সায়েব কী?
—সায়েব জানো না? তারা যে পৃথিবীর রাজা!
—ও! যারা কলের গাড়ি চালায়, বিজলিকে বেঁধে রাখে, সমুদ্রকে শাসন করে?
—হ্যাঁ, হ্যাঁ,—তারাই!
—তারা এখানে এসেচে!
—হ্যাঁ, ওই যে তাদের গলার আওয়াজ পাচ্চি!
—অ্যাঁ। এত কাছে এসেচে! এই শিবের রাজত্বেও শাস্তি নেই! কেন, কেন তারা এখানে এসেচে?
—গৌরীশৃঙ্গ দখল করবে বলে!
রূপকথা কেঁদে উঠল। গুহার দরজা বন্ধ করে দিলে।
রাজপুত্রের গুহা।
রাজপুত্র, মন্ত্রীপুত্র ও কোটালপুত্র বসে বসে গল্প করচে।
রাজপুত্র : উঃ, কী শীত!
মন্ত্রী : আংরাটা গেল কোথায়?
কোটালপুত্র : তাতে আগুন নেই।
রাজপুত্র : সওদাগরের ছেলে নীচের উপত্যকায় কাঠ আনতে গেছে। এলে বাঁচি, আগুন পুইয়ে স্যাঁতা বুকটা তাতিয়ে নি।
মন্ত্রী : আমরা আর কতদিন এখানে থাকব? ক্রমেই যে বুড়ো হয়ে পড়চি!
কোটালপুত্র : রূপকথা না বললে তো আমরা আর যেতে পারি না।
রাজপুত্র : রূপকথা তো দিনরাত ঘুম নিয়েই অজ্ঞান হয়ে আছেন!
মন্ত্রী : আমি কিন্তু আর পারচি না— পৃথিবীর জন্যে আমার মন কেমন করচে।
কোটালপুত্র : বসে থেকে থেকে আমার গেঁটে বাত হয়েচে। পৃথিবীতে গেলে রাজবৈদ্যের কাছ থেকে আগেই একটা অব্যর্থ বাত-বিনাশক তৈল কিনতে হবে।
রাজপুত্র একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললে। তারপর বললে, আমার তরোয়ালে মরচে ধরে গেছে। অমৃতকুণ্ডের ধারে সেই যে রাক্ষসী বধ করেছিলুম, সে আজ কত দিনের কথা!
মন্ত্রী : তোমার ঘুমপুরীর রাজকন্যার ঘুম ভাঙাবার লোক আজ আর নেই, সোনার কাটির সন্ধান তুমি ছাড়া তো আর কেউ জানে না!
রাজপুত্র : রাজকন্যা এখনও ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপনে আমাকে দেখে কি? এতদিন পরে গিয়ে সোনার কাটি ছুঁইয়ে তার ঘুম যদি ভাঙাই, তাহলে সে হয়তো আর আমাকে চিনতেই পারবে না!
কোটালপুত্র : আমরা চার বন্ধুতে মিলে কত দেশেই যেতুম। অন্ধকারের নদীর ধারে, সেই তেপান্তরের মাঠের পারে, বনের গাছটিতে ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমি বাসা বেঁধে থাকত, তারা আমাদের দেশ-বিদেশের পথ বলে দিত। আহা, কী দিনই গেছে হে!
রাজপুত্র : বনের ভেতরে চাঁদ যেদিন রংমশাল জ্বালত, তখন সাত ভাই চাঁপা তাদের ফুটফুটে মুখগুলি বার করে পারুল বোনকে গান গাইতে বলত। পারুল বোনের গান শুনে সাতটি চাঁপা তালে তালে দুলতে থাকত, আর জোছনার মুখে হাসি যেন ধরত না!
মন্ত্রী : তারপর সেই সোনার শ্রীফল, কাঠের ঘোড়া, সোনার চাঁপা, পাথর-পাখি, মানিকজোড় পায়রা—কতদিনই যে এসব চোখে দেখিনি!
কোটালপুত্র : রাজপুত্র, তোমার সুয়োরানি-দুয়োরানি মায়েরা এখন না জানি কী করচেন!
রাজপুত্র : তাঁরা কি আর বেঁচে আছেন!
কোটালপুত্র : মন্ত্রীপুত্র, তোমার বেলবতী কন্যাকে কি আর মনে পড়ে?
মন্ত্রী : (করুণস্বরে) হায় রে, তা আর মনে পড়ে না! দিঘির ধারে অপ্সরিকে পুঁতে রেখে, কত কষ্টেই যে তাকে উদ্ধার করে এনেছিলুম।
কোটালপুত্র : সেসব দিনের কথা ভেবে আমার কান্না আসচে!
রাজপুত্র : ইচ্ছে হচ্চে, যাই আবার পক্ষীরাজ ঘোড়া ছুটিয়ে, তেপান্তরের মাঠ পেরিয়ে নিজের রাজ্যে ফিরে! কিন্তু প্রজারা হয়তো আর আমাকে চিনতেই পারবে না!
মন্ত্রী : কেন চিনতে পারবে না? সেদিন মানস সরোবরের ধারে রূপকথার জন্যে পদ্ম ফুল আনতে গিয়েছিলুম। মহাদেবের নন্দির সঙ্গে হঠাৎ দেখা! সে পৃথিবীতে শিবরাত্রির মচ্ছব সেরে ফিরে আসছিল। তার মুখে শুনলুম, পৃথিবীতে ঠাকুমারা এখনও নাকি আমাদের ভোলেননি। তুলসীতলায় সন্ধ্যাপ্রদীপ দিয়ে, এখনও রোজ তাঁরা হরিনামের মালা ঘোরাতে ঘোরাতে আমাদেরই নাম করেন।
রাজপুত্র : আর যুবারা?
মন্ত্রী : যুবারা? তারাই নাকি আমাদের শত্রু। তারা সব বড়ো বড়ো শহরে থাকে, চোখে চশমা দিয়ে দিনরাত বড়ো বড়ো পুঁথি পড়ে আর খালি বড়ো বড়ো বুলি কাটে আর তর্ক করে। আমাদের কখনো চোখেও দেখেনি, আমরা যে বেঁচে আছি— তাও তারা মানতে চায় না। তারা কেবল কলকবজা নিয়ে মেতে আছে, সারাজীবন ষোড়শোপচারে যন্ত্র-রাক্ষসের পুজো দিচ্ছে। তাদের প্রাণ শুকনো যেন পাথর, নিংড়োলেও একফোঁটা রস বেরোয় না। কবিতা আর রূপকথার নাম শুনলেই তারা মারমুখো হয়ে তেড়ে আসে।
রাজপুত্র : তবেই তো!
কোটালপুত্র : ওদের ভয়েই তো আজ আমরা দেশছাড়া।
রাজপুত্র : ভয়? কীসের ভয়? আমরা কি কাপুরুষ? এই হাতে আমি কত দৈত্যদানব বধ করেচি, তা কি তোমাদের মনে নেই? সামান্য মানুষকে আমরা ভয় করব? চলো, আজই আমরা পৃথিবীতে ফিরে যাই। তাদের ভালো করে জানিয়ে দিই গে— আমরা আছি, আমরা জেগে আছি, আমরা জ্যান্ত আছি!
কোটালপুত্র : কিন্তু রূপকথার ঘুম এখনও ভাঙেনি যে!
রাজপুত্র : কবে তাঁর ঘুম ভাঙবে?
মন্ত্রী : যতদিন না পৃথিবীর যন্ত্র-রাক্ষসকে কেউ বধ করে।
রাজপুত্র : চলো, আমরাই গিয়ে তার গলা টিপে দিয়ে আসি।
মন্ত্রী : উঁহু, অস্ত্রে সে মরবে না। আগে তার প্রাণপাখিকে খুঁজে বার করতে হবে।
রাজপুত্র : আমরাই তা খুঁজে বার করব।
কোটালপুত্র : কিন্তু রূপকথা না বললে আমরা তো যেতে পারব না।
রাজপুত্র দমে গিয়ে চুপ করলে।
কোটালপুত্র : উঃ, কী কনকনে হাওয়া!
মন্ত্রীপুত্র : সওদাগরের ছেলে এখনও ফিরল না তো! কাঠ আনতে বুড়ো হয়ে গেল যে!
তিনজনে বসে বসে শীতের বাতাসে কাঁপতে লাগল।... হঠাৎ তিনজনেই একসঙ্গে চমকে উঠল।
রাজপুত্র : ও কী ও!
মন্ত্রীপুত্র : কিছুই বুঝবি না তো!
কোটালপুত্র : চলো, চলো,— বাইরে গিয়ে দেখে আসি!
যন্ত্র-রাক্ষসের আক্রমণ
হিমালয়ের একটি উচ্চশিখর। সূর্যকরোজ্জ্বল তুষার-শয়নের উপরে মেঘের পরদা দুলচে।
চারদিকের নীরবতার মাঝে একটা অশ্রান্ত, নিষ্ঠুর শব্দ শোনা যাচ্ছে—যেন কোনো অশরীরী দানবের গভীর গর্জন।
রাজপুত্র, মন্ত্রীপুত্র ও কোটালপুত্র আকাশের দিকে বিস্মিত চোখ তুলে দাঁড়িয়ে আছে।
রাজপুত্র : শুনচ?
মন্ত্রীপুত্র : হুঁ। স্তব্ধতার বুক যেন চিরে যাচ্চে।
কোটালপুত্র : কীসের শব্দ ও?
রাজপুত্র : কে জানে! শব্দটা কিন্তু ক্রমেই কাছে এগিয়ে আসচে।
মন্ত্রীপুত্র : এমন শব্দ তো কখনো শুনিনি!
কোটালপুত্র : বাপ রে বাপ, রাক্ষসদের চিৎকারের চেয়েও এ শব্দ ভয়ানক।
রাজপুত্র : এ কি বৃদ্ধ হিমালয়ের কান্না?
মন্ত্রীপুত্র : বোধহয় নরকের প্রেতাত্মাদের আর্তনাদ!
কোটালপুত্র : কৈলাসের শ্মশানে বুড়ি ডাকিনী হাড়ের মাদল বাজাচ্চে না তো?
সবাই আবার চুপ করে শুনতে লাগল।
রাজপুত্র : শব্দটা খুব কাছে এসেচে।
মন্ত্রীপুত্র : হ্যাঁ, সামনের ওই শিখরটার পিছনে।
কোটালপুত্র : আমার বুকটা কেমন ছমছম করে উঠচে!
রাজপুত্র : শব্দটা যেন কাকে খাই, কাকে খাই করচে।
মন্ত্রীপুত্র : ও শিবের ধ্যান ভেঙে দেবে।
কোটালপুত্র : চলো ভাই, গুহার ভেতরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিই গে।
রাজপুত্র : ও আবার কে? ঝড়ের মতন ছুটে আসচে?
মন্ত্রীপুত্র : হ্যাঁ— এইদিকেই।
কোটালপুত্র : ওকে চিনতে পারচ না? ও যে সওদাগরের ছেলে!
রাজপুত্র : ওর মাথার তাজ কোথায় গেল?
মন্ত্রীপুত্র : গায়ের উত্তরীয় কোথায় ফেলে এল!
কোটালপুত্র : নিশ্চয় কোনো বিপদ হয়েচে!
রাজপুত্র : শব্দটা কি ওরই পিছনে তাড়া করেচে?
মন্ত্রীপুত্র : তা-ই হবে!
কোটালপুত্র : আমার গা ঠকঠক করে কাঁপচে। সবাই গুহার ভেতরে চলো।
রাজপুত্র : সওদাগরের ছেলের মুখ দেখেচ!
মন্ত্রীপুত্র : মড়ার মতো সাদা।
কোটালপুত্র : গুহার ভেতরে চলো!
সওদাগরপুত্র ছুটে কাছে এসে পড়ল। হাঁপাতে হাঁপাতে বার বার পিছনে তাকিয়ে দেখতে লাগল।
রাজপুত্র : বন্ধু, বন্ধু, কী হয়েচে বলো!
সওদাগরপুত্র : ভয়ানক বিপদ!
রাজপুত্র, মন্ত্রীপুত্র, কোটালপুত্র (একসঙ্গে) : বিপদ!
সওদাগরপুত্র : সাংঘাতিক বিপদ! তোমাদের সাবধান করতে ছুটে আসচি।
কোটালপুত্র : ভূতপ্রেতরা বিদ্রোহী হয়েচে নাকি?
রাজপুত্র : হিমালয়ের তুষার-মুকুট খসে পড়েচে?
মন্ত্রীপুত্র : শিবের ষাঁড় কি চুরি করে সিদ্ধি খেয়ে খেপে গিয়েচে? তোমার পিছনে তাড়া করেচে?
সওদাগরপুত্র : না, না,— ওসব বিপদ নয়!
রাজপুত্র : তবে?
সওদাগরপুত্র : মানুষ।
রাজপুত্র : কোথায়?
সওদাগরপুত্র : মানস সরোবরের পথে।
রাজপুত্র : মানস সরোবরের পথে মানুষ? অসম্ভব।
সওদাগরপুত্র : আমি নিজের চোখে দেখে আসচি। এক-আধজন নয়—দলে দলে, অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে।
রাজপুত্র : অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে? কী উদ্দেশ্যে?
সওদাগরপুত্র : জানি না। তাদের সঙ্গে আছে যন্ত্র-রাক্ষস।
রাজপুত্র : যন্ত্র-রাক্ষস! মানুষরা যার গোলাম? যার জন্যে আজ আমরা দেশছাড়া? যার ভয়ে পৃথিবী থেকে রূপকথা পালিয়ে এসেচেন?
মন্ত্রীপুত্র : সর্বনাশ!
কোটালপুত্র : যন্ত্র-রাক্ষস কি এখানেও আমাদের আক্রমণ করতে এসেচে?
রাজপুত্র : কিন্তু আকাশে ও কীসের শব্দ, বলতে পারো?
সওদাগরপুত্র : যন্ত্র-রাক্ষসের গর্জন!
কোটালপুত্র : ওরে বাস রে, যার গর্জন এমন ভয়ানক— না-জানি তার চেহারা কী বিকট! আমার তো ভাবতেই মূর্ছার উপক্রম হচ্চে!
রাজপুত্র : আচ্ছা, আসুক সে,— আজ এসপার কি ওসপার! কতদিন আর অলসের মতন নির্বাচনে থাকব? আজ আমি যন্ত্র-রাক্ষসকে বধ করব।—এই বলেই রাজপুত্র খাপ থেকে তরোয়াল খুললে।
সওদাগরপুত্র : কিন্তু যন্ত্র-রাক্ষস বড়ো যে-সে রাক্ষস নয়। মানুষকে পিঠে করে সে আকাশে ওড়ে।
রাজপুত্র : উড়ুক। আমারও পক্ষীরাজ ঘোড়া আছে।
সওদাগরপুত্র : কিন্তু তোমার কাছে বাজ নেই। মানুষরা দেবরাজ ইন্দ্রের বাজ কেড়ে এনেচে। তুমি পারবে কেন?
হঠাৎ দূরে বন্দুকের শব্দ হল।
সওদাগরপুত্র : ওই শোনো।
রাজপুত্র : ও আবার কীসের শব্দ?
সওদাগরপুত্র : মানুষ তার বাজ ছুড়চে।
মন্ত্রীপুত্র : দেখো, দেখো,— আকাশে কী ওটা?
কোটালপুত্র : ও বাবা, ওর নাক দিয়ে যে হুস হুস করে ধোঁয়া বেরুচ্চে!
সওদাগরপুত্র : যন্ত্র-রাক্ষস!
আকাশে একখানা উড়োজাহাজ ঘুরতে ঘুরতে এগিয়ে আসচে। সকলে শ্বাস বন্ধ করে দেখতে লাগল।
রাজপুত্র : ও কার কান্না?
সওদাগরপুত্র : তা-ই তো, এ যে রূপকথার গলা!
কোটালপুত্র : রূপকথার ঘুম ভাঙল কী করে?
সওদাগরপুত্র : বোধহয় যন্ত্র-রাক্ষসের গর্জনে।
রূপকথা কাঁদতে কাঁদতে আলুথালু বেশে ছুটে এল। যেখানে তার পা পড়চে, সেইখানেই তুষারের উপরে এক-একটি টুকটুকে পদ্ম ফুটে উঠচে—যেন শুচিশুভ্র তুষারপটে তরুণী উষার বিকশিত রাঙা-বাসনার রেখা!
রূপকথা : বাছা, এখানেও মানুষের বিদ্রোহ মাথা তুলেচে— ত্রিভুবনে আমার কি কোথাও একটু ঠাঁই নেই!
রাজপুত্র : তোমার কোনো ভয় নেই মা, আমরা তোমাকে রক্ষা করব!
রূপকথা : পালিয়ে আয় বাছারা, পালিয়ে আয়,— ওই যন্ত্র-রাক্ষসের মুখে পড়লে তোরা কি আর বাঁচবি?
রাজপুত্র : কাপুরুষের মতো পালিয়ে যাব! মা, তুমি কী বলচ!
রূপকথা : যা বলচি, শোন, এ তোর মায়ের হুকুম!
কৈলাস।
আকাশগঙ্গা ঝরে পড়চে হিমারণ্যের তুষার-তাজের উপরে—দুধের মতো ধবল তার ধারা।
বিশাল পুরী। সিংহদ্বারের বাইরে একপাশে দুই থাবার উপরে মুখ রেখে দুর্গার সিঙ্গি শুয়ে শুয়ে ঝিমুচ্চে, আর-একপাশে শিবের ষাঁড় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ল্যাজ নেড়ে গায়ের উপর থেকে মাছি তাড়াচ্চে।
সিংহদ্বারের ভিতরে, আঙিনার এককোণে বসে ভূতের দলের মাঝখানে নন্দি আর ভৃঙ্গির আড্ডা খুব জমে উঠেচে।
মণি-মন্দিরের দরদালানে শিবের আসর। একখানা বাঘছালের উপরে শিব বসে আছেন। সামনেই মড়ার মাথার খুলিতে ফলমূল সাজানো।
আর একপাশে পার্বতী বসে বসে শিবের খাওয়ার তদারক করছেন। জয়া-বিজয়া তাঁর চুল আঁচড়ে দিচ্ছে।
পার্বতী : হ্যাঁ গা, এতকাল ধরে পৃথিবীর শহরে শহরে আনাগোনা করলে, তবু এই বদ অভ্যাসটা ছাড়তে পারচ না?
শিব : বদ অভ্যাস আবার কী দেখলে?
পার্বতী : এই, মড়ার মাথার খুলিতে খাওয়া?
শিব : তুমিও কি আমাকে কার্তিকের মতন একেলে হতে বলো? ওসব পুরোনো অভ্যাস আমি ছাড়তে পারব না। পছন্দ না হয়, আমাকে 'ওল্ড ফুল' বলে 'ডিভোর্স' করতে পারো।
পার্বতী : তোমার সঙ্গে কথা কওয়াও ঝকমারি দেখচি। একটুতেই মেজাজ একেবারে তেরিয়া! গাঁজাখোরের স্বভাব, যাবে কোথায়!
শিব সে কথার কোনো জবাব না দিয়ে, সিদ্ধির বাটির দিকে হাত বাড়ালেন। আসন্ন নেশার স্ফূর্তিতে চোখ দুটি তাঁর ঢুলঢুলে হয়ে এল। কিন্তু বাটিটা মুখের কাছে ধরেই দেখলেন, তাতে সিদ্ধি বড়ো কম রয়েছে! অমনি চেঁচিয়ে হাঁক দিলেন, নন্দি!
নন্দি আজ্ঞে বলে কাছে এসে দাঁড়াল।
শিব : সিদ্ধি আজ এত কম কেন? ক-আনা পয়সা চুরি করেচিস?
নন্দি : আজ্ঞে, আজ তো আমি বাজার করতে যাইনি!
শিব : তবে কে বাজারে গিয়েছিল শুনি?
নন্দি : আজ্ঞে, ব্রেহ্মদত্যি।
শিব : হুঁ, ব্যাটা পাকা ছিঁচকে চোর। ব্রহ্মদত্যিকে এখনই বেল গাছ থেকে কান ধরে নামিয়ে, দূর করে তাড়িয়ে দে।
নন্দি : যে আজ্ঞে।
শিব : আর শোন। বেশ করে এক ছিলিম গাঁজা সেজে দিয়ে যা দেখি!
নন্দি : আজ্ঞে, আজ তো বাজার থেকে গাঁজা আসেনি!
শিব : কী! একে সিদ্ধি কম, তার গাঁজা নেই! ভৃঙ্গি, নন্দিকে এখনই ধরে খড়মপেটা করে দে তো!
নন্দি : আজ্ঞে, আমার দোষ কী, বাজারে দোকানিরা যে আজ 'হরতাল' করেচে—সব দোকান বন্ধ।
শিব : রোজ রোজ 'হরতাল!' দোকানিরা ভারী চালাকি পেয়েচে দেখচি। আচ্ছা শোন। এবারে অন্নপূর্ণাপুজোর সময়ে তুই পৃথিবীতে গিয়ে, ছদ্মবেশে একটা কৃষি বিদ্যালয়ে ভরতি হবি। তারপর শিবরাত্রির সময়ে আমি গিয়ে তোকে সঙ্গে করে নিয়ে আসব। কিন্তু এর মধ্যে তোকে সিদ্ধি আর গাঁজার চাষ শিখে নিতে হবে। এবারে আমি কৈলাসপুরীর বাগানেই সিদ্ধি আর গাঁজার চাষ করাব। হরতালের মজাটা টের পাইয়ে দিচ্চি, বোস-না! কেমন, পারবি তো?
নন্দি : আজ্ঞে, তা আর পারব না!
এমন সময়ে শুঁড় নাড়তে নাড়তে ও ভুঁড়ি দোলাতে দোলাতে গণেশ এসে গরম হয়ে ডাকলে, বাবা।
শিব : এসো বাপধন, এসো, তোমার আবার কী আরজি?
গণেশ : ভালো চাও তো তোমার সাপকে সাবধানে রাখো, নইলে এবারে আমি ওর দফারফা করে দেব— তা কিন্তু আগে থাকতেই বলে দিচ্চি—হ্যাঁ।
শিব : আরে গেল, আমার সাপ আবার কী করলে তোর?
গণেশ : তোমার সাপ আমার ইঁদুরকে ধরে, আজ আর একটু হলেই পেটে পুরে ফেলত।
শিব : আপদ যেত। তোর ইঁদুর রোজ আমার বাঘছাল কেটে দিয়ে যায়।
গণেশ : আচ্ছা, আমার কথায় কান না দাও, মজাটা দেখতেই পাবে। কাল থেকে আমি একটা বেজি পুষব।— গণেশ মুখ ভার করে শুঁড় তুলে চলে গেল।
শিব : গিন্নির আদরে গণেশ-ছোঁড়ার বড়ো বাড় হয়েছে! একালের ছোঁড়াগুলো হল কী! বাপের মুখের ওপরে লম্বা লম্বা কথা!
এমন সময়ে পাশের ঘর থেকে হারমোনিয়াম বাজিয়ে কার্তিক গান ধরলে—
'যে যাহারে ভালোবাসে, সে তাহারে পায় না কেন?'
শিব চেঁচিয়ে বললেন, কেতো, কেতো! থাম ইস্টুপিড, গেরস্ত বাড়িতে বসে বাপের কানের কাছে এইসব ছাই গান! একেবারে গোল্লার দোরে গিয়েচ?
গান থেমে গেল।
শিব : নাঃ, এমন সব ছেলেপুলে নিয়ে আমার আর বাঁচতে সাধ নেই। কী বলব, আমি যে অমর— নইলে এখনই গলায় দড়ি দিতুম। নন্দি, শিগগির সোমরস নিয়ে আয় তো বাবা!
পার্বতী : আবার ওসব ঢলাঢলি কেন? বুড়ো হলে, লজ্জা করে না!
শিব: তুমি থামো গিন্নি, কানের কাছে মিছে ফ্যাচ ফ্যাচ কোরো না!
নন্দি ফিরে এসে বললে, সোমরস নেই!
শিব তিন চোখের তিন ভুরু কুঁচকে বললেন, সোমরস নেই কীরকম? সবে কাল আনা হয়েছে যে!
নন্দি : আজ্ঞে, সোমরসের পাত্রটা দেখলুম, কার্তিকদাদার টেবিলের ওপরে উপুড় হয়ে আছে।
শিব : হুঁ, বুঝেচি—এ কেতোর কীর্তি! গিন্নি, এর জন্যেও তুমিই দায়ী!
পার্বতী : তা তো বলবেই গো—ছাই ফেলতে ভাঙা কুলো আছি আমি,— যত পারো বলে নাও!
শিব : বলব না তো কী? তোমাকে না ফি-বছরে বারণ করি, কেতোকে নিয়ে বাপের বাড়ি যেতে? কলকাতায় গিয়ে যত কুসংসর্গে মিশে, ছোঁড়ার চরিত্র একেবারে বিগড়ে গেছে! তুমি যদি ওকে ফি-বছর সোহাগ করে সঙ্গে না নিতে, তাহলে আজ ওকে কে চিনত?
পার্বতী : সঙ্গে করে নিয়ে যাই, বেশ করি। আমার বাপের বাড়ির দোষ কী? কার্তিক যেমন দেখচে তেমনি শিখচে— তোমারই ছেলে তো, বংশাবলির ধারা বজায় রাখবে না?
শিব : তোমার লেকচার থামাও গিন্নি! এ কলকাতা শহর নয়— এ কৈলাসধাম, এখানে স্ত্রী-স্বাধীনতা একেবারেই আউট-অফ-প্লেস!
পার্বতী : দেখো, আমাকে বেশি রাগিয়ো না বলে দিচ্চি। আমার সেই দশ বাই-চণ্ডীমূর্তির কথা মনে নেই বুঝি? ধরব নাকি সেই মূর্তি?
শিব আর উচ্চবাচ্য করলেন না— হতাশভাবে চুপ মেরে গেলেন।
আচম্বিতে সিঙ্গির হালুম হুলুম আর ষাঁড়ের গাঁ গাঁ শোনা গেল।
শিব : নন্দি, দেখ দেখ,— ষাঁড়ের সঙ্গে সিঙ্গি ঝগড়া কচ্চে বুঝি! সেবারে ওই হতভাগা সিঙ্গি থাবা মেরে আমার ষাঁড়ের আধখানা ল্যাজ ছিঁড়ে নিয়েছিল!
পার্বতী : আর সেদিন ওই মুখপোড়া ষাঁড় আমার সিঙ্গির পেটে গুঁতিয়ে দিয়েছিল!
নন্দি সিং দরজা খুলে বললে, না, ষাঁড় আর সিঙ্গি ঝগড়া করচে না, একটি পরমা সুন্দরী কন্যা এসেচে, তাকে দেখেই ওরা চেঁচাচ্চে।
শিব : পরমা সুন্দরী কন্যা!
পার্বতী : পরমা সুন্দরী কন্যা! এই কৈলাসে!
জয়া-বিজয়ার দিকে ফিরে পার্বতী চুপি চুপি বললেন, এ আবার কে লো?
জয়া : আবার সেই ত্রেতাযুগের মোহিনী-টোহিনির মতন কেউ এল না তো?
বিজয়া : সেবারে মোহিনী তো কর্তাবাবুকে সাত ঘাটের জল খাইয়ে তবে ছেড়েছিল!
পার্বতী : নন্দি, মেয়েটাকে এখান থেকে চলে যেতে বল।
পার্বতীর মনের ভাব বুঝে শিব হেসে বললেন, গিন্নি, আমাকে তা বলে তুমি এতটা খেলো ভেবো না!
পার্বতী : পুরুষকে বিশ্বেস নেই!
নন্দি এতক্ষণে চিনতে পেরে বললে, চিনেচি, চিনেচি! উনি রূপকথা-ঠাকরোন, ওই যে,—রাজপুত্র, মন্ত্রীপুত্র, কোটালপুত্র আর সওদাগরপুত্র সবাই সঙ্গে রয়েছে।
শিব : রূপকথা এখানে কী করতে?
নন্দী : উনি ভেতরে আসতে চাইচেন!
শিব : আসতে দে।
রূপকথা পুরীর ভিতরে এসে ঢুকল—পিছনে রাজপুত্র, মন্ত্রীপুত্র, কোটালপুত্র ও সওদাগরপুত্র। সকলে একে একে এসে শিবের ও পার্বতীর পায়ের কাছে গড় হয়ে প্রণাম করলে।
রূপকথার পদ্মের পাপড়ির মতন চোখে তখনও শিশিরের ফোঁটার মতন অশ্রু টলমল করছিল।
শিব : তুমি কাঁদচ কেন বাছা? তোমার কীসের দুঃখ?
রূপকথা : বাবা, জানেন তো একদিন সারা পৃথিবীতে আমারই রাজত্ব ছিল!
শিব : জানি বই কী! প্রত্যেক মানুষের প্রাণ সেদিন ছিল তরুণ কবির মতন— তারা মর্ম দিয়ে ভাব-রস-রূপের মর্ম বুঝত।
রূপকথা : কিন্তু লোকে আর আমাকে মানে না, তারা আমাকে পৃথিবী থেকে বিদেয় করে দিয়েচে। তারা আগে আমাকে প্রাণের মতো ভালোবাসত। সে ভালোবাসার বিনিময়ে আমি তাদের দিতুম—কল্পনার অগাধ ঐশ্বর্য, কবিত্বের মনোরম আকাশকুসুম, আনন্দের সুমধুর সুধাপাত্র! তা-ই নিয়ে তারা পৃথিবীর দুঃখ দৈন্য-হাহাকারের মধ্যেও দু-দণ্ডের তরেও বিস্মৃতির দুর্লভ আস্বাদ পেত।
শিব : মানুষ তোমাকে এখন মানে না কেন?
রূপকথা : তারা যন্ত্র-রাক্ষসের পাল্লায় গিয়ে পড়েচে। তারা আর আমাকে বিশ্বাস করে না,—বলে, আমার সব মিথ্যে। তারা এখন কল্পনার রঙিন আলোতে মন দিয়ে যা দেখা যায়, তাকে ফেলে, স্পষ্ট সূর্যের উত্তাপে চোখ দিয়ে যা দেখা যায়, তাকেই সত্যি বলে মানে।
শিব : ভুল করে। চোখের দেখা দু-দিনের, কিন্তু মনের দেখা চিরদিনের।
রূপকথা : সেই দুঃখেই তো আমি এই কৈলাসের ছায়ায় পালিয়ে এসে, ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্নলোকে বাস করতুম।
শিব : তা আমি শুনেচি।
রূপকথা : অবিশ্বাসীদের যুক্তিতে আমার যেসব ভক্তের মন আজও টলেনি, তারা তবু এই ভেবেও সুধী যে, রূপকথা মিথ্যা নয়— সে তার কবিত্ব আর কল্পনাকে নিয়ে হিমালয়ের এই গোপন অন্তঃপুরে, এই অজানা রহস্যলোকে আজও বাস করচে। যন্ত্র-রাক্ষস তাদের পূজা পায়নি। সংসার-মরুর তপ্ত বালুরাশির ভিতরে এই বিশ্বাসই তাদের মনকে শ্যামল করে রেখেচে। কিন্তু অবিশ্বাসীদের প্রাণে আমার এটুকু পূজাও সইল না। আমাকে বধ করবার জন্যে, কল্পনার এই সর্বশেষ আশ্রয়টুকুও বাস্তবের আড্ডা করে তোলবার জন্যে, তারা দলবল নিয়ে হইচই করে ছুটে এসেচে।
শিব : তারা কারা?
রূপকথা : মানুষ। তাদের সঙ্গে আছে যন্ত্র-রাক্ষস।
রাজপুত্র বললে, আমি যন্ত্র-রাক্ষসকে বধ করতে চাই, কিন্তু সবাই আমাকে বার করচেন।
শিব : বাছা, তাকে তুমি বধ করতে পারবে না। মানুষ সে কাজ একদিন নিজেই করবে।
রাজপুত্র : কিন্তু মানুষ যে যন্ত্র-রাক্ষসের বন্ধু!
শিব : হ্যাঁ। কিন্তু এ বন্ধুত্ব চিরদিনের নয়। মানুষ আজ তার বন্ধু— কারণ মানুষই এখন তাকে চালাচ্চে। কিন্তু শীঘ্রই পৃথিবীতে এমন দিন আসবে, যেদিন যন্ত্র-রাক্ষসই মানুষের চালক হয়ে উঠবে। সেদিন মানুষের মোহ কেটে যাবে, তার প্রাণ বিদ্রোহী হবে। যন্ত্র-রাক্ষসের বিষদাঁত মানুষ নিজেই সেদিন ভেঙে দেবে।
রূপকথা : কিন্তু খালি আমাকে মারতে নয়—যন্ত্র-রাক্ষসকে নিয়ে মানুষ যে এই কৈলাসপুরীও দখল করতে ছুটে আসচে!
শিব : কী করে জানলে? মানুষের এত সাহস হবে না!
রূপকথা : আমরা সকলে স্বচক্ষে দেখে আসচি।
রাজপুত্র : এতক্ষণে তারা মানস সরোবরের পথে এসে পড়েচে।
শিবের তৃতীয় নেত্র আস্তে আস্তে ডাগর হয়ে উঠতে লাগল। বিস্মিতস্বরে বললেন, এতদূরে তারা এসেচে?
রূপকথা : হ্যাঁ, মানুষ আর যন্ত্র-রাক্ষস।
শিব : আমার এই কৈলাসপুরী অপবিত্র করবে—এত বড়ো সাহস কি তাদের হবে?
রাজপুত্র : তারা নাকি বলচে যে, এই কৈলাসপুরীর টঙে তারা বিজয়-নিশান পুঁতে দিয়ে যাবে!
শিব গম্ভীরস্বরে বললেন, নন্দি, কৈলাসের চুড়োয় উঠে দেখ তো, কারা এদিকে আসচে!
কৈলাসের মেঘভেদী সর্বোচ্চ শিখরের উপরে উঠে নন্দি একবার চারদিকে দৃষ্টিপাত করলে। সেখান থেকে পৃথিবীর সবুজ বুক পর্যন্ত শূন্যতার অবাধ বিস্তার।
নন্দি তাড়াতাড়ি নেমে এসে ব্যস্তভাবে বললে, আজ্ঞে বিষম বিপদ!
শিব অধীরভাবে জটা-নাড়া দিয়ে বললেন, বিপদ! আমার আবার বিপদ। কী দেখলি, আগে তা-ই বল!
নন্দি : আজ্ঞে, দেখলুম— মানস সরোবরের জলে লীলাকমল সব শুকিয়ে গুটিয়ে গেছে, মরালরা আর জলকেলি করচে না, দেব, যক্ষ, গন্দর্ভ, কিন্নর আর অপ্সরবালারা কী এক অজানা বিপদের ভয়ে ঘাট থেকে উঠে দলে দলে পালিয়ে যাচ্চে। চার তীরে তরুকুঞ্জে আর বসন্তের লীলা নেই, তাদের শ্যামশ্রীর ওপরে কালিমার গাঢ় ছায়া নেমেচে, ফল-ফুল সব খসে পড়েচে, ভ্রমর আর প্রজাপতিরা মূর্ছিত হয়েচে, কোকিলরা সব দেশ ছেড়ে উড়ে গেছে।
শিবের তৃতীয় নেত্র ধক ধক করে জ্বলে উঠল। নন্দি ভয়ে ভয়ে সুমুখ থেকে সরে দাঁড়াল। মনে মনে বললে, কী জানি বাবা, ও আগুন-চাউনির একটা ফিনিক গায়ে লাগলে আর তো রক্ষে নেই—একেবারে মরদ-ভস্ম হয়ে যাব!
শিব রুক্ষ্মস্বরে বললেন, আর কী দেখলি?
নন্দি : আকাশগঙ্গার স্রোত আকাশেই স্তম্ভিত হয়ে আছে, ভয়ে আর নীচে নামতে পারচে না।
শিব : গঙ্গা—গঙ্গা—আমার গঙ্গাও ভয় পেয়েচেন! আচ্ছা, আর কিছু দেখলি?
নন্দী : আর দেখলুম— দূরে, মানস সরোবরের পথে একখানা উড়ো রথ— তার সারথি মানুষ। বরফেরও ওপর দিয়ে আসচে দলে দলে মানুষের পর মানুষ।
শিব তাঁর চকচকে ত্রিশূলের দিকে সুদীর্ঘ বাহুবিস্তার করে উদ্যত বজ্রের মতন প্রদীপ্ত নেত্রে, সমুদ্র-গম্ভীরস্বরে বললেন, মানুষ? ভালো করে দেখেচিস?
নন্দি : আজ্ঞে হ্যাঁ,—ফিরিঙ্গি!
ত্রিশূলে ভর দিয়ে শিব উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর মাথার জটাজূট, গলার হাড়ের ও সাপের মালা এবং কোমরের বাঘছাল লটপট করে দুলতে লাগল। নিষ্ঠুর অট্টহাস্যে আকাশ-বাতাস চমকে দিয়ে এবং কৈলাসের শিখরের পর শিখরে প্রতিধ্বনির আর্তনাদ জাগিয়ে তিন বললেন, মানুষ! কৈলাসের ওপরে মানুষের আক্রমণ! হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ! পাথরের শিব দেখে তারা কি ভেবেচে—সত্যি সত্যিই আমি অমনি প্রাণহীন? তারা কি ভুলে গেছে— আমিই বিলয়-কর্তা? এই এক লাথিতে সারা পৃথিবীটাকে গাঁজার কলকের মতো গুঁড়িয়ে, এক ফুঁয়ে ধুলোর মতো আমি শূন্যে উড়িয়ে দিতে পারি, তারা কি তা জানে না? বটে! আচ্ছা— দেখুক তবে!— শিব প্রচণ্ড বেগে তাঁর দক্ষিণ পদ উপরে তুললেন।
পার্বতী প্রমাদ গনে তাড়াতাড়ি শিবের পা চেপে ধরে বললেন, প্রভু, প্রভু! লঘু পাপে গুরুদণ্ড দেবেন না।
শিব : লঘু পাপ। কৈলাসে মানুষের আক্রমণ!— এ কি লঘু পাপ? পার্বতী, তুমি বলো কি? এ চিন্তাও যে অসহ্য!
পার্বতী : প্রভু, মানুষ অবোধ জীব— এ যাত্রা সামান্য দণ্ডেই তাদের চোখ ফুটিয়ে মুক্তি দাও।
রূপকথা : দেবাদিদেব, অবিশ্বাসীদের জন্যে আমার ভক্তরাও কেন দণ্ড ভোগ করবে? পৃথিবী ধ্বংস হলে আমার ভবিষ্যতের আশা দাঁড়াবে কোথায়?
পার্বতী : পৃথিবীতে তোমারও তো ভক্ত আছে। বিনা দোষে তাদের ওপরেও দণ্ড দেবে কেন প্রভু?
শিব আপনাকে কতকটা সামলে নিয়ে বললেন, আচ্ছা, এ যাত্রা নির্বোধগুলোকে অল্পে অল্পেই ছেড়ে দিচ্ছি। প্রভঞ্জন!
প্রভঞ্জন এসে শিবের চরণে প্রণাম করে জোড়হাতে দাঁড়াল।
শিব : প্রভঞ্জন! তোমার উনপঞ্চাশ বায়ুকে এখনই মানস সরোবরের পথে পাঠিয়ে দাও— তুষারের ঝড় উঠুক—তুষারের স্তূপ ধসে পড়ুক—হিমাচলের বুক দুপদুপিয়ে কাঁপতে থাকুক—তুচ্ছ মানুষের বাচালতাকে ক্ষণিক স্বপ্নের মতো ধুয়ে-মুছে লুপ্ত করে দিক!
প্রভঞ্জন তখনই লাফাতে লাফাতে ছুটে চলে গেল।
শিব : নন্দি, তুমি আর-একবার কৈলাসের শিখরে উঠে দেখো।
শিব আবার বাঘের ছালের উপরে স্থির হয়ে বসলেন— নিবিড় মেঘে যেমন জ্বলন্ত সূর্য ঢেকে যায়, তাঁর অগ্নিবর্ষী তৃতীয় নেত্র তেমনি ধীরে ধীরে আবার ছাই-মাখা চোখের পাতার আড়ালে লুকিয়ে পড়ল।
কৈলাসের শিখরে শিখরে অকস্মাৎ প্রভঞ্জনের ভৈরব হুংকার ধ্বনিত হয়ে উঠল— সঙ্গে সঙ্গে উনপঞ্চাশ বায়ু অন্ধকার গিরিকন্দর থেকে ছাড়ান পেয়ে, হুড়মুড় দুড়দুড় করে পিঞ্জর-খোলা দুর্দান্ত বন্যের মতো নীচে নেমে গেল, তাদের নির্দয় পদাঘাতে হিমাচলের বিপুল ললাট থেকে তুষারের বৃহৎ স্তূপ সব চারদিকে খসে খসে পড়তে লাগল— বহু যুগের শীতল নিদ্রার অনাহার থেকে জেগে উঠে, তুষার-স্তূপেরা যেন সাক্ষাৎ ক্ষুধিত মৃত্যুর মতো মানস সরোবরের ঢালু পথ ধরে, ক্রুদ্ধ আবেগে গড়াতে গড়াতে ছুটতে শুরু করলে!
মরণের পূতিগন্ধ পেয়ে, শিবের চ্যালা জীবন্ত তিমির মূর্তির মতো ভূতপ্রেতরা ঊর্ধ্ববাহু হয়ে নাচতে নাচতে, বিকট 'হর-হর-শংকর' চিৎকারে কৈলাসপুরী থেকে বেরিয়ে পড়ল।
শিব মনের খুশিতে একবার ডমরুটা ডিমি ডিমি বাজিয়ে নিয়ে দুলতে দুলতে বললেন, ব্যোম, ব্যোম, ব্যোম! অনেকদিন পরে এই খণ্ড-প্রলয়ের সূচনা দেখে, আমারও পা দুটো আজ তাণ্ডবে মাতবার জন্যে উসখুস করে উঠচে!
পার্বতী বললেন, ঢের হয়েচে, থামো। বুড়ো বয়সে আর নাচের শখে কাজ নেই!
আকাশপটে আঁকা ছবির মতো, হিমালয়ের সব উঁচু শিখরের টঙে, ততক্ষণে নন্দিও ত্রিশূল ঘুরিয়ে নাচ লাগিয়ে দিয়ে বলচে, ব্যোম ভোলানাথ! ব্যোম ভোলানাথ! ব্রাভো প্রভঞ্জন! কতক ম'ল— কতক পালাল— পথ একেবারে সাফ। জাদুরা ঘুঘু দেখেচ, ফাঁদ তো দেখোনি!—এইবার দেখো! ব্রাভো—ব্রাভো। ক্যা-পি-টা-ল। এখনই থামল কেন—এনকোর।
শিব : আমিও একবার ওখানে গিয়ে ব্যাপারটা দেখে আসব নাকি?
পার্বতী : না, না—তাও কি হয়! তোমার কি আর ডানপিটেগিরি করবার বয়স আছে গা? বরফে পা হড়কে পৃথিবীর গর্তে মুখ থুবড়ে পড়ে যাবে যে!
মানস সরোবর
রাজপুত্র, মন্ত্রীপুত্র, কোটালপুত্র ও সওদাগরপুত্র আগে আগে আসচেন—পিছনে রূপকথা।
রাজপুত্র : কী চমৎকার রাত!
মন্ত্রীপুত্র : প্রকৃতি যেন রূপের ধ্যানে বসেচে।
কোটালপুত্র : মানস সরোবরে চাঁদের হাসি ফুটে উঠেচে!
সওদাগরপুত্র : গাছে গাছে আবার সবুজ পাতা গজিয়েছে, রাঙা রাঙা ফুল-ফল ফুটেচে, বসন্ত আবার কোকিলের গানের সঙ্গে দখিন হাওয়ার বেহালায় সুর মেলাচ্চে!
রাজপুত্র : এমনি একরাতেই ঘুমপুরীর রাজকন্যার সঙ্গে আমার প্রথম চোখে চোখে মিল হয়!
মন্ত্রীপুত্র : হায় রে, পৃথিবীতে বেলবতী-কন্যা আজ যদি আমাকে তার পাশটিতে পেত, তবে কী খুশিটাই যে হত!
কোটালপুত্র : আজ পৃথিবীতে থাকলে, এমন সুখের রাতে আমি চোর-টোর ধরলেও তখনই বেকসুর খালাস দিতুম।
মন্ত্রীপুত্র : আমার সাধ হচ্ছে, মানস সরোবরের অথই অপার রুপোলি জলে সাতখানা ডিঙা সাজিয়ে ভেসে যাই, আর জ্যোৎস্নার কানে কানে সারারাত চুপি চুপি মনের কথা কই।
রাজপুত্র : বাছারা, দেবাদিদেবের অনুমতি পেয়েচি, আজ থেকে আমরা এই মানস সরোবরের তীরেই বাস করব।
রাজপুত্র : তাহলে আর আমাদের নীচের সেই গুহাতে থাকতে হবে না?
রূপকথা : না—যন্ত্র-রাক্ষসের ছায়ায় সে স্থান অপবিত্র হয়েচে। সেখানে আর আমাদের ঠাঁই নেই।
আর সকলে। আঃ, বাঁচা গেল, আর শীত ভুগে মরতে হবে না।
রূপকথা : ওই যে রাঙা ফুলের কুঞ্জটি রয়েচে, আমি এখন ওইখানেই চললুম।
রাজপুত্র : কেন মা?
রূপকথা : ঘুমুতে।
রাজপুত্র : আবার ঘুম?
রূপকথা : জেগে জেগে কষ্ট সওয়া যে বড়ো দায় বাছা!
রাজপুত্র : এবারে কতদিন পরে আবার জাগবে?
রূপকথা : যতদিন না যন্ত্র-রাক্ষসের বিরুদ্ধে মানুষের বিদ্রোহ মাথা চাগাড় দেয়।
রাজপুত্র : তারপর?
রূপকথা : তারপর আবার আমাদের দিন ফিরে আসবে— কবিত্বের দিন, কল্পনার দিন, পরির স্বপনের দিন। মানুষের বুকটা সেদিন আর কঠোর গদ্যের পাথরে চাপা থাকবে না—সেখানে জেগে উঠবে সুরের ছন্দ, পারিজাতের গন্ধ আর রূপের আনন্দ!
রাজপুত্র : সেদিন আবার আমরা পৃথিবীতে ফিরে যাব?
রূপকথা : হ্যাঁ।
রাজপুত্র : আবার তেপান্তরের মাঠে আমার পক্ষীরাজ ঘোড়া ছুটবে? আবার আমি ঘুমপুরীতে যাব? আমার সোনার কাঠি খুঁজে পাব?
মন্ত্রীপুত্র : বেলবতী-কন্যা আমাকে দেখে সুখে কেঁদে ফেলবে?
কোটালপুত্র : মানুষ আবার আমাদের আদর করবে?
সওদাগরপুত্র : সাত ডিঙা নিয়ে আবার আমি কমলে-কামিনীকে খুঁজতে বেরুব?
রূপকথা : হ্যাঁ বাছা, তোদের সকলেরই মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হবে। মানুষ তোদের পেলে বর্তে যাবে। বুঝবে, তোদের নির্বাসনে পাঠিয়ে এতদিন তারা কী ভুলই করেছিল।
রাজপুত্র : সে আর কতদিন—আর কতদিন!
রূপকথা : জানি না। আমি আর দাঁড়াতে পারচি না, ঘুম আমাকে ডাক দিয়েচে, আমার চোখ ঢুলে আসছে, আমি ঘুমোতে যাই... ঘুমোতে যাই!
ভারতী, আশ্বিন ১৩২৯ (সেপ্টেম্বর ১৯২২)
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।