অশ্রু

হেমেন্দ্রকুমার রায়

আমাদের বাড়ি পাশাপাশি। উপমাদের সঙ্গে আমাদের বেশ-একটু ঘনিষ্ঠতা ও আত্মীয়তার যোগ ছিল। উপমার সঙ্গে ছেলেবেলায় কত খেলাই খেলেছি— যদিও সে আমার চেয়ে বছর পাঁচেক বয়সে ছোটো। সুতরাং, বাল্যের ভালোবাসা যে যৌবনের প্রেমে পরিণত হবে, এ আর আশ্চর্য কী?

উপমার বাবা সুরেনবাবু নব্যতন্ত্রের হিন্দু। মেয়ের বিয়ের জন্য তাঁর স্ত্রী যথেষ্ট মুখরা হয়ে উঠেছিলেন, কিন্তু কিছুতেই স্বামীর 'মাথার টনক' নড়াতে পারেননি। মেয়ে বড়ো হবে, লেখাপড়া শিখবে, তবেই বিয়ের কথা— এই ছিল তাঁর পণ।

প্রথম যেদিন তার কাছে আত্মপ্রকাশ করি, সেদিন সে কিছুই বলেনি; কিন্তু তার প্রসন্ন নতদৃষ্টি ও রক্তকপোলে হৃদয়ের মৌন সম্মতি পেয়েছিলাম। বাগানের গোলাপ গাছ থেকে একটি আধ-ফোটা ফুল তুলে তার এলো খোঁপায় গুঁজে দিলাম— আমার প্রাণের পুলকই ফুলের পাপড়িগুলিকে যেন রঙিন করে তুলেছিল। উপমা আমার একখানি হাত দু-হাতে নিজের মুঠোর ভিতর নিয়ে কোলে করে বসে রইল। আমরা কেউ কিছু বললাম না— বকুল শাখার কানে কানে বাতাস মৃদু গুঞ্জনে যে কথা বলছিল, সারাসন্ধ্যা সেইখানে বসে বসে আমরা তা-ই শুধু শুনতে লাগলুম।

এ কথা কত লুকোনো!

জানতাম, আমার আইন-পড়া সাঙ্গ না হলে বাবা কখনোই এ বিবাহে মত দেবেন না। বিশেষ সে সময়ে আমার বাবা ফিটের ব্যামোয় বড়ো কষ্ট পাচ্ছিলেন। সুতরাং তখনকার মতো আমার প্রাণের কথা আমার প্রাণেই চাপা রইল।

রোজ সন্ধ্যাবেলায় আমি উপমাদের বাড়িতে চা খেতে যাই— এটি আমার অনেক দিনের অভ্যাস।

সেদিনও নিয়মমতো গেলাম।

টেবিলের একধারে বসে সুরেনবাবু খবরের কাগজ পড়ছিলেন। আমি তাঁর সামনে গিয়ে বসলুম। উপমা চকিত চোখে একবার আমার দিকে তাকিয়ে, একটু হেসে চায়ের পেয়ালায় দুধ ঢালতে লাগল। উপমার চোখের এই দৃষ্টিতে এখন আমি এক নূতন ভাষা দেখি— চারিদিকে লোকজন থাকলেও সে ভাষা আমি ছাড়া আর কেউ পড়তে পারত না— সে ভাষা যে কেবল আমারই জন্য!

বাইরে পায়ের শব্দ হল। সুরেনবাবু খবরের কাগজ থেকে মুখ তুলে বললেন, 'উপা, বোধহয় নরেন আসছে।'

নরেন উপমার দাদা।

নরেন ঘরের ভিতরে এল— তার পিছনে সাহেবি পোশাক-পরা আর-একজন লোক। হঠাৎ এক অচেনা লোক দেখে উপমা একটু জড়সড় হয়ে আমার কাছ ঘেঁষে দাঁড়াল।

নরেন বললে, 'উপা, লজ্জা করিসনে, এ আমার বন্ধু অজিত। বাবা, আমার মুখে অজিতের কথা শুনেছেন তো?'

সুরেনবাবু তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, 'এসো বাবা, এসো! নরেনের বন্ধু বলে তোমাকে আর আপনি বললুম না। বোসো— ওই চেয়ারে বোসো। উপা, আর দু-পেয়ালা চা তৈরি করো তো মা!'

অজিত হেসে বললে, 'কোর্টের ফেরতা আসছি, নরেন আর আমাকে বাড়ি গিয়ে খোলস ছাড়বার অবকাশ দেয়নি। আশা করি দাঁড়কাকের এ ময়ূরপুচ্ছকে আপনারা সকলে ক্ষমা করবেন।'— টুপি হাতে করে অজিত আমার সামনের চেয়ারে বসে পড়ল।

এই অজিতের কথা আজ কদিন ধরেই শুনছি। অজিত খুব বড়োলোকের একমাত্র সন্তান। কলকাতায় বি.এ. পাশ করে বিলাতে গিয়ে সে ব্যারিস্টার হয়ে এসেছে। দেখতেও সে বেশ সুপুরুষ। নরেন কাল বলছিল, অজিতের সঙ্গে উপমার বিয়ে হলে বেশ হয়। কথাটা তিরের ফলার মতো আমার বুকে গিয়ে বিঁধেছিল বটে,— কিন্তু ভেবেছিলুম সে শুধু কথার কথা।

আজ আমার চায়ের পেয়ালায় কে যেন নিমপাতার রস ঢেলে দিয়েছে! কোনোরকমে চা-পান করতে করতে ভাবতে লাগলুম, নরেন যখন অজিতকে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে, ব্যাপারটা তখন আর হালকা ভেবে উড়িয়ে দেওয়া চলে না। উপমা যে এখন আমার দেহের সঙ্গে রক্তের মতো মিশে আছে,— সে পরের হবে, এ যে ভাবতেও পারি না। উপমাকে এখন যেদিন ভুলব— সেদিন আমি নিজেকেও হয়তো ভুলে যাব!

ভাবছি, হঠাৎ আমার বেয়ারা ছুটতে ছুটতে এসে খবর দিলে, বাবার আবার ফিট হয়েছে। আমি তাড়াতাড়ি উঠে পড়লুম।

বাবার এবারকার পীড়া কিছু গুরুতর। ডাক্তার বললেন, কলকাতার গরম বাবার সহ্য হচ্ছে না, এঁকে দু-একদিনের মধ্যেই দার্জিলিঙে নিয়ে যাওয়া উচিত, নইলে অবস্থা হঠাৎ খারাপ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

মা ধরে বসলেন, কালকেই দার্জিলিং যাব। স্থির হল, দার্জিলিঙে আমার এক মামা আছেন, আপাতত সেইখানে গিয়েই উঠব।

বলতে কী, এ সময়ে আমার মন কলকাতা থেকে কিছুতেই নড়তে চাইছিল না, কিন্তু উপায় নেই— এ যে কর্তব্য!

সকালে উঠে তাড়াতাড়ি উপমাদের বাড়ি ছুটলাম।

ঢুকতেই দেখি, উপমা বাগানে দাঁড়িয়ে ফুল তুলছে।

আমি তার কাছে গিয়ে বললাম, 'উপা, বাবার ব্যামোর বড়ো বাড়াবাড়ি— তাঁকে নিয়ে আমরা দার্জিলিং যাচ্ছি।'

'কবে, প্রভাতদা?'

'আজই।'

'আজই! সে কী, যাবার আগে মা-বাবা দেখতে পাবেন না?'

'কেন উপা, তোমার বাবা আর মা কোথায়?'

'তাঁরা শ্রীরামপুরে কাকার বাড়ি গেছেন। কাল আসবেন।'

আমি হতাশভাবে বললাম, 'তোমার বাবার সঙ্গে আজ আমার দেখা হওয়ার যে বড়ো দরকার ছিল উপা!'

'কেন প্রভাতদা?'

'আমার হাতে তোমাকে দিতে তাঁর কোনো আপত্তি আছে কি না, যাবার আগে সে কথা জেনে যেতাম।'

উপমার গাল দুটি রাঙা হয়ে উঠল। ঘাড় হেঁট করে খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে সে বললে, 'তোমরা চলে যাচ্ছ, এইবেলা আমি সকলকার সঙ্গে দেখা করে আসি।'

নরম কাঁধের উপর এলানো চুল দুলিয়ে উপমা চলে যেতে উদ্যত হল,— আমি আবেগভরে তার সুমুখে গিয়ে দাঁড়িয়ে গাঢ়স্বরে বললাম, 'দাঁড়াও উপমা, অনেকদিন তোমায় দেখব না, একবার ভালো করে দেখে নি!'

উপমা একবার চকিতের জন্য পূর্ণদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাল,— পরক্ষণেই চোখ নামিয়ে লজ্জায় নুয়ে ফুলের ডালার দিকে চেয়ে থমকে দাঁড়াল।

গাছের ফাঁক দিয়ে সোনার মতো একঝলক রোদ এসে উপমার মুখের একদিকটি আলোয় আলো করে তুলল— সে মূর্তি যেন গ্রিক ভাস্করের উপাস্য প্রতিমা!

দার্জিলিঙে এসে বাবার রোগ কমল না— কিন্তু নানান উপসর্গ বাড়তে লাগল।

আমাদের মনের আনন্দই প্রকৃতিতে প্রাণসঞ্চার করে।— সে আনন্দ আমার ছিল না। তাই উপত্যকায় মেঘের মেলা, তুষারপটে আলোর খেলা, শৈলকোলে ঝরনার লীলা— এসব চোখ দিয়ে দেখতাম মাত্র, মন দিয়ে গ্রহণ করতে পারতাম না;— সবই যেন অর্থহীন চিত্রের মতো!

শুধু বাবার অসুখই এত অশান্তির কারণ নয়;— নিয়তি সকল দিক থেকেই আমাকে কাবু করবার ফিকিরে আছে।

জীবনের এই ভাগটা শিশুর পক্ষে দ্বিতীয় ভাগের মতো আমাকে ভারাক্রান্ত করে তুলেছে,— একে বাদ দেওয়াও চলে না, মনে রাখাও কষ্টকর। এ দুর্দিনের কথা ভুলে মেতে কত-না চেষ্টা করেছি;— কিন্তু পারিনি, কিছুতেই পারিনি! এ যেন আগুনের আখরের মতো আমার বুকের ভিতরটা দাগি করে রেখেছে!

...তাকে দেবী বলেই জানতাম। না,— জানতাম কেন, এখনও তা-ই বলেই জানি, তা-ই বলেই পূজা করি। ভ্রম-প্রমাদের জীবনে হয়তো সে ক্ষণিকের ভুল করে ফেলেছিল। কিন্তু কার অভিশাপে ক্ষণিকের সে ভুল আমার অদৃষ্টে চিরস্থায়ী হয়ে রইল?

দার্জিলিঙে আসবার পরে, কলকাতা থেকে প্রথম চিঠি পাই উপমার। আমরা কে কেমন আছি জিজ্ঞাসা করে সব শেষ লাইনে সে লিখেছিল— 'প্রভাতদাদা, তোমার জন্যে আমার মন কেমন করে।'

সর্বশেষের সামান্য এই একটি লাইনকে তোমরা কেউ অসামান্য বলে ভাববে না হয়তো। আমি কিন্তু সেই লাইনটিকে ইষ্টমন্ত্রের মতো মনে মনে কতবার— কতদিন যে জপ করেছি, তা আর বলা যায় না। প্রেম যে সামান্যকে অসামান্য করে তোলে!

আজও সে লাইন— সেই একটিমাত্র লাইন আমার জীবনকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছে। 'প্রভাতদাদা, তোমার জন্যে আমার মন কেমন করে।'— উপমার শেষ পত্রের এই শেষ পঙক্তিটি স্মরণীয়। কারণ, তারপর উপমার জীবনে যেদিন এসেছে, সেদিনের কথা আর আমার অধিকারে নেই— সে তখন অন্যের ধর্মপত্নী!

চিঠি লেখবার সময় সত্যই কি তার মন কেমন করেছিল? এখনও মাঝে মাঝে কথাটা ভাবি। একটা ইতর প্রাণীর সঙ্গে থাকলেও যে তার উপরে মায়া পড়ে,— আর আমি হচ্ছি তার বাল্যসাথি,— কতকাল থেকে একসঙ্গে আছি, আমার উপরে কি তার মায়া পড়েনি? এ আর বিচিত্র কী? কিন্তু আমার এ প্রাণ তো তার মায়ার কাঙাল ছিল না— সে যে চেয়েছিল, প্রেম! উপমাও তো তা জানত!

আবার, আর-এক হতেও পারে। হয়তো, আমার জীবন তার নির্দয়তায় নিষ্ফল হয়ে যাবে বলে, আমার হতভাগ্যের কথা ভেবে তার মনে অনুতাপের ক্ষণিক দয়া হয়েছিল। তা-ই কি? উপমার এ মন-কেমন-করা কি প্রথম শিকারির করুণার মতো? না, না,— আর ভাবতে পারি না। এ যে নিজের দেহেই ছুরি চালিয়ে শবব্যবচ্ছেদ শিক্ষা হচ্ছে। এ ব্যাপার যতই বিশ্লেষণ করব, আমার আত্মা ততই রক্তাক্ত হয়ে উঠবে!

ধনীর সন্তান অজিতের অর্থের মোহেই হোক, আর তার বাপ-মা-র ইচ্ছা বা আদেশেই হোক,— উপমা যখন আমাকে ত্যাগ করেছে, তখন আর কারণ চিন্তা করে লাভ কী? অকালে, তৃষ্ণায় ছাতি ফেটে গেলেও চাতক যখন বাদলের ধারা পাবে না, তখন তার পক্ষে কান্না থামানোই হচ্ছে উচিত কার্য।

* * *

উপমার চিঠি সামনে রেখে সেদিনও মেঘের প্রাসাদ তৈরি করছিলাম, এমন সময়ে সুরেনবাবুর এক পত্র এসে আমার সুখের মেঘে আগুন ধরিয়ে দিলে। সেই পত্রেই প্রথম জানলুম, অজিতের সঙ্গে উপমার বিবাহ।

আমার তখনকার মনের অবস্থা ভাষায় বর্ণনা করা নিষ্ফল; কারণ, সে তো আমি পারব না! কল্পনায় পরের মানস-ভাব হয়তো ফুটানো যায়, কিন্তু নিজে যা প্রাণে প্রাণে অনুভব করছি, সে কঠিন বাস্তবকে ভাষায় ঠিক প্রকাশ করা যায় কি না, তাতে আমার সন্দেহ আছে। অন্তত আমার সে শক্তি নেই।

জীবনে ধিক্কার এল,— নারীর প্রতি ঘৃণা হল। সারাসন্ধ্যা কেমন যেন আচ্ছন্নের মতো চুপ করে বসে রইলুম,— যখন সাড় হল তখন রাত্রি হয়েছে।

কৃষ্ণপক্ষের রাত্রি,— আমার বুক ছাপিয়ে অনন্ত কালিমা যেন বিশ্বময় ব্যাপ্ত হয়ে পড়েছে। চন্দ্রশূন্য আকাশ, মাথার উপরে যেন এক কালি-মাখা বিরাট কটাহের মতো উলটে রয়েছে। আমার মনে হতে লাগল, পৃথিবীতে শত শত অভাগার প্রাণে প্রাণে অহরহ যে দুঃখের চিতা জ্বলছে, তারই শিখার ধূমে আকাশ অত অন্ধকার!...

উপমার চিঠিখানা হাতেই ছিল,— সেখানা বাতির আলোয় ধরলুম। দেখতে দেখতে সমস্ত পুড়ে ছাই হয়ে গেল। কিন্তু ছাই হয়েও চিঠিখানা একেবারে গুঁড়ো হয়ে গেল না,— বেঁকেচুরে দুমড়ে গেল মাত্র। মাথা হেঁট করে তার দিকে চেয়ে দেখলাম। ছোটো ছোটো চেনা হাতের লেখায় তখনও পড়া যাচ্ছে— 'প্রভাতদাদা, তোমার জন্যে আমার মন কেমন করে!' করে নাকি? করুক! বিদ্রুপের স্বরে আপনমনে হেসে উঠে, পত্রভস্ম সবলে মুঠোয় চেপে ধরলুম, মুড়মুড় করে একটা শব্দ হল— সে যেন কার অতি মৃদু আর্তনাদ! যখন মুঠো খুললুম, হঠাৎ একটা দমকা হাওয়া এসে ছাইগুলোকে এক ঝাপটায় নিঃশেষে উড়িয়ে নিয়ে গেল।

* * *

মনের যখন এমনি অবস্থা, বাবার অসুখ তখন চরমে উঠল।

সুরেনবাবুর আর-এক পত্র পেলুম, উপমার বিয়ের নিমন্ত্রণ! তার দু-চার দিন পরেই বাবাকে নিয়ে কলকাতায় রওনা হলুম।

মনে আছে, উপমাদের বাড়িতে যেদিন সানায়ে সাহানা বাজছে, আমাদের বাড়িতে সেদিন কান্নার রোল উঠেছে!

কলকাতা আমার বিষ হয়ে উঠেছিল। ওকালতি পাশ করেই তাই পশ্চিমে চলে এসেছি। ছোটোভায়ের সঙ্গে মা কলকাতাতেই আছেন।

বছর দুই কেটে গেছে। এর মধ্যে মনের উন্নতি যত-না হোক,— আর্থিক উন্নতি কিছু কিছু হয়েছে।

মা প্রতি পত্রেই কান্না ধরেছেন, এইবার আমাকে বিয়ে করতে হবে। কিন্তু সে কথা আমি কানে তুলিনি।

ইতিমধ্যে মা-র চিঠিতে উপমার খবরও পেয়েছি। তার জীবন সুখের নয়। অজিত মাতাল আর লম্পট। উপমার গায়ে হাত তুলতেও সে পিছপাও নয়।

নিয়তি!

আমার কথা কি আর তার মনে আছে? বোধহয়, না। নইলে, বিয়ের পর থেকে সে আমার কোনো খোঁজখবর নেয়নি কেন? ভালো স্বামী না পেলেও সে টাকা তো পেয়েছে বটে! উপমা এখন বিলাসিনী ধনীর ঘরনি। সেখানে আমি কে?

থাক ও কথা। অতীতের চিতাভস্ম কুড়িয়ে, কী আর হবে?

এদিকে মা হতাশ হয়ে উঠছেন। শেষ পত্রে তিনি লিখেছেন, যাদের নিয়ে এ বয়সে তাঁর সংসারধর্ম, তারা যদি সংসারী না হয়, তবে তিনিও আর সংসারের ভার লইবেন না— কাশী চলে যাবেন।— চিঠির ঝাপসা কালি দেখে বুঝলাম, লিখতে লিখতে মা কেঁদেছেন। মনে কেমন একটা ঘা লাগল।— অভাগিনি বিধবা জননী আমার! না ভেবেচিন্তেই উত্তর দিলাম— আমি বিয়ে করব।

দেশে ফিরছি।

একেলে বিয়ের বাজারে রোজগারি উকিল-বর ভারী আক্রা— একরাশ পুঁটিমাছের ভিতরে দশ-সেরি একটি কাতলার মতো। সুতরাং, আমাকে কেনবার খরিদ্দারের অভাব হয়নি।

মত দিয়েছি বলে এখন অনুতাপ হচ্ছে। পরিচিতকে যে আপন করতে পারলে না, অপরিচিতকে সে কি আর আপন করতে পারবে?

ট্রেন একটা বড়ো জংশনে এসে দাঁড়াল। কলকাতা থেকেও একখানা যাত্রী-গাড়ি এসে স্টেশনে দাঁড়িয়েছিল।

এখন বড়োদিনের ছুটি। পশ্চিমে, কলকাতার গাড়িতে এ সময় অনেক চেনা মুখ নজরে পড়ে। ও গাড়িতে কোনো আত্মীয়-বন্ধু আছেন কি না দেখবার জন্যে কামরা থেকে নেমে পড়লুম।

চেনা মুখ আছে বই কী! দু-চার পা যেতে-না যেতেই যাকে দেখলুম,— তাকে দেখবার আশা মোটেই করিনি। একখানি সেকেন্ড ক্লাস রিজার্ভ গাড়িতে, জানালায় মুখ বাড়িয়ে, ঠিক আমার সামনেই বসে আছে— উপমা!

থমকে দাঁড়িয়ে পড়লুম,— উপমাও আমাকে দেখতে পেয়েছে!

আমাকে দেখেই সে কেঁপে উঠল। তারপর ঘাড় হেঁট করে পাথরের মতো বসে রইল। যেন সে ফাঁসির হুকুম পেয়েছে!

আমার মনের ভিতর সমস্ত অতীত একচমকে বিদ্যুতের মতো খেলে গেল। সেই উপমা!

উঃ, কী বিবর্ণ তার মুখ, কী বিশীর্ণ তার দেহ, কী বিষণ্ণ তার ভাব! সেই রূপে নিরুপমা উপমা, কেমন করে এমন বিষাদ-প্রতিমা হল?— এ যে জীবন্ত শব!

কতক্ষণ যে অবাক-আড়ষ্ট হয়ে সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম, তা আমার মনে নেই। উপমা আমার প্রাণে যে দাগা দিয়েছিল, আমার সমস্তকেই যে ব্যর্থ করে দিয়েছিল, আজ তার এই দীনমূর্তি দেখে সেসব কথা একেবারে ভুলে গেলাম— স্টেশনের সেই ব্যস্ত জনতা, সেই কর্কশ কোলাহল ডুবিয়ে আমার স্মৃতির পটে সেই একদিনের সোনার ছবি জেগে উঠল, যেদিন তার পাশে বসে, তার হাতে হাত রেখে বকুল-শাখায় বসন্ত-বাতাসের অশ্রান্ত গানে এক নূতন রাগিণীর আভাস পেয়েছিলাম!

কলকাতার গাড়ির বাঁশি বেজে উঠল, সে তীক্ষ্ন ধ্বনি যেন ধারালো অস্ত্রের মতো আমার প্রাণটা খান খান করে দিলে। আমি চমকে উঠলুম— উপমাও চমকে উঠল।

গাড়ি ছেড়ে দিলে।

উপমা যেন প্রাণপণে চোখ তুলে আমার দিকে চেয়ে রইল,— সে চোখে কোন ভাব ছিল, মন তা বুঝেছে, আমার মুখ তা বলতে পারবে না!

আকাশের রোদ উপমার মুখে এসে পড়ল— তার পাণ্ডুর কপোলে কী ও চকচক করছে? অশ্রু!

উপমা কাঁদছে!

কলকাতার টিকিট ছুড়ে ফেলে দিলাম। বিবাহ? এ জীবনে নয়।

তার চোখের জলে মনের সকল মলিনতা ধুয়ে গেছে। জীবনে তাকে আর কখনো দেখিনি; কিন্তু আমার হৃদয়-মরু সজল করে, আজীবন জেগে থাকবে সেই একফোঁটা অশ্রুজল!

ভারতী আষাঢ় ১৩২৩ (জুন ১৯১৬)

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%