শিউলি

হেমেন্দ্রকুমার রায়

(ক)

নীলিমা ঢাকিয়া যখন সজল বাদলে কাজল-মেঘের ঘোরঘটা পড়িয়া যায়, কাল আকাশ তখন আপন বুক চিরিয়া মাঝে মাঝে ক্ষণিক আলো দেখায় কেন? সে জানাইয়া দেয় যে, এই অকাল-সাঁঝে অন্ধকারই তাহার যথাসর্বস্ব নহে! অন্ধকারের ভিতর হইতেও যে আলো ফুটিতে পারে, সব সময়ে এটা আমরা মনে না রাখিয়া প্রকৃতির উপরে কঠিন অবিচার করি।

—আরম্ভটা ঠিক গল্পের মতো শুনাইতেছে না। কিন্তু জীবনের সব গল্প ঘটনার গল্প নয়; সুতরাং আরম্ভেই পাঠককে রোমাঞ্চিত করা চলে না।

যার কথা বলিব, তার নাম শিউলি। সে ঘৃণিতা পতিতা। সকলের মৌখিক প্রেমে ও আন্তরিক অবজ্ঞায়, সংসারের সাগর-সৈকতে বালুকার ঘর বাঁধিয়া সে চঞ্চল-যৌবনের দ্রুত দিনগুলি গুনিয়া গুনিয়া দীর্ঘশ্বাসে কাঁপিয়া উঠিত।

তাহার 'দেবতাকে কেহ তো চাহে' নাই। মাটির ঢেলায় তাহার আত্মার বেদি ঢাকা। পঙ্কিল রূপের ঘৃণ্য আবর্জনা সরাইয়া তাহার আত্মার মাঝে দেবতার গোপন বাণী কেহ শুনিয়াছে কি—'আমি আছি, আমি আছি।'—কেহ না, কেহ না!—'হরিনাম ব্যর্থ নয় গণিকার মুখে' এ কবির বাণী—সমাজের নয়।

হায় এ জীবনের ভ্রম-প্রমাদ! রত্ন এখানে তত সহজে পুঞ্জীভূত হয় না—জঞ্জাল যত সহজে হয়।

(খ)

পৃথিবীতে দুই দল বড়ো মানুষের নাম শোনা যায়। অমুক চার পয়সার সম্বল হইতে লক্ষপতি হইয়াছিলেন, আর অমুক বিড়ালের বিবাহে লক্ষ টাকা খরচ করিয়াছিলেন।

বিলাসচন্দ্র দ্বিতীয় শ্রেণির 'অমুকে'র দলে। এবারে পশ্চিমে যাইবার সময়ে শিউলিকে সে সঙ্গে করিয়া লইয়া গেল।

তীর্থে তীর্থে ঠাকুর দেখিয়া পুণ্যসঞ্চয় করিবার ইচ্ছা, ভালো-মন্দ সকল নারীর মনেই প্রবল থাকে। কাশীধামে আসিয়া শিউলির প্রাণ তাই পুলকে পরিপূর্ণ হইয়া উঠিল। তাহার মনে হইতে লাগিল, নরক ছাড়িয়া আজ যেন সে সশরীরে স্বর্গে আসিয়া উপস্থিত।

পবিত্র পট্টবস্ত্র পরিয়া সে গঙ্গাস্নানের জন্য বাহির হইল। শিউলির আগ্রহ বেশি—সে আগে আগে যাইতে লাগিল, পিছনে পিছনে বিলাসচন্দ্র। শিউলির অঙ্গের অলংকার পুষ্পিত যৌবনের চঞ্চল রাগিণীর মতো বড়ো মধুর মধুর বাজিতেছে। তাহার লঘু গমনভঙ্গি দেখিলে মনে হয়, যেন প্রথম বসন্তের মলয় সমীর আজ এখানে মূর্তি ধরিয়া জাগিয়া উঠিয়াছে। শিউলির চরণতালে বিলাসচন্দ্রের প্রাণ উঠিতে ও নামিতে লাগিল।

রাস্তার লোকে মুগ্ধ হইয়া শিউলির দিকে তাকাইয়া রহিল। কেহ কেহ চোখ নাড়িয়া ইঙ্গিত করিতেও ছাড়িল না। এরকম ইঙ্গিত শিউলি আগেও অনেকবার দেখিয়াছে; কিন্তু আজ, এখানে, সে ইহার প্রত্যাশা করে নাই। আজ সে চলিয়াছে বিশ্বদেবতার দুয়ারে, নতশিরে, পূজারিনির বেশে;—কাহারো চিত্ত তৃষিত করিবার জন্য সে তো কোনোরকম হাবভাবের শরণ লয় নাই। রাজপথ দিয়া আরও কত রূপসি কুলকামিনী চলিয়াছেন; এ হতভাগারা তাঁহাদের দিকে চাহিয়া তো এমন ইঙ্গিত করিতে ভরসা পাইতেছে না। তবে? বিধাতা তাহার মুখে এমন কী ভয়ানক অভিশাপের ছাপ মারিয়া দিয়াছেন যে, সে লুকাইতে গেলেও ধরা পড়িয়া যায়? শিউলির গতি সংকুচিত হইয়া আসিল। একবার পিছনপানে চাহিয়া দেখিল, বিলাসচন্দ্র আসিতেছে কি না?—দেখিল, বিলাসচন্দ্র দেমাকে ডগমগ হইয়া রাস্তার সেই অসভ্য লোকগুলোর দিকে চাহিয়া মৃদু মৃদু হাসিতেছে। শিউলি সে হাসির মানে বুঝিল। সে হাসি যেন সকলকে বলিতে চায়, 'হুঁ, হুঁ; দেখো দেখো—কী দুর্লভ রত্নের মালিক আমি, দেখো!'

অত্যন্ত আহত হইয়া শিউলি আপন মুখে ঘোমটা টানিয়া দিল।

(গ)

গঙ্গাজলে ডুব দিয়া শিউলির মনে হইল, তাহার সারাজীবনের ময়লা-মাটি যেন একেবারে ধুইয়া গেল। সাদা জলে একটি গোলাপি পদ্মের মতো শিউলি অনেকক্ষণ আনমনে বসিয়া রহিল,—ছোটো ছোটো ঢেউ আসিয়া তাহার কটিতট চুম্বন করিয়া, মধুর কলহাস্যে উছলিয়া উছলিয়া উঠিতে লাগিল। ওপারের ওই ধবল বালুতটে, যেখানে দীপ্ত নীলিমার তলায় ভোরের রৌদ্র ঝিকমিকে সোনার ফুল ফুটাইতেছিল, শিউলির চোখ যেন সেখান হইতে কিছুতেই ফিরিতে চাহিতেছিল না। ওপারের ওই বিজন গঙ্গাতটে, সবুজ গাছের শীতল ছায়ায়, একখানি কুঁড়েঘর বাঁধিয়া সব ছাড়িয়া, যদি একলাটি বসিয়া বসিয়া কাশীধামের দিকে চাহিয়া চাহিয়া—কেবল চাহিয়া থাকিতে পারা যায়, তাহা হইলে সে কেমন সুখের হয়!'

শিউলি বসিয়া বসিয়া এমনি সব নানান কল্পনা করিতেছে, হঠাৎ ঘাট হইতে বিলাসচন্দ্র ডাকিয়া বলিল, 'কী গো, ঘাট থেকে আজ কি আর বাড়ি ফিরবে না—ব্যাপার কী বলো দেখি?'

শিউলি চমকিয়া বলিল, 'হ্যাঁ, হ্যাঁ—এই যাই!'—বলিয়া কাপড়খানা তাড়াতাড়ি কাচিয়া লইয়া উপরে উঠিল।

বিলাসচন্দ্র একেবারে শিউলির গা ঘেঁষিয়া দাঁড়াইল। তাহার ভাবভঙ্গি দেখিয়া ঘাটের দু-চারজন লোক অবাক হইয়া চাহিয়া রহিল। শিউলি তাহা লক্ষ করিয়া বিলাসচন্দ্রকে বলিল, 'রাস্তার মাঝখানে ও কী করো! তুমি পাছে পাছে আলাদা হয়ে এসো। আমি এখন মন্দিরে যাব।'

বিলাসচন্দ্র বলিল, 'এত বেলায় মন্দিরে! সে এবেলা নয়, ওবেলা হবে এখন।'

শিউলি বলিল, 'সে কি হয় গা! গঙ্গা নেয়ে শুদ্ধ হলুম, এখন মন্দিরে যাব না তো আবার কখন যাব? চিরকালটা পাপই করে আসছি, ঠাকুর-দেবতার জন্যে একদিন না হয় একটু কষ্টস্বীকারই করলুম—তাতে তো আর মরে যাব না।'

বিলাসচন্দ্র অস্ফুট, বিরক্তস্বরে কহিল, 'যার যত পাপ, পুণ্যের দিকে তার টান তত বেশি।'

শিউলির মুখ প্রথমে বিবর্ণ—তারপর রাগে রাঙা হইয়া উঠিল। যেখানে ব্যথা সেইখানেই লাগে। খানিকক্ষণ স্তব্ধ থাকিয়া হঠাৎ সে উদ্ধতস্বরে বলিল, 'তোমার যদি অসুবিধে হয়, তুমি বাসায় আগে ফিরে যাও। মন্দির হয়ে আমি পরে যাচ্ছি।'

বিলাসচন্দ্র হা হা করিয়া হাসিয়া বলিল, 'কী মুশকিল, ঠাট্টা বোঝো না। চলো চলো, কোথায় যাবে চলো!'

মন্দিরে ঢুকিবার আগে শিউলি আঁচল ভরিয়া বেলপাতা আর পূজার ফুল কিনিল।

তখন দুর্গাপূজার ছুটি। বিশ্বনাথজির মন্দিরে যাত্রীর বড়ো ভিড়।

চারিদিক হইতে দেবাদিদেব মহাদেবের চরণোদ্দেশে ভক্তদের গদগদ কণ্ঠের জয়গাথা ধ্বনিয়া উঠিতেছে;—কেহ ডাকিতেছে 'জয় বাবা বিশ্বনাথ!'—কেহ বলিতেছে 'কাশীনাথজি কি জয়!'—কেহ বলিতেছে 'জয় শিব শম্ভো!'—নানা জাতি নানা ভাষায়, নানা স্বরে, সেই একই দেবতাকে একপ্রাণে ডাকিয়া হৃদয়ের গোপন কামনা নিবেদন করিতেছে—কেহ কাহাকেও জানে না, চিনে না, কিন্তু সকলেরই মনের কথা এক—কী পাপী, কী পুণ্যবান।

ঘন ঘন ঘণ্টাধ্বনির সঙ্গে গম্ভীর স্তোত্রপাঠ ও পবিত্র মন্ত্রোচ্চারণ শুনিতে শুনিতে, শিউলি অভিভূত প্রাণে অঙ্গন পার হইয়া বিশ্বনাথের মূর্তির সুমুখে গিয়া বসিয়া পড়িল। তাহার তিক্ত, বিস্বাদ জীবনের মাঝে হঠাৎ আজ এ কী অজানা আনন্দের মধুর ফোয়ারা ফুটিয়া উঠিল—এ অমৃতের অজস্র ধারায় শিউলির প্রাণ গলিয়া যায় যে, গলিয়া যায়!

তাহার সেই ভক্তিভরা, নতজানু, যুক্তকর মূর্তি আজ চিত্রের মতো স্থির, সুন্দর, অপূর্ব!

কে এক ভক্ত একতারা বাজাইয়া, অঙ্গনে নাচিয়ানাচিয়া গাহিতেছিল—

'—বাবা, ভক্তিতে ভুলে

সেটা, যাই না ভুলে—

বাবাকে তুষব দুটো বিল্বদলে—'

সে গান শিউলির প্রাণকে স্পর্শ করিল।

সেইখানে দুই চোখ মুছিয়া বসিয়া শিউলি, ঠাকুরের পায়ে আপনার কলঙ্কিত জীবনের কোন কামনা জানাইল, তা বলিতে পারি না; কিন্তু তাহার চোখ ছাপিয়া, গাল বহিয়া, ঝর-ঝর-ঝর অশ্রু ঝরিতে লাগিল—সে বুঝি অনুতাপের পবিত্র অশ্রু! সে অশ্রুধারার সঙ্গে সঙ্গে তার হৃদয়ের সকল কলঙ্ক ধুইয়া বাহির হইয়া আসিল। ঠাকুরকে এমন করিয়া আর কখনো সে ডাকিতে পারে নাই; আজ এই মহাতীর্থে, অপূর্ব স্থানমাহাত্ম্যে, নিখিল ভক্তের নিখিল যাচ্ঞা একত্র হইয়া তাহার চিত্তেও যেন ভক্তির জোয়ার বহাইয়া দিতেছে।

দেবমূর্তির সুমুখে প্রতিমার মতো স্থির হইয়া শিউলি যে কতক্ষণ বসিয়া রহিল, তা সে জানে না; হঠাৎ বিলাসচন্দ্র তাহার হাত ধরিয়া টানিল।

কিন্তু শিউলির আত্মা তখন অন্য লোকে—সে নিঃসাড় হইয়াই বসিয়া রহিল।

বিলাসচন্দ্র তাহার হাত ধরিয়া আরও জোরে নাড়া দিয়া অধীরস্বরে বলিল, 'কী, ফিরতে কি হবে না?'

শিউলি ফিরিয়া বিলাসচন্দ্রের মুখের দিকে নিদ্রোত্থিতের মতো চাহিয়া দেখিল। তাহাকে দেখিবামাত্র শিউলির আবার আপনাকে মনে পড়িল এবং সেই সঙ্গে সঙ্গে তাহার দৃষ্টিতে কী গভীর একটা ব্যথার আভাস ফুটিয়া উঠিল!

কাতরস্বরে থামিয়া থামিয়া সে বলিল, 'কী, কী বলচ তুমি?'

বিলাসচন্দ্র ব্যঙ্গের সহিত বলিল, 'বলি, অতিভক্তি চোরের লক্ষণ যে! খিদেয় পেট আমার বাপান্ত করছে—এদিকে ওঁর পুজো—না মাথামুন্ডু—শেষ আর হয় না। নাও, ওঠো!'

বিলাসচন্দ্র আবার শিউলির দুর্বলতার প্রতি ইঙ্গিত করিল। শিউলির সমস্ত বুকটা ভরিয়া বিদ্রোহের একটা ঝড় বহিয়া গেল। সে কী একটা শক্ত কথা বলিতে যাইতেছিল, কিন্তু সকলে তাহাদের দিকে কৌতূহলী ও বিস্মিত দৃষ্টিতে চাহিয়া আছে দেখিয়া, সে আপনাকে সামলাইয়া নীরবে আবার দেবমূর্তির দিকে ঘুরিয়া বসিল।

ঠোঁট কামড়াইয়া বিলাসচন্দ্র বলিল, 'কী, কথা কইলে না যে!'

শিউলি চুপ।

বিলাসচন্দ্র তাহার হাত ধরিয়া সজোরে একটা টান মারিয়া বলিল, ওঠ, ওঠ বলছি।

সাপ যেমন করিয়া ফণা তোলে, বিলাসচন্দ্র তাহার গায়ে হাত দিবামাত্র শিউলি তেমনি করিয়া ঘাড় তুলিয়া দাঁড়াইয়া উঠিল। কঠিন, তীব্রস্বরে বলিল, 'কে, কে তুমি? চলে যাও এখান থেকে!'

তাহার কণ্ঠস্বরে ঘরসুদ্ধ লোক চমকিয়া উঠিল। একজন পান্ডা এতক্ষণ দূরে বসিয়া তাহাদের দুজনের হাবভাব খরচোখে লক্ষ করিতেছিল। গোলযোগ দেখিয়া এখন সে আগাইয়া আসিল। শিউলিকে জিজ্ঞাসা করিল, 'কী হয়েছে, মায়ি?'

বিলাসচন্দ্র তাহার বলিষ্ঠ দেহের দিকে তাকাইয়া ভয়ে ভয়ে কহিল, 'কিছু হয়নি। এ আমার স্ত্রী, সঙ্গে যেতে চাইছে না।'

শিউলি তীক্ষ্নস্বরে বলিল, 'ও আমার কেউ নয়। আমার গায়ে ও হাত দিয়েছে—আমি ওকে চিনি না।'

পান্ডা হুংকার দিয়া উঠিল। বিশ্বনাথজির মন্দিরে মহিলার অপমান! একটি কথা না কহিয়া বিলাসচন্দ্রের গলা ধরিয়া সে এক ধাক্কা মারিল,—বিলাসচন্দ্র লাট্টুর মতো ঘুরিতে ঘুরিতে একেবারে আঙিনায় ঠিকরিয়া পড়িল। তারপর, আপনাকে সামলাইতে-না সামলাইতে সে দেখিল, ক্রুদ্ধ মহিষের মতো পান্ডা আবার তাহার দিকে ছুটিয়া আসিতেছে। পলক না পালটিতে ঊর্ধ্বশ্বাসে সে অদৃশ্য হইয়া গেল।

ততক্ষণে শিউলি আবার হাত দুটি জোড় করিয়া, আঁচল-গলায় জানু পাতিয়া বসিয়া পড়িয়াছে—তাহার নতনেত্রে গভীর আনন্দের পবিত্র আভাস!

বৈশাখ ১৩২৩

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%